📄 মুনাফিকের জানাযা
سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ اِسْتَغْفَرْتُ لَهُمْ أَمْ لَمْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ لَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ
“(হে রসূল) তুমি তাদের (মুনাফিকদের) জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর বা না কর উভয়ই সমান। আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন না। (অর্থাৎ তাদের ব্যাপারে তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর হবে না)।" (সূরা মুনাফিকুন ৬)
إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللهُ لَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَسِقِينَ
"যদি তুমি তাদের জন্য সত্তরবারও ক্ষমা প্রার্থনা কর তবুও কখনোই আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। তা এজন্য যে, তারা আল্লাহ ও রসূলের সাথে কুফরী করেছে। বস্তুত আল্লাহ না-ফরমানদের পথ দেখান না।” (সূরা আত-তাওবাহ ৮০)
وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَا تُوْا وَهُمْ فَسِقُوْنَ
"তাদের মধ্য হতে কেউ মারা গেলে কখনো তাদের জানাযা পড়বে না এবং তাদের কবর যিয়ারতও করবে না। কেননা এই লোকেরাই তো আল্লাহ ও রসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং ফাসিক হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।” (সূরা আত-তাওবাহ ৮৪)
অত্র আয়াতের শানে নুযূল বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনু উমার (রাঃ) বলেন-
لما توفي عبد الله بن أبي جاء ابنه عبد الله بن عبد الله إلى رسول الله ﷺ فأعطاه قميصه وأمره أن يكفنه فيه. ثم قام يصلى عليه فأخذ عمر بن الخطاب بثوبه فقال : تصلى عليه وهو منافق وقد نهاك الله ان تستغفر لهم ؟ قال : انما خيرني الله أو اخبرني الله فقال : «استغفر لهم او لا تستغفر لهم سبعين مرة فلن يغفر الله لهم» فقال : سأزيده على سبعين . قال : فصلى عليه وسول الله ﷺ وصلينا معه ثم أنزل الله عليه ولا تصلى على أحد منهم مات أبدا ولا تقم على قبره إنهم كفروا بالله ورسوله وماتوا وهم فاسقون. (صحیح بخاری)
(মুনাফিক নেতা) আব্দুল্লাহ ইবনু 'উবাই মারা গেলে তার পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দুল্লাহ রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে তার পিতার কাফন হিসেবে ব্যবহারের জন্য রসূলের নিকট তাঁর জামাটি দেবার আবেদন জানালে নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামাটি দিয়ে দিলেন। পুনরায় সে পিতার জানাযার নামায পড়ার জন্য রসূলের নিকট আবেদন জানালে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার নামায আদায়ের জন্য উঠতে চাইলেন। এমনি সময় উমার (রাঃ) রসূলের কাপড় টেনে ধরে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি তার জানাযার নামায আদায় করতে এবং তার জন্য দু'আ করতে চাইছেন, অথচ আপনার প্রতিপালক তো তা করতে নিষেধ করেছেন। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ ব্যাপারে আল্লাহ আমাকে এখতিয়ার দিয়েছেন। আর আল্লাহ তো বলেছেন, “তুমি তাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ কর বা না কর, যদি সত্তরবারও তাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ কর তবুও আমি তাদেরকে ক্ষমা করব না।” সুতরাং আমি সত্তরবারের চেয়েও বেশি মাগফিরাত কামনা করব। উমার (রাঃ) বললেন, সে তো মুনাফিক। (যা হোক) রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ পর্যন্ত তার জানাযার নামায আদায় করলেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তা'আলাও এই আয়াত নাযিল করে রসূলকে জানিয়ে দিলেন যে, তাদের কেউ মারা গেলে আপনি কখনো তাদের জানাযার নামায আদায় না এবং তাদের কবরের পাশেও দাঁড়াবেন না। নিশ্চয়ই তারা আল্লাহ ও রসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং ফাসিক হয়েই মারা গেছে। (সহীহ বুখারী)
মুসনাদে আহমাদেও হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে, সেখানে এও বর্ণনা করা হয়েছে,
فما صلى رسول الله بعده على منافق ولا قام على قبره حتى قبضه الله عز وجل » . (احمد - مسند عمر بن الخطاب)
এরপর থেকে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু পর্যন্ত আর কোন মুনাফিকের জানাযা পড়েননি এবং কবর যিয়ারতও করেননি।
এতে বুঝা গেল যে, মুনাফিকের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং রসূলে আকরাম সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দু'আ কবুল করেননি। সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ (রহঃ) বলেন, মুনাফিকদের জানাযা না পড়া ও তাদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দু'আ করার প্রতি নিষেধাজ্ঞার কারণ এটাই ছিল যে, দীন প্রতিষ্ঠায় জিহাদের ডাক পাওয়া সত্ত্বেও তারা তাতে সাড়া দেয়নি। দুনিয়ার লোভ-লালসা চরিতার্থ করা ও ভোগ বিলাসে মেতে থাকার জন্য জিহাদে না গিয়ে তারা শুধু আল্লাহর হুকুম অমান্যই করেনি বরং অবজ্ঞা করার মাধ্যমে কুফরীও করেছে। এছাড়া তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কবুল না হওয়ার পেছনে এটাও কারণ ছিল যে, তারা আল্লাহর কোন কোন বিধান এবং মু'মিন বান্দাদের সম্পর্কে ঠাট্টা বিদ্রূপ করত। সুতরাং মুসলিম জামা'আতকে ঐরূপ লোকদের সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে। তাদেরকে কোনরূপ সামাজিক সম্মান বা মূল্যায়ন করা হতে বিরত থাকতে হবে।
অতএব মুসলমান পরিচয় বহনকারী কোন ব্যক্তি যদি জেনে শুনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বা দীন প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ না করে (শর'য়ী ওজর ব্যতীত) এবং ইসলামী আদর্শের অনুসারী আল্লাহর অনুগত বান্দাদেরকে বিদ্রূপ করে তবে সে ঐরূপ অবস্থায় মারা গেলে তার জানাযা পড়া মোটেই সঠিক হবে না।
📄 বিদ'আতী
فمن أحدث فيها حدثا فعليه لعنة الله والملائكة والناس أجمعين، لا يقبل الله منه صرفا ولا عدلا ». (صحیح بخاری، مسلم)
যে কেউ এ দীনের মধ্যে নতুন কিছু সৃষ্টি করবে তার উপর আল্লাহ ও ফেরেশতা এবং সমগ্র মানবকূলের অভিশাপ বর্ষিত হোক। তার কোন ফরয বা নফল ইবাদত কবুল হবে না। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বিদ'আতী যতক্ষণ পর্যন্ত বিদ'আত পরিত্যাগ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তার কোন প্রকার তাওবাহই কবুল করবেন না। (তারগীব আত্তারহীব, হাদীস হাসান)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلَا تَبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর রসূলের। আর (এরূপ না করে) তোমাদের 'আমলকে নষ্ট করো না।" (সূরা মুহাম্মাদ ৩৩)
'আমল কবুলের জন্য যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা অপরিহার্য তেমনি রসূলের যথাযথ অনুসরণ আবশ্যক। রসূলের দেখানো পদ্ধতি পরিত্যাগ করে অন্য কোন পদ্ধতিতে ইবাদত করলে তা গৃহীত হবে না। কুরআন-সুন্নাহতে নেই এমন কিছু সাওয়াবের উদ্দেশে ইবাদতের নামে চালু করাই হলো বিদ'আত এবং উক্ত 'আমল সম্পাদনকারী বিদ'আতী। যে কেউ বিদ'আত করলে তার সকল সৎকর্মই বাতিল বলে গণ্য হবে।
📄 যে বিদ'আতীকে আশ্রয় দেয়
আলী (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যারা বিদ'আতীকে আশ্রয় দেবে তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক, বর্ষিত হোক সকল ফেরেশতা ও মানবকূলের অভিশাপ। তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত আল্লাহ কবুল করবেন না। (বুখারী ও মুসলিম)
আল্লাহ যাকে অপছন্দ করেন, রসূলুল্লাহ যাকে ইসলাম হতে খারিজ বলে ঘোষণা দেন, ফেরেশতামণ্ডলী যাকে অভিসম্পাত করেন, সে বিদ'আতীকে আশ্রয় প্রশ্রয় দানকারী কিভাবে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারে, হতে পারে নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয় উম্মত বা ফেরেশতামণ্ডলী কিভাবে তার জন্য দু'আ করতে পারে? বরং আল্লাহর লা'নত, ফেরেশতাকূলের লা'নতই তার উপযুক্ত প্রাপ্য। উপরন্তু নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের ধ্বংসকারী বিদ'আতীদেরকে যারা আশ্রয় প্রশ্রয় দেবে তাদের ইবাদত কবুল হবে না বলে সতর্ক করে দিয়েছেন।
📄 লোক দেখানোর উদ্দেশে ইবাদত
قال رسول الله ﷺ : «إن أخوف ما أخاف عليكم الشرك الأصغر ، قالوا يا رسول الله او ما الشرك الأصغر ؟ قال : الرياء». (أحمد، شرح السنة، بيهقى، وقال الباني : هذا اسناد جيد كما قال المنذري في الترغيب، ٣٤/١ - رجاله كلهم ثقات، سلسلة صحيحة ٩٥١)
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের জন্য যে বিষয়টিকে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা হলো ছোট শিরক। সাহাবাগণ (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ছোট শির্ক কি? উত্তরে রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রিয়া অর্থাৎ লোক দেখানো 'আমল। [আহমাদ, শরহে সুন্নাহ, বাইহাকী, আল্লামা আলবানী ও আল্লামা মুনযিরী (রহঃ) এর সনদকে উত্তম বলেছেন।
عن أبي سعيد أن رسول الله ﷺ قال : «الا أخبركم بما هو اخوف عليكم عندى من المسيح الدجال، قلنا بلى، قال الشرك الخفي يقوم الرجل فيزين صلاته لما يرى من نظر رجل». (أحمد)
আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয়ে সংবাদ দেবন না যে বিষয়টি মাসীহ দাজ্জালের চেয়েও ভয়ঙ্কর? সাহাবাগণ (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তা হচ্ছে গুপ্ত শিক্ক। (আর এর উদাহরণ হচ্ছে) একজন ব্যক্তি শুধু এজন্যই তার নামাযকে খুব সুন্দরভাবে আদায় করে যে, কোন মানুষ তার নামায লক্ষ্য করছে। (আহমাদ)
মানুষকে দেখানোর জন্য বা অন্য কোন উদ্দেশে কোন ইবাদত করা হলে তা আল্লাহর নিকট গৃহীত হয় না। আল্লাহর অন্তরের খবর জানেন। যা একনিষ্ঠভাবে তাঁর জন্য করা হয় তিনি তা-ই কবুল করেন। সে যেন কিয়ামতের দিন তিনি সর্বপ্রথম লোক দেখানোর উদ্দেশে ইবাদতকারীদের পাকড়াও করবেন। এ প্রসঙ্গে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে,
عن أبي هريرة قال : سمعت رسول الله ﷺ يقول : «ان اول الناس يقضى يوم القيامة عليه رجل استشهد فاتى به فعرفه نعمه فعر فها قال فما عملت فيها قال قاتلت فيك حتى استشهدت قال كذبت ولكنك قاتلت لان يقال جرئ فقد قيل ثم أمر به فسحب على وجهه حتى القي في النار، ورجل تعلم العلم ...... ثم القى في النار». (صحيح مسلم)
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম এমন ব্যক্তির বিচার করা হবে যিনি শহীদ হয়েছেন। তাকে আল্লাহর দরবারে হাজির করে তার প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত যাবতীয় নি'য়ামতের স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে সে ঐসব নি'য়ামত প্রাপ্তি ও ভোগের কথা স্বীকার করবে। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি আমার এসব নি'য়ামত পেয়ে কি করেছো? সে বলবে, আমি আপনার পথে লড়াই করতে করতে শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি বীর হিসেবে খ্যাতি অর্জনের জন্য লড়াই করেছো এবং তা তুমি দুনিয়াতেই পেয়েছো। অতঃপর তাকে উপুড় করে পা ধরে টেনে হেচড়ে দোযখে নিক্ষেপ করার হুকুম করা হবে এবং এভাবেই সে দোযখে নিক্ষিপ্ত হবে। এরপর আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে এমন এক ব্যক্তিকে যে দীনের জ্ঞান অর্জন করেছে, দীনের জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছে এবং আল-কুরআন পড়েছে। তাকে তার প্রতি প্রদত্ত নি'য়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে। সে ব্যক্তি এসব নি'য়ামত প্রাপ্তি ও ভোগের কথা স্বীকার করবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে এসব পাওয়ার পর তুমি কি করেছো? সে বলবে, আমি দীনের ইল্ম হাসিল করেছি, অপরকে তা শিক্ষা দিয়েছি এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন পড়েছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি তো আলিম (হাফিজ) খ্যাতি লাভের জন্য ইল্ল্ম অর্জন করেছো। তুমি ক্বারী রূপে খ্যাত হবার জন্য কুরআন পড়েছো এবং তা তুমি দুনিয়াতেই পেয়েছো। তারপর ফায়সালা দেয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে পা ধরে টেনে হেচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এরপর হাজির করা হবে এমন এক ব্যক্তিকে যাকে আল্লাহ স্বচ্ছলতা ও নানা রকম ধন-সম্পদ দান করেছেন। তাকে তার প্রতি প্রদত্ত নি'য়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে এবং সে তা স্বীকার করবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে এসব পেয়ে তুমি কি করেছো? সে বলবে, আমি আপনার পছন্দনীয় সব খাতেই আমার সম্পদ ব্যয় করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি তো দানশীল হিসেবে খ্যাতি অর্জনের জন্যই দান করেছো এবং সে খ্যাতি তুমি অর্জনও করেছো। তারপর ফায়সালা দেয়া হবে এবং তাকে পা ধরে টেনে হেচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহীহ মুসলিম)
আবূ হুরাইরা (রাঃ) কর্তৃক অনুরূপ হাদীস 'তিরমিযী' হাদীস গ্রন্থেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে এ কথা উল্লেখ করা হয় যে, উক্ত হাদীস বর্ণনার পূর্বে সাহনাবী আবূ হুরাইরা পর পর তিনবার চিৎকার করে বেহুস হয়ে যান। এছাড়াও তিরমিযীর হাদীসটিতে অতিরিক্তভাবে বলা হয় যে, আল্লাহ যখন বলবেন যে, তুমি মিথ্যা বলছো তখন ফেরেশতারাও তাঁর সাথে সাক্ষ্য দিবেন। সবশেষে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ হুরাইরার হাঁটুতে হাত রেখে বলেন, হে আবূ হুরাইরা! কিয়ামতের দিন আল্লাহর সৃষ্টির মধ্য থেকে এ তিনজন দ্বারাই প্রথমে জাহান্নামের আগুন প্রজ্বলিত করা হবে।
এক ব্যক্তি মু'আবিয়া (রাঃ)-এর কাছে আবূ হুরাইরা (রাঃ) সূত্রে উক্ত হাদীস বর্ণনা করলে মু'আবিয়া (রাঃ) বলেন, তাদের সাথে যদি এরূপ করা হয় তবে অন্য সব লোকের কি অবস্থা হবে? অতঃপর মুআবিয়া (রাঃ) খুব কাঁদতে লাগলেন। এমনকি উপস্থিত লোকেরা ধারণা করলেন যে, তিনি কাঁদতে কাঁদতে মারা যাবেন। ফলে তারা বলাবলি করতে লাগল যে, এই লোকটি আমাদের এখানে অনিষ্ট নিয়ে এসেছে (অর্থাৎ সে যদি এ হাদীস বর্ণনা না করত তবে এ দুর্ঘটনা ঘটত না) ইতোমধ্যে মু'আবিয়া (রাঃ) হুশ ফিরে পেলেন এবং তার চেহারা মুছলেন। অতঃপর বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রসূল সত্যই বলেছেন। এই বলে নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন:
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيُوةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيْهَا وهُم فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ * أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارَ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَطِلَّ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
“যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও এর সৌন্দর্য কামনা করে, আমি তাদের কাজের পূর্ণফল দুনিয়াতে দিয়ে থাকি এবং তথায় তাদেরকে কম দেয়া হবে না। আর এরাই হলো সে সব লোক আখিরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া কিছু নেই। তারা দুনিয়াতে যা কিছু করেছিল সবই বরবাদ করেছে আর যা কিছু উপার্জন করেছিল সবই বিফল হয়েছে।” (সূরা হুদ ১৫-১৬)
অতএব বুঝা গেল, কোন ব্যক্তি যদি এই উদ্দেশে নামায আদায় করে যে লোক তাকে নামাযী বলবে বা এ উদ্দেশে হাজ্জ করে যে, লোকে তাকে হাজী বলে সম্বোধন করবে, সমাজে সে একটা বিশেষ স্থান লাভ করবে, মানুষ তাকে সম্মান করবে বা টাকা যেহেতু হয়েছে তাই হাজী সার্টিফিকেট নেয়া দরকার ইত্যাদি বা কেউ যদি এ উদ্দেশে সুন্দর করে বা সুর দিয়ে বক্তব্য দেয় যে, লোকে তাকে সুবক্তা বলবে বা এ উদ্দেশে লিখে যে, মানুষ তাকে লেখক বলবে বা এ উদ্দেশে থিসিস করে যে, সে ডঃ হিসেবে খ্যাত হবে ইত্যাদি তাহলে তার এ সমস্ত কর্ম আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ তার উদ্দেশ্যই দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ত।
আবূ হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসূল! এক লোক আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ইচ্ছা করেছে এবং সে জিহাদের মাধ্যমে দুনিয়ার সম্পদ গণিমতের মাল পেতে চায়। তখন রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে কোন সাওয়াবই পাবে না। ঐ লোক রসূলের কাছে কথাটি তিনবার পুনরাবৃত্তি করল, কিন্তু প্রত্যেকবারই রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, )لا أجزل( সে কোন সাওয়াব বা প্রতিদান পাবে না। (মুস্তাদরাক হাকীম, মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ- আলবানী একে হাসান বলেছেন)
আর যদি এমনটি হয় যে, আল্লাহর সন্তুষ্টিও চাই এবং সুনাম বা প্রসিদ্ধিও চাই। অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে অন্য আরেকটি উদ্দেশ্য রয়েছে। এক্ষেত্রে নিম্নের হাদীসটি লক্ষণীয়।
আবূ উমামা আল বাহিলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! এক ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সাওয়াব এবং মানুষের কাছে সুনাম অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেছে। তার কি প্রাপ্য? রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে কিছুই পাবে না। ঐ ব্যক্তি রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে প্রশ্নটি একাধারে তিনবার পুনরাবৃত্তি করলেন, আর রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবারই বললেন, সে কিছুই পাবে না। অতঃপর তিনি সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
«إن الله لا يقبل من العمل إلا ما كَانَ لَهُ خَالِصًا ، وابتغي به وجه »
আল্লাহ গাফুরুর রহীম কেবল সেই 'আমলই কবুল করেন যা একনিষ্ঠভাবে তাঁরই জন্য করা হয় এবং তার মাধ্যমে শুধু তাঁর সন্তুষ্টিই কামনা করে। (সুনানে নাসাঈ, সহীহ তারগীব, সহীহা ৫২, আলবানী একে হাসান সহীহ বলেছেন)
তবে হাঁ কেউ যদি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোন কিছু করে থাকে কিন্তু লোকে তার সুনাম করে বা এতে সে কোন উপকার লাভ করে তবে তাতে কোন ক্ষতির আশঙ্কা নেই। বরং বলা যায় এ প্রাপ্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে দুনিয়ার জীবনে তার জন্য নির্ধারিত নি'য়ামত বা উপহার স্বরূপ।
আবূ যার (রাঃ) রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, কোন লোক (আল্লাহর জন্যই) ভাল কাজ করে এবং লোকেরা তার প্রশংসা করে এ ব্যাপারে আপনার কি মত? রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা একজন মু'মিনের জন্য অগ্রিম সুসংবাদ। (সহীহ মুসলিম)
قُلْ إِنْ تُخْفُوا مَا فِي صُدُورِكُمْ أَوْ تُبْدُوهُ يَعْلَمُهُ اللهُ
আপনি বলে দিন, নিশ্চয়ই তোমরা যা মনের মধ্যে গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর তা আল্লাহ জানেন। (সূরা আল-ইমরান ২৯)
«إنما الاعمال بالنيات»
প্রত্যেক কাজের প্রতিদান তার নিয়ত অনুযায়ী হবে। (সহীহ বুখারী)