📄 এক নযরে জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
জাহান্নামের রয়েছে সাতটি দরজা। দুনিয়ার আগুনের তাপমাত্রা জাহান্নামের আগুনের তাপমাত্রার সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। কিয়ামতের দিন সত্তর হাজার লোহার শিকল দিয়ে বেধে টেনে টেনে জাহান্নামকে হাশরের মাঠের নিকটবর্তী করা হবে। প্রতিটি শিকলে সত্তর হাজার ফেরেশতা থাকবে। জাহন্নামের আগুনে সবচেয়ে হালকা আযাব হবে এমন এক ব্যক্তির যাকে আগুনের ফিতা বিশিষ্ট দু'টি জুতা পরিয়ে দেয়া হবে। যার গরমে পাতিলের মধ্যে পানিতে কোন জিনিষ ফুটার মত তার মাথার মগজ গলতে থাকবে। তাকে দেখে মনে হবে তার চেয়ে বেশী শান্তি আর কাউকে দেয়া হচ্ছে না। অথচ তাকে সবচেয়ে হালকা আযাব দেয়া হচ্ছে।
কিয়ামতের দিন এমন একজন জাহান্নামীকে নিয়ে আসা হবে যে দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশী নিয়ামতের অধিকারী ছিল। অতঃপর তাকে জাহান্নামে একবার চুবানি দিয়ে জিজ্ঞেস করা হবেঃ দুনিয়াতে কখনও সুখ ভোগ করেছো কি? কোন নিয়ামত তোমার কাছে এসেছিল কি? উত্তরে সে বলবেঃ আল্লাহর শপথ করে বলছি! দুনিয়াতে কোন দিন শান্তি ভোগ করিনি।
জাহান্নামীদের দেহ এত বিশাল হবে যে তাদের দাঁতগুলো হবে উহুদ পাহাড়ের মত বিশাল। এক কাঁধ হতে অন্য কাঁধের দূরত্ব হবে দ্রুতগামী বাহনে আরোহীর তিন দিনের রাস্তা। শরীরের চামড়াও হবে অনুরূপ মোটা এবং জাহান্নামে তাদের বসার স্থানটি (নিতম্ব) হবে মক্কা-মদীনার মধ্যবর্তী দূরত্বের সমপরিমাণ।
তাদের পানীয় হবে এমন গরম পানি যা মাথার উপর ঢালা হবে। মাথা দিয়ে শরীরের ভিতরে প্রবেশ করে পায়খানার রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যাবে। তাদেরকে পুঁজ মেশানো পানিও পান করানো হবে। যাক্কুম ফল হবে তাদের খাদ্য। তা জাহান্নামের ভিতরেই উৎপন্ন হবে। তারা তা খেতে চাইবেনা। জোর করে খাওয়ানো হবে। যাক্কুম ফলের এক বিন্দু রস যদি দুনিয়াতে ফেলে দেয়া হতো তাহলে দুনিয়াবাসীর সমস্ত জীবিকা নষ্ট করে দিতো এবং তার গন্ধ ও বিষের কারণে মানুষের জন্যে পৃথিবীতে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে যেত। তাহলে চিন্তা করুন এই ফলটি যাদের খাদ্য হবে তাদের অবস্থা কেমন কঠিন হবে?!! জাহান্নামের গভীরতা এতো বেশী হবে যে তার উপর থেকে একটি পাথর নিক্ষেপ করলে সত্তর বছরেও তার তলদেশে পৌঁছতে পারবেনা। পাথর এবং কাফেরের শরীর দিয়ে জাহান্নামের আগুন জ্বালানো হবে। জাহান্নামের আগুন কাউকে তার পায়ের গিরা, কাউকে তার হাঁটু, কাউকে কোমর এবং কাউকে তার বুক পর্যন্ত গ্রাস করবে। বাতাস এবং পানি হবে অত্যন্ত গরম। জাহান্নামের গরম বাতাস এবং গরম পানি শরীরের চামড়া জ্বালিয়ে দিয়ে হাড্ডী এবং কলিজা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। জান্নাতীদের অধিবাসীর চেয়ে জাহান্নামের অধিবাসীর সংখ্যা অনেক বেশী হবে। তাদের পোষাক হবে আগুনের। শাস্তি হবে বিভিন্ন ধরণের। শরীরের চামড়া জ্বালিয়ে দেয়া হবে, মাথায় গরম পানি ঢালা হবে, চেহারা জ্বালিয়ে দেয়া হবে, মুখের উপর উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তাদের মুখমন্ডল কালো হবে, আগুন তাদেরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলবে, হৃদয় পর্যন্ত আগুন পৌঁছে যাবে, নাড়ী-ভুঁড়ি বের হয়ে যাবে, তাদেরকে শিকল ও বেড়ি লাগিয়ে বেধে রাখা হবে। তারা যে শয়তান ও যেসমস্ত বাতিল মা'বৃদের অনুসরণ করত তারাও জাহান্নামীদের সাথে শাস্তি ভোগ করবে।
সম্মানিত পাঠক মণ্ডলী! আমরা আখেরাতে ঐ সমস্ত গুনাহগার মানুষের আযাবের বিভিন্ন অবস্থা ও তাদের পরিণতির কথা বর্ণনা করলাম যারা তাওবা না করে মৃত্যু বরণ করেছে কিংবা আল্লাহ তাদের গুনাহ ক্ষমা করেন নি।
তাওহীদপন্থী কোন মানুষ যদি আল্লাহর অপছন্দনীয় এমন কাজ করে মৃত্যু বরণ করে যা কোন সৎ আমলের মাধ্যমে মোচন করা হয়নি সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করে দিবেন না হয় শাস্তি দিবেন। শাস্তি দিলে মৃত্যুর পরই তা শুরু হবে। কবরে কারও শাস্তি কিয়ামত দিবস পর্যন্ত স্থায়ী হবে। কারও শাস্তি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বহাল থাকার পর মূলতবী করা হবে। আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রঃ) তার "রূহ্” নামক গ্রন্থে এই মাসআলাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।
হাশরের মাঠে কোন কোন গুনাহগার মু'মিনের শাস্তি হবে। কোন কোন অপরাধী গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য জাহান্নামে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট সময় অবস্থান করার পর সেখান থেকে বের হয়ে আসবে।
সহীহ হাদীছে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণিত হয়েছে,
يُعَذِّبُ نَاسٌ مِنْ أَهْلِ التَّوْحِيدِ فِي النَّارِ حَتَّى يَكُونُوا فِيهَا حُمَمًا ثُمَّ تُدْرِكُهُمُ الرَّحْمَةُ فَيُخْرَجُونَ وَيُطْرَحُونَ عَلَى أَبْوَابِ الْجَنَّةِ قَالَ فَيَرُشُ
অর্থঃ "তাওহীদে বিশ্বাসী কিছু লোককে জাহান্নামের আগুনের মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হবে। তারা আগুনে পুড়ে কয়লার মত হয়ে যাবে। পরিশেষে তাদেরকে আল্লাহর রহমতে আগুন থেকে বের করে জান্নাতের দরজার সামনে আনা হবে। জান্নাতবাসীগণ তাদের উপর পানির ছিটা দেয়ার সাথে সাথে তারা বন্যায় ভাসমান আবর্জনার উপর গজে উঠা তৃণলতার ন্যায় উত্থিত হবে। অতঃপর তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
এবিষয়ে আরো অনেক হাদীছ রয়েছে যা প্রমাণ করে, কৃত অপরাধের শাস্তি স্বরূপ কোন কোন মু'মিনও জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে। অতঃপর নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত শাস্তি ভোগ করার পর তারা সেখান থেকে বের হবে।
প্রতিটি মুসলিমের উচিত কিয়ামতের দিন নাজাতের উপায় অবলম্বন করা এবং আল্লাহর অপছন্দনীয় প্রতিটি কাজ থেকে এমন দিন আসার পূর্বেই তাওবা করা যেদিন সে তার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে এবং পুনরায় দুনিয়াতে আগমণ কামনা করবে, যাতে তারা সৎ কাজ করতে পারে অথবা মৃত্যুর ফেরেশতা দেখার পর কামনা করবে যে, তার বয়স বাড়িয়ে দেয়া হোক। অথচ ফেরেশতাগণ তার রূহ্ কবজ করার জন্য আগমণ করেছেন।
আল্লাহ বলেনঃ
وَلَنْ يُؤَخِّرَ اللَّهُ نَفْسًا إِذَا جَاءَ أَجَلُهَا وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ)
অর্থঃ "কারও মৃত্যুর সময় এসে গেলে আল্লাহ তাকে মুহূর্তের জন্যেও অবকাশ দিবেন না। আর আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে অবগত আছেন"। (সূরা মুনা'ফিকূনঃ ১১)
টিকাঃ
১. তিরমিজী, অধ্যায়ঃ ছিফাতুল জাহান্নাম।
📄 আখেরাতে মুমিন গুনাহগারদের অবস্থা
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আলেমদের মতে কোন গুনাহগার মুসলিম ব্যক্তিকে কাফের বলা বৈধ নয়। তবে কুরআন ও সুন্নায় যার কুফরী হওয়ার কথা এসেছে এবং তার সামনে দলীল-প্রমাণ সুস্পষ্ট হয়েছে, তার কথা ভিন্ন। এবং তার কুফরী যবরদস্তি বা অজ্ঞতা কিংবা সন্দেহের কারণে নয়। এমনিভাবে আল্লাহ এবং তদীয় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে সমস্ত মুশরিক, ইহুদী এবং নাসারাদেরকে কাফের হিসাবে ঘোষণা করেছেন তাদের কাফের হওয়ার ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ করা বৈধ নয়।
এথেকে জানা গেল, যে সমস্ত তাওহীদপন্থী মু'মিন আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করেনি এবং তাদের মধ্যে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার কোন কারণও পাওয়া যায়নি কিন্তু তারা গুনাহ ও পাপের কাজে লিপ্ত হয়েছে তাদের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে শাস্তি দিবেন অথবা ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ বলেনঃ
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ)
অর্থঃ "নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করেন না। শির্ক ব্যতীত অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করে থাকেন"। (সূরা নিসাঃ ৪৮)
কুরআন ও হাদীছে পাপী মু'মিনদের এমন অনেক আমলের বর্ণনা এসেছে যাতে তাদের জন্যে শাস্তির কথা উল্লেখ হয়েছে তবে উহা তাদের চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়া আবশ্যক করেনা। যে সমস্ত গুনাহগার মু'মিন তাদের কৃত অপরাধ থেকে মৃত্যুর পূর্বে তাওবা করেনি নিম্নে আমরা তাদের অবস্থা আলোকপাত করব।
📄 বেনামাযীর ভয়াবহ পরিণতি
ইচ্ছাকৃতভাবে যে ব্যক্তি একেবারেই নামায ছেড়ে দিবে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে কাফের হয়ে যাবে। কেননা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ অর্থঃ "আমাদের মাঝে ও তাদের (কাফেরদের) মাঝে অঙ্গিকার হলো নামায। সুতরাং যে ব্যক্তি নামায ছেড়ে দিবে সে কাফের হয়ে যাবে।' রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেনঃ
إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلَاةِ অর্থঃ "আল্লাহর বান্দা এবং কাফের-মুশরেকের মধ্যে পার্থক্য হলো নামায ছেড়ে দেয়া"।
তবে যে ব্যক্তি নামাযের ব্যাপারে অলসতা করবে চাই সে অলসতা যথাসময়ে আদায় না করার মাধ্যমে হোক বা ঘুমের মাধ্যমে হোক কিংবা শরীয়ত সম্মত পদ্ধতিতে নামায আদায়ে ত্রুটির মাধ্যমে হোক, সে কাফের না হলেও তার ব্যাপারে কঠিন শাস্তির হুমকি রয়েছে। সহীহ বুখারীতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্বপ্নের দীর্ঘ হাদীছে এসেছে,
وَإِنَّا أَتَيْنَا عَلَى رَجُلٍ مُضْطَجِعٍ وَإِذَا آخَرُ قَائِمٌ عَلَيْهِ بِصَخْرَةٍ وَإِذَا هُوَ يَهْوِي بِالصَّخْرَةِ لِرَأْسِهِ فَيَثلَغُ رَأْسَهُ فَيَتَهَدْهَدُ الْحَجَرُ هَا هُنَا فَيَتَّبِعُ الْحَجَرَ فَيَأْخُذُهُ فَلَا يَرْجِعُ إِلَيْهِ حَتَّى يَصِحَ رَأْسُهُ كَمَا كَانَ ثُمَّ يَعُودُ عَلَيْهِ فَيَفْعَلُ بِهِ مِثْلَ مَا فَعَلَ الْمَرَّةَ الْأُولَى
অর্থঃ "আমরা এক শায়িত ব্যক্তির কাছে আসলাম। তার মাথার কাছে পাথর হাতে নিয়ে অন্য একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল। দাঁড়ানো ব্যক্তি শায়িত ব্যক্তির মাথায় সেই পাথর নিক্ষেপ করছে। পাথরের আঘাতে তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং পাথরটি বলের মত গড়িয়ে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। লোকটি পাথর কুড়িয়ে আনতে আনতে আবার তার মাথা ভাল হয়ে যাচ্ছে। দাঁড়ানো ব্যক্তি প্রথমবারের মত আবার আঘাত করছে এবং
তার মাথাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সফরসঙ্গী ফেরেশতাদ্বয়কে জিজ্ঞেস করলেনঃ কি অপরাধের কারণে তাকে এভাবে শাস্তি দেয়া হচ্ছে? উত্তরে তারা বললেনঃ এব্যক্তি কুরআন শিক্ষা করেছিল। কিন্তু কুরআন অনুযায়ী আমল করেনি এবং সে ফরজ নামাযের সময় ঘুমিয়ে থাকত। কিয়ামত পর্যন্ত তাকে এভাবে শাস্তি দেয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
(فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ)
অর্থঃ "ধ্বংস ঐ সমস্ত নামাযীদের জন্যে যারা নামাযের ব্যাপারে উদাসীন”। (সূরা মাউনঃ ৪-৫)
হাফেজ ইবনে কাছির (রঃ) এই আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যায় বলেনঃ "তারা হয়ত প্রথম ওয়াক্তে নামায আদায় না করে সব সময় বা অধিকাংশ সময় দেরী করে নামায আদায় করে থাকে। অথবা নামাযের রুকন ও শর্তসমূহ যথাযথভাবে আদায়ের ব্যাপারে গাফিলতি করে থাকে অথবা তারা নামাযে মনোযোগ দেয়না এবং নামাযে কুরআন তিলাওয়াতের সময় তারা এর অর্থের মাঝে গবেষণা করেনা"।
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ مَنْ حَافَظَ عَلَيْهَا كَانَتْ لَهُ نُورًا وَبُرْهَانَا وَنَجَاةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنْ لَمْ يُحَافِظُ عَلَيْهَا لَمْ يَكُنْ لَهُ نُورٌ وَلَا بُرْهَانٌ وَلَا نَجَاةٌ وَكَانَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَعَ قَارُونَ وَفِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَأُبَيِّ بْنِ خَلَفٍ
অর্থঃ “যে ব্যক্তি নামাযের হেফাযত করবে কিয়ামতের দিন নামায তাঁর জন্য আলো, তার ঈমানের দলীল এবং নাজাতের উপায় হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি নামাযের হেফাযত করবেনা কিয়ামতের দিন তার জন্যে কোন আলো থাকবেনা, তার ঈমানের পক্ষে কোন প্রমাণ এবং তার নাজাতের
কোন উপায় থাকবেনা। কিয়ামতের দিন সে ফেরাউন, কারূন, হামান, এবং উবাই বিন খাল্ফের সাথে হাশরের মাঠে উপস্থিত হবে"।
কোন কোন বিদ্বান বলেছেনঃ বেনামাযীকে উক্ত চার শ্রেণীর নিকৃষ্ট মানুষের সাথে হাশরের মাঠে উঠানোর কারণ হলো মানুষ সাধারণতঃ ধন-সম্পদ, রাজত্ব, মন্ত্রিত্ব ও ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত থেকেই নামায থেকে বিরত থাকে। ধন-সম্পদ নিয়ে ব্যস্ত থেকে নামায পরিত্যাগ করলে কুখ্যাত ধনী কারূনের সাথে হাশর হবে। রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে ব্যস্ত থেকে নামায পরিত্যাগ করলে ফেরাউনের সাথে হাশর হবে। মন্ত্রিত্ব নিয়ে ব্যস্ত থেকে নামায নষ্ট করলে ফেরাউনের মন্ত্রী হামানের সাথে হাশর হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত থেকে নামায ছেড়ে দিলে মক্কার কাফের ব্যবসায়ী উবাই বিন খাল্ফের সাথে হাশর হবে। এধরণের অপমানকর অবস্থা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
📄 যাকাত না দেয়ার শাস্তি
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَرْتُمْ لِأَنفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنتُمْ تَكْنِزُونَ)
অর্থঃ আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে আর তা হতে আল্লাহর পথে ব্যয় করেনা তাদেরকে যন্ত্রনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দিন। সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার মাধ্যমে তাদের ললাটসমূহে, পার্শ্বদেশসমূহে ও পৃষ্ঠদেশসমূহে দাগ দেয়া হবে। বলা হবে এগুলো ঐ সকল সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা করে রেখেছিলে। সুতরাং এখন স্বাদ গ্রহণ কর জমা করে রাখা বস্তুর। (সূরা তাওবাঃ ৩৪-৩৫)
সহীহ বুখারীতে আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ مَنْ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثْلَ لَهُ مَالُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شُجَاعًا أَقْرَعَ لَهُ زَبِيبَتَانِ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ يَأْخُذُ بِلهْزِمَتَيْهِ يَعْنِي بِشِدْقَيْهِ ثُمَّ يَقُولُ أَنَا مَالُكَ أَنَا كَنْزُكَ ثُمَّ تَلَا وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
অর্থঃ "আল্লাহ যাকে ধন-সম্পদ দান করেছেন সে যদি তার যাকাত না দেয় কিয়ামতের দিন তার ধন-সম্পদগুলোকে টাক মাথা বিশিষ্ট সাপে পরিণত করা হবে। তার চোখের উপরে দু'টি কালো বিন্দু থাকবে। সাপটি তার চিবুকে কামড়িয়ে ধরবে এবং বলবেঃ আমি তোমার মাল। আমিই তোমার গুপ্তধন”। অতঃপর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরআনের এ আয়াতটি পাঠ করলেনঃ وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ)
অর্থঃ "যাদেরকে আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে ধন-সম্পদ দান করেছেন, তারা যদি তাতে কৃপণতা করে, এই কৃপণতা তাদের জন্য মঙ্গলকর হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে। বরং এটা তাদের জন্য একান্তই ক্ষতিকর। যাতে তারা কার্পণ্য করে, সে ধন-সম্পদকে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ি বানিয়ে পরানো হবে”। (সূরা আল ইমরানঃ ১৮০)
সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ مَا مِنْ صَاحِب ذَهَب وَلَا فِضَّةٍ لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ صُفْحَتْ لَهُ صَفَائِحَ مِنْ نَارٍ فَأُحْمِيَ عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَيُكْوَى بِهَا جَنْبُهُ وَجَبِينُهُ وَظَهْرُهُ كُلَّمَا بَرَدَتْ أُعِيدَتْ لَهُ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ
أَلْفَ سَنَةٍ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ الْعِبَادِ فَيَرَى سَبِيلَهُ إِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ وَإِمَّا إِلَى النَّارِ قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَالْإِبِلُ قَالَ وَلَا صَاحِبُ إِبِلِ لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا وَمِنْ حَقِّهَا حَلَبُهَا يَوْمَ وِرْدِهَا إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ بُطِحَ لَهَا بِقَاعٍ قَرْقَرٍ أَوْفَرَ مَا كَانَتْ لَا يَفْقَدُ مِنْهَا فَصِيلًا وَاحِدًا تَطَؤُهُ بِأَخْفَافِهَا وَتَعَضُّهُ بِأَفْوَاهِهَا كُلَّمَا مَرَّ عَلَيْهِ أُولَاهَا رُدَّ عَلَيْهِ أُخْرَاهَا فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ الْعِبَادِ فَيَرَى سَبِيلَهُ إِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ وَإِمَّا إِلَى النَّارِ قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَالْبَقَرُ وَالْغَنَمُ قَالَ وَلَا صَاحِبُ بَقَرٍ وَلَا غَنَمِ لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ بُطِحَ لَهَا بِقَاعٍ قَرْقَرٍ لَا يَفْقِدُ مِنْهَا شَيْئًا لَيْسَ فِيهَا عَقْصَاءُ وَلَا جَلْحَاءُ وَلَا عَضْبَاءُ تَنْطَحُهُ بِقُرُونِهَا وَتَطَؤُهُ بِأَخْلَافِهَا كُلَّمَا مَرَّ عَلَيْهِ أُولَاهَا رُدَّ عَلَيْهِ أُخْرَاهَا فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ الْعِبَادِ فَيَرَى سَبِيلَهُ إِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ وَإِمَّا إِلَى النَّارِ
অর্থঃ "যে স্বর্ণ-রৌপ্যের মালিক তার স্বর্ণ-রৌপ্যের যাকাত প্রদান করবেনা কিয়ামতের দিন তার স্বর্ণ-রৌপ্যগুলোকে আগুন দিয়ে গলিয়ে চ্যাপটা করা হবে। অতঃপর জাহান্নামের আগুনে গরম করে তার পার্শ্বদেশে, পিঠে এবং কপালে তা দিয়ে সেঁক দেয়া হবে। ঠান্ডা হয়ে গেলে আবার গরম করা হবে। এমন একদিনে তাদের এ শাস্তি চলতে থাকবে যার পরিমাণ হবে দুনিয়ার পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। হাশরের মাঠে মানুষের মাঝে ফয়সালা শেষ হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে এভাবে শাস্তি দেয়া হবে। পরিশেষে সে জান্নাত অথবা জাহান্নামে প্রবেশ করবে"।
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে প্রশ্ন করা হলো উট ওয়ালার কি অবস্থা হবে? উত্তরে তিনি বললেনঃ উটের মালিক যদি উহার
হক আদায় না করে অর্থাৎ যাকাত না দেয় কিয়ামতের দিন একটি সমতল ভূমিতে উটগুলোকে পূর্বের চেয়ে মোটা-তাজা অবস্থায় একত্রিত করা হবে। তা থেকে একটি বাচ্চাও বাদ পড়বেনা। উটগুলো পা দিয়ে তাদের মালিককে পিষতে থাকবে এবং দাঁত দিয়ে কামড়াতে থাকবে। যখন প্রথম দলের পালা শেষ হবে পরবর্তী দলের পালা আসবে। এমন এক দীর্ঘ দিনে তাদের এশাস্তি চলতে থাকবে যার পরিমাণ হবে দুনিয়ার পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। মানুষের মাঝে ফয়সালা শেষ হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত হাশরের মাঠে তাকে এভাবে শাস্তি দেয়া হবে। পরিশেষে সে জান্নাত অথবা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে প্রশ্ন করা হলো গরু এবং ছাগলের মালিকের কি অবস্থা হবে? উত্তরে তিনি বললেনঃ গরু বা ছাগলের মালিক যদি উহার হক আদায় না করে অর্থাৎ যাকাত না দেয় কিয়ামতের দিন একটি সমতল ভূমিতে গরু ও ছাগলগুলোকে একত্রিত করা হবে। তা থেকে একটিও বাদ পড়বেনা এবং কোনটিই শিংবিহীন, বাঁকা শিং, অথবা ভাঙ্গা শিংবিশিষ্ট থাকবেনা। অর্থাৎ সবগুলো পূর্বের চেয়ে মোটা-তাজা এবং ধারালো সোজা শিংবিশিষ্ট থাকবে। শিং দিয়ে তাদের মালিককে আঘাত করবে এবং পা দ্বারা পিষতে থাকবে। এমন এক দীর্ঘ দিনে তাদের এশাস্তি চলতে থাকবে যার পরিমাণ হবে দুনিয়ার পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। মানুষের মাঝে ফয়সালা শেষ হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত হাশরের মাঠে তাকে এভাবে শাস্তি দেয়া হবে। পরিশেষে সে জান্নাত অথবা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।