📄 জাহান্নামের আগুন
১. জাহান্নামের আগুন জাহান্নামের সবচেয়ে বেশি শাস্তি আগুনেরই হবে, যে ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন যে, জাহান্নামের আগুন দুনিয়ার আগুনের চেয়ে সত্তর গুণ বেশি গরম হবে। (মুসলিম)
কুরআনুল কারীমের কোনো কোনো স্থানে তাকে "বড় আগুন" নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (সূরা আ'লা-১২)
আবার কোথাও "আল্লাহর প্রজ্জলিত অগ্নি" নামেও আখ্যায়িত করা হয়েছে। (সূরা হুমাযা-৫)
আবার কোথাও 'লেলিহান জাহান্নাম'ও বলা হয়েছে। (সূরা লাইল-১৪)
আবার কোথাও "জ্বলন্ত অগ্নি"ও বলা হয়েছে। (সূরা গাশিয়া)
শাস্তি হিসেবে যদি শুধু মানুষকে জ্বালিয়ে দেয়াই উদ্দেশ্য হতো, তাহলে দুনিয়ার আগুনই যথেষ্ট ছিল যাতে মানুষ সাময়িক সময়ের মধ্যে জ্বলে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু জাহান্নামের আগুন তো মূলত কাফের ও মুশরিককে বিশেষভাবে শাস্তি দেয়ার জন্যই উত্তপ্ত করা হয়েছে, তাই তা পৃথিবীর আগুনের চেয়ে কয়েক গুণ গরম হওয়া সত্ত্বেও জাহান্নামীদেরকে একেবারে শেষ করে দিবে না; বরং তাদেরকে ধারাবাহিকভাবে আযাবে নিমজ্জিত করে রাখবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
لَا يَمُوتُ فِيهَا وَلَا يَحْيَىٰ
(জাহান্নামে) সে মরবেও না বাঁচবেও না। (সূরা আ'লা-১৩)
রাসূলুল্লাহকে স্বপ্নযোগে এক কুৎসিত আকৃতি ও বিবর্ণ চেহারার লোক দেখানো হল, সে আগুন জ্বালিয়ে যাচ্ছে এবং তাকে উত্তপ্ত করছে, রাসূলুল্লাহ জিবরীল (আ)-কে জিজ্ঞেস করলেন: এ কে? জবাবে তিনি বললেন: তার নাম মালেক সে জাহান্নামের দারওয়ান। (বোখারী)
জাহান্নামের আগুনকে আজও উত্তপ্ত করা হচ্ছে, কিয়ামত পর্যন্ত তাকে উত্তপ্ত করা হতে থাকবে, জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে যাওয়ার পরও তাকে উত্তপ্ত করার ধারাবাহিকতা চলতে থাকবে।
আল্লাহ তা'য়ালা ইরশাদ করেন:
كُلَّمَا خَبَتْ زِدْنَاهُمْ سَعِيرًا
যখনই তা স্তিমিত হবে আমি তখনি তাদের জন্য অগ্নি বৃদ্ধি করে দিব। (সূরা বানী ইসরাঈল-৯৭)
জাহান্নামের আগুন কত উত্তপ্ত হবে তার হুবহু পরিমাণের বর্ণনা করা তো অসম্ভব, তবে রাসূলুল্লাহ এর বর্ণনা অনুযায়ী জাহান্নামে আগুনের তাপদাহ পৃথিবীর আগুনের চেয়ে উনসত্তর গুণ বেশি হবে।
সাধারণ অনুমানে পৃথিবীর আগুনের উত্তাপ ২০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ধরা হলে জাহান্নামের আগুনের তাপমাত্রা হয় ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এ কঠিন গরম আগুন দিয়ে জাহান্নামীদের পোশাক ও তাদের বিছানা তৈরি করা হবে। ঐ আগুন দিয়ে তাদের ছাতি ও তাঁবু তৈরি করা হবে। ঐ আগুন দিয়েই তাদের জন্য কার্পেট তৈরি করা হবে। কঠিন আযাবের এ নিকৃষ্ট স্থানে মানুষের জীবনযাপন কেমন হবে, যারা নিজের হাতে সামান্য একটি আগুনের কয়লাও রাখার ক্ষমতা রাখে না।
মানুষের ধৈর্যের বাঁধ তো এই যে, জুন, জুলাই মাসে দুপুর ১২টার সময়ের তাপ ও গরম বাতাস সহ্য করাই অনেকের অসম্ভব হয়ে যায়, দুর্বল, অসুস্থ ও বৃদ্ধ লোক এর ফলে মৃত্যুবরণও করে, অথচ রাসূলুল্লাহ -এর বাণী অনুযায়ী পৃথিবীর এ কঠিন গরম জাহান্নামের শ্বাস ত্যাগ বা তাপের কারণ মাত্র। যে মানুষ জাহান্নামের তাপই সহ্য করতে পারে না, তারা তার আগুন কি করে সহ্য করবে?
কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুন দেখে সমস্ত নবীগণ এত ভীতসন্ত্রস্ত হবে যে, তাঁরা বলবে যে- رَبِّي سَلَمَ رَبِّي سَلم .
হে প্রভু! আমাকে বাঁচাও, হে আমার প্রভু! আমাকে বাঁচাও! এ বলে আল্লাহর নিকট স্বীয় জীবনের নিরাপত্তা কামনা করবে।
উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা (রা) জাহান্নামের আগুনের কথা স্মরণ করে পৃথিবীতে কাঁদতেন, পৃথিবীতে থাকা অবস্থায়ই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবীর একজন ওমর (রা)। কুরআন তেলাওয়াত করার সময় জাহান্নামের আযাবের কথা আসলে বেঁহুশ হয়ে যেতেন। মুয়াজ বিন জাবাল, আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা, ওবাদা বিন সামেত (রা) এদের মতো সম্মানিত সাহাবাগণ জাহান্নামের আগুনের কথা স্মরণ করে এত কাঁদতেন যে, তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যেতেন। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) কামারের দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানে প্রজ্জলিত আগুন দেখে জাহান্নামের কথা স্মরণ করে কাঁদতে থাকতেন।
আতা সুলামী (রা)-এর সাথীরা রুটি বানানোর জন্য চুল্লী প্রস্তুত করলে তিনি তা দেখে বেঁহুশ হয়ে গেলেন।
সুফিয়ান সাওরীর নিকট যখন জাহান্নামের কথা আলোচনা করা হতো, তখন তার রক্তের প্রস্রাব হতো।
রবী (রা) সারা রাত বিছানায় এপাশ-ওপাশ হতে থাকলে তার মেয়ে জিজ্ঞেস করল, আব্বাজান! সমস্ত মানুষ আরামে ঘুমিয়ে গেছে আপনি কেন জেগে আছেন? তিনি বললেন: হে মেয়ে! জাহান্নামের আগুন তোমার পিতাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন কতইনা সত্য- إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا .
তোমার প্রতিপালকের শাস্তি ভয়াবহ। (সূরা বনী ইসরাঈল-৫৭)
আল্লাহ স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহে সকল মুসলমানকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিন। আমীন!
📄 শাস্তির পরিমাপ থাকা চাই
৩. শাস্তির পরিমাপ থাকা চাই!
জাহান্নামের আগুন ও তার বিভিন্ন প্রকার শাস্তির কথা অধ্যয়নের সময় মানুষের পশম দাঁড়িয়ে যায় এবং মনের অজান্তেই জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করতে থাকে। কিন্তু সাথে সাথে একথাও মনে পড়ে যে জীবনের সমস্ত পাপ যতই হোক না কেন এ গুনাহসমূহের শাস্তির জন্য একটি পরিসীমা থাকা দরকার ছিল। আর ঐ সত্তা যিনি স্বীয় বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়াবান, তিনি সর্বসময়ের জন্য কি করে মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন?
এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে প্রথমে আল্লাহর শাস্তি ও সাজা সম্পর্কে একটি নিয়ম আমরা পাঠকদের দৃষ্টিগোচর করতে চাই যে, রাসূল বলেছেন: যে ব্যক্তি মানুষকে হেদায়েতের পথে আহ্বান করে, তার আমলনামায় ঐ সমস্ত লোকদের আমলের সমান সওয়াব লেখা হবে, যারা তার আহ্বানে হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়েছে। অথচ তাদের (পরস্পরের) সওয়াবের মধ্যে মোটেও কমতি হবে না। এমনিভাবে যে ব্যক্তি মানুষকে গোমরাহির পথে আহ্বান করে, তার আমলনামায় ঐ সমস্ত লোকদের পাপের সমান পাপ লিখা হবে, যারা তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে পাপে লিপ্ত হয়েছে। অথচ পাপকারীদের পরস্পরের পাপের মধ্যে কোন কমতি হবে না। (মুসলিম)
এ নিয়মের বিস্তারিত বর্ণনা হাবীল কাবীলের ঘটনার মাধ্যমেও স্পষ্ট হয়। যে ব্যাপারে নবী বলেছেন: পৃথিবীতে কোন ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হলে আদম (আ)-এর প্রথম সন্তান কাবীল (হত্যাকারী) ও ঐ পাপের ভাগী হবে। কেননা সে সর্বপ্রথম হত্যার প্রথা চালু করেছে। (বোখারী ও মুসলিম)
এ নিয়মের আলোকে একজন কাফের শুধু তার নিজের পাপের সাজাই ভোগ করবে না, বরং তার সন্তান, সন্তানদের সন্তান... এমনকি কিয়ামত পর্যন্ত তার বংশে যত কাফের জন্মগ্রহণ করবে এ সমস্ত কাফেরদের কুফরীর সাজা, প্রথম কাফের পাবে, যে আল্লাহ তাঁর রাসূল -কে মানতে অস্বীকার করেছে। সাথে সাথে এ সমস্ত কাফেররা তাদের স্ব স্ব কুফরীর সাজাও পাবে। এ আচরণ ঐ সমস্ত কাফেরের সাথে করা হবে, যারা তাদের সন্তানদেরকে কুফরীর সবক দিয়েছে এবং কুফরীর ওপর অটল রেখেছে। এ নিয়মের আলোকে প্রত্যেক কাফেরের পাপের সূচি এত বৃহৎ মনে হয় যে, জাহান্নামে তার চিরস্থায়ী ঠিকানা ন্যায়পরায়ণতার আলোকে সঠিক বলেই স্পষ্ট হয়। এতো গেল ব্যক্তিগত একক কুফরীর কথা, আর যদি কোন কাফের কুফরীকে সামাজিক আন্দোলনরূপে প্রতিষ্ঠিত করে, কোন সমাজ বা কোন রাষ্ট্র বা সমগ্র পৃথিবীতে তা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে, তাহলে এ সম্মিলিত চেষ্টা প্রচেষ্টা তার মূল পাপের সাথে আরো পাপ বৃদ্ধির কারণ হবে। আর এ বৃদ্ধির পরিমাপ ঐ বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে যে, এ সম্মিলিত চেষ্টা প্রচেষ্টার ফলে কত লোক পথভ্রষ্ট হয়েছে। আর এ আন্দোলনকে প্রচার করার জন্য কত কত এবং কি কি পাপ করা হয়েছে।
যেমন: লেলিন কমিউনিজম নামক ভ্রান্ত আবিষ্কার করেছিল, এরপর ঐ ভ্রান্ত মতবাদকে বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য লাখ মানুষ নির্দ্বিধায় নিহত হয়েছে। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী লাখ মানুষের ওপর নির্যাতনের পাহাড় চাপিয়েছে। শহর কি শহর, গ্রাম কি গ্রাম পদদলিত করা হয়েছে। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাসমূহে, ইসলামের রাস্তা বন্ধ করার জন্য সর্বপ্রকার হাতিয়ার ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাম নেয়াতে নিয়মানুবর্তিতা, আযানে নিয়মানুবর্তিতা, সালাতে নিয়মানুবর্তিতা, কুরআনে নিয়মানুবর্তিতা, মসজিদ ও মাদরাসায় নিয়মানুবর্তিতা, আলেম উলামাদের প্রতি দূরাচরণ।
এ সমস্ত অপরাধ লেলিনের পাপ বৃদ্ধির কারণ হবে। সে শুধু তার বংশগত কাফেরদের কুফরিরই জিম্মাদার নয়, বরং অসংখ্য মানুষকে পথভ্রষ্ট করার পাপের বোঝা বহন করে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। হত্যা, মারামারি ও পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাপের সূচি ও তার বদ আমলের সাথে সম্পৃক্ত হবে। সর্বশেষ ধরনের ইসলামের শত্রু কট্টর কাফেরের জন্য জাহান্নামের চেয়ে অধিক উপযুক্ত স্থান আর কি হতে পারে?
১৮৪৬ ইং মার্চ মাসে মহারাজা গোলব সিং কাশ্মীর খরিদ করে তার জোরপূর্বক শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করল। তখন দু'জন নেতৃস্থানীয় মুসলমান মল্লি খাঁন এবং সবজ আলী খাঁন তার প্রতিবাদ জানাল। তখন গোলব শিং এ উভয় নেতাকে উল্টা করে ঝুলিয়ে জীবন্ত অবস্থায় তাদের চামড়া ছিলার নির্দেশ দিল। এ দৃশ্য এক ভয়ানক ছিল যে, গোলব শিংয়ের ছেলে রামবীর শিং সহ্য করতে না পেরে দরবার থেকে উঠে গেল, তখন গোলব শিং তাকে ডাকিয়ে বলল: যদি তোমার মধ্যে এ দৃশ্য দেখার মতো সাহস না থাকে, তাহলে তোমাকে যুবরাজের পদ থেকে হটিয়ে দেয়া হবে। ইসলাম ও মুসলমানদের দুশমনীর এ ধরনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের উপযুক্ত শাস্তি জাহান্নামের আগুন ব্যতীত আর কি হতে পারে?
ভারত বিভক্তির সময় লর্ড মাউন্টবেটিন, স্যার পেটিল, হেজাক্সী লেন্সী, নেহেরু, আন্জহানী, গান্ধীরা জেনে বুঝে যেভাবে ইসলামের শত্রুতার ঝড় তুলে ও নির্দ্বিধায় মুসলমানদেরকে হত্যা করিয়েছে, মুসলিম মহিলাদের ইজ্জত হরণ করেছে, মাসুম শিশুদেরকে কতল করেছে, এর প্রতিশোধ যতক্ষণ পর্যন্ত জাহান্নামের আগুন, তার সাপ, বিচ্ছুরা না নিবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নিরপরাধে নিহত মুসলমান, পবিত্র মুসলিম মহিলা, মাসুম মুসলিম শিশুদের কলিজা কি করে ঠাণ্ডা হবে? এমনিভাবে বসনিয়া, কসোভো ও সিসান ইত্যাদি।
সুতরাং ঐ মহাজ্ঞানী অভিজ্ঞ সত্ত্বা যিনি মানুষের অন্তরের গোপন আকাঙ্ক্ষার খবর রাখেন, কাফেরের জন্য যত শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন, তা কাফেরের উপযুক্ত শাস্তি, তার প্রাপ্যের চেয়ে বিন্দু পরিমাণ কমও হবে না আবার বেশিও না। বরং ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে তার উপযুক্ত শাস্তিই হবে। অত্যন্ত দয়ালু তিনি কারো ওপর বিন্দু পরিমাণ জুলুম করেন না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا .
তোমার রব কারো ওপর বিন্দু পরিমাণ জুলুম করেন না। (সূরা কাহাফ-৪৯)
📄 স্বীয় পরিবার-পরিজনদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও
৪. স্বীয় পরিবার ও পরিজনদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও
কুরআন মাজীদে আল্লাহ ইরশাদ করেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أأَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ .
হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনদেরকে রক্ষা করো অগ্নি থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর। যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম হৃদয়, কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না আল্লাহ তাদেরকে যা আদেশ করেন তার। আর তারা যা করতে আদিষ্ট হয় তারা তাই করে। (সূরা তাহরীম-৬)
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ দুটি কথা স্পষ্ট শব্দে নির্দেশ দিয়েছেন-
১. নিজেকে নিজে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।
২. নিজের পরিবার-পরিজনদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।
পরিবার-পরিজন বলতে বুঝায় স্ত্রী, সন্তান, যেন প্রত্যেক ব্যক্তি তার সাথে সাথে নিজের স্ত্রী সন্তানদেরকেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে বাধ্যগত। স্বীয় পরিবার-পরিজনের প্রতি প্রকৃত কল্যাণকামীতার দাবিও তাই। এমনিভাবে যখন আল্লাহ তার রাসূলকে এ নির্দেশ দেন যে- وَانْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ .
তোমার নিকট আত্মীয়দেরকে (জাহান্নামের আগুন) থেকে সতর্ক কর। (সূরা শু'আরা-২১৪)
তখন নবী স্বীয় পরিবার ও বংশের লোকদেরকে ডেকে তাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করলেন। সব শেষে স্বীয় কন্যা ফাতেমা (রা)-কে ডেকে বললেন- يَا فَاطِمَةُ انْقِذِي نَفْسَكِ مِنَ النَّارِ فَإِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ مِّنَ اللَّهِ شَيْئًا
হে ফাতেমা! নিজেকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করো, (কিয়ামতের দিন) আল্লাহর সামনে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারব না। (মুসলিম)
নিজের পাড়া-প্রতিবেশী ও বংশের লোকদেরকে জাহান্নাম থেকে সতর্ক করার পর, নিজের কন্যাকে জাহান্নামের আগুন থেকে ভয় দেখিয়ে, সমস্ত মুসলমানকে সতর্ক করলেন যে, স্বীয় সন্তানদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোও পিতা-মাতার দায়িত্বসমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এক হাদীসে নবী ইরশাদ করেছেন "প্রত্যেকটি সন্তান ফিতরাত (ইসলামের) ওপর জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু তাদের পিতা-মাতা তাদেরকে ইহুদী, নাসারা বা অগ্নিপূজক হিসেবে গড়ে তোলে। (বোখারী)
যেন সাধারণ নিয়ম এই যে, পিতা-মাতাই সন্তানদেরকে জান্নাত বা জাহান্নামে নিক্ষেপ করে।
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে মানুষের বহু দুর্বলতার উল্লেখ করেছেন। যেমন: মানুষ অত্যন্ত জালেম ও অকৃতজ্ঞ। (সূরা ইবরাহীম-৩৪)
অন্যান্য দুর্বলতার ন্যায় একটি দুর্বলতা এই বলে বর্ণনা করা হয়েছে যে, মানুষ দ্রুত অর্জিত লাভসমূহকে অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তা ক্ষণস্থায়ী বা অল্পই হোক না কেন? আর বিলম্বে অর্জিত লাভকে তারা উপেক্ষা করে চলে, যদিও তা স্থায়ী ও অধিকই হোক না কেন।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- إِنَّ هَؤُلَاءِ يُحِبُّونَ الْعَاجِلَةَ وَيَذَرُونَ وَرَاءَهُمْ يَوْمًا ثَقِيلاً .
নিঃসন্দেহে তারা দ্রুত অর্জিত লাভ (অর্থাৎ দুনিয়া)-কে ভালোবাসে আর পরবর্তী কঠিন দিবসকে উপেক্ষা করে চলে। (সূরা দাহার-২৭)
এ হল মানুষের ঐ স্বভাবজাত দুর্বলতার ফল যে, পিতা-মাতা স্বীয় সন্তানদেরকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে উচ্চ মর্যাদা লাভ, সম্মান এবং উচ্চ শিক্ষা দেয়ার জন্য অধিকাংশ সময় গুরুত্ব দেয়। চাই এ জন্য যত সময় এবং সম্পদই ব্যয় হোক না কেন, আর যত দুঃখ কষ্ট পোহানো হোক না কেন। অথচ অনেক কম পিতা-মাতাই আছে যারা, তাদের সন্তানদেরকে পরকালের স্থায়ী জীবন, উচ্চ পজিশন লাভের জন্য, দ্বীনি শিক্ষা দেয়ার জন্য গুরুত্ব দেয়। যার অর্জন দুনিয়ার শিক্ষার চেয়ে সহজও বটে আবার দ্বীন ও দুনিয়া উভয় দিক থেকে পিতা-মাতার জন্য কল্যাণকরও। দুনিয়াবী শিক্ষা অর্জনকারী বেশিরভাগ সন্তান কর্মজীবনে স্বীয় পিতা-মাতার অবাধ্য থাকে এবং নিজে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে, পক্ষান্তরে দ্বীনি শিক্ষা অর্জনকারী বেশিরভাগ সন্তান, স্বীয় পিতামাতার অনুগত থাকে এবং তাদের সেবা করে। আর পরকালের দৃষ্টিতে তো অবশ্যই এ সন্তানরা পিতা-মাতার জন্য কল্যাণকামী হবে। যারা সৎ মুত্তাকী ও দ্বীনদার হবে।
এ সমস্ত বাস্তবতাকে জানা সত্ত্বেও কোন অতিরঞ্জন ব্যতীতই ৯৯% মানুষই দুনিয়াবী শিক্ষাকে দ্বীনি শিক্ষার ওপর প্রাধান্য দেয়। আসুন মানবতার এ দুর্বলতাকে অন্য এক দিক দিয়ে বিবেচনা করা যাক।
ধরুন, কোন জায়গায় যদি আগুন লেগে যায়, তাহলে ঐ স্থানের সমস্ত বসবাসকারীরা সেখান থেকে বের হয়ে যাবে, ভুলক্রমে যদি কোন শিশু ঐ স্থানে থেকে যায়, তাহলে চিন্তা করুন, ঐ অবস্থায় ঐ শিশুর পিতা-মাতার অবস্থা কি হবে? পৃথিবীর যে কোন ব্যস্ততা বা বাধ্যকতা যেমন ব্যবসা, ডিউটি, দুর্ঘটনা, অসুস্থতা ইত্যাদি পিতা-মাতাকে শিশুর কথা ভুলিয়ে রাখতে পারবে? কখনো নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত শিশু আগুন থেকে বেরিয়ে না আসতে পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পিতা-মাতা ক্ষণিকের জন্যও আরামবোধ করবে না। নিজের শিশুকে আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য যদি পিতা-মাতার জীবনবাজী দিতে হয়, তা হলে তাও দিবে। কত আশ্চর্য কথা যে এ ক্ষণস্থায়ী জীবনে তো প্রত্যেক ব্যক্তিরই অনুভূতি এ কাজ করে যে, তার সন্তানকে যে কোন মূল্যের বিনিময়ে হলেও আগুন থেকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু পরকালে জাহান্নামের আগুন থেকে নিজের সন্তানকে বাঁচানোর অনুভূতি খুব কম লোকেরই আছে। আল্লাহ তায়ালা কতই না সত্য বলেছেন।
وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ .
আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ। (সূরা সাবা-১৩)
নিঃসন্দেহে মানুষের এ দুর্বলতা ঐ পরীক্ষার অংশ যার জন্য মানুষকে এ পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু জ্ঞানী সে-ই যে এ পরীক্ষার অনুভূতি লাভ করেছে। আর এ পরীক্ষার অনুভূতি এই যে, মানুষ তার স্রষ্টা ও মনিবের হুকুম বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নিবে। আল্লাহ্ ঈমানদারদেরকে জাহান্নাম থেকে বাঁচার এবং নিজের স্ত্রী, সন্তানদেরকে তা থেকে বাঁচানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তাহলে ঈমানের দাবী এই যে, প্রত্যেক মুসলমান নিজে নিজেকে এবং তার স্ত্রী-সন্তানকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষার জন্য ৬৯ গুণ বেশি চিন্তিত থাকবে। যেমন সে তার স্ত্রী-সন্তানকে দুনিয়ার আগুন থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন অনুভব করে। এ দায়িত্ব পূর্ণ করার জন্য প্রত্যেক মুসলমান দু'টি বিষয় গুরুত্বের চোখে দেখবে:
প্রথমত: কুরআন ও হাদীসের শিক্ষার গুরুত্ব: মূর্খতা ও অজ্ঞতা চাই তা দুনিয়ার ব্যাপারেই হোক আর দ্বীনের ব্যাপার হোক, তা মানুষের জন্য লাভ-ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেছেন। তিনি বলেন-
هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ .
যারা জ্ঞানী আর যারা জ্ঞানী নয় তারা কি সমান? (সূরা যুমার-৯)
এ সর্বসাধারণের কথা, যে ব্যক্তি পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, হাশর-নশর সম্পর্কে অবগত আছে, জান্নাতের চিরস্থায়ী নি'আমতসমূহ এবং জাহান্নামের শাস্তি সম্পর্কে অবগত রয়েছে, তার জীবন ঐ ব্যক্তির জীবনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হবে যে, ব্যক্তি অফিসিয়ালভাবে আখেরাতকে মানে, কিন্তু হাশর নশরের অবস্থা জান্নাতের চিরস্থায়ী নি'আমত এবং জাহান্নামের শাস্তি সম্পর্কে অবগত নয়। কিতাব ও সুন্নাতের জ্ঞান যারা রাখে, তারা অন্য লোকদের মোকাবেলায় অধিক সঠিক পথে ঈমানদার এবং প্রতি কদমে তারা আল্লাহকে ভয় করে।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ .
মূলত আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু (কুরআন ও হাদীসের) জ্ঞান যারা রাখে তারাই আল্লাহকে অধিক ভয় করে। (সূরা ফাতের-২৮)
সুতরাং যারা স্বীয় সন্তানদেরকে দুনিয়ার শিক্ষা দেয়ার জন্য কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখে, তারা মূলত নিজের সন্তানদের আখিরাতকে বরবাদ করে, তাদের ওপর অধিক জুলুম করছে। আর যারা তাদের সন্তানদেরকে দুনিয়াবী শিক্ষার সাথে সাথে, কুরআন কারীম ও হাদীসের শিক্ষাও দিয়ে যাচ্ছে, তারা শুধু তাদের সন্তানদেরকে তাদের আখিরাতই আলোকময় করছে না, বরং নিজেরা আল্লাহর আদালতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
দ্বিতীয়ত: ঘরে ইসলামী পরিবেশ তৈরি: শিশুর ব্যক্তিত্বকে ইসলামী ভাবধারায় গড়ে তুলতে হলে ও ঘরে ইসলামী পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা, ঘরে আসা ও যাওয়ার সময় সালাম দেয়া, সত্য বলার অভ্যাস গড়ে তোলা, পানাহারের সময় ইসলামী আদবের প্রতি লক্ষ্য রাখা। দান-খয়রাত করার অভ্যাস গড়ে তোলা। শয়ন ও নিদ্রা থেকে উঠার সময়, দোয়া পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা। গান-বাজনা, ছবি না রাখা, এমনকি ফিল্মী ম্যাগাজিন, উলঙ্গ ছবিযুক্ত পেপার ইত্যাদি থেকে ঘরকে পবিত্র রাখা। মিথ্যা, গীবত, গালি-গালাজ, ঝগড়া থেকে বিরত থাকা।
নবীদের ঘটনাবলী, ভালো লোকদের জীবনী, কুরআনের ঘটনাবলী, যুদ্ধ, সাহাবাদের জীবনী সম্বলিত বই-পুস্তক শিশুদেরকে পড়ানো। পরস্পরের মাঝে উত্তম আচরণ করা, এ সমস্ত কথা ব্যক্তি সন্তানদেরকে ব্যক্তিত্ব গঠনে মৌলিক বিষয়বস্তু।
সুতরাং যে পিতা-মাতা স্বীয় সন্তানদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য পুরাপুরি দায়িত্ব পালন করতে চায়, তার জন্য আবশ্যক যে, সে তার সন্তানদেরকে কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা দেয়ার সাথে সাথে ঘরের মধ্যে পূর্ণ ইসলামী পরিবেশ তৈরি করা।
📄 কবীরা গুনাহকারী কিছু সময়ের জন্য জাহান্নামে অবস্থান করবে
৫. কবীরা গুনাহকারী কিছু সময়ের জন্য জাহান্নামে অবস্থান করবে
উল্লেখিত নামে এ কিতাবে একটি অধ্যায় রচনা করা হয়েছে, যেখানে ঐ মুসলমানদের জাহান্নামে যাওয়ার বর্ণনা রয়েছে যে, যারা কিছু কিছু কবীরা পাপের কারণে প্রথমে জাহান্নামে যাবে এবং স্বীয় পাপের শাস্তি ভোগ করার পর জান্নাতে যাবে।
উল্লেখিত অধ্যায়ে আমরা ঐ সমস্ত হাদীস বাছাই করেছি যেখনে রাসূল স্পষ্ট করে বলেছেন: "ঐ ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করেছে" এরকম শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে বা তার সাথে সম্পৃক্ত এমন কোন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যাতে করে কোন প্রকার ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়। কিন্তু এ থেকে এ কথা বুঝা ঠিক হবে না যে, এ কবীরা গুনাহসমূহ ব্যতীত আর এমন কোন গুনাহ নেই, যা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হতে পারে। জাহান্নামের বর্ণনা নামক গ্রন্থ লেখার উদ্দেশ্য শুধু এই যে, লোকেরা শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক হয়ে তা থেকে বাঁচার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। এ জন্য জরুরী ছিল যে, লোকদেরকে এ সমস্ত কবীরা গোনাহ থেকে সতর্ক করা যা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে। এ জন্য আমরা কোন আলোচনায় না গিয়ে ইমাম জাহাবীর 'কিতাবুল কাবায়ের' থেকে কবীরা গুনাহসমূহের সূচি পেশ করছি। এ আশায় যে আল্লাহর শাস্তিকে ভয়কারী, নেককার মুত্তাকী লোকেরা এ থেকে অবশ্যই উপকৃত হবে ইনশাআল্লাহ।
কবীরা গুনাহ কী?
আল্লাহর কিতাব, রাসূল এর সুন্নাহ ও অতীতের পুণ্যবান মনীষীদের বর্ণনা থেকে যেসব জিনিস আল্লাহ ও রাসূল কর্তৃক সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ বলে জানা যায়, সেগুলোই কবীরা (বড়) গুনাহ। কবীরা ও নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকলে সগীরা (ছোট) গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হবে বলে আল্লাহ কুরআনে নিশ্চয়তা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন-
إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سياتكم وندخلكم مدخلاً كريما
তোমরা, যদি বড় বড় নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাক তাহলে আমি তোমাদের (অন্যান্য) গুনাহ মাফ করে দিব এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব। (সূরা ৪-আন নিসা : আয়াত-৩১)
আল্লাহ তায়ালা এ অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দ্বারা কবীরা বা বড় বড় গুনাহ থেকে যারা সংযত থাকে তাদের জন্য স্পষ্টতই জান্নাতের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। সূরা আশ্ শূরাতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَالَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبِيرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُواهُمْ يَغْفِرُونَ .
"আর সেসব ব্যক্তি, যারা বড় বড় গুনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে সংযত থাকে এবং রাগান্বিত হলে, ক্ষমা করে।" (সূরা ৪২- আশ্ শূরা: আয়াত-৩৭) এবং সূরা আন নাজমে আল্লাহ বলেন-
الَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبِيرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ طَ إِنَّ رَبِّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ .
আর যারা বড় বড় গুনাহ ও অশ্লীল কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকে, তাদের জন্য আল্লাহর ক্ষমা খুবই প্রশস্ত। অবশ্য ছোটখাটো গুনাহের কথা আলাদা। (সূরা ৫৩- আন নাজম: আয়াত-৩২)
রাসূলুল্লাহ বলেছেন: "প্রতিদিন পাঁচবার সালাত, জুময়ার সালাত পরবর্তী জুময়া না আসা পর্যন্ত এবং রমযানের রোযা পরবর্তী রমযান না আসা পর্যন্ত মধ্যবর্তী গুনাহসমূহের ক্ষমার নিশ্চয়তা দেয়- যদি 'কবীরা গুনাহ'সমূহ থেকে বিরত থাকা হয়।” এ কয়টি আয়াত ও হাদীসের আলোকে আমাদের জন্য কবীরা গুনাহসমূহ কি কি তা অনুসন্ধান করা অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে আমরা আলেম সমাজের মধ্যে কিছু মতভেদ দেখতে পাই। কারো কারো মতে কবীরা গুনাহ সাতটি। তাঁরা যুক্তি প্রদর্শন করেন যে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (رض) قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ قَالَ الشَّرْكُ بِاللهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَكُلُ الرِّبَا وَأَكُلُ مَالِ الْيَتِيمِ وَالتَّولِى يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَدْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ الْغَافِلَاتِ .
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল বলেছেন- “তোমরা সাতটি সর্বনাশা গুনাহ থেকে বিরত থাক। ১. আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা, ২. যাদু করা, ৩. শরীয়াতের বিধিসম্মতভাবে ছাড়া কোন অবৈধ হত্যাকাণ্ড ঘটানো, ৪. ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, ৫. সুদ খাওয়া, ৬. যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানো, এবং ৭. সরলমতি সতীসাধ্বী মু'মিন মহিলাদের ওপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ। (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন: এর সংখ্যা সত্তরের কাছাকাছি।
হাদীসে কবীরা গুনাহের কোন সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায় না। তবে এতটুকু বুঝা যায় এবং অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, যে সমস্ত বড় বড় গুনাহের জন্য দুনিয়ায় শাস্তি প্রদানের আদেশ দেয়া হয়েছে, যেমন হত্যা, চুরি, ও ব্যভিচার, কিংবা আখিরাতে ভীষণ আযাবের ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে অথবা রাসূল এর ভাষায় সে অপরাধ সংঘটককে অভিসম্পাত করা হয়েছে, অথবা সে গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির ঈমান নেই, বা সে মুসলিম উম্মাহর ভেতরে গণ্য নয়- এরূপ বলা হয়েছে সেগুলো কবীরা গুনাহ।
সাঈদ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে বলেছিল: কবীরা গুনাহ তো সাতটি। ইবনে আব্বাস বললেন: বরঞ্চ সাতশোটির কাছাকাছি। তবে ক্ষমা চাইলে ও তওবা করলে কোন কবীরা গুনাহই কবীরা থাকে না। অর্থাৎ মাফ হয়ে যায়। আর ক্রমাগত করতে থাকলে সগীরা গুনাহও সগীরা থাকে না, বরং কবীরা হয়ে যায়। অপর এক রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, ইবনে আব্বাস বলেছেন: কবীরা গুনাহ প্রায় ৭০টি। অধিকাংশ আলেম গণনা করে ৭০টিই পেয়েছেন বা তার সামান্য কিছু বেশি পেয়েছেন।
এ কথাও সত্য যে, কবীরা গুনাহর ভেতরেও তারতম্য আছে। একটি অপরটির চেয়ে গুরুতর বা হালকা আছে। যেমন শিরককেও কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়েছে। অথচ এই গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি চির জাহান্নামী এবং তার গুনাহ অমার্জনীয়।
আল্লাহ তায়ালা সূরা আন নিসায় বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يشَاءُ ، وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا .
আল্লাহ শিরকের গুনাহ মাফ করেন না। এর নিচে যে কোন গুনাহ যাকে ইচ্ছা মাফ করে দিতে পারেন। অবশ্য শিরক পরিত্যাগ করলে ভিন্ন কথা। (সূরা ৪- আন নিসা : আয়াত-৪৮)
কবীরা গুনাহসমূহ
১. শিরক করা।
২. হত্যা করা।
৩. জাদু করা।
৪. নামাযে শৈথিল্য প্রদর্শন করা।
৫. যাকাত না দেয়া।
৬. বিনা ওযরে রমযানের রোযা ভঙ্গ করা।
৭. সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্জ না করা।
৮. আত্মহত্যা করা।
৯. পিতামাতার অবাধ্য হওয়া।
১০. রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজনকে পরিত্যাগ করা।
১১. সমকাম ও যৌনবিকার।
১২. ব্যভিচার করা।
১৩. সুদের আদান প্রদান।
১৪. ইয়াতীমের ওপর যুলুম করা।
১৫. আল্লাহ ও রাসূলের ওপর মিথ্যা আরোপ করা।
১৬. যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা।
১৭. শাসক কর্তৃক শাসিতের ওপর যুলুম করা।
১৮. অহংকার করা।
১৯. মিথ্যা সাক্ষ্য দান করা।
২০. মদ্যপান করা।
২১. জুয়া খেলা।
২২. সতী নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনা।
২৩. রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করা।
২৪. চুরি করা।
২৫. ডাকাতি করা।
২৬. মিথ্যা শপথ করা।
২৭. যুলুম করা।
২৮. জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা।
২৯. হারাম খাওয়া ও হারাম উপার্জন করা।
৩০. মিথ্যা বলা।
৩১. বিচার কার্যে অসততা ও দুর্নীতি করা।
৩২. ঘুষ খাওয়া।
৩৩. নারী-পুরুষের এবং পুরুষ-নারীর সাদৃশ্যপূর্ণ বেশভূষা ধারণ করা।
৩৪. নিজ পরিবারের মধ্যে অশ্লীলতা ও পাপাচারের প্রশ্রয় দেয়া।
৩৫. তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সাথে সহবাস করা।
৩৬. প্রস্রাব থেকে যথাযথভাবে পবিত্রতা অর্জন না করা।
৩৭. রিয়া অর্থাৎ অন্যকে দেখানোর উদ্দেশ্যে সৎ কাজ করা।
৩৮. নিছক দুনিয়ার উদ্দেশ্যে কোন জ্ঞান অর্জন করা।
৩৯. খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা করা।
৪০. নিজের কৃত দানখয়রাতের বা অনুগ্রহের খোটা দেয়া।
৪১. তাকদীরকে অস্বীকার করা।
৪২. মানুষের গোপনীয় দোষ জানার চেষ্টা করা।
৪৩. নামীয় বা চোগলখুরি।
৪৪. বিনা অপরাধে কোন মুসলমানকে অভিশাপ ও গালি দেয়া।
৪৫. ওয়াদা খেলাপ করা।
৪৬. ভবিষ্যদ্বক্তা ও জ্যোতিষীর কথা বিশ্বাস করা।
৪৭. স্বামী স্ত্রীর পরস্পরের অধিকার লংঘন করা।
৪৮. প্রাণীর প্রতিকৃতি বা ছবি আঁকা।
৪৯. বিপদে দুর্যোগে বা শোকাবহ ঘটনায় উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করা।
৫০. বিদ্রোহ ঔদ্ধত্য ও দাম্ভিকতা প্রদর্শন করা।
৫১. দুর্বল শ্রেণী, দাসদাসী বা চাকর-চাকরাণী ও জীবজন্তুর সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করা।
৫২. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া।
৫৩. মুসলমানদেরকে উত্যক্ত করা ও গালি দেয়া।
৫৪. সৎ ও খোদাভীরু বান্দাদেরকে কষ্ট দেয়া।
৫৫. দাম্ভিকতা ও আভিজাত্য প্রদর্শনার্থে টাখনুর নিচ পর্যন্ত পোশাক পরা।
৫৬. পুরুষের স্বর্ণ ও রেশম ব্যবহার করা।
৫৭. বৈধ কর্তৃপক্ষের অবাধ্য হওয়া ও বৈধ আনুগত্যের বন্ধন একতরফাভাবে ছিন্ন করা।
৫৮. আল্লাহ ছাড়া আর কারো নামে জন্তু যবাই করা।
৫৯. জেনেশুনে নিজেকে পিতা ব্যতীত অন্যের সন্তান বলে পরিচয় দেয়া।
৬০. জেনেশুনে অন্যায়ের পক্ষে তর্ক, ঝগড়া ও দ্বন্দ্ব করা।
৬১. উদ্বৃত্ত পানি অন্যকে না দেয়া।
৬২. মাপে ও ওজনে কম দেয়া।
৬৩. আল্লাহর আযাব ও গযব নিজের জন্য সাব্যস্ত করা।
৬৪. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া।
৬৫. বিনা ওযরে জামায়াত ত্যাগ করা ও একাকী সালাত আদায় করা।
৬৬. ওসিয়তের মাধ্যমে কোন উত্তরাধিকারীর হক নষ্ট করা।
৬৭. ধোঁকাবাজি, ছলচাতুরী ও ষড়যন্ত্র করা।
৬৮. কৃপণতা, অপচয় ও অপব্যয় তথা অবৈধ ও অন্যায় কাজে ব্যয় করা।
৬৯. মুসলমানদের গোপনীয় বিষয় শত্রুর নিকট ফাঁস করা।
৭০. কোন সাহাবীকে গালি দেয়া।
আরো ৩৫টি গুরুতর কবীরা গুনাহ
১. ইসলামের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা।
২. ইসলামের ব্যাপারে শৈথিল্য ও সীমাতিরিক্ত নমনীয়তা প্রদর্শন করা
৩. বিদয়াতে লিপ্ত হওয়া।
৪. গীবত করা।
৫. মুসলমানদের মতামত গ্রহণ ও পরামর্শ ছাড়া জোর পূর্বক ক্ষমতা দখল করা ও শাসন পরিচালনা করা, কারচুপি ও ছলচাতুরীর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা, নিজে পদপ্রার্থী হওয়া, পদপ্রার্থীকে নিয়োগ দান এবং অন্যকে ভোট দিতে বাধা দেয়া।
৬. ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সৎকাজের আদেশ না দেয়া ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ না করা বা বাধা না দেয়া, সৎকাজে সহযোগিতা না করা বা বাধা দেয়া, অসৎ কাজে সহযোগিতা করা বা অত্যাচারীকে সমর্থন করা।
৭. সালাতের সামনে দিয়ে যাওয়া।
৮. পরিবেশকে নোংরা ও দূষিত করা।
৯. ইসলামী হুদুদ বা দণ্ডবিধি প্রয়োগের বিরুদ্ধে তদবীর, সুপারিশ বা অন্য কোন পন্থায় বাধা দান ও দণ্ডবিধি প্রয়োগে বৈষম্য করা।
১০. কোন মুসলমানের সাথে তিন দিনের বেশি কথা বন্ধ বা সম্পর্ক ছিন্ন রাখা।
১১. আমীরের অর্থাৎ ইসলামের অনুসারী নেতার আনুগত্য না করা ও কোন ইসলামী জামায়াতের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে মৃত্যুবরণ করা।
১২. গান, বাজনা ও নাচ করা।
১৩. পর্দার বিধান লংঘন ও অশ্লীলতার বিস্তার ঘটানো, শরীয়তসম্মত ওযর ব্যতীত ছতর তথা শরীরের আবরণীয় অংশ উন্মোচন করা।
১৪. খাদ্যদ্রব্য চল্লিশ দিনের বেশি গোলাজাত করে রাখা ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে খুশী হওয়া।
১৫. পাওনা পরিশোধে সমর্থ হওয়া সত্ত্বেও গড়িমসি করা ও পাওনাদারকে হয়রানী করা বা মজুরি না দেয়া।
১৬. হিংসা করা ও মানুষের অকল্যাণ কামনা করা।
১৭. মুসলমানদের মধ্যে ভাষা, বর্ণ, বংশ ও আঞ্চলিকতা ইত্যাদির ভিত্তিতে বিভেদ, বৈষম্য ও অনৈক্য সৃষ্টি করা, একে অপরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা, বিদ্রূপ করা ও তিরস্কার করা।
১৮. কোন মুসলমানের বিপদে খুশী হওয়া।
১৯. শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা এবং বড়দের সাথে বেয়াদবী করা।
২০. বিনা ওযরে ভিক্ষা করা, পরের সেবা ও সাহায্য চাওয়া ও পরের মুখাপেক্ষী হওয়া ও ঋণ করা।
২১. কাউকে তার পূর্বে কৃত গুনাহ লোক সম্মুখে ফাঁস করে দিয়ে লজ্জা দেয়া এবং বিনা অনুমতিতে কারো গোপনীয়তা ফাঁস করা।
২২. কোন মুসলমান সম্পর্কে বিনা প্রমাণে খারাপ ধারণা পোষণ করা।
২৩. মসজিদের অবমাননা করা।
২৪. অজানা বিষয়ে কথা বলা, গুজব রটানো, বিনা তদন্তে গুজবে বিশ্বাস করা ও জানা বিষয় গোপন করা।
২৫. পরিবারের প্রতি শরীয়তসম্মত আচরণ না করা, সুবিচার না করা এবং বিয়ে ও তালাক সংক্রান্ত শরীয়তের বিধান অমান্য করা।
২৬. জেনেশুনে কোন পাপিষ্ঠ ও ইসলামীবরোধী ব্যক্তির সংসর্গে বাস করা, তাকে ভোট দেয়া, প্রশংসা করা ও আনুগত্য করা, সততা ছাড়া অন্য কিছুকে নেতৃত্বের মাপকাঠি মেনে নেয়া।
২৭. ইসলামের তথা আল কুরআন ও হাদীসের অত্যাবশ্যকীয় ও ন্যূনতম জ্ঞান অর্জন না করা।
২৮. নিষিদ্ধ সময়ে ও নিষিদ্ধ অবস্থায় ইবাদাত করা।
২৯. স্বাস্থ্যগত কারণ ও প্রবল জীবনাশংকা ব্যতীত নিছক অভাবের ভয়ে ভ্রুণ হত্যা, গর্ভপাত ও বন্ধ্যাকরণ প্রভৃতি উপায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা।
৩০. বিনা ওযরে জুময়ার সালাত না পড়া ও জুময়ার নিয়ম লংঘন করা।
৩১. কুরআন ও হাদীসের অবমাননা, অবজ্ঞা ও অবহেলা করা, না জেনে অপব্যাখ্যা করা, অপবিত্রাবস্থায় কুরআন স্পর্শ করা, কুরআন তেলাওয়াতের সময় শ্রবণ না করা বা শ্রবণ করতে বাধা দেয়া, কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান গোপন করা তথা বিতরণে বিনা ওযরে বিরত থাকা, বা বাধা দেয়া, বিশুদ্ধ হাদীস অস্বীকার ও অমান্য করা, ইসলাম বিরোধী কাজ বিসমিল্লাহ বা কুরআন তেলাওয়াত দ্বারা শুরু করা ইত্যাদি।
৩২. সমাজে ফেতনা তথা গোমরাহী ছড়ানো, মানুষ সৎ কাজে নিরুৎসাহিত হয় বা বাধা পায় এবং অসৎকাজে প্ররোচিত বা বাধ্য হয় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।
৩৩. বিনা ওযরে ফেতরা না দেয়া ও কোরবানী না করা।
৩৪. বিনা ওযরে সালামের জবাব না দেয়া ও কোন কাফেরকে প্রথম সালাম করা।
৩৫. উপযুক্ত পুরুষ থাকতে কোন নারীর হাতে পুরুষদের অথবা নারী ও পুরুষ উভয়ের নেতৃত্ব ও পরিচালনার ভার অর্পণ করা। রাসূল বলেছেন: "যখন নারীর হাতে কর্তৃত্ব অর্পণ করা হবে তখন তোমাদের জন্য ভূ-পৃষ্ঠের চেয়ে ভূ-গর্ভই উত্তম হবে।” অন্য এক হাদীসে রাসূল বলেছেন- لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَّوْا أَمْرَهُمْ امْرَأَةٌ .
ঐ জাতি কখনো সফল হবে না যে জাতি (পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের) তাদের নেতৃত্বের ভার কোন নারীর ওপর অর্পণ করেছে। (বুখারী) আল্লাহ তায়ালা বলেন- الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ. পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল। (সূরা ৪-আন নিসা : আয়াত-৪৬)
কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার উপায়
আল্লাহ বলেছেন: "হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর যুলুম করেছে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।”
বস্তুত: একনিষ্ঠ তওবার মাধ্যমে সকল গুনাহ থেকে অব্যাহতি লাভ করা যায়। তবে এ জন্য ৪টি শর্ত রয়েছে-
১. আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হওয়া,
২. ভবিষ্যতে আর ঐ গুনাহ না করার ওয়াদা করা,
৩. অবিলম্বে উক্ত গুনাহ একেবারেই ত্যাগ করা,
৪. গুনাহর সাথে মানুষের অধিকার জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি জীবিত থাকে তবে তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া এবং প্রয়োজনে তাকে বা তার উত্তরাধিকারীদেরকে সন্তোষজনক ক্ষতিপূরণ দান। আর গুনাহের সাথে যদি আল্লাহকে অধিকার জড়িত থাকে যেমন- যাকাত, রোযা, হজ্জ তাহলে তা কাফফারা ও কাযা আদায় করা।
এ চারটি শর্ত পালনপূর্বক ক্ষমা চাইলে আল্লাহ ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।