📄 আল্লাহর সন্তুষ্টি
জান্নাতে উল্লিখিত সমস্ত নি'আমতের চেয়ে সবচেয়ে বড় নি'আমত হবে স্বীয় স্রষ্টা, মালিক, রিযিকদাতার সন্তুষ্টি যার উল্লেখ কুরআন মাজীদের বহু জায়গায় করা হয়েছে।
لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ .
যারা আল্লাহভীরু তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট জান্নাত রয়েছে, নিম্নে স্রোতস্বিনীগুলো প্রবাহিত, তন্মধ্যে তারা সদা-সর্বদা অবস্থান করবে এবং সেখানে পবিত্র সহধর্মিণীগণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে। (সূরা আলে ইমরান: ১৫) আরো এরশাদ হয়েছে-
وَعَدَ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةٌ فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ - ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ .
আল্লাহ মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীদেরকে এমন উদ্যানসমূহের ওয়াদা দিয়েছেন, যার নিম্নদেশে বইতে থাকবে নহরগুলো। যেগুলোর (উদ্যান) মধ্যে তারা অনন্তকাল থাকবে, আরো (ওয়াদা দিয়েছেন) ঐ উত্তম বাসস্থানসমূহের যা চিরস্থায়ী উদ্যানসমূহে অবহিত হবে। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি হচ্ছে সর্বাপেক্ষা বড় নি'আমত। আর এটা হচ্ছে অতি বড় সফলতা। (সূরা তাওবা: ৭২)
সূরা তাওবার আয়াতে আল্লাহ নিজেই সুস্পষ্ট করেছেন যে, জান্নাতের সমস্ত নি'আমতসমূহের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি সবচেয়ে বড় নি'আমত। উল্লিখিত আয়াতের তাফসীরে রাসূলুল্লাহ বলেন: আল্লাহ জান্নাতীদেরকে লক্ষ্য করে বলবেন: হে জান্নাতীরা! জান্নাতীরা বলবে, হে আমাদের রব! আপনার নিকট আমরা উপস্থিত আছি। আর আপনার অনুসরণের মধ্যে রয়েছে সার্বিক কল্যাণ। আল্লাহ আবার বলবেন: এখন কি তোমরা সন্তুষ্ট হয়েছ? জান্নাতী বলবে, হে আমাদের প্রভু! আমরা কেন সন্তুষ্ট হব না? তুমি আমাদেরকে এমন এমন নি'আমত দান করেছ যা তোমার সৃষ্টি জীবের মধ্যে কাউকে দাও নি। আল্লাহ বলবেন, আমি কি তোমাদেরকে ঐ নি'আমত দিব না, যা এ সমস্ত নি'আমত থেকেও উত্তম? আল্লাহ বলবে: আমি তোমাদেরকে আমার সন্তুষ্টির মাধ্যমে সম্মানিত করব। আজ থেকে আর কখনো আমি তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হব না। (বুখারী, মুসলিম)
তাদের কতইনা সৌভাগ্য যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করবে এবং তাঁর রাগ থেকে মুক্তি পাবে। আর ঐ সমস্ত লোকদের কতইনা দুর্ভাগ্য যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে আর তাঁর গজবের হকদার হবে।
(আল্লাহ্ মুসলমানদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর অনুগ্রহের মাধ্যমে স্বীয় সন্তুষ্টির মাধ্যমে সম্মানিত করুন এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে মুক্তি দিন, আমীন।)
📄 আল্লাহর সাক্ষাৎ
অন্যান্য মাসয়ালা-মাসায়েলের ন্যায় আল্লাহর সাক্ষাৎ এ বিষয়েও মুসলমানরা অতিরিক্ত ও কমতির দিক থেকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে। একদল তো মোরাকাবা ও মোকাশাফার মাধ্যমে দুনিয়াতেই আল্লাহর সাক্ষাতের দাবি করেছে। আবার কোন কোন দল কুরআনের আয়াত দ্বারা দলীল দিচ্ছে- لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ .
তাঁকে কোন দৃষ্টি পরিবেষ্টন করতে পারে না আর তিনি সকল দৃষ্টি পরিবেষ্টনকারী। (সূরা আন'আম : ১০৩)
অনেকে আলোচ্য আয়াতের আলোকে আখিরাতে আল্লাহর সাক্ষাৎকে অস্বীকার করেছে। কুরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণিত আক্বীদা এই যে, যে কোনো মানুষের জন্য, চাই সে নবীই হোক না কেন, এ পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষাৎ সম্ভব নয়।
কুরআন মাজীদে মূসা (আ)-এর ঘটনা অত্যন্ত পরিষ্কার করে বর্ণনা করা হয়েছে, যখন তিনি ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বনি ইসরাঈলকে সাথে নিয়ে সীনা নামক দ্বীপে পৌঁছলেন তখন আল্লাহ তাকে তুর পাহাড়ে ডাকলেন। আর সেখানে চল্লিশ দিন অবস্থান করার পর, তাকে তাওরাত দান করলেন। তখন মূসা (আ) আল্লাহর দিদারের আগ্রহ করল, তাই তিনি আরয করলেন-
رَبِّ أَرِنِي أَنْظُرْ إِلَيْكَ .
হে আমার প্রভু! আমাকে অনুমতি দাও যেন আমি তোমাকে দেখতে পাই।
আল্লাহ উত্তরে বললেন: হে মূসা! তুমি আমাকে কখনো দেখতে পাবে না। তবে তুমি সামনের পাহাড়ের দিকে তাকাও যদি তা স্বস্থানে স্থির থাকতে পারে, তাহলে তখন তুমিও আমাকে দেখতে পাবে। অতঃপর তার প্রতিপালক যখন পাহাড়ের আলোক সম্পাৎ করলেন তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। আর মূসা (আ) সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেল। যখন তার চেতনা ফিরে আসল, তখন সে বলল- আপনি মহিমাময়, আপনি পবিত্র সত্তা, আমি তওবা করছি। আমিই সর্বপ্রথম (গায়েবের প্রতি) ঈমান আনলাম। (বিস্তারিত দেখুন সূরা আ'রাফ ১৪৩)
এ ঘটনা থেকে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, দুনিয়াতে আল্লাহর দীদার সম্ভবই না। মে'রাজের ঘটনা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ এর ব্যাপারে আয়েশা (রা)-এর বর্ণনাও এ আক্বীদার কথাই প্রমাণ করে, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি বলে মুহাম্মদ স্বীয় রবের সাথে সাক্ষাৎ করেছে সে মিথ্যুক। (বুখারী ও মুসলিম)
এ দুনিয়ায় যখন নবীগণ আল্লাহকে দেখতে পারে নি, তাহলে উম্মতের কোন ব্যক্তির দাবি করা যে, সে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করেছে তা মিথ্যা ব্যতীত আর কি হতে পারে? আখিরাতে আল্লাহর সাক্ষাৎ কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ .
নেককারদের জন্য উত্তম প্রতিদান ব্যতীতও আরো প্রতিদান থাকবে। (সূরা ইউনুস: ২৬)
অলোচ্য আয়াতের তাফসীরে সুহাইব রূমী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এ আয়াত পাঠ করেছেন এবং বলেছেন: যখন জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে চলে যাবে তখন এক আহ্বানকারী আহ্বান করবে: হে জান্নাতীরা! আল্লাহ তোমাদের সাথে এক ওয়াদা করেছিলেন, তিনি আজ তার পূর্ণ করতে চান। তারা বলবে সে কোন ওয়াদা? আল্লাহ তাঁর স্বীয় দয়ায় আমাদের আমলগুলোকে মিযান ভারী করে দেন নি? আল্লাহ আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করান নি? তখন পর্দা উঠে যাবে এবং জান্নাতবাসী আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে। সুহাইব বলেন: আল্লাহর কসম! আল্লাহকে দেখার চেয়ে জান্নাতবাসীদের জন্য আনন্দদায়ক এবং চোখের শান্তিদায়ক আর কিছুই থাকবে না। (মুসলিম)
অন্যত্র আল্লাহ ইরশাদ করেন- وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ .
সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। (সূরা কিয়ামাহ: ২২-২৩)
আলোচ্য আয়াতে জান্নাতীগণের আল্লাহর দিকে তাকানোর কথা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। জারীর বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী -এর নিকট উপস্থিত ছিলাম ১৪ তারিখের চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন: জান্নাতে তোমরা তোমাদের রবকে এমনভাবে দেখবে যেমনভাবে এ চাঁদকে দেখছ। সেদিন আল্লাহকে দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট হবে না। (বুখারী)
সুতরাং ঐ লোকেরা পথভ্রষ্ট হয়েছে যারা দাবি করে যে, তারা এ পৃথিবীতে আল্লাহকে দেখেছে এবং তারাও ধোঁকায় পড়েছে যারা মনে করে যে, কিয়ামতের দিনও আল্লাহকে দেখা যাবে না। সঠিক আক্বীদা হল এই যে, দুনিয়াতে আল্লাহর দীদার অসম্ভব, তবে অবশ্যই আখিরাতে জান্নাতীরা আল্লাহকে দেখতে পাবে। যা হবে অত্যন্ত বড় নি'আমত যার মাধ্যমে বাকি সমস্ত নি'আমত পূর্ণতা লাভ করবে।
📄 জান্নাতে প্রবেশকারী মানুষ
উল্লিখিত শিরোনামে এ গ্রন্থে একটি অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হল। যেখানে কতিপয় গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দুটি জিনিস স্পষ্ট করা প্রয়োজন মনে করছি। প্রথমত: এ অধ্যায়ে আলোচিত গুণাবলীর উদ্দেশ্যে মোটেও এ নয় যে, এগুলো ব্যতীত আর এমন কোন গুণাবলী নেই যে, যা মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। এ অধ্যায়ে আমরা শুধু ঐ সমস্ত হাদীসসমূহ বাছাই করেছি যেখানে রাসূলুল্লাহ স্পষ্টভাবে "সে জান্নাতে প্রবেশ করেছে" এবং "তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে" ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেছেন, যাতে করে কোন সন্দেহ বা অপব্যাখ্যার অবকাশ না থাকে।
দ্বিতীয়ত: যে সকল গুণাবলীর কারণে রাসূলুল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করার সুসংবাদ দিয়েছেন তা থেকে এ অর্থ বুঝা মোটেও ঠিক হবে না যে, যে ব্যক্তি উল্লিখিত গুণাবলীর কোন একটিতে গুণান্বিত হবে সে সরাসরি জান্নাতে চলে যাবে।
একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, ইসলামের বিধি-বিধানগুলো একটি অপরটির সাথে এমনভাবে সম্পর্কিত যে, একটি থেকে অপরটিকে পৃথক করা সম্ভব নয়। যে কোনো ব্যক্তির ইসলামের রুকনসমূহের যতই আমল থাকুক না কেন, সে যদি পিতা-মাতার অবাধ্য হয়, তাহলে তাকে এ কবীরা গুনাহর শান্তি ভোগ করার জন্য জাহান্নামে যেতে হবে। তবে যদি সে তাওবা করে, আর আল্লাহ তাঁর বিশেষ রহমতে তাকে ক্ষমা করে দেয়, তা হবে আলাদা বিষয়।
অতএব এ অধ্যায়ের উল্লিখিত হাদীসসমূহের সঠিক অর্থ হবে এই যে, যে ব্যক্তি তাওহীদের ওপর বিশ্বাস হয়ে, ইসলামের রুকনগুলো পালন করার জন্য পরিপূর্ণভাবে চেষ্টা করে, মানুষের হক আদায় করার ব্যাপারে কোন প্রকার অলসতা দেখায় না, কবীরা গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে, এমন ব্যক্তির মধ্যে যদি উল্লিখিত গুণাবলীর মধ্য থেকে কোন একটি বা তার অধিক গুণ থাকে তাহলে আল্লাহ তাঁর স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহের মাধ্যমে না জানা পাপগুলো ক্ষমা করে প্রথমেই তাকে জান্নাতে দিবেন এবং তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন।
এর আরেকটি অর্থ এও হতে পারে যে, যাদের মধ্যে উল্লিখিত গুণাবলীর মধ্য থেকে কোন একটি থাকবে, যদিও সে কোন কবীরা গোনাহর কারণে জাহান্নামে যায়ও শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে তার ঐ গুণে গুণান্বিত হওয়ার কারণে জাহান্নাম থেকে অবশ্যই বের করে দিবেন। যেমন এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেছেন, কোন এক সময় ঐ ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হবে যে একনিষ্ঠভাবে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে, আর তার অন্তরে শুধু সরিষা পরিমাণ ভালো আছে। (মুসলিম) (এ ব্যাপারে আল্লাহই অধিক ভালো জানেন)
📄 প্রাথমিকভাবে জান্নাত থেকে বঞ্চিত মানুষ
এ গ্রন্থে "জান্নাত থেকে প্রাথমিকভাবে বঞ্চিত থাকা মানুষ" নামক অধ্যায়টি শামিল করা হল, এখানে যে ঐ সমস্ত কবীরা গোনাহর কথা আলোচনা করা হবে, যার কারণে মুসলমান স্বীয় পাপের শাস্তি ভোগ করার জন্য প্রথমে জাহান্নামে যাবে। এরপর জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ অধ্যায়েও সমস্ত কবীরা গুনাহর কথা আলোচনা করা হয় নি, যা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে, বরং শুধু ঐ সমস্ত হাদীসসমূহ বাছাই করা হয়েছে যেখানে রাসূলুল্লাহ স্পষ্টভাবে "ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না" বা "আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করেছেন" ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেছেন। যাতে করে কোন কথা বলার বা অপব্যাখ্যার অবকাশ না থাকে।
এ কথা স্মরণ থাকা দরকার যে, সগীরা গুনাহ কোন সৎ কাজের মাধ্যমে (তাওবা ব্যতীতই) আল্লাহ স্বীয় দয়ায় ক্ষমা করে দেন। কিন্তু কবীরা গোনাহ তাওবা ব্যতীত ক্ষমা হয় না। আর কবীরা গুনাহর শাস্তি হল জাহান্নাম। সকল কবীরা গুনাহের শাস্তিও গুনাহ হিসেবে পৃথক পৃথক। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে কোন কোন ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন টাখনু পর্যন্ত স্পর্শ করবে। আবার কোন কোন ব্যক্তির কোমর পর্যন্ত স্পর্শ করবে এবং কোন কোন ব্যক্তির গর্দান পর্যন্ত স্পর্শ করবে। (মুসলিম)
অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, কোন কোন লোকের সমস্ত শরীরেই আগুন স্পর্শ করবে, তবে সেজদার স্থানটুকু আগুনের স্পর্শ থেকে মুক্ত থাকবে। (ইবনে মাযাহ)
কবীরা গুনাহর শাস্তি ভোগ করার পর আল্লাহ সমস্ত কালিমা পড়া মুসলমানদের জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
মু'মিনদের একথা ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে, জান্নাতে কিছুক্ষণ থাকা তো দূরের কথা বরং তার মাঝে এক পলক থাকাই মানুষকে দুনিয়ার সমস্ত নি'আমত, আরাম-আয়েশের কথা ভুলিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হবে। তাই সকল মুসলমানের অনুভূতিগতভাবে এ চেষ্টা চালাতে হবে যে, জাহান্নাম থেকে সে বেঁচে থাকে এবং প্রথমবারে জান্নাতে প্রবেশকারীদের অন্তর্ভুক্ত থাকে। এ জন্য দুটি বিষয় গুরুত্বের সাথে দেখা দরকার।
প্রথমত: কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য যতদূর সম্ভব চেষ্টা করা, আর যদি কখনো অনিচ্ছা সত্ত্বেও কবীরা গুনাহ হয়ে যায়, তা হলে দ্রুত আল্লাহর নিকট তাওবা করে ভবিষ্যতে তা থেকে বেঁচে থাকার জন্য দৃঢ় মনোভাব রাখা।
দ্বিতীয়ত: অধিক পরিমাণে এমন আমল করা যার ফলে আল্লাহ স্বয়ং কবীরা গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিবেন। যেমন নবী এর বাণী: "যে ব্যক্তি সকল সালাতের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৩ বার আল্লাহু আকবার বলার পর একবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি সাইইন ক্বাদীর বলে আল্লাহ তার সমস্ত সগীরা গুনাহ ক্ষমা করে দেন যদিও তার গুনাহ সমুদ্রের ফেনা তুল্য হয়।" (মুসলিম)
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি বাজারে প্রবেশ করার পূর্বে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু, ওয়ালাহুল হামদু, ওয়া ইয়ুহয়ী ওয়া ইউমিতু, ওয়াহুয়া হাইয়ুন লাইয়ামুতু, বিয়াদিহিল খাইর, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইঈন কাদীর।
অর্থ: আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, তিনি এক তাঁর কোন শরীক নেই, তাঁর জন্যই সমস্ত বাদশাহী, তাঁর জন্যই সমস্ত প্রশংসা, তিনি জীবন ও মৃত্যু দেন, তিনি চিরঞ্জীব, তিনি মৃত্যুবরণ করবেন না, তাঁর হাতেই যাবতীয় কল্যাণ, তিনি সর্ব বিষয়ের ওপর শক্তিমান। এ দোয়া পাঠ করবে তার আমলনামায় আল্লাহ দশ লক্ষ নেকী লিখে দিবেন এবং দশ লক্ষ গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন এবং দশ লক্ষ মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। (তিরমিযী)
দরূদের ফযীলত প্রসঙ্গে নবী এরশাদ করেছেন : যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন। তার দশটি গুনাহ ক্ষমা করেন। তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। তাই বেশি বেশি করে সিজদা কর। (অর্থাৎ বেশি বেশি করে নফল সালাত আদায় কর) (ইবনে মাজাহ)
কবীরা গুনাহ থেকে পরিপূর্ণরূপে বেঁচে থাকা এবং নিয়মিত তাওবা করা এবং সগীরা গুনাহগুলোকে ক্ষমাকারী আমলগুলো ধারাবাহিকভাবে বেশি বেশি করে করার পরও আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের আশা রাখা যে, তিনি আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং প্রথম সুযোগেই আমাকে জান্নাতে প্রবেশকারীদের অন্তর্ভুক্ত করবেন। নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী এবং অত্যন্ত দয়াময়।