📄 মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান
সন্তানকে মানুষ করার জন্য মাতা-পিতাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। নিজের ঘুম হারাম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, ঝড় তুফান উপেক্ষা করে এমনকি নিজের মুখের খাবারটুকু সন্তানের মুখে তুলে দিয়ে সন্তানকে মানুষ করে গড়ে তোলার জন্য মাতা-পিতা পাগল পাড়া হয়ে যায়। সন্তানের প্রতি মা-বাবার ভালবাসা পরিমাপ করা আল্লাহ ব্যতীত কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এমন মাতা-পিতার সাথে অসৎ ব্যবহার করা, তাদের মনে দুঃখ দেয়া কেমন জঘন্য অপরাধ হতে পারে? এজন্যই ইসলাম মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, তাদের কথা শোনা, সেবা-যত্ন করা, তাদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা- এসবের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করে। আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার জন্য বহুবার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রিয় রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসের মাধ্যমে মাতা-পিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং যারা মাতা-পিতার অবাধ্য তাদের ইবাদত ও দু'আ আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয় বলে উপরোক্ত হাদীসে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন। তবে হ্যাঁ, মাতা-পিতা যদি কোন প্রকাশ্য কুফরী বা আল্লাহর নাফরমানীর কাজে আদেশ করে সে ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করা যাবে না বরং তাদেরকে উত্তম কথার মাধ্যমে বুঝাতে হবে যে, এমনটি করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা আল্লাহ ও তাঁর রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কাজে সন্তুষ্ট নন। আল্লাহ বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا أَبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنْ اسْتَحَبُوا الكُفْرَ عَلَى الإِيمَانِ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালবাসে। আর (ঐরূপ অবস্থায়) তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে তারা সীমালঙ্ঘনকারী।” (সূরা আত-তাওবাহ ২৩)
📄 দান করে তিরস্কারকারী ও তাকদীর অস্বীকারকারী
ثلاثة لا يقبل الله منهم صرفا ولا عدلا : عاق، ومنان، ومكذب بالقدر» (ابن أبي عاصم في (السنه)، طبراني - المنتقي ٥٠/٢ - ابن عساكر، قال الباني- هذا اسناد حسن، سلسلة صحيحة ١٧٨٥)
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা তিন প্রকার লোকের ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করেন না। (১) মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান (২) দান করে তিরস্কারকারী (৩) তাকদীরকে অস্বীকারকারী। (ইবনু অনাবী আসিম- সুন্নাহ, তাবারানী, ইবনু আসাকির, আলবানী বলেছেন- এর সনদ হাসান)
উল্লেখ্য, কেউ কেউ হাদীসে বর্ণিত সরফুন ও আদলুন শব্দের অর্থ করেছেন তাওবাহ ও ফিদয়া।
কাউকে উপকার করে খোটা দেয়া
কেউ যদি কাউকে কোন উপকার করে বা দান করে খোটা দেয় বা তিরস্কার করে এমন ব্যক্তির ইবাদত আল্লাহ কবুল করেন না। অর্থাৎ সে ব্যক্তি কাউকে কোন কিছু দান করে বা উপকার করে যে সওয়াবটুকু লাভ করেছিল তিরস্কার করার ফলে সে উক্ত সাওয়াব হতে বঞ্চিত হবে আর এটা হলো তার ইবাদত কবুল না হওয়া। এরূপ ব্যক্তির দান সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَبْطِلُوا صَدَقْتِكُمْ بِالْمَنْ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رياءَ النَّاسِ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা প্রচার করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের দান তাদের ন্যায় কষ্ট করো না যারা লোক দেখানোর উদ্দেশে দান করে।" (সূরা আল-বাকারা ২৬৪)
তবে হ্যাঁ, কেউ যদি কারো বিবেককে জাগ্রত করার জন্য তার প্রতি কৃত অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় তবে সেটা খোটা বা তিরস্কার হিসেবে গণ্য হবে না। যেমন, কোন ব্যক্তি কারোর ক্ষতি করতে চাইছে বা কারোর সাথে এমন আচরণ করছে যা করা মোটেই ঠিক হচ্ছে না তখন যদি সে তার বিবেককে জাগ্রত করার জন্য এ কথা বলে যে, আমি তো সবসময় তোমার কল্যাণ কামনা করি, তোমার বিপদের দিনে তোমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছি অথচ তুমি আমার ক্ষতি করতে চাইছো, এমনটি করা তোমার জন্য কি শোভা পায়?
তাকদীর অস্বীকারকারী
তাকদীর বা ভাগ্যে নির্ধারিত ভাল-মন্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যে ব্যক্তি তাকদীরকে বিশ্বাস করে না সে ঈমানদার হতে পারে না। তাই এমন ব্যক্তির ইবাদত কবুল না হওয়াটাই স্বাভাবিক।
📄 বেনামাযীর সৎকর্ম
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি বেনামাযী হয়ে আল্লাহর কাছে যাবে তার অন্যান্য সৎকাজকে আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। (তাবারানী)
নামায ত্যাগ কুফরী। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফির ও মুসলমানের মধ্যে পার্থক্য হিসেবে নামাযকে উল্লেখ করেছেন। কোন ব্যক্তি মুসলমান হবার সাথে সাথে তার উপর নামায ফরয হয়ে যায় অন্যথায় তার মুসলমানিত্ব বজায় থাকে না। কুরআন মাজীদে মহান আল্লাহ তা'আলা বহুবার নামাযের নির্দেশ প্রদান করেছেন। এই মহান নির্দেশ যারা অমান্য করে তাদের ঈমানের দনাবী নিঃসন্দেহে মিথ্যা। কারো বেনামাযী হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, তার অন্তর ঈমানশূন্য, দুনিয়াপূজা ও অহঙ্কারপূর্ণ। বেনামাযী ব্যক্তি আল্লাহ ও রসূলের প্রতি ঈমানের মৌলিক স্বীকৃতি দিলেও তার কর্ম তাকে কুফরী বা কাফিরের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়। [প্রাসঙ্গিক বক্তব্য দেখুন ১৩-১৪ পৃষ্ঠার, (ক)]
তবে এখানে মূল কথা হচ্ছে রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উল্লেখিত হাদীসটি যাতে তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, বেনামাযীর কোন সৎকর্মই আল্লাহ তা'আলা গ্রহণ করবেন না।
উল্লেখ্য বেনামাযী কারা বা উক্ত হাদীসের বিধানে কারা শামিল হবে এতেও কিছু সংশয় দেখা দিয়েছে। কেননা, বর্তমানে কয়েক ধরনের বেনামাযী দেখা যাচ্ছে।
(১) যারা জীবনে নামায পড়েছে কিনা সন্দেহ।
(২) শুধু জুমু'আর নামায আর ঈদের নামায। এদের ব্যাপারে একদল উলামার মত হলো এরা বেনামাযীর মধ্যেই শামিল হবে। কেননা সপ্তাহে ৭ দিনে ৩৫ ওয়াক্ত ফরয নামাযের মধ্যে মাত্র এক ওয়াক্ত নামাযে সাড়া দিয়েছে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য। তাই এদের কেউ মারা গেলে এদের জানাযা পড়া ঠিক নয় এবং মুসলমানের কবরস্থানেও এদেরকে কবর দেয়া ঠিক হবে না। কারণ এরা দীনের সাথে ঠাট্টা করেছে এবং কুফরী অবস্থায় মারা গেছে। সেজন্য এদের কোন সৎকর্ম গৃহীত হবার কথা নয়।
(৩) বারো মাসে একমাস ও একদিন অর্থাৎ শুধু রামাযান মাস এবং শবেবরাত নামক বিদ'আতী আমলের দিনটিতে। এদের ব্যাপারে বক্তব্য হলো, সে যদি আল্লাহর দরবারে এই বলে তাওবাহ করে যে, সে আর নামায ছাড়বে না তাহলে উত্তম। আর যদি প্রতি বছরই এভাবে রামাযানের পর নামায ছেড়ে দেয়া ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায় তবে এর পরিণতি আরো ভয়াবহ। নামায ছেড়ে দেয়া অবস্থায় মারা গেলে সে কুফরীর উপর মারা যাবে। আর শবেবরাত? সে রাতকে নির্দিষ্ট করে ইবাদত সম্পূর্ণ বিদ'আত। এমন ব্যক্তির ইবাদত দু'টি কারণে কবুল হবে না। (ক) সে বিদ'আতী এবং (খ) ৩৬৪ দিনে মোট ১৮২০ ওয়াক্ত নামায পরিত্যাগকারী।
উল্লেখিত ব্যক্তিদের যদি বেনামাযীর মধ্যে শামিল না করে অনিয়মিত নামাযী বা নামাযের প্রতি অবহেলা প্রদর্শনকারীও বলা হয় তবুও হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী তাদের পরিণাম খুবই ভয়াবহ।
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত বা যথাযথভাবে নামায আদায় করে না, তার ঐ নামায পরকালে নূর, দলিল বা নাজাতের উপকরণ তো হবেই না বরং তার হাশর হবে ফেরাউন, কারুন, হামান ও উবাই ইবনু খালফের সাথে। (আহমাদ, বাইহাকী, দারেমী)
লক্ষণীয় যে, একজন বেনামাযী তার ব্যবহার যদিও ভাল হয় বা সে একজন ভাল মানুষ হিসেবে অনেকের কারছে সুপরিচিত কিন্তু সে তো একজন ঈমানদার নয়। অতএব তার সকল ভাল কাজই যে বরবাদ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে যদি নামায পড়ে তাহলে তার অপরাধ ক্ষমা ও সৎকর্ম কবুল হবার সুযোগ রয়েছে।
আসলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী আইন বাস্তবায়িত হলে বেনামাযীদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হতো। ফলে ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি আইনের চাপ এবং শাস্তির ভয়ে বেনামাযী খুঁজে পাওয়া যেত না। আজ দুর্ভাগ্য আল্লাহর আইন সমাজে বাস্তবায়িত নেই বলেই মুসলিম পরিচয় বহনকারীদের বিশেষ করে নামাযের ব্যাপারে এ করুণ অবস্থা।
📄 জাফরান রং ব্যবহারকারী পুরুষ
قال رسول الله ﷺ : « لا يقبل الله صلواة رجل في جسده شيئ من خلوق (أبو داود مشكاة، ضعفه الباني)
আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ সে ব্যক্তির নামায কবুল করেন না, যার দেহে জাফরান রঙের কিছু থাকে। (আবূ দাউদ, মিশকাত)
আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'একরাতে দু'হাত ফাটা অবস্থায় আমি আমার পরিবারের কাছে হাজির হলে তারা আমার দু'হাতে জাফরান রঙের প্রলেপ লাগিয়ে দেয়। পরদিন সকালে আমি নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে সালাম করলে তিনি আমার সালামের জবাব দেননি এবং মারহাবাও বলেননি বরং তিনি বলেন, তুমি ফিরে যাও এবং একে ধুয়ে ফেল। আমি তা ধুয়ে পুনরায় তার নিকট হাজির হই, কিন্তু সে রঙের কিছু তখনও অবশিষ্ট ছিল। এরপর আমি তাকে সালাম দিলে তিনি আমার সালামের জবাব দেননি এবং মারহাবাও বলেননি। তিনি বলেন, ফিরে যাও এবং হাত থেকে এ রং ধুয়ে ফেল। আমি ফিরে গিয়ে ধুয়ে ফেলে তাঁর কাছে এসে তাকে সালাম করি। তখন তিনি আমার সালামের জবাব দেন এবং মারহাবা বলেন। তারপর তিনি বলেন, ফেরেশতারা কাফিরের জানাযা, জাফরান রং ব্যবহারকারী ও অপবিত্র লোকদের নিকট আসে না। তবে তিনি নাপাক অবস্থায় অযু করার পর পানাহার করতে ও নিদ্রা যেতে অনুমতি দিয়েছেন। (আবূ দাউদ)
আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস (রাঃ) বলেন, নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার পরিধানে জাফরান রং এর দু'খানা কাপড় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মা' কি এগুলি পড়তে বলেছে? আমি বললাম, আমি কাপড়খানা ধুয়ে ফেলব? তিনি বললেন বরং জালিয়ে ফেল। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি বলেন, এগুলো কাফিরদের পোশাক সুতরাং এসব পোশাক পড়বে না। (সহীহ মুসলিম)