📄 নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের দ্বিতীয় যুগ : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত (১৯১৯-১৯৪৫ খ্রি.)
ফ্যাসিবাদ ও গণতন্ত্রের যুদ্ধ
যেমনটা আমরা পূর্বে বর্ণনা করেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভার্সাই চুক্তির ফলে। কারণ এর মাধ্যমে জার্মানির ওপর সামরিক অবরোধ আরোপ করা হয়। তাদের সম্পদসমৃদ্ধ এলাকা ফ্রান্সকে দিয়ে দেওয়া হয়। শুধু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জার্মানিকে যুদ্ধ শুরুর অপরাধে সমস্ত জোটশক্তির যুদ্ধব্যয় আদায়ে বাধ্য করা হয়। জার্মানির কাছে তখন সম্পদসমৃদ্ধ এলাকা এবং জমানো কোনো অর্থ বাকি ছিল না। জার্মান জাতির মধ্যে এই চুক্তির বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিক্রিয়া জন্ম নিয়েছিল। বিশেষ করে চুক্তির সেই পয়েন্টের কারণে যেখানে জার্মানিকে যুদ্ধের একক দায়ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়। জার্মান জাতি এই চুক্তিকে জাতীয় অপমান হিসেবে গণ্য করে। এই চুক্তি জার্মান জাতির জন্য এটা ব্যতীত আর কোনো রাস্তা খোলা রাখেনি যে, তারা হয়তো সারা জীবন গোলামের মতো ট্যাক্স আদায় করে যাবে, নতুবা এই চুক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। বিদ্রোহের জন্য তাদের শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল, যা হিটলার এসে পূরণ করে দেয়।
**হিটলার ও ফ্যাসিবাদের উত্থান**
হিটলার ১৮৮৯ সালে অস্ট্রিয়াতে জন্মগ্রহণ করে। তার ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে আর্টিস্ট হবে, তাই আর্টিস্ট হওয়ার জন্য সে অস্ট্রিয়ার ভিয়ানাতে আসে। কিন্তু সে আর্ট কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। ফলে তার ইতিহাস, ভূগোল ও দর্শন নিয়ে পড়ার সুযোগ হয়। সেগুলো অধ্যয়নের পর হিটলার এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, ইউরোপের সমস্যাগুলোর বড় কারণ দুটি। এক. গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আর দুই. ইহুদি জাতি। তার ধারণামতে ইহুদিরা পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্যকে দখল করে নিয়েছে এবং প্রত্যেক ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের পেছনে তাদের হাত রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সে ধারণা করত গণতন্ত্র ইহুদিদের শাসনব্যবস্থা। যা মানুষকে দুর্বল নেতৃত্ব দেয় এবং সেই নেতৃত্বকে ইহুদিরা সহজেই কব্জা করে নেয়। সে ভিয়ানাতে থাকাকালীন ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। হিটলার তাতে অংশ নেওয়ার জন্য জার্মান বাহিনীতে ভর্তি হয়, যেখানে সে দুবার আহত হয়। যুদ্ধে হিটলারের বীরত্ব অনেক প্রসিদ্ধি লাভ করে। তার বাহাদুরির ফলে তাকে জার্মানির সবচেয়ে বড় সামরিক সম্মাননা আইরোন ক্রস প্রদান করা হয়। ১৯১৯ সালে সে যুদ্ধের ময়দানে বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই জার্মানির পরাজয়ের খবর তার কাছে পৌঁছায়।
এই পরাজয় হিটলারের জীবন পরিবর্তন করে দেয়। সে রাজনীতিতে প্রবেশের ইচ্ছা করে। কিন্তু হিটলারের সামনে তখন এই প্রশ্ন আসে যে, সে রাজনীতির জন্য কোন পার্টিতে অন্তর্ভুক্ত হবে। সেই সময় তার সাক্ষাৎ হয় একটি ছোট দল নাজি পার্টির সাথে, যেখানে সর্বসাকুল্যে ২৫ জন সদস্য ছিল। এই পার্টি জার্মান জাতিকে বিদ্যমান সমস্যা থেকে বের করার দৃঢ় ইচ্ছা রাখত। হিটলারের দৃঢ় প্রতিজ্ঞাও তাদের সাথে মিলে যায়। সে এই পার্টিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সময় জার্মানির অবস্থা ছিল এমন যে, ভার্সাই চুক্তি জার্মানির সমাজকে ধ্বংসের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। এই অবস্থা হিটলারের কাছে উপযুক্ত মনে হয়। তার ভাষণগুলো পুরো জার্মানিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। সে মৃতপ্রায় জার্মান জাতির মধ্যে এই অনুভূতি সৃষ্টি করে যে, জার্মানরা দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তম জাতি এবং এই জাতিকে গোলাম বানানোর অধিকার কারও নেই। পুরো ইউরোপকে শাসন করার অধিকার একমাত্র জার্মানিদেরই রয়েছে। সে ভার্সাই চুক্তিকে বিলুপ্ত করে দেয় এবং এই চুক্তির ওপর দস্তখত করার সমস্ত অভিযোগ রাষ্ট্রের সকল স্যোশালিস্ট ও ইহুদি পার্টির ওপর চাপিয়ে দেয়। সে জার্মানিদের সমস্যার মূল কারণ ইহুদিদেরকে সাব্যস্ত করে এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করে যে, সে শক্তিশালী হওয়ার পর পুরো ইউরোপ থেকে ইহুদিদের বের করে দেবে। সে জার্মান জাতির সাথে প্রতিজ্ঞা করে, যদি ক্ষমতায় যায়, তাহলে ভার্সাই চুক্তির বাস্তবায়নকে বন্ধ করে দেবে। এটাই ছিল সেই স্লোগান, যা ১৯২০ সালের সেই সময়ে জার্মান জাতি শুনতে এবং মানতে উন্মুখ হয়ে ছিল।
১৯৩১ সালে হিটলারের নাজি পার্টি সামান্য কিছু ভোট নিয়ে পার্লামেন্টে যায়। কিন্তু ১৯৩৩ সালে এই পার্টি ক্ষমতায় যেতে সক্ষম হয়ে যায়। সেই বছরেই হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হয়ে যায়; কিন্তু সে চ্যান্সেলর উপাধি ধারণের পরিবর্তে 'ফুয়েরার' উপাধি ধারণ করে। যার অর্থ ছিল 'নেতা'। ক্ষমতায় যাওয়ার পর তার সমস্ত কাজ ভার্সাই চুক্তির বিরুদ্ধে যাওয়া শুরু করে। সে সমস্ত ধারা বাস্তবায়নে বাধা দেয় এবং অপরদিকে সে জার্মান বাহিনীকে নতুনভাবে সজ্জিত করতে থাকে। সেই সাথে সে ট্যাঙ্ক, কামান ও বিমান বানানোর আদেশ জারি করে। ১৯৩৬ সালে সে রাইনল্যান্ড হামলা করে দখল করে নেয়। ১৯৩৮ সালে যুদ্ধ ছাড়াই সে অস্ট্রিয়া দখল করে নেয়। এরপর ১৯৩৮ সালে হিটলার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর সাথে এক চুক্তির মাধ্যমে যুগোস্লাভিয়ার জার্মানির অংশ দখল করে নেয় এবং কয়েক মাসে পুরো দেশ দখল করে নেয়।
পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে হিটলার মুসোলিনির পেশ করা ফ্যাসিবাদকে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। হিটলারের উত্থানের সাথে সাথে ফ্যাসিবাদও ইউরোপে উত্থান হতে থাকে। ফ্যাসিবাদের উত্থানের ফলে ইউরোপে পুঁজিবাদী গণতন্ত্র বিপদে পড়ে যায়। ফ্যাসিবাদের ভিত্তি ছিল দুটি থিউরির ওপর :
**জাতীয়তাবাদ**
**একনায়কতন্ত্র**
হিটলার একদিকে জার্মান জাতীয়তাবাদকে উজ্জীবিত করে নিজেকে সবচেয়ে উত্তম ও সবার ওপর রাজত্ব করার অধিকারী প্রমাণ করে। অপরদিকে সে এই পদ্ধতিতে জার্মানিদের পরিচালিত করে যে, পুরো জাতি শুধু একজন ব্যক্তির ইশারায় চলতে থাকে।
**দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ**
১৯৩৯ সালে হিটলার পোল্যান্ডে হামলা করে ১৮ দিন যুদ্ধের পর পোল্যান্ড দখল করে নেয়। পোল্যান্ড দখল করার সাথে সাথেই ব্রিটেন ও ফ্রান্স যুদ্ধের জন্য লাফঝাঁপ শুরু করে। আর এভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এই যুদ্ধে ইতালি জার্মানির সাথে অংশ নেয়। জার্মানরা পোল্যান্ডের পর ফ্রান্স ও নরওয়ে দখল করে নেয়। পশ্চিম ইউরোপের পর জার্মানি তার নিশানা পূর্ব ইউরোপের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। সে রাশিয়ার ওপর তিনবার হামলা করে; কিন্তু প্রতিকূল মৌসুমি অবস্থার ফলে মস্কো দখল করতে পারেনি। আর এখান থেকেই তার পতন শুরু হয়। রাশিয়ার ওপর হামলার সাথে সাথে সে ইতালির সাহায্যে ব্রিটেনের অধীন মিশরের ওপরও হামলা করে বসে।
জার্মানির এই বিজয়গুলোর সামনে ১৯৪১ সালে যখন ব্রিটেনের পরাজয় নিশ্চিত হচ্ছিল, তখনই আমেরিকা তাদের সাহায্যে ময়দানে নামে। অন্যদিকে জাপান আমেরিকার সাথে শত্রুতার ভিত্তিতে জার্মানির সাথে অংশ নেয়। যার ফলে একদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার জোট হয় এবং অপরদিকে জার্মানি, ইতালি ও জাপানের জোট হয়। রাশিয়া কোনো জোটে প্রবেশ করা ব্যতীতই জার্মানির বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। হিটলারের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল, সে বিভিন্ন অঞ্চলে ও বিভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে একই সাথে যুদ্ধফ্রন্ট খুলে রেখেছিল। যার ফলে এই অবস্থায় যুদ্ধকে দীর্ঘ দিন টিকিয়ে রাখতে সে সক্ষম হয়নি। এই যুদ্ধে আমেরিকা জাপানের ওপর এটম বোমা নিক্ষেপ করে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে জার্মানির পরাজয় জোটবাহিনীকে চতুষ্পার্শ্ব থেকে জার্মানির ওপর হামলা করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। যার ফলে জার্মানির পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। পশ্চিমারা এই যুদ্ধকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করে।
**দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মির ভূমিকা**
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ব্রিটেন হিন্দুস্থানের রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মিকে ব্যবহার করে। রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মি তার প্রভুদের গোলামির জন্য ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাহিনী গঠন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের ২১টি পদাতিক ডিভিশন ও চারটি আর্মার্ড ডিভিশন অংশ নিয়েছিল। যা সর্বমোট ২৫ লাখ সদস্যের সমষ্টি ছিল। এই সেনারা বার্মা, মালয়, ইরাক, ইরান, শাম, লেবানন, ইতালি, সিঙ্গাপুর, তিউনিসিয়া, মিশর ও পূর্ব আফ্রিকার অঞ্চলগুলোতে ব্রিটেনের খিদমত আঞ্জাম দেয়। এই বাহিনীর ৮৭ হাজার সেনা যুদ্ধে নিজের প্রভুদের জন্য জান কুরবান করে এবং ৩০ জন ব্রিটেনের সামরিক পদক ভিক্টোরিয়া ক্রেস্ট অর্জন করে। এই যুদ্ধে বাহিনীতে সেনা ভর্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পাঞ্জাবে থাকা ইউনিয়নিস্ট পার্টির প্রধান সিকান্দার হায়াত খান।
**দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফল**
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কার্যতভাবে পশ্চিমাদের সেই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জিত হয়ে যায়, যার স্বপ্ন তারা দেখছিল। এই সফলতায় অন্তর্ভুক্ত ছিল জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা, ইসরাইল রাষ্ট্রকে অফিসিয়ালি স্বীকৃতি দেওয়া, নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং জার্মান-ইতালির ফ্যাসিবাদের সমাপ্তি।