📄 যে বিচারক আল্লাহর বিধান মত ফয়সালা করে না
عن النبي ﷺ قال : «لا يقبل الله صلاة إمام حكم بغير ما أنزل الله» (الحاكم - وقال الحاكم في المستدرك - هذا حديث صحيح الإسناد، وقال الذهبي سنده مظلم)
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে বিচারক আল্লাহর নাযিলকৃত ব্যবস্থা মত ফায়সালা করবে না আল্লাহ তার নামায কবুল করবেন না। (মুস্তাদরাকে হাকীম, তিনি বলেছেন হাদীসের সনদ সহীহ)
দেশ ও সমাজের বুক থেকে যাবতীয় ফিতনা, সন্ত্রাস, অনাচার দূর করে নাগরিকদের অধিকার রক্ষা ও শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইনসাফ ভিত্তিক আইন, নিরপেক্ষ সাহসী ঈমানদার বিচারক ও বিচার ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। যে দেশে যে সমাজে ইনসাফ ভিত্তিক আইন ও নিরপেক্ষ, সাহসী ও ন্যায়পরায়ণ বিচারক নেই সেখানে অশান্তি ছাড়া কিছুই পাওয়া সম্ভব নয়। একজন বিচারকের রায়ের উপর সমাজের শান্তি বা অশান্তি বহুলাংশে নির্ভর করে। তাই বলা যায়, একজন বিচারকের দায়িত্ব কোন ছোটখাট দায়িত্ব নয়, এ দায়িত্ব অনেক বড় ও কঠিন। সবাই যেমন বিচারক হবার যোগ্যতা রাখে না, আবার সব বিচারক ইনসাফ কায়েম করতে পারে না।
উপরোক্ত হাদীস এই বিচারক সম্পর্কেই বর্ণিত হয়েছে যাতে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে বিচারক আল্লাহর বিধান মোতাবেক বিচার ফায়সালা করে না তার নামায কবুল হয় না। এতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, এ হাদীস মুসলমান বিচারকদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। বিচারক সম্পর্কিত বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্য একটি হাদীসে। তা হলো- রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বিচারক তিন প্রকার: এক প্রকার জান্নাতী আর দু'প্রকার জাহান্নামী। (১) যে বিচারক হক্বের জ্ঞান সম্পন্ন এবং তাঁর জ্ঞানানরূপ ফায়সালা করে- সে জান্নাতী। (২) যে বিচারক হক্বের জ্ঞান রাখে কিন্তু জেনে শুনে অন্যায় ফায়সালা করে- সে জাহান্নামী। (৩) যে বিচারক হক্বের জ্ঞান রাখে না, অজ্ঞভাবে ফায়সালা করে- সে জাহান্নামী। (তিরমিযী, হাকিম)
তাহলে বুঝা গেল, বিচারকের অন্যায় রায় শুধু তাঁর নামাযকেই নষ্ট করে না বরং এ রায় তার জন্য জাহান্নামের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় এ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা তুলে ধরা দরকার।
১। হাদীসে জান্নাতী বিচারকের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে দু'টি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে। (ক) বিচারক অবশ্যই হজ্বের জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি হবে এবং (খ) সে হক্বের জ্ঞানানুসারেই বিচার ফায়সালা করবে। প্রশ্ন হতে পারে হজ্বের জ্ঞান কি? হক্বের জ্ঞান হচ্ছে মহান আল্লাহর ঐশী বিধানের জ্ঞান তথা কুরআনের বিধি বিধান যাকে আল্লাহ হকু বলে ঘোষণা করেছেন। সুতরাং দেশের ছোট বড় বিচারালয়ের বিচারকগণ, মহল্লার পঞ্চায়েত নেতৃবৃন্দ যদি আল্লাহ ও রসূলের বিধান মোতাবেক বিচার ফায়সালা করতে পারেন তাহলে তারা জান্নাতী বিচারক হিসেবে গণ্য হবেন।
২। জাহান্নামী বিচারকের প্রথম শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য হলো- (ক) হজ্বের জ্ঞান রাখবে (খ) কিন্তু সে হক্বের জ্ঞানানুসারে বিচার না করে জেনে শুনে অন্যায় ফায়সালা করবে। এরূপ বিচারকদের সংখ্যাই বর্তমানে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কোর্টে, আদালতে, পঞ্চায়েত ক্লাবে সবখানেই বিচার আচারে কুরআন-হাদীসকে উপেক্ষা করে নিজেদের মস্তিষ্ক প্রসূত কুফরী পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। সরকারী বিচারালয়ের কথা বাদই দেয়া যাক, কেননা সেখানে টাকার মাধ্যমে অথবা ক্ষমতাধর ব্যক্তির প্রভাবে প্রায়ই কুখ্যাত খুনী, সন্ত্রাসীরাও ছাড়া পেয়ে যায়। তাছাড়া দেশের প্রতিটি মহল্লায় বা সমাজে প্রতিষ্ঠিত পঞ্চায়েত এর অবস্থাটাই লক্ষ্য করা যাক না। সেখানে এমন ঘটনা ঘটতে হয়তো অনেকে দেখে থাকবেন যে, সেখানে যদি এমন কোন ব্যক্তি অপরাধী হয় যিনি সমাজের একজন ধনী বা প্রভাবশালী ব্যক্তি, বা তিনি বিচার ব্যবস্থাপনা কমিটির কোন সদস্য বা সদস্যের সন্তান বা কোন আত্মীয় হন তাহলে সে অপরাধীবিচারকের চোখে আর অপরাধী হয়ে ধরে পড়ে না। এ ক্ষেত্রে বিচারক হয় অপরাধীর পক্ষে রায় দিবেন অথবা যিনি মজলুম বা বিচার প্রার্থী তাকে অভিযোগ পেশ করার তেমন সুযোগ দেবেন না বা মজলুমকে ঘুরিয়ে পেচিয়ে কিছু বলে ব্যাপারটাকে অন্যদিকে নিয়ে ইনসাফ কায়েম করা হতে পাশ কেটে যাবেন। এরূপ ঘটনা বহু জায়গায় প্রায় ঘটে থাকে। অথচ বিচারক হিসেবে নামায কবুল না হওয়ার বিধানে এরাও শামিল।
এ ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে, যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে কুফরী বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত সেখানে সামাজিক বিচারলয়ের বিচারকগণ কি করবেন? তাহলে এক্ষেত্রে বলা উচিত যে, সরকার এমনি এমনি নির্বাচিত হয় না বরং এজন্য প্রয়োজন হয় জনগণের সাহায্য ও সমর্থন। যারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে মুসলিম জনসাধারণের উপর কুফরী আইন চাপিয়ে দেয় আর তাদেরকেই ক্ষমতায় বসানোর জন্য যদি সাহায্য, সমর্থন করা হয় তাহলে এ কথা বলে আল্লাহকে রাযী করা কিরূপে সম্ভব। আর যদি সাহায্য সমর্থন না করা হয় তবে কুফরী আইনের পৃষ্ঠপোষক নয় বরং কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে ইসলামী শাসন কায়েমের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা একান্তই প্রয়োজন। নিশ্চয় আল্লাহ কারোর সাধ্যের বাইরে হিসাব নিবেন না। (প্রাসঙ্গিক বক্তব্য দেখুন ১৪-১৫ পৃষ্ঠার ৩ নং পয়েন্ট)
৩। জাহান্নামী বিচারকের দ্বিতীয় শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য হলো- (ক) হক্বের জ্ঞান রাখে না। (খ) এবং অজ্ঞতাবশত বিচার ফায়সালা করে। এখানে প্রশ্ন জাগতে পারে যেহেতু সে কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান রাখে না তাই সে অজ্ঞতাবশত ফায়সালা দিয়েছে এ কারণে সে জাহান্নামী হবে কেন? তা এই কারণেই যে, তিনি কিছু না জেনে বিচারক হতে গেলেন কেন? যিনি হজ্বের জ্ঞান রাখেন এবং ইনসাফ কায়েম করতে সক্ষম তার হাতেই তো বিচারের ভার অর্পণ করা যেত। ইল্ল্মবিহীন তার এরূপ বিচারক হবার সাধ সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিতে যথেষ্ট নয় কি? যা হোক এরূপ বিচারক হবার সাধ যেন কারো না জাগে তাই রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবধান করে দিয়েছেন। কেননা এতে কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই ডেকে আনবে।
📄 মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান
সন্তানকে মানুষ করার জন্য মাতা-পিতাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। নিজের ঘুম হারাম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, ঝড় তুফান উপেক্ষা করে এমনকি নিজের মুখের খাবারটুকু সন্তানের মুখে তুলে দিয়ে সন্তানকে মানুষ করে গড়ে তোলার জন্য মাতা-পিতা পাগল পাড়া হয়ে যায়। সন্তানের প্রতি মা-বাবার ভালবাসা পরিমাপ করা আল্লাহ ব্যতীত কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এমন মাতা-পিতার সাথে অসৎ ব্যবহার করা, তাদের মনে দুঃখ দেয়া কেমন জঘন্য অপরাধ হতে পারে? এজন্যই ইসলাম মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, তাদের কথা শোনা, সেবা-যত্ন করা, তাদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা- এসবের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করে। আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার জন্য বহুবার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রিয় রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসের মাধ্যমে মাতা-পিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং যারা মাতা-পিতার অবাধ্য তাদের ইবাদত ও দু'আ আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয় বলে উপরোক্ত হাদীসে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন। তবে হ্যাঁ, মাতা-পিতা যদি কোন প্রকাশ্য কুফরী বা আল্লাহর নাফরমানীর কাজে আদেশ করে সে ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করা যাবে না বরং তাদেরকে উত্তম কথার মাধ্যমে বুঝাতে হবে যে, এমনটি করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা আল্লাহ ও তাঁর রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কাজে সন্তুষ্ট নন। আল্লাহ বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا أَبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنْ اسْتَحَبُوا الكُفْرَ عَلَى الإِيمَانِ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালবাসে। আর (ঐরূপ অবস্থায়) তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে তারা সীমালঙ্ঘনকারী।” (সূরা আত-তাওবাহ ২৩)
📄 দান করে তিরস্কারকারী ও তাকদীর অস্বীকারকারী
ثلاثة لا يقبل الله منهم صرفا ولا عدلا : عاق، ومنان، ومكذب بالقدر» (ابن أبي عاصم في (السنه)، طبراني - المنتقي ٥٠/٢ - ابن عساكر، قال الباني- هذا اسناد حسن، سلسلة صحيحة ١٧٨٥)
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা তিন প্রকার লোকের ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করেন না। (১) মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান (২) দান করে তিরস্কারকারী (৩) তাকদীরকে অস্বীকারকারী। (ইবনু অনাবী আসিম- সুন্নাহ, তাবারানী, ইবনু আসাকির, আলবানী বলেছেন- এর সনদ হাসান)
উল্লেখ্য, কেউ কেউ হাদীসে বর্ণিত সরফুন ও আদলুন শব্দের অর্থ করেছেন তাওবাহ ও ফিদয়া।
কাউকে উপকার করে খোটা দেয়া
কেউ যদি কাউকে কোন উপকার করে বা দান করে খোটা দেয় বা তিরস্কার করে এমন ব্যক্তির ইবাদত আল্লাহ কবুল করেন না। অর্থাৎ সে ব্যক্তি কাউকে কোন কিছু দান করে বা উপকার করে যে সওয়াবটুকু লাভ করেছিল তিরস্কার করার ফলে সে উক্ত সাওয়াব হতে বঞ্চিত হবে আর এটা হলো তার ইবাদত কবুল না হওয়া। এরূপ ব্যক্তির দান সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَبْطِلُوا صَدَقْتِكُمْ بِالْمَنْ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رياءَ النَّاسِ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা প্রচার করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের দান তাদের ন্যায় কষ্ট করো না যারা লোক দেখানোর উদ্দেশে দান করে।" (সূরা আল-বাকারা ২৬৪)
তবে হ্যাঁ, কেউ যদি কারো বিবেককে জাগ্রত করার জন্য তার প্রতি কৃত অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় তবে সেটা খোটা বা তিরস্কার হিসেবে গণ্য হবে না। যেমন, কোন ব্যক্তি কারোর ক্ষতি করতে চাইছে বা কারোর সাথে এমন আচরণ করছে যা করা মোটেই ঠিক হচ্ছে না তখন যদি সে তার বিবেককে জাগ্রত করার জন্য এ কথা বলে যে, আমি তো সবসময় তোমার কল্যাণ কামনা করি, তোমার বিপদের দিনে তোমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছি অথচ তুমি আমার ক্ষতি করতে চাইছো, এমনটি করা তোমার জন্য কি শোভা পায়?
তাকদীর অস্বীকারকারী
তাকদীর বা ভাগ্যে নির্ধারিত ভাল-মন্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যে ব্যক্তি তাকদীরকে বিশ্বাস করে না সে ঈমানদার হতে পারে না। তাই এমন ব্যক্তির ইবাদত কবুল না হওয়াটাই স্বাভাবিক।
📄 বেনামাযীর সৎকর্ম
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি বেনামাযী হয়ে আল্লাহর কাছে যাবে তার অন্যান্য সৎকাজকে আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। (তাবারানী)
নামায ত্যাগ কুফরী। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফির ও মুসলমানের মধ্যে পার্থক্য হিসেবে নামাযকে উল্লেখ করেছেন। কোন ব্যক্তি মুসলমান হবার সাথে সাথে তার উপর নামায ফরয হয়ে যায় অন্যথায় তার মুসলমানিত্ব বজায় থাকে না। কুরআন মাজীদে মহান আল্লাহ তা'আলা বহুবার নামাযের নির্দেশ প্রদান করেছেন। এই মহান নির্দেশ যারা অমান্য করে তাদের ঈমানের দনাবী নিঃসন্দেহে মিথ্যা। কারো বেনামাযী হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, তার অন্তর ঈমানশূন্য, দুনিয়াপূজা ও অহঙ্কারপূর্ণ। বেনামাযী ব্যক্তি আল্লাহ ও রসূলের প্রতি ঈমানের মৌলিক স্বীকৃতি দিলেও তার কর্ম তাকে কুফরী বা কাফিরের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়। [প্রাসঙ্গিক বক্তব্য দেখুন ১৩-১৪ পৃষ্ঠার, (ক)]
তবে এখানে মূল কথা হচ্ছে রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উল্লেখিত হাদীসটি যাতে তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, বেনামাযীর কোন সৎকর্মই আল্লাহ তা'আলা গ্রহণ করবেন না।
উল্লেখ্য বেনামাযী কারা বা উক্ত হাদীসের বিধানে কারা শামিল হবে এতেও কিছু সংশয় দেখা দিয়েছে। কেননা, বর্তমানে কয়েক ধরনের বেনামাযী দেখা যাচ্ছে।
(১) যারা জীবনে নামায পড়েছে কিনা সন্দেহ।
(২) শুধু জুমু'আর নামায আর ঈদের নামায। এদের ব্যাপারে একদল উলামার মত হলো এরা বেনামাযীর মধ্যেই শামিল হবে। কেননা সপ্তাহে ৭ দিনে ৩৫ ওয়াক্ত ফরয নামাযের মধ্যে মাত্র এক ওয়াক্ত নামাযে সাড়া দিয়েছে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য। তাই এদের কেউ মারা গেলে এদের জানাযা পড়া ঠিক নয় এবং মুসলমানের কবরস্থানেও এদেরকে কবর দেয়া ঠিক হবে না। কারণ এরা দীনের সাথে ঠাট্টা করেছে এবং কুফরী অবস্থায় মারা গেছে। সেজন্য এদের কোন সৎকর্ম গৃহীত হবার কথা নয়।
(৩) বারো মাসে একমাস ও একদিন অর্থাৎ শুধু রামাযান মাস এবং শবেবরাত নামক বিদ'আতী আমলের দিনটিতে। এদের ব্যাপারে বক্তব্য হলো, সে যদি আল্লাহর দরবারে এই বলে তাওবাহ করে যে, সে আর নামায ছাড়বে না তাহলে উত্তম। আর যদি প্রতি বছরই এভাবে রামাযানের পর নামায ছেড়ে দেয়া ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায় তবে এর পরিণতি আরো ভয়াবহ। নামায ছেড়ে দেয়া অবস্থায় মারা গেলে সে কুফরীর উপর মারা যাবে। আর শবেবরাত? সে রাতকে নির্দিষ্ট করে ইবাদত সম্পূর্ণ বিদ'আত। এমন ব্যক্তির ইবাদত দু'টি কারণে কবুল হবে না। (ক) সে বিদ'আতী এবং (খ) ৩৬৪ দিনে মোট ১৮২০ ওয়াক্ত নামায পরিত্যাগকারী।
উল্লেখিত ব্যক্তিদের যদি বেনামাযীর মধ্যে শামিল না করে অনিয়মিত নামাযী বা নামাযের প্রতি অবহেলা প্রদর্শনকারীও বলা হয় তবুও হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী তাদের পরিণাম খুবই ভয়াবহ।
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত বা যথাযথভাবে নামায আদায় করে না, তার ঐ নামায পরকালে নূর, দলিল বা নাজাতের উপকরণ তো হবেই না বরং তার হাশর হবে ফেরাউন, কারুন, হামান ও উবাই ইবনু খালফের সাথে। (আহমাদ, বাইহাকী, দারেমী)
লক্ষণীয় যে, একজন বেনামাযী তার ব্যবহার যদিও ভাল হয় বা সে একজন ভাল মানুষ হিসেবে অনেকের কারছে সুপরিচিত কিন্তু সে তো একজন ঈমানদার নয়। অতএব তার সকল ভাল কাজই যে বরবাদ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে যদি নামায পড়ে তাহলে তার অপরাধ ক্ষমা ও সৎকর্ম কবুল হবার সুযোগ রয়েছে।
আসলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী আইন বাস্তবায়িত হলে বেনামাযীদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হতো। ফলে ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি আইনের চাপ এবং শাস্তির ভয়ে বেনামাযী খুঁজে পাওয়া যেত না। আজ দুর্ভাগ্য আল্লাহর আইন সমাজে বাস্তবায়িত নেই বলেই মুসলিম পরিচয় বহনকারীদের বিশেষ করে নামাযের ব্যাপারে এ করুণ অবস্থা।