📘 যাদের ইবাদত কবুল হয় না > 📄 হারাম খাদ্যের দ্বারা গঠিত দেহের ইবাদত

📄 হারাম খাদ্যের দ্বারা গঠিত দেহের ইবাদত


عن أبي هريرة قال قال رسول الله ﷺ : « إن الله طيب لا يقبل إلا طيبا وإن الله أمر المؤمنين بما امربه المرسلين فقال : يأيها الرسول كلوا من الطيبت واعملوا صالحا وقال يأيها الذين آمنوا كلوا من طيبت ما رزقناكم ثم ذكر الرجل يطيل السفر اشعث أغبر يمد يديه إلى السماء يا رب يا رب ومطعمه حرام ومشربه حرام وملبسه حرام وغذى بالحرام فاني يستجاب لذلك » . (صحيح مسلم)
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি শুধুমাত্র পবিত্রকেই গ্রহণ করেন। আর আল্লাহ মু'মিনদেরকে ঐ বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, যে বিষয়ে রসূলদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন, “হে রসূলগণ! তোমরা (পাক-পবিত্র) হালাল খাদ্য ভক্ষণ কর এবং সৎকার্য কর”। আল্লাহ আরো বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের যে হালাল রিক দান করেছি তা থেকে ভক্ষণ কর। তারপর রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দূরদূরান্তে ভ্রমণ করছে (ভ্রমণকারী তথা মুসাফিরের দু'আ সাধারণত বেশি কবুল হয়) তার মাথার চুল এলোমেলো, শরীরে ধূলাবালু। এমতাবস্থায় ঐ ব্যক্তি উভয় হাত আকাশের দিকে উঠিয়ে কাতর স্বরে হে প্রভু! হে প্রভু! বলে প্রার্থনা করছে অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং হারাম দ্বারাই সে উদরপূর্তি করেছে তাহলে কিভাবে এ ব্যক্তির দু'আ কবুল হতে পারে? (সহীহ মুসলিম)
عن أنس قال : قلت يا رسول الله ﷺ : أدع الله أن يجعلني مستجاب الدعوة، فقال : « يا أنس اطب كسبك تجب دعوتك، فإن الرجل ليرفع اللقمة من الحرام إلى فيه فلا يستجاب له دعوة أربعين يوما » (طبرانی)
আনাস (রাঃ) বলেন, আমি একদা রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, আপনি আল্লাহর নিকট দু'আ করুন তিনি যেন আমার দু'আ কবুল করেন। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আনাস! তুমি হালাল রোজগার কর তোমার দু'আ কবুল হবে। কোন ব্যক্তি যখন হারাম লোকমা মুখে রাখবে তখন চল্লিশ দিন তার দু'আ কবুল হবে না। (তাবারানী)
عن ابن عمر قال : لمن اشترى ثوبا بعشرة دراهم وفيه درهم حرام لم يقبل الله تعالى صلوة مادام عليه ثم أدخل اصبعيه في أذنيه وقال صبتا إن لم يكن النبي ﷺ سمعته يقوله . (رواه أحمد والبيهقي في شعب الإيمان وقال اسناه ضعيف)
ইবনু উমার (রাঃ) বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি দশ মুদ্রায় একটি কাপড় কিনেছে আর যাতে একটি মুদ্রা হারাম ছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত এই কাপড়টি তাঁর পরনে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার নামায কবুল হবে না।
ইবনু উমার (রাঃ) এই বর্ণনার পর তার উভয় কানে আঙ্গুল দিয়ে বললেন, আমার কর্ণদ্বয় বধির হয়ে যাবে যদি এই বর্ণনা আমি নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনে না থাকি। (আহমাদ, বাইহাকী- শুয়াবুল ঈমান)
قال رسول الله ﷺ : يأتى على الناس زمان لا يبالى المرء ما أخذ منه أمن الحلال ام من الحرام» . (صحیح بخاری)
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষের সামনে এমন এক যুগ আসবে যে, কেউই পরোয়া করবে না- কি উপায়ে মাল উপার্জন করছে। হারাম উপায়ে না হালাল উপায়ে। (সহীহ বুখারী)
ঈমান ছাড়া কেউ মুসলমান হতে পারে না। ঈমান এনে মুসলমান হলেই তার উপর নামায, রোযা, হাজ্জ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদত ফরয হয়ে যায়। কিন্তু এ সকল ইবাদত কবুল হবার জন্যও পূর্বশর্ত রয়েছে। আর তা হলো হালাল উপার্জন। যার উপার্জন হালাল নয় তার নামায, রোযা, হাজ্জ এসবের কিছুই কবুল হবে না। এজন্যই আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদে এবং বিশ্বনাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসের মাধ্যমে হারাম ভক্ষণ ও উপার্জন কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। পাশাপাশি হালাল উপার্জন অন্বেষণ প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরয করে দিয়েছেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ঈমান আনার পরে অন্যান্য ফরয আদায়ের আগেই হালাল উপার্জন তথা হালাল খাদ্য খাওয়া, হালাল পোষাক পরিধান করা, হালাল গৃহে বসবাস করা ইত্যাদি ফরয।
কেউ যদি হারাম খাদ্য ভক্ষণ করে তবে তা দ্বারা শরীর প্রতিপালন করা সম্ভব বটে; কিন্তু আখিরাতে এর পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। হারাম ভক্ষণকারীর রক্তমাংস সবই হারামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তাই সে দেহ বেহেশতে প্রবেশ করার অধিকার হারায়। যে ব্যক্তির আয় হারাম তার সন্তানের শরীর বর্ধিত হয় হারাম দ্বারা এবং তার নিজের ও তার স্ত্রীর শরীর গড়ে উঠে হারাম দ্বারা। তাহলে এরূপ হারাম দ্বারা বর্ধিত ও সংরক্ষিত দেহ কিভাবে বেহেশতে প্রবেশ করতে পারে? এ কারণেই নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারাম পন্থায় উপার্জনকারীর উপর নির্ভরশীল পরিবারের অন্যদেরকেও তা ভক্ষণ করতে নিষেধ করেছেন।
সতর্কতার জন্য একটি বিষয় উল্লেখ করা একান্ত প্রয়োজন। তা হলো পুরুষের রেশমী কাপড় ও স্বর্ণ ব্যবহার। সমাজে বিশেষ করে যুবক শ্রেণীর মাঝে স্বর্ণের চেইন, আংটি, ব্রেসলেট ব্যবহার ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেগুলো পরিধান করে অনেককে নামায আদায় করতে দেখা যাচ্ছে অথচ তা সম্পূর্ণ হারাম। যেখানে হারাম উপার্জিত পোষাক পরিধান করলে ইবাদত হয় না সেখানে আরেকটি প্রকাশ্য হারামকে পরিধান করে নামাযের মত পবিত্র ইবাদতকে কিভাবে স্বার্থক রূপদান করা যায়? তাই এরূপ আচরণ পরিহার একান্তই জরুরী। কেননা একটি হারামকে সাথে নিয়ে আরেকটি হালাল সফল করার চেষ্টা বোকামির পরিচয়।
উল্লেখ্য যে সকল দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি সেখানে সুদ ভিত্তি ব্যাংকিং ও ব্যবসা-বাণিজ্য সরকারীভাবেই চালু রয়েছে বিধায় বসবাসরত প্রতিটি মুসলমান কম বেশী সুদের সাথে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য। এমতাবস্থায় এর কুফল হতে পরিত্রাণের জন্য করণীয় হলো-
(ক) আল্লাহদ্রোহী সকল কুফরী শক্তি হতে নিজেদের সমর্থন উঠিয়ে নেয়া।
(খ) যথাসম্ভব হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা এবং হারাম থেকে দূরে থাকা।
(গ) ইসলামী আইন বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা, যাতে হারামের সকল পথই বন্ধ হয়ে যায়।
(ঘ) আল্লাহ তা'আলা যেন এই অনিচ্ছাকৃত হারামের কারণে ইবাদতকে বরবাদ করে না দেন সেজন্য আল্লাহর কাছে মিনতি করা ও বার বার ক্ষমা চাওয়া।
(ঙ) সর্বাবস্থায় আল্লাহর সাহায্য কামনা করা, যাতে পরিবেশ অনুকূলে এসে যায়।
যারা উপরোক্ত কাজগুলো না করে সুদ ও অন্যান্য হারামের পৃষ্ঠপোষকদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখবে, নিজেকে দায়িত্বমুক্ত ভেবে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে অর্থাৎ এসব হারাম তাকে বিচলিত করছে না এমন ব্যক্তির ইবাদত কবুল হবার কথা নয়। নিঃসন্দেহে সে আল্লাহর কাছে ধরা পড়ে যাবে। কারণ সে হারাম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন মনে করেনি এবং চেষ্টাও করেনি।

📘 যাদের ইবাদত কবুল হয় না > 📄 যে তার মুসলমান ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে

📄 যে তার মুসলমান ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে


تفتح أبواب الجنة يوم الاثنين ويوم الخميس، فيغفر لكل عبد مسلم لا يشرك بالله شيأ ، إلا رجلا كانت وبينه وبين اخيه شحناء، فيقال : انظروا هذين حتى يصطلحا ، انظروا هذين حتى يصطلحا »
(صحیح مسلم، مالك الموطا، أحمد، ترمزى وقال حديث حسن صحيح)
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সোমবার ও বৃহস্পতিবার বেহেশতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। যেসব অপরাধী আল্লাহর সাথে শির্ক করেনি তাদেরকে ক্ষমা করা হয়। কিন্তু পরস্পর সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি সম্পর্কে (আল্লাহ বলেন): এদেরকে ফিরিয়ে দাও যতক্ষণ না এরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করে। (মুসলিম, মুয়াত্তা মালিক, আহমাদ, তিরমিযী; ইমাম তিরমিযী একে হাসান ও সহীহ বলেছেন)
ان اعمل بني آدم تعرض كل خميس ليلة الجمعة فلا يقبل عمل قاطع رحم». (احمد، والبخاري في الادب المفرد، وطبرانی، قال الباني إسناده ضعیف)
নিশ্চয় আদম সন্তানের 'আমল প্রতি বৃহস্পতিবারে জুমু'আর রাতে উঠিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু আত্মীয়তার সম্পর্ককারীর 'আমল কবুল করা হয় না। (বুখারী- আদাবুল মুফরাদ, তাবারানী)
অপর এক বর্ণনায় রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোন মুসলমানের জন্যই নিজের ভাইকে তিনদিনের বেশি পরিত্যাগ করে থাকা হালাল নয়। (আবু দাউদ- আলবানী একে সহীহ বলেছেন)
তবে কেউ যদি ঈমান রক্ষার জন্য কারো সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তবে তা গুনাহ হবে না। কেননা রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঈমানের প্রকৃত স্বাদ সেই পাবে যে আল্লাহর জন্যই কাউকে ভালবাসে এবং সম্পর্ক ছিন্ন করে। (সহীহ বুখারী, মুসলিম, মিশকাত)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি কাউকে আল্লাহর উদ্দেশে ভালবাসে, আল্লাহর উদ্দেশেই ঘৃণা করে, আল্লাহর উদ্দেশে বন্ধুত্ব স্থাপন করে, আল্লাহর জন্য শত্রুতা করে- সে ব্যক্তি এ বৈশিষ্ট্যের দ্বারা নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুত্ব লাভ করবে। তার এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া ছাড়া নামায রোযার পরিমাণ যত বেশিই হোক না কেন কোন বান্দাই ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না। (ইবনু জারীর)

📘 যাদের ইবাদত কবুল হয় না > 📄 জাহিলিয়্যাতের দিকে আহ্বানকারী

📄 জাহিলিয়্যাতের দিকে আহ্বানকারী


من دعا بدعوى الجاهلية فهو من جثى جهنم، قيل : يارسول الله ﷺ ! وان صام وصلى قال : وإن صام وصلى وزعم انه مسلم»
(احمد، الحاكم)
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষকে জাহিলিয়্যাতের দিকে আহ্বান করে সে জাহান্নামী। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম! নামায কায়েম ও সওম পালন করা সত্ত্বেও? উত্তরে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নামায কায়েم ও সওম পালন এমনকি নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করলেও সে জাহান্নামী। (আহমাদ, হাকিম)
কুরআন-সুন্নাহর পথ পরিহার করে যারা অন্যান্য পথ বা মতকে গ্রহণের জন্য জনগণকে আহ্বান জানায় তাদেরকে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহান্নামী বলেছেন। অথচ সে ব্যক্তি নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং নিজেকে সে একজন খাঁটি মু'মিন বলে মনে করে। নামায, রোযা এমন ইবাদত যার মাধ্যমে জান্নাত লাভ করা যায় অথচ রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সে জাহান্নামী। তাই এ হাদীসকে কেন্দ্র করে অনেকের মত হলো জাহিলিয়াতের পথে আহ্বান করার কারণে সে বড় ধরনের কুফরী করেছে ফলে তার ঐ নামায, রোযা আল্লাহর নিকট কবুল হয়নি তাই তাকে জাহান্নামী বলা হয়েছে। আবার কারো মতে তার ইবাদত কবুল হবে না, এটা নিশ্চিত বলা যাবে না। আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবার পর জান্নাতে ফিরিয়ে দিতে পারেন।
কেউ আবার এ মতও পোষণ করেছেন যে, জাহিলিয়াতের দিকে আহ্বান করার কারণে সে ব্যক্তি শির্ক ও কুফর এ দু'টি গুনাহে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে তার 'আমল বিনষ্ট হবারই কথা। কেননা মহান আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
أَفَحُكُمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ تُوْقِنُونَ
"তোমরা কি জাহিলিয়াতের শাসন ব্যবস্থা কামনা কর? দৃঢ় বিশ্বাসীদের নিকট আল্লাহর চেয়ে শাসনকার্যে কে উত্তম হবে?" (সূরা আল-মায়িদা ৫০)
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَسِرِينَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি তাদের অনুসরণ কর যারা কুফরী করেছে তবে তারা তোমাদেরকে জাহিলিয়াতের দিকে ফিরিয়ে দিবে, তাতে তোমরা ক্ষতির সম্মুখীন হবে।" (সূরা আল-ইমরান ১৪৯)
আর ক্ষতির সম্মুখীন হবার অর্থই হলো 'আমল বরবাদ হয়ে যাওয়া।

📘 যাদের ইবাদত কবুল হয় না > 📄 যে বিচারক আল্লাহর বিধান মত ফয়সালা করে না

📄 যে বিচারক আল্লাহর বিধান মত ফয়সালা করে না


عن النبي ﷺ قال : «لا يقبل الله صلاة إمام حكم بغير ما أنزل الله» (الحاكم - وقال الحاكم في المستدرك - هذا حديث صحيح الإسناد، وقال الذهبي سنده مظلم)
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে বিচারক আল্লাহর নাযিলকৃত ব্যবস্থা মত ফায়সালা করবে না আল্লাহ তার নামায কবুল করবেন না। (মুস্তাদরাকে হাকীম, তিনি বলেছেন হাদীসের সনদ সহীহ)
দেশ ও সমাজের বুক থেকে যাবতীয় ফিতনা, সন্ত্রাস, অনাচার দূর করে নাগরিকদের অধিকার রক্ষা ও শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইনসাফ ভিত্তিক আইন, নিরপেক্ষ সাহসী ঈমানদার বিচারক ও বিচার ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। যে দেশে যে সমাজে ইনসাফ ভিত্তিক আইন ও নিরপেক্ষ, সাহসী ও ন্যায়পরায়ণ বিচারক নেই সেখানে অশান্তি ছাড়া কিছুই পাওয়া সম্ভব নয়। একজন বিচারকের রায়ের উপর সমাজের শান্তি বা অশান্তি বহুলাংশে নির্ভর করে। তাই বলা যায়, একজন বিচারকের দায়িত্ব কোন ছোটখাট দায়িত্ব নয়, এ দায়িত্ব অনেক বড় ও কঠিন। সবাই যেমন বিচারক হবার যোগ্যতা রাখে না, আবার সব বিচারক ইনসাফ কায়েম করতে পারে না।
উপরোক্ত হাদীস এই বিচারক সম্পর্কেই বর্ণিত হয়েছে যাতে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে বিচারক আল্লাহর বিধান মোতাবেক বিচার ফায়সালা করে না তার নামায কবুল হয় না। এতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, এ হাদীস মুসলমান বিচারকদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। বিচারক সম্পর্কিত বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্য একটি হাদীসে। তা হলো- রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বিচারক তিন প্রকার: এক প্রকার জান্নাতী আর দু'প্রকার জাহান্নামী। (১) যে বিচারক হক্বের জ্ঞান সম্পন্ন এবং তাঁর জ্ঞানানরূপ ফায়সালা করে- সে জান্নাতী। (২) যে বিচারক হক্বের জ্ঞান রাখে কিন্তু জেনে শুনে অন্যায় ফায়সালা করে- সে জাহান্নামী। (৩) যে বিচারক হক্বের জ্ঞান রাখে না, অজ্ঞভাবে ফায়সালা করে- সে জাহান্নামী। (তিরমিযী, হাকিম)
তাহলে বুঝা গেল, বিচারকের অন্যায় রায় শুধু তাঁর নামাযকেই নষ্ট করে না বরং এ রায় তার জন্য জাহান্নামের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় এ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা তুলে ধরা দরকার।
১। হাদীসে জান্নাতী বিচারকের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে দু'টি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে। (ক) বিচারক অবশ্যই হজ্বের জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি হবে এবং (খ) সে হক্বের জ্ঞানানুসারেই বিচার ফায়সালা করবে। প্রশ্ন হতে পারে হজ্বের জ্ঞান কি? হক্বের জ্ঞান হচ্ছে মহান আল্লাহর ঐশী বিধানের জ্ঞান তথা কুরআনের বিধি বিধান যাকে আল্লাহ হকু বলে ঘোষণা করেছেন। সুতরাং দেশের ছোট বড় বিচারালয়ের বিচারকগণ, মহল্লার পঞ্চায়েত নেতৃবৃন্দ যদি আল্লাহ ও রসূলের বিধান মোতাবেক বিচার ফায়সালা করতে পারেন তাহলে তারা জান্নাতী বিচারক হিসেবে গণ্য হবেন।
২। জাহান্নামী বিচারকের প্রথম শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য হলো- (ক) হজ্বের জ্ঞান রাখবে (খ) কিন্তু সে হক্বের জ্ঞানানুসারে বিচার না করে জেনে শুনে অন্যায় ফায়সালা করবে। এরূপ বিচারকদের সংখ্যাই বর্তমানে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কোর্টে, আদালতে, পঞ্চায়েত ক্লাবে সবখানেই বিচার আচারে কুরআন-হাদীসকে উপেক্ষা করে নিজেদের মস্তিষ্ক প্রসূত কুফরী পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। সরকারী বিচারালয়ের কথা বাদই দেয়া যাক, কেননা সেখানে টাকার মাধ্যমে অথবা ক্ষমতাধর ব্যক্তির প্রভাবে প্রায়ই কুখ্যাত খুনী, সন্ত্রাসীরাও ছাড়া পেয়ে যায়। তাছাড়া দেশের প্রতিটি মহল্লায় বা সমাজে প্রতিষ্ঠিত পঞ্চায়েত এর অবস্থাটাই লক্ষ্য করা যাক না। সেখানে এমন ঘটনা ঘটতে হয়তো অনেকে দেখে থাকবেন যে, সেখানে যদি এমন কোন ব্যক্তি অপরাধী হয় যিনি সমাজের একজন ধনী বা প্রভাবশালী ব্যক্তি, বা তিনি বিচার ব্যবস্থাপনা কমিটির কোন সদস্য বা সদস্যের সন্তান বা কোন আত্মীয় হন তাহলে সে অপরাধীবিচারকের চোখে আর অপরাধী হয়ে ধরে পড়ে না। এ ক্ষেত্রে বিচারক হয় অপরাধীর পক্ষে রায় দিবেন অথবা যিনি মজলুম বা বিচার প্রার্থী তাকে অভিযোগ পেশ করার তেমন সুযোগ দেবেন না বা মজলুমকে ঘুরিয়ে পেচিয়ে কিছু বলে ব্যাপারটাকে অন্যদিকে নিয়ে ইনসাফ কায়েম করা হতে পাশ কেটে যাবেন। এরূপ ঘটনা বহু জায়গায় প্রায় ঘটে থাকে। অথচ বিচারক হিসেবে নামায কবুল না হওয়ার বিধানে এরাও শামিল।
এ ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে, যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে কুফরী বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত সেখানে সামাজিক বিচারলয়ের বিচারকগণ কি করবেন? তাহলে এক্ষেত্রে বলা উচিত যে, সরকার এমনি এমনি নির্বাচিত হয় না বরং এজন্য প্রয়োজন হয় জনগণের সাহায্য ও সমর্থন। যারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে মুসলিম জনসাধারণের উপর কুফরী আইন চাপিয়ে দেয় আর তাদেরকেই ক্ষমতায় বসানোর জন্য যদি সাহায্য, সমর্থন করা হয় তাহলে এ কথা বলে আল্লাহকে রাযী করা কিরূপে সম্ভব। আর যদি সাহায্য সমর্থন না করা হয় তবে কুফরী আইনের পৃষ্ঠপোষক নয় বরং কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে ইসলামী শাসন কায়েমের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা একান্তই প্রয়োজন। নিশ্চয় আল্লাহ কারোর সাধ্যের বাইরে হিসাব নিবেন না। (প্রাসঙ্গিক বক্তব্য দেখুন ১৪-১৫ পৃষ্ঠার ৩ নং পয়েন্ট)
৩। জাহান্নামী বিচারকের দ্বিতীয় শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য হলো- (ক) হক্বের জ্ঞান রাখে না। (খ) এবং অজ্ঞতাবশত বিচার ফায়সালা করে। এখানে প্রশ্ন জাগতে পারে যেহেতু সে কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান রাখে না তাই সে অজ্ঞতাবশত ফায়সালা দিয়েছে এ কারণে সে জাহান্নামী হবে কেন? তা এই কারণেই যে, তিনি কিছু না জেনে বিচারক হতে গেলেন কেন? যিনি হজ্বের জ্ঞান রাখেন এবং ইনসাফ কায়েম করতে সক্ষম তার হাতেই তো বিচারের ভার অর্পণ করা যেত। ইল্ল্মবিহীন তার এরূপ বিচারক হবার সাধ সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিতে যথেষ্ট নয় কি? যা হোক এরূপ বিচারক হবার সাধ যেন কারো না জাগে তাই রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবধান করে দিয়েছেন। কেননা এতে কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই ডেকে আনবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00