📘 জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা > 📄 চেহারায় অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত করার মাধ্যমে শাস্তি

📄 চেহারায় অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত করার মাধ্যমে শাস্তি


৪. চেহারায় অগ্নিশিখা প্রজ্জলিত করার মাধ্যমে শাস্তি।

জাহান্নামে শুধু আগুন আর আগুনই হবে। জাহান্নামীদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত দেহ আগুনের মাঝে নিমজ্জিত থাকবে। এরপরও কুরআন মাজীদে কোন কোন অপরাধী সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তাদের চেহারায় আগুনের শিখা প্রজ্জলিত করা ও চেহারাকে আগুন দিয়ে গরম করার কথা উল্লেখ হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন: "ঐ দিন তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে শৃংখলিত অবস্থায়। তাদের জামা হবে আল কাতরার, আর অগ্নি আচ্ছন্ন করবে তাদের মুখমণ্ডল"। (সূরা ইবরাহিম-৪৯, ৫০)

আল্লাহ মানব দেহকে যে বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন তা সম্পর্কে তিনি বলেন- لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ .
আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি উত্তম আকৃতিতে। (সূরা ত্বীন-৪)

মানুষের সমস্ত শরীরের মধ্যে চেহারাকে আল্লাহ্ সুন্দর, ইজ্জত, মাহাত্ম্যের নিদর্শন করেছেন। তৃপ্তিদায়ক চোখ, সুন্দর নাক, মানানসই কান, নরম ঠোঁট, গণ্ডদেশ ইত্যাদি। যৌবনকালে কালো চুল মানুষের সৌন্দর্য ও আকৃতিতে আরো উজ্জ্বল করে। আবার বৃদ্ধ বয়সে চাঁদির ন্যায় সাদা চুল মানুষের সম্মান ও মাহাত্ম্যের নিদর্শন। চেহারার ঐ সম্মান ও মাহাত্মের মর্যাদায় রাসূল নির্দেশ দিয়েছেন যে, "স্ত্রীকে যদি প্রহার করতে হয় তাহলে তার চেহারায় প্রহার করবে না"। (ইবনে মাজাহ)

চিকিৎসা শাস্ত্রে চেহারা শরীরের অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় অধিক সংবেদনশীল। চোখ, কান, নাক, দাঁত ও গণ্ডদেশ ইত্যাদির রগসমূহ মস্তিষ্কের সাথে সম্পৃক্ত। চেহারা মস্তিষ্কের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে রক্তের চলাচল শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় বেশি দ্রুত। তাই সামান্য রাগের কারণে চেহারার রগ দ্রুত লাল হয়ে যায়। চেহারার এক অংশে কোন সমস্যা হলে সমস্ত চেহারাই ঐ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে যায়। যদি শুধু দাঁতে কোন ব্যথা হয় চোখ, কান, মাথায়ও ব্যাথা অনুভব হয়। আর এ ব্যাথা এত বেশি হয় যে, এ সময়ে মানুষের সময় যেন অতিক্রান্ত হয় না। সে যত দ্রুত সম্ভব তা থেকে রক্ষা পেতে চায়। শরীরের এ সমবেদনশীল অংশে যখন জাহান্নামের অত্যাধিক গরমে উনুনের শিখা প্রজ্জলিত করা হবে, তখন কাফেরদের কত কঠিন ব্যথা সহ্য করতে হবে, তার অনুমান জাহান্নামীদের এ আফসোস থেকে অনুভব করা যায় যে, তারা বলবে- يَا لَيْتَنِي كُنتُ تُرَابًا. হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম (সূরা নাবা-৪০)

অপরাধীদেরকে যখন প্রহার করা হয়, তখন তারা সাধারণত হাত দিয়ে চেহারাকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। কিন্তু অনুমান করা হোক যে যখন একদিকে অপরাধীদের হাত-পা ভারি জিঞ্জির দিয়ে বাঁধা থাকবে, অন্য দিকে জাহান্নামের ভয়ানক ফেরেস্তা বিনা বাধায় তার চেহারায় আগুনের বৃষ্টি বর্ষণ করতে থাকবে। মূলত তাকে শারীরিক শাস্তির সাথে সাথে মারাত্মক অপমান ও লাঞ্ছনাও করা হবে। আর এ লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি এক বা দু'ঘন্টা বা এক বা দু'সপ্তাহ, এক বা দু'মাসের জন্য বা এক বা দু'বছরের জন্য নয়, বরং তা সার্বক্ষণিকভাবে চলতে থাকবে। আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন-

"হায় যদি কাফেররা ঐ সময়ের কথা জানত যখন তারা তাদের সম্মুখ ও পশ্চাৎ হতে অগ্নি প্রতিরোধ করতে পারবে না, আর তাদের কোনু সাহায্যও করা হবে না”। (সূরা আম্বিয়া- ৩৯)

কোন বদ নসীব এ লাঞ্ছনাময় শাস্তির যোগ্য হবে? এ ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা স্পষ্ট করে বলেছেন।

"সে দিন তাদের মুখমণ্ডল অগ্নিতে উলট-পালট করা হবে, সে দিন তারা বলবে হায়! আমরা যদি আল্লাহকে মানতাম এবং তাঁর রাসূল কে মানতাম। তারা আরো বলবে: হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড় লোকদের আনুগত্য করেছিলাম আর তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন। আর তাদেরকে দিন মহা অভিসম্পাত”। (সূরা আহযাব ৬৬,৬৮)

যেহেতু পাপিষ্ঠদের অন্যায় এ হবে যে, তারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিপক্ষে তাদের সরদার, গুরুদের অনুসরণ করেছে। কাফেরদের কুফরী আর মুশরিকদের শিরকের এ অবস্থা হবে যে, তারা তাদের আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করে নাই বরং তাদের আলেম, দরবেশ, লিডার, বাদশাহদের অনুসরণ করেছে। যার বেদনাদায়ক শাস্তি তাদেরকে কিয়ামতের দিন ভোগ করতে হবে।

আমাদের নিকট কাফের মুশরিকদের তুলনায় ঐ সমস্ত মুসলমানদের আচরণ বেশি বেদনাদায়ক যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কালেমা পাঠ করেছে, কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস, জান্নাত ও জাহান্নামকে স্বীকার করে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কোনো না কোনো ভুল বুঝের কারণে রাসূলের অনুসরণ থেকে দূরে সরে গিয়েছে।

মনে রাখুন রাসূল ﷺ-এর মিশন যেমন কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে, তেমনিভাবে তাঁর অনুসরণও কিয়ামত পর্যন্ত করে যেতে হবে।

وَمَا اَرْسَلْنٰكَ اِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيْرًا وَّنَذِيْرًا
আমি মানুষের নিকট তোমাকে সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে প্রেরণ করেছি। (সূরা সাবা-২৮)

অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
يٰٓاَيُّهَا النَّاسُ اِنِّىْ رَسُوْلُ اللّٰهِ اِلَيْكُمْ جَمِيْعًا
হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি। (সূরা আ'রাফ-১৫৮)

অনুরূপভাবে আরো ইরশাদ হয়েছে-
تَبٰرَكَ الَّذِيْ نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلٰى عَبْدِهٖ لِّيَكُوْنَ لِلْعٰلَمِيْنَ نَذِيْرًا
কত মহান তিনি যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরকান (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন। যাতে তিনি বিশ্বাসীদের জন্য সতর্ককারী হতে পারেন। (সূরা ফুরকান-১)

সুতরাং যারা রাসূল ﷺ-এর মিশনকে তাঁর জীবিত থাকা পর্যন্তই সীমিত বলে বিশ্বাস করে নিঃসন্দেহে তারা তাঁর অনুসরণের ব্যাপারে পথভ্রষ্ট হচ্ছে। আবার যারা রাসূল ﷺ-কে শুধু আল্লাহর বার্তাবাহকরূপে মেনে নিয়ে তাঁর নির্দেশিত পথ (হাদীসের) অকাট্যতাকে অস্বীকার করছে তারাও তাঁর অনুসরণের ব্যাপারে পথভ্রষ্ট হচ্ছে। আর যারা এ আক্বীদা পোষণ করে যে কুরআন মাজীদ হেদায়েতের জন্য যথেষ্ট। এর সাথে রাসূল ﷺ-এর হাদীসের কোন প্রয়োজন নেই তারাও তাঁর অনুসরণের ব্যাপারে পথভ্রষ্ট হচ্ছে। (সূরা নাহল ৪৪ আয়াত দ্রঃ)

এমনিভাবে যারা এ আক্বীদা পোষণ করে যে, কুরআন মাজীদ নির্ভরযোগ্য সূত্রে সংরক্ষিত আছে কিন্তু হাদীস নির্ভরযোগ্য সূত্রে সংরক্ষিত নেই। তাই তাঁর ওপর আমল করা জরুরি নয় তারাও তাঁর অনুসরণের ব্যাপারে পথভ্রষ্ট। (সূরা হিযর ৯ নং আয়াত দ্রঃ)

যে সমস্ত উলামায়ে কেরাম স্বীয় ফিকহী মাসআলার গোড়ামীর কারণে স্বীয় ইমামগণের কথাকে রাসূল-এর হাদীসের ওপর প্রাধান্য দেয় তারাও তার অনুসরণের ব্যাপারে পথভ্রষ্ট হচ্ছে।

অনুরূপভাবে যারা স্বীয় বুযুর্গদের মোরাকাবা ও কাশফকে রাসূল-এর হাদীসের ওপর প্রাধান্য দেয় তারাও তাঁর অনুসরণের ব্যাপারে পথভ্রষ্ট হচ্ছে। এমনিভাবে যারা স্বীয় আকাবেরগণের মোশাহাদা ও স্বপ্নকে রাসূল-এর সুন্নতের ওপর প্রাধান্য দেয় তারাও তাঁর অনুসরণের ব্যাপারে পথভ্রষ্ট হচ্ছে। (সূরা হুজরাত ১ নং আয়াত দ্রঃ)।

আমরা অত্যন্ত আদব ও সম্মানের সাথে, মুসলমানদের সমস্ত গবেষণালয়ের নিকট, অত্যন্ত নিষ্ঠতা ও হামদর্দ নিয়ে আবেদন করছি যে, রাসূল এর অনুসরণের বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এমন যেন না হয় যে, ইমামগণের আক্বীদা, বুযর্গদের মোহাব্বত, আর নিজস্ব দর্শনের গোড়ামী আমাদেরকে কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তিতে নিষ্পেষিত না করে। কেননা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর এ ধরনের বেদনাদায়ক পরিণতি ক্ষতির কারণ হবে।

أَلَا ذَٰلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
জেনে রেখ, এটা সুস্পষ্ট ক্ষতি। (সূরা যুমার- ১৫)

📘 জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা > 📄 গুর্জ ও হাতুড়ির আঘাতের মাধ্যমে শাস্তি

📄 গুর্জ ও হাতুড়ির আঘাতের মাধ্যমে শাস্তি


৫. গুর্জ ও হাতুড়ির আঘাতের মাধ্যমে শান্তি। জাহান্নামে কাফের ও মোশরেকদেরকে গুর্জ ও লোহার হাতুড়ি দিয়ে আঘাতের মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হবে। কুরআন ও হাদীসে এর প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- وَلَهُمْ مَّقَامِعُ مِنْ حَدِيدٍ
আর তাদের জন্য থাকবে লৌহ গুর্জসমূহ। (সূরা হাজ্জ-২১)

এ প্রসঙ্গে নবী এরশাদ করেন কাফেরদেরকে মারার গুর্জের ওজন এত বেশি হবে যে, যদি একটি গুর্জ পৃথিবীর কোথাও রাখা হয়, আর পৃথিবীর সমস্ত জ্বিন ও ইনসান তা উঠানোর জন্য চেষ্টা করে তাহলে তারা তা উঠাতে পারবে না। (মুসনাদ আবু ইয়ালা)

জাহান্নামের পূর্বে কবরেও কাফেরদেরকে গুর্জ ও হাতুড়ি দিয়ে মারা হবে। কবরের আযাবের বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে রাসূল বলেন: মুনকার ও নাকীরের প্রশ্ন উত্তরে নিষ্ফল হওয়ার পর কাফেরদের জন্য অন্ধ ও মূক ফেরেশতা নিয়োগ করা হবে, তাদের নিকট লোহার গুর্জ থাকবে, আর তা এত ভারী হবে যে, যদি কোন পাহাড়ের ওপর তা দিয়ে আঘাত করা হয়, তাহলে পাহাড় অণু অণু হয়ে যাবে। ঐ গুর্জ দিয়ে অন্ধ ও মূক ফেরেশতা তাকে মারতে থাকবে আর সে চিৎকার করতে থাকবে। নবী বলেন: কাফেরের চিৎকারের আওয়াজ পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে মানুষ ও জ্বিন ব্যতীত সমস্ত সৃষ্টি জীব শুনে। ফেরেশতার আঘাতে কাফের মাটির মতো অণু অণু হয়ে যাবে, তখন সেখানে আবার রূহ ফেরত দেয়া হবে। (মুসনাদে আবু ইয়ালা) কিয়ামত পর্যন্ত বারংবার এ অবস্থা চলতে থাকবে।

জাহান্নামের শাস্তি কবরের শাস্তির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি কঠিন ও বেদনাদায়ক হবে। কবরে হাতুড়ি ও গুর্জ দিয়ে আঘাতকারী ফেরেশতা যদি অন্ধ ও মূক হয় তাহলে জাহান্নামের ফেরেশতা সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ ঘোষণা করেন- عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلاظٌ شِدَادٌ .
তাতে নিয়োজিত আছে নির্মম হৃদয় ও কঠোর স্বভাব বিশিষ্ট ফেরেশতা। (সূরা তাহরীম-৬)

ইকরামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: জাহান্নামীদের প্রথম গ্রুপ যখন সেখানে যাবে তখন দেখবে যে, দরজার সামনে চার লক্ষ ফেরেশতা তাদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। যাদের চেহারা হবে অত্যন্ত ভয়ানক ও খুবই কালো। আল্লাহ তাদের অন্তর থেকে দয়া-মায়া বের করে নিয়েছেন, ফলে তারা হবে অত্যন্ত নির্দয়। এ ফেরেশতাদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হবে এই যে- لا يَعْصُونَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤمرون .
ঐ ফেরেশতারা কখনো আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে না, আর তাদেরকে যে নির্দেশ দেয়া হয় তারা তাই করে। (সূরা তাহরীম-৬)

অর্থাৎ: আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে যেমন শাস্তি দিতে নির্দেশ দিয়েছেন তারা সাথে সাথে তেমন শাস্তিই দিতে শুরু করবে। এক পলকের জন্যও বন্ধ করবে না। এ ফেরেশতারা কাফেরদেরকে এত কঠিন পদ্ধতিতে শাস্তি দিতে থাকবে যে, বড় বড় পাপিষ্ঠদের কলিজা চালনির মতো ছিদ্র হয়ে যাবে। (ইবনে কাসীর)

এ হল কাফেরদের পরিণতি ও তাদের কুফরীর শাস্তি। মূলত কাফের আল্লাহর নিকট পৃথিবীর সর্বাধিক পরিত্যাজ্য ও লাঞ্ছিত সৃষ্টি। পৃথিবীতে ঈমানের সম্পদের চেয়ে মূল্যবান আর কোন সম্পদ নেই, হায় যদি মুসলমানরা পৃথিবীতে এ সম্পদকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারত, কাফেররা তো নিঃসন্দেহে কিয়ামতের দিন (জাহান্নামের) শাস্তি দেখে এ কামনা করবে যে-

لَوْ أَنَّهُمْ كَانُوا يَهْتَدُونَ .
হায়! তারা যদি সৎপথের অনুসরণ করত। (সূরা কাসাস-৬৪)

📘 জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা > 📄 বিষাক্ত সাপ ও বিচ্ছুর ছোবলের মাধ্যমে শাস্তি

📄 বিষাক্ত সাপ ও বিচ্ছুর ছোবলের মাধ্যমে শাস্তি


৬. বিষাক্ত সাপ ও বিচ্ছুর ছোবলের মাধ্যমে শাস্তি।

জাহান্নামে বিষাক্ত সাপ ও বিচ্ছুর ছোবলের মাধ্যমেও শাস্তি হবে। সাপ ও বিচ্ছু উভয়কেই মানুষের দুশমন মনে করা হয়, আর এ উভয়ের নামের মাঝেই এত ভয় ও আতংক রয়েছে যে, যদি কোন স্থানে সাপ ও বিচ্ছুর অবস্থান সম্পর্কে মানুষ অবগত থাকে, তাহলে সেখানে মানুষের বসবাসের কথাতো অনেক দূরে; বরং কোন ব্যক্তি ঐ দিক দিয়ে রাস্তা অতিক্রমের ঝুকিও নিতে রাজি হবে না। কোন কোন সাপের আকৃতি, প্রকৃতি, রং, লম্বা, নড়াচড়া, স্বাভাবিকতা এমন থাকে যে, তা দেখামাত্রই মানুষ সংজ্ঞাহীন হয়ে যায়। সাপ বা বিচ্ছু সর্বাধিক কতটা বিষাক্ত হতে পারে? তার সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না, কিন্তু অভিজ্ঞতার আলোকে এবং বিভিন্ন পুস্তকে বর্ণিত ব্যাখ্যার আলোকে, এ সিদ্ধান্ত নেয়া দুষ্কর নয় যে, সাপ অত্যন্ত ভয়ানক ও মানুষের জানের শত্রু। দক্ষিণ পূর্ব ফ্রান্সে বিদ্যমান একটি বিষাক্ত সাপ সম্পর্কে কিছু কিছু সংবাদ সূত্রে বলা হয়েছে সেখানকার এক একটি সাপ দেড় মি: লম্বা। আর এক একটি সাপের বিষ দিয়ে এক সাথে পাঁচজন লোককে নিহত করা সম্ভব।

১৯৯৯ইং, কিং সউদ ইউনিভার্সিটি রিয়াদ, সউদী আরবের ছাত্রদের জন্য একটি শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অত্যন্ত বিষাক্ত সাপের প্রদর্শনীও করা হয়েছিল। কাঁচের বাক্সে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে কোনো কোনোটি সম্পর্কে নিম্নোক্ত তথ্য দেয়া হয়েছিল।

অ্যারাবীয়ান কোবরা (Arabin Cobra) যা আরব দেশগুলোতে পাওয়া যায় তা এতো বিষাক্ত যে, তার বিষের মাত্রা বিশ মি: গ্রাম, ৭০ কি: গ্রাম ওজনের মানুষকে সাথে সাথেই ধ্বংস করতে পারে। আর এ কোবরা তার মুখ থেকে এক সাথে ২০০ কি:- ৩০০ কি: গ্রাম বিষ দুষমনের ওপর নিক্ষেপ করে।

কান্‌গ কোবরা' যা ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানে পাওয়া যায়, এদের ছোবলগ্রস্ত লোকও সাথে সাথেই মারা যায়। প্রাচ্যের দেশসমূহের বিদ্যমান সাপসমূহ (West Diamond Black Snack) অত্যন্ত বিষাক্ত সাপের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়।

ইন্দোনেশিয়ার থুথু নিক্ষেপকারী বিষাক্ত সাপ (Indonesia Spitting Cibra) ২ কি: লম্বা হয়ে থাকে যা ৩ কি: দূরে থেকে মানুষের চোখে পিচনকারীর ন্যায় বিষ নিক্ষেপ করে থাকে, যার ফলে মানুষ সাথে সাথেই মৃত্যুবরণ করে।

জাহান্নামের পূর্বে কবরেও কাফেরদেরকে সাপের ছোবলের মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হবে। তাই কবরের আযাবের বর্ণনা দিতে গিয়ে রাসূল বলেন: যে কাফের যখন মোনকার নাকীরের প্রশ্নের উত্তরে নিষ্ফল হবে, তখন তার জন্য নিরানব্বইটি সাপ নির্ধারণ করা হবে। যা কিয়ামত পর্যন্ত তাকে ছোবল মারতে থাকবে। কবরের সাপ সম্পর্কে রাসূল বলেন: যদি এ সাপ একবার পৃথিবীতে নিঃশ্বাস ফেলে, তাহলে পৃথিবীতে কখনো আর কোন ঘাস উৎপাদিত হবে না। (মুসনাদে আহমদ)

নিঃসন্দেহে কবরে ও জাহান্নামে ধ্বংসকারী সাপসমূহ পৃথিবীর সাপের তুলনায়, বহুগুণ বেশি বিষাক্ত, ভয়ানক ও আতংক সৃষ্টিকারী হবে। পৃথিবীর কোন সাধারণ সাপের দংশনে মানুষের যে অবস্থা হয় তা হল প্রথমত সে বেঁহুশ হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত: দংশনকৃত অংশটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়।

তৃতীয়ত: মুখ, কান এমনকি চোখ দিয়েও রক্ত ঝরতে থাকে। শুধু একবার দংশনের ফলেই এ অবস্থা হয়, তাহলে চিন্তা করা যেতে পারে যে, যে মানুষকে পৃথিবীর সাপের তুলনায় হাজার গুণ বেশি বিষাক্ত সাপ বারবার দংশন করতে থাকবে সে তখন কি পরিমাণ বেদনাদায়ক শাস্তিতে নিমজ্জিত থাকবে। (আল্লাহ আমাদের তা থেকে রক্ষা করুন।)

বিচ্ছুর দংশনের প্রতিক্রিয়া সাপের দংশনের প্রতিক্রিয়ার চেয়ে অধিক বেশি হবে। বিচ্ছুর দংশনের ফলে মানুষের সাথে সাথে নিম্নোক্ত অবস্থা হয়।

প্রথমত: দেহ ফুলে উঠে।

দ্বিতীয়ত: শ্বাস নেয়া কষ্টকর হয়ে যায়। দম বন্ধ হয়ে আসে। জাহান্নামের বিচ্ছুর কথা বর্ণনা করতে গিলে রাসূল বলেন তা খচ্চরের সমান হবে, আর তার একবার ছোবলের ফলে কাফের চল্লিশ বছর পর্যন্ত ব্যথা অনুভব করতে থাকবে। (মুসনাদে আহমদ)

এর অর্থ হল এই যে, বিচ্ছুর বারবার দংশনের ফলে জাহান্নামী বার বার ফুলে উঠবে এবং দম বন্ধ হয়ে আসার অবস্থাও বার বার বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এ হবে ঐ কঠিন শাস্তির একটি ধরন। যা মাত্র কাফেরকে দেয়া হবে। কাফের কি জাহান্নামে ঐ সাপ ও বিচ্ছুসমূহকে মেরে ফেলবে? না কোথাও পালিয়ে যাবে, না কোন আশ্রয়স্থল পাবে? আল্লাহ কতইনা সত্য বলেছেন-

رَبِّمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ كَانُوا مُسْلِمِينَ .
কোনো কোনো সময় কাফেররা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হতো। (সূরা হিযর-২)

কিন্তু হে ঈমানদাররা! জাহান্নাম ও তার আযাবের প্রতি ঈমান আনয়নকারী! তোমরা তো আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করবে এবং আল্লাহ তার রাসূলের নাফরমানী করা থেকে বিরত থাক। আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে জেনে ও মেনেও যদি তাঁর নাফরমানী করা হয়, তাহলে তো তাঁর শাস্তি আরো বেশি কঠিন হবে।

فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ -
তোমরা কি তা থেকে বিরত থাকবে? (সূরা মায়েদা-৯১)

📘 জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা > 📄 দেহকে বিকট আকৃতি দেয়ার মাধ্যমে শাস্তি

📄 দেহকে বিকট আকৃতি দেয়ার মাধ্যমে শাস্তি


৭. দেহকে বিকট আকৃতি দেয়ার মাধ্যমে শাস্তি।

বর্তমান দেহ নিয়ে যেহেতু জাহান্নামের শাস্তি সহ্য করা অসম্ভব তাই জাহান্নামীদের দেহকে অধিক পরিমাণে বড় করা হবে, যা নিজেই একটি শাস্তি হয়ে যাবে। রাসূল বলেন: “জাহান্নামে কাফেরের একটি দাঁত উহুদ পাহাড় সম হবে। (মুসলিম)

এ পৃথিবীতে আল্লাহ কোন পার্থক্যহীনভাবে সমস্ত মানুষকে অত্যন্ত সুন্দর আকৃতি ও মানানসই দেহ দান করেছেন। যদি ঐ মানানসই শরীরের কোন একটি অঙ্গ বেমানান হয়, তাহলে মানুষের আকৃতি অত্যন্ত কুৎসিত ও হাস্যকর হয়ে যায়। চিন্তা করুন ৫ বা ৬ ফিট শরীরের সাথে ১০ ফিট লম্বা বাহু যদি সংযুক্ত হয় বা কপালের ওপর ১ ফিট লম্বা নাক সংযোগ করা হলে, মানুষের আকৃতি কি পরিমাণ কুৎসিত হতে পারে। বরং তা হবে অত্যন্ত ভয়ানক। সম্ভবত জাহান্নামে কাফেরের দেহকে এ বেমানান আকৃতিতে বৃদ্ধি করে অত্যধিক ভীতিকর ও আতংকময় করা হবে। (এ বিষয়ে আল্লাহই ভালো জানেন)

মানব দেহ কষ্টের দিক থেকে তার চামড়া সর্বাধিক অনুভূতিপরায়ণ। আর এ কারণেই কাফেরকে জাহান্নামে অধিক শাস্তি দেয়ার লক্ষ্যে, জ্বলন্ত চামড়াকে পরিবর্তনের কথা কুরআনে বার বার বিশেষভাবে এসেছে। (সুরা নিসা ৪ নং আয়াত দ্রঃ)

চামড়াকে যখন টানা হয়, তখন কেমন ব্যথা হয়। তার অনুমান এভাবে করা যায় যে, বাহু বা পায়ের ভাঙ্গা হাড়কে জোড়া দেয়ার জন্য, চামড়াকে যদি সামান্য পরিমাণে টানা হয়, তাহলে এর ব্যথায় মানুষ ছটফট করতে শুরু করে দেয়। ঐ চামড়াকে টেনে যখন লম্বা করা হবে, যার বর্ণনা হাদীসে এসেছে, তাতে কাফেরের কত মারাত্মক কষ্ট হবে। সম্ভবত দুনিয়াতে তার কল্পনা করাও সম্ভব নয়।

এত বিশাল দেহের অধিকারী কাফেরকে যখন বড় বড় সাপ ও বিচ্ছু বার বার দংশন করতে থাকবে এবং তার গোশত খেতে থাকবে, তখন তার বিষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় বেহুঁশ, ফুলা, রক্ত রঞ্জিত এবং হাঁপানো ও কম্পমান কাফেরের ভয়ানক দৃশ্যের কল্পনা করুন!

মানুষকে তার দেহ নিয়ে নড়াচড়া করার ক্ষমতাও একটি নির্দিষ্ট পরিমাপের মধ্যে। এ দেহ যদি অস্বাভাবিকভাবে মোটা হয়ে যায়, তাহলে মানুষের জন্য উঠাবসা ও চলাফিরা করা এক কঠিন হয়ে যায়, যেন জীবনটা একটা শাস্তি। আর মোটা হওয়ার কারণে শরীরের আরো বহু প্রকার সমস্যা দেখা দেয়। যেমন মন রোগ, শ্বাস কষ্ট, চোখের সমস্যা, জাহান্নামে কাফেরের দেহ বড় হওয়ার কারণে অন্যান্য সমস্যাও শাস্তি আকারে দেখা দিবে, কি দিবে না দিবে এটা তো আল্লাহই ভালো জানেন।

কিন্তু একথা স্পষ্ট যে, ফেরেশতা গুর্জ ও হাতুড়ি দিয়ে তাকে মারবে বা সাপ ও বিচ্ছু ছোবল মারতে থাকবে। ফলে কাফের হরকতও করতে পারবে না। আর যদি কখনো তাকে জোর করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করতে চায়, তাহলে কাফেরের জন্য এক কদম উঠানো এত কঠিন হবে যে, এটাই একটি বেদনাদায়ক শাস্তিতে পরিণত হবে। কাফের জাহান্নামে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলবে: হে আল্লাহ! এক বার এখান থেকে বের কর, পরে আমরা নেককার হয়ে এখানে আসব। উত্তরে বলা হবে-

فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ نَّصِيرٍ .
সুতরাং শাস্তি আস্বাদন কর; জালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরা ফাতির-৩৭)

আল্লাহ স্বীয় রহমত, দয়া ও অনুগ্রহে আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন। নিঃসন্দেহে তিনি অত্যন্ত উদারভাবে নি'আমত দানকারী বাদশা, অনুগ্রহপরায়ণ, অত্যন্ত করুণাময় ও দয়ালু।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00