📄 জান্নাত-জাহান্নাম এবং যুক্তির পূজা
দ্বীনের মূলভিত্তি ওহীর জ্ঞানের ওপর। তাই ওহীর জ্ঞানের অনুসরণ সর্বদাই মানুষের জন্য মুক্তি ও পরিত্রাণের উপায়। ওহীর জ্ঞানের মোকাবেলায় যুক্তির পূজা করা সর্বদাই পথভ্রষ্টতা ও ক্ষতিগ্রস্ততার মাধ্যম। আম্বিয়ায়ে কেরামের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে যারা ওহীর নির্দেশাবলী মোতাবেক গায়েবের প্রতি ঈমান এনেছে এবং মৃত্যুর পর আখিরাত তথা হাশর, হিসাব, কিতাব, জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদির প্রতি ঈমান এনেছে, সে সফলকাম হয়েছে। পক্ষান্তরে যারা এ নির্দেশাবলীকে যুক্তির আলোকে যাচাই করেছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পবিত্র কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ কাফেরদের যুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন যে, তারা বলে- মৃত্যুর পর জীবিত হওয়া অসম্ভব। তাই কাফেররা নবীগণকে শুধু মিথ্যার প্রতিপন্নই করেনি বরং তাদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রুপও করেছে। এ প্রসঙ্গে কুরআন মাজীদের উদ্ধৃতি নিম্নরূপ-
১. আল্লাহ তায়ালা কুরআন কারীমে ইরশাদ করেন- أَئِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا ذَلِكَ رَجْعٌ بَعِيدٌ .
আমাদের মৃত্যু হলে এবং আমরা মাটি হয়ে গেলে (আমরা কি পুনরুজ্জীবিত হব) সে প্রত্যাবর্তন-তো'সুদূর পরাহত। (সূরা কা'ফ-৩)
২. তিনি আরো ইরশাদ করেন- وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا هَلْ نَدُلُّكُمْ عَلَى رَجُلٍ يُنَبِّئُكُمْ إِذَا مُزِّقْتُمْ كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّكُمْ لَفِي خَلْقٍ جَدِيدٍ - أَفْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَمْ بِهِ جِنَّةٌ بَلِ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ فِي الْعَذَابِ وَالضَّلَالِ الْبَعِيدِ .
কাফেররা বলে: আমরা কি তোমাদেরকে এমন ব্যক্তির সন্ধান দিব, যে তোমাদেরকে বলে: তোমাদের দেহ সম্পূর্ণ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়লেও তোমরা নতুন সৃষ্টিরূপে উত্থিত হবেন। সে কি আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, অথবা সে কি পাগল? বস্তুত যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না তারা শাস্তি ও ঘোর ভ্রান্তিতে রয়েছে। (সূরা সাবা-৭-৮)
৩. সূরা সাফাতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- وَقَالُوا إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ - أَئِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا وَعِظَامًا أَئِنَّا لَمَبْعُوثُونَ، أَوْ آبَاؤُنَا الْأَوَّلُونَ - قُلْ نَعَمْ وَأَنْتُمْ دَاخِرُونَ .
এবং তারা বলে, এটাতো সুস্পষ্ট যাদু ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি ও হাড্ডিতে পরিণত হব তখনো কি আমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে এবং আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকেও? বল: হ্যাঁ এবং তোমরা হবে লাঞ্ছিত। (সূরা সাফফাত-১৫-১৮)
৪. আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন- وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَئِذَا كُنَّا تُرَابًا وَآبَاؤُنَا أَئِنَّا لَمُخْرَجُونَ ، لَقَدْ وُعِدْنَا هَذَا نَحْنُ وَآبَاؤُنَا مِنْ قَبْلُ إِنْ هَذَا إِلَّا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ .
কাফেররা বলে, আমরা ও আমাদের পিতৃপুরুষরা মাটিতে পরিণত হয়ে গেলেও কি আমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে? এ বিষয়ে তো আমাদেরকে এবং আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকেও ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল। এটা তো পূর্ববর্তী উপকথা ব্যতীত আর কিছুই নয়। (সূরা নামল-৬৭-৬৮)
৫. সূরা মু'মিনুনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন- ايَعِدُكُمْ أَنَّكُمْ إِذَا مِتُّمْ وَكُنْتُمْ تُرَابًا وَعِظَامًا أَنَّكُمْ مُخْرَجُونَ، هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ لِمَا تُوعَدُونَ .
সে কি তোমাদেরকে এ প্রতিশ্রুতিই দেয় যে, তোমাদের মৃত্যু হলে এবং তোমরা মাটি ও হাড়ে পরিণত হলেও তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে? অসম্ভব, তোমাদেরকে যে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা অসম্ভব। (সূরা মু'মিনূন-৩৫-৩৬)
মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীকৃত শিক্ষাকে যুক্তির আলোকে যাচাইকারী পণ্ডিতবর্গ সর্বকালেই যথেষ্ট পরিমাণে ছিল, কিন্তু অতীত কালে যারা ওহীর শিক্ষাকে মিথ্যায় প্রতিপন্ন করত তারা মুসলমান হতো না। তবে বর্তমানকালে যারা অহীর শিক্ষাকে যুক্তির আলোকে যাচাই করে ওহীর শিক্ষাকে মিথ্যায় প্রতিপন্ন করে, তারা ঐ সমস্ত লোক যারা প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং মুসলমান বলে দাবি করে। হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরুতে জাহাম বিন সাফওয়ান গ্রীস দর্শনে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে, আল্লাহর সত্তা, তাঁর গুণাবলী এবং ভাগ্য প্রসঙ্গে ওহীর শিক্ষাকে পরিবর্তন করে আরো অনেক লোককে সে তার সাথে পথভ্রষ্ট করেছে, যা পরবর্তীতে জাহমিয়া সম্প্রদায় নামে আখ্যায়িত হয়েছে, এমনিভাবে মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসেল বিন আতাও অহীর জ্ঞান বাদ দিয়ে যুক্তিকে মানদণ্ড স্থির করে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং বহু লোককে পথভ্রষ্ট করেছে, যাদেরকে মু'তাযিলা ফেরকা বলা হয়।
হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি ওহীর শিক্ষার বিরুদ্ধে যুক্তির পূজারী সুফিয়া বাগদাদে এক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করল যার নামকরণ করা হয়েছিল, 'ইখওয়ানুস্সাফা' যাদের নিকট সমস্ত ধর্মীয় পরিভাষাগুলো যেমন- নবুয়ত, রিসালাত, মালাইকা, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্জ, আখিরাত, জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদির দুটি করে অর্থ। একটি জাহেরী অপরটি বাতেনী। জাহেরী অর্থ ঐটি যা ইসলামী শরীয়তে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ওহী মোতাবেক। আর বাতেনী ঐটি যা সুফীদের নিজস্ব যুক্তি প্রসূত। সূফীদের নিকট জাহেরী অর্থের ওপর আমলকারী মুসলমানরা জাহেলদের অন্তর্ভুক্ত, আর বাতেনী অর্থের ওপর আমলকারী মুসলমান জ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত। ওহীর শিক্ষাকে পরিবর্তনকারী বাতেনী সংগঠনের এ ফিতনা আজও পৃথিবীর সকল দেশে কোনো না কোন সুরতে আছেই।
নিকট অতীতের স্যার সাইয়্যেদ আহমদ খানের উদাহরণ আমাদের সামনে আছে যে, ১৮৬৮-১৮৭০ ইং পর্যন্ত ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এসে প্রাচ্যের সাইন্স, উন্নতি টেকনোলজি, দেখে এতটা প্রক্রিয়াশীল হয়েছিল যে, আলীগড়ে এম, এ, ও, কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিল, আর এর লক্ষ্য উদ্দেশ্যের মধ্যে এ কথা লেখা ছিল যে, দর্শন আমাদের ডান হাত নেচারাল সাইন্স আমাদের বাম হাত, আর লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ তাজ, যা আমাদের মাথায় থাকবে। কলেজের উদ্বোধন করিয়েছিল লর্ড লিটনের মাধ্যমে। আর কলেজের সংবিধানে একথা লেখা ছিল যে, এ কলেজের প্রিন্সিপাল সর্বদা কোন ইউরোপীয়ান হবে।
প্রাচ্যের সাইন্স ও টেকনোলজিতে প্রতিক্রিয়াশীল সাইয়েদ সাহেব যখন কুরআন মাজীদের তাফসীর লেখা শুরু করলেন, তখন তিনি নবীগণের মো'জেযাগুলোকে যুক্তির আলোকে যাচাই করতে লাগলেন এবং সমস্ত মো'জেযাগুলোকে এক এক করে অস্বীকার করতে লাগলেন। স্ব-শরীরে উপস্থিত না থাকা ফেরেশতাদেরকে অস্বীকার করতে লাগল। জান্নাত, কবরের আযাব, কিয়ামতের আলামত, যেমন: দাব্বাতুল আরদ (মাটি ফেটে প্রাণীর আগমন) ঈসা (আ)-এর আগমন, সূর্য পূর্বদিক থেকে উঠা ইত্যাদি অস্বীকার করতে লাগল। জান্নাত, জাহান্নামের অস্তিত্ব অস্বীকার করল। আর ওহীর শিক্ষা থেকে দূরে সরে শুধু সে নিজেই পথভ্রষ্ট হয় নি বরং তার পিছনে যুক্তির পূজারীদের এমন একদল রেখে গেছে, যারা সর্বদাই উম্মতকে নাস্তিকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়ার গুরু দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের একথা স্বীকার করতে কোন দ্বিধা নেই।
উল্লেখ্য, জাহমিয়া এবং মু'তাযিলা উভয়ে আল্লাহর গুণাবলী যার বর্ণনা কুরআনে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। যেমন, আল্লাহর হাত, পা, চেহারা, পায়ের গোছা ইত্যাদিকে অস্বীকার করেছে, এমনিভাবে সমস্ত আয়াত ও হাদীসের অপব্যাখ্যা করেছে, আর তাকদীর প্রসঙ্গে জাহমিয়াদের আকীদা হল মানুষ বাধ্য। আর সমস্ত হাদীস ও আয়াত যেখানে মানুষকে আমল করার কথা বলা হয়েছে, তারা তার বিভিন্নভাবে অপব্যাখ্যা করেছে। মো'তাযেলারা তাকদীরের ব্যাপারে মানুষ স্বইচ্ছাধীন বলে বিশ্বাস করে।
যে পৃথিবীতে জান্নাত ও জাহান্নামের বাস্তব অবস্থা প্রসঙ্গে সবিস্তারিত বুঝ আসলেই অসম্ভব যুক্তির আলোকে তা পরিপূর্ণভাবে যাচাই করা যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন হল যে, কোন জিনিস যুক্তিতে না ধরাই কি তা অস্বীকার করার জন্য যথেষ্ট? আসুন বিজ্ঞান ও যুক্তির আলোকেই এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি।
সর্বশেষ বিজ্ঞানের আবিষ্কার অনুযায়ী- ১. সর্বদা এ পৃথিবী ঘুরছে, একভাবে নয় বরং দু'ভাবে। প্রথমত নিজের চতুর্পার্শ্বে।
২. সূর্য স্থির যা শুধু তার চতুর্পার্শ্বে ঘুরছে।
৩. পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব প্রায় ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল।
৪. সূর্যের দেহ পৃথিবীর মোকাবেলায় ৩ কোটি লক্ষ ৩৭ হাজার গুণ বেশি।
৫. আমাদের সৌর জগৎ থেকে ৪শ কোটি কি: মি: দূরত্বে আরো একটি সূর্য আছে, যা আমাদের নিকট ছোট একটি আলোকরশ্মি বলে মনে হয়। তার নাম আলফাকেন তুরস। (ALFAGENTAURISA)
৬. আমাদের সৌর জগতের বাহিরে অন্য একটি নাম কালব আকরাব (ATNTARES) তার ব্যাস ২৮ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল প্রায়।
গভীরভাবে চিন্তা করুন বাস্তবেই কি আমাদের অনুভূতি হচ্ছে যে, পৃথিবী আমাদের চতুর্পার্শ্বে ঘুরছে? বাহ্যত পৃথিবী পরিপূর্ণভাবে স্থির আছে, আর তার সামান্য কম্পন পৃথিবীবাসীকে তছনছ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। অথচ বলা হচ্ছে যে পৃথিবী ঘুরে বলে বিশ্বাস কর?
বাস্তবেই কি সূর্য আমাদের নিকট স্থির বলে মনে হয়? সকল মানুষ স্বচোখে প্রত্যক্ষ করছে যে, সূর্য পূর্ব দিক থেকে উদিত হয়ে আস্তে আস্তে চলতে চলতে পশ্চিমে গিয়ে অস্ত যাচ্ছে।
বাস্তবেই কি সূর্য পৃথিবীর তুলনায় ৩ লক্ষ ৩৭ হাজার গুণ বড় বলে মনে হয়। বরং সকল ব্যক্তিই দেখতে পায় যে, সূর্য নয় বা দশ মিটারের একটি আলোকরশ্মি। মানবিক জ্ঞান কি একথা বিশ্বাস করে যে, আমাদের এ সৌর জগতের বাহিরে, কোটি কি: মি: দূরে আরো একটি সূর্য আছে, যা আমাদের এ পৃথিবী ও সূর্যের তুলনায় লক্ষ গুণ বড়। এ সমস্ত কথা শুধু বাস্তব দেখা বিরোধীই নয় বরং বিবেকসম্মতও নয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আমরা তা শুধু এ জন্যই বিশ্বাস করি যে, বিজ্ঞানীগণ তাদের গবেষণার মাধ্যমে এ সমস্ত তথ্য দিয়ে থাকে। এর পরিষ্কার ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা হল এই যে, কোন জিনিস বিবেকসম্মত না হওয়ায় তা অস্বীকার করা সম্পূর্ণ ভুল।
এমনিভাবে জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব এবং তার বিস্তারিত অবস্থা মানবিক জ্ঞানসম্মত না হওয়ায় তা অস্বীকার করা সম্পূর্ণই ভ্রান্তি, ভুলদর্শন, যা শুধু শয়তানী চক্রান্ত মাত্র। নিউটন ও আইনস্টাইনের সূত্রগুলো যদি বুঝে না আসে তা হলে আমরা তখন শুধু আমাদের স্বল্প জ্ঞান এবং কম বুদ্ধির কথাই স্বীকার করি না বরং উল্টো তাদের জ্ঞান-বুদ্ধির প্রশংসায় পঞ্চমুখও হই। অথচ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে আসা বিষয়গুলো যুক্তিসম্মত না হলে তখন শুধু তা অস্বীকারই করি না বরং উল্টো ঠাট্টা-বিদ্রূপও করি। এর অর্থ এছাড়া আর কি হতে পারে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথার ওপর আমাদের এতটুকু ঈমানও নেই যতটা ঈমান আইনস্টাইন ও নিউটনের গবেষণার ওপর আছে। বাস্তবতা হল এই যে, জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব এবং এ ব্যাপারে বর্ণিত গুণাবলি পরিপূর্ণরূপে মানার একমাত্র দলীল হল এই যে, "গায়েবের প্রতি বিশ্বাস" যাকে আল্লাহ কুরআন মাজীদে মানুষের হেদায়াতের জন্য প্রথম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ذلِكَ الْكِتَابُ لأَرَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ، الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ .
এটা ঐ কিতাব যার মধ্যে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। মুত্তাকীদের জন্য এটি হিদায়াত। যারা গায়েবের প্রতি বিশ্বাস করে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে উপজীবিকা প্রদান করেছি তা থেকে তারা দান করে থাকে। (সূরা বাক্বারা ২-৩)
এর স্পষ্ট অর্থ হল এই যে, গায়েবের প্রতি যার ঈমান যত মজবুত হবে, জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি তার বিশ্বাসও তত মজবুত হবে। আর গায়েবের প্রতি যার ঈমান যত দুর্বল হবে জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি তার বিশ্বাসও তত দুর্বল হবে।
অতএব যার বিবেক জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত নয় তার উচিত বিবেকের চিন্তা না করে ঈমানের চিন্তা করা। ঈমানদারগণের আমল অত্যন্ত স্পষ্ট। যাদের প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন- رَبَّنَا إِنَّا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِى لِلإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَأَمَنَّا
হে আমাদের প্রভু! নিশ্চয়ই আমরা এক আহ্বানকারীকে আহ্বান করতে শুনেছিলাম যে, তোমার স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, তাতেই আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। (সূরা আলে ইমরান-১৯৩)
📄 জান্নাতের সীমারেখা ও তথায় জীবন-যাপন
আরবি ভাষায় জান্নাত বলা হয় বাগানকে। এর বহুবচন আসে جَنَّاتٍ এবং (বাগানগুলো) এ জান্নাতের পরিসীমা কতটুকু? তার যথাযথ পরিসীমা সুনির্দিষ্ট করে বলা শুধু কষ্টকরই নয় বরং অসম্ভবও বটে। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন- فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِى لَهُمْ مِنْ قُرَّةٍ أَعْيُنٍ جَزَاء بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ .
কেউই জানেনা তার জন্য নয়ন প্রীতিকর কি লুক্কায়িত রাখা হয়েছে, তাদের কৃতকর্মের প্রতিদানস্বরূপ। (সূরা সাজদা: ১৭)
কুরআন হাদীস চর্চা ও গবেষণার পর যা কিছু বুঝা যায় তার সারমর্ম হল এই যে, জান্নাত আল্লাহ প্রদত্ত এমন এক রাজ্য হবে যা আমাদের এ পৃথিবীর তুলনায় কোন অতিরঞ্জন ব্যতীতই বলা যেতে পারে যে, আমাদের এ পৃথিবীর তুলনায় বহুগুণ বেশি প্রশস্ত হবে। জান্নাতের বিশাল আয়তনের কোন ছোট একটি অংশই আমাদের পৃথিবীর সমান হবে। জান্নাতে সর্বশেষ প্রবেশকারী প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ বলেছেন, যে, যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে, তখন সে আরয করবে হে আল্লাহ! এখন তো সব জায়গা পরিপূর্ণ হয়ে গেছে, আমার জন্য আর কি বাকি আছে? আল্লাহ বলবেন: যদি তোমাকে পৃথিবীর কোন সর্ববৃহৎ বাদশার রাজত্বের সমান স্থান দেয়া হয় তাতে কি তুমি খুশি হবে? তখন বান্দা বলবে, হ্যাঁ হে আল্লাহ! কেন হব না? আল্লাহ তখন বলবেন, যাও জান্নাতে তোমার জন্য পৃথিবীর সর্ববৃহৎ রাজ্যের সমান এবং এর চেয়ে অধিক আরো দশ গুণ স্থান দেয়া হল। (মুসলিম)
জান্নাতে সর্বশেষ প্রবেশকারীকে এতটুকু স্থান দেয়ার পরও জান্নাতে এত স্থান বাকি থেকে যাবে যে, তা পরিপূর্ণ করার জন্য আল্লাহ অন্য মাখলুক সৃষ্টি করবেন। (মুসলিম)
জান্নাতের স্তরসমূহের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ বলেন: তার শত স্তর আছে। আর সকল স্তরের মাঝে আকাশ ও পৃথিবী সম দূরত্ব রয়েছে। (তিরমিযী)
জান্নাতের ছায়াবান বৃক্ষসমূহের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ বলেন: একটি বৃক্ষের ছায়া এত লম্বা হবে যে, কোন অশ্বারোহী শত বছর পর্যন্ত তার ছায়ায় চলার পরও সে ছায়া শেষ হবে না। (বুখারী)
সূরা দাহারের ২০ নং আয়াতে আল্লাহ্ ইরশাদ করেন, জান্নাতের যেদিকেই তোমরা তাকাও না কেন নি'আমত আর নি'আমতই তোমাদের চোখে পড়বে। আর এক বিশাল রাজ্যের আসবাবপত্র তোমাদের চোখে পড়বে। দুনিয়াতে কোন ব্যক্তি যত ফকীরই হোক না কেন যখন সে তার সৎ আমল নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন সে সেখানে এমন অবস্থায় থাকবে, যেন সে বৃহৎ কোন রাজ্যের বাদশা। (তাফহীমুল কুরআন খ: ৬ পৃ. ২০০)
উল্লিখিত আয়াত ও হাদীসের আলোকে এ অনুমান করা কষ্টকর নয় যে, জান্নাতের সীমারেখা নির্ধারণ করা তো দূরের কথা এমনকি ঐ প্রসঙ্গে চিন্তা করাও মানুষের জন্য সম্ভব নয়।
জান্নাতে মানুষ কি ধরনের জীবনযাপন করবে? জান্নাতীদের ব্যক্তিগত গুণাগুণ কি হবে? তাদের পারিবারিক জীবন কেমন হবে? তাদের খানা-পিনা, থাকা কেমন হবে, যদিও এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। এরপরও কুরআন ও হাদীস থেকে যা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত তার আলোকে জান্নাতী জিন্দেগীর কোন কোন অংশের বিস্তারিত বর্ণনা নিম্নরূপ:
📄 শারীরিক গুণাগুণ
জান্নাতীদের চেহারা আলোকময় হবে, চক্ষুদ্বয় লাজুক হবে, মাথার চুল ব্যতীত শরীরের আর কোথাও কোন চুল থাকবে না। এমনকি দাড়ী-গোঁফও থাকবে না, বয়স ৩০-৩৩ বছরের মাঝামাঝি হবে, উচ্চতা মোটামুটি ৯ ফিটের মতো হবে। জান্নাতবাসী সর্বপ্রকার নাপাকী থেকে পবিত্র থাকবে, এমনকি থুথু এবং নাকের পানিও আসবে না। ঘাম হবে কিন্তু তা মেশক আম্বরের ন্যায় সুঘ্রাণযুক্ত থাকবে। জান্নাতবাসীগণ সর্বদা আরাম-আয়েশ ও হাসি-খুশি থাকবে। কারো কোন চিন্তা, ব্যথা, বিরক্ত ও ক্লান্তিবোধ থাকবে না। জান্নাতবাসীগণ সর্বদা সুস্থ থাকবে। তারা কখনো অসুস্থ, বৃদ্ধ ও তাদের মৃত্যু হবে না। জান্নাতী মহিলাদের যে গুণাবলির কথা কুরআনে বারবার এসেছে তা হল এই যে, জান্নাতের রমণী লজ্জাশীল হবে, দৃষ্টি নিম্নমুখী থাকবে। সৌন্দর্যে তারা মুক্তা ও প্রবালকেও হার মানায়। নবী বলেন: জান্নাতী রমণীগণ যদি ক্ষণিকের জন্যও পৃথিবীতে দৃষ্টিপাত করে তাহলে পূর্ব পশ্চিমের মাঝে যা কিছু আছে সব কিছুকে আলোকময় করে তুলবে এবং পূর্ব পশ্চিমের মাঝে যত খালি জায়গা আছে তা সুগন্ধিময় করে তুলবে। (বুখারী)
📄 পারিবারিক জীবন
জান্নাতে কোন ব্যক্তি একাকী থাকবে না। প্রত্যেকের দু'জন করে স্ত্রী থাকবে, আর এ দু স্ত্রী আদম সন্তানদের মধ্য থেকে হবে। (ইবনে কাসীর)
পৃথিবীর এ মহিলাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর পূর্বে আল্লাহ তাদেরকে পুনরায় নতুন করে সৃষ্টি করবেন। আর তখন তাদেরকে ঐ সৌন্দর্য প্রদান করবেন যা জান্নাতে বিদ্যমান হুরদেরকে দেয়া হয়েছে। এ নারীদেরকে নতুন করে সৃষ্টি করার পর তাদেরকে কোন জ্বিন ও ইনসান স্পর্শও করে নি। তারা তাদের স্বামীদের সমবয়সী ও লাজুক, পর্দাশীল, অত্যন্ত স্বামী ভক্ত হবে। জান্নাতীরা তাদের সুযোগ মতো স্বীয় স্ত্রীগণের সাথে ঘন শীতল ছায়ায় প্রবাহমান নদীর তীরে সোনা-চান্দি ও মুক্তার নির্মিত আসনসমূহে বসে আনন্দময় গল্পে মেতে উঠবে। খানাপিনার জন্য মহিলাদের কষ্ট করতে হবে না। বরং তারা যা কিছু চাইবে মুক্তার ন্যায় সুন্দর ও বুদ্ধিমান খাদেম তা তাদের সামনে সাথে সাথে উপস্থিত করবে। একই খান্দানের নিকট আত্মীয়গণ যেমন: পিতামাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, ছেলে-মেয়ে, নাতী-নাতনী ইত্যাদি যদি জান্নাতে স্তরের দিক থেকে একে অপর থেকে দূরবর্তীতে থাকে তবে আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে পরস্পরের নিকটবর্তী করে দিবেন। সুবহানাল্লাহী ওয়া বিহামদিহী সুবহানাল্লাহিল আযীম।)