📄 'আমল বিনষ্ট হওয়ার ব্যাপারে মু'মিনের আশঙ্কা
আনাস বিন মালিক (রা) বর্ণনা করেন যখন এ আয়াত নাযিল হল, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠের উপর নিজেদের কণ্ঠ উঁচু করবে না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চৈঃস্বরে কথা বল তাঁর সাথে সেরূপ উচ্চৈঃস্বরে কথা বলবে না; এতে তোমাদের 'আমল বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে অথচ তোমরা টেরও পাবে না-” (সূরা হুজরাত ২)। এমতাবস্থায় (আয়াতটি নাযিল হলে) সাবিত (রাঃ) নিজের ঘরে বসে গেলেন এবং বলতে লাগলেন, আমি একজন জাহান্নামী এবং এরপর থেকে তিনি নাবী (সঃ)-এর কাছে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। একদিন নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা'দ ইবনু মু'আয (রাঃ)-কে সাবিত (রাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, হে আবূ 'আমর! সাবিতের কি হলো? সা'দ বললেন, সে তো আমার প্রতিবেশী, তার কোন অসুখ হয়েছে বলে তো জানি না। আনাস (রাঃ) বলেন, পরে সা'দ (রাঃ) সাবিতের কাছে গেলেন এবং তার সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বক্তব্য উল্লেখ করলেন। সাবিত (রাঃ) বলেন, এ আয়াত নাযিল হয়েছে। আর তোমরা জান যে, রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর আমার কণ্ঠস্বরই সবচেয়ে উঁচু হয়ে যায়। সুতরাং আমি তো জাহান্নামী। সা'দ রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে সাবিতের কথা বললেন। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, না বরং সে তো জান্নাতী।
(সহীহ মুসলিম- কিতাবুল ঈমান)
📄 কাফির ও মুরতাদের 'আমল
কাফিরদের 'আমল সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَعْمَالُهُمْ كَسَرَابٍ بِقِيعَةٍ تَحْسَبُهُ الظَّمْآنُ مَاءً حَتَّى إِذَا جَاءَهُ لَمْ يَجِدُهُ شَيْئًا وَوَجَدَ اللهُ عِنْدَهُ فَوَفَّهُ حِسَابَهُ وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ
“যারা কুফরী করেছে তাদের আমলের দৃষ্টান্ত যেমন শুষ্ক পানিহীন মরুভূমির বুকে মরিচিকা। পিপাসার্ত ব্যক্তি একেই পানি মনে করেছিল, যখন সেখানে পৌঁছালো তখন কিছুই পেলো না বরং সেখানে আল্লাহকেই বর্তমান পেল, যিনি তার পুরোপুরি হিসাব সম্পন্ন করে দিয়েছেন। আর আল্লাহর হিসাব নিতে দেরী হয় না।" (সূরা আন-নূর ৩৯)
وَمَنْ يَكْفُرْ بِالْإِيْمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ
"কেউ ঈমানের বিষয়কে অবিশ্বাস বা প্রত্যাখ্যান করলে তার কর্ম নিস্ফল হবে এবং পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।" (সূরা আল-মায়িদা ৫)
إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِآيَتِ اللهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّنَ بِغَيْرِ حَقٌّ وَيَقْتُلُونَ الَّذِينَ يَأْمُرُونَ بِالْقِسْطِ مِنَ النَّاسِ فَبَشِّرُهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ * أُولَئِكَ الَّذِينَ حَبِطَتْ أَعْمَالَهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَمَا لَهُمْ مِنْ تُصِرِينَ
"যারা আল্লাহর নির্দেশাবলীকে অস্বীকার করে এবং নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে এবং সেসব লোকদের হত্যা করে যারা ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দেয়। তাদেরকে বেদনাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন। এরাই হলো সে সকল লোক যাদের সমগ্র 'আমল দুনিয়া ও আখিরাত উভয় লোকেই বিনষ্ট হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে তাদের কোন সাহায্যকারীও নেই।" (সূরা আল-ইমরান ২১-২২)
وَالَّذِينَ كَفَرُوا فَتَعْسَالَهُمْ وَأَضَلَّ أَعْمَالَهُمْ * ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمُ
“আর যারা কাফির, তাদের জন্য রয়েছে দুর্গতি এবং তিনি তাদের কর্ম বিনষ্ট করে দিবেন। এটা এজন্য যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তারা তা পছন্দ করে না। অতএব, আল্লাহ তাদের 'আমলসমূহ ব্যর্থ করে দেবেন।" (সূরা মুহাম্মাদ ৮-৯)
ঈমান ছাড়া কেউ কোন ভাল কাজ করে কেউ হয়তো এই আশায় বিভোর থাকে যে, নিশ্চয় সে এর সুফল পাবে। কিন্তু ঈমান ব্যতীত এরূপ আশা যে ব্যর্থ বৈ কিছু নয় তা আল্লাহ তা'আলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। অতএব কাফির অবস্থায় থেকে বা কুফরী করে কোন ক্রমেই পরকালে কল্যাণ পাওয়া যাবে না। এমনিভাবে যারা ইসলাম গ্রহণের পর নিজেদের কথা বা কর্মের দ্বারা দীন ত্যাগ করেছে তাদের 'আমল প্রসঙ্গেও আল্লাহ বলেছেন-
وَمَنْ يَرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرُ فَأُولَئِكَ حَبِطَتُ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَة وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَلِدُونَ
"তোমাদের মধ্যে যে সব লোক নিজের দীন থেকে সরে যাবে আর দীনত্যাগী অবস্থায় মারা যাবে, দুনিয়ায় ও আখিরাতে তাদের সব নেক 'আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। তারা জাহান্নামবাসী এবং সেখানেই তারা চিরকাল থাকবে।” (সূরা আল-বাকারা ২১৭)
عن عائشة قالت قلت يارسول الله إبن جدعان كان في الجاهيلة يصل الرحم ويطعم المسكين فهل ذاك نافعه قال « لا ينفعه إنه لم يقل يوما رب اغفر لي خطيئتي يوم الدين ».
'আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ইবনু জুদ'আন জাহেলী যুগে আত্মীয় স্বজনদের হক আদায় করত এবং দরিদ্রদের আহার দিত। (আখিরাতে) এসব কর্ম তার উপকারে আসবে কি? রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: কোন উপকারে আসবে না। সে তো কোন দিন এ কথা বলে নাই যে, হে আমার রব! কিয়ামতের দিন আমার অপরাধ ক্ষমা করে দিও। (সহীহ মুসলিম)
মুসলমান কিভাবে কাফির ও মুরতাদ হয়?
মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ أَمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ ازْدَادُوا كُفْرًا لَمْ يَكُنِ اللهِ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيهِمْ سَبِيلًا
"নিশ্চয় যারা ঈমান আনলো, অতঃপর কুফরী করল, পুনরায় ঈমান গ্রহণ করল, পুনরায় আবার কুফরী করল, অতঃপর কুফরী আক্বীদা বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ড বাড়তেই থাকলো। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই ক্ষমা করবেন না এবং কখনো তাদেরকে হিদায়াতের পথ দেখাবেন না।" (সূরা আন-নিসা ১৩৭)
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ تُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَفِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمِ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্য হতে যে ব্যক্তি স্বীয় ধর্ম হতে ফিরে যায়, তবে (এতে ইসলামের কোন ক্ষতি নেই কেননা) আল্লাহ সত্বরই তোমাদের স্থলে এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসবেন এবং আল্লাহকেও তারা ভালবাসবেন। তারা মু'মিনদের প্রতি খুবই নম্র এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করবে না।” (সূরা আল-মায়িদা ৫৪)
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا فَرِيقًا مِّنَ الَّذِينَ أوتُوا الكِتَابَ يَرُدُّوكُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ كَفِرِينَ * وَكَيْفَ تَكْفُرُونَ وَأَنْتُمْ تُتْلَى عَلَيْكُمْ آيَتُ اللهِ وَفِيكُمْ رَسُولُهُ وَمَنْ يَعْتَصِمُ بِاللَّهِ فَقَدْ هُدِي إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ * ينَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقْتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আহলে কিতাবদের কোন একটি দলেরও কথা মেনে নাও, তবে ঈমান আনার পর তারা তোমাদেরকে কাফিরে পরিণত করে দেবে। আর তোমরা কিরূপে কাফির হতে পার, অথচ তোমাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় এবং তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রসূল রয়েছেন। আর যারা আল্লাহর বাণী দৃঢ়ভাবে ধরবে, তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে সরল পথের। হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করার মত ভয় করতে থাক এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না (অর্থাৎ ঈমান এনেও কুফরী করে কাফির অবস্থায় মরো না)।” (সূরা আলে-ইমরান ১০০-১০২)
كَيْفَ يَهْدِى اللَّهُ قَوْمًا كَفَرُوا بَعْدَ إِيْمَانِهِمْ
“যারা ঈমানের নিয়ামত একবার পাওয়ার পর পুনরায় কুফরী অবলম্বন করে তাদেরকে আল্লাহ কিরূপে হিদায়াত দান করতে পারেন?" (সূরা আলে-ইমরান ৮৬)
إن الله تبارك وتعالى لا يقبل توبة عبد كفر بعد إسلامه
(أحمد-هذا اسناد صحيح، رجاله كلهم ثقات)
নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সেই বান্দার তাওবাহ কবুল করেন না, যে ইসলাম গ্রহণের পর কুফরী প্রকাশ করে। (আহমাদ, সনদ সহীহ)
أن رسول الله ﷺ قال : «بادروا بالاعمل فتنا كقطع الليل المظلم يصبح الرجل مؤمنا ويمسى كافرا أو يمسى مؤمنا ويصبح كافرا يبيع دينه بعرض من الدنيا ». (صحيح مسلم كتاب الإيمان)
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অন্ধকার রাতের মত ফিতনা আসার আগেই তোমরা নেক আমলের প্রতি অগ্রসর হও। সে সময় সকালে একজন মু'মিন হলে (কুফরী করে) বিকেলে কাফির হয়ে যাবে। বিকেলে মু'মিন হলে সকালে কাফির হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে সে তার দীন বিক্রি করে বসবে। (মুসলিম- কিতাবুল ঈমান)
উল্লেখিত আয়াতে কারীমা ও হাদীস দ্বারা প্রমাণ হলো যে, মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়। আবার মুসলমান হবার পর কুফরী করলে সে কাফির হয়ে যায়। যে ব্যক্তি তার দীন ও ঈমানকে প্রত্যাহার করে কাফির হয় শরীয়তের পরিভাষায় তাকেই মুরতাদ বলা হয়।
বিষয়টি যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ তাই কুরআন সুন্নাহর বক্তব্যবলীর নিরীক্ষে মুসলিম উম্মাহর মহামান্য আইন বেত্তাগণ ঈমান, কুফর ও দীন বর্জনের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা জানা আবশ্যক। কারণ, ঈমান ও কুফর সম্পর্কে অনেকের ভুল ধারণা রয়েছে যার অবসান না ঘটলে নিজেদের অজান্তেই সৎকর্মগুলো বরবাদ হয়ে যাবার আশঙ্কা থাকে। যেমন, অনেকেই মনে করেন, কেউ মুসলমানের ঘরে জন্ম নিলে, তার নাম মুসলমান হলে এবং খাতনা করলেই সে মুসলমান। চাই সে ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলুক, কুফরীর আনুগত্য বা অনুসরণ করুক বা নামায পড়ুক আর না পড়ুক। মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণের ফলেই ঈমান তার ওপর জেঁকে বসেছে। অতএব, ঈমান কার ওপর আনতে হবে? কেন আনতে হবে? কিভাবে ঈমানকে রক্ষা করতে হবে? এগুলোর জানার কোনই প্রয়োজন নেই। অথচ সমস্ত কুফরকে প্রত্যাখ্যান করে ইসলামী বিধান যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ঈমানের ওপর টিকে থাকা এবং নিজেকে সত্যিকার মুসলমান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। ঈমান সম্পর্কে কোন মুসলমানের যদি ঐরূপ ভুল ধারণা হয় তাহলে তো আমলের সাথে অতি সহজেই কুফরীর সংমিশ্রণে সকল 'আমল নিস্ফল হয়ে যাবে। নিম্নে সাঈদ আহমাদ রচিত "কুরআন সুন্নাহর ফায়সালায় মুসলমান কিভাবে কাফির হয়?" শীষর্ক গ্রন্থের সহযোগিতায় সংক্ষেপে ঈমান, কুফর ও দীন বর্জনের ব্যাখ্যা দেয়া হলো।
ঈমান ও মু'মিন কাকে বলে
কুফরকে অস্বীকার করার মাধ্যমে মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিধি বিধান বা শরীয়ত নিয়ে এসেছেন তার প্রতি অন্তরে বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি এবং শরীয়তের সেসব আহকাম আমলে রূপদান করাই হলো ঈমান। যিনি নিঃসংকোচে তা সম্পন্ন করতে পারবেন তিনিই হলেন একজন মুসলমান।
আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহঃ) বলেন, ঈমান হলো অন্তরের এমন একটি পর্যায়ের ক্রিয়া প্রক্রিয়া যা প্রত্যেকটি বিষয়ে ইসলামী শরীয়তের হুকুম আহকাম মেনে চলার আন্তরিক প্রতিজ্ঞা ও বাস্তবে গ্রহণ করে নেয়াকে বাধ্য করে।
কুফর ও কাফির কাকে বলে
কুফর অর্থ কোন কিছুকে গোপন করা। শরীয়তের ভাষায় কুফর বলতে যা বুঝায় তা হলো দীনী বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত যে সব বিষয়কে অপরিহার্য অলঙ্ঘনীয়রূপে মেনে চলার জন্য নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থাপন করেছেন সেগুলোর কোন বিষয়কে অস্বীকার করা বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করা। অর্থাৎ ইসলাম বিরোধী কোন বিধানকে বিশ্বাস করা এবং নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনীত বিধানের কোনটিকে অস্বীকার করা। যে ব্যক্তির দ্বারা এমন কাজ সংগঠিত হবে সে কাফির হয়ে যাবে।
মুরতাদ কাকে বলে
ইসলামী শরীয়ত কর্তৃক দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত, অপরিহার্যভাবে মেনে চলার জন্য নির্ধারিত এক বা একাধিক বিষয়কে অস্বীকার করলে মুসলমান মুরতাদ হয়ে যায়। এ সম্পর্কে জগৎ বিখ্যাত মুহাদ্দিস আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহঃ) তাঁর রচিত "ইকফারুল মুলহিদীন” গ্রন্থে লিখেছেন, যে ব্যক্তির ইসলামী শরীয়ত কর্তৃক অপরিহার্যরূপে মেনে চলার জন্য নির্ধারিত কোন একটি বিষয়কে অস্বীকার করলো বস্তুত সে আল্লাহর কিতাবের অংশ বিশেষের প্রতি ঈমান আনলো আর অস্বীকার করলো অংশ বিশেষকে এমতাবস্থায় সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত বলেই গণ্য হবে। অর্থাৎ সে মুরতাদ হয়ে যাবে। উদাহরণ স্বরূপঃ
(ক) নামায অস্বীকারকারী, যার সম্পর্কে আল্লামা আইনী বলেন, আর নামায অস্বীকৃতি সম্পর্কে ইসলামী আইন বেত্তাগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো “যে ব্যক্তি নামাযের অপরিহার্যতায় অস্বীকার প্রসূত নামায বর্জন করলো সে মুরতাদ”।
(খ) যাকাত অস্বীকারকারী, যাদেরকে স্বীয় খিলাফতকালে আবূ বাকার সিদ্দীক (রাঃ) মুরতাদ ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। (বুখারী- আধুনিক প্রকাশনী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ২৪৭ পৃষ্ঠা)
যে সকল কুফরীর কারণে মুসলমান কাফির হয় এ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আরো স্পষ্টভাবে দলিল সহকারে সৌদি সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত “হাজ্জ 'উমরাহ ও যিয়ারত নির্দেশিকা” নামক পুস্তকে (যা হাজীদের বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়) যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা হয়েছে তা নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ
১। যারা নিজেদের ও সৃষ্টিকর্তার মধ্যে মাধ্যম নির্বাচন করতঃ তাদেরকে আহ্বান করে এবং তাদের উপর ভরসা করে, তারা সর্বসম্মতিক্রমে কাফির হয়ে যায়।
২। যারা মুশরিকদেরকে কাফির মনে করে না বা তাদের কুফরীতে সন্দেহ পোষণ করে তাদের ধর্মকে সঠিক বলে বিশ্বাস করে তারা কাফির হয়ে যায়।
৩। যে ব্যক্তি তাগুতের (আল্লাহদ্রোহী শক্তি) হুকুমকে নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হুকুম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর মনে করে, অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পথ প্রদর্শন অপেক্ষা অন্যের পথ প্রদর্শন অধিকতর সঠিক অথবা অন্যের নির্দেশ নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ অপেক্ষা উন্নতর, সে ব্যক্তি কাফির। এই জাতীয় কুফরী, যেমন-
(ক) মানব রচিত বিধান ও নিয়ম পদ্ধতি ইসলামী শরীয়ত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলে বিশ্বাস করা, অথবা এ কথা মনে করা যে, এই শতাব্দীতে ইসলামী বিধান যুগোপযোগী নয়, অথবা মনে করা যে, একমাত্র ইসলামই হচ্ছে মুসলমানদের পশ্চাদপদতার কারণ, অথবা মনে করা যে, ধর্ম প্রভু পরওয়ারদেগার ও মানুষের মধ্যে একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার। অন্যান্য ক্ষেত্রে ধর্মের প্রবেশ নিষিদ্ধ।
(খ) আল্লাহর নির্দেশ মুতাবিক চোরের হাত কাটা অথবা বিবাহিত ব্যভিচারীকে প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা করা আধুনিককালে যুগোপযোগী ও যুক্তিসঙ্গত নয়; এরূপ ধারণা পোষণ করা।
(গ) এই আক্বীদা পোষণ করা যে, শরয়ী ব্যাপারে অথবা হুদুদ (শাস্তির নির্ধারিত সীমা) বা অন্যান্য ব্যাপারে আল্লাহর নাযিল করা বিধান ছাড়া বিচার ফায়সালা করা জায়িয; যদিও সে বিশ্বাস করে যে, তার ফায়সালা শরয়ী বিধান অপেক্ষা নিকৃষ্ট। কেননা এর ফল দাঁড়াবে এই যে, কখনো কখনো সে অবধারিত হারাম বস্তুকে হালাল মনে করে নিবে আর যারা নিশ্চিত হারাম বস্তু যেমন- যিনা, মদ, খুন ইত্যাদিকে হালাল মনে করে নেয় তারা কাফির হয়ে যায়, এতে সকল মুসলমান একমত।
৪। মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনীত শরয়ী বিধানের কোন কিছুর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি কাফির যদিও সে উক্ত বিধানের উপর অসন্তুষ্ট চিত্তে 'আমল করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
ذلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ
“এটা এজন্য যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তারা তা পছন্দ করে না। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের কর্ম নিস্ফল করে দেবেন।” (সূরা মুহাম্মাদ ৯)
৫। শরীয়তে মুহাম্মাদীর কোন অনুশাসন অথবা তার জন্য নির্ধারিত সাওয়াব বা শাস্তিকে যে বিদ্রূপ করবে, সে আল্লাহ তা'আলার বাণী অনুযায়ী কাফির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قُلْ أَبِاللهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِوْنَ - لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ
"তুমি বল, তোমরা কি ঠাট্টা-তামাশা করছিলে আল্লাহ ও তাঁর আয়াতগুলো এবং তাঁর রসূল সম্বন্ধে? এখন আর কৈফিয়ত পেশ করো না। তোমরা নিজেদের ঈমান প্রকাশ করার পরও তো কুফরী কাফে লিপ্ত ছিলে।” (সূরা আত-তাওবাহ ৬৫-৬৬)
৬। যাদু, যাদুর দ্বারা বিকর্ষণ করা, যেমন- কোন মানুষকে যাদুর দ্বারা তার প্রেয়সী স্ত্রীর প্রতি বিরাগভাজন করা। যাদুর আকর্ষণ; যেমন শয়তানী যন্ত্রণা দ্বারা অপছন্দনীয় কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান। সুতরাং যে ব্যক্তি এটা সম্পাদন করে অথবা এতে সন্তুষ্ট থাকে সে আল্লাহর কালাম অনুযায়ী কাফির হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ
"তারা কাউকে কিছু শিক্ষা দেয়ার পূর্বেই অবশ্য বলে দিত যে, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ। সুতরাং তোমরা কুফরী করো না।" (সূরা আল-বাকারা ১০২)
৭। মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদেরকে সাহায্য করা।
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
وَمَنْ يَتَوَلَهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِى القَوْمَ الظَّالِمِينَ
“তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে (ইহুদী খৃষ্টানদেরকে) অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে তারা তাদের মধ্যেই পরিগণিত হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারী জাতিকে সঠিক পথপ্রদর্শন করেন না।” (সূরা আল-মায়িদাহ ৫১)
৮। যদি কেউ বিশ্বাস পোষণ করে যে, মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিধান হতে বের হয়ে যাওয়া কোন কোন লোকের জন্য বৈধ, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرُ الإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يَقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِن الْخَسِرِينَ
"কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দীনের আশ্রয় নিতে চাইলে তা কখনো কবুল করা হবে না এবং সে হবে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।" (সূরা আল-ইমরান ৮৫)
৯। আল্লাহর দীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া অথবা যে সব বস্তু ছাড়া ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না, সে সব বস্তু সম্পর্কে অনবহিত থাকা এবং তার উপর 'আমল না করা।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذُكِرَ بِايَاتِ رَبِّهِ ثُمَّ أَعْرَضَ عَنْهَا إِنَّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ مُنْتَقِمُونَ
“যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নির্দেশাবলীর মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে তা হতে মুখ ফিরায় তার অপেক্ষা অধিক সীমালঙ্ঘনকারী আর কে? আমি অপরাধীদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি।" (সূরা আস-সাজদা ২২)
আল্লাহ আরো বলেন,
وَالَّذِينَ كَفَرُوا عَمَّا أَنْذِرُوا مُعْرِضُونَ
আর যারা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে তারা অবজ্ঞা ভরে অস্বীকার করে। (সূরা আহকাফ ৩)
ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, ভয়ে হোক- যদি কোন ব্যক্তি উল্লিখিত ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয়ের কোন একটি সম্পাদন করে, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। হাঁ, যদি কোন ব্যক্তিকে জবরদস্তির মাধ্যমে উক্ত কাজ করানো হয়, তবে সে এই হুকুমের আওতায় পরবে না।
{দেখুন- হাজ্জ, উমরাহ ও বিয়ারত নির্দেশিকা। অনুচ্ছেদ- ইসলাম বিনষ্টকারী দশটি বস্তু। প্রকাশনা ও প্রচারে- প্রধান কার্যালয়; গবেষণা, ইফতা ও ইরশাদ বিভাগ, রিয়াদ, সৌদি আরব সরকার। 'আল আক্বীদাতুস সহীহা' প্রণেতা শায়খ আব্দুল আযীয আব্দুল্লাহ বিন বায (রহঃ)।}
উপরের আলোচনা থেকে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেল যে, মু'মিন হওয়ার জন্য পরিপূর্ণ দীনের অপরিহার্য সব বিষয়ের প্রতি ঈমান আনা শর্ত। কিন্তু কাফির সাব্যস্ত হবার জন্য দীনের সব বিষয়াদির অস্বীকৃতি শর্ত নয় বরং দীনের কোন একটি অকাট্য প্রমাণিত এবং সর্বজনবিদিত বিষয়ের সমূলে প্রত্যাখ্যান বা অস্বীকৃতি পাওয়া গেলেই কাফির সাব্যস্ত হবে।
যেহেতু ইবাদত কবুল হওয়া বা না হবার প্রশ্ন, তাই প্রয়োজনের তাগিদেই উপরোক্ত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। যাতে করে যাবতীয় কুফর হতে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রেখে ইবাদতগুলোর স্বার্থকরূপ দেয়া যায়।
📄 মুশরিকের ইবাদত
وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
"যদি তারা শির্ক করে তাহলে তাদের সমস্ত ভাল 'আমল বরবাদ হয়ে যাবে।” (সূরা আল-আন'আম ৮৮)
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ
“(হে নবী) আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি অহী করা হয়েছে যে, যদি আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করেন, তাহলে আপনার সকল কর্ম বরবাদ হয়ে যাবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।” (সূরা আয-যুমার ৬৫)
لا يقبل الله عز وجل من مشرك بعد ما أسلم عمل». (سلسلة صحيحة ٨٤٨/٦ مكتب الرياض)
ইসলাম গ্রহণ করার পর কোন শিক্ককারীর 'আমল আল্লাহ কবুল করবেন না। (সিলসিলাতুল আহাদীসুস সহীহা- ৬ষ্ঠ খণ্ড ৮৪৮ পৃষ্ঠা)
শিরক অর্থ হচ্ছে অংশীদার স্থাপন করা। শরীয়তের পরিভাষায় শিক হলো যে সব গুণাবলী কেবল আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট, সে সব গুণে অন্য কাউকে গুণান্বিত ভাবা বা এতেও কারোর অংশ আছে মনে করা।
আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন জঘন্য অপরাধ। যে ব্যক্তি ইবাদতের ক্ষেত্রে বা আল্লাহর গুণাবলী ও ক্ষমতার সাথে অন্য কাউকে শরীক করবে সে ব্যক্তি মুশরিক বলে গণ্য হবে। এমন ব্যক্তির অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য এবং তার কোন প্রকার সৎকর্মই গ্রহণযোগ্য হবে না। এ কারণেই রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোরভাবে হুশিয়ার করে বলেছেন, "সাবধান! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, যদিও তোমাকে এজন্য কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয় অথবা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়।” (ইবনু মাজাহ)
অংশীদার স্থাপন কখন প্রয়োজন হয়
অংশীদার স্থাপন করা তখনই প্রয়োজন হয় যখন কারো মাঝে কোন কিছুর অপূর্ণতা লক্ষ্য করা যায়। যেমন, কেউ ব্যবসায়ে কাউকে পার্টনার বা অংশীদার করতে চাইলে এ জন্যই করে যে, হয়তো তার কাছে টাকা আছে কিন্তু দক্ষতা নেই বা দক্ষতা আছে কিন্তু টাকা নেই বা টাকা ও দক্ষতা উভয়ই আছে কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় কম বিধায় সে ব্যবসা করতে সক্ষম নয় ইত্যাদি। এক কথায় সে নিজের মধ্যে কোন অপূর্ণতা লক্ষ্য করছে যা পূর্ণ করার জন্য তার অংশীদার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।
আল্লাহ কি অপূর্ণাঙ্গ (নাউযুবিল্লাহ)?
এর উপযুক্ত জবাব স্বয়ং আল্লাহ তা'আলাই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন-
قل هو الله أحد * الله الصمد * لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدُ * وَلَمْ يَكُنْ له كفوا أحد
“হে নবী! বল : তিনি অর্থাৎ আল্লাহ একক, অমুখাপেক্ষী, তার কোন সন্তান-সন্ততি নেই, আর তিনি কারো সন্তান নন, আর কেউই তাঁর সমতুল্য নয়।” (সূরা ইখলাস)
ولله المثل الْأَعْلَى وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
"আল্লাহর জন্যই তো সর্বোত্তম গুণাবলী, তিনিই তো সবার উপর পরাক্রমশালী এবং জ্ঞানের দিক দিয়ে পূর্ণতার অধিকারী।" (সূরা আন-নাহল ৬০)
اللهُ خَالِقٌ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلُ
“আল্লাহই সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনিই সব কিছু রক্ষণাবেক্ষণ করেন।” (সূরা আয-যুমার ৬২)
وَإِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونَ
“যখন তিনি কোন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন শুধু এতটুকুই বলেন যে, হও, আর অমনিতেই তা হয়ে থাকে।" (সূরা আল-বাকারা ১১৭)
وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعْجَزَهُ مِنْ شَيْءٍ فِي السَّمَوتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ إِنَّهُ كَانَ عَلِيمًا قَدِيرًا
“আল্লাহ এমন নন যে, আসমান জমিনের কোন কিছু তাকে অক্ষম করতে পারে। তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।” (সূরা ফাতির ৪৪)
لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلْ
"তাঁর ক্রিয়াকলাপের কৈফিয়ত কাউকে দিতে হয় না।” (সূরা আম্বিয়া ২৩)
وَاللَّهُ يَحْكُمُ لَا مُعْقِبُ الحُكْمِهِ
“তিনি রাজত্ব করছেন, তাঁর সিদ্ধান্তসমূহ বিবেচনা করার কেউ নেই।” (সূরা রাদ ৪১)
وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلْمَتِ الْأَرْضِ
তাঁরই নিকট অদৃশ্য জগতের চাবি রয়েছে। তিনি ব্যতীত এগুলো কেউ জানে না। জলে ও স্থলে যা কিছু আছে তিনিই জানেন। গাছের একটি পাতাও তাঁর অবগতি ছাড়া ঝড়ে না এবং কোন শস্য কণা মৃত্তিকার অন্ধকার অংশে পতিত হয় না। (সূরা আল-আন'আম ৫৯)
فَتَعْلَى اللَّهُ الْمُلِكَ الْحَقِّ
অতএব, আল্লাহই মহান, শ্রেষ্ঠ, প্রকৃত বাদশা। (সূরা মু'মিনূন ১১৬)
তবুও মানুষ শির্কে লিপ্ত হলো
জাহান্নাম যেহেতু তৈরী করা হয়েছে তাই দুনিয়াতে তার উপযুক্ত অধিবাসীর বসবাস থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাইতো আল্লাহ তা'আলার স্পষ্ট বক্তব্য এবং বিভিন্ন ভ্রান্ত যুক্তি ও ধারণার উপযুক্ত জবাব পেশের পরও মানুষ শির্ক থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখতে পারেনি। কল্পিত শয়তানী চিন্তা ও গুমরাহীর অন্ধকার মানুষের অন্তরকে এমনিভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলল যে হিদায়াতের স্বচ্ছ আলো সামনে থাকা সত্ত্বেও তা যেন তাদের চোখের আড়াল হয়ে রইল। সত্যের নূর তাদের বক্ষে প্রবেশ করল না। অকাট্য দলিল ও বাস্তবতাকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের প্রবৃত্তিকে ইলাহর আসনে বসিয়ে মানুষ শির্কী কর্মকাণ্ড সূচনা করে দিল।
বিধর্মীদের শির্কের ধরন
বিধর্মী মুশরিকরা বিভিন্নভাবে আল্লাহ তা'আলার সাথে অংশীস্থাপন করেছে। তাদের মধ্যে হিন্দুদের শিরকের ধরন এতই আশ্চর্য যে, তারা একটি দু'টি নয়, তেত্রিশ কোটি দেবতা গ্রহণ করেছে। আল্লাহর সৃষ্টি পাথর, গাছপালা, গরু-বাছুরকেও তারা মহান প্রতিপালকের আসনে বসাতে দ্বিধাবোধ করেনি। অপরদিকে বৌদ্ধ ধর্মের লোকেরাও গৌতম বুদ্ধের মূর্তিকে রূপক ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে। খৃষ্টানরা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র ও মারইয়াম (আঃ)-কে আল্লাহর স্ত্রী (নাউযুবিল্লাহ) সাব্যস্ত করে তিন ইলাহ গ্রহণ করেছে। অপরদিকে ইহুদীরাও 'উযাইর (আঃ)-এর প্রকৃত শিক্ষা বর্জন করে তাকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করেছে। এভাবেই কাফির মুশরিকরা আল্লাহ তা'আলার সাথে একের পর এক অংশীদার স্থাপন করে বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং আল্লাহর একত্ববাদের কথা জেনেও তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে।
মুসলমান কিভাবে মুশরিক হয়?
অন্যান্য জাতি যেমন শিক্কের কারণে মুশরিক হয়েছে তেমনি কোন মুসলমান শির্ক করলে সেও মুশরিক বলে গণ্য হবে। শিক্কের কারণে মুসলমানদের মুশরিক হবার কথা আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছেন-
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ
"অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে বটে কিন্তু সাথে সাথে তারা মুশরিকও।” (সূরা ইউসুফ ১০৬)
এর দ্বারা বুঝা গেল, মুসলমানদের দ্বারাও শির্ক সংগঠিত হচ্ছে। তবে অমুসলিমদের মত কাউকে আল্লাহর পুত্র বা স্ত্রী সাব্যস্ত করে নয় বরং ভিন্ন কায়দায়। যেমন-
(ক) কবর পূজা, মাজার পূজা, পীর পূজা এবং তাদের নামে মানৎ, যবেহ ইত্যাদি। [প্রাসঙ্গিক দেখুন বইয়ের ১৪ পৃষ্ঠা (১)]
(খ) মানুষের আইন রচনার অধিকার আছে বলে স্বীকার করা ও মানুষের তৈরী আইন মেনে নেয়া। [প্রাসঙ্গিক দেখুন ১৪ পৃষ্ঠা (৩)]
(গ) জনসাধারণকে সকল ক্ষমতার উৎস বলে আখ্যায়িত করা।
(ঘ) মূর্তি-ভাস্কর্য তৈরী করা, আগুনকে সম্মান দেখানো।
(ঙ) তাবিজ ব্যবহার করা, তাবিজকে বিপদের রক্ষাকারী মনে করা।
(চ) কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী আক্বীদা পোষণ করা।
(ছ) মানুষ বা জীনকে গায়েব জানে বলে মনে করা। (দেখুন ৩৬-৩৮ পৃষ্ঠা)
(জ) কাউকে পৃথিবীতে যা ইচ্ছে করার অধিকারী ভাবা ইত্যাদি।
📄 মুনাফিকের জানাযা
سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ اِسْتَغْفَرْتُ لَهُمْ أَمْ لَمْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ لَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ
“(হে রসূল) তুমি তাদের (মুনাফিকদের) জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর বা না কর উভয়ই সমান। আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন না। (অর্থাৎ তাদের ব্যাপারে তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর হবে না)।" (সূরা মুনাফিকুন ৬)
إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللهُ لَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَسِقِينَ
"যদি তুমি তাদের জন্য সত্তরবারও ক্ষমা প্রার্থনা কর তবুও কখনোই আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। তা এজন্য যে, তারা আল্লাহ ও রসূলের সাথে কুফরী করেছে। বস্তুত আল্লাহ না-ফরমানদের পথ দেখান না।” (সূরা আত-তাওবাহ ৮০)
وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَا تُوْا وَهُمْ فَسِقُوْنَ
"তাদের মধ্য হতে কেউ মারা গেলে কখনো তাদের জানাযা পড়বে না এবং তাদের কবর যিয়ারতও করবে না। কেননা এই লোকেরাই তো আল্লাহ ও রসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং ফাসিক হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।” (সূরা আত-তাওবাহ ৮৪)
অত্র আয়াতের শানে নুযূল বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনু উমার (রাঃ) বলেন-
لما توفي عبد الله بن أبي جاء ابنه عبد الله بن عبد الله إلى رسول الله ﷺ فأعطاه قميصه وأمره أن يكفنه فيه. ثم قام يصلى عليه فأخذ عمر بن الخطاب بثوبه فقال : تصلى عليه وهو منافق وقد نهاك الله ان تستغفر لهم ؟ قال : انما خيرني الله أو اخبرني الله فقال : «استغفر لهم او لا تستغفر لهم سبعين مرة فلن يغفر الله لهم» فقال : سأزيده على سبعين . قال : فصلى عليه وسول الله ﷺ وصلينا معه ثم أنزل الله عليه ولا تصلى على أحد منهم مات أبدا ولا تقم على قبره إنهم كفروا بالله ورسوله وماتوا وهم فاسقون. (صحیح بخاری)
(মুনাফিক নেতা) আব্দুল্লাহ ইবনু 'উবাই মারা গেলে তার পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দুল্লাহ রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে তার পিতার কাফন হিসেবে ব্যবহারের জন্য রসূলের নিকট তাঁর জামাটি দেবার আবেদন জানালে নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামাটি দিয়ে দিলেন। পুনরায় সে পিতার জানাযার নামায পড়ার জন্য রসূলের নিকট আবেদন জানালে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার নামায আদায়ের জন্য উঠতে চাইলেন। এমনি সময় উমার (রাঃ) রসূলের কাপড় টেনে ধরে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি তার জানাযার নামায আদায় করতে এবং তার জন্য দু'আ করতে চাইছেন, অথচ আপনার প্রতিপালক তো তা করতে নিষেধ করেছেন। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ ব্যাপারে আল্লাহ আমাকে এখতিয়ার দিয়েছেন। আর আল্লাহ তো বলেছেন, “তুমি তাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ কর বা না কর, যদি সত্তরবারও তাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ কর তবুও আমি তাদেরকে ক্ষমা করব না।” সুতরাং আমি সত্তরবারের চেয়েও বেশি মাগফিরাত কামনা করব। উমার (রাঃ) বললেন, সে তো মুনাফিক। (যা হোক) রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ পর্যন্ত তার জানাযার নামায আদায় করলেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তা'আলাও এই আয়াত নাযিল করে রসূলকে জানিয়ে দিলেন যে, তাদের কেউ মারা গেলে আপনি কখনো তাদের জানাযার নামায আদায় না এবং তাদের কবরের পাশেও দাঁড়াবেন না। নিশ্চয়ই তারা আল্লাহ ও রসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং ফাসিক হয়েই মারা গেছে। (সহীহ বুখারী)
মুসনাদে আহমাদেও হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে, সেখানে এও বর্ণনা করা হয়েছে,
فما صلى رسول الله بعده على منافق ولا قام على قبره حتى قبضه الله عز وجل » . (احمد - مسند عمر بن الخطاب)
এরপর থেকে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু পর্যন্ত আর কোন মুনাফিকের জানাযা পড়েননি এবং কবর যিয়ারতও করেননি।
এতে বুঝা গেল যে, মুনাফিকের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং রসূলে আকরাম সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দু'আ কবুল করেননি। সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ (রহঃ) বলেন, মুনাফিকদের জানাযা না পড়া ও তাদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দু'আ করার প্রতি নিষেধাজ্ঞার কারণ এটাই ছিল যে, দীন প্রতিষ্ঠায় জিহাদের ডাক পাওয়া সত্ত্বেও তারা তাতে সাড়া দেয়নি। দুনিয়ার লোভ-লালসা চরিতার্থ করা ও ভোগ বিলাসে মেতে থাকার জন্য জিহাদে না গিয়ে তারা শুধু আল্লাহর হুকুম অমান্যই করেনি বরং অবজ্ঞা করার মাধ্যমে কুফরীও করেছে। এছাড়া তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কবুল না হওয়ার পেছনে এটাও কারণ ছিল যে, তারা আল্লাহর কোন কোন বিধান এবং মু'মিন বান্দাদের সম্পর্কে ঠাট্টা বিদ্রূপ করত। সুতরাং মুসলিম জামা'আতকে ঐরূপ লোকদের সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে। তাদেরকে কোনরূপ সামাজিক সম্মান বা মূল্যায়ন করা হতে বিরত থাকতে হবে।
অতএব মুসলমান পরিচয় বহনকারী কোন ব্যক্তি যদি জেনে শুনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বা দীন প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ না করে (শর'য়ী ওজর ব্যতীত) এবং ইসলামী আদর্শের অনুসারী আল্লাহর অনুগত বান্দাদেরকে বিদ্রূপ করে তবে সে ঐরূপ অবস্থায় মারা গেলে তার জানাযা পড়া মোটেই সঠিক হবে না।