📄 মৃত্যুর সময় কাফেরের করুণ অবস্থা
অপর পক্ষে কাফের ব্যক্তির যখন দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণের সময় হয় তখন কালো বর্ণের একদল ফেরেশতা এসে উপস্থিত হন। তাদের সাথে থাকে দুর্গন্ধযুক্ত কাপড়। চোখের দৃষ্টি যতদূর যায় তথায় তারা বসে থাকেন। তারপর মৃত্যুর ফেরেশতা এসে তাকে বলেনঃ ওহে অপবিত্র আত্মা! বেরিয়ে আয় আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির দিকে। কাফের বা পাপীর আত্মা তখন দেহের মাঝে পালাতে চেষ্টা করে। কিন্তু ফেরেশতা তাকে এমনভাবে টেনে বের করেন যেমনভাবে লোহার পেরেককে ভিজা পশমের মধ্য থেকে টেনে বের করা হয়। তার রূহ্ বের হওয়ার সময় শরীরের রগসমূহ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার উপর আকাশ ও যমিনের মধ্যকার সকল ফেরেশতা লা'নত করতে থাকেন। আকাশের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রত্যেক দরজার ফেরেশতাগণ আল্লাহর কাছে দু'আ করেন যাতে ঐ ব্যক্তির রূহ তাদের দরজা দিয়ে না উঠানো হয়। তার রূহকে দুর্গন্ধযুক্ত কাপড়ে রাখা হয়। তা থেকে মরা-পঁচা মৃত দেহের দুর্গন্ধের ন্যায় দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। ফেরেশতাগণ তাকে আকাশের দিকে উঠাতে থাকেন। যেখান দিয়েই গমণ করেন সেখানের ফেরেশতাগণ জিজ্ঞেস করেনঃ এই অপবিত্র আত্মা কার? উত্তরে ফেরেশতাগণ অতি মন্দ নাম উচ্চারণ করে বলতে থাকেনঃ অমুকের পুত্র অমুকের। আকাশে পৌছে তার জন্যে আকাশের দরজা খুলতে বলা হলে আকাশের দরজা খোলা হয় না। অতঃপর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করলেনঃ
(لَا تُفَتَّحُ لَهُمْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَلَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمِّ الْخِيَاطِ)
অর্থঃ "তাদের জন্য আকাশের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পরবেনা যে পর্যন্ত না সূচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করে"। (সূরা আ'রাফঃ ৪০)
তারপর বলা হয় সাত যমিনের নীচে সিজ্জীনে তার নাম লিখে দাও এবং তার রূহ যমিনের যেখানে দাফন করা হয়েছে সেখানে ফেরত দাও। কেননা আমি যমিন থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যমিনেই ফিরিয়ে দিব এবং সেখান থেকেই তাকে পুনরায় জীবিত করব। তারপর তার রূহকে যমিনের দিকে নিক্ষেপ করা হয়। অতঃপর কাফেরের দেহ যেখানে দাফন করা হয়েছে রূহটি সেখানে গিয়ে পতিত হয়। এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করলেনঃ (وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنْ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي به الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سَحِيقٍ )
অর্থঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক করল সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়ল। অতঃপর মৃতভোজী পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোন দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল"। (সূরা হজ্জঃ ৩১)
📄 কবরে কাফেরের করুণ অবস্থা
অতঃপর তার রূহকে দেহে ফেরত দেয়া হয়। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তাকে দাফন করে যখন লোকেরা চলে যায় তখন দু'জন ফেরেশতা আগমন করেন এবং কঠিনভাবে ধমকাতে থাকেন। অতঃপর তাকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ তোর প্রভু কে? সে উত্তর দেয়ঃ আফসোস! আমি জানিনা। আবার জিজ্ঞেস করেনঃ তোর দ্বীন কি? জবাবে সে বলেঃ হায়! আমি তো এটা অবগত নই। তারপর জিজ্ঞেস করেনঃ তোদের কাছে যে লোকটিকে পাঠানো হয়েছিল তাঁর সম্পর্কে তোর ধারণা কি? সে উত্তরে বলেঃ হায় আফসোস! আমি তা জানিনা। তার সম্পর্কে মানুষ যা বলত আমিও তাই বলতাম। তখন আকাশ থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা করেনঃ এই লোক মিথ্যা বলছে। তাকে জাহান্নামের পোষাক পরিয়ে দাও, তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং তার জন্যে জাহান্নামের দরজা খুলে দাও। যাতে তার কাছে জাহান্নামের গরম বাতাসও তাপ পৌঁছতে পারে। তার কবর অতি সংকীর্ণ করে দেয়া হয়। মাটি তাকে এমনভাবে চেপে ধরে যাতে তার এক পার্শ্বের হাড় অপর পার্শ্বে ঢুকে যায়।
অতঃপর কালো চেহারা বিশিষ্ট, কালো পোষাক পরিহিত ও দুর্গন্ধযুক্ত এক ভয়ানক আকারের লোক এসে বলতে থাকেঃ তুই দুঃখের সংবাদ গ্রহণ কর। ধংস হোক তোর! আজ তোর সেই দিন যার অঙ্গিকার তোর সাথে করা হয়েছিল। তখন কাফের বা মুনাফিক ব্যক্তি বলেঃ তোমার পরিচয় কি? তোমার চেহারা দেখেই মনে হচ্ছে তুমি কোন দুঃখের সংবাদ নিয়ে এসেছো। উত্তরে লোকটি বলেঃ আমি তোর সেই খারাপ আমল যা তুই দুনিয়াতে করেছিলে। আল্লাহর শপথ করে বলছিঃ তুই ছিলে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে গাফেল এবং আল্লাহর নাফরমানীতে ছিলে তুই অগ্রগামী।
অতঃপর তার কবরে একজন বোবা ও বধির ফেরেশতা পাঠানো হয়। তার হাতে থাকে লোহার এমন একটি হাতুড়ি, তা দিয়ে যদি কোন কঠিন পাহাড়ে আঘাত করা হতো তাহলে উক্ত পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধূলায় পরিণত হয়ে যেত। তা দিয়ে তাকে এমন জোরে প্রহার করা হয় যাতে সে মাটির সাথে মিশে যায়। আল্লাহ তাকে পুনরায় জীবিত করেন। ফেরেশতা আবার তাকে আঘাত করেন। সে এমন প্রকটভাবে চিৎকার করতে থাকে যার আওয়াজ জিন-ইনসান ব্যতীত সকল সৃষ্টিজীবই শুনতে পায়। অতঃপর তার জন্যে জাহান্নামের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দেয়া হয়। কিয়ামতের দিন যেহেতু তার জন্যে আরো কঠিন আযাব রয়েছে তাই সে বলবেঃ হে আল্লাহ! কিয়ামত যেন না হয়।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদেরকে কবরের এই ভয়াবহ আযাব থেকে হেফাযত করেন।
📄 কাফেরদের মৃত্যু যন্ত্রণা
মৃত্যুর সময় কাফেরেরা খুবই কঠিন ও ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
(وَلَوْ تَرَى إِذْ الظَّالِمُونَ فِي غَمَرَاتِ الْمَوْتِ وَالْمَلَائِكَةُ بَاسِطُوا أَيْدِيهِمْ أَخْرِجُوا أَنفُسَكُمُ الْيَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْهُونِ بِمَا كُنتُمْ تَقُولُونَ عَلَى اللهِ غَيْرَ الْحَقِّ وَكُنتُمْ عَنْ آيَاتِهِ تَسْتَكْبِرُونَ)
অর্থঃ "আপনি যদি জালিমদেরকে ঐ সময়ে দেখতে পেতেন যখন তারা মৃত্যু যন্ত্রনায় থাকবে এবং ফেরেশতাগণ হাত বাড়িয়ে বলবেনঃ তোরা নিজেরাই নিজেদের প্রাণ বের করে আন। তোদের আমলের কারণে আজ তোদেরকে অবমাননাকর আযাব দেয়া হবে। কারণ তোরা আল্লাহর উপর
মিথ্যারোপ করেছিলে এবং তোরা তাঁর আয়াতের বিরুদ্ধে অহংকার করেছিলে"। (সূরা আনআমঃ ৯৩)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আব্দুর রাহমান আস-সা'দী (রঃ) বলেনঃ আপনি যদি কাফেরদের মৃত্যুকালীন কঠিন অবস্থা প্রত্যক্ষ করতেন তাহলে অবশ্যই এমন ভয়াবহ অবস্থা প্রত্যক্ষ করতেন যা কারও পক্ষে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। কাফেরদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতাগণ তাদেরকে আঘাত করতে থাকেন এবং বলতে থাকেনঃ তোরা নিজেরাই নিজেদের প্রাণ বের করে আন। আজ তোদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করা হবে। আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ, রাসূলগণ কর্তৃক আনীত সত্য প্রত্যাখ্যান ও আল্লাহর আয়াতের সাথে অহংকার করার কারণে তোদের এই শাস্তি। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
(وَلَوْ تَرَى إِذْ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ وَذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ)
অর্থঃ "আর যদি আপনি দেখেন যখন ফেরেশতারা কাফেরদের জান কবজ করার সময় তাদের মুখে এবং তাদের পশ্চাদদেশে প্রহার করতে করতে বলবেনঃ তোরা জ্বলন্ত আগুনের আযাবের স্বাদ গ্রহণ কর"। (সূরা আনফালঃ ৫০)
বারা' বিন আযিব (রাঃ) এর হাদীছে এসেছে, কাফেরের মৃত্যুর সময় মালাকুল মাউতের সাথে কুৎসিত চেহারা বিশিষ্ট একদল কঠিন প্রকৃতির ফেরেশতা আগমন করেন। কাফেরের রূহকে বলা হয়, হে অপবিত্র আত্মা! আগুন ও গরম পানির আযাবের দিকে বের হয়ে আয়। একথা শুনে তার রূহ্ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পালাতে চেষ্টা করে। কিন্তু ফেরেশতাগণ অত্যন্ত কঠিনভাবে তার রূহকে টেনে বের করেন।