📘 জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা > 📄 জান্নাতের সীমারেখা ও তথায় জীবন-যাপন

📄 জান্নাতের সীমারেখা ও তথায় জীবন-যাপন


আরবি ভাষায় জান্নাত বলা হয় বাগানকে। এর বহুবচন আসে جَنَّاتٍ এবং (বাগানগুলো) এ জান্নাতের পরিসীমা কতটুকু? তার যথাযথ পরিসীমা সুনির্দিষ্ট করে বলা শুধু কষ্টকরই নয় বরং অসম্ভবও বটে। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন- فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِى لَهُمْ مِنْ قُرَّةٍ أَعْيُنٍ جَزَاء بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ .
কেউই জানেনা তার জন্য নয়ন প্রীতিকর কি লুক্কায়িত রাখা হয়েছে, তাদের কৃতকর্মের প্রতিদানস্বরূপ। (সূরা সাজদা: ১৭)

কুরআন হাদীস চর্চা ও গবেষণার পর যা কিছু বুঝা যায় তার সারমর্ম হল এই যে, জান্নাত আল্লাহ প্রদত্ত এমন এক রাজ্য হবে যা আমাদের এ পৃথিবীর তুলনায় কোন অতিরঞ্জন ব্যতীতই বলা যেতে পারে যে, আমাদের এ পৃথিবীর তুলনায় বহুগুণ বেশি প্রশস্ত হবে। জান্নাতের বিশাল আয়তনের কোন ছোট একটি অংশই আমাদের পৃথিবীর সমান হবে। জান্নাতে সর্বশেষ প্রবেশকারী প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ বলেছেন, যে, যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে, তখন সে আরয করবে হে আল্লাহ! এখন তো সব জায়গা পরিপূর্ণ হয়ে গেছে, আমার জন্য আর কি বাকি আছে? আল্লাহ বলবেন: যদি তোমাকে পৃথিবীর কোন সর্ববৃহৎ বাদশার রাজত্বের সমান স্থান দেয়া হয় তাতে কি তুমি খুশি হবে? তখন বান্দা বলবে, হ্যাঁ হে আল্লাহ! কেন হব না? আল্লাহ তখন বলবেন, যাও জান্নাতে তোমার জন্য পৃথিবীর সর্ববৃহৎ রাজ্যের সমান এবং এর চেয়ে অধিক আরো দশ গুণ স্থান দেয়া হল। (মুসলিম)

জান্নাতে সর্বশেষ প্রবেশকারীকে এতটুকু স্থান দেয়ার পরও জান্নাতে এত স্থান বাকি থেকে যাবে যে, তা পরিপূর্ণ করার জন্য আল্লাহ অন্য মাখলুক সৃষ্টি করবেন। (মুসলিম)

জান্নাতের স্তরসমূহের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ বলেন: তার শত স্তর আছে। আর সকল স্তরের মাঝে আকাশ ও পৃথিবী সম দূরত্ব রয়েছে। (তিরমিযী)

জান্নাতের ছায়াবান বৃক্ষসমূহের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ বলেন: একটি বৃক্ষের ছায়া এত লম্বা হবে যে, কোন অশ্বারোহী শত বছর পর্যন্ত তার ছায়ায় চলার পরও সে ছায়া শেষ হবে না। (বুখারী)

সূরা দাহারের ২০ নং আয়াতে আল্লাহ্ ইরশাদ করেন, জান্নাতের যেদিকেই তোমরা তাকাও না কেন নি'আমত আর নি'আমতই তোমাদের চোখে পড়বে। আর এক বিশাল রাজ্যের আসবাবপত্র তোমাদের চোখে পড়বে। দুনিয়াতে কোন ব্যক্তি যত ফকীরই হোক না কেন যখন সে তার সৎ আমল নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন সে সেখানে এমন অবস্থায় থাকবে, যেন সে বৃহৎ কোন রাজ্যের বাদশা। (তাফহীমুল কুরআন খ: ৬ পৃ. ২০০)

উল্লিখিত আয়াত ও হাদীসের আলোকে এ অনুমান করা কষ্টকর নয় যে, জান্নাতের সীমারেখা নির্ধারণ করা তো দূরের কথা এমনকি ঐ প্রসঙ্গে চিন্তা করাও মানুষের জন্য সম্ভব নয়।

জান্নাতে মানুষ কি ধরনের জীবনযাপন করবে? জান্নাতীদের ব্যক্তিগত গুণাগুণ কি হবে? তাদের পারিবারিক জীবন কেমন হবে? তাদের খানা-পিনা, থাকা কেমন হবে, যদিও এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। এরপরও কুরআন ও হাদীস থেকে যা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত তার আলোকে জান্নাতী জিন্দেগীর কোন কোন অংশের বিস্তারিত বর্ণনা নিম্নরূপ:

📘 জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা > 📄 শারীরিক গুণাগুণ

📄 শারীরিক গুণাগুণ


জান্নাতীদের চেহারা আলোকময় হবে, চক্ষুদ্বয় লাজুক হবে, মাথার চুল ব্যতীত শরীরের আর কোথাও কোন চুল থাকবে না। এমনকি দাড়ী-গোঁফও থাকবে না, বয়স ৩০-৩৩ বছরের মাঝামাঝি হবে, উচ্চতা মোটামুটি ৯ ফিটের মতো হবে। জান্নাতবাসী সর্বপ্রকার নাপাকী থেকে পবিত্র থাকবে, এমনকি থুথু এবং নাকের পানিও আসবে না। ঘাম হবে কিন্তু তা মেশক আম্বরের ন্যায় সুঘ্রাণযুক্ত থাকবে। জান্নাতবাসীগণ সর্বদা আরাম-আয়েশ ও হাসি-খুশি থাকবে। কারো কোন চিন্তা, ব্যথা, বিরক্ত ও ক্লান্তিবোধ থাকবে না। জান্নাতবাসীগণ সর্বদা সুস্থ থাকবে। তারা কখনো অসুস্থ, বৃদ্ধ ও তাদের মৃত্যু হবে না। জান্নাতী মহিলাদের যে গুণাবলির কথা কুরআনে বারবার এসেছে তা হল এই যে, জান্নাতের রমণী লজ্জাশীল হবে, দৃষ্টি নিম্নমুখী থাকবে। সৌন্দর্যে তারা মুক্তা ও প্রবালকেও হার মানায়। নবী বলেন: জান্নাতী রমণীগণ যদি ক্ষণিকের জন্যও পৃথিবীতে দৃষ্টিপাত করে তাহলে পূর্ব পশ্চিমের মাঝে যা কিছু আছে সব কিছুকে আলোকময় করে তুলবে এবং পূর্ব পশ্চিমের মাঝে যত খালি জায়গা আছে তা সুগন্ধিময় করে তুলবে। (বুখারী)

📘 জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা > 📄 পারিবারিক জীবন

📄 পারিবারিক জীবন


জান্নাতে কোন ব্যক্তি একাকী থাকবে না। প্রত্যেকের দু'জন করে স্ত্রী থাকবে, আর এ দু স্ত্রী আদম সন্তানদের মধ্য থেকে হবে। (ইবনে কাসীর)

পৃথিবীর এ মহিলাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর পূর্বে আল্লাহ তাদেরকে পুনরায় নতুন করে সৃষ্টি করবেন। আর তখন তাদেরকে ঐ সৌন্দর্য প্রদান করবেন যা জান্নাতে বিদ্যমান হুরদেরকে দেয়া হয়েছে। এ নারীদেরকে নতুন করে সৃষ্টি করার পর তাদেরকে কোন জ্বিন ও ইনসান স্পর্শও করে নি। তারা তাদের স্বামীদের সমবয়সী ও লাজুক, পর্দাশীল, অত্যন্ত স্বামী ভক্ত হবে। জান্নাতীরা তাদের সুযোগ মতো স্বীয় স্ত্রীগণের সাথে ঘন শীতল ছায়ায় প্রবাহমান নদীর তীরে সোনা-চান্দি ও মুক্তার নির্মিত আসনসমূহে বসে আনন্দময় গল্পে মেতে উঠবে। খানাপিনার জন্য মহিলাদের কষ্ট করতে হবে না। বরং তারা যা কিছু চাইবে মুক্তার ন্যায় সুন্দর ও বুদ্ধিমান খাদেম তা তাদের সামনে সাথে সাথে উপস্থিত করবে। একই খান্দানের নিকট আত্মীয়গণ যেমন: পিতামাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, ছেলে-মেয়ে, নাতী-নাতনী ইত্যাদি যদি জান্নাতে স্তরের দিক থেকে একে অপর থেকে দূরবর্তীতে থাকে তবে আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে পরস্পরের নিকটবর্তী করে দিবেন। সুবহানাল্লাহী ওয়া বিহামদিহী সুবহানাল্লাহিল আযীম।)

📘 জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা > 📄 খানা-পিনা

📄 খানা-পিনা


জান্নাতে প্রবেশ করার পর জান্নাতবাসীগণকে সর্বপ্রথম মাছের কলিজা দিয়ে আপ্যায়ন করানো হবে। এরপর গরুর গোশত দিয়ে আপ্যায়ন করানো হবে। আর পানীয় হিসেবে প্রথমে দেয়া হবে, 'সালসাবীল' নামক ঝর্ণার পানি। যা আদার স্বাদ মিশ্রিত হবে। সর্বপ্রকার সুস্বাদু ফল যেমন আঙ্গুর, আনার, খেজুর, কলা, ইত্যাদির কথা বিশেষভাবে কুরআনে উল্লেখ হয়েছে। এরপরও আরো থাকবে সর্বপ্রকার সুস্বাদু ও সুগন্ধিময় পানীয়, যেমন: দুধ, মধু, কাউসারের পানি, আদা বা কর্পূরের স্বাদ মিশ্রিত পানি। বিশেষভাবে উল্লেখ্য হল জান্নাতীদের সম্মানার্থে সোনা, চান্দি ও কাঁচের তৈরি পাত্রগুলো সরবরাহ করা হবে। খানা-পিনার স্বাদ কখনো নষ্ট হবে না। বরং সর্বক্ষণই তারা নতুন নতুন খানা-পিনা থেকে কোন প্রকার গন্ধ, ঝাল, আলসত, ঠাণ্ডা বা খারাপ নেশাদার হবে না।

জান্নাতী নিজে যদি কোন গাছের ফল খেতে চায় তাহলে স্বয়ং ঐ ফল তার হাতের নাগালে চলে আসবে। কোন পাখির গোশত খেতে চাইলে তখনই প্রস্তুত করে তার সামনে উল্লেখ করা হবে। জান্নাতের এ সমস্ত নি'আমত চিরস্থায়ী হবে। তাতে কখনো কোন কমতি দেখা দিবে না। আর কখনো শেষও হবে না। না তা কোন বিশেষ মৌসুমের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে। আরো বড় বিষয় হল এই যে, এ নি'আমতগুলো পাওয়ার জন্য জান্নাতীকে কারো কাছ থেকে কোন অনুমতি নিতে হবে না। যে জান্নাতী যখনই চাইবে যে পরিমাণে চাইবে স্বাধীনভাবে সে তা হাসিল করতে পারবে। আর আল্লাহর এ বাণীরও এ অর্থই- لَا مَقْطُوعَةٍ وَّلَا مَمْنُوعَةٍ .
জান্নাতের নি'আমতের ধারাবাহিকতা কখনো ছিন্ন হবে না, আর না তা নিষিদ্ধ হবে। (সূরা ওয়াকেয়া-৩৩)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00