📘 যা হবে মরনের পরে > 📄 আখেরাতে মুমিনদের আনন্দ

📄 আখেরাতে মুমিনদের আনন্দ


মু'মিনদের মৃত্যুর সময় শান্তনা ও জান্নাতের সুসংবাদ দেয়ার জন্যে আল্লাহর পক্ষ হতে রহমতের ফেরেশতা আগমণ করে থাকেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ في الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ نُزُلًا مِنْ غَفُورٍ رَحِيمٍ)
অর্থঃ "নিশ্চয়ই যারা বলে আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়ে বলতে থাকেনঃ তোমরা ভয় করোনা, চিন্তা করোনা এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্যে রয়েছে যা তোমাদের মন চায় এবং তোমরা যা দাবী কর। এটা ক্ষমাশীল করুণাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন। (সূরা হামীম সাজদাহঃ ৩০-৩২)
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ "মৃত্যুর সময় ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়ে থাকেন। কাতাদা ও মুকাতেল (রঃ) বলেনঃ মু'মিনগণ যখন কবর থেকে বের হয়ে হাশরের মাঠের দিকে রওয়ানা করবেন তখন ফেরেশতাগণ তাদের সাথে থাকবেন। অকী ইবনে জাররাহ (রঃ) বলেনঃ তিন স্থানে ফেরেশতাগণ মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিবেন। মৃত্যুর সময়, কবরে এবং কবর থেকে উঠার সময়।
ইবনে কাছীর (রঃ) উক্ত আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে বলেনঃ মু'মিনদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতাগণ বলবেনঃ আমরা দুনিয়াতে তোমাদের বন্ধু ছিলাম। দুনিয়াতে আল্লাহর আদেশে আমরা তোমাদেরকে সঠিক পথের উপর অবিচল থাকতে সহযোগিতা করতাম এবং তোমাদেরকে সকল প্রকার অকল্যাণ থেকে হেফাযত করতাম। পরকালেও আমরা তোমাদের সাথে থাকব। কবরের নির্জনতায় ও একাকীত্বে এবং শিঙ্গায় ফুঁক দেয়ার সময় আমরা তোমাদেরকে অভয় দিব। পুনরুত্থান দিবসে তোমাদেরকে নিরাপদে রাখব ও তোমাদেরকে সাথে নিয়ে পুলসিরাত পার হবো এবং তোমাদেরকে অসংখ্য নেয়া'মতে পরিপূর্ণ জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিব।'
মু'মিন ব্যক্তির রূহ্ কবজের অবস্থা ইতিপূর্বে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মালাকুল মাউত তাঁর মাথার পাশে এসে বসবেন এবং বলবেনঃ ওহে পবিত্র আত্মা! বের হয়ে এসো আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টির দিকে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ পানপাত্র থেকে পানি যেমন সহজভাবে বের হয় মু'মিনের আত্মাও ঠিক তেমনই সহজভাবে বের হয়ে আসে। রূহ্ বের হওয়ার পর আকাশ ও যমিনের ফেরেশতাগণ তাঁর জন্যে মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার জন্যে আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়"।

টিকাঃ
১. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৪র্থ খন্ড।

📘 যা হবে মরনের পরে > 📄 মৃত্যুর সময় আল্লাহর সাক্ষাৎ

📄 মৃত্যুর সময় আল্লাহর সাক্ষাৎ


ফেরেশতারা যখন পরহেজগার মু'মিনগণকে আল্লাহর সাক্ষাতের সুসংবাদ দিবেন, তখন তাঁরা আনন্দ প্রকাশ করবেন। আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
مَنْ أَحَبَّ لِقَاءَ اللَّهِ أَحَبَّ اللَّهُ لِقَاءَهُ وَمَنْ كَرِهَ لِقَاءَ اللَّهِ كَرِهَ اللَّهُ لِقَاءَهُ فَقُلْتُ يَائِبِيَ اللَّهُ أَكَرَاهِيَةَ الْمَوْتِ فَكُلُّنَا تَكْرَهُ الْمَوْتَ قَالَ لَيْسَ ذَاكَ وَلَكِنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا حَضَرَهُ الْمَوْتُ بُشِّرَ بِرَحْمَةِ اللهِ وَ رِضْوَانِ اللَّهِ وَجَنَّتِهِ أَحَبَّ لِقَاءَ اللَّهِ وَأَحَبَّ اللَّهُ لِقَاءَهُ وَإِنَّ الْكَافِرَ إِذَا بُشِّرَ بِعَذَابِ اللَّهِ وَسَخَتِهِ كَرِهَ لِقَاءَ اللَّهِ وَكَرِهَ اللَّهُ لِقَاءَهُ
অর্থঃ "যে আল্লাহর সাক্ষাৎ ভালবাসবে আল্লাহও তার সাক্ষাৎ ভালবাসবেন। আর যে আল্লাহর সাক্ষাৎ অপছন্দ করবে আল্লাহও তার সাথে সাক্ষাৎ করাকে অপছন্দ করবেন। আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি মৃত্যুকে অপছন্দ করা? আমরা সবাইতো মৃত্যুকে অপছন্দ করে থাকি। উত্তরে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এমনটি নয়; বরং মু'মিন ব্যক্তিকে যখন আল্লাহর রহমত, সন্তুষ্টি এবং জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করাকে ভালবাসে এবং আল্লাহও তার সাথে সাক্ষাৎ করাকে ভালবাসেন। আর কাফেরকে যখন আল্লাহর আযাবের সংবাদ দেয়া হয় তখন সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করাকে অপছন্দ করে। ফলে আল্লাহও তার সাথে সাক্ষাৎ করাকে অপছন্দ করেন।'
সহীহ বুখারীতে আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ إِذَا وُضِعَتِ الْجِنَازَةُ وَاحْتَمَلَهَا الرِّجَالُ عَلَى أَعْنَاقِهِمْ فَإِنْ كَانَتْ صَالِحَةٌ قَالَتْ قَدِّمُونِي وَإِنْ كَانَتْ غَيْرَ صَالِحَةِ قَالَتْ يَا وَيْلَهَا أَيْنَ يَذْهَبُونَ بِهَا يَسْمَعُ صَوْتَهَا كُلُّ شَيْءٍ إِلَّا الْإِنْسَانَ وَلَوْ سَمِعَهُ صَعِقَ
অর্থঃ "যখন জানাযা বহন করে নিয়ে যাওয়া হয় তখন মৃত ব্যক্তি সৎ হয়ে থাকলে বলে আমাকে তাড়াতাড়ি আমার গন্তব্য স্থানে নিয়ে যাও। আর অসৎ হলে তার আপনজনকে বলতে থাকে হায় আমার ধ্বংস!! আমাকে নিয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে? তার একথাটি মানুষ ব্যতীত সকলেই শুনতে পায়। কোন মানুষ তা শুনতে পেলে বেহুঁশ হয়ে যেত”।²

টিকাঃ
১. আবু দাউদ ও নাসাঈ।
২. তিরমিযী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল জানায়েয।

📘 যা হবে মরনের পরে > 📄 মুমিনগণ নির্ভয়ে হাশরের মাঠে

📄 মুমিনগণ নির্ভয়ে হাশরের মাঠে


আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ وَفْدًا)
অর্থঃ "সেদিন দয়াময় আল্লাহর কাছে পরহেজগারদেরকে সম্মানিত অতিথিরূপে সমবেত করা হবে"। (সূরা মারইয়ামঃ ৮৫)
আল্লামা ইবনে কাছীর (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ আল্লাহর যেসমস্ত পরহেজগার বান্দা দুনিয়াতে আল্লাহকে ভয় করে চলবেন, তাঁর রাসূলদের আনুগত্য করতঃ রাসূলগণ কর্তৃক প্রদত্ত সংবাদ সত্য বলে বিশ্বাস করবেন, তারা যে বিষয়ের আদেশ দিবেন তা মেনে নিবেন এবং রাসূলগণ যা থেকে নিষেধ করবেন তা থেকে বিরত থাকবেন তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা সম্মানিত অতিথি রূপে আপন দরবারে উপস্থিত করবেন।
আল্লাহ তাআ'লা আরও বলেনঃ (وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا حَتَّى إِذَا جَاؤُوْهَا وَفُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فَادْخُلُوهَا خَالِدِينَ ) অর্থঃ "যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করতো তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা জান্নাতের নিকটস্থ হবেন এবং তাদের জন্যে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে তখন জান্নাতের রক্ষীগণ তাদেরকে বলবেনঃ তোমাদের প্রতি সালাম। তোমরা সুখে থাক। অতঃপর স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর"। (সূরা যুমারঃ ৭৩)
অত্র আয়াতে আল্লাহ সৌভাগ্যবান মু'মিনদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, তাদেরকে দ্রুতগামী বাহনে করে সম্মানিত মেহমান রূপে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে। নৈকট্যশীলদেরকে সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। তার পর নেককারদেরকে অতঃপর তাদের পরবর্তীদেরকে। প্রত্যেক দলকে তাদের সাথীদের সঙ্গে বেহেশতে প্রবেশ করানো হবে। নবীগণকে নবীদের সাথে, সত্যবাদীগণকে সত্যবাদীদের সাথে, শহীদদেরকে তাঁদের সঙ্গীদের সাথে এবং আলেমদেরকে তাদের বন্ধুদের সাথে বেহেশতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। পুলসিরাত পার হওয়ার পর যখন তারা জান্নাতের দরজার কাছে পৌঁছবেন তখন জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝামাঝি একটি স্থানে তাদেরকে আটকানো হবে এবং তাদের মাঝে পারস্পরিক জুলুম থেকে প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ দেয়া হবে। তাদেরকে সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র করে বেহেশতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে।

📘 যা হবে মরনের পরে > 📄 মুমিনদের পুলসিরাত পার

📄 মুমিনদের পুলসিরাত পার


জাহান্নামের উপরে যে পুলসিরাত স্থাপন করা হবে তার উপর দিয়ে পার হয়ে মু'মিনগণ জান্নাতে চলে যাবেন আর কাফের ও অপরাধীরা তা থেকে পড়ে গিয়ে জাহান্নামে পতিত হবে।
আল্লাহ তায়া'লা বলেনঃ
(وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا) অর্থঃ "তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তথায় পৌঁছবেনা। এটা আপনার পালনকর্তার অনিবার্য ফয়সালা। অতঃপর আমি আল্লাহ ভীরুদেরকে উদ্ধার করবো এবং জালেমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় ছেড়ে দিবো"। (সূরা মারইয়ামঃ ৭১-৭২) সহীহ হাদীছে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেনঃ
يَرِدُ النَّاسُ النَّارَ ثُمَّ يَصْدُرُونَ مِنْهَا بِأَعْمَالِهِمْ فَأَوَّلُهُمْ كَلَمْحِ الْبَرْقِ ثُمَّ كَالرِّيحِ ثُمَّ كَحُضْرِ الْفَرَسِ ثُمَّ كَالرَّاكِبِ فِي رَحْلِهِ ثُمَّ كَشَدِ الرَّجُلِ ثُمَّ كَمَشِيهِ অর্থঃ "মানুষদেরকে জাহান্নামের আগুনের উপর পেশ করা হবে। অতঃপর প্রত্যেকেই নিজ নিজ আমল অনুযায়ী তা পার হবে। তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম ব্যক্তি চোখের পলকে পার হবে। কেউ পার হবে দ্রুতগামী বাতাসের গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে, কেউ দ্রুতগামী উটের গতিতে, কেউ দৌড়িয়ে আবার কেউ পায়ে হেঁটে হেঁটে পার হবে"।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00