📄 হাশরের মাঠের একদিন
হাশরের মাঠের একটি দিনের পরিমাণ হবে দুনিয়ার পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। এদিনের দীর্ঘতা দেখে মানুষ মনে করবে দুনিয়াতে তারা মাত্র সামান্য সময় বসবাস করেছিল। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ )
অর্থঃ “ফেরেশতাগণ এবং রূহ্ (জিবরীল আঃ) আল্লাহর দিকে উর্ধগামী হবেন এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান।” (সূরা মাআ'রিজঃ ৪)
📄 মাথার উপরে সূর্যের আগমন
দুনিয়াতে আমরা যেই সূর্যের আলো পাচ্ছি তা বৈজ্ঞানিকদের হিসাব মতে আমাদের পৃথিবী থেকে কোটি কোটি মাইল দূরে অবস্থিত। হাশরের মাঠে সূর্য মানুষের মাথার উপরে মাত্র এক মাইলের দূরত্বে চলে আসবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
تَدْنُو الشَّمْسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنَ الْخَلْقِ حَتَّى تَكُونَ مِنْهُمْ كَمِقْدَارِ مِيلٍ فَيَكُونُ النَّاسُ عَلَى قَدْرِ أَعْمَالِهِمْ فِي الْعَرَقِ فَمِنْهُمْ مَنْ يَكُونُ إِلَى كَعْبَيْهِ وَمِنْهُمْ مَنْ يَكُونُ إِلَى رُكْبَتَيْهِ وَمِنْهُمْ مَنْ يَكُونُ إِلَى حَقُوَيْهِ وَمِنْهُمْ مَنْ يُلْحِمُهُ الْعَرَقُ إِلْجَامًا قَالَ وَأَشَارَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِهِ إِلَى فِيهِ
অর্থঃ "কিয়ামতের দিন সূর্য মানুষের মাথার উপরে চলে আসবে। মাত্র এক মাইলের ব্যবধান থাকবে। মানুষেরা তাদের নিজ নিজ আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে হাবুডুবু খাবে। মানুষের শরীরের পঁচা ঘাম কারো টাখনু পর্যন্ত পৌছে যাবে। কারো হাঁটু পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত এবং কারো নাকের ডগা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। একথা বলার পর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মুখের দিকে ইঙ্গিত করে দেখালেন"।
📄 শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে কাফেরদের হাশর
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَوَاتُ وَبَرَزُوا لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ وَتَرَى الْمُجْرِمِينَ يَوْمَئِذٍ مُقَرَّنِينَ فِي الْأَصْفَادِ سَرَابِيلُهُمْ مِنْ قَطِرَانٍ وَتَغْشَى وُجُوهَهُمُ النَّارُ)
অর্থঃ "সেদিন পরিবর্তিত করা হবে এ পৃথিবীকে অন্য এক পৃথিবীতে এবং পরিবর্তিত করা হবে আসমানসমূহকে এবং লোকেরা পরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে হাজির হবে। আপনি ঐদিন পাপীদেরকে পরস্পরে শৃংখলাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পাবেন। তাদের পোষাক হবে দাহ্য আলকাতরার এবং তাদের মুখমণ্ডল আগুন আচ্ছন্ন করে ফেলবে।” (সূরা ইবরাহীমঃ ৪৮-৫০)
অতঃপর সে ভয়ানক দিনে পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে যাবে। বর্তমানে যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায় থাকবেনা। বুখারী ও মুসলিম শরীফে সাহল বিন সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى أَرْضٍ بَيْضَاءَ عَفْرَاءَ كَقُرْصَةِ نَقِي قَالَ سَهْلُ أَوْ غَيْرُهُ لَيْسَ فِيهَا مَعْلَمُ لِأَحَدٍ
অর্থঃ "সকল মানুষকে কিয়ামতের দিন সাদা ময়দার রূটির মত পরিস্কার একটি ভূমিতে উপস্থিত করা হবে। তাতে কারও কোন নিশানা থাকবে না"। মানুষ তখন পুলসিরাতের উপর থাকবে। কেননা মুসলিম শরীফে আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেনঃ আমিই সর্বপ্রথম রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আল্লাহর বাণী, يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَوَاتُ )
অর্থঃ "সে দিন আকাশ ও যমিনের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে যাবে" এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করেছি। আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলামঃ মানুষ তখন কোথায় অবস্থান করবে? তিনি বললেনঃ পুল সিরাতের উপর"।
সে দিন কাফের ও পাপিষ্ঠদের একজনকে অন্যজনের সাথে বাঁধা অবস্থায় দেখা যাবে। প্রত্যেককে তার স্বজাতীয় লোকের সাথে একত্রিত করা হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
( احْشُرُوا الَّذِينَ ظَلَمُوا وَأَزْوَاجَهُمْ وَمَا كَانُوا يَعْبُدُونَ )
অর্থঃ "জালেমদেরকে এবং তাদের সঙ্গীদেরকে একত্রিত কর”। (সূরা আস্-সাফ্ফাতঃ ২২) তাদের হাত, পা এবং ঘাড় শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দেখা যাবে। তাদেরকে আলকাতরার পোষাক পরিয়ে দেয়া হবে। আগুন তাদের চেহারা ঢেকে ফেলবে।
📄 অন্ধ অবস্থায় কাফেরদের হাশর
কাফেরদেরকে অন্ধ অবস্থায় টেনে হাশরের মাঠে আনা হবেঃ আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
( وَنَحْشُرُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى وُجُوهِهِمْ عُمْيًا وَبُكْمًا وَصُمًّا مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ كُلَّمَا خَبَتْ زِدْنَاهُمْ سَعِيرًا )
অর্থঃ "আমি কিয়ামতের দিন তাদের সমবেত করব তাদের মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায় এবং অন্ধ, বোবা ও বধির অবস্থায়। তাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। যখনই জাহান্নামের অগ্নি নির্বাপিত হওয়ার উপক্রম হবে তখনই আমি তাদের জন্য অগ্নি আরো বৃদ্ধি করে দিব।" (সূরা বানী ইসরাঈলঃ ৯৭)
বুখারী ও মুসলিম শরীফে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে,
( إِنَّ رَجُلًا قَالَ يَا نَبِيَّ اللَّهِ كَيْفَ يُحْشَرُ الْكَافِرُ عَلَى وَجْهِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ قَالَ أَلَيْسَ الَّذِي أَمْشَاهُ عَلَى الرِّجْلَيْنِ فِي الدُّنْيَا قَادِرًا عَلَى أَنْ يُمْشِيَهُ عَلَى وَجْهِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ )
অর্থঃ "জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! কিভাবে কিয়ামতের দিন কাফেরকে মুখের উপর ভর দিয়ে হাঁটানো হবে? উত্তরে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ দুনিয়াতে যিনি তাকে
দু'পায়ের উপর হাঁটাতে সক্ষম ছিলেন তিনি কি কিয়ামতের দিন মুখের উপর হাঁটাতে সক্ষম নন? আল্লাহ কাফেরদের আযাবের ব্যাপারে আরো বলেনঃ
(إِنَّ الْمُجْرِمِينَ فِي ضَلَالٍ وَسُعُرٍ يَوْمَ يُسْحَبُونَ فِي النَّارِ عَلَى وُجُوهِهِمْ ذُوقُوا مَسَّ سَقَرَ)
অর্থঃ "নিশ্চয়ই অপরাধীরা পথভ্রষ্ট ও আযাবে নিপতিত। যেদিন তাদেরকে মুখের উপর করে টেনে নেয়া হবে জাহান্নামের দিকে। বলা হবেঃ জাহান্নামের যন্ত্রনা আস্বাদন কর। (সূরা কামারঃ ৪৭-৪৮)
হাশরের মাঠে প্রচণ্ড গরমের সাথে সাথে তারা পিপাসায় কাতর থাকবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
(وَنَسُوقُ الْمُجْرِمِينَ إِلَى جَهَنَّمَ وِرْدًا)
অর্থঃ "এবং আমি অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাব।” (সূরা মারইয়ামঃ ৮৬)
এটি নিঃসন্দেহে একটি কঠিন অবস্থা যেখানে তাদেরকে অপমানিত, লাঞ্ছিত, পিপাসিত ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা পানি চেয়ে চিৎকার করবে, কিন্তু পানি দেয়া হবে না, তারা ডাকা-ডাকি করবে, কিন্তু তাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবে না, তারা সুপারিশের অনুসন্ধান করবে, কিন্তু তাদের জন্যে কোন সুপারিশকারী থাকবেনা।