📄 দেহকে বিকট আকৃতি দেয়ার মাধ্যমে শাস্তি
৭. দেহকে বিকট আকৃতি দেয়ার মাধ্যমে শাস্তি।
বর্তমান দেহ নিয়ে যেহেতু জাহান্নামের শাস্তি সহ্য করা অসম্ভব তাই জাহান্নামীদের দেহকে অধিক পরিমাণে বড় করা হবে, যা নিজেই একটি শাস্তি হয়ে যাবে। রাসূল বলেন: “জাহান্নামে কাফেরের একটি দাঁত উহুদ পাহাড় সম হবে। (মুসলিম)
এ পৃথিবীতে আল্লাহ কোন পার্থক্যহীনভাবে সমস্ত মানুষকে অত্যন্ত সুন্দর আকৃতি ও মানানসই দেহ দান করেছেন। যদি ঐ মানানসই শরীরের কোন একটি অঙ্গ বেমানান হয়, তাহলে মানুষের আকৃতি অত্যন্ত কুৎসিত ও হাস্যকর হয়ে যায়। চিন্তা করুন ৫ বা ৬ ফিট শরীরের সাথে ১০ ফিট লম্বা বাহু যদি সংযুক্ত হয় বা কপালের ওপর ১ ফিট লম্বা নাক সংযোগ করা হলে, মানুষের আকৃতি কি পরিমাণ কুৎসিত হতে পারে। বরং তা হবে অত্যন্ত ভয়ানক। সম্ভবত জাহান্নামে কাফেরের দেহকে এ বেমানান আকৃতিতে বৃদ্ধি করে অত্যধিক ভীতিকর ও আতংকময় করা হবে। (এ বিষয়ে আল্লাহই ভালো জানেন)
মানব দেহ কষ্টের দিক থেকে তার চামড়া সর্বাধিক অনুভূতিপরায়ণ। আর এ কারণেই কাফেরকে জাহান্নামে অধিক শাস্তি দেয়ার লক্ষ্যে, জ্বলন্ত চামড়াকে পরিবর্তনের কথা কুরআনে বার বার বিশেষভাবে এসেছে। (সুরা নিসা ৪ নং আয়াত দ্রঃ)
চামড়াকে যখন টানা হয়, তখন কেমন ব্যথা হয়। তার অনুমান এভাবে করা যায় যে, বাহু বা পায়ের ভাঙ্গা হাড়কে জোড়া দেয়ার জন্য, চামড়াকে যদি সামান্য পরিমাণে টানা হয়, তাহলে এর ব্যথায় মানুষ ছটফট করতে শুরু করে দেয়। ঐ চামড়াকে টেনে যখন লম্বা করা হবে, যার বর্ণনা হাদীসে এসেছে, তাতে কাফেরের কত মারাত্মক কষ্ট হবে। সম্ভবত দুনিয়াতে তার কল্পনা করাও সম্ভব নয়।
এত বিশাল দেহের অধিকারী কাফেরকে যখন বড় বড় সাপ ও বিচ্ছু বার বার দংশন করতে থাকবে এবং তার গোশত খেতে থাকবে, তখন তার বিষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় বেহুঁশ, ফুলা, রক্ত রঞ্জিত এবং হাঁপানো ও কম্পমান কাফেরের ভয়ানক দৃশ্যের কল্পনা করুন!
মানুষকে তার দেহ নিয়ে নড়াচড়া করার ক্ষমতাও একটি নির্দিষ্ট পরিমাপের মধ্যে। এ দেহ যদি অস্বাভাবিকভাবে মোটা হয়ে যায়, তাহলে মানুষের জন্য উঠাবসা ও চলাফিরা করা এক কঠিন হয়ে যায়, যেন জীবনটা একটা শাস্তি। আর মোটা হওয়ার কারণে শরীরের আরো বহু প্রকার সমস্যা দেখা দেয়। যেমন মন রোগ, শ্বাস কষ্ট, চোখের সমস্যা, জাহান্নামে কাফেরের দেহ বড় হওয়ার কারণে অন্যান্য সমস্যাও শাস্তি আকারে দেখা দিবে, কি দিবে না দিবে এটা তো আল্লাহই ভালো জানেন।
কিন্তু একথা স্পষ্ট যে, ফেরেশতা গুর্জ ও হাতুড়ি দিয়ে তাকে মারবে বা সাপ ও বিচ্ছু ছোবল মারতে থাকবে। ফলে কাফের হরকতও করতে পারবে না। আর যদি কখনো তাকে জোর করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করতে চায়, তাহলে কাফেরের জন্য এক কদম উঠানো এত কঠিন হবে যে, এটাই একটি বেদনাদায়ক শাস্তিতে পরিণত হবে। কাফের জাহান্নামে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলবে: হে আল্লাহ! এক বার এখান থেকে বের কর, পরে আমরা নেককার হয়ে এখানে আসব। উত্তরে বলা হবে-
فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ نَّصِيرٍ .
সুতরাং শাস্তি আস্বাদন কর; জালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরা ফাতির-৩৭)
আল্লাহ স্বীয় রহমত, দয়া ও অনুগ্রহে আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন। নিঃসন্দেহে তিনি অত্যন্ত উদারভাবে নি'আমত দানকারী বাদশা, অনুগ্রহপরায়ণ, অত্যন্ত করুণাময় ও দয়ালু।
📄 মারাত্মক ঠাণ্ডার দ্বারা শাস্তি
৮. মারাত্মক ঠাণ্ডার দ্বারা শাস্তি।
আগুন যেভাবে মানুষের দেহকে জ্বালিয়ে দেয়, তেমনিভাবে মারাত্মক ঠাণ্ডাও মানুষের দেহকে ঢিলা করে দেয়। তাই জাহান্নামে অত্যধিক ঠাণ্ডার শাস্তিও থাকবে। জাহান্নামে ঐ স্তরটির নাম হবে 'যামহারীর'। যামহারীর কত কঠিন ঠাণ্ডা হবে তার জ্ঞান তো একমাত্র সর্বজ্ঞ ও সম্যক অবহিত মহান আল্লাহই ভালো জানেন। কিন্তু এ ঠাণ্ডা যেহেতু শাস্তি দেয়ার জন্য হবে, সুতরাং তা তো অবশ্যই এ ঠাণ্ডা থেকে কয়েক গুণ বেশি হবে। এ দুনিয়ার যে কোন ঠাণ্ডার মৌসুমে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে হয়ে থাকে। যা থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য গরম পোশাক কম্বল, লেপ, হিটার, অঙ্গার ধানিকা, গরম গরম খানা-পিনা, আরো কত কি, এরপরও মানুষের অস্বাভাবিক অসাবধানতার ফলে, সাথে সাথেই মানুষ কোন না কোন সমস্যায় পড়ে যায়। উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যতীত মানুষকে যদি পোশাকহীন পৃথিবীর ঠাণ্ডায় থাকতে হয়, তাহলে তাও এক প্রকার কঠিন শাস্তি হবে। অথচ রাসূল বলেন: “পৃথিবীর ঠাণ্ডা জাহান্নামের শ্বাস ত্যাগের কারণে হয়ে থাকে। (বোখারী)
এ থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, শুধু জাহান্নামের অভ্যন্তরীণ শ্বাস থেকে সৃষ্ট ঠাণ্ডা যদি মানুষের জন্য অসহ্য হয়, তাহলে জাহান্নামের অভ্যন্তরীণ ঠাণ্ডার স্তর 'যামহারীরে' মানুষের কি অবস্থা হবে?
আল্লাহ মানুষকে অত্যন্ত নরম ও মোলায়েম করে তৈরি করেছেন। এত নরম ও মোলায়েম যে শুধু ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মাঝে সে সুস্থ থাকতে পারে। এর চেয়ে কম বা বেশি উভয় তাপমাত্রাই অসুস্থতার লক্ষণ। যদি শরীরের তাপমাত্রা ৩৫ এর কম হয়ে ৩৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে তার মৃত্যু হয়ে যাবে। আর যদি এ তাপমাত্রা প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে শরীরের কোন অংশে ৬.৭৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড (বা ২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে শরীরের ঐ অংশটি ঠাণ্ডার কারণে ঢিলা হয়ে বা পঁচে সাথে সাথে পৃথক হয়ে যায়, যাকে চিকিৎসা শাস্ত্রে "FROST BITE' বলে।
অনুমান করা যাক যে, যামহারীরে যদি এতটুকু ঠাণ্ডা থাকে যে, শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ৬.৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড (বা ২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে ঐ আযাবের অবস্থা এ হবে যে, জীবিত মানুষের দেহ ঠাণ্ডার প্রচণ্ডতায় বালুর মত দানা দানা হয়ে অণুতে পরিণত হবে। অতপর তাকে নূতন করে দেহ দেয়া হবে। যতক্ষণ সে যামহারীরে থাকবে ততক্ষণ সে ঐ আযাবে নিমজ্জিত থাকবে। এ ভাগ শুধু সাইন্স ও অভিজ্ঞতার আলোকে দেখানো হল। যখন একথা স্পষ্ট যে, জাহান্নামের আগুনের ন্যায় যামহারীরের ঠাণ্ডাও পৃথিবীর ঠাণ্ডার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি কঠিন হবে। যামহারীরের বাস্তব ঠাণ্ডার শাস্তি যথাযথ অবস্থা কি হবে, তা হয়ত আমরা এ দুনিয়াতে কল্পনাও করতে পারব না। কিন্তু এ বিষয়ে মোটেও সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে, জাহান্নামের আগুন হোক আর যামহারীরের ঠাণ্ডা, উভয় অবস্থায়ই কাফের জীবিত থাকার চেয়ে মৃত্যুকে প্রাধান্য দিবে। আর বার বার মৃত্যু কামনা করবে।
وَنَادَوْا يَا مَالِكُ لِيَقْضِ عَلَيْنَا رَبُّكَ .
তারা চিৎকার করে বলবে: হে মালিক! (জাহান্নামের রক্ষক) তোমার প্রতিপালক আমাদেরকে নিঃশেষ করে দিন। উত্তরে বলা হবে -
قَالَ إِنَّكُمْ مَّاكِثُونَ
সে বলবে তোমরা তো এভাবেই থাকবে। (সূরা যুমার-৭৭) আল্লাহ সব মুসলমানকে স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহে যামহারীরের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। নিঃসন্দেহে তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল এবং স্বীয় বান্দাদের প্রতি রহম ও অনুগ্রহপরায়ণ।
📄 আরো কতিপয় অজানা শাস্তি
৯. আরো কতিপয় অজানা শাস্তি। কুরআন ও হাদীসে আগুন ব্যতীত অন্যান্য বহু প্রকার আযাবের যেখানে সাধারণ বর্ণনা হয়েছে, সেখানে কোন কোন পাপের বিশেষ বিশেষ আযাবের উল্লেখও করা হয়েছে। কিন্তু এর সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলা একথাও উল্লেখ করেছেন- وَآخَرُ مِنْ شَكْلِهِ أَزْوَاج
আরো আছে এরূপ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি। (সূরা সোয়াদ-৫৮) আবার কোথায়ও শুধু বলা হয়েছে- عَذَابٌ اَلِيْمٌ বেদনাদায়ক শাস্তি”। আবার কোথায়ও عَذَابٌ عَظِيمٌ “প্রচণ্ড শাস্তি” আবার কোথায়ও عَذَابٌ شَدِيدٌ "কঠিন শাস্তি” বলেই শেষ করা হয়েছে।
"এরূপ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি"। "বেদনাদায়ক শাস্তি" "প্রচণ্ড শাস্তি” “কঠিন শাস্তি" ইত্যাদি কি ধরনের হবে তার সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। মনে হচ্ছে যে, জেলখানায় যেমন সন্ত্রাসীদের শাস্তি সুনির্দিষ্ট থাকে, কিন্তু এরপরও কিছু কিছু বড় বড় সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে, অফিসাররা কোন কোন সময় শুধু বলে দেয় যে, অমুক সন্ত্রাসীকে ইচ্ছামতো শিক্ষা দাও। আর জল্লাদ ভালো করেই জানে যে, এ নির্দেশের মাধ্যমে অফিসারদের উদ্দেশ্য কি এবং এ ধরনের সন্ত্রাসীদেরকে শিক্ষা দেয়ার কি ব্যবস্থা আছে। এমনিভাবে আল্লাহ কাফেরদের বড় বড় নেতাদেরকে শিক্ষা দেয়ার জন্য, শুধু এতটুকু বলেছেন যে, অমুক অমুক মোজরেমকে বেদনাদায়ক শাস্তি দেয়া হবে। জাহান্নামের প্রহরী ভালো করে জানে যে, বেদনাদায়ক শাস্তি দেয়ার কি কি পদ্ধতি আছে। আর যে মোজরেম প্রচণ্ড আযাবের হকদার, তাকে প্রচণ্ড শাস্তি কিভাবে দিতে হবে, তাও তার জানা আছে। (এ ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন)
এ হল ঐ জাহান্নাম এবং তার শাস্তি যা থেকে সতর্ক করার জন্য আল্লাহ তাঁর রাসূলকে ভয় প্রদর্শনকারীরূপে প্রেরিত করেছিলেন। আর তিনি লোকদেরকে ভয় প্রদর্শন করতে কোন প্রকার ত্রুটি করেননি। লোকদেরকে বারবার সতর্ক করেছেন যে-
اتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمَرَةٍ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَبِكَلِمَةٍ طَيِّبَةٍ .
একটি খেজুরের (সামান্য) অংশ দান করার বিনিময়ে হলেও জাহান্নাম থেকে বাঁচ। আর যার পক্ষে এতটুকুও সম্ভব নয়, সে যেন ভালো কথা বলার মাধ্যমে তা থেকে বাঁচে। (মুসলিম)
অর্থাৎ: জাহান্নাম থেকে বাঁচা এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, যার নিকট দান করার মতো কোন কিছুই নেই, সে যেন একটি খেজুরের একটু অংশ দান করে জাহান্নাম থেকে নিজেকে বাঁচায়। আর যার পক্ষে তাও সম্ভব নয়, সে যেন ভালো কথা বলার মাধ্যমে নিজেকে তা থেকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করে।
রাসূল-এর বাণীর অংশটি "যার নিকট খেজুরের একটি টুকরাও নেই" একথা প্রমাণ করছে যে, তিনি তার উম্মতকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য কত আগ্রহী ও শুভকামনা করতেন। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার দোয়া এমনভাবে শিখাতেন, যেমন কুরআন মাজীদের সূরা শিখাতেন। (নাসায়ী),
মালেক বিন দিনার (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: যদি আমার নিকট কোন সাহায্যকারী থাকত তাহলে আমি তাকে সমগ্র পৃথিবীতে আহ্বানকারীরূপে প্রেরণ করতাম যে, সে ঘোষণা করবে যে, হে লোকেরা! জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচ। হে লোকেরা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচ। সমগ্র পৃথিবীতে না হোক, অন্তত এটুকু তো আমরা প্রত্যেকে করতে পারি যে, নিজের সন্তান-সন্ততিদেরকে জাহান্নাম থেকে সতর্ক করি। নিজের আত্মীয়-স্বজনদেরকে জাহান্নাম থেকে সতর্ক করি। নিজের বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করি যে, হে লোকেরা! খেজুরের একটি টুকরা দান করার মাধ্যমে হলেও, জাহান্নাম থেকে বাঁচ, আর তা সম্ভব না হলে ভালো কথার মাধ্যমে তা থেকে বাঁচ। (মুসলিম)