📄 তাকওয়া বিহীন উৎসর্গ
لَنْ تَنَالَ اللهُ لِحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ
“(কুরবানীর) পশুর গোস্ত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তার কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া।” (সূরা হাজ্জ ৩৭)
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتَقْبَلَ مِن أَحَدِهِمَا وَلَمْ يتَقَبَّلْ مِنَ الْآخِرِ قَالَ لَا قَتَلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ
“আর হে নবী! তাদেরকে আদম (আঃ)-এর দুই পুত্রের কাহিনীটিও পুরোপুরি শুনিয়ে দাও। তারা দু'জনেই কুরবানী করল, তখন তাদের মধ্যে একজনের কুরবানী কবুল করা হলো ও অপর জনের কবুল করা হলো না। সে বলল, আমি তোমাকে হত্যা করব। উত্তরে বলল, আল্লাহ তো মুত্তাকীদের মানৎই কবুল করে থাকেন।" (সূরা আল-মায়িদা ২৭)
আদম (আঃ)-এর দুই ছেলে হাবীল ও কাবীল উভয়ই কুরবানী করেছিল। কিন্তু হাবীলের কুরবানী কবুল করা হলো আর কাবীলেরটা কবুল করা হলো না। এর কারণ এটাই ছিল যে, হাবীলের কুরবানীর ভিত্তি ছিল তাকওয়া তথা আল্লাহ ভীতির উপর।
📄 গণক ও জ্যোতিষীর কাছে গমনকারী
من أتى عرافا أو كاهنا فصدقه بما يقول لن تقبل له صلاة أربعين يوما». (صحيح مسلم)
নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কতিপয় স্ত্রী হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে গণকের নিকট আসবে এবং সে যা বলল তা বিশ্বাস করবে, সে ব্যক্তির চল্লিশ দিনের নামায কবুল হবে না। (সহীহ মুসলিম)
من أتى عرافا أو كاهنا فصدقه بما يقول فقد برى بما أنزل الله على محمد». (أبو داود - صححه البانی)
আবূ হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি জ্যোতিষ বা গণকের নিকট আসবে এবং সে যা বলে তার কথায় বিশ্বাস করবে, সে মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি নাযিলকৃত দীন হতে মুক্ত, অর্থাৎ পথভ্রষ্ট হল। (আবূ দাউদ- আলবানী একে সহীহ বলেছেন)
যায়েদ বিন খালিদ জুহানী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদাইবিয়াতে আমাদের সঙ্গে নামায আদায় করেন। তখন রাত্রিতে কিছু বৃষ্টি হওয়ার চিহ্ন বাকী ছিল। নামায শেষে তিনি লোকদের বললেন: তোমরা কি জান, তোমাদের রব কি বলেছেন? সাহাবীগণ (রাঃ) বললেন, এ ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রসূলই অধিক জ্ঞাত। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ বলেছেন- ফজরের সময় আমার কিছু সংখ্যক বান্দা মু'মিন এবং কিছু সংখ্যক কাফির হয়ে গেছে। যারা এরূপ বলেছে আমরা আল্লাহর রহমত ও বরকতে পানি পেয়েছি তারা তো আমার প্রতি বিশ্বাসী এবং (আকাশের) তারার প্রতি অবিশ্বাসী আর যারা বলেছে অমুক অমুক তারার প্রভাবে বৃষ্টি হয়েছে তারা আমার অস্বীকারকারী এবং তারার প্রতি বিশ্বাসী। [বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, আলবানী ও হাকিম (রহঃ) এটিকে সহীহ বলেছেন]
মুসলমানদের ঈমান ধ্বংসের যত পথ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে গণক ও জ্যোতিষী গোষ্ঠীর ভেলকীবাজী অন্যতম। মানব সম্প্রদায়ের মাঝে এরা সেই গোষ্ঠী যারা তাদের কথা ও কর্ম দ্বারা আল্লাহর তাওহীদকে অস্বীকার করেছে এবং আল্লাহর বাণী উপেক্ষা করে নিজেদেরকে গায়িব জানলে ওয়ালা দাবী করে প্রকৃতপক্ষে নিজেদেরকে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করেছে। অথচ তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেই জ্ঞাত নয়। এরা মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার জন্য বিভিন্ন কুটকৌশল অবলম্বন করে থাকে। কেউ বা দুষ্ট জীনদের সাহায্যে কারামত প্রদর্শনের নামে ভেলকীবাজী করে সর্বসাধারণকে নিজের দিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে থাকে। আবার কেউ বা শয়তানের দ্বারা কাজ হাতিয়ে নিতে শয়তানের পূজাও করে থাকে। আশ্চর্য বিষয় হলো এ যুগে বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন বেশে এদের সংখ্যা ও প্রচারণা ক্রমশঃই বৃদ্ধি পাচ্ছে। দৈনিক পত্রিকা আর ম্যাগাজিন খুললেই দেখা যায় ঐসব ভণ্ডদের বিজ্ঞাপন শিরোনাম- অমুক শর্প রাজের চ্যালেঞ্জ, অমুক আধ্যাত্মিক সাধকের আমন্ত্রণ, অমুক হুজুরের তদবিরে ভাগ্য ফিরে, অমুক রূহানী হুজুরের- আল্লাহর দান মুশকিলে আসান, অমুক হুজরের তদবিরে সুখে আছি, অমুক বোগদাদী'র বিশ্বাসে মুক্তি মেলে ইত্যাদি। ঈমান বিনষ্টের লক্ষ্যে এই ভণ্ডামীর পথ থেকে মহিলারাও পিছে নাই। তারাও বিজ্ঞাপন শিরোনাম দিয়েছে অমুক বেগমের আমন্ত্রণ, অমুক খানমের চ্যালেঞ্জ, অমুক হুজুর কন্যার লিখিত চুক্তি শান্তি মুক্তি, অমুক কেবলা বিবি, দরগা বিবি ইত্যাদি আর কত কি! এদের বেশির ভাগই আবার ধর্মের লেবাসধারী। কেননা, এই বেশে প্রতারিত করা তুলনামূলক সহজ বটে। তারা নিজেদেরকে যা কিছু করার ক্ষমতাবান বলে দাবী করেছে তাহলো- সন্তানহীনাকে সন্তানদান, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি দান, জীবনে যাবতীয় বিপদ থেকে স্থায়ী রক্ষা, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের সংবাদ প্রদান, পরীক্ষা সহ যে কোন কাজে সফল হবার নিশ্চয়তা, যত কঠিন বিপদ বা সমস্যাই হোক না কেন তা দূরিকরণের ১০০% গ্যারান্টি প্রদান (নাউযুবিল্লাহ) আরো কত কি!
আবার কেউ বা রাস্তার পাশে বসে পাখি দিয়ে চিঠি উঠিয়ে বা হস্ত রেখা দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করছে। কেউ বা আবার জ্যোতিষীর বেশে কিয়ামত সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলছে- অমুক মাসের অমুক তারিখে কিয়ামত হবে। কেউ কেউ তো সিংহ, তুলা, কন্যা, মেষ ইত্যাদি আজগুবী রাশি আবিষ্কার করে প্রত্যেহের ভাল-মন্দের ভবিষ্যদ্বাণী করে যাচ্ছে। আর দৈনিক পত্রিকা ও ম্যাগাজিনগুলোও তা দিব্বি প্রচার করে চলেছে। আসল কথা হলো ঐ ভণ্ডদের প্রত্যেকেই আল্লাহর কালামের কুফরকারী মানবরূপী শয়তানের দল। যারা আল্লাহর কোন গুণে নিজেকে গুণান্বিত বলে দাবী করে তারা निःসন্দেহে কাফির। তাই এ বিষয়ে নিজে সতর্ক থাকা এবং অপরকে সতর্ক করা প্রতিটি মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। (প্রাসঙ্গিক দেখুন ১৬ পৃষ্ঠা)
অতএব রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী অনুযায়ী যে বা যারাই ঐ লোকদের নিকট যাবে তাদের চল্লিশ দিনের নামায কবুল হবে না। উপরন্তু তাদের কথা বিশ্বাস করায় উক্ত ব্যক্তি আল্লাহর দীন হতে খারিজ হয়ে যাবে।
📄 মদ্যপায়ী
قال عبد الله بن عمر قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : « من شرب الخمر لم يقبل الله له صلاة أربعين صباحا ، فإن تاب تاب الله عليه فإن عاد لم يقبل الله له صلاة أربعين صباحا ، فإن تاب تاب الله عليه، فإن عاد لم يقبل الله له صلاة أربعين صباحا ، فإن تاب تاب الله عليه فإن عاد الرابعة لم يقبل له صلاة أربعين صباحا ، فان تاب لم يتب الله عليه وسقاه من نهر الخبال قيل يا ابا عبد الرحمن وما نهر الخبال ؟ قال : نهر من صديد أهل النار » . (رواه الترمزي وحسنه)
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মদপান করে তার চল্লিশ দিনের নামায কবুল হয় না। যদি সে তাওবাহ করে তবে আল্লাহ তার তাওবাহ কবুল করেন। যদি সে পুনরায় মদপান করে তবে আল্লাহ তার চল্লিশ দিনের নামায কবুল করেন না। যদি সে তাওবাহ করে তবে আল্লাহ তার তাওবাহ কবول করেন। যদি সে পুনরায় মদপানে লিপ্ত হয় তবে আল্লাহ তার চল্লিশ দিন নামায কবুল করেন না। যদি সে তাওবাহ করে আল্লাহ তার তাওবাহ কবুল করেন। সে যদি চতুর্থবার মদপানে লিপ্ত হয় তবে আল্লাহ তার চল্লিশ দিনের নামায কবুল করেন না এবং সে যদি তাওবাহ করে আল্লাহ কখনো তার তাওবাহ কবুল করেন না এবং তাকে 'নাহরুল খাবাল' থেকে পান করাবেন। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আব্দুর রহমান (ইবনু উমার)। নাহুরুল খাবাল বা খাবাল নামক ঝর্ণা কি? তিনি বলেন, দোযখীদের পুঁজের নহর। (তিরমিযী, ইমাম তিরমিযী এটিকে হাসান বলেছেন)
أن النبي ﷺ يقول : «لا يشرب الخمر رجل من أمتي فيقبل له صلاة أربعين صباحا ». (صحيح ابن خزيمة، الحاكم، النسائ استاده صحيح ... )
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মাতের মধ্যে যে ব্যক্তি মদ্যপান করবে, তার চল্লিশ দিনের নামায কবুল হবে না। (সহীহ ইবনু খুযাইমাহ, হাকিম, নাসাঈ- আলবানী বলেছেন, এর সনদ মুসলিমের শর্তে সহীহ; হাকিম বলেছেন, এটি বুখারী ও মুসলিমের শর্তে সহীহ; ইমাম যাহাবী'র মতও তাই)
হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে মদ্যপায়ীর চল্লিশ দিনের ইবাদত কবুল হয় না যদি না সে একনিষ্ঠভাবে তাওবাহ করে ফিরে আসে। কেউ কেউ বলেছেন, মদ্যপায়ী যদি তাওবাহ না করে বা এমন কাজ করলে তাওবাহ করতে হয় এটা সে না জানে এমতাবস্থায় সে নামায আদায় করলে তার ফরযিয়াত আদায় হয়ে যাবে তবে সে নামাযের ফযীলত ও সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। কিন্তু আহলে জাহির বা যারা কুরআন-সুন্নাহ এর প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করেন তারা বলেন, রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু কবুল না হবার কথা বলেছেন তাই তার নামায কবুল হবে না। এখানে উল্লেখ্য যে, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেকটি নেশা জাতীয় দ্রব্যকে মদ বলেছেন। তাই হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা, আফীম, হুইসকি ইত্যাদি সেবী এদের কারোই চল্লিশ দিন পর্যন্ত নামায কবুল হবে না। যদি না তারা তাওবাহ করে উক্ত নেশা জাতীয় দ্রব্য পরিত্যাগ করে।
📄 অপবিত্রাবস্থায় ইবাদত
عن ابن عمر عن النبي ﷺ قال : « لا تقبل صلاة بغير طهور » .
(سنن اربعة ومسلم - صحيح الباني)
ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পবিত্রতা ছাড়া নামায কবুল হয় না। (তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মুসলিম- আলবানী একে সহীহ বলেছেন)
قال رسول الله ﷺ : « لا تقبل صلاة من أحدث حتى يتوضأ » .
(صحیح بخاری، صحیح مسلم)
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের কারো নামায কবুল করবেন না যতক্ষণ না তোমরা অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জন কর। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
বান্দা আল্লাহর সাথে কথা বলার জন্য দণ্ডায়মান হবে অপবিত্রাবস্থায় তা আল্লাহ কখনোই চান না। তাই নামাযের পূর্বে পবিত্র হয়ে নেয়াকে ফরয ও পূর্ব শর্ত করা হয়েছে। এমতাবস্থায় কেউ যদি অপবিত্র অবস্থায় নামায আদায় করে তবে তার নামায কবুল হবে না।