📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের প্রথম যুগ : ফরাসি বিপ্লব থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত (১৭৮৯-১৯১৪ খ্রি.)

📄 নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের প্রথম যুগ : ফরাসি বিপ্লব থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত (১৭৮৯-১৯১৪ খ্রি.)


নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের প্রথম যুগকে পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা 'স্বাধীন দুনিয়ার বাদশাহদের সাথে যুদ্ধ'-এর যুগ হিসেবে গণ্য করে। মুসলিম ঐতিহাসিকরা এই যুগকে মুসলিম উম্মাহর পতনের শুরু হিসেবে গণ্য করেন। একদিকে ফরাসি বিপ্লবের পর ইউরোপের সমস্ত বাদশাহ নিজ নিজ সাম্রাজ্য নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায়। হল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, হাঙ্গেরি, ইতালি ও রাশিয়াও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই রাষ্ট্রগুলোর শাসকরা বিপ্লবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়াকে বাধা প্রদান ও ফ্রান্সের বাদশাহকে সাহায্যের সিদ্ধান্ত নেয়। অপরদিকে ভৌগলিকভাবে আমেরিকা আবিষ্কার ও হিন্দুস্থানের ওপর ইংরেজদের দখলের ফলে ইউরোপে কাঁচামাল আমদানি অনেক বেড়ে যায়। এই কাঁচামালের ওপর ভিত্তি করেই ইউরোপ ও বিশেষত ব্রিটেনে শিল্প-বিপ্লব সংঘটিত হয়। যার আলোচনা আমরা সামনে করব ইনশাআল্লাহ। এই শিল্প-বিপ্লব ইউরোপীয়দের মধ্যে নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। যার ফলে প্রত্যেক ইউরোপীয় রাষ্ট্র মুসলিম উম্মাহর সম্পদ লুণ্ঠনের পাশাপাশি সেই সব অঞ্চল থেকে একে অপরকে বঞ্চিত করার জন্য নিজেদের মধ্যেও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে।

অপরদিকে উসমানি সাম্রাজ্যে নিষ্ক্রিয়তা প্রকাশিত হতে থাকে। ইউরোপ ও রাশিয়া তাদের দুর্বলতা অনুধাবন করতে পারে। ফলে তারা সর্বদা উসমানিদের অধিকৃত অঞ্চলগুলোর ওপর লোভের দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিল। রাশিয়ার দৃষ্টি ছিল মধ্য এশিয়া, ককেশাস ও বলকানের দিকে। অন্যদিকে ব্রিটেন সরকার রোম উপসাগর ও লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে হিন্দুস্থানের রাস্তা দখলের পরিকল্পনা তৈরি করছিল। ফ্রান্সের দৃষ্টি ছিল আল-জাজায়ির ও তিউনিসিয়াসহ উসমানিদের পশ্চিম ও উত্তর আফ্রিকার দিকে। এই রাষ্ট্রগুলো নিষ্ক্রিয় ও দুর্বল হয়ে যাওয়ার ফলে তারা উসমানিদের বিরুদ্ধে চক্রান্তের জাল বোনা শুরু করে। প্রায় এক শতাব্দী যাবৎ বিভিন্ন চক্রান্তের মাধ্যমে এই রাষ্ট্রগুলো একেক করে মুসলিম অঞ্চলগুলো দখল করতে থাকে। এই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানিদের পতন হয়ে মুসলিম উম্মাহর ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়। এই চক্রান্ত ও যুদ্ধগুলোকে পশ্চিমা ঐতিহাসিকগণ 'গ্রেট গেইম' নাম দিয়ে থাকে। ব্রিটেন তাদের চক্রান্ত পূর্ণ বাস্তবায়ন করে এবং হিন্দুস্থান দখল করে নেয়। হিন্দুস্থান দখলের মাধ্যমে তাদের সেই সরঞ্জাম, সম্পদ ও জনবল অর্জিত হয়ে যায়, যা দিয়ে তারা উসমানিদের পরাজিত করে ব্রিটেনকে সুপার পাওয়ার বানাতে সক্ষম ছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দীকে যদি ইহুদিদের উত্থানের শতাব্দী বলা হয়, তাহলে ভুল হবে না। কারণ ফরাসি বিপ্লবের পর যে রাষ্ট্রেই পার্লামেন্ট-ভিত্তিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, সেখানেই ইহুদিদেরকে ইউরোপীয় নাগরিকদের মতো সমান অধিকার দেওয়া হতো। সমান অধিকার প্রাপ্তির সাথে সাথেই ইহুদিরা তাদের জায়োনিস্ট আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তোলে, যা ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিল। ১৯১৭ সালে ব্রিটেনের প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের জন্য ফিলিস্তিন বিজয় করে দেয়। এই শতাব্দীতে ইহুদিরা ইউরোপে ব্যাংকের মুকুটহীন বাদশায় পরিণত হয় এবং তারা ইউরোপের অর্থনীতিকে পরিপূর্ণভাবে দখল করে নেয়।

সারকথা হলো, ফরাসি বিপ্লবের ফলে ইউরোপে নতুন যুগ শুরু হয়। এই যুগকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার প্রতিষ্ঠার যুগ বলার সাথে সাথে ইহুদিদের উত্থান ও মুসলিমদের পতনের যুগ বলা হয়। কেননা, এই সব একই যুগে হয়েছিল। এখানে আমরা ফরাসি বিপ্লব থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ১৩০ বছরের ইতিহাসকে দুটি অংশে বর্ণনা করব। প্রথম অংশে বিপ্লবের ফলে ইউরোপে সংঘটিত পরিবর্তনগুলো বোঝার চেষ্টা করব। দ্বিতীয় অংশে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের প্রভাবে ঘটা আন্তর্জাতিক পরিবর্তন অর্থাৎ গ্রেট গেইমের আলোচনা করব।

**ইউরোপে বিপ্লবের যুগ (১৭৮৯-১৮৭৫ খ্রি.)**
১৭৮৯ সালে একদিকে ফরাসি বিপ্লবের ফলে ইউরোপে বিশাল পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। অপরদিকে ১৭৬৪ সালে হিন্দুস্থানে বক্সার যুদ্ধে ব্রিটেন বাংলাকে দখল করতে সক্ষম হয়ে যায়। এই দুটি ঘটনার ফলে ইউরোপে তিন ধরনের বিপ্লব সংঘটিত হয়। এক. রাজনৈতিক বিপ্লব, দুই. অর্থনৈতিক বিপ্লব, যাকে পুঁজিবাদী বিপ্লব বলা যায় এবং তিন. সামরিক বিপ্লব। এই বিপ্লবগুলো সর্বপ্রথম ইউরোপে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারকে প্রতিষ্ঠা করে। অতঃপর ইসলামি বিশ্বের যে সমস্ত অঞ্চলের ওপর তাদের দখল ছিল, সেই সমস্ত অঞ্চলেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।

**ইউরোপে রাজনৈতিক বিপ্লব**
ফরাসি বিপ্লবের ফলে স্বয়ং ফ্রান্স অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত বিশৃঙ্খলার শিকার হয়। বিপ্লবীরা চাচ্ছিল ফ্রান্সে মানব-আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করতে। অন্যদিকে বাদশাহ চাচ্ছিল নিজের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে। বিপ্লবের শক্তি দেখে প্রথমে ফ্রান্সের বাদশাহ লুই পার্লামেন্টের অধীনে নিজের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ইউরোপের অন্যান্য বাদশাহর সাথে মিলে নিজের হারানো ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। তার স্ত্রী ছিল অস্ট্রিয়ার বাদশাহ ফ্রেডরিকের বোন; তাই সেও তার ভগ্নিপতির সাহায্যের জন্য প্রস্তুত ছিল। এ ছাড়াও ইউরোপের অন্যান্য বাদশাহ এই বিপ্লবকে ভালো দৃষ্টিতে দেখছিল না। এই বিপ্লবের প্রভাবে তাদের রাষ্ট্রগুলোও ঝুঁকির মুখে ছিল। তাই এই বিপ্লবকে দমন করা তাদের দৃষ্টিতে আবশ্যক ছিল। এত কিছু সত্ত্বেও ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব আস্তে আস্তে ধারাবাহিকভাবে পুরো ইউরোপে ছড়াতে থাকে। ইউরোপের জনগণ আধুনিক ধর্মহীন দর্শনকে গ্রহণ করতে থাকে। ফলে হল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম ও অস্ট্রিয়াতে মানবাধিকার আন্দোলন শুরু হয়। এই বিপজ্জনক অবস্থা প্রত্যক্ষ করে অস্ট্রিয়া ও জার্মানি ফ্রান্সের বিপ্লবীদের ওপর হামলা করে বসে। এই যুদ্ধ 'ফ্রেঞ্চ রেভুলেশনারি ওয়ার' (French Revolutionary Wars) নামে প্রসিদ্ধ এবং এই যুদ্ধেই ফ্রান্সের জেনারেল নেপোলিয়নের প্রসিদ্ধি অর্জিত হয়। এই যুদ্ধে ফ্রান্স বিজয়ী হয় এবং নেপোলিয়নের নেতৃত্বে তারা প্রায় পুরো ইউরোপ কব্জা করে নেয়। নেপোলিয়নের বিজয়ের ফলে ফরাসি বিপ্লবের আদর্শগুলো ইউরোপের অন্যান্য রাষ্ট্রেও ছড়িয়ে পড়ে।

তখন ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল ইংল্যান্ড। নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডকে পরাজিত করার জন্য ১৭৯৮ সালে মিশরে হামলা করে বসে। মিশর সেই সময় উসমানিদের অধীন ছিল। মিশরের ওপর ফ্রান্সের কজার ফলে হিন্দুস্থানে ব্রিটেনের দখলদারিত্ব হুমকির মুখে পড়ে।
যায়। এই বিষয়টি ব্রিটেনের জন্য মোটেও মেনে নেওয়ার মতো ছিল না। পরবর্তীকালে ব্রিটেনের সামুদ্রিক এডমিরাল নেলসন (Admiral Horatio Nelson) এর হাতে ফ্রান্সের সামুদ্রিক বহর পরাজিত হয়। বাধ্য হয়ে নেপোলিয়ন ফ্রান্সে ফিরে আসে।

মিশর থেকে ফিরে আসার পর নেপোলিয়ন ব্রিটেনকে অর্থনৈতিক অবরোধ দেওয়া শুরু করে এবং ব্রিটেনের উৎপাদিত পণ্য ইউরোপে আসাকে বন্ধ করে দেয়। এই অর্থনৈতিক অবরোধকে মহাদেশীয় ব্যবস্থা (Continental System) বলা হয়। এই অবরোধে পর্তুগাল ফ্রান্সের সাথে থাকতে অস্বীকার করে। এই অবরোধ মোকাবিলা করার জন্য ব্রিটেন জেনারেল (Lord Wellington) লর্ড ওয়েলিংটনের নেতৃত্বে স্পেনে বাহিনী পাঠায়। যেখানে নেপোলিয়ন ও ব্রিটেনের মাঝে সামনাসামনি যুদ্ধ হয়। রাশিয়া প্রথমে ফ্রান্সের সাথে ছিল; কিন্তু পরে রাশিয়া জোট থেকে বের হয়ে যায়। যার কারণে নেপোলিয়ন ক্রুদ্ধ হয়ে রাশিয়ার ওপর হামলা করে বসে, যা নেপোলিয়নের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাশিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ নেপোলিয়নের ৪৫ হাজার সেনাকে পরিপূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। অপরদিকে ব্রিটেনের কমান্ডার ওয়েলিংটন ও নেপোলিয়নের মধ্যে ধারাবাহিক এক যুদ্ধ শুরু হয়। ১৮১৫ সালে ১৮ জুন 'ওয়াটার লু' (Waterloo) স্থানে ওয়েলিংটন নেপোলিয়নের বাহিনীকে পরাজিত করে এবং নেপোলিয়নকে গ্রেফতার করে সেন্ট হেলেনা (Island of Saint Helena) দ্বীপে নির্বাসিত করে। ওই দ্বীপেই সে ১৮২১ সালে মারা যায়।

১৮৩০ সালে বেলজিয়ামে বিপ্লব হয়। এই বিপ্লবের ফলে বেলজিয়াম হল্যান্ড থেকে আলাদা হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৪৮ সালে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, বোহেমিয়া, হাঙ্গেরি ও অস্ট্রিয়াতে পার্লামেন্ট-ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭১ সালে মধ্য ইউরোপে আরও একটি বিপ্লব হয়, যা আজকের নতুন ইউরোপের গঠনকে পূর্ণ করে। এটাই সেই রাজনৈতিক বিপ্লবের যুগ ছিল, যা ভবিষ্যৎ বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল।

**ইউরোপের গণতান্ত্রিক আইনি ব্যবস্থা**
ফরাসি বিপ্লবের পর পোপতন্ত্র ও বাদশাহি বিলুপ্তির ফলে সর্বোচ্চ বিধানদাতা ও আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার বিশ্বাস বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে রাষ্ট্র-শাসনে একটি শূন্যতা তৈরি হয়। এই শূন্যতাকে পূরণের জন্য এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল, যা হিউম্যানকে পূর্ণ স্বীকৃতি দেবে। হিউম্যানকে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ নিরাপত্তা, সুখ-সমৃদ্ধি, উন্নতি, স্বাধীনতা ও সমতা প্রতিষ্ঠা করা। অপরদিকে মধ্যযুগের রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘটিত '৩০ বছরের যুদ্ধ' এবং এর ফলে হওয়া 'ওয়েস্ট ফেলিয়া চুক্তি' এর
মাধ্যমে ইউরোপের জাতিগুলো নিজেদের জন্য আলাদা দেশ ভাগ করে নেয় এবং জাতীয়তাবাদকে আঁকড়ে ধরে। এই চুক্তির ফলে পুরো ইউরোপের মধ্যে দেশাত্মবোধ একটি বিশ্বাসে রূপ নেয়। ওয়েস্ট ফেলিয়া চুক্তির ফলে ইউরোপে 'আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র' (Nation States)-এর দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নেয়। সেসব রাষ্ট্রের গঠনের মধ্যে চারটি উপাদান থাকা মৌলিকভাবে আবশ্যক ছিল:

১. এমন ভূমি, যেখানে এই রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হবে।
২. এমন জনগণ, যারা এই রাষ্ট্রকে গ্রহণ করে নেবে।
৩. এমন প্রশাসন, যারা রাষ্ট্রকে চালাবে।
৪. সর্বোচ্চ বিধানদাতার বিশ্বাস, যা রাষ্ট্রকে সেই অঞ্চল ও তার বাসিন্দাদের ওপর ক্ষমতা প্রদান করবে।

ওয়েস্ট ফেলিয়া চুক্তি ইউরোপে উল্লেখিত শর্তগুলোর মধ্য থেকে ভৌগলিক সীমানা ও জনগণ তথা ১ ও ২ নং শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছিল। কিন্তু প্রশাসন ও বিধানদাতার প্রশ্ন বাকি রয়ে গিয়েছিল, যার উত্তর নির্ধারণ সহজ ছিল না। বিশেষ করে যেখানে বিধানদাতা হিসেবে ফরাসি বিপ্লব পর্যন্ত পোপতন্ত্রের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলাকে বিশ্বাস করা হতো। ফলে এর সমাধানে এমন জটিল এক দর্শন গ্রহণ করা হয়েছিল, যাকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা প্রায় শুরুদিন থেকেই অসম্ভব ছিল। এই দর্শনগুলো অনেক চেষ্টার পর কিছুটা বুঝে আসলেও পূর্ণ বুঝে আসে না। তাই আমরা এই ব্যবস্থাকে ধোঁকা ও মিথ্যাচার গণ্য করি এবং এই দর্শন আমাদের দৃষ্টিতে মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

যাহোক, ইউরোপের শাসন-ক্ষমতার জন্য এমন থিউরি দরকার ছিল, যা ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের আদর্শ 'আল্লাহ তাআলার হুকুমত'-এর সমপর্যায়ের হবে এবং হিউম্যানের সেসব মৌলিক স্বার্থগুলো বাস্তবায়ন করবে, যা এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের দার্শনিকরা 'মানবাধিকারের পবিত্র নীতি' হিসেবে প্রচার করেছিল। অর্থাৎ নিরাপত্তা, সুখ, উন্নতি, সমতা ও স্বাধীনতা। তাদের এই প্রয়োজন অর্থাৎ 'শাসনের থিউরি'র শূন্যতা এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের দার্শনিক জন লক ও রুশো পূর্বেই সমাধান করে রেখেছিল। জন লকের তুলনায় ফরাসি বিপ্লবে রুশোর বর্ণিত গণতান্ত্রিক দর্শন অনেক প্রভাব রেখেছিল। তাই আমরা রুশোর দর্শনকে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরছি। কারণ এটাই বর্তমান আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি।

'রুশোর থিউরির ভিত্তিতে ইউরোপে শাসন-ক্ষমতার যে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা হয়, তার সারকথা হচ্ছে: ফরাসি বিপ্লবের মৌলিক লক্ষ্য ও নীতিগুলো (নিরাপত্তা, সুখ, উন্নতি, স্বাধীনতা ও সমতা) সমস্ত হিউম্যানের সামষ্টিক ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ছিল, যাকে "জেনারেল উইল" বলা হয়। অর্থাৎ সমস্ত হিউম্যান এই লক্ষ্যগুলো গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করে। এখন যখন কোনো দেশ তাদের রাষ্ট্রীয় আইনে এই লক্ষ্যগুলো মূল হিসেবে গ্রহণ করে "উইল অফ অল" বাস্তবায়ন করবে, তখন স্বয়ং সেই রাষ্ট্র সর্বোচ্চ বিধানদাতার মর্যাদায় পৌঁছে যাবে।'

এই থিউরিকে আরও অধিক স্পষ্ট করার জন্য আমরা নিম্নে রুশোর দর্শনকে তুলে ধরছি:

**গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দর্শন**
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সফলতা ছিল গণতান্ত্রিক থিউরি অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। আর এর ভিত্তি ছিল গণতন্ত্রের জনক হিসেবে পরিচিত রুশোর দর্শন। রুশো অষ্টাদশ শতাব্দীতে সুইজারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করে এবং ফরাসি বিপ্লবের কিছু বছর পূর্বে ফ্রান্সে মারা যায়। তার বই (Social Contact) 'সামাজিক সম্পর্ক' এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে। এই বইয়ে রুশো আধুনিক গণতন্ত্রের পূর্ণ নকশা পেশ করে। বইয়ের শুরু হয় এই বাক্য দিয়ে, 'মানুষ স্বাধীনভাবে জন্ম নিয়েছে; কিন্তু তাকে সমস্ত ক্ষেত্রে শিকলে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।' রুশো মানুষকে একটি পূর্ণ স্বাধীন ও স্বেচ্ছাচার ব্যক্তিত্ব হিসেবে পেশ করে। সে বলে যে, 'মানুষের চাহিদা হলো স্বাধীনতা, নিজ চাহিদামতো চলা ও সমতার সাথে থাকা এবং জীবনে সুখের জন্য উন্নতি করা। এই সবই প্রত্যেক মানুষের মৌলিক চাহিদা।' এটাকে রুশো নাম দিয়েছে (general will) 'সাধারণ ইচ্ছা'। কিন্তু 'সাধারণ ইচ্ছা' ছাড়াও প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব কিছু ব্যক্তিগত ইচ্ছা থাকে, যাকে রুশো নাম দিয়েছে (Will of all) 'সকলের ইচ্ছা'। সকলের ইচ্ছা এবং সাধারণ ইচ্ছার মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য রুশো একটি পূর্ণ নকশা পেশ করে, যাকে আজ 'গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা' বলা হয়।

রুশোর দাবি অনুযায়ী মানুষ অতীতকালে একসময় সুন্দর ও উন্নত জীবনযাপন করত। যেখানে তারা সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা ও বন্ধনকে আঁকড়ে ধরেছিল। সেই সমাজে মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা ছিল। অতঃপর বিভিন্ন এলাকায় বসতি গড়ে ওঠার ফলে মানুষের মধ্যে ভূমির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এই দ্বন্দ্ব থেকে বের হওয়া এবং বেঁচে থাকার জন্য মানুষ একে অপরের সাথে চুক্তি করা শুরু করে। একসময় মানুষের বসতি বাড়ার সাথে সাথে এই চুক্তিগুলোর সাথে সংযুক্ত পক্ষগুলো বৃদ্ধি পেতে থাকে। যার ফলে আবারও দ্বন্দ্ব সৃষ্টির অবস্থা তৈরি হয়। ফলে তখন মানুষ প্রয়োজন বোধ করে যে, তাদের পরস্পরের মধ্যে হওয়া চুক্তিগুলো কোনো এক যৌথ শক্তির অধীনে সোপর্দ করতে হবে; যাতে সেই শক্তি তাদের মধ্যে স্বাধীনতা ও সমতা প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারে। কিন্তু সে জন্য আবশ্যক ছিল, এই শক্তিকে এমন হাকিমিয়্যাত বা বিধান প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদান করা, যা সমস্ত মানুষ গ্রহণ করে নেবে। আর এখান থেকেই আইন প্রণয়নের প্রয়োজন সামনে আসে।
রুশোর মতে মানুষের এমন সংবিধান প্রয়োজন, যা সবার জন্য নিরাপত্তা, সুখ, সমতা, উন্নতি ও স্বাধীনতা বাস্তবায়ন করবে। এই মূলনীতিগুলো অনুযায়ী সামাজিক জীবনযাপন করাই সমস্ত মানুষের ইচ্ছা, যাকে রুশো নাম দিয়েছে 'সাধারণ ইচ্ছা বা মূল ইচ্ছা' (Real Will)। অতঃপর এই মূল ইচ্ছাকে বাস্তবায়নের জন্য সবাই নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে 'সাধারণ ইচ্ছা'র অনুগামী করে নেবে। ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে রুশো নাম দিয়েছে 'সবার ইচ্ছা' (will of all)। অর্থাৎ সকলের ইচ্ছাকে সাধারণ ইচ্ছার অনুগত করা আবশ্যক। সাধারণ ইচ্ছাকে মূল ইচ্ছার অনুগত করার জন্য প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মানুষ নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিধি বাছাই করবে। এই নির্বাচন দ্বারা 'সাধারণ ইচ্ছা' জনগণ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে তাদের প্রতিনিধিদের কাছে চলে যাবে। তখন এই প্রতিনিধিরা একটি কমিটি বৈঠক প্রতিষ্ঠা করবে, যার নাম হবে পার্লামেন্ট। অতঃপর পার্লামেন্ট এমন আইন তৈরি করবে, যা সকলের ইচ্ছা অনুযায়ী হবে। অর্থাৎ সকলের ইচ্ছা প্রণীত আইন দ্বারা বাস্তবায়িত হবে এবং সাধারণের ইচ্ছা পার্লামেন্টের দ্বারা বাস্তবায়িত হবে। অতঃপর পার্লামেন্ট যখন তাদের প্রণীত আইনে স্বাক্ষর করবে, তখন এর দ্বারা মূলত সাধারণ জনগণের ইচ্ছা তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে 'মূল ইচ্ছা বা সাধারণ ইচ্ছা'র অনুগত করে দেওয়া হয়।

'সাধারণ ইচ্ছা' যখন 'সকলের ইচ্ছা'র অনুগত হয়, তখনই মূলত সেই রাষ্ট্রের বিধান দেওয়ার অধিকার অর্জিত হয়, যা সমস্ত জনগণ 'নির্বাচন' এর মাধ্যমে গ্রহণ করে নিয়েছে। রাষ্ট্র সর্বময় বিধানদাতা হওয়ার পর জনগণকে তার আইন মেনে চলা আবশ্যক হয়ে যায়, কারণ তারা নিজেরাই এটাকে গ্রহণ করেছে। আর এভাবেই আইনের আনুগত্যের দ্বারা মানুষ মূলত নিজেই নিজের গোলামি করে এবং আইনের বিরোধিতা করা মূলত নিজেই নিজের বিরোধিতা করার সমতুল্য হয়ে যায়। এই ধরনের স্বাধীনতা অর্জনের ফলে কেমন যেন মানুষ অন্য কোনো সত্তার বান্দা বা গোলাম না হয়ে তার নিজের গোলাম হয়ে যায়। কেননা, বাস্তবে সে নিজেই নিজের আদেশ মেনে চলছে এবং নিজেই নিজের চাহিদাগুলো পূর্ণ করছে। এই আইন তৈরির ক্ষমতাকে গ্রহণ করে নেওয়াই মানুষকে আলোকায়ন, উন্নতি, স্বাধীনতা, স্বকীয়তা ও সমতার নিশ্চয়তা দেবে।'

এটাই সেই ফর্মুলা, যেখানে আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে মানুষকেই সর্বোচ্চ বিধানদাতা হিসেবে বিশ্বাস করা হয় (মাআজাল্লাহ)। এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এখন আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে মানুষের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে কেমন যেন মানুষ নিজেই নিজের রব হয়ে গেছে।
এর ফলেই রুশোর দর্শনের ভিত্তিতে ধর্মীয় বা বাদশাহি শাসনে প্রতিষ্ঠিত সমাজকে ভ্রান্ত ও জালিম সমাজ মনে করা হতো, কারণ সেখানে হিউম্যানের চাহিদাকে অবহেলা করা হয়। এভাবেই ইউরোপে পোপতন্ত্র ও বাদশাহদের ওপর রক্তাক্ত কলম চালানো হয়। এমনকি সমস্ত নবির সম্মিলিত দাওয়াহকেও বাতিল মনে করা হয় এবং ইসলামি খিলাফতকে ইতিহাসের অন্ধকার যুগ হিসেবে গণ্য করা হয় (নাউজুবিল্লাহ)।

রুশোর দর্শন বর্ণনার পর আমরা এই বিষয়ের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করব যে, রুশোর দর্শনেও 'এরিস্টটলের দর্শন'-এর মতো উন্নত সমাজের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠা করাই নাকি মানুষের মূল লক্ষ্য। রুশোর কথামতো মানবজাতির শুরুতে এমন উন্নত সমাজের অস্তিত্ব ছিল, যেখান থেকেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের থিউরি জন্ম নিয়েছে। কিন্তু আধুনিক চিন্তাবিদ, ঐতিহাসিক ও দক্ষ ভূগোলবিদরা অনেক খোঁজার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, মানুষের ইতিহাসে এমন উন্নত সমাজ বা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ নেই। তার বর্ণিত এই উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র কাল্পনিক। রুশোর এই মিথ্যা দাবি সত্ত্বেও পশ্চিমারা এই থিউরির ওপরেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে আবশ্যকীয়ভাবে এমন রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য তাদের মিথ্যা ও ধোঁকাবাজির পাশাপাশি এমন শক্তিও প্রয়োজন ছিল, যা এই মিথ্যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করবে। সেই শক্তির আলোচনা আমরা সামনে সামরিক দর্শনের অধ্যায়ে করব ইনশাআল্লাহ।

**গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা**
যেমনটা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে, 'সবার ইচ্ছা' ও 'সাধারণ ইচ্ছা' মিলিত হয়ে গঠিত সর্বময় বিধানদানের ক্ষমতা অর্জনের ফলে রাষ্ট্রের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ পূরণ হয়ে যায়। মোটকথা ফরাসি বিপ্লবের পর পূর্বের বাদশাহি শাসনব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়া শুরু হয়ে যায় এবং পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। এই সমস্ত পার্লামেন্ট এমন সংবিধান ও আইন প্রণয়ন করে, যা ছিল 'সকলের ইচ্ছা'র বাস্তবায়ন। মূলত বিধান প্রণয়নের এই ফর্মুলা থেকেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছিল, যার সামনে রাষ্ট্রের সব বাসিন্দা মাথা ঝুঁকিয়ে দেয় এবং এই সিজদাকেই তারা মানুষের আসল স্বাধীনতা মনে করে। বাস্তবতা হচ্ছে পশ্চিমা চিন্তাবিদরা 'রব' শব্দ ব্যবহার করা ব্যতীতই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এমন সম্মান ও মর্যাদা বর্ণনা করে যে, কেমন যেন এই রাষ্ট্রই মানুষের রব।

যেহেতু হুকুম দেওয়া জীবিত সত্তার গুণ, তাই রাষ্ট্রকে বিধানদাতা বানানোর দ্বারা মূলত তাকে 'বৈধ সত্তা' (Legal Personality) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পূর্বের সমস্ত মুশরিক তো জীবিত বা অস্তিত্বশীল মূর্তির পূজা করত; কিন্তু এই আধুনিক মুশরিকরা কাল্পনিক অস্তিত্বহীন রাষ্ট্রের মধ্যে বিধানদাতার রুহ ফুঁকে দিয়েছে, অতঃপর এটাকে পূজা করা শুরু করেছে। এই রাষ্ট্রকে রবের বন্ধু বা নিকটবর্তী নয়; বরং সরাসরি রব মনে করে পূজা করতে থাকে। এমনকি এই সমস্ত রাষ্ট্রকে এরিস্টটল, রুশো ও হিগেল-সহ অন্যান্য দার্শনিক প্রভুর মতোই সমস্ত ভুলের ঊর্ধ্বে দাবি করত। অর্থাৎ তাদের মতে রাষ্ট্র ভুল থেকে মুক্ত এবং এর ভুল হওয়াই অসম্ভব। কেমন যেন রাষ্ট্র মানুষের মতো এক সত্তা; কিন্তু কাল্পনিক ও সকলের ঊর্ধ্বে।

রাষ্ট্রের গঠন বোঝানোর জন্য দার্শনিকরা তাকে শরীরের সাথে তুলনা দিয়েছে। যার হাত, পা ও মাথা আছে। অতঃপর তারা এই সত্তাটির জন্য অধিকার ও করণীয় নির্ধারণ করে দিয়েছে। করণীয় দ্বারা উদ্দেশ্য রাষ্ট্রকে জনগণের সকল বিধান ও ফয়সালা দানের ক্ষমতা প্রদান করা, যা সংরক্ষণ ও প্রণয়নের দ্বায়িত্বশীল রাষ্ট্র নিজেই। অপরদিকে জনগণকে সেই রাষ্ট্রের হক বা অধিকার আদায় করতে হবে। যদি কেউ রাষ্ট্রের আদেশ পালন করে, তাহলে তাকে সেই রাষ্ট্রের সম্মানিত গোলাম বা নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে। কিন্তু যদি সে অবাধ্যতা করে, তাহলে রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে অপরাধী হয়ে যাবে, যার জন্য রাষ্ট্র কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছে। যেমন এই ধরনের অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

প্রশ্ন হচ্ছে, সর্বোচ্চ বিধান প্রণয়নের এই ফর্মুলাকে গ্রহণ করে মানুষ রাষ্ট্রের কাল্পনিক সত্তার শিকল নিজের গলায় পরিধান করে সে মূলত কী থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছে? এর জবাব বুদ্ধিমান পাঠকমাত্রই বুঝতে পারবে যে, মানুষ এর মাধ্যমে মূলত আল্লাহ তাআলা থেকে, নবিদের আনুগত্য থেকে, দ্বীন থেকে, হালাল-হারামের মাপকাঠি থেকে, সাওয়াব ও গুনাহ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। একমাত্র রাষ্ট্রকেই 'সর্বময় ক্ষমতার' অধিকারী বিশ্বাস করা হচ্ছে ধর্মহীনতার সর্বোচ্চ চূড়া। এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাস্তবতা বর্ণনার পর এটা থেকে জন্ম নেওয়া প্রশ্নের জবাব দেওয়া সম্মানিত মুফতি ও আলিমগণের জিম্মাদারি। যেমন : এই রাষ্ট্রের কুফুরি ও শিরকের মধ্যে কোনো সন্দেহের অবকাশ রয়েছে কি? এই রাষ্ট্র কোনোভাবে ইসলামি রাষ্ট্র হওয়া সম্ভব কি? যদি কোনো বাহিনী এই রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ করে, তাহলে সেই বাহিনী ও যুদ্ধের কী হুকুম হবে? যদি কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য সর্বোচ্চ বিধান দেওয়ার উল্লেখিত আদর্শ ও বিশ্বাসকে সঠিক মনে করে, তাহলে শরিয়তে তার অবস্থান কী? এই রাষ্ট্রের শক্তি কীভাবে নিঃশেষ করা যাবে? এই রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের ভেতরে থেকেই এর সংশোধনে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করা হবে, নাকি বিদ্রোহ করে এর বৈশ্বিক ক্ষমতাবানদের সিংহাসন উলটে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে?

মোটকথা, ফরাসি বিপ্লবের পর ইউরোপের জনগণ এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই ভোট দিয়ে নিজেদের ইচ্ছাকে পার্লামেন্টের কাছে সোপর্দ করে দেয়। এখন পার্লামেন্ট আইন বানিয়ে মানুষকে তার সামষ্টিক ইচ্ছা অর্থাৎ সেই উন্নত যুগের দিকে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা প্রস্তুত করে দিচ্ছে (যার কোনো বাস্তবতা নেই)। আফসোসের বিষয় হচ্ছে, পরবর্তী বছরগুলোতে মুসলিম উম্মাহও এই ব্যবস্থা দ্বারা প্রভাবিত হয়। খিলাফতের চাদর ছিন্ন করে গণতন্ত্রের শিকল গলায় পরিধান করে নেয়। যার আলোচনা আমরা সামনে করব ইনশাআল্লাহ।

**মানুষের উন্নতি ও ইউরোপের শিল্প-বিপ্লব (পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উত্থান)**
নতুন বিশ্বব্যবস্থা অর্থাৎ নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার প্রতিষ্ঠার পর দ্বিতীয় বিপ্লব ছিল শিল্প-বিপ্লব, যা আধুনিক ইউরোপের গঠনের ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই বিপ্লবে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো বস্তুগত উন্নতির ময়দানে এক নতুন রেকর্ড তৈরি করে। বাষ্পচালিত ইঞ্জিন, প্রেট্রোল-চালিত ইঞ্জিন আবিষ্কার, যোগাযোগের ক্ষেত্রে টেলিগ্রাফ ও টেলিফোনের আবিষ্কার, রেলওয়ে ও মটরগাড়ির আবিষ্কার ইউরোপের উৎপাদিত পণ্যের আমদানি-রপ্তানিকে এতটাই বৃদ্ধি করে যে, পুরো দুনিয়ার বাজারগুলো তাদের মোকাবিলা করতে অক্ষম হয়ে যায়। অপরদিকে উন্নত ও আধুনিক অস্ত্র বানানোর দ্বারা পশ্চিমারা অনেক শক্তিশালী হয়ে যায়। আর এই বিপ্লব শুরু হয় ইংল্যান্ড থেকে।

এই বিপ্লবের দুটি যুগ ছিল। প্রথম শিল্প-বিপ্লব, যা ১৭৮০-১৮৫০ সালে সংঘটিত হয়েছিল। এই সময়টাতে পোশাক-শিল্পে অনেক উন্নতি হয়েছিল এবং যার মূল কারণ ছিল ব্রিটেন বাংলাকে দখল করে নেওয়া। ৭০ বছরের মধ্যেই ব্রিটেন পোশাক-শিল্পে হিন্দুস্থানকে পিছিয়ে দেয়। শিল্প-বিপ্লবের দ্বিতীয় যুগ ১৮৫০ খ্রি. থেকে শুরু হয়। এই বিপ্লবের মধ্যে মৌলিক ভূমিকা রাখে আমেরিকা। এই বিপ্লবের কারিগররা আধুনিক মেশিন ও আধুনিক পদ্ধতির সাহায্যে উৎপাদনে অনেক বৃদ্ধি ঘটায়, যার প্রভাব পুরো দুনিয়ার বাণিজ্যের ওপর পড়ে।

**শিল্প-বিপ্লবের কারণসমূহ**
পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা শিল্প-বিপ্লবের যে সমস্ত কারণ বর্ণনা করে থাকে, আমরা সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ উল্লেখ করছি:

**ইংল্যান্ডের মহা বিপ্লব (১৬৮৮ খ্রি.)**
যেমনটা আমরা পূর্বে বলেছি, ১৬৮৮ সালে ইংল্যান্ডের মহা বিপ্লবের ফলে ব্রিটেন প্রটেস্টান্ট চিন্তাধারা গ্রহণ করে নেয়। প্রটেস্টান্ট ধর্মমতে মানুষ শুধু তার দুনিয়াদারি ও ব্যবসায়িক কাজেই পুরো জীবন ব্যয় করতে পারত। কিন্তু অন্যদিকে ক্যাথলিকরা দুনিয়া-ত্যাগের শিক্ষা দিত। যেহেতু প্রটেস্টান্ট ধর্মমতে দুনিয়া অর্জনের সমস্ত চেষ্টা ধর্মীয় কাজ হিসেবেই গণ্য হতে থাকে, তাই ঐতিহাসিকদের মতে এই চিন্তাধারা শিল্প-বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কেননা, এই বিশ্বাস ইউরোপে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন তৈরি করে এবং ইউরোপীয় জাতি সংগঠিত হয়ে কাজ করা শুরু করে।

**পুঁজিবাদী চিন্তাধারা**
শিল্প-বিপ্লবের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, ব্রিটেনের প্রসিদ্ধ অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথের পুঁজিবাদী থিউরি। যেখানে স্বাধীন ব্যবসা, ব্যক্তিগত লাভ অর্জন, ব্যবসায় প্রশাসনের কম অনুপ্রবেশ ও শ্রমিকদেরকে শ্রেণিবিন্যাস করার মতো দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এডাম স্মিথের থিউরি অনুযায়ী সবাই যেহেতু নিজের জন্য কামাই করে, তাই প্রত্যেকের উচিত অধিক থেকে অধিক কাজ করা এবং বিনিময়ে অধিক থেকে অধিক লাভ অর্জন করা। এই চিন্তার বিরুদ্ধে কার্ল মার্ক্স সমাজতন্ত্রের থিউরি পেশ করে।

**ব্রিটেনের দখলকৃত অঞ্চল বৃদ্ধি**
ব্রিটেনে শিল্প-বিপ্লবের তৃতীয় কারণ ছিল তাদের দখলকৃত উপনিবেশ বৃদ্ধি হওয়া। যার মধ্যে হিন্দুস্থান ও আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর ভূমিসমূহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই বিপ্লবের ক্ষেত্রে হিন্দুস্থানের ওপর ব্রিটেনের দখলদারিত্ব মূল ভূমিকা রেখেছিল। কারণ এই এলাকাগুলো থেকে তারা বিশাল পরিমাণে কাঁচামাল ব্রিটেনে লুণ্ঠন করে নিয়ে আসে, যা থেকে পণ্য উৎপাদনের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল। যাতে কাঁচামাল নষ্ট না হয়ে যায়।

**পেটেন্টের রেজিস্ট্রেশন**
শিল্প-বিপ্লবের আরেকটি কারণ ছিল 'পেটেন্ট রেজিস্ট্রেশন'। এর অর্থ হচ্ছে কোনো ব্যক্তি যদি কোনো বিশেষ বস্তু বানায় বা আবিষ্কার করে, তাহলে এটাকে সে নিজের নামে গভর্মেন্টের কাছে রেজিস্ট্রেশন করবে; যার ফলে তার অনুমতি ছাড়া কেউ আর তা তৈরি করতে পারবে না। যদি কোনো ব্যবসায়ী বা কোম্পানি এটা বানাতে চায়, তাহলে মূল প্রস্তুতকারক বা তৈরিকারী থেকে অর্থের বিনিময়ে অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। এই নীতি জনগণের মধ্যে উদ্ভাবনের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।

**পুঁজি বিনিয়োগের নতুন সিস্টেম**
শিল্প-বিপ্লবের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ব্যবসার নতুন সিস্টেম। সহজ কথায়, উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল ও শ্রমিক প্রয়োজন এবং এগুলোর জন্য পুঁজি প্রয়োজন। শিল্প-বিপ্লব ইউরোপের শাসকদেরকে ব্যবসা ও পুঁজি সহজলভ্য করার জন্য নতুন নীতিমালা তৈরি করতে বাধ্য করে। যার ফলে কোম্পানি, ব্যাংক ও স্টক মার্কেট সিস্টেম ব্যবস্থা পুরো দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। কারেন্সি ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়। এই সিস্টেম প্রতিষ্ঠার পর ইউরোপের নাগরিক জীবন সম্পূর্ণরূপে বদলে যায়।

এই সিস্টেমের ফলে তিন ধরনের সহজতা তৈরি হয়। কোম্পানিগুলোর জন্য কাঁচামাল উৎপাদনকারী দেশে গিয়ে তা ক্রয়ের জন্য যেকোনো ইউরোপীয় ব্যাংক থেকে পুঁজি নেওয়া সহজ হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, এই কাঁচামালকে ইউরোপের নিজ নিজ দেশে পৌঁছানোর জন্য ব্যাংক থেকে পুজি নেওয়া সহজ হয়ে যায়। তৃতীয়ত, নিজ দেশে এই কাঁচামাল থেকে পণ্য উৎপাদনের জন্য কারখানা তৈরির ক্ষেত্রে পুজি নেওয়া সহজ হয়ে যায়। কাঁচামাল আমদানি, কারখানা, পণ্য উৎপাদন ও ব্যবসার এই নতুন সিস্টেম ইউরোপের নাগরিকদের ব্যক্তিজীবনেও অনেক গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সবাই তখন নিজ নিজ সম্পদ বিক্রি করে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা শুরু করে। লোকেরা চাকরি ও রোজগারের তালাশে শহরের দিকে আসা শুরু করে। যার ফলে শহরে আবাস বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইউরোপের উৎপাদিত পণ্য এতটাই বেড়ে যায়, যা রপ্তানি করে তারা পুরো দুনিয়ার মার্কেটকে পেছনে ফেলে দেয়। এই ধারাবাহিকতা আজও চলমান রয়েছে। যার বিস্তারিত আলোচনা উপযুক্ত স্থানে করা হবে ইনশাআল্লাহ।

**গোলামের ব্যবসা**
শিল্প-বিপ্লবের মধ্যে গোলামের ব্যবসাও সর্বোচ্চ ভূমিকা রেখেছিল। এখানে গোলাম এই অর্থে নয় যে, কোনো এলাকা বিজয় করে বা কোনো যুদ্ধের পর গোলাম হিসেবে ধরে আনা হয়েছে। বরং ব্রিটেন ও আমেরিকা নিজেদের কারখানায় বেতন ছাড়া শ্রমিকের জন্য আফ্রিকার চতুষ্পার্শ্বের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বিশেষ কোম্পানি পাঠায়। যাদের সাথে সেনাবাহিনীর সদস্যরা থাকত। এই কোম্পানিগুলোর কাজ ছিল মৌরিতানিয়া, এঙ্গোলা, নামিবিয়া, কঙ্গো, মাদাগাস্কার, মুজাম্বিক, কেনিয়া ও সোমালিয়ার উপকূলীয় এলাকাগুলোতে হঠাৎ হামলা করে হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করে জাহাজে তুলে এনে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারগুলোতে বিক্রি করে দেওয়া।

উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে পশ্চিমা জাতি এভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষকে দাস বানায়। যার মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তাতেই অসুস্থতার ফলে মারা যেত; ফলে তাদেরকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হতো। যারা ভালো ও সুস্থ থাকত, তাদেরকে শিল্প ও খেত-খামারের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হতো। তারা আর কখনোই নিজের দেশে ফিরে যেতে পারত না। এদের অর্ধেকের বেশি মুসলিম ছিল, যাদেরকে বাধ্য করে খ্রিষ্টান বানানো হয়েছিল (নাউজুবিল্লাহ)। আমেরিকায় বসবাসকারী সমস্ত কালো প্রজন্ম তাদের গোলামদের বংশ থেকে জন্ম নিয়েছে, শিল্প-বিপ্লবের সময় যাদেরকে কিডন্যাপ করে আমেরিকা ও ব্রিটেনে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। এই প্রজন্ম এখন পূর্ণভাবে খ্রিষ্টান হয়ে গেছে। দাস-ব্যবসার এই কষ্টদায়ক কাহিনি স্বয়ং পশ্চিমা ঐতিহাসিকদের বইয়ে আজও সংরক্ষিত রয়েছে।

**জাগিরদার ব্যবস্থার পতন**
কিছু চিন্তাবিদের মতানুযায়ী পুঁজিবাদী সিস্টেমের উন্নতি জাগিরদার ব্যবস্থার প্রতিরোধস্বরূপ ছিল। এই ব্যবস্থার উন্নতির ফলে জাগিরদার ব্যবস্থার পতন শুরু হয়। এখন জাগিরদারেরা নিজেদের ভূমি বিক্রি করে কারখানা ও ব্যবসায় অর্থ লাগানো শুরু করে।

**শিল্প-বিপ্লবের প্রভাব**
শিল্প-বিপ্লব শুধু ইউরোপে নয়; বরং পুরো দুনিয়াতেই প্রভাব ফেলেছিল। যেমন :

**বৈশ্বিক বাজারে পশ্চিমাদের ঠিকাদারি**
এই বিপ্লবের ফলে ইউরোপের বস্তুগত উন্নতি এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, তারা পুরো দুনিয়াকে পেছনে ফেলে দেয়। এই উন্নতির মূল কারণ ছিল ইউরোপে পণ্য অধিক দ্রুত ও অনেক বেশি তৈরির সক্ষমতা ছিল। অধিক ও দ্রুত তৈরির সক্ষমতার ফলে তাদের সম্পদ বৈশ্বিক বাজারে অন্যান্য পণ্য উৎপাদনকারী রাষ্ট্রগুলোকে খুব দ্রুত পেছনে ফেলে দেয়। যার ফলে বৈশ্বিক বাজারে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়, যা আজও প্রতিষ্ঠিত আছে।

**মুসলিম উম্মাহর পতন**
সেই সময় মুসলিমদের অধিকাংশ এলাকা ছিল পশ্চিমা দখলদারদের উপনিবেশের অধীনে। পশ্চিমা জাতি সেই এলাকাগুলোর সম্পদ সীমাহীনভাবে লুণ্ঠন করে নিজেদের রাষ্ট্রে নিয়ে যায়। যার ফলে মুসলিম এলাকাগুলোর বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে যায় এবং মুসলিমদের সম্পদ নিজেদের হাত থেকে ছুটে যেতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ ব্রিটেন ১৭৫৭ সালে বাংলা বিজয় করে। বাংলা বিজয়ের ফলে তুলা ও সুতার এক বড় বাজার তাদের হাতে এসে যায়। পূর্ব জমানায় খুব বেশি পরিমাণ কাঁচামাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হতো না; বরং কাঁচামাল থেকে সেই অঞ্চলেই পণ্য উৎপাদন করতে হতো। তাই সেই সময় হিন্দুস্থান ছিল পুরো দুনিয়ার পোশাক রপ্তানিতে একক ও সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র। যখন ইংরেজরা বাংলার ওপর কজা করে, তখন তারা সর্বপ্রথম বাংলায় এই নীতি পরিবর্তন করে। যার ফলে কৃষকরা কোম্পানির কাছে কাঁচামাল বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অতঃপর বাংলা ও হিন্দুস্থানের পোশাক- শিল্প ধ্বংস হতে থাকে। তুলা ও সুতা সোজা ব্রিটেনে যেতে থাকে। ফলে ব্রিটেনে অনেক কাঁচামাল জমা হয়ে যায়। অপরদিকে ব্রিটেন এমন মেশিন তৈরি করে, যা অল্প সময়ে অধিক সুতা কাটতে ও পোশাক তৈরি করতে সক্ষম ছিল। অন্যদিকে হিন্দুস্থানে পোশাক তৈরিতে তাদের থেকে বেশি সময় লাগত। যার ফলে ৭০ বছরের মধ্যেই হিন্দুস্থানের পোশাক ব্রিটেনের পোশাকের বিপরীতে অনেক কমে যায়। এমনকি ব্রিটেনের পোশাক হিন্দুস্থানের মার্কেটে বিক্রি হতে থাকে।

**অস্ত্র-ব্যবসা ও যুদ্ধের সক্ষমতা বৃদ্ধি**
ইউরোপের মধ্যে এই শিল্প-বিপ্লব সামরিক বিপ্লবের ওপর খুব গভীর প্রভাব ফেলেছিল। লোহাশিল্পে উন্নতি খুব ভালো অস্ত্র বানানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফলে উন্নত বন্দুক, কামান ও মেশিনগান পশ্চিমাদের আক্রমণের শক্তিতে অনেক বৃদ্ধি ঘটায়। অপরদিকে রেলগাড়ি ও জাহাজের ইঞ্জিন আবিষ্কারের ফলে অধিক থেকে অধিক সৈন্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর করা সহজ হয়ে যায়। গাড়ি, ট্রাক, ট্যাঙ্ক ও বিমান আবিষ্কার বাহিনীর চলাচলের সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দেয়।

**নতুন শহর প্রতিষ্ঠা**
শিল্প-বিপ্লবের একটি সামাজিক প্রভাব ছিল নতুন নতুন শহর গড়ে ওঠা। যে সমস্ত এলাকায় কারখানা ছিল সেগুলো শহরে পরিবর্তন হতে থাকে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ শহরের দিকে আসতে থাকে, যা শহরের আবাদি বৃদ্ধি করতে থাকে। এর একটি ক্ষতিকর প্রভাব ছিল গোত্র, ভ্রাতৃত্ব ও বংশ ধ্বংস হতে থাকা এবং সমাজব্যবস্থা দুর্বল হতে থাকা।

**সমাজতন্ত্রের বিপ্লব**
পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও শিল্প-বিপ্লবের বিপরীতে সমাজতন্ত্রের থিউরি সামনে আসে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উদ্ভাবক ছিল এডাম স্মিথ, অন্যদিকে সমাজতন্ত্রের উদ্ভাবক ছিল কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিক ইঞ্জেল। কার্ল মার্ক্স ছিল জার্মানির ইহুদি দার্শনিক। সে শিল্প-বিপ্লব ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণের পর সমাজতন্ত্রের থিউরি পেশ করে। সমাজতন্ত্র ছিল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিপরীত। কার্ল মার্ক্সের দাবি অনুযায়ী পুঁজিবাদ শুধু এক শ্রেণির সম্পদ বৃদ্ধি করে; যার ফলে সমস্ত পুঁজি একটা শ্রেণির কাছে জমা হয়ে যায়। এই ব্যবস্থায় গরিব আরও গরিব হয় এবং ধনী আরও ধনী হতে থাকে। কার্ল মার্ক্সের দাবি অনুযায়ী যেই লাভ পুঁজিদাতা অর্জন করে, এটা মূলত শ্রমিকদের মেহনতে অর্জিত হয়। পুঁজিদাতা শ্রমিককে মজুরি দিয়ে ছেড়ে দেয় এবং সমস্ত লাভ শুধু নিজেই নিয়ে যায়। অথচ এই লাভের মধ্যে এই শ্রমিকেরও অংশ রয়েছে। যদি এই অবস্থা চলমান থাকে, তাহলে পুঁজিবাদ পুরো দুনিয়ার ওপর এমন দখল প্রতিষ্ঠা করবে, যা বাদশাহদের ক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যাবে। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যার মধ্যে গরিব ও শ্রমিক শ্রেণিকে গোলামের মতো ব্যবহার করা হয়। কার্ল মার্ক্স এর সমাধান এভাবে দিয়েছিল, দুনিয়ার সমস্ত শ্রমিক মিলে পুঁজিবাদীদের থেকে ক্ষমতাকে ছিনিয়ে নেবে। অতঃপর পুঁজি ও উৎপাদিত পণ্যের মূল্য কন্ট্রোলের মাধ্যমে লভ্যাংশ পুরোটাই সবার মাঝে হিসাব করে বণ্টিত হবে।

কার্ল মার্ক্সের এই থিউরি ইউরোপে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে। ১৮৬৪ সালে লন্ডনে প্রথম সমাজতন্ত্রের কনফারেন্স হয়, যার পর এই আন্দোলনের অনেক প্রচার-প্রসার শুরু হয়। ১৮৯৫ সালে দ্বিতীয় কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়।

**সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মাঝে পার্থক্য**
এখানে আমরা পাঠকের সামনে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যকার পার্থক্য তুলে ধরব। যাতে সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের পার্থক্য স্পষ্ট হয় এবং এটাকে মাথায় রেখে পুঁজিবাদী সিস্টেমের মোকাবিলায় সঠিক কার্যনীতি প্রস্তুত করা যায়। চিন্তাগত অবস্থান থেকে পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্রের উৎস একই। কেননা মৌলিক নীতি ও উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে এই দুইয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। এই দুটি ব্যবস্থাই আল্লাহ তাআলার বিদ্রোহী। মানুষকে ধর্ম থেকে স্বাধীন করে দেয় এবং শুধু ব্যক্তিগত উন্নতিকেই জীবনের মাকসাদ হিসেবে গণ্য করে। দুটি সিস্টেমই রেনেসাঁর যুগের চিন্তা-চেতনা, এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন এবং ফরাসি বিপ্লবের প্রভাবকে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছে। তবে স্বার্থ অর্জনের ক্ষেত্রে এই দুটির কার্যক্রমের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। তাই এই দুটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পরিকল্পনা করার সময় এই পার্থক্যগুলো মাথায় রাখা আবশ্যক। এটা স্পষ্ট হওয়া চাই যে, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে জিহাদের ক্ষেত্রে রাশিয়ার কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োগকৃত কৌশল কার্যকর হবে না।

এখন চিন্তাগত ও কার্যক্রমের ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক পার্থক্যসমূহ নিচে পেশ করছি:

**সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চিন্তাগত অবস্থান**
সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দুটিই এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন ও সেক্যুলারিজম অনুযায়ী মানুষকে হিউম্যান বানানো, মুক্তচিন্তাকে গ্রহণ করে বুদ্ধিকেই সর্ববিষয়ে দলিল বানানো এবং মানুষের উন্নতি ও পুঁজি বৃদ্ধিকে জীবনের লক্ষ্য বানানোর ক্ষেত্রে পরস্পর একমত। ঐতিহাসিক দিক থেকে এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের ধারায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সমাজতন্ত্রের আগে অস্তিত্বে এসেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ফরাসি বিপ্লবের পর মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্যের শূন্যতা পূরণের জন্য আসে, অন্যদিকে সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামনে এসেছে:

• প্রথম পার্থক্য: হিউম্যানের থিউরিতে এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় হিউম্যান স্বাধীন সত্তা, অন্যদিকে সমাজতন্ত্রে হিউম্যান শুধু গরিব ও অক্ষম শ্রেণির মানুষ, যাদের অধিকার পুঁজিপতিরা মেরে খাচ্ছে। এই দুর্বল হিউম্যানদের অধিকার রক্ষার জন্য পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। এই মৌলিক পার্থক্যের ভিত্তিতেই বাকি সব পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

• দ্বিতীয় পার্থক্য: পুঁজি বৃদ্ধিতে অতিরিক্ত সংখ্যা অর্থাৎ 'লাভ' (Surplus Value) -এর ক্ষেত্রে পার্থক্য। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় লাভকে পুঁজিদাতার অধিকার মনে করা হয়। অন্যদিকে সমাজতন্ত্রে লাভকে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার মনে করা হয়, যা সমাজে সমানভাবে বণ্টন করে দিতে হবে।

• তৃতীয় পার্থক্য: পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রশাসনের ক্ষমতা সমস্ত জনগণের সম্মিলিত ক্ষমতা; চাই সে পুঁজিদাতা হোক বা শ্রমিক। এই জন্যই তারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে নিয়েছে। পক্ষান্তরে সমাজতন্ত্রে সরকারী ক্ষমতা শুধুই শ্রমিক শ্রেণির অধিকার, যার জন্য তারা যুদ্ধ করে।

• চতুর্থ পার্থক্য : পুঁজিবাদী ব্যবস্থা চায় সমাজে মালিকানার অধিকার, স্বাধীন ব্যবসা, ব্যবসায়িক উন্নতি, সম্পদের উন্নতির ক্ষেত্র সব ধরনের হস্তক্ষেপ মুক্ত থাকা। অন্যদিকে সমাজতন্ত্র চায় প্রশাসনের মাধ্যমে শ্রমিকদের মধ্যে জীবনযাপনের সুযোগ সমানভাবে বণ্টন করতে।

**সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কার্যক্রমে পার্থক্য**
চিন্তাগত বৈপরীত্যের ভিত্তিতে কাজের ক্ষেত্রেও নিম্নোক্ত পার্থক্যগুলো তৈরি হয়েছে :

• পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কোম্পানিগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন (Privatization) হয়ে থাকে। অন্যদিকে সমাজতন্ত্রের সংস্থাগুলো হয় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন (Nationalization)।
• পুঁজিবাদী ব্যবস্থা স্বাধীন বাণিজ্যের প্রবক্তা, যেখানে প্রশাসনের সবচেয়ে কম অনুপ্রবেশ থাকবে। অন্যদিকে সমাজতন্ত্র বিনিয়োগকারীকে (Non Commercial) বাজারের পরোয়া না করে ব্যবসার প্রবক্তা, যার নেগরানি প্রশাসন করবে।
• পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পেশাদার (Professional) মানুষকে সম্মান করা হয়, সমাজতন্ত্রে শুধু শ্রমিক শ্রেণিকে সহায়তা করা হয়।
• পুঁজিবাদী সমাজ 'কর্পোরেট সমাজ' (Corporate Society)-এর রূপ ধারণ করেছে। অন্যদিকে সমাজতন্ত্রে 'আইরন কার্টেন সমাজ' (Iron Curtain Society) হয়ে থাকে। আইরন-কার্টেন দ্বারা উদ্দেশ্য লৌহ-খাঁচায় বন্দী সমাজ।
• পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের মাধ্যমে প্রশাসন চালানো হয়। যেখানে নিয়ন্ত্রণের (Controls) মাধ্যমে সমস্ত শৃঙ্খলাকে টিকিয়ে রাখা হয়। অন্যদিকে সমাজতন্ত্র শ্রমিক শ্রেণির একচ্ছত্র সিদ্ধান্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত (Dictatorship), যেখানে (Commands) আদেশের মাধ্যমে শৃঙ্খলা পরিচালিত হয়।

দুটিই বৈশ্বিক (Global) শাসনের প্রবক্তা। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তার নিজের জন্য কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক (Statesman) ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যাদের দৃষ্টি শুধু স্বার্থের দিকে নিবদ্ধ থাকে; চাই তা যেই পদ্ধতিতেই অর্জন করা হোক। অন্যদিকে সমাজতন্ত্র যুদ্ধকে কর্মপদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করে নিজের লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করে।

এই পার্থক্যগুলোকে অনুধাবনের ফলে একটি কথা স্পষ্ট হয় যে, সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মোকাবিলায় শক্তিশালী কেন্দ্রের প্রবক্তা। অন্যদিকে পুঁজিবাদ কেন্দ্রীয় না হওয়ার ফলে সব জায়গায় জোট বা অংশীদারের তালাশে থাকে। এই জোট অর্জনের পর এর আকৃতি অনেক বৃদ্ধি হতে থাকে। অপরদিকে সমাজতন্ত্রে বাহ্যিক জোট থাকা সত্ত্বেও সমস্ত কাজ নিজস্ব বলে পরিচালনা করে।

**সামরিক চিন্তাধারায় বিপ্লব**
ফরাসি বিপ্লবের ফলে একটি বড় সমস্যা সৃষ্টি হয় বাদশাহদের নিয়ন্ত্রিত সেনাবাহিনী নিয়ে। শাহি বাহিনী তাদের বাদশাহকে আল্লাহ তাআলার ছায়া মনে করে লড়াই করত। তার পরাজয়কে নিজেদের পরাজয় বলে বিশ্বাস করত এবং তার জন্য জান কুরবান করাকে নিজেদের ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করত। কিন্তু ধর্মহীন রাষ্ট্রে এমন কোনো থিউরির সুযোগ ছিল না। অথচ সর্বস্বীকৃত বিষয় হলো, কোনো বাহিনী দৃঢ় আদর্শ ও পরস্পর একতার সূত্র ছাড়া কখনো যুদ্ধে নামতে পারে না। এই অবস্থায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর জন্য এমন থিউরির প্রয়োজন হয়, যা তাদের একত্রিত ও উজ্জীবিত রাখতে পারবে। পশ্চিমাদের এই প্রশ্নের জবাব প্রুশিয়ার (Prussia) জেনারেল ক্লজউইজ (Karl Von Clausewithz) দিয়েছিল। ক্লজউইজের থিউরিকে পশ্চিমা রাষ্ট্রীয় বাহিনী গঠনের আদর্শ ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বাইবেলের মতো মূল্যায়ন করা হয়। ক্লজউইজকে আধুনিক সামরিক বিদ্যার জনক হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৭৯৮ সালে ক্লজউইজ ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রুশিয়ার জেনারেল ছিল, যে পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার বাহিনীর সাথে মিলিত হয়। এটা ছিল সেই যুগ, যখন ইউরোপ ফরাসি বিপ্লবের ফলে পোপতন্ত্র ও বাদশাহি দুটা থেকেই মুক্ত ছিল। এই যুগেই কান্ট (Kant) পুঁজিবাদ ও কার্ল মার্ক্স সমাজতন্ত্রের থিউরি পেশ করেছিল। ক্লজউইজ যদিও নিজে কার্ল মার্ক্সের চিন্তাধারায় প্রভাবিত ছিল; কিন্তু তার মৃত্যুর পর তার থিউরিকে পশ্চিমা পুঁজিবাদীরা পূর্ণভাবে প্রয়োগ করে। ক্লজউইজের থিউরি তার জীবদ্দশায় ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ১৮৩২ সালে অসুস্থতার ফলে সে মৃত্যুবরণ করে।

তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী এই চিন্তাধারাগুলো বই আকারে ছাপিয়ে প্রচার করে। শুরুতে তা তেমন প্রসিদ্ধি লাভ করেনি। কিন্তু ১৮৭১ সালে যখন ফ্রান্সের বাদশাহ নেপোলিয়ন তৃতীয় (Nepoleon III) প্রুশিয়ার ওপর হামলা করে, তখন এই যুদ্ধে প্রুশিয়ার বাহিনীর সেনাপতি ছিল ক্লজউইজের শাগরিদ জেনারেল মোল্টকি (General Moltke)। মোল্টকি প্রুশিয়ার বাহিনীকে ক্লজউইজের থিউরি অনুযায়ী সাজিয়েছিল। ফ্রান্স সেই যুদ্ধে কঠিন পরাজয়ের শিকার হয়। প্রুশিয়ার সফলতা দেখে সারা ইউরোপ চমকে গিয়েছিল। পরে যখন জানতে পারে, এটা ছিল ক্লজউইজের থিউরি বাস্তবায়নের ফল, তখন পুরো ইউরোপ তা গ্রহণ করা শুরু করে। তারা সকলেই নিজেদের বাহিনীকে তার থিউরি অনুযায়ী সাজাতে থাকে।

সেই সময় পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ এতটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল যে, তারাও এই মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। উসমানিরা স্বয়ং জেনারেল মোল্টকিকে তাদের বাহিনী নতুনভাবে সাজানোর দায়িত্ব দেয়। অপরদিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোও তাদের বাহিনীগুলোকে এই থিউরি অনুযায়ী সাজিয়ে নেয়। হিন্দুস্থান দখলকারী ব্রিটেন ও মিশর দখলকারী ফ্রান্স তাদের বাহিনীকে এই থিউরি অনুযায়ী ঢেলে সাজায়। যার ফলে ৭০ বছরের কম সময়ে বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ক্লজউইজের থিউরি অনুযায়ী নতুনভাবে সাজানো হয়ে যায়। এমনকি এই রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর নাম পর্যন্ত 'ক্লজউইজের বাহিনী' রাখা হয়। আমাদের জন্য এখন চিন্তার বিষয় হচ্ছে, সোভিয়েতকে পরাজিত করার পর আমাদের মোকাবিলা এখন ক্লজউইজের বাহিনীর সাথে হচ্ছে। তাই ক্লজউইজের থিউরিগুলো ভালোভাবে বোঝা উচিত। নিচে এই সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে:

**ক্লজউইজের বর্ণিত লক্ষ্যসমূহ**
বাহিনীকে গঠনের সময় ক্লজউইজের সামনে কিছু লক্ষ্য ছিল :
১. শাহি ফৌজকে জাতীয়তাবাদী বাহিনীতে পরিবর্তন করা
২. শাহি সিপাহিকে জাতীয়তাবাদী সোলজার বানানো
৩. যুদ্ধের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন
৪. নতুন থিউরি অনুযায়ী ব্যবস্থাপনাগত গঠন সাজানো

**ক্লজউইজের থিউরিসমূহ**
এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য সে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা পেশ করে। সেগুলো হলো:

• **বৈধ শক্তি**
ক্লজউইজের নিকট 'গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র' হচ্ছে একমাত্র বৈধ শক্তি, যে যুদ্ধের আদেশ দিতে পারে। এই শক্তি ব্যতীত অন্য কোনো বৈধ শক্তি নেই, যে যুদ্ধের আদেশ দেওয়ার অধিকার রাখে। না রব, না দ্বীন, না শরিয়াহ এবং না আলিমরা; (নাউজুবিল্লাহ) এদের কেউই যুদ্ধের আদেশ দেওয়ার অধিকার রাখে না।

• **শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং অশৃঙ্খল যুদ্ধ**
ক্লজউইজের থিউরি অনুযায়ী যুদ্ধ দুই ধরনের : একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ যুদ্ধ এবং অপরটি অশৃঙ্খল যুদ্ধ। শৃঙ্খলাবদ্ধ যুদ্ধ শুধু প্রশাসনের জন্যই নির্দিষ্ট, কেননা প্রশাসন রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার একমাত্র রক্ষক। তাই যেই যুদ্ধে প্রশাসন লড়বে, সেই যুদ্ধটাই শৃঙ্খলাবদ্ধ বৈধ যুদ্ধ এবং যুদ্ধে লড়ার অধিকারও শুধু প্রশাসনেরই রয়েছে। এটা ব্যতীত সমস্ত যুদ্ধ বিশৃঙ্খলা ও অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে।

• **সশস্ত্র ও অসশস্ত্র সমাজ**
এই নীতির ভিত্তিতেই সমাজের বৈধ সশস্ত্র সদস্য ও অবৈধ সশস্ত্র সদস্যের মধ্যে পার্থক্য করা হয়। বাহিনীর সিপাহিরাই সমাজের বৈধ সশস্ত্র সদস্য; তাই সমাজের বাকিরা যদি অস্ত্র ধারণ করে, তাহলে তা অবৈধ বলে বিবেচিত হবে। এ ছাড়াও ক্লজউইজের থিউরি অনুযায়ী মানুষের অস্ত্র ধারণের অনুমতি শুধু একমাত্র গণতান্ত্রিক প্রশাসন দিতে পারবে। এ ছাড়া কোনো শক্তি কোনো মানুষ বা গ্রুপকে সশস্ত্র করার অধিকার নেই।

• **যুদ্ধ, রাজনৈতিক পলিসির ধারাবাহিকতা**
পূর্বের থিউরির ভিত্তিতে ক্লজউইজের নিকট যুদ্ধ রাষ্ট্রীয় রাজনীতি বা পলিসির নাম। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, এই তিন থিউরি গ্রহণের ফলে মুসলিম উম্মাহর বাহিনীগুলোতে এত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা আল্লাহ তাআলার হুকুম জিহাদের বিধান আদায় না করে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আদেশের অপেক্ষায় থাকে।

• **রেজিমেন্ট ও তার ইতিহাস (যুদ্ধের উদ্বুদ্ধকারী)**
ক্লজউইজের মতে বাহিনীর একক শক্তি হচ্ছে রেজিমেন্ট। অনেকগুলো রেজিমেন্ট মিলে একটি ডিভিশন হয়। ভিডিশনকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাহিনী হিসেবে গণ্য করা হয়। আর এই বাহিনীর একক অর্থাৎ রেজিমেন্ট একটি সমাজের সমতুল্য। ক্লজউইজের থিউরি ছিল, মানুষ দুই কারণে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়, একটি হলো সামষ্টিক কারণ 'দেশপ্রেমের চেতনা'।

দ্বিতীয়টি ব্যক্তিগত কারণ, আর এটাই তার কাছে রেজিমেন্টের ইতিহাস। এভাবেই শাহি সেনা, যারা পূর্বে বাদশাহকে আল্লাহ তাআলার ছায়া মনে করে যুদ্ধ করত, এখন তাদেরকে রেজিমেন্টের ইতিহাসের সাথে মিলিত করে রাষ্ট্রীয় সৈন্যে পরিণত করে দেওয়া হয়েছে।

অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত, যদিও দেশপ্রেম একজন সেনাকে ময়দানে এনে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; কিন্তু লড়াইয়ের সময় নিজের জান তার রেজিমেন্টের সম্মান ও ইজ্জতের জন্য কুরবান করে দেয়। মোটকথা, তার নিকট যুদ্ধের ময়দানে রেজিমেন্টের ইতিহাস দেশপ্রেম থেকেও বেশি প্রভাবশীল প্রমাণিত হয়েছে। যদি কোনো সিপাহির সামনে তার রেজিমেন্টের ইতিহাসকে ভুল প্রমাণিত করে দেওয়া যায়, তাহলে তার যুদ্ধের আগ্রহ শেষ হয়ে যায়।

• **বাহিনীর জন্য সেনা নির্বাচন**
রাষ্ট্রীয় সিপাহি নির্বাচনের জন্য সমাজের সদস্যদের ওপর বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়। সেখান থেকেই মার্শাল বা সামরিক প্রজন্ম এবং সামরিক মানসিকতার থিউরি সামনে আসে। এই থিউরি অনুযায়ী দুনিয়ার সমস্ত রাষ্ট্র ও জাতির মধ্যে এমন সদস্য রয়েছে, যারা দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় চিন্তাধারার অধিকারী; কিন্তু আক্রমণাত্মক ও দৃঢ়চেতা মানসিকতা রাখে। এমন ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় সৈনিক হওয়ার সক্ষমতা বেশি হয়ে থাকে। দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় চিন্তার ফলে এমন ব্যক্তিরা নিজের দেশ ও বাহিনীর সাথে বিদ্রোহ করে না। আর আক্রমণাত্মক মানসিকতার ফলে দুশমনের বাহিনীকে ক্ষতি করার ক্ষেত্রে খুব অগ্রগামী থাকে।

**রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গঠন**
ক্লজউইজের বাহিনীর থিউরি বোঝার পর এখন আমরা সহজেই বুঝতে পারব, সে কীভাবে শাহি ফৌজকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীতে রূপান্তর করেছে। প্রথমে একজন দুর্বল ব্যক্তিকে রিক্রুট করা হতো এবং সেই ব্যক্তিকে দেশ ও রেজিমেন্টের ইতিহাসের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে দেওয়া হতো। অতঃপর এই রেজিমেন্টকে ব্রিগেড বা ডিভিশনের সাথে মিলিত করে দেওয়া হতো। এই সিপাহিকে প্রশিক্ষণের সময় এই বিশ্বাস করানো হতো যে, যুদ্ধের আদেশ দেওয়ার বৈধ শক্তি শুধু এবং শুধুই গণতান্ত্রিক প্রশাসন। তারা ব্যতীত কোনো শক্তি যুদ্ধের আদেশ দিতে পারবে না। তাকে এটাও বলে দেওয়া হয় যে, রাষ্ট্রীয় বৈধ অস্ত্রধারী ও অনুগত সৈনিকরাই শুধু বৈধ যুদ্ধ করতে পারে। এরা ছাড়া যারাই যুদ্ধের জন্য অস্ত্র ধারণ করবে, তারা সন্ত্রাসী ও অবৈধ।

সেই সময় পুরো দুনিয়ার রাষ্ট্রীয় বাহিনী—চাই তা পশ্চিমা হোক বা মুসলিম—তাদেরকে ক্লজউইজের থিউরির মতে গঠন করা হয়। তাই জিহাদ করা ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই সমস্ত রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কোনো ভূমিকা থাকে না এবং কখনো থাকবেও না। কারণ, এই কাজ তাদের আদর্শের বিপরীত।

**ইহুদিদের শতাব্দী**
ইউরোপে ফরাসি বিপ্লবের পর অন্যান্য রাষ্ট্রেও বিপ্লব হতে থাকে। শিল্প-বিপ্লব ও রাজনৈতিক বিপ্লবের সাথে সাথে ইউরোপের সমাজ নতুনভাবে গঠন হতে থাকে। ইউরোপের জনগণ ধর্ম থেকে স্বাধীন হয়ে বস্তুগত উন্নতির পথে চলতে শুরু করে। অপরদিকে ইউরোপের এই বিপ্লবগুলো থেকে ইহুদিদের অনেক ফায়দা হয়। ইহুদিরা গির্জার বাধা থেকে মুক্ত হয়ে যায়। ইউরোপের সমস্ত রাষ্ট্র ইহুদিদেরকে সমান নাগরিক অধিকার প্রদান করে। দ্বিতীয় দিক থেকে শিল্প-বিপ্লবের ফলে ইহুদিরা সবচেয়ে বড় পুঁজিদাতা হয়ে যায়।

এই পরিবর্তনের ফলে ইহুদিরা তাদের মহান লক্ষ্যের দিকে আরও এক কদম এগিয়ে যায়। তারা তাদের শত্রু ক্যাথলিকদেরকে পরাজিত করে এবং প্রটেস্টান্টরূপে নিজেদের জন্য একটি শক্তিশালী জোট তৈরি করে ফেলে। যারা ফিলিস্তিনের ওপর তাদের অধিকারকে মেনে নেয় এবং তা দখলের ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। যাদের মধ্যে ব্রিটেন ও আমেরিকার প্রশাসন অন্তর্ভুক্ত। এমনিভাবে ইহুদিরা ইউরোপের ব্যাংকগুলোর ওপর পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে নেয়। তবে তখনও অনেক কিছু বাকি ছিল। ফিলিস্তিনের ওপর কজা করা, কারেন্সিকে স্বর্ণের শক্তি থেকে আলাদা করা ও কারেন্সির মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা ব্যাংককে সোপর্দ করা এবং এগুলোর বৈশ্বিক সব রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব দখল করা বাকি ছিল তখনও।

ফিলিস্তিন দখলের পথে তাদের সামনে তখনও দুটি বড় শক্তিশালী বাধা বিদ্যমান ছিল। একদিকে উসমানিরা, যাদের নিয়ন্ত্রণে ফিলিস্তিন রয়েছে। অপরদিকে রাশিয়ার বাদশাহ, যাকে 'জার' বলা হতো। রাশিয়ার জার ছিল অর্থডক্স খ্রিষ্টান, তারা ক্যাথলিকদের মতোই ইহুদিদের দুশমন। তারা কখনোই ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের জন্য আলাদা ভূমি ও রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না; বরং তারা নিজেরাই ফিলিস্তিন ভূমির দাবিদার ছিল। ইহুদিদের জন্য এই দুটি শক্তিকে রাস্তা থেকে হটানো তখনও বাকি ছিল। এই দুটি শক্তি এমন নয়, যেগুলোকে সহজে হটানো সম্ভব। স্বয়ং ফ্রান্স ও ব্রিটেনের পক্ষেই এই দুই শক্তিকে রাস্তা থেকে হটানো সম্ভব ছিল না।

ফলে অবস্থা এই ছিল, একদিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স উসমানিদের বিলুপ্তির পরিকল্পনা করছিল, যেখানে রাশিয়ার জারও তাদের সাথে ঐকমত্য ছিল। কিন্তু এটাও বাস্তবতা ছিল যে, কোনো পক্ষেই এতটুকু সাহস ছিল না যে, তারা একাই উসমানিদের পরাজিত করতে সক্ষম হবে (যদিও তখন উসমানিরা অনেক দুর্বল হয়ে গিয়েছিল)। অপরদিকে এই শতাব্দীর বিপ্লবগুলো পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরিকে রাশিয়ার বিরোধী বানিয়ে দেয়। এই জন্য তারা উসমানিদের রক্ষা করছিল। এই প্রেক্ষাপটগুলো এতটাই কঠিন ছিল, যা একটি বিশ্বযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সেই বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ের জন্য অসংখ্য সৈনিকের প্রয়োজন ছিল, যা ব্রিটেন হিন্দুস্থানের ওপর কজার ফলে সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক অবস্থানে ব্রিটেনই একক রাষ্ট্র ছিল, যারা হিন্দুস্থান থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে খিলাফতকে খতম করতে সক্ষম হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মির (হিন্দুস্থানের শাহি ফৌজ) ১৫ লক্ষ বাহিনী মুসলিম উম্মাহর খিলাফতকে ধ্বংসের দুর্ভাগ্য অর্জন করে!

ঊনবিংশ শতাব্দীর এই রাজনীতি এতটাই কঠিন ছিল যে, এটাকে স্পষ্ট করা ও বোঝার জন্য এক বিশাল বই প্রয়োজন। এ জন্য ঐতিহাসিকরা এই যুদ্ধকে গ্রেট গেইম নাম দিয়েছে। এখানে আমরা সেই ঘটনাগুলো সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করব। যেহেতু রাজনৈতিক খেলাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় উসমানি সাম্রাজ্য, রাশিয়ার জার, ব্রিটেন সাম্রাজ্য, ফ্রান্স ও হিন্দুস্থান ছিল, তাই আমরা সব ঘটনা একই সূত্রে বর্ণনা করার চেষ্টা করব।

**গ্রেট গেইম (মুসলিম উম্মাহর পতন)**
গ্রেট গেইম মূলত পশ্চিমা ঐতিহাসিকদের পরিভাষা, যা উসমানি খিলাফতকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কৃত চক্রান্ত ও যুদ্ধগুলোর জন্য ব্যবহার করা হয়। এই তিনটি রাষ্ট্র একদিকে উসমানিদের দুর্বল করছিল এবং অপরদিকে চেষ্টা করছিল; যাতে তাদের কেউ একে অপরের থেকে বেশি অংশ দখল করতে না পারে। এই জন্যই ১৮৭৭ সালে রাশিয়া যখন উসমানিদের ওপর হামলা করে অনেক অংশ দখল করে নেয়, তখন ফ্রান্স ও ব্রিটেন উসমানিদের রক্ষাকারী হয়ে যায়। ফলে রাশিয়া সেখান থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু বলকান যুদ্ধে যখন নিজেদের স্বার্থ সামনে আসে, তখন এই দুই রাষ্ট্র উসমানিদের মোকাবিলায় বলকানকে রক্ষা করে। অতঃপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য যখন বড় শক্তিশালী বাহিনী প্রস্তুত হয়ে যায়, তখন সবাই মিলে উসমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলে দিয়েছিল।

গ্রেট গেইমের দুটি অংশ রয়েছে। প্রথম অংশকে ইউরোপীয় যুগ বলা হয়, যা ১৮৫৬ থেকে শুরু হয়ে ১৯১২ সালে বলকান যুদ্ধ পর্যন্ত চলমান ছিল। এই যুগ প্রায় ৬০ বছর দীর্ঘ ছিল। এই সময় মুসলিম উম্মাহর তিন দুশমন নিজ নিজ অবস্থান থেকে উসমানিদের দুর্বল করে ইউরোপ থেকে তাদের ক্ষমতাকে বিলুপ্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। অতঃপর গ্রেট গেইমের দ্বিতীয় যুগ শুরু হয়, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে নিয়ে উসমানিদের পতন (১৯১৪ থেকে ১৯২৩ খ্রি.) পর্যন্ত বিস্তৃত।

**গ্রেট গেইমের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট**
গ্রেট গেইমের ঘটনা উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে শুরু হয়েছিল। এই খেলার চারটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল। চারটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হচ্ছে উসমানি খিলাফত, রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্স। দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে, ব্রিটেনের হিন্দুস্থান দখল এবং ভূমধ্য সাগর ও লোহিত সাগর দখলের চেষ্টা।

এটা ছিল সেই সময়, যখন উসমানিদের ক্ষমতা দুনিয়ার তিনটি মহাদেশে ছড়িয়ে ছিল এবং তাদের অবস্থান সুপার পাওয়ারের মতো ছিল। এই সাম্রাজ্যের সীমা একদিকে রাশিয়ার সাথে অপরদিকে ইউরোপের জার্মানি ও ফ্রান্সের সাথে লেগে ছিল। বিশ্বের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক পথ উসমানিদের কব্জায় ছিল। ভূমধ্য সাগরে তাদের অনুমতি ব্যতীত কোনো জাহাজ চলতে পারত না। ভূমধ্য সাগর অতীতকাল থেকেই বিশ্বের মেরুদণ্ডের মতো ছিল। ঐতিহাসিকদের মতানুযায়ী দুনিয়ার প্রাচীন ইতিহাস ভূমধ্য সাগরের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। কারণ বনি ইসরাইলের প্রাচীন ইতিহাস হোক বা সিকান্দারের হামলা, মুশরিক রোম হোক বা খ্রিষ্টান রোম, বনি উমাইয়্যা হোক বা বনি আব্বাসি, উসমানিদের পশ্চিম রাষ্ট্রগুলো থেকে যুদ্ধ হোক বা পশ্চিমাদের গ্রেট গেইম, ব্রিটেনের বিরুদ্ধে নেপোলিয়নের যুদ্ধ হোক বা হিটলারের আফ্রিকান চক্রান্ত; বাস্তবতা হচ্ছে এই সমস্ত ঘটনায় ভূমধ্য সাগরের ভূমিকা ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের। যার ফলে পূর্ব-পশ্চিমের ঐতিহাসিকরা একমত যে, দুনিয়ার সুপার পাওয়ার হওয়ার জন্য ভূমধ্য সাগরের ওপর কব্জা জরুরি।

**ভূমধ্য সাগরের ভৌগলিক অবস্থান**
ভূমধ্য সাগর (Mediterranean Sea) পশ্চিমে জিব্রাল্টা প্রণালী (Gibraltar) থেকে নিয়ে পূর্বে ফিলিস্তিন, শাম ও লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় আড়াই হাজার মাইল লম্বা এক জলাভূমি। এটি পশ্চিমে জিব্রাল্টা প্রণালীর স্থানে (Atlantic Ocean) প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে মিলিত হয়েছে। অন্যদিকে পূর্ব দিকে ভূমধ্য সাগর থেকে দুটি রাস্তা বের হয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমে মিশরের (Suez Canal) সুয়েজ খালের মাধ্যমে (Red Sea) লোহিত সাগরের সাথে মিলিত হয়েছে। এই খালটিকে ১৮৬৯ সালে ফ্রান্সের এক কোম্পানি বানিয়েছিল। উত্তর-পূর্ব দিকে এটি মর্মর সাগর (Dardanelles Strait) পাড়ি দিয়ে বসফরাস প্রণালী (Bosphorus Strait) দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কৃষ্ণ সাগর (Black Sea)-এর সাথে মিলিত হয়েছে। পূর্ব ও পশ্চিমের এই তিন রাস্তা সর্বদাই ব্যবসা ও সেনাবাহিনী আসা-যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। ভূমধ্য সাগরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই সমুদ্রের দুই দিকে বিশ্বের তিনটি মহাদেশ একে অপরের থেকে কিছু মাইল দূরে এসে থেমে গেছে। জিব্রাল্টা প্রণালীতে ইউরোপ ও আফ্রিকা একে অপরের থেকে শুধু পনেরো কিলো দূরে। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মিশরের সিনাই (Sinai) মরুতে আফ্রিকা ও এশিয়ার ভৌগলিক সীমা মিলিত রয়েছে। উত্তর-পূর্বে এশিয়া ও ইউরোপ তুর্কিতে শুধু পাঁচ কিলো দূরে এসে মিলিত হয়েছে।

ভূমধ্য সাগরে নিজেদের দখল টিকিয়ে রাখার জন্য প্রত্যেক বড় শক্তি পশ্চিমে জিব্রাল্টা প্রণালী, মধ্য ভূমধ্য সাগরের সিসিলি (Sicily), মাল্টা (Malta) ও ক্রিট (Crete) দ্বীপের ওপর দখল জরুরি মনে করত। এ ছাড়াও মিশরের ইস্কান্দারিয়া (Alexandria) বন্দর এবং তুর্কির মর্মর সাগরে গ্যালিপলি (Gallipoli) বন্দরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামরিক স্থান। আধুনিক যুগের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে এই স্থানগুলোতে লড়াই হয়েছিল।

**রাশিয়ার জার**
অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে রাশিয়ায় জারের সাম্রাজ্য এক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তাদের ব্যবসার জন্য ওয়ার্ম ওয়াটার পোর্টের প্রয়োজন ছিল; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার উপযোগী ক্ষেত্র কৃষ্ণ সাগর ছিল উসমানিদের দখলে। এ ছাড়া পশ্চিম দিকের পথ ইউরোপের অভ্যন্তরীণ পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও অস্ট্রিয়ার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতো এবং সেখানেও উসমানিরা এই রাস্তাগুলোতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাশিয়ার দক্ষিণে মধ্য এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর ওপর সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উসমানিদের দখল ছিল। ভৌগলিক এই সমস্যাতে রাশিয়া অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর ভাগে পতিত ছিল।

**ব্রিটেন ও ফ্রান্স**
যেমনটা আমরা পূর্বে বলেছি, ১৩৪০ সালে ইউরোপে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ফলে পুরো ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ বসতি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। তাদের সমস্ত বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ফলে ইউরোপ তখন দুনিয়ায় নতুন বাজার তালাশের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ইউরোপের সমস্ত রাষ্ট্র যাদের মধ্যে পর্তুগাল, ফ্রান্স, হল্যান্ড ও ব্রিটেন অন্তর্ভুক্ত ছিল, তারা ব্যবসার জন্য বের হয়। এই রাষ্ট্রগুলো নিজেদের কোম্পানিগুলো হিন্দুস্থানে রওয়ানা করিয়ে দেয়। অতঃপর সেখানে মোঘল বাদশাহদের অনুমতি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে। ইউরোপ থেকে হিন্দুস্থানে আসার দুটি রাস্তা ছিল। একটি পথে ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে লোহিত সাগর হয়ে আরব সাগর পৌঁছে সেখান থেকে হিন্দুস্থানে যাওয়া যেত। এই রাস্তা ছোট ও সহজ ছিল। সেই সময় এই রাস্তায় হিন্দুস্থানে দুই মাসে সফর শেষ করা যেত। কিন্তু দ্বিতীয় রাস্তায় প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম আফ্রিকা উপকূলের সাথে সাথে দক্ষিণ আফ্রিকার শহর ক্যাপটাউন ঘুরে দক্ষিণ থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে ভারত সাগরে প্রবেশ করা যেত। অতঃপর সেখান থেকে আরব সাগর পার হয়ে হিন্দুস্থানে যাওয়া যেত। এই সফরের জন্য আট মাস সময় লাগত।

অপরদিকে আমেরিকা আবিষ্কারের পর ইউরোপের সব রাষ্ট্র সেটাকেও দখলের কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছিল। ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মাঝে তাদের নতুন বাজার দখল নিয়ে যুদ্ধ হচ্ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে আমেরিকাতে থাকা ব্রিটেনের বাজারগুলো প্রচণ্ড এক ধাক্কা খায়। কেননা জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে আমেরিকা ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে নিয়েছিল। আমেরিকা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর ব্রিটেন এসে হিন্দুস্থানে ফ্রান্সের ব্যবসাকে অনেক সীমাবদ্ধ করে ফেলে এবং আস্তে আস্তে হিন্দুস্থান তাদের পূর্ণ দখলে নিয়ে নেয়।

**গ্রেট গেইমের যুদ্ধক্ষেত্র**
হিন্দুস্থানের ওপর দখলদারিতের পর ব্রিটেনের জন্য জরুরি ছিল যে, তারা ভূমধ্য সাগর থেকে লোহিত সাগর ও সেখান থেকে আরব সাগর এবং সেখান থেকে হিন্দুস্থানে পৌছার রাস্তাকে নিজেদের জন্য খোলা রাখবে, যা তখন উসমানিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এটাই ছিল গ্রেট গেইমের প্রথম যুদ্ধক্ষেত্র। এই পথে তাদের জন্য এডেন ও ইস্কান্দারিয়া বন্দর এবং ক্রিট, মাল্টা ও সিসিলি দ্বীপের ওপর দখল আবশ্যক ছিল। ব্রিটেন ১৮১৪ সালের প্যারিস কনফারেন্সের মাধ্যমে মাল্টা দখল করে নেয়। ১৮৩২ সালে এক চুক্তির অধীনে এডেনকে উসমানিদের থেকে নিয়ে নেয়। ১৮৮২ সালে ব্রিটেন মিশর দখল করে এবং ১৮৯৮ সালে ক্রিটকে উসমানিদের থেকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেওয়া হয়।

গ্রেট গেইমের দ্বিতীয় ক্ষেত্র ১৮৫৬ সালে রাশিয়ার সাথে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের পর শুরু হয়। এই যুদ্ধক্ষেত্রে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর লক্ষ্য ছিল পূর্ব ও দক্ষিণ ইউরোপ থেকে উসমানিদের বের করে দেওয়া। এই ক্ষেত্রে রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ত্রিশক্তি একত্রে ছিল; কিন্তু তাদের কর্মপদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ব্রিটেন ও ফ্রান্স অভ্যন্তরীণ চক্রান্তের এক বিশাল প্ল্যান সাজায়। খিলাফতের ভেতর তারা আইন (পার্লামেন্ট), গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও উন্নতির স্লোগানে কিছু পার্টি প্রতিষ্ঠা করে এবং দেশাত্ববোধ ও জাতীয়তাবাদের দিকে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। মুসলিম এলাকাগুলোতে অবস্থানরত খ্রিষ্টানদের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে থাকে। যার ফলে সর্বশেষ ১৯১২ সালে বলকান যুদ্ধে ইউরোপে উসমানিদের ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়।

গ্রেট গেইমের তৃতীয় ক্ষেত্র ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯২৩ খ্রি.)। যেখানে খিলাফতকে পতন করে কামাল আতাতুর্ক জাতীয়তাবাদী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করে।

গ্রেট গেইমের চতুর্থ ক্ষেত্র রাশিয়ার দক্ষিণ দিকের সীমান্ত বৃদ্ধির ফলে তৈরি হয়েছিল। রাশিয়া ১৮৬২ সাল থেকে ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত মধ্য এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো দখল করে ব্রিটেন ও হিন্দুস্থান থেকে মাত্র চারশ কিলো দূরত্বে চলে আসে। ফলে রাশিয়া ও ব্রিটেনের মাঝে শুধু আফগানটাই বাকি ছিল। যার ফলে তখন আফগানের গুরুত্ব বেড়ে যায়। রাশিয়া চাচ্ছিল আফগানে তাদের চাহিদামতো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে এবং ব্রিটেন চাচ্ছিল তাদের চাহিদামতো সরকার গঠন হবে। এই রেষারেষি এক নতুন যুদ্ধের সূচনা করে, যাকে কাায়েলি যুদ্ধ বা ব্রিটেনের বিরুদ্ধে প্রথম আফগান জিহাদ বলা হয়।

গ্রেট গেইমের পঞ্চম ও সর্বশেষ ক্ষেত্র ছিল রাশিয়ার সন্নিকটে ক্রিমিয়া, ককেশাস, বলকান ও মধ্য এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো এবং কৃষ্ণ সাগর।

**গ্রেট গেইমে হিন্দুস্থানের ভূমিকা**
গ্রেট গেইম উসমানিদের পতনের শুরু থেকে পতন পর্যন্ত (১৮২৫-১৯২৩ খ্রি.) চলমান ছিল। এই পুরো সময়ে ব্রিটেনের ভূমিকাই ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের। যার মূল কারণ ছিল ব্রিটেনের হিন্দুস্থান দখল। হিন্দুস্থান ব্রিটেনকে সেই বাহিনী ও সরঞ্জাম সংগ্রহ করে দিয়েছিল, যার মাধ্যমে তাদের এমন সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তারা উসমানিদের পরাজিত করে মুসলিম উম্মাহকে টুকরা টুকরা করে দিয়েছিল। তাই এখানে জরুরি হচ্ছে, হিন্দুস্থানের ইতিহাস এমনভাবে আলোচনা করা, যেখানে হিন্দুস্থানের ওপর ব্রিটেনের কব্জা ও গ্রেট গেইমের ইতিহাস একসাথে আলোচিত হবে; যাতে আমরা বাস্তব অবস্থা খুব সহজেই বুঝতে সক্ষম হব।

**ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্যবসার যুগ**
ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো থেকে সর্বশেষ ব্রিটেন হিন্দুস্থানে এসেছিল। ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথ ১ম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে হিন্দুস্থানে ব্যবসার পরিকল্পনা দেয়। ১৮১২ সালে এই কোম্পানি বাদশাহ জাহাঙ্গির থেকে অনুমতি নিয়ে হিন্দুস্থানে ব্যবসা শুরু করে। কোম্পানির প্রথম যুগকে ব্যবসার যুগ বলা হয়। এই কোম্পানি অনেক সাধারণভাবে ব্যবসা শুরু করে এবং আস্তে আস্তে উন্নতি করে তাদের কারবার মাদ্রাজ, বোম্বাই এবং বাংলার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। এই জায়গাগুলোতে কোম্পানি নিজেদের ফেক্টরি বসায় ও গুদাম বানায়। এই ফেক্টরি ও গুদামগুলোকে রক্ষা করার জন্য ইংরেজদের চৌকিদারের প্রয়োজন হয়। তাই বাদশাহের অনুমতিতে চৌকিদারের বাহিনী তৈরি করে, যাদেরকে সেই সময় 'সিপয়' (Sepoy) বলা হতো। এটা ছিল শাহি বাহিনীর একটি বিকৃত রূপ।

হিন্দুস্থানের ঐতিহাসিকরা একমত যে, বর্তমান পাকিস্তানি বাহিনীর সমস্ত ইউনিট ও রেজিমেন্টের শুরু এই চৌকিদার বাহিনী থেকেই হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে যখন কোম্পানির কাজ বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন তাদের কোম্পানিকে তিনটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অংশে ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রত্যেক অংশের নাম প্রেসিডেন্সি (Presidency) রাখা হয়। মাদ্রাজ এর অংশকে 'মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি' যা ১৬৪০ সালে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, বোম্বাইয়ের অংশকে 'বোম্বাই প্রেসিডেন্সি' যা ১৬৮৭ সালে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় এবং বাংলার অংশকে 'বাঙ্গাল প্রেসিডেন্সি' যা ১৬৯০ সালে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। আস্তে আস্তে এই তিন প্রেসিডেন্সি নিজ নিজ বাহিনী বৃদ্ধি করে নিজেদের ঘাঁটিকে শক্তিশালী করা শুরু করে। অতঃপর যখন মোঘল বাদশাহরা দুর্বল হয়ে যায়, তখন এই প্রেসিডেন্সিগুলো সেই সুযোগে হিন্দুস্থান দখলের চক্রান্ত শুরু করে দেয়। সর্বশেষ হিন্দুস্থানের ওপর পূর্ণ দখল প্রতিষ্ঠার দ্বারা এই চক্রান্ত শেষ হয়।

**মোঘল সাম্রাজ্যের পতন**
মোঘলদের পতন ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেব আলমগীর-এর মৃত্যু থেকেই শুরু হয়। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তার ছেলে শাসনের অযোগ্য প্রমাণিত হয়। সে সাম্রাজ্যকে পরিচালনা করতে সক্ষম ছিল না। ফলে মোঘল সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে যায়। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যারা পূর্বে মোঘলদের অধীনে ছিল, তারা আস্তে আস্তে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যায়। তাদের গভর্নররা বাদশাহদের থেকেও বেশি শক্তিশালী হওয়া শুরু হয়। শুরুতে আলাদা তিনটি রাষ্ট্র জন্ম নেয়; যার মধ্যে দক্ষিণ ও মধ্য হিন্দুস্থানে হায়দারাবাদ, দাকান ও মিরাঠিরা প্রতিষ্ঠিত হয়। উত্তর হিন্দুস্থানে অয্যোধ্যায় ছিল সাদাতুল মালিকের রাষ্ট্র। তবে সেই যুগে হিন্দুস্থানে এই বিশ্বাস খুব গভীরভাবে বদ্ধমূল ছিল যে, সেই ব্যক্তিই নবাব ও গভর্নর হতে পারবে, যাকে মোঘলরা নির্ধারণ করবে। যার ফলে মোঘলরা ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো। ফলে হিন্দুস্থানের রাজনীতি এক নতুন দিকে চলা শুরু করে। প্রত্যেক রাষ্ট্র মোঘল দরবারে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করা শুরু করে। মোঘলদের দরবারে সবচেয়ে বড় পদ ছিল আমিরুল উমারা। এই পদ দখলের জন্য এই রাজ্যগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। আমিরুল উমারা হওয়ার দ্বন্দ্ব ও নিজেদের সীমানা বৃদ্ধির রাজনীতি তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা আরও দুর্বল করে দেয়। সেই সময় আরও একটি দাবিদার বৃদ্ধি পায়, তারা ছিল রোহিলখণ্ড রাজ্যের পাঠান নজিবুদ্দৌলা ও হাফিজ রহমত খান। এ ছাড়াও দিল্লির আশেপাশে 'জাঠ জাতি' শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং 'সূর্যমিল'-এর নেতৃত্বে দিল্লির মফস্বল এলাকাগুলোতে লুণ্ঠন করতে থাকে।

১৭৩৭ সালে মিরাঠিরা দিল্লিতে হামলা করে শাহি খাজানা লুটে নেয় এবং বাদশাহ থেকে নিজেদের ট্যাক্স মাফ করিয়ে চলে যায়। দিল্লি এই হামলা থেকে তখনও সামলে উঠতে পারেনি, এর মধ্যেই ইরানের বাদশাহ নাদের শাহ দিল্লিতে হামলা করে শাহি খাজানা লুণ্ঠন করে এবং বাদশাহ শাহজাহানের সিংহাসন নিজের সাথে নিয়ে যায়। ফিরে যাওয়ার সময় লাহোর পর্যন্ত নিজেদের সীমানার ভেতর অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। মিরাঠি ও নাদের শাহের এই হামলার ফলে মোঘল বাদশাহরা চূড়ান্তরূপে দুর্বল হয়ে যায়।

**শাহ ওয়ালি উল্লাহ-এর কার্যক্রম**
এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই ১৭০৩ সালে ইসলামের এক মহান বীরপুরুষ জন্ম নেন। যিনি ইতিহাসে 'শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি' নামে পরিচিত। শাহ সাহেব শুরুজীবনে পিতার কাছেই শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং যুবক বয়সেই হজ করে আসেন। শিশুকাল থেকে যৌবন পর্যন্ত তিনি দিল্লির দুরবস্থা লক্ষ করে আসছিলেন, যা দেখে কোনো আলিমে রব্বানির পক্ষে চুপ থাকা ছিল অসম্ভব। শাহ সাহেবও এই সমস্ত অবস্থা দেখে কাজের ময়দানে নেমে আসেন। তিনি এক পরিপূর্ণ কার্যপদ্ধতি বা মানহাজ তৈরি করেন, যার দুটি মৌলিক অংশ ছিল। তার কার্যপদ্ধতির প্রথম অংশ ছিল হিন্দুস্থানের মুসলিমদের শক্তি যাতে দুর্বল না হয়ে যায়; তাই মোঘল বাদশাহদেরকে (যারা সেই সময় অনেক শরিয়াহবিরোধী কাজে লিপ্ত থাকলেও হিন্দুস্থানের মুসলিমদের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো) যেকোনোভাবে হোক সেই সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত রাখা, যতক্ষণ না কোনো উপযুক্ত শরয়ি নেতৃত্ব সামনে আসে। তার কার্যপদ্ধতির দ্বিতীয় অংশ ছিল হিন্দুস্থানের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে শরিয়াহর অনুগত করা। যেহেতু তিনি জানতেন, এই বিপ্লব এক-দুই বছরে সম্ভব নয়; তাই তার কার্যক্রম ছিল এই বিপ্লবের প্রথম ধাপ হিসেবে আলিমদের এমন একটি দল তৈরি করা, যারা জনগণ ও মুসলিমদের মধ্যে জিহাদের মানসিকতা জাগ্রত করবে। অতঃপর সেই জিহাদের বদৌলতে সমাজে পরিবর্তন সংঘটিত হবে।

এই কর্মপদ্ধতিতে কাজের জন্য তিনি দুটি জামাআত তৈরি করে শাসক ও আলিমদের ওপর আলাদাভাবে কাজ শুরু করেন। তার কার্যক্রমের প্রথম অংশ বাস্তবায়নের জন্য রোহিলার সর্দার নাজিবুদ্দৌলাকে রাজি করান যে, সে আফগানের শাসক আহমাদ শাহ আবদালিকে হিন্দুস্থানে হামলার আমন্ত্রণ জানাবে। যাতে মিরাঠি ও জাঠদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে আবারও মোঘলদের শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এই লক্ষ্যে তারা নিজেই আহমাদ শাহ আবদালির কাছে চিঠি লিখেন। শাহ ওয়ালি উল্লাহ ও নাজিবুদ্দৌলার প্রচেষ্টার ফলে ১৭৬১ সালে আহমাদ শাহ আবদালি তার বাহিনী নিয়ে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মিরাঠি বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। যার ফলে মধ্য ও পূর্ব হিন্দুস্থানের মধ্যে তাদের শক্তি ধ্বংস হয়ে যায়। সামনে এগিয়ে আহমাদ শাহ দিল্লি পৌঁছে যান এবং মোঘল বাদশাহ শাহ আলমকে দিল্লি ডেকে পাঠান, যে তখন ইলাহাবাদে ছিল। যাতে সে দিল্লিতে এসে আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। এটা ছিল মোঘলদের শক্তিশালী হওয়ার সর্বশেষ সুযোগ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বাদশাহ দিল্লিতে আসেননি এবং এভাবেই ঐতিহাসিক এই সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যায়।

**ইংরেজদের বাংলা দখল**
শাহ ওয়ালি উল্লাহ ও নাজিবুদ্দৌলা এবং আহমাদ শাহ আবদালি যখন মিরাঠিদের শক্তিকে নিঃশেষ করার জিহাদে লিপ্ত ছিলেন, তখন দিল্লি ও পানিপথের ময়দানের বহুত দূরে বাংলার রাজনীতি একটি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। ইংরেজরা-যারা ব্যবসার জন্য হিন্দুস্থানে এসেছিল, এখন তারা বাংলার বাদশাহ থেকে ট্যাক্স মাফ করিয়ে নেয়, সেই সাথে তাদের দুর্গে সেনা ও তোপ বৃদ্ধির অনুমতি মঞ্জুর করিয়ে নেয়। কিন্তু বাংলার নবাব সিরাজুদ্দৌলা বাদশাহর এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। তাই নবাব সিরাজ ইংরেজদের এই অনুমতির ভিত্তিতে কাজ করা থেকে বাধা দেয়। কিন্তু ইংরেজরা সিরাজের বাধার কোনো পরোয়াই করেনি। তাই সিরাজ কলকাতায় ইংরেজদের কেল্লা ফোর্ট উইলিয়ামের ওপর হামলা করে সেখানে থাকা সকল ইংরেজকে বন্দী করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে আসে। রবার্ট ক্লাইভ যে মাদ্রাজ বাহিনীতে ক্লার্ক হিসেবে ভর্তি হয়েছিল, সে তখন উন্নতি করে কর্নেলের পদে উপনীত হয়ে গেছে। সে এই সমস্ত বন্দীকে ছাড়ানোর জন্য মাদ্রাজ থেকে তিন হাজারের একটি বাহিনী নিয়ে বের হয়। সে ভালো করেই জানত, এই বাহিনী কখনোই বাংলার বাহিনীকে পরাজিত করতে পারবে না। তাই তার একটি গাদ্দার প্রয়োজন ছিল, যে প্রয়োজন মীর জাফর পূরণ করে দেয়। ক্লাইভ তাকে লোভ দেখায় যে, যদি সে সিরাজের পরিবর্তে ইংরেজদের সাহায্য করে, তাহলে তারা তাকে বাংলার নবাব বানিয়ে দেবে। মীর জাফর এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়।

১৭৫৭ সালে পলাশি অঞ্চলে ইংরেজ ও সিরাজের বাহিনীর সামনাসামনি মোকাবিলা হয়। যুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্তে যখন সিরাজ মীর জাফরকে ঘোড়-সওয়ার বাহিনী নিয়ে হামলার আদেশ দেয়, তখন সেই গাদ্দার হামলার পরিবর্তে যুদ্ধের ময়দান থেকে বাহিনী নিয়ে চলে যায়। যার ফলে সিরাজের বাহিনীর নেতৃত্ব টলে যায়। এই অবস্থা দেখে সিরাজ নিজেই পলায়ন করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাকে গ্রেফতার করে হত্যা করা হয়। ইংরেজরা মীর জাফরকে বাংলার নবাব বানায় ঠিকই, কিন্তু তার ওপর যুদ্ধের বিশাল খরচ বহনের বোঝা চাপিয়ে দেয়, যা সে আদায় করতে সক্ষম ছিল না। তাই সে জনগণের ওপর মোটা অঙ্কের ট্যাক্স বসিয়ে দেয়, যার ফলে বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষে যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়। একদিকে জনগণ মারা যাচ্ছিল, অপরদিকে জাফর আরও ট্যাক্স বাড়াচ্ছিল। যার ফলে জনগণ একসময় অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। আর এই সুযোগ নিয়ে তার জামাতা মীর কাসেম তার সিংহাসন উলটে দিয়ে বাংলার নবাব হয়ে যায়। জাফর পলায়ন করে ইংরেজদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। অন্যদিকে মীর কাসেম তার বিরুদ্ধে অযোধ্যার নবাব ও বাদশাহ শাহ আলমের কাছে সাহায্য চায়।

১৭৬৪ সালে বক্সারের ময়দানে শাহ আলম ও ইংরেজদের বাহিনীর মোকাবিলা হয়। শাহ আলম বক্সারের ময়দানে পরাজিত হয়। অতঃপর ইংরেজ ও শাহ আলমের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। যেখানে বাদশাহ ইংরেজদের পূর্ণরূপে বাংলার ক্ষমতা প্রদান করে। যার অর্থ ছিল ইংরেজরা এখন বাংলার শাসক হয়ে গেছে। বক্সার যুদ্ধ হিন্দুস্থানের ইতিহাসে একটি চূড়ান্ত মোড়ই ছিল না; বরং এই যুদ্ধ বৈশ্বিকভাবে পশ্চিমাদের উত্থানের জন্যও একটি শক্তিশালী সিঁড়ি হিসেবে পরিগণিত হয়।

**বক্সার যুদ্ধের পর হিন্দুস্থানের অবস্থা**
বক্সার যুদ্ধ হিন্দুস্থানের ওপর অনেক গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বাংলার শাসক হওয়ার অর্থ এই ছিল যে, এখন ইংরেজরা সেখানে নিজেদের আইন-বিধান বাস্তবায়ন করা, মানুষকে শাস্তি দেওয়া, স্বাধীন ব্যবসা করা এবং ট্যাক্স উসুলের ক্ষমতা পেয়ে গিয়েছে। এর পূর্বে যেহেতু বাংলায় শরিয়াহ বাস্তবায়িত হতো এবং সেই অনুযায়ী ফয়সালা হতো; বাংলার বাণিজ্যের সমস্ত নীতিমালা জনগণের ফায়দার জন্য বানানো হয়েছিল; তাই এই নীতিগুলোর দ্বারা ইংরেজদের কোনো উপকার হচ্ছিল না। ফলে তারা সেই নীতিগুলো পরিবর্তন করে বাংলায় নিজেদের পূর্ণ হুকুমত প্রতিষ্ঠা করে এবং হিন্দুস্থানে ইংরেজদের আইন বাস্তবায়ন শুরু করে দেয়। এর মাধ্যমে ইংরেজরা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চলমান যুদ্ধের নতুন একটি পক্ষ হয়ে যায়।

**হিন্দুস্থানে ইংরেজদের কার্যক্রম**
ইংরেজরা কখনোই সর্বদা হিন্দুস্থানি হয়ে থেকে যাওয়ার কল্পনা করেনি। যদি করেও থাকে, তাহলে হিন্দুস্থানের চলমান জিহাদি আন্দোলন তাদেরকে সর্বদা এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করত যে, তাদেরকে অবশ্যই একদিন এই রাষ্ট্র থেকে বের হতেই হবে। তাই তাদের কাজ ছিল হিন্দুস্থান থেকে অধিক থেকে অধিক সম্পদ নিয়ে যাওয়া। ইংরেজদের মূল লক্ষ্য ছিল যত বেশি সম্ভব হিন্দুস্থানের কাঁচামাল ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে কারখানা প্রতিষ্ঠা করে পণ্য উৎপাদন করা। অতঃপর পুরো দুনিয়ার বাজারগুলোতে সেই উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে বিশ্ববাণিজ্যে হিন্দুস্থানের ঠিকাদারি শেষ করে ব্রিটেনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠা করা। ইংরেজরা এটা ভালো করেই জানত যে, তারা যখন এমনটা করবে, তখন হিন্দুস্থানের শিল্প-কারখানা ধ্বংস হয়ে যাবে; ফলে হিন্দুস্থানে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন বিরোধিতা শুরু হবে।

অপরদিকে ইংরেজরা দেখছিল যে, এখন হিন্দুস্থানের রাজনীতির মধ্যে দুটি দল হয়ে গেছে। একটি ইংরেজদের সাহায্যকারী ও অপরটি তাদের শত্রু। ইংরেজদের সাহায্যকারী দলে ছিল কার্নাটাকার নবাব মুহাম্মাদ আলি, হায়দারাবাদের নিজাম, অযোধ্যার নিজام সুজাউদ্দৌলা ও তার ছেলে আজাদ আলি খান। ইংরেজদের বিরোধীদের মধ্যে ছিল মহিশুরের নবাব হায়দার আলি ও তার ছেলে টিপু সুলতান, রোহিলখণ্ডের নবাব নজিবুদ্দৌলা এবং মিরাঠিরা। মিরাঠিরা ইংরেজদের বিরোধী হওয়ার পাশাপাশি মহিশুর ও রোহিলখণ্ডেরও বিরোধী ছিল।

**হিন্দুস্থানে ইংরেজ বাহিনীর গঠন**
এই সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য ইংরেজদের সেই সময়ের জেনারেল লর্ড ক্লাইভ ও ওয়ারেন হ্যাস্টিংস সিদ্ধান্ত নেয় যে, তাদের এমন একটি বাহিনী প্রয়োজন, যাদেরকে হিন্দুস্থানের সাধারণ জনগণ থেকে গঠন করা হবে। তাদের বৈশিষ্ট্য হবে যে, তারা কোনো ধর্মের আদর্শ ছাড়াই যুদ্ধ করবে এবং তাদের জান কুরবান করবে। পাশাপাশি ইংরেজরা যখন কোনো আইন পরিবর্তন করবে, তখন কেন এটা করছে, তা চিন্তা করার সক্ষমতা সেই সিপাহিদের মধ্যে থাকতে পারবে না। এই আইন পরিবর্তনের ফলে ইংরেজদের কী ফায়দা ও হিন্দুস্থানের কী ক্ষতি, তা চিন্তা করতে পারবে না। সেই সিপাহিরা শুধু এই চিন্তাই করবে যে, তাদের কাজের দ্বারা তাদের কী লাভ অর্জিত হবে?

সেই সাথে সিপাহিরা ইংরেজদের পূর্ণ ওয়াফাদার হবে। কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়াই যুদ্ধ কীভাবে হবে এবং আঞ্চলিক জনগণের ওয়াফাদারি কীভাবে অর্জন করবে? এই প্রশ্নের জবাবে ইংরেজদের বক্তব্য ছিল, যদি কোনো সিপাহি ইংরেজদের ওয়াফাদার হয়, তাহলে তাকে বাহিনীতে প্রমোশন দেওয়া হবে। অর্থাৎ বাহিনীর উঁচু পদে অধিষ্ঠিত করা হবে। মূলত তাদেরকেই পেশাদার ভাড়াটে সিপাহি বলা হয়; বরং সঠিক শব্দে তাদেরকে পেশাদার ভাড়াটে হত্যাকারী বলা যায়। এটাই ছিল পরবর্তী উপমহাদেশের বাহিনীর আদর্শিক চিন্তাগত ভিত্তি। ইংরেজদের প্রতি সর্বদা ওয়াফাদার বানানোর জন্য লর্ড ক্লাইভ ও হ্যাস্টিংস যেই থিউরি পেশ করে, তার নাম ছিল 'ওয়াফাদারির পরিবর্তে ভূমি।' যার অর্থ ইংরেজদের ওয়াফাদার হলে বড় বড় জায়গির দেওয়া হবে। যার ফলে এমন এক শ্রেণি আপনাআপনিই তৈরি হয়ে যায়, যারা ইংরেজদের বিশ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি বাহিনীর সদস্য হিসেবে পূর্ণ শক্তি ব্যয় করবে।

এটিই সেই মৌলিক চিন্তাধারা, যার ভিত্তিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গুদাম ও উপকূলীয় অঞ্চলগুলো রক্ষার আঞ্চলিক চৌকিদার তিনটি বাহিনী গঠন করা হয়। সেই তিন বাহিনী ছিল বাংলার বাহিনী, মাদ্রাজের বাহিনী ও বোম্বাইয়ের বাহিনী। এই তিন বাহিনীতেই পদাতিক, ঘোড়-সওয়ার ও তোপ নিক্ষেপকারী সেনা ছিল। শুরুতে ইংরেজদের পলিসি ছিল যে, প্রত্যেক এলাকা থেকেই সেখানের আঞ্চলিক লোকদের ভর্তি করা হবে। যার ফলে বাংলার বাহিনীতে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মুসলিম ও হিন্দুরা ছিল। তেমনিভাবে মাদ্রাজের বাহিনীতে দক্ষিণ হিন্দের মুসলিম ও হিন্দুরা অন্তর্ভুক্ত ছিল। বোম্বাইয়ের বাহিনীতে মিরাঠি, সিন্ধ ও বেলুচ মুসলিম ও হিন্দুরা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

মাদ্রাজের বাহিনী পলাশি, বক্সার ও টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইংরেজদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বাংলা বিজয় ও টিপু সুলতানের পরাজয়ের ক্ষেত্রে মাদ্রাজের বাহিনীরই মূল ভূমিকা ছিল। ১৭৫৯ সালে উপকূল রক্ষার জন্য মাদ্রাজের বাহিনীকে তিনটি ব্যাটালিয়নে ভাগ করা হয়েছিল, যা নতুন গঠনের পর মাদ্রাজের স্থানীয় বাহিনীতে পরিণত হয়। ১৭৯৮ সালে 'মাসুলি পিতমে' আরও একটি ব্যাটালিয়ন বানানো হয়, যাকে মাক্লাউডের প্লাটুন বলা হতো।

১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা-যুদ্ধে হিন্দুস্থানি বাহিনীর বিদ্রোহের পর ইংরেজরা রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মি (শাহি হিন্দুস্থানি বাহিনী) নামে একটি বাহিনীকে নতুনভাবে গঠন করে। উপকূলীয় ব্যাটালিয়নগুলোতে মাদ্রাজের আঞ্চলিক সেনাদের পরিবর্তে পাঞ্জাব ও পাঠান সেনাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। ১৯০৩ সালে 'লর্ড কিচেনার' রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মিকে নতুনভাবে সজ্জিত করে। সে উপকূলীয় রেজিমেন্টের পাঞ্জাব ব্যাটালিয়নকে পাঠান রেজিমেন্টে পরিবর্তন করে দেয়। ১৯২২ সালে রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মিকে দ্বিতীয়বার নতুনভাবে সাজানো হয় এবং পাঞ্জাব ও পাঠান ব্যাটালিয়নকে মিলিত করে ১ম, ২য়, ৮ম, ১৪তম, ১৫তম ও ১৬তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট বানানো হয়। অপরদিকে মাক্লাউডের প্লাটুনকে বোম্বাইয়ের বেলুচ ব্যাটালিয়নের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়। ১৯২২ সালের নতুন গঠনে বেলুচ ব্যাটালিয়নকে ১০ম বেলুচ রেজিমেন্ট বানিয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তান হওয়ার পর পাকিস্তানি বাহিনীর গঠন এমনভাবে হয়েছিল, যেখানে উল্লেখিত ১ম, ১৪তম, ১৫তম ও ১৬তম পাঞ্জাব রেজিমেন্টকে মিলিত করে পাকিস্তানের পাঞ্জাব রেজিমেন্ট বানানো হয়। আর ১০ম বেলুচ ও ১৮তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট মিলিয়ে পাকিস্তানের ১৮তম বেলুচ রেজিমেন্ট বানানো হয়। যার ফলে পাকিস্তানের পাঞ্জাব রেজিমেন্টের জন্ম ইংরেজদের মাদ্রাজ ফৌজ থেকেই হয় এবং বেলুচ রেজিমেন্টের জন্ম মাদ্রাজ ও বোম্বাই রেজিমেন্ট থেকে হয়।

সময় পার হওয়ার সাথে সাথে বাংলার বাহিনীর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ পর্যন্ত বাংলার বাহিনী বিহার, অযোধ্যা, দিল্লি, উড়িষ্যা ও পাঞ্জাব বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই বাংলার বাহিনীই ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহ করে। কিন্তু এই বাহিনীরই অপর অংশ 'গাইড কোর' ইংরেজদের সাথে মিলিত হয়ে এই বিদ্রোহ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই 'গাইড কোর' থেকেই পাকিস্তানের ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট জন্ম নেয়। বোম্বাইয়ের বাহিনী সিন্ধু ও বেলুচ বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাকিস্তানের ট্যাঙ্ক বাহিনী, পরিভাষায় যাকে 'আর্মার্ড কোর' বলা হয়-এর সকল রেজিমেন্টকে বোম্বাই, বাংলা ও মাদ্রাজের ঘোড়-সওয়ার ব্যাটালিয়ন থেকে বানানো হয়েছিল।

**ইংরেজদের রোহিলখণ্ড বিজয়**
১৭৭২ সালে মারাঠিরা রোহিলখণ্ডের ওপর হামলা করে। হাফিজ রহমাতুল্লাহ খান সুজাউদ্দৌলার সাহায্যে মারাঠিদের পরাজিত করে। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দায়িত্ব পালন নিয়ে সুজাউদ্দৌলা ও হাফিজ রহমত খানের মধ্যে মতানৈক্য তৈরি হয়। যার ফলে ১৭৭৪ সালে সুজাউদ্দৌলা ইংরেজদের সাথে মিলে রোহিলখণ্ডের ওপর হামলা করে। এই যুদ্ধে হাফিজ রহমাতুল্লাহ শহিদ হয় এবং রোহিলখণ্ডকে ইংরেজ ও সুজাউদ্দৌলা পরস্পর ভাগ করে নেয়। যার ফলে হিন্দুস্থানে মুসলিমদের আশার আরও একটি বাতি নিভে যায়।

**মহিশুরের সাথে ইংরেজদের যুদ্ধ**
রোহিলখণ্ডের পর পুরো হিন্দুস্থানে শুধু দক্ষিণ হিন্দের মহিশুরের বাদশাহ হায়দার আলি ও তার ছেলে ফাতেহ আলি টিপু হিন্দের মুসলিমদের সর্বশেষ আশ্রয় হিসেবে টিকে ছিল। কিন্তু শুধু ইংরেজরাই নয়; বরং মিরাঠি এবং হায়দারাবাদের নিজামও মহিশুরের ভূমির ওপর লোভের দৃষ্টি ফেলে রেখেছিল। ১৭৬৩ সালে হায়দারাবাদের নিজাম ইংরেজদের সাথে সহযোগিতার চুক্তি করে। ১৭৭২ সালের সেপ্টেম্বরে এই চুক্তির অধীনে নিজাম ও মিরাঠিরা ইংরেজদের সাথে মিলে মহিশুরের ওপর হামলা করে। যার ফলে ইংরেজ-মহিশুরের মাঝে ধারাবাহিক যুদ্ধ শুরু হয়।

প্রথম যুদ্ধে হায়দার আলি ইংরেজ জোটকে চরমভাবে পরাজিত করে। ১৭৬৯ সালে ইংরেজ ও হায়দার আলির মাঝে একটি চুক্তি হয়। সেই চুক্তিতে একে অপরের এলাকাতে হামলা না করার সন্ধি করে এবং বিপদে একে অপরকে সাহায্যের চুক্তি করে।

১৭৮০ সালে দ্বিতীয় ইংরেজ-মহিশুর যুদ্ধ হয়, যা চার বছর চলমান ছিল। যেখানে ইংরেজরা আরও একবার পরাজিত হয়। এই যুদ্ধে হায়দার আলি অসুস্থতার ফলে মারা যান। হায়দার আলির পরে তার সন্তান টিপু নিজ যোগ্যতায় সুলতান হন। ১৭৮৪ সালের ১৪ এপ্রিলে টিপু সুলতান ও ইংরেজদের মাঝে একটি চুক্তি হয়। যেখানে ইংরেজরা চরম অপদস্থতার শর্তে স্বাক্ষর করে। ইংরেজদের তখনকার গভর্নর এই চুক্তির আলোচনা করে লিখে, এই চুক্তি ছিল ইংরেজদের জন্য লাঞ্ছনাকর এবং যতদিন টিপু সুলতান জীবিত থাকবে, ততদিন ইংরেজরা হিন্দুস্থান বিজয় করতে পারবে না।

১৭৮৯ সালে টিপু সুলতান ত্রিকুটের ওপর হামলা করে। ত্রিকুটের রাজা ইংরেজদের পক্ষে ছিল। ইংরেজরা এই যুদ্ধে বাহিনী পাঠিয়েছিল। এটা ছিল তৃতীয় ইংরেজ-মহিশুর যুদ্ধ, যা তিন বছর চলমান থাকে। ১৭৯২ সালে টিপু সুলতান ও ইংরেজদের মাঝে একটি চুক্তি হয়। এরপর ইংরেজরা এই সিদ্ধান্ত নেয় যে, টিপুকে পরাজিত করার জন্য মহিশুর বাহিনীতে তাদের এক গাদ্দারের প্রয়োজন। সর্বশেষ মীর সাদেক নামের এক গাদ্দার পেয়ে যায়, যে ছিল সুলতানের নায়েব।

১৭৯৮ সালে চতুর্থ ইংরেজ-মহিশুর যুদ্ধ শুরু হয়। ১৭৯৯ সালের ৪ মে সারেঙ্গার যুদ্ধে মীর সাদেক গাদ্দারি করে। সে সারেঙ্গা পিতম দুর্গের দুর্বল অংশ ইংরেজদেরকে চিহ্নিত করে দেওয়ার পাশাপাশি বেতন উসুলের বাহানায় সেখানের ডিউটিরত সিপাহিদের সরিয়ে দেয়। ইংরেজ বাহিনী কেল্লার মধ্যে প্রবেশের পর টিপু সুলতান দুর্গের বাইরে বের হয়ে হামলা করে বসেন। যখন তার কাছে হাতিয়ার ফেলে দেওয়ার কথা বলা হয়, তখন তিনি এই ঐতিহাসিক কথাটি বলেন, 'শিয়ালের মতো হাজার বছর বেঁচে থাকার চেয়ে সিংহের মতো একদিন বেঁচে থাকা উত্তম।' টিপু সুলতান শহিদ হয়ে যান এবং তার সাথে হিন্দের মুসলিমদের আশার সর্বশেষ প্রদীপটিও নিভে যায়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে হিন্দুস্থানে বাদশাহ আলমগীরের মজবুত হুকুমত প্রতিষ্ঠিত ছিল; কিন্তু এই শতকের শেষে উত্তর হিন্দে হাফিজ রহমাতুল্লাহর শাহাদাত ও রোহিলার পরাজয় এবং দক্ষিণ হিন্দে টিপু সুলতানের শাহাদাত ও মহিশুরের পতনের মাধ্যমে সেই মজবুত ইসলামি হুকুমতের যুগ শেষ হয়। নবাব ও আমিরুল উমারা হওয়া এবং নিজেদের রাষ্ট্রকে বড় করার জন্য যারা ইংরেজদের সাথে ছিল, একেক করে তারা ইংরেজদের গোলামে পরিণত হতে থাকে। মোঘল বাদশাহ শাহ আলম ইংরেজদের বেতনভুক্ত কর্মচারীর মতো হয়ে যায়। হায়দারাবাদের নিজাম অয্যোধ্যার নবাব এবং মিরাঠের বাহিনী পূর্ণভাবে ইংরেজদের সামনে আত্মসমর্পণ করে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে হিন্দুস্থানের রাজনৈতিক অবস্থার আরও একটি দিক পরিবর্তন হয়। তখন বাংলা থেকে শতদ্রু নদী পর্যন্ত এবং মাদ্রাজ থেকে বোম্বাই পর্যন্ত সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ইংরেজরা তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিল। অপরদিকে পশ্চিম হিন্দুস্থানে রণজিৎ সিং শিখ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। যেখানে পাঞ্জাব, কাশ্মীর, হাজারা, পেশওয়ার, মার্দান ও ডেরা ইসমাইল খানের এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল। হিন্দের মুসলিমদের কোনো প্রভাবশালী শক্তি ছিল না। দিল্লির হুকুমত ছিল বাদশাহর; কিন্তু বিধান চলত কোম্পানির। এই সব অবস্থায় দিল্লির একদল আলিম তাদের বুড়ো কমান্ডারের নেতৃত্ব পর্যবেক্ষণ করছিল। তিনি ছিলেন শাহ ওয়ালি উল্লাহ -এর সন্তান আলিমে রব্বানি আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিসে দেহলবি । যিনি প্রায় অর্ধ শতাব্দী যাবৎ পিতার চিন্তাধারা অনুযায়ী এমন এক বাহিনী প্রস্তুত করতে ব্যস্ত ছিলেন, যারা একদিকে আবারও জিহাদের ময়দানে ইংরেজ শক্তির মোকাবিলা করবে। অপরদিকে সমাজ সংশোধনের দ্বারা সমস্ত শিরক-বিদআত ও কুসংস্কারকে দূর করবে। তৃতীয় দিক থেকে মুসলিমদের জন্য এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে, যেই নেতৃত্ব (শাহ সাহেবের ভাষায়) সমস্ত পথভ্রষ্ট ও কাফির বাদশাহ, যারা নিজেদের স্বার্থে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাথে মিলে লড়াই করত, তাদের হটিয়ে সেই স্থানে খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়্যাহ প্রতিষ্ঠা করবে।

**শাহ আব্দুল আজীজ-এর ঐতিহাসিক ফতোয়া (১৮০৬ খ্রি.)**
শাহ আব্দুল আজীজ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ১৮০৬ সালে এক গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ফতোয়া প্রকাশ করেন, যা ছিল হিন্দুস্থান অঞ্চলের শরয়ি অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা। তিনি সেই ফতোয়ায় হিন্দুস্থানকে দারুল ইসলামের পরিবর্তে দারুল হরব ঘোষণা করেন। তিনি পরিস্থিতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বুঝে শরয়ি মানদণ্ড মুতাবিক কোনো ভয়-ভীতি ছাড়াই শরিয়াহর হুকুম স্পষ্ট বর্ণনা করেছিলেন। অতঃপর শুধু ফতোয়া দিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন না; বরং ফতোয়ার ভিত্তিতে যে শরয়ি হুকুম স্পষ্ট হয়েছে, তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেন।

শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিসে দেহলবি-এর ফতোয়া নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

প্রশ্ন: দারুল ইসলাম কি দারুল হরব হতে পারে?
এর জবাবে তিনি বলেন:
গ্রহণযোগ্য কিতাবগুলোতে এমন বর্ণনা এসেছে যে, যখন তিনটি শর্ত পাওয়া যাবে, তখন দারুল ইসলাম দারুল হরব হয়ে যাবে।

'দুররুল মুখতারে এসেছে:
“তিনটি বিষয় পাওয়া গেলে দারুল ইসলাম দারুল হরব হয়ে যাবে:

১. সেখানে কাফিরদের বিধান বাস্তবায়িত হলে।
২. দারুল ইসলাম দারুল হরবের সাথে মিলিত হলে।
৩. সেখানের কোনো মুসলিম নিরাপদে না থাকলে, পাশাপাশি সেখানে এমন কোনো জিম্মি কাফির না থাকলে, যে পূর্বে মুসলিমদের থেকে নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করত এবং এখনো সে উক্ত আশ্রয়ের ফলেই বসবাস করতে পারছে।

অন্যদিকে দারুল হরব তখন দারুল ইসলাম হয়, যখন মুসলিমদের বিধান সেখান বাস্তবায়িত হয়।"
আল-কাফিতে বর্ণিত আছে,
"দারুল ইসলাম দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেই শহর, যেখানে মুসলিমদের ইমামের হুকুম প্রচলিত রয়েছে এবং যা তার কর্তৃত্বের অধীনে রয়েছে। দারুল হরব দ্বারা সেই শহর উদ্দেশ্য, যেখানে কাফির শাসকের বিধান প্রয়োগ হচ্ছে এবং যা তার কর্তৃত্বের অধীনে রয়েছে।"

(অতঃপর শাহ আব্দুল আজীজ লিখেন)
হিন্দুস্থানের মধ্যে মুসলিমদের ইমামের হুকুম কোনোভাবেই বাস্তবায়িত হচ্ছে না; বরং এখানে খ্রিষ্টান শাসকদের আইন পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কুফুরি হুকুম প্রচলনের দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, রাষ্ট্রের মামলা-মুকাদ্দামা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, উশর-খারাজ, ব্যবসায়িক সম্পদে কাফির প্রশাসন ক্ষমতাশীল হয়ে গেছে এবং ডাকাত ও চোরদের শান্তি, জনগণের পারস্পরিক লেনদেন এবং অপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে কাফিরদের বিধান প্রচলিত।

যদিও কিছু ইসলামি বিধান যেমন জুমআ, ঈদ, আজান, কুরবানির ক্ষেত্রে কাফিররা বাধা দেয় না; বরং এই বিষয়গুলোতে মূলত তাদের কোনো বাধা দেওয়ার প্রয়োজনও নেই। তবে তারা কোনো বাধা ছাড়াই মসজিদ ধ্বংস করে দিতে পারে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো মুসলিম বা জিম্মি এখানে বসবাস করতে পারে না। তারা নিজেদের স্বার্থে মুসাফির বা ব্যবসায়ীদের ক্ষতি করে না; কিন্তু অন্যান্য আমির যেমন সুজাউল মালিক ও বেলায়েতি বেগম তাদের অনুমতি ছাড়া নিজ শহরেও যেতে পারে না। দিল্লি থেকে কলকাতা পর্যন্ত সমস্ত জায়গায় খ্রিষ্টানদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যদিও ডানে-বামে হায়দারাবাদ, লক্ষ্ণৌ ও রামপুরে তাদের হুকুম জারি নয়। কারণ সেখানের গভর্নররা তাদের সাথে সন্ধি করে নিয়েছে এবং কাফিরদের আনুগত্য গ্রহণ করে নিয়েছে।

হাদিস, সাহাবা ও খুলাফাদের মত থেকে এমনটাই বোঝা যায় যে, হিন্দুস্থান এই অবস্থায় দারুল হরব। কেননা, সিদ্দিকে আকবারের সময়ে হুকুম দেওয়া হয়েছিল, 'বনি ইয়ারবু' দারুল হরব। কারণ সেখানের লোকেরা জাকাত প্রদানে অস্বীকার করেছে; যদিও সেখানে জুমআ, ইদ ও আজান আপন অবস্থায় চলমান ছিল। এমনিভাবে তাদের চতুষ্পার্শ্বের অঞ্চলগুলোকেও দারুল হরব ফতোয়া দেওয়া হয়েছিল; যদিও সেগুলোতে মুসলিমরা ছিলেন। খুলাফায়ে রাশিদিনের সময়ে এই পদ্ধতিই চলমান ছিল। এমনকি রাসুলুল্লাহ -ও এই আদেশ দিয়েছিলেন যে, ফাদাক ও খাইবার দারুল হরব; যদিও সেখানে মুসলিমদের ব্যবসা চলমান ছিল এবং সেখানে কিছু মুসলিমদের বসবাস ছিল। তা ছাড়া ফাদাক ও খাইবার মদিনার একেবারেই নিকটবর্তী ছিল। (তথাপি রাসুল সেগুলোকে দারুল হরব ঘোষণা করেছেন)।

**ফতোয়ার প্রভাব**
শাহ আব্দুল আজীজ-এর ফতোয়া হিন্দুস্থানের মুসলিমদেরকে দুই ধরনের দিক-নির্দেশনা দেয়। প্রথম নির্দেশনা এই ফতোয়ার মূল ইবারত থেকে পাওয়া যায়। তা হলো, এখন হিন্দুস্থানের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেছে এবং এটি দারুল ইসলাম থেকে দারুল হরব হয়ে গেছে। দ্বিতীয় নির্দেশনা হলো, ফতোয়া মুতাবিক সেই সব কার্যক্রম, যা আব্দুল আজীজ জিহাদ সংঘটিত করার জন্য করেছিলেন। অর্থাৎ এই দারুল হরবকে আবার দারুল ইসলাম বানানোর কার্যক্রমের সূচনা। উপমহাদেশের মুসলিমদের সেই অধঃপতনের যুগে শাহ আব্দুল আজীজ-এর ফতোয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের নিকট আজও সেই ফতোয়া এতটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা সেই যুগে ছিল। এই ফতোয়া আমাদেরকে শরিয়াহর ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও চিন্তাগত দিক-নির্দেশনা দেয়। এই ফতোয়ার গুরুত্ব অনুধাবনে আমরা এখানে ফতোয়া থেকে গৃহীত নির্দেশনাগুলো পয়েন্ট আকারে বিস্তারিত আলোচনা করব।
• এই ফতোয়ার প্রথম নির্দেশনা, সেই সময় হিন্দুস্থানের পরিস্থিতির শরয়ি সমাধান ছিল, যার কারণে এই ফতোয়ার জরুরত অনুভূত হয়। এই ফতোয়া দেওয়ার সময় যদিও হিন্দুস্থানের মোঘল বাদশাহ মুসলিম ছিল; কিন্তু পূর্ব হিন্দ থেকে মধ্য হিন্দ পর্যন্ত অর্থাৎ বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা পূর্ণভাবে ইংরেজদের দখলে ছিল। মধ্য হিন্দের অধিকাংশ রাজ্য তাদের সাথে সন্ধি করে রেখেছিল। শাহ সাহেব হিন্দের এই দুই ধরনের এলাকার আলোচনা করেছেন। এক. সেই এলাকা, যা কাফিরদের সরাসরি দখলে রয়েছে এবং দুই. যেগুলো পরোক্ষ দখলে রয়েছে। অতঃপর এই দুই প্রকারের এলাকাকেই ইংরেজদের নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে দারুল হরব ঘোষণা করা হয়েছে। ফতোয়াটি আজও আমাদের জন্য একই দিক-নির্দেশনা দেয়।

• এই ফতোয়ায় শাহ সাহেব 'ইংরেজ' নয়; বরং 'খ্রিষ্টান জাতি' বলেছেন এবং তাদেরকে হিন্দুস্থানে মুসলিমদের শত্রু ঘোষণা দিয়েছেন। যার মাধ্যমে শাহ সাহেব আল্লাহ তাআলার জন্য বন্ধুত্ব ও শত্রুতার বিশ্বাসের দিকে নির্দেশনা দিয়েছেন, যাকে 'আল-ওয়ালা ওয়াল বারা'র আকিদা বলা হয়। এই আকিদাই গত এক শতাব্দী যাবৎ হিন্দুস্থানের বাদশাহ ও জনগণের মধ্যে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। যার ফলে মুসলিমরা ইংরেজদের সাথে মিলে নিজের মুসলিম ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল।

হিন্দের মুসলিমদের প্রতি তৃতীয় নির্দেশনা, যা এই ফতোয়াতে রয়েছে তা হলো, কখনোই কাফিরদের আনুগত্য গ্রহণযোগ্য নয়। যে সমস্ত মুসলিম অঞ্চল কাফিররা দখল করেছে, তা দারুল হরব হয়ে যাবে; যদিও সেখানে কিছু ইসলামি বিধান আদায় করা হোক এবং সেখানের কিছু নেতার নাম মুসলিম হোক।

এগুলো ছিল ফতোয়ার মূল মর্ম। এ ছাড়াও আরও কিছু বিষয় সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতা থেকে বোঝা যায়, যা এই ফতোয়ার নির্দেশনায় সংঘটিত হয়েছিল এবং যার আলোচনা আমরা সামনে করব, ইনশাআল্লাহ।

**শাহ সাহেবের ফতোয়া ও হিন্দের আজাদি আন্দোলন শুরু**
হিন্দের ঐতিহাসিকগণ সকলেই একমত যে, শাহ আব্দুল আজীজ -এর ফতোয়া ছিল হিন্দুস্থানকে ইংরেজদের থেকে আজাদ করে আল্লাহ তাআলার দ্বীনকে বিজয়ী করার জিহাদের ভিত্তি। এটা ছিল সেই ছায়াদার বৃক্ষের শিকড়, যার ছায়াতলে হিন্দের সমস্ত ইমানদার মুসলিম নিজেদের ইমান বাঁচানো ও দ্বীন বিজয়ের চেষ্টায় অংশ নেয়। ঐতিহাসিকরা এই ব্যাপারেও একমত যে, এই ফতোয়া সাধারণ মুসলিম ও আলিমদের সকল শ্রেণির মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। এই ফতোয়ার পর হিন্দের মুসলিমদের সমস্ত সামাজিক কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হয়ে যায় হিন্দকে দারুল হরব থেকে দারুল ইসলামে পরিবর্তন করা। এই ফতোয়াকে সামনে রেখে দিল্লির আলিম সাইয়িদ আহমাদ শহিদ, শাহ ইসমাইল শহিদ ও মাওলানা আব্দুল হাই এবং পাঠনার আলিম মাওলানা বেলায়েত আলি ও এনায়েত আলি জিহাদ করেছেন। ১৮৫৭ সালে আজাদির যুদ্ধে আকাবিরে দেওবন্দ মাওলানা কাসেম নানুতুবি এবং মাওলানা রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি এ-এর কার্যক্রমও এই লক্ষ্যেই হয়েছিল। আজিমাবাদের আলিম মাওলানা ইয়াইহয়া আলি, মাওলানা জাফর থানেশ্বরি, মাওলানা আহমাদ আলি আন্দামানে বন্দিত্বের কষ্টও এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বরদাশত করেছেন। উত্তর কাবায়েলি এলাকায় মোল্লা সাহেব আখন্দ ও হাজি সাহেব তরংজায়ি এ-এর জিহাদ, ওয়াজিরিস্তানের মোল্লা পাওয়েন্দা এবং হাজি মির্জা আলি খান এ-এর জিহাদও এই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্যই ছিল। হিন্দুস্থানকে ইংরেজদের থেকে স্বাধীন করার জন্য তাহরিকে শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান ও মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানি এ-এর ইংরেজদের 'বন্ধুত্ব ত্যাগের আন্দোলন' এই উদ্দেশ্যেই ছিল। হাকিমুল উম্মাহ আশরাফ আলি থানবি ও আল্লামা শিব্বির আহমাদ উসমানি এ-এর পাকিস্তান আন্দোলন এবং মাদানি ৬১-এর ঐক্যবদ্ধ হিন্দুস্থানের মতামত-এই সবই হিন্দকে কাফিরদের থেকে মুক্ত করা ও এটাকে দারুল ইসলাম বানানোর জন্য ছিল। হিন্দের মুসলিমদের এই সমস্ত সামষ্টিক চেষ্টায় উক্ত ফতোয়ার ও এর ফলে সংঘটিত কার্যক্রমের প্রভাব অনেক বেশি দৃষ্টিগোচর হয়।

**শাহ সাহেব-এর কার্যক্রম**
শাহ আব্দুল আজীজ শুধু ফতোয়া দিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি; বরং দারুল হরবকে আবার দারুল ইসলামে পরিণত করার জন্য কার্যক্রম শুরু করেন। শাহ সাহেব-এর নিকট দারুল হরবকে দারুল ইসলামে পরিবর্তন করার একমাত্র পদ্ধতি ছিল নিজ ঘর ছেড়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য হিজরত করা এবং জিহাদের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। সাইয়িদ আহমাদ শহিদ ও শাহ ইসমাইল শহিদ-এর নেতৃত্বে জিহাদ ছিল এই ফতোয়ারই বাস্তবায়ন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ফতোয়ার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী সময়ে সমস্ত মুসলিম দলের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সমস্ত ইসলামি জিহাদ ও জামাআতের পেছনে মৌলিক চিন্তা এটাই ছিল যে, হিন্দুস্থান দখলদারদের কব্জায় চলে গেছে; তাই এখন মুসলিমদের হুকুমত আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। ফলে এই ফতোয়া ছিল সমস্ত ইসলামি জিহাদ ও জামাআতের মূল ভিত্তি। স্যার সাইয়িদের থিউরি, কংগ্রেস বা মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা নয়; বরং হিন্দের স্বাধীনতা আন্দোলনের উৎস ছিল এই ফতোয়াই।

**সাইয়িদ আহমাদ শহিদ-এর তাহরিকে মুজাহিদিন এবং জিহাদি বৃক্ষের অঙ্কুর**
তাহরিকে মুজাহিদিন উলামায়ে হক ও মুজাহিদদের সেই বাহিনী ছিল, যাদেরকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে শাহ ওয়ালি উল্লাহ ও শাহ আব্দুল আজীজ -এর কর্মপদ্ধতিতে হিন্দকে আবারও দারুল ইসলাম বানানোর জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল। এই আন্দোলন ছিল উপমহাদেশের পাক ও হিন্দ থেকে ইংরেজদের বের করা এবং দ্বীন বিজয়ের জিহাদে শক্তিশালী খুঁটি। যা উপমহাদেশের সমস্ত মুসলিমের চিন্তাকে সঠিক দিকে পরিচালিত করে বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে জিহাদে এনে দাঁড় করিয়েছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে ও পরে পাক ও হিন্দের দ্বীনি মাকতাবায়ে ফিকিরগুলো এই বৃক্ষেরই শাখা। চাই তা মাওলানা কাসেম নানুতুবি -এর দেওবন্দ মাকতাবায়ে ফিকির হোক বা মাওলানা জাফর থানেশ্বরি -এর আহলে হাদিস মাকতাবায়ে ফিকির হোক। চাই তা কাবায়েলের ইংরেজবিরোধী জিহাদ হোক, যা এখনো পর্যন্ত সেই একই ধারায় চলমান রয়েছে। এই সবের মূল ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহর ওপরেই হয়েছিল এবং এই সকল মাকাতাবায়ে ফিকিরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক বিষয় ছিল শাহ আব্দুল আজীজ -এর ফতোয়া এবং দারুল হরবকে দারুল ইসলামে পরিবর্তনের কর্মতৎপরতা।

সাইয়িদ আহমাদ শহিদ ১৭৮৬ সালে রায়বেরালির সাইয়িদ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। শুরু থেকেই আল্লাহ তাআলা তাকে অসাধারণ যোগ্যতা দিয়েছিলেন। শিক্ষার জন্য তিনি দিল্লির শাহ আব্দুল আজীজ -এর কাছে গমন করেন। শাহ সাহেব শাগরিদের মধ্যে যোগ্যতা দেখে তার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন। সাইয়িদ আহমাদ দ্রুত ইলম ও তাজকিয়ার মানজিলগুলো পাড়ি দিয়ে ফেলেন। শাগরিদের তাকওয়া, পরহেজগারি ও আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া দেখে শাহ সাহেব তার ভাতিজা শাহ ইসমাইল শহিদ এবং জামাতা মাওলানা আব্দুল হাই -কে নিজের জীবদ্দশাতেই সাইয়িদ আহমাদ শহিদের হাতে বাইআত করান এবং পূর্ণ আনুগত্যের আদেশ দেন। এই দুই হজরত নিজেরাই তখন বড় আলিমদের মাঝে গণ্য হতেন। এভাবেই আল্লাহ তাআলা এমন এক পবিত্র গ্রুপ তৈরি করেন, যারা মুসলিমদের সঠিক নির্দেশনা দিতে পারবেন। সাইয়িদ আহমাদ শহিদ প্রথমে দাওয়াহ ও তাবলিগের কাজ শুরু করেন। পুরো হিন্দে সফর করে মানুষকে কুরআন, সুন্নাহ, জিহাদ ও কিতালের দাওয়াত দেন। হিন্দের হাজারো মুসলিম তার হাতে শিরক ও বিদআত থেকে তাওবা করেন এবং হাজার হাজার লোক তাদের সাথে জিহাদের সংকল্প করেন।

**জিহাদের ঘাঁটি ও হালাকাসমূহ**
ধীরে ধীরে এই দাওয়া পুরো হিন্দে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং এর কয়েকটি ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। যার মধ্যে তিনটি ঘাঁটি ছিল সবচেয়ে বড়। প্রথম ঘাঁটি দিল্লির শাহ আব্দুল আজীজ এর মাদরাসায়ে রহীমিয়্যা, দ্বিতীয় সাদেকপুর পাঠনা এবং তৃতীয় ঘাঁটি ছিল কাবায়েলি এলাকায়। দিল্লি ও পাঠনার ঘাঁটি হিন্দুস্থানে দাওয়াত ও সম্পদের মাধ্যমে জিহাদ অর্থাৎ জিহাদের দিকে উদ্বুদ্ধ করা ও আল্লাহর পথে ব্যয় করাকে নিজেদের ফরজ হিসেবে আঞ্জাম দিচ্ছিলেন। আর কাবায়েলি এলাকায় থাকা মুজাহিদদের ঘাঁটিগুলো অস্ত্রের মাধ্যমে জিহাদ অর্থাৎ বাস্তব জিহাদ ও কিতালে লিপ্ত ছিলেন।

**দিল্লির মারকাজ**
দিল্লির এই মারকাজের দুটি যুগ ছিল। প্রথম জিহাদি যুগ, যা ১৮৩১ সালে বালাকোট যুদ্ধ থেকে ১৮৫৭ সালের আজাদি লড়াই পর্যন্ত জারি ছিল। এই ঘাঁটির কার্যক্রম শাহ আব্দুল আজীজ এর নাতি শাহ মুহাম্মাদ ইসহাকের নেতৃত্বে পূর্বের মতোই চলমান ছিল। এর মারকাজ দিল্লির সেই মসজিদ ও মাদরাসা ছিল, যার প্রধান ছিলেন শাহ ওয়ালি উল্লাহ ও শাহ আব্দুল আজীজ। এই ঘাঁটি সম্পদের মাধ্যমে সাহায্য ও মুজাহিদদের জন্য নতুন সদস্য প্রেরণ করত। দ্বিতীয় ইলমি যুগ, যা ১৮৫৭ সালের আজাদি লড়াই থেকে শুরু হয়েছে। এই যুগে সেই ঘাঁটির নেতৃত্ব আকাবিরে দেওবন্দের হাতে চলে আসে, যারা ইলম ও আমলের ময়দানকে সামনে রেখেছেন এবং এর পূর্ণ হক আদায় করেছেন।

**সাদেকপুর পাঠনার মারকাজ**
সাদেকপুরের মারকাজের নেতৃত্ব সাইয়িদ আহমাদ শহিদের বাইআতপ্রাপ্ত এবং মাওলানা ইসহাক-এর শাগরিদ মাওলানা এনায়েت আলি ও মাওলানা বেলায়েত আলির হাতে ছিল। এই দুই ভাইকে সাইয়িদ সাহেব সাদেকপুর থেকে জিহাদের দাওয়াতি কার্যক্রমের আদেশ দেন। এই দুই ভাই বালাকোটের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন না। তারা সাইয়িদ সাহেবের শাহাদাতের পর ১৮৪১ থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬১ বছর এই ঘাঁটিতে তাহরিকে মুজাহিদিনের কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৮৬৩ সালের আম্বেলা যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর ইংরেজরা সাদেকপুর পাঠনার এই ঘাঁটির বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়। অনেক আলিমকে কালাপানির শাস্তি দিয়ে আন্দামানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই মামলার অন্তর্ভুক্ত মাওলানা জাফর থানেশ্বরি এবং শাহ সাহেবের শাগরিদ মাওলানা নজির হুসাইন -ই হিন্দের জামাআতে আহলে হাদিসের ভিত্তি রেখেছিলেন।

**কাবায়েলি জিহাদের ঘাঁটি**
জিহাদের তৃতীয় ঘাঁটি ছিল সীমান্তবর্তী ও কাবায়েলি এলাকাগুলো। শুরুতে এই ঘাঁটি শুধু মার্দান জেলার সওয়াবি, নওশেরাহ ও বুনের পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে জিহাদের দাওয়াতের বরকতে এই সীমা বৃদ্ধি হয়ে পূর্বদিকে হাজারা ও কাশশ্মীর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং পশ্চিমে সোয়াত, বাজুর, মেহমান্দ, খায়বার ও ওয়াজিরিস্তান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এটাই সেই জায়গা, যেখানে প্রায় এক শতাব্দী পর্যন্ত ইসলামের মুজাহিদরা জিহাদের বরকতে ইংরেজদের স্বার্থের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

**জিহাদের মাকসাদ ও মানহাজ**
শাহ আব্দুল আজীজ এ-এর এই ফতোয়ার ফলে তার শাগরিদ সাইয়িদ আহমাদ শহিদ, জামাতা শাইখুল ইসলাম মাওলানা আব্দুল হাই এবং ভাতিজা শাহ মুহাম্মাদ ইসমাইল শহিদ বাস্তব জিহাদের দিকে অগ্রসর হন। তাদের মানহাজ ছিল সাহাবায়ে কিরাম এবং সুন্নাহর অনুসারী সালাফে সালিহিনের মানহাজ অর্থাৎ হিজরত, ইদাদ, রিবাত ও জিহাদ। তাদের লক্ষ্য তা-ই ছিল, যা ইসলাম জিহাদের জন্য নির্ধারণ করেছে। মাওলানা গোলাম রাসুল মহর তার কিতাব 'সিরাতে সাইয়িদ আহমাদ শহিদ'-এর ২৫২ নং পৃষ্ঠায় সাইয়িদ আহমাদ শহিদের কিতাব থেকে সেই ইবারত নকল করেন, যেখানে সাইয়িদ সাহেব নিজেই উদ্দেশ্যের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন:

• যদি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়, প্রশাসন, রাজনীতি ও বিচারালয়ে শরিয়াহর নীতিমালা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আমাদের লক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। নিজেই হুকুমতের বাদশাহ হওয়ার পরিবর্তে আমার পছন্দ-সব জায়গায় ন্যায়বান ব্যক্তিরাই শাসন করবে।
• আমি অর্ধ রাষ্ট্রের ওপরও বাদশাহি করার ইচ্ছা রাখি না। যখন ইসলামের সাহায্যের যুগ শুরু হয়ে যাবে এবং স্বৈরাচারী শাসন মূল থেকে উপড়ে ফেলা হবে, তখন আমাদের প্রচেষ্টার তির আপন নিশানায় বিদ্ধ হবে।

তারিখে দাওয়াত ও আজিমাতের অষ্টম খণ্ডের প্রথম অধ্যায়ে ৪০৮ পৃষ্ঠায় সাইয়িদ আহমাদ শহিদ এ-এর জবানে তার মাকসাদ বা লক্ষ্য বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে:

• আমাদের যুদ্ধ আমির বা নেতাদের সাথে নয়; বরং আমাদেরকে লম্বা চুলওয়ালা (শিখ) এবং সমস্ত ফিতনার উৎস ইংরেজ কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। নিজের কালিমাওয়ালা ভাই বা আমাদের ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের সাথে নয়।
• এই অঞ্চলকে (পশ্চিম হিন্দুস্থান) মুশরিকদের নাপাকি থেকে পাক করা এবং মুনাফিকদের গাদ্দারি থেকে পবিত্র করার পর হুকুমত ও সালতানাতের হকদার, নেতৃত্বদান ও শৃঙ্খলা কায়িমে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু এই শর্তে যে, সে আল্লাহ তাআলার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করবে এবং সর্বাবস্থায় জিহাদ চালিয়ে যাবে এবং কখনোই জিহাদ বন্ধ করবে না। মামলা-মুকাদ্দামায় শরিয়াহর বিধানকে কোনোভাবেই পাশ কাটানো বা বিকৃত করবে না এবং জুলুম ও ফিসক থেকে পূর্ণভাবে মুক্ত থাকবে। এর পরেই আমি মুজাহিদদের দায়িত্ব ছেড়ে হিন্দুস্থানের দিকে রওয়ানা করব এবং সেটাকে শিরক ও কুফর থেকে পবিত্র করার চেষ্টা করব। কারণ আমার মূল মাকসাদ হিন্দুস্থানে যুদ্ধ করা, খোরাসানে শান্তিতে বসে থাকা নয়।'

এর থেকে বোঝা যায়, সাইয়িদ আহমাদ শহিদের দৃষ্টিতেও হিন্দুস্থান দারুল হরব ছিল, যেখানে কাফিররা বিজয়ী এবং যাকে দারুল ইসলামে পরিবর্তন করার জন্য জিহাদ আবশ্যক। এখানে দারুল ইসলাম দ্বারা উদ্দেশ্য এমন ইসলামি ইমারাত প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে শরিয়াহ বাস্তবায়িত হবে।

**হিজরত, যুদ্ধপ্রস্তুতি ও জিহাদ**
জিহাদের জন্য প্রস্তুতি আবশ্যক এবং প্রস্তুতির জন্য হিজরত আবশ্যক। এটাই সাহাবিদের তরিকা। সাইয়িদ সাহেব এটাও স্পষ্ট করেছেন, হিজরত সুন্নাহ মুতাবিক হতে হবে। তিনি হিজরত ও ইদাদের জন্য সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো নির্ধারণ করেছেন এবং এর কারণ ছিল কয়েকটি। যদিও সাইয়িদ সাহেবের কিছু সাথির ইচ্ছা ছিল হিন্দে থেকেই জিহাদ করা, কারণ এর জন্য তারা তাদের দাবি অনুযায়ী অস্ত্র ও সম্পদ সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু সাইয়িদ আহমাদ শহিদ সীমান্তের কিছু বৈশিষ্ট্যের ফলে সেই এলাকাগুলোকে নির্বাচন করেছিলেন, যা তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন:

• জিহাদের প্রস্তুতির জন্য সীমান্ত ছিল ভৌগলিক ও সামরিক দৃষ্টিতে উপযুক্ত ও নিরাপদ এলাকা। অপরদিকে হিন্দুস্থানের মধ্যে বিপদ ও ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপক আশঙ্কা ছিল।
• সীমান্তে মুসলিমদের আধিক্য ছিল, যারা শিখদের জুলুমে অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। সেখানে জনগণ ফিতরাতগতভাবেই লড়াকু ও নিষ্ঠাবান ছিল।
• সীমান্তের উত্তর ও দক্ষিণ দিকেও মুসলিমদের আধিক্য ছিল। দক্ষিণ দিকে অবস্থিত পাঞ্জাবে মুসলিমসহ হিন্দুরাও শিখদের জুলুমে অতিষ্ঠ ছিল।
• যদিও কিছু সীমান্তবর্তী এলাকা কাফিররা দখল করেছিল; কিন্তু স্বাধীনতার সম্ভাবনা তখনও বাকি ছিল। অনেক এলাকা তখনও মুক্ত ছিল, যেখানে কাফিরদের দখল ছিল না। সেখানে পরিপূর্ণ ক্ষমতাও তাদের হাতে ছিল না। পক্ষান্তরে হিন্দুস্থানের সমস্ত এলাকার স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা পূর্ণভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

এই হিজরতের জন্য সাইয়িদ আহমাদ-কে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। কেননা, তার ও সীমান্তের মাঝে শিখদের রাজ্য ছিল। তাই তিনি অনেক ঘুরে বিশাল রাস্তা পাড়ি দিয়ে হিজরত করেছেন। নিজ এলাকা রায়বেরলি থেকে বের হয়েছেন, যা ছিল মধ্য হিন্দুস্থানে। সেখান থেকে গোয়ালিয়া গেছেন, অতঃপর উড়িষ্যার শহর টুংকি, সেখান থেকে রাজস্থানের শহর আজমির, সিন্ধের শহর শিকারপুল, বেলুচিস্থানের কোয়েটা এবং সর্বশেষ আফগানের কান্দাহার ও কাবুল হয়ে পেশওয়ার পৌঁছেছেন। এর থেকে খুব ভালোভাবেই আন্দাজ করা যায় যে, এই সফরে তিনি কতটা কষ্ট সহ্য করেছেন। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও তার দৃঢ় সংকল্প ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞার মধ্যে কোনো কমতি ছিল না। আড়াই থেকে তিন হাজার মাইলের এই সফর তিনি ও তার কাফেলা প্রায় দশ মাসে পাড়ি দিয়েছেন।

**সাইয়িদ আহমাদ শহিদ-এর সীমান্তে আগমন**
যখন সাইয়িদ আহমাদ শহিদ সীমান্তে পৌঁছান, তখন ছোট ছোট খানদের অধীনে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা বণ্টিত ছিল। যার মধ্যে আম্ব, পাঞ্জেতার, সামাহ, জিদাহ, সাত্তানাহ, পেশাওয়ার ইত্যাদি অধিক প্রসিদ্ধ। এই সব আজ পেশাওয়ার, মার্দান, নওশেরওয়াহ ও সুবাই জেলা ইত্যাদি এলাকায় বদলে গেছে। এই খানদের অবস্থা হিন্দুস্থানের রাজ্যগুলো থেকে আলাদা ছিল না। তাদের মধ্যে কিছু খান শিখ-রাজা রণজিৎ সিং-এর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল, আবার কিছু খান তাকে ট্যাক্স আদায় করত। সাইয়িদ সাহেব সর্বপ্রথম পাঞ্জেতারের আমিরের কাছে মেহমান হন এবং সেখান থেকে কার্যক্রম শুরু করেন। পাঞ্জেতারের অবস্থান ছিল সিন্ধু নদের পশ্চিম কিনারে, যা শিখদের এলাকার অধিক নিকটবর্তী। তাই সাথিদের মুশাওয়ারায় পাঞ্জেতার থেকে ঘাঁটি সাত্তানাতে স্থানান্তরিত করেন। সাত্তানা ছিল মার্দান ও বুনির জেলার কিনারে অবস্থিত এবং পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় জিহাদি ঘাঁটির জন্য ছিল অধিক উপযুক্ত।

**জিহাদের ইমামতের বাইআত**
সীমান্তে পৌঁছে কাজের ক্ষেত্রে মুজাহিদদের সামনে যে সমস্ত সমস্যা দেখা দেয়, তার মধ্যে ছিল কবিলাগুলোর অপরিকল্পিত পদ্ধতি, জিহাদের মাকসাদের ব্যাপারে অজ্ঞতা, দুনিয়ার মাল ও সম্মানকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নেতাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব। তাই প্রথমেই তারা নেতাদের কাছে দাওয়াহ পাঠান এবং তাদের কাছে জিহাদের বার্তা ও শরিয়াহর মানহাজ বিস্তারিত আলোচনা করেন। যার ফলে তারা জিহাদকে এক আমিরের অধীনে শৃঙ্খলিত করার ব্যাপারে রাজি হয়ে যান। শুধু তা-ই নয়; বরং সেখানের আলিম ও নেতারা শাহ সাহেবকেই ইমামতের উপযুক্ত গণ্য করেন। সীমান্তের সব বড় নেতা, আলিম, শাইখ ও খানরা জুমাদাল উখরা ১২৪২ হিজরি মুতাবিক, ১৮২৭ সালের জানুয়ারিতে শাহ সাহেবকে জিহাদের আমির নির্ধারণের সাথে সাথে জুমআর খুতবাতেও তার নাম সংযুক্ত করে দেন।

যার ফলে শাহ সাহেবকে নিজেদের লোকেরা আমিরুল মুমিনিন বলা শুরু করেন। সীমান্তের জনগণের মাঝে তিনি 'সাইয়িদ বাদশাহ' ও শিখদের কাছে 'খলিফাহ সাহেব' নামে প্রসিদ্ধ হয়ে যান। এই বাইআতের মধ্যে শুধু জিহাদের ব্যবস্থাপনা করাই সাইয়িদ সাহেবের জিম্মাদারি ছিল। কিন্তু অন্যান্য রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে খানরা ছিল স্বাধীন। এই বাইআতের পর জিহাদের জন্য নফিরে আম ঘোষণা করা হয় এবং জিহাদের জন্য বড় আকারে বাইআত নেওয়া হয়। যাদের থেকে বাইআত নেওয়া হয়, তাদের মধ্যে এমন সর্দারও ছিল, যাদের ব্যাপারে মুখলিস সাথিরা সাইয়িদ সাহেবকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু নফিরে আম হিসেবে সবার থেকে বাইআত নেওয়া ও তাদের ওপর ভরসা করা ব্যতীত কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু পরে সেই অঞ্চলের সাথিদের সতর্কবার্তাই সত্য প্রমাণিত হয়।

**'তাহরিকে মুজাহিদিন'-এর জিহাদের ময়দান**
আকুরাতে শিখদের বিরুদ্ধে হামলার দ্বারা সাইয়িদ সাহেবের জিহাদ শুরু হয়। কিছু হামলার পরেই সীমান্ত এলাকাতে শিখদের শক্তি কমতে শুরু করে (আলহামদুলিল্লাহ)। মুজাহিদরা দুই দিকে যুদ্ধ শুরু করেন; এক. শিখদের বিরুদ্ধে ও দুই. গাদ্দার খানদের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধগুলোতে আল্লাহ তাআলা সাইয়িদ সাহেবকে সফলতা দান করেন। যার ফলে সীমান্ত এলাকাগুলো কাফিরদের থেকে মুক্ত আজাদ মুসলিম ভূমিতে পরিণত হয়। পরিস্থিতি অনুকূলে আসার পর সাইয়িদ সাহেব মানুষদের থেকে ইমারাতের বাইআত নিয়ে এই ভূমিকে শরয়ি ইমারাতে পরিণত করেন।

**সাইয়িদ আহমাদ শহিদ -এর শরয়ি বাইআত**
ইমামতে জিহাদের বাইআতের ফলে যদিও কিছু শৃঙ্খলাবদ্ধ জিহাদি কার্যক্রম হচ্ছিল; কিন্তু জিহাদের মূল লক্ষ্য পূরণ হচ্ছিল না। এই বাইআতে খানরা তাদের আঞ্চলিক কার্যক্রমে স্বাধীন ছিল। তাই তিনি তখন পূর্ণ শরিয়াহ বাস্তবায়নের বাইআত নেওয়াও শুরু করেন। সীমান্তের জনগণ যদিও ইসলামের প্রতি মহব্বত রাখত; কিন্তু সেই সাথে তাদের মাঝে শরিয়াহর ব্যাপারে ছিল অনেক অজ্ঞতা এবং উপমহাদেশের মুসলিমদের অধঃপতনের ফলে তাদের ভেতর অনেক সমস্যা জন্ম নিয়েছিল। এর মধ্যে কিছু সমস্যা মাওলানা গোলাম রাসুল মহর সাইয়িদ সাহেবের জীবনীগ্রন্থে (৪৫৮ পৃষ্ঠায়) আলোচনা করেছেন। তার মধ্যে রয়েছে:

- শরিয়াহর হুকুমের ব্যাপারে নেতাদের বেপরোয়া ভাব এবং তাদের সাথে স্থানীয় আলিমদের আপসি সম্পর্ক।
- সমাজে অনেক বিদআত চালু হওয়া। যেমন: বাচ্চা নষ্টের পদ্ধতি, মোহরের মধ্যে বাড়াবাড়ি, নারীদেরকে উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে মাহরুম করা ইত্যাদি।

- জিহাদ ও অন্যান্য জাহিলি লড়াইয়ের মধ্যে পার্থক্য না করা।

জিহাদের মাকসাদকে বাস্তবায়নের জন্য পূর্ণ শরিয়াহ পালনের বাইআতের ক্ষেত্রে সাইয়িদ সাহেব সব সর্দার থেকে প্রতিশ্রুতি নিতেন যে, তারা নিজেদের সমস্ত কার্যক্রম শরিয়াহ অনুযায়ী চালাবে এবং জনগণের ওপর শরিয়াহ বাস্তবায়ন করবে।

১২৪৪ হিজরির শাবান মাস ১৮২৯ সালে সর্দার ফাতাহ খানের কবিলায় একটি আম জমায়েত হয়। যেখানে ফাতাহ খান সকলকে শরয়ি বাইআতের দিকে উদ্বুদ্ধ করেন। সেখানে সবাই স্বেচ্ছায় ইসলামি শরিয়াহর পাবন্দিকে গ্রহণ করে নেয়। যার পর একজন দক্ষ আলিমকে প্রধান বিচারক ও একজন তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করে দেওয়া হয়। তার অধীনে আবার ৩০ জন বন্দুক চালনাকারীকেও নিয়োগ দেওয়া হয়।

ঐতিহাসিকদের দাবি অনুযায়ী এই বাইআতের ফলে সেই সক্ষমতা তৈরি হয়, যেই লক্ষ্যে সাইয়িদ সাহেব হিজরত করেছিলেন। তার লক্ষ্য বাস্তবতার মুখ দেখে এবং ব্রিটিশ ও শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য অনেক সেনা প্রস্তুত হয়। অপরদিকে সমাজের শিরক ও বিদআতের সংস্কৃতির প্রচলন কমে যায় এবং তার জায়গায় নামাজ, জাকাত ও জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেই সময় এক নতুন ফিতনা শুরু হয়, যা এই পুরো কার্যক্রমকে ধ্বংস করে দিয়েছিল।

**পেশওয়ারের খানদের চুক্তিভঙ্গ ও সাইয়িদ আহমাদ-এর শাহাদাত**
মুজাহিদদের জিহাদের এই সফলতার ফলে রণজিৎ সিং ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। অপরদিকে পেশওয়ারের খান 'ইয়ার মুহাম্মাদ' সীমান্তে নিজ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখত। সেও মুজাহিদদের এই সফলতাকে ভিন্ন চোখে দেখছিল। বলা হয় রণজিৎ সিং পাঞ্জাবের এক বিদআতি আলিম থেকে একটি ফতোয়া লিখিয়ে পেশওয়ারের খানের কাছে পাঠায়। এই ফতোয়ার ভাষ্য কিছুটা এমন ছিল:

'তোমাদের কাছে এমন কিছু উগ্রবাদী লোক এসেছে, যারা নতুন ধর্ম আবিষ্কার করেছে। তাদেরকে এখনই এলাকা থেকে বের করে দাও।'

পেশওয়ারের খান—যারা প্রথম থেকেই নিষ্ঠাবান ছিল না, এই ফতোয়া তাদের চক্রান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেয়। পেশওয়ারের খান ভেতরে ভেতরে জনগণ, অন্যান্য খান ও আলিমদের মধ্যে মুজাহিদদের বিরুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডা চালায়। এর ফলে অনেক মানুষ গোমরাহ হয়ে যায়। তাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষই অজ্ঞতার ভিত্তিতে তাদের সাথে অংশ নেয়। মোটকথা, চক্রান্তের মাধ্যমে গোপনভাবে একটি দিন নির্ধারণ করা হয় এবং নিজ নিজ এলাকার মুজাহিদদের অতর্কিত হামলা করে শহিদ করে দেওয়া হয়। এই মুজাহিদদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল সেসব কাজি ও আলিম, যারা সাইয়িদ সাহেবের নেতৃত্বে মানুষের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন এবং দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিলেন। এই সমস্ত হজরত ছিলেন মুজাহিদদের জিহাদের প্রাণ। এই কাজের ফলে জিহাদি কার্যক্রম অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওয়াফাদার খানগণ ও মুজাহিদরা সাইয়িদ আহমাদ শহিদকে এই খানদের বদলা নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু সাইয়িদ সাহেব এটাকে মুসলিমদের মধ্যকার গৃহযুদ্ধ মনে করে এমনটা করা থেকে বিরত থাকেন। এরপর সাত্তানা থেকে পুনরায় বালাকোটের দিকে হিজরত করে চলে আসেন। এখানে হিজরতের পর ১৮৩১ সালের মে মাসে বালাকোটের প্রসিদ্ধ যুদ্ধ হয়। যেখানে সাইয়িদ আহমাদ শহিদ, শাহ ইসমাইল শহিদ অন্যান্য সাথিদের সাথে শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন।

সাইয়িদ আহমাদ শহিদ ও শাহ ইসমাইল শহিদের শাহাদাতের পর মুজাহিদরা মাওলানা অলি মুহাম্মাদকে আমির নির্ধারণ করেন। মাওলানা অলি মুহাম্মাদ মুজাহিদদের নিয়ে পুনরায় সাত্তানা ফিরে আসেন এবং জিহাদের কার্যক্রম শুরু করেন। মাওলানা ছিলেন বয়োবৃদ্ধ এবং এক বছরের মাথায় তিনি ইনতিকাল করেন। মাওলানা অলি মুহাম্মাদের পর মুজাহিদরা নাসিরুদ্দিন মেঙ্গোরিকে আমির বানান। তার সময়ে আবার যুদ্ধ শুরু হয় এবং মাওলানা এক যুদ্ধে শহিদ হয়ে যান।

দিল্লির মারকাজ নেতৃত্বের ঘাটতি পূরণের জন্য মাওলানা নাসিরুদ্দিন দেহলবিকে নির্বাচন করে। মাওলানা মুজাহিদদের পুরো বাহিনী নিয়ে সাত্তানার দিকে হিজরত শুরু করেন। মাওলানা সিন্ধে পৌঁছামাত্রই খবর আসে, ইংরেজরা তাদের অধীন বাহিনী নিয়ে আফগানে হামলার জন্য সিন্ধে পৌঁছে গিয়েছে। এটা ছিল সেই মুহূর্তের সূচনা, যখন মুসলিম উম্মাহর দুই দুশমন রাশিয়া ও ব্রিটেন প্রত্যেকেই নিজেকে সুপার পাওয়ার বানানোর কার্যক্রমে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

**প্রথম আফগান-যুদ্ধ (১৮৩৯-১৮৪৪ খ্রি.)**
তিন উপমহাদেশে ছড়িয়ে থাকা উসমানি সালতানাত যদিও একসময় সুপার পাওয়ার ছিল; কিন্তু তখন তাদের মধ্যে নিষ্ক্রিয়তা আসতে শুরু করে। ইংরেজরা আস্তে আস্তে শক্তিশালী হয়ে এগিয়ে আসতে থাকে। অপরদিকে রাশিয়া মধ্য এশিয়ার মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর দিকে লোভের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, যাতে ইরান বা বেলুচ কোনো একটির উপকূল পর্যন্ত সব ঋতুতে জলযান চলাচল-উপযোগী জলপথ নিজেদের আয়ত্তে রাখতে পারে এবং বৈশ্বিক বাজারে তারাও ব্যবসা করতে পারে। সেই সাথে রাশিয়া চাচ্ছিল হিন্দুস্থান দখল করে ইংরেজদের হিন্দুস্থান থেকে তাড়িয়ে দিতে। এই লক্ষ্যে রাশিয়া ইরান ও আফগানে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করছিল, যা ইংরেজদের জন্য মেনে নেওয়া অসম্ভব। তাদের জন্য রাশিয়াকে এই পলিসি থেকে দূরে রাখা জরুরি ছিল।

এটা ছিল সেই যুগ, যখন হিন্দুস্থানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাঙ্গাল আর্মি একদিকে শতদ্রু নদী পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল এবং অপরদিকে বোম্বাই আর্মি সিন্ধের দরজায় কড়া নাড়ছিল। পাঞ্জাব, কাশ্মীর, হাজারা ও সীমান্ত এলাকাতে রণজিৎ সিং-এর শাসন ছিল। ইংরেজ ও রণজিৎ সিং-এর মাঝে ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। ১৮১৮ সালে শাহ সুজাকে পরাজিত করে দোস্ত মুহাম্মাদ আফগানের বাদশাহ হয়ে যায়। ফলে শাহ সুজা আফগান থেকে পলায়ন করে হিন্দুস্থান এসে ইংরেজদের আশ্রয়ে লুধিয়ানাতে অবস্থান করছিল।

১৮৩৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর, এক ঘোড়-সওয়ার কাবুলের সংকীর্ণ গলিতে প্রবেশ করে। সে ছিল রাশিয়ার জারের প্রতিনিধি ওয়াং কোচ, যে জারের পক্ষ থেকে আফগান শাসকের কাছে বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে এসেছে। দোস্ত মুহাম্মাদের দরবার থেকে ব্রিটেনের প্রতিনিধি আলেকজান্ডার বার্নিস এই খবর গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ডের কাছে প্রেরণ করে। অকল্যান্ড তার দূতের মাধ্যমে আফগানের গভর্নরের কাছে বন্ধুত্বের বার্তা পাঠায়। দোস্ত মুহাম্মাদ এই শর্তে বন্ধুত্ব করতে প্রস্তুত হয় যে, পেশওয়ার অঞ্চল রণজিৎ সিং থেকে নিয়ে তার হতে অর্পণ করতে হবে। এই শর্ত পূরণ করা ছিল ব্রিটেনের জন্য অসম্ভব। কেননা, রণজিতের সাথে ইংরেজদের ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। এই সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য ইংরেজদের দয়ার দৃষ্টি শাহ সুজার ওপর পড়ে, যাকে দোস্ত মুহাম্মাদ ১৮০৯ সালে দেশান্তর করে সিংহাসন দখল করেছিল। শাহ সুজা ইংরেজদের আশ্রয়ে লুধিয়ানাতে বসবাস করছিল। ইংরেজরা তাকে এই শর্তে সাহায্য করতে রাজি হয় যে, ক্ষমতা গ্রহণের পর পেশওয়ারের সাথে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখবে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই 'শিমলা'তে ব্রিটেন, রণজিৎ ও শাহ সুজার মাঝে একটি চুক্তি হয়, যাকে 'শিমলা চুক্তি' বলা হয়। সেখানে বলা ছিল, ইংরেজ বাহিনী আফগান দখল করে শাহ সুজাকে আফগানের শাসক বানিয়ে ফিরে চলে যাবে। এই চুক্তিই প্রথম আফগান জিহাদের কারণ হয়েছিল।

১৮৩৯ সালের ১৯ জানুয়ারিতে ব্রিটেনের দুই ডিভিশন সেনা ফিরোজপুর ও বাংলা থেকে এসে কোয়েটাতে একত্রিত হয়। সেখানে ছিল সাড়ে নয় হাজার ইংরেজ সেনা, ৩৮ হাজার সাধারণ সেনা ও ৩০ হাজার উট। এই বাহিনী ৩ মে স্বাভাবিক লড়াইয়ের মাধ্যমে কান্দাহার দখল করে শাহ সুজাকে বাদশাহ বানিয়ে দেয়। এরপর কাবুলের দিকে এগিয়ে গিয়ে গজনি কেল্লা দখল করে। গজনি কেল্লা বিজয়ের জন্য তাদের খুব কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়। এই যুদ্ধে আফগানের সাথে ইয়াগিস্তান কবিলা ও সাইয়িদ আহমাদ শহিদের বাইআতকৃত মাওলানা নাসিরুদ্দিন-এর নেতৃত্বে হিন্দুস্থানের মুজাহিদরা অংশগ্রহণ করেছিল। এই যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন লড়াই কেল্লার দেয়ালের বাইরে হিন্দুস্থানি মুজাহিদরাই করেছিল। এই কঠিন লড়াইয়ে অংশগ্রহণকারী সমস্ত মুজাহিদ শাহাদাত বরণ করেন। সর্বশেষ গজনি কেল্লাকে ইংরেজরা দখল করে নেয়। কাবুল দখলের পথে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। এই বাধা দূর হয়ে যাওয়ার পর কাবুল সহজেই ইংরেজদের দখলে চলে এসেছিল। বিজয়ের উল্লাসে ব্যস্ত ব্রিটেন বাহিনী কল্পনাও করতে পারেনি যে, যুদ্ধ মূলত কেবল শুরু হয়েছে।

১৮৪০ সালের শুরুর দিকে ব্রিটেন অনুভব করে যে, আফগান জনগণের মধ্যে বিরোধী প্রতিক্রিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আস্তে আস্তে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। তাই তারা কাবুলে একটি বড় সেনাঘাঁটি তৈরির প্ল্যান নেয়। যার বিরুদ্ধে উলামায়ে কিরাম জিহাদের আহ্বান জানায়। ফলে মুজাহিদরা কুহিস্থান এলাকাতে শাহ সুজা ও ইংরেজদের পুরো বাহিনীকে হত্যা করে। কাবুলেও ব্রিটেনের সহকারী প্রতিনিধি বার্নিস ও তার ভাইকে হত্যার পর মুজাহিদরা সেনা-ঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়। ব্রিটেনের প্রতিনিধি উইলিয়াম হেই ম্যাগন্যান দোস্ত মুহাম্মাদের ছেলে আকবার খানের সাথে কথাবার্তা চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আকবার খানের একটাই চাওয়া ছিল যে, ব্রিটেন-বাহিনী আফগান থেকে বের হয়ে যাবে। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর আফগানরা ব্রিটেনের প্রতিনিধিকে হত্যা করে তাদের ঘাঁটি দখল করে নেয় এবং সেখানের ইংরেজ জেনারেল ও অফিসারদের বন্দী করে ফেলে। ইংরেজ বাহিনীর এক অংশ যুদ্ধ করতে করতে জালালাবাদের দিকে পলায়ন করে। তখন মুজাহিদরা তাদের পিছু ধাওয়া করে। যার ফলে সেই বাহিনীর এক ডাক্তার উইলিয়াম ব্রাইডান ব্যতীত কেউ জীবিত অবস্থায় জালালাবাদ পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি।

কান্দাহারে জেনারেল নাট নামের এক অফিসার ইংরেজদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল; কিন্তু তার অবস্থাও ভালো ছিল না। তাই তার সাহায্যের জন্য পেশওয়ার থেকে জেনারেল পলকের নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করা হয়। এই বাহিনী আসার ফলে এতটুকুই ফায়দা হয় যে, বাকি বাহিনী ১৮৪২ সালের ২৩ ডিসেম্বর পিছু হটে ফিরোজপুর পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল। আফগান মুজাহিদরা শাহ সুজাকে হত্যা করে ক্ষমতা দ্বিতীয়বার দোস্ত মুহাম্মাদের কাছে অর্পণ করে। যার ফলে ব্রিটেন যেসব লক্ষ্য নিয়ে আফগানে প্রবেশ করেছিল, তার একটিও অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। উলটো তারা মুজাহিদদের হাতে কঠিন পরাজয়ের শিকার হয়। সেখানে তাদের প্রধান জেনারেল গ্রেফতার হয়, যে বন্দী থাকা অবস্থায় মারা যায় এবং মাত্র একজন ডাক্তার ব্যতীত সব সেনাকে হত্যা করা হয়। আর এভাবেই আফগানের প্রথম জিহাদ শেষ হয়।

**আল-জাজায়িরে ফ্রান্সের হামলা (১৮৩০ খ্রি.) এবং আমির আব্দুল কাদীরের প্রতিরোধ-যুদ্ধ**
একদিকে তাহরিকে মুজাহিদিনের কার্যক্রম চলমান ছিল। অপরদিকে ব্রিটেন আফগান-যুদ্ধে ব্যস্ত ছিল। ঠিক সেই সময় ফ্রান্স উত্তর আফ্রিকার মুসলিম রাষ্ট্র আল-জাজায়িরের ওপর হামলা করে বসে। আল-জাজায়ির ভূমধ্য সাগরের কিনারায় অবস্থিত একটি মুসলিম রাষ্ট্র। সে সময় তারা উসমানিদের অংশ ছিল। ফ্রান্সের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সেখানের মুসলিমরা জিহাদ শুরু করে, যাদের নেতা ছিলেন আমির আব্দুল কাদীর। তিনি ছিলেন একজন আলিম ও কাদেরি সিলসিলার সুফি। তার নেতৃত্বে আল-জাজায়িরের মুজাহিদরা ফ্রান্সের সেনাদেরকে কঠিনভাবে মোকাবিলা করে। আমির আব্দুল কাদীর বর্বর গোত্রগুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেন এবং অন্যান্য কবিলাকেও সাথে আনতে সক্ষম হন। এই জিহাদের ফলে আমির আব্দুল কাদীর আল-জাজায়িরের অর্ধেকের বেশি অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলেন এবং ইমারাতে ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠা করে শরিয়াহ বাস্তবায়ন শুরু করেন। জিহাদের এই সফলতার ফলে ফ্রান্স ঘাবড়ে যায় এবং তাদের প্রশাসন ১৮৩৭ সালে আমির আব্দুল কাদীরের সাথে চুক্তি করে তাদের ইমারাতকে মেনে নেয়। কিন্তু দুই বছরের মাথায় ফ্রান্স চুক্তি ভঙ্গ করে ১৮৩৯ সালে আমির আব্দুল কাদীরের এলাকায় হামলা করে। এই যুদ্ধ ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত চলমান ছিল। যেই সময় ফ্রান্স আমিরের অনেক এলাকাকে দখল করে নেয়। ফলে আমির আব্দুল কাদীর তিউনিসিয়া থেকে সাহায্য কামনা করেন; কিন্তু তিনি সেখান থেকে কোনো সাহায্য পাননি। ফলে তিনি হাতিয়ার ফেলে দিতে বাধ্য হন। এরপর আমিরকে গ্রেফতার করে সিরিয়াতে দেশান্তর করা হয়। তিনি ১৮৮৩ সালে সেখানেই মারা যান।

**উসমানিদের পতন : পশ্চিমা নীতি গ্রহণের যুগ (১৮২৬-১৮৭৬ খ্রি.)**
ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব ইউরোপে প্রচণ্ডভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বাদশাহদের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছিল। অপরদিকে হিন্দুস্থানের ওপর ব্রিটেন এবং আল-জাজায়িরের ওপর ফ্রান্সের দখল পূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। রাশিয়া কান্দাহার, বলকান ও কৃষ্ণ সাগর দখলের জন্য বাহিনী তৈরি করছিল। এই অবস্থায় উসমানিদের পতনের ছাপ স্পষ্ট হতে থাকে। ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব তখন উসমানি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল। অনেক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জন্ম নিতে থাকে। যারা নিজ নিজ দেশীয় অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করতে থাকে।

এটাও একটি বাস্তবতা যে, যখন কোনো রাষ্ট্রের পতন শুরু হয়, তখন তারা অপর রাষ্ট্রগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যায় এবং তাদের নীতিমালা গ্রহণ করা শুরু করে। এই অবস্থা উসমানিদের ক্ষেত্রেও হয়েছিল। পতনের সেই সময় উসমানিরা পশ্চিমা শাসনব্যবস্থা ও তাদের শিল্পোন্নতির দ্বারা প্রভাবিত হওয়া শুরু করে। তারা চিন্তা করছিল, পশ্চিমাদের শাসনব্যবস্থা গ্রহণের ফলে হয়তো তাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু না কখনো এমনটা হয়েছে আর না কখনো এমনটা হবে।

১৮৩৯ সালে সুলতান মাহমুদ প্রশাসনকে নতুনভাবে গঠনের নামে উসমানিদের মধ্যে পরিবর্তন শুরু করে। এর মধ্যে ছিল সামাজিক, বাণিজ্যিক, সামরিক ও আইনগত পরিবর্তন। এই উন্নতির সহজ অর্থ ছিল এটাই যে, তখন উসমানি সাম্রাজ্যকে পূর্ণভাবে পশ্চিমা ধাঁচে সাজানোর চেষ্টা শুরু হয়। এই নতুন গঠনের আলোচনা অনেক বিস্তারিত, যার সারসংক্ষেপ এখানে পেশ করা হচ্ছে:

• ১৮৩৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের মানবাধিকার চার্টার গ্রহণ করে নেওয়া হয়।
• ১৮৪০ সালে পশ্চিমাদের অনুকরণে প্রথমবার উসমানি সাম্রাজ্যে কাগুজি নোট জারি হয়।
• ১৮৪৩-১৮৪৪ সালের মধ্যে বাহিনীকে পূর্ণভাবে পশ্চিমা যুদ্ধনীতি ও বিশ্বাস অনুযায়ী গঠন করা হয়। এই বাহিনীর গঠনে মূল ভূমিকা রেখেছিল পশ্চিমা ধর্মহীন যুদ্ধের থিউরির জনক জেনারেল ক্লজউইজের শাগরিদ জেনারেল মোল্টকি।
• ১৮৪৭ সালে উসমানিদের জন্য জাতীয়তাবাদী সংগীত ও পতাকা বানানো হয়।
• সেই বছরেই উসমানিদের মধ্যে পশ্চিমা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা চালু করা হয়।
• সেই বছরেই শরিয়াহর বিধানকে কাটছাঁট করে কিছু পশ্চিমা ফৌজদারি নীতি গ্রহণ করা হয়।
• ১৮৪৮ সালে পশ্চিমা ধাঁচে ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
• ১৮৫৬ সালে কাফিরদের জন্য জিজিয়া বিলুপ্ত করে পশ্চিমা ধাঁচে ট্যাক্সব্যবস্থা চালু হয়।
• এই বছরেই অমুসলিমদেরকে বাহিনীতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
• ১৮৬৬ সালে প্রথম স্টক এক্সচেঞ্জ বানানো হয়।
• ১৮৬৯ সালে পশ্চিমাদের মতো নাগরিক নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।

এই সংশোধন ও এই নতুন গঠন উসমানিদের পতনের গতি আরও বৃদ্ধি করে। আমরা সামনে এর ওপর আরও অধিক আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

**হিন্দুস্থানে ব্রিটেনের বন্ধ বর্ডার নীতি (১৮৪৮-১৮৭৮ খ্রি.)**
হিন্দুস্থানের রাজনীতি তখন নতুন দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। একদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দিল্লির শাসন পূর্ণভাবে দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু অপরদিকে আফগানে পরাজিত হওয়ার পর ব্রিটেনের জন্য রাশিয়ার বিপদ আরও অধিক বৃদ্ধি হচ্ছিল। সেই সময় রণজিৎ মারা যায় এবং তার পরে সিংহাসন নিয়ে উত্তরসূরিদের মাঝে লড়াই শুরু হয়। যার ফলে ইংরেজরা সুযোগ পেয়ে যায় এবং সাহায্যের বাহানায় পাঞ্জাবে ঢুকে যায়। সর্বশেষ ১৮৪৯ সালে তারা পাঞ্জাব দখল করে নেয়। এই ঘটনাকে ইতিহাসে 'পাঞ্জাব অনুপ্রবেশ' (ইলহাকে পাঞ্চাব) বলা হয়। পাঞ্জাব অনুপ্রবেশ ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। যা একই সাথে গ্রেট গেইম ও হিন্দুস্থানের রাজনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পাঞ্জাব অনুপ্রবেশের ফলে ব্রিটেন হিন্দুস্থানের পশ্চিমে কাবায়েলি ও আফগানের মুজাহিদদের সাথে সরাসরি মোকাবিলায় এসে গিয়েছিল। আর এই পাঞ্জাব অনুপ্রবেশের ফলেই গ্রেট গেইম উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়া শুরু করে।

তখন গ্রেট গেইমে আফগানের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়ে যায়। আফগানে ব্রিটেন ও রাশিয়া দুই পক্ষই আপন স্বার্থ অর্জনে মরিয়া হয়ে ওঠে। যার ফলে সেই অঞ্চলে তিন বাহিনীর মধ্যে লড়াই শুরু হয়। একদিকে ইংরেজ, যারা রাশিয়াকে প্রতিরোধ করার জন্য কাবায়েলি এলাকা ও আফগান দখল করে সেখানে নিজেদের অধীন শাসক বসাতে চাচ্ছিল। অপরদিকে রাশিয়া আফগান দখল করে হিন্দ থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করতে চাচ্ছিল এবং উপকূল দখল করে বিশ্বের সাথে বাণিজ্য করতে চাচ্ছিল। তৃতীয় দিকে মুজাহিদরা ব্রিটেন ও রাশিয়া উভয় পক্ষকেই ইসলামি রাষ্ট্র থেকে বের করে দিতে চাচ্ছিল। যার ফলে এটা এমন এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়, যা একই সাথে ছিল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধ এতটাই বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল যে, ইংরেজরা তা কল্পনাও করতে পারেনি।

পাঞ্জাব অনুপ্রবেশের ফলে ইংরেজদের সামনে অনেক নতুন চ্যালেঞ্জ চলে আসে। মূল চ্যালেঞ্জ ছিল এখন প্রথমবারের মতো হিন্দুস্থানি ও কাবায়েলি মুজাহিদদের সাথে তাদের সরাসরি মোকাবিলা শুরু হয়। হিন্দুস্থানে তাদের বিজয়গুলো অনেক সহজেই হয়ে গিয়েছিল। যার ফলে তারা কল্পনাও করেনি পাঞ্জাব অনুপ্রবেশের ফলে তারা এমন এক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যা ১৮৪৯ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রায় এক শতাব্দী চলমান থাকবে। অতঃপর এই যুদ্ধে তাদের এত পরিমাণ প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতি হবে, যা কয়েকটি বড় যুদ্ধ থেকেও বেশি হয়ে যাবে। সর্বশেষ তারা কোনো সফলতাও অর্জন করতে সক্ষম হবে না।

পাঞ্জাব অনুপ্রবেশের ফলে সৃষ্ট দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ের। ব্রিটেনের হুকুমত শুরু থেকেই রাশিয়ার সম্প্রসারণ নীতির ব্যাপারে ভীত ছিল। তারা রাশিয়ার ওয়ার্ম ওয়াটার পোর্ট পর্যন্ত পৌঁছার ইচ্ছা ভালোভাবেই জানত। যা আফগানের বেলুচিস্থান উপকূল পর্যন্ত পৌঁছে পূরণ হওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু এই অঞ্চল ছিল ব্রিটেনের আয়ত্তে।

রাশিয়াকে বাধা দেওয়ার জন্য ইংরেজদের সামনে এই পথই খোলা ছিল যে, তারা আফগান দখল করে সেখানে তাদের অনুগত শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু তাদের এই ইচ্ছার পথে কাওয়ায়েলি ও হিন্দুস্থানি মুজাহিদরা বাধা হয়েছিল। তাই এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইংরেজরা বিকল্প যে কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেছিল, তাকে 'বন্ধ বর্ডার নীতি' বলা হয়।

এই নীতি দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, হিন্দুস্থানে ব্রিটেন সাম্রাজ্যের সীমানা সিন্ধু নদ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হবে এবং সিন্ধু নদ থেকে ব্রিটেন সাম্রাজ্যের সীমানা মেনে নিয়ে নদীর পাশের পাঁচটি জেলা মার্দান, নওশেরওয়া, কোহাট, বান্নু ও ডেরা ইসমাইল খানকে পাঞ্জাব প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হবে। ফলে তারা পশ্চিমের কবিলাগুলোকে দখল করা ছাড়াই পরোক্ষভাবে সোয়াত, বুনির ও টাঙ্ককে খানদের মাধ্যমে কন্ট্রোল করতে পারবে। এই কৌশলকে কার্যকর বানানোর জন্য 'এফ.সি.আর.' (Frontier Crime Regulation) নীতিমালা প্রস্তুত করা হয়। এই নীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল এমন :

১. ইংরেজদের অধীন এলাকাগুলো নিরাপদ রাখা এবং সেখানে কাওয়ায়েলি যোদ্ধাদের অনুপ্রবেশে বাধা দেওয়া।
২. ইংরেজদের আইনে কোনো অপরাধী যদি কবিলাগুলোতে আশ্রয় নেয়, তাহলে কবিলাগুলো তাদেরকে প্রশাসনের কাছে সোপর্দ করবে।
৩. কবিলাগুলোকে ইংরেজদের আইনের অনুগত করার জন্য ধারাবাহিক চেষ্টা চালানো হবে।
৪. যে সমস্ত কবিলা ইংরেজদের সাথে চুক্তি করবে, তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সেখানে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা চালু করা হবে।

কিন্তু ব্রিটেনের এই বন্ধ বর্ডার নীতি হিন্দুস্থানি মুজাহিদ ও কাওয়ায়েলি জিহাদের ফলে ব্যর্থ হয়ে যায়।

**ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের ইতিহাস ও কার্যক্রম**
'বন্ধ বর্ডার নীতি'র লক্ষ্য অর্জনের জন্য ১৮৪৬ সালে পাঞ্জাবের গভর্নর হেনরি লরেন্স (Henry Lawrence) ও তার ভাই জন লরেন্স (John Lawrence) বাংলার আঞ্চলিক বাহিনীর অফিসার ল্যাফটেনেন্ট হ্যারি লামসডেন (Harry Lumsden)-কে একটি নতুন বাহিনী তৈরির আদেশ দেয়। যেই নতুন বাহিনীর নাম হবে 'ক্রপস অফ গাইড (Corps of Guides)। এই কোরের কাজ হবে সিন্ধু নদীর সাথে সাথে ইংরেজদের সীমান্তকে রক্ষা করা। কবিলা এবং হিন্দুস্থানি মুজাহিদদের অতর্কিত হামলাকে প্রতিহত করা এবং প্রয়োজনের সময় তাদের বিরুদ্ধে অপারেশন চালানো। শুরুর দিকে গাইডদের একটি আধা সামরিক বাহিনী হিসেবে গঠন করা হয়। এখানে ঘোড়-সওয়ার বাহিনীকে ক্যাভলরি গাইড (Guides Cavalry) ও পদাতিক সেনাদেরকে ইনফন্ট্রি গাইড (Guides Infantry) হিসেবে গঠন করা হয়। যেহেতু ইংরেজরা সেই সীমান্তকে পাঞ্জাব সীমান্ত বলত, যার ইংরেজি নাম ছিল পাঞ্জাব ফ্রন্টিয়ার (Punjab Frontier), তাই ১৮৬৫ সালে গাইডদের এই কোরের নামের সাথে পাঞ্জাব ফ্রন্টিয়ার লাগিয়ে দেওয়া হয়। যা পরবর্তী সময়ে 'পিফার্স' (Piffers) হয়ে যায়, যা আজও পাক বাহিনীর ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট হিসেবে রয়েছে।

১৮৭৬ সালে এই কোরের উৎকৃষ্ট কার্যক্রমে খুশি হয়ে ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়া এই ক্রপসকে রানির নিজস্ব ক্রপস (Queen Victoria's Own Crops) নাম প্রদান করে। যার ফলে এটাকে ব্রিটেনের রানির নিজস্ব কোর অফ গাইড ফ্রন্টিয়ার ফোর্স বলা হতো। ১৯০৬ সালে এর নামের সাথে তার প্রতিষ্ঠাতা লামসডেন এর নামও যুক্ত করে দেওয়া হয়।

১৯১৪ সালে কোর অফ গাইডকে পদাতিক ও ঘোড়-সওয়ার দুটি অংশে ভাগ করা হয়। ১৯২২ সালে পদাতিক অংশকে ১০ম ফ্রন্টিয়ার ফোর্স নাম রাখা হয়, যাকে আজ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট বলা হয়।

১৮৪৯ সালে পাঞ্জাবের গভর্নর হেনরি লরেন্স বর্ডারের প্রতিরক্ষায় আরও একটি নতুন আধা সামরিক মিলিশিয়া বাহিনী প্রতিষ্ঠা করে। যার নাম ফ্রন্টিয়ার রাইফেল (Frontier Rifles) রাখা হয়।

**এফ.সি.আর.-এর নীতিমালা**
বন্ধ বর্ডার পলিসির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নীতি ছিল স্বাধীন কবিলাগুলো থেকে নিজেদের নিরাপত্তা টিকিয়ে রাখা। এই জন্য ব্রিটেন প্রশাসন এক বিশেষ নীতি বাস্তবায়ন করে, যার নাম ছিল 'ফ্রন্টিয়ার ক্রাইম রেগুলেশন'। এই নীতির ফলে কবিলাগুলোতে একটি নতুন ব্যবস্থা চালু হয়, যা কোনো না কোনোভাবে আজও প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এই নীতির ফলে কবিলাগুলোর প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরকে 'মালিক' উপাধি দেওয়া হয়। শুরুতে তাদের অন্তর্ভুক্ত জেলাগুলোর মুনাফিক খানদের মাধ্যমে সম্পর্ক রাখা হচ্ছিল এবং পরবর্তী সময়ে এই কাজের জন্য পলিটিক্যাল এজেন্ট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য হুকুমত কবিলাগুলোকে ট্যাক্স আদায়ের আদেশ দেয়, যাকে বলা হতো 'আবশ্যকীয় অর্থ'। এই অর্থ রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হতো।

যেই কবিলা নিরাপত্তা নষ্ট করত, তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ চাপিয়ে দেওয়া হতো। এর অর্থ ছিল সেনাবাহিনী ও অন্যান্য কবিলা এই কবিলার সাথে সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করবে। যদি কবিলার কিছু সদস্য বা কোনো শাখা চুক্তির আনুগত্য না করে, তাহলে বাকি কবিলাগুলো তার বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগ করবে। যার অর্থ এই সদস্য বা শাখার সাথে সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন রাখা হবে। মুলুক (রাষ্ট্র), মুয়াজেব (বেতন), বান্দাশ (সম্পর্ক ছিন্ন) এই শব্দগুলো সেখানের নিয়মতান্ত্রিক পরিভাষা হয়ে যায়, যেগুলোর প্রয়োগ এখনো হচ্ছে। কাবায়েলি জনগণ ও আলিমগণ এই সিস্টেমকে মানতে অস্বীকার করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার মধ্যে সাইয়িদ আহমাদ শহিদ -এর সাথে আসা মুহাজির মুজাহিদদের একটি বড় অংশ ছিল। কবিলা ও মুহাজির মুজাহিদরা ইংরেজ বাহিনী ও চৌকিগুলোর ওপর হামলা শুরু করে।

**কাবায়েলি জিহাদ (১৮৪৮-১৮৭৮ খ্রি.)**
ব্রিটেনের বন্ধ বর্ডার নীতির ফলে প্রথমবারের মতো মুজাহিদরা ও ইংরেজদের ভারতীয় বাহিনী সামনাসামনি হয়ে যায়। সেই সময় মুজাহিদদের উদ্দেশ্য তা-ই ছিল, যা আজকের মুজাহিদদের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার পথে জিহাদের মাধ্যমে কাফিরদের পরাজিত করে আল্লাহ তাআলার শরিয়াহ বাস্তবায়ন করা। এর কর্মপদ্ধতিও তা-ই ছিল, যা আজ মুজাহিদরা বাস্তবায়ন করছেন। সাহায্যকারী আনসার, হিন্দুস্থানের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মুহাজির, তাদের অঞ্চল, রং, বংশ ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল এক। তারা দিনে আল্লাহ তাআলার পথে জিহাদ করতেন এবং রাত সালাত ও সিজদায় কাটিয়ে দিতেন।

তখন মুজাহিদদের নেতৃত্ব ছিল সাইয়িদ আহমাদ শহিদ -এর বাইআতপ্রাপ্ত মাওলানা এনায়েত আলি ও মাওলানা বেলায়েত আলির কাঁধে। তাদের নেতৃত্বে মুজাহিদদের আক্রমণে কাফিরদের নাভিশ্বাস উঠে যায়। তখন তাদের বিরুদ্ধে ইংরেজ বাহিনীতে সেই সমস্ত ভাড়াটে নামধারী মুসলিম সেনারাও ছিল, যারা তাদের মূল্যবান জীবনকে ব্রিটেনের জন্য কুরবান করছিল। তারা প্রত্যেকটি যুদ্ধ এই জন্যই করছিল, যাতে মুসলিম উম্মাহকে পরাজিত করা যায়। ভাড়াটে সেনাদের জীবনের মূল লক্ষ্য নিজের জান কুরবান করে মুসলিমদের শক্তিকে ছিন্নভিন্ন করে তার পরিবর্তে কয়েক গজ জমিন ও কিছু সেনা-সম্মাননা অর্জন ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এত কিছু সত্ত্বেও তারা নিজেরা নিজেদের মুসলিম দাবি করত।

কাবায়েলি জিহাদকে আমরা দুটি ময়দানে ভাগ করতে পারি। একটি উত্তর ও আরেকটি দক্ষিণ। উত্তরের দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মালাকান্ট, বুনির, সোয়াত, বাজুর, মেহমান্দ, খাইবার, মার্দান ইত্যাদি কাবায়েলি এলাকা। দক্ষিণ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে কাজায়ি ও উত্তর-দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান। যেমনটা আমরা পূর্বে বলে এসেছি, এখানে মুহাজির ও আনসার উভয় পক্ষই ছিল। এই সমস্ত এলাকার সীমানা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ছিল। তেমনই এখানের জিহাদও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ছিল। হিজরত ও জিহাদের কাজে এক এলাকার মানুষ অপর এলাকায় চলাচল করত। এই এলাকাগুলোতে সাইয়িদ আহমাদ -এর সাথিরা ও স্থানীয় জনগণ উভয় পক্ষই বসবাস করছিল। এখানে জিহাদের যে 'সাধারণ কর্মপদ্ধতি' গ্রহণ করা হয়েছিল, তা হলো:

১. দুশমনের ওপর অধিকাংশ কার্যক্রম গোপন হামলার মাধ্যমে করা হবে। যার লক্ষ্য হবে ইংরেজদেরকে সামনে আগানো থেকে বাধা দেওয়া।
২. এই চোরাগুপ্তা হামলার দ্বারা ইংরেজদের বাধ্য করা হবে; যাতে তারা পাল্টা হামলা করে। তখন মুজাহিদরা তাদেরকে নিজেদের পছন্দমতো ময়দানে এনে টার্গেট করে আক্রমণ করবে।
৩. ইংরেজরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পলিসি গ্রহণ করছে এবং রাশিয়ার ভয়ে আফগান দখলে এগিয়ে আসতে চাচ্ছে। তাদের রাস্তায় কবিলাগুলো বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
৪. আফগানের ভেতরেও মুজাহিদরা আফগান প্রশাসনের সাথে মিলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।

ইংরেজ ঐতিহাসিকরা লিখেছে যে, ১৮৪৯ থেকে ১৮৫৭ পর্যন্ত মুজাহিদদের হামলা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, পেশওয়ার শহরে কোনো ইংরেজ রাস্তায় বের হতে পারত না। সেই সময় মুজাহিদদের বিরুদ্ধে ইংরেজরা আটটি বড় অপারেশন চালায়, যাতে তারা কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনি। যার মধ্যে একটি বড় অপারেশন ছিল মেজর নিকলসনের নেতৃত্বে তাহরিকে মুজাহিদিনের মারকাজ সাত্তানাতে হামলা। মুজাহিদরা এই অপারেশনের ফলে পিছু হটে বুনের অঞ্চলের মালকায় চলে আসে।

**১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা-যুদ্ধ**
১৮৫৭ সালের মে মাসে মিরাঠ অঞ্চলে ব্রিটেনের হিন্দুস্থানি বাহিনীর 'বাঙ্গালি ফৌজ' বিদ্রোহ করে। তারা মিরাঠের সমস্ত ইংরেজ অফিসারকে হত্যা করে পালিয়ে দিল্লি চলে আসে। সেখানেও তারা ইংরেজদের গণহত্যা করে এবং বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফরকে তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার আবেদন জানায়। যার ফলে তখন দিল্লি মুসলিমদের দখলে চলে আসে। এটি ছিল হিন্দের মুসলিমদের ইংরেজদের থেকে আজাদির একটি সোনালি মুহূর্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বাহাদুর শাহ জাফর সেনাদের নেতৃত্ব দিতে পারার মতো সাহসী ছিলেন না। সে বিদ্রোহী বাহিনীকে জেনারেল বখত খানের নেতৃত্বে ছেড়ে দেয়। আস্তে আস্তে এই বিদ্রোহ লক্ষ্ণৌ, জানসি ও শামেলিতে পৌঁছে যায়। এই স্বাধীনতা-যুদ্ধকে দমনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ইংরেজদের নতুন ভর্তি হওয়া ৪৪ হাজারের বাহিনী, যাদেরকে পাঞ্জাবের চকোয়াল ও রাওয়ালপিন্ডি জেলার মুসলিমদের থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাদের সাথে গাইডের ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্টও অন্তর্ভুক্ত ছিল। যারা মেজর নিকলসনের নেতৃত্বে ২৭ দিনের মধ্যে ৬শ মাইল সফর করে দিল্লি পৌঁছায় এবং হিন্দুস্থানের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

**ব্রিটেনের বাদশাহর রাজত্ব ও রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মি গঠন**
১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ মুসলিম নামধারী গাদ্দারদের কারণে ব্যর্থ হয়। তবে এর ফলে কোম্পানির হুকুমত খতম হয়ে হিন্দুস্থান সরাসরি ব্রিটেন রাজ্যের অধীনে চলে যায়। কোম্পানির প্রেসিডেন্সি বাহিনীগুলোর নাম রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মি রাখা হয়। ইংরেজ ঐতিহাসিকরা একমত যে, ১৮৫৭ সালে হিন্দুস্থানের বিদ্রোহ কোম্পানির হুকুমতের জন্য ছিল বিশাল ধাক্কা। কিন্তু এই বিদ্রোহের সময় পাঞ্জাবের তিন জেলা ঝিলাম, চাকোয়াল ও রাওয়ালপিন্ডি এবং পশতুনের দুই জেলা বুনের ও কোহাট ইংরেজদের চূড়ান্ত আনুগত্য প্রদর্শন করে। তারা পরবর্তী সময়ে ইংরেজ বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে মুসলিমদের কেন্দ্র উসমানি খিলাফতকে পতন করে মুসলিম উম্মাহর কর্তৃত্ব ধ্বংসের পাশাপাশি মুসলিমদের প্রথম কিবলা ইহুদিদের দখলে দিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সাহায্য করেছিল।

এই এলাকাগুলো ইংরেজদের এতটাই সাহায্য করেছিল যে, ইংরেজ ঐতিহাসিকরা এই জেলাগুলোকে ব্রিটেন সাম্রাজ্যের তরবারি বলা শুরু করে। এই জেলাগুলো থেকে ভর্তি করা সেনা এতটাই অনুগত ছিল যে, ইংরেজ জেনারেলরা শুধু বাংলার বাহিনী নয়; বরং মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ের বাহিনীতেও পাঞ্জাব, বুনের ও কোহাটের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা শুরু করে। এমনিভাবে আস্তে আস্তে ইংরেজদের পুরো বাহিনীর ৬০% থেকে ৭০% অংশ এই জেলাগুলোর সেনা দ্বারাই পূর্ণ হয়ে যায়। ইংরেজরা এই জাতিকে লড়াকু জাতি বা মার্শাল রেইস ঘোষণা দেয়। ইংরেজদের দেওয়া এই উপাধি আস্তে আস্তে একটি বিশ্বাস আকারে বাহিনীর মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। যা আজও পাকিস্তানের বাহিনীর মধ্যে একটি মাপকাঠি হিসেবে গণ্য হয়।

**উত্তর কাবায়েলি যুদ্ধক্ষেত্র এবং আম্বেলার যুদ্ধ**
১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা-যুদ্ধে মার্দানে অবস্থিত ৫৫তম বাঙ্গালী বাহিনী বড় আকারে বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহ শুরু করার ক্ষেত্রে মুজাহিদদের অনেক সাহায্য ছিল। স্বাধীনতা-যুদ্ধকে দমানোর পর ইংরেজদের তদন্তে এটা প্রমাণিত হয় যে, মুজাহিদরা শুধু বিদ্রোহই করায়নি; বরং বাঙ্গালী বাহিনী থেকে পলায়নকারী সেনাদেরও আশ্রয় দিয়েছিল।

এই বিদ্রোহের সাজা হিসেবে ১৭৫৮ সালে ইংরেজ বাহিনী মুজাহিদদের মারকাজ সাত্তানাতে হামলা করে। কিন্তু মুজাহিদরা যেহেতু গেরিলা দল ছিল, তাই তারা সাত্তানা থেকে পিছু হটে বুনের জেলার মালকাতে চলে যায়; যার ফলে ইংরেজদের হামলা ব্যর্থ হয়। কয়েক বছর মুজাহিদ ও ইংরেজদের মাঝে যুদ্ধ চলমান থাকে। মুজাহিদরা ইংরেজদের এতটাই চাপে ফেলে দেয় যে, ইংরেজ ঐতিহাসিকদের মতে পেশওয়ার শহরে ইংরেজরা দিনের বেলায় রাস্তায় বের হতে পারত না। সর্বশেষ ১৮৬৩ সালে ব্রিটেন প্রশাসন মুজাহিদদের বিরুদ্ধে বালকার ওপর এক বড় অপারেশনের পরিকল্পনা করে, যা ইতিহাসে আম্বেলা যুদ্ধ বা আম্বেলা ক্যাম্পেইনের নামে প্রসিদ্ধ।

এই যুদ্ধে ইংরেজদের প্ল্যান ছিল, মুজাহিদদেরকে উত্তর দিকের পাহাড়ে যেতে না দিয়ে বরং দক্ষিণ দিকে সিন্ধু নদীর দিকে পিছপা হতে বাধ্য করা হবে। এবং সেখানে পূর্ব থেকেই ইংরেজদের একটি বাহিনী মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকবে। এই হামলার প্ল্যান অনেক গোপন রাখা হয়। তদের ইচ্ছা ছিল বুনের জেলার চামলাহ উপত্যকার 'ডেরা আম্বেলা' পার হয়ে মুজাহিদদের মারকাজ মালকার ওপর আক্রমণ করবে। এই অপারেশনের প্ল্যান ছিল তিন সপ্তাহের।

১৮৬৩ সালের ১৯ অক্টোবর ইংরেজ বাহিনী জেনারেল ন্যাভিল চার্লিম্যানের নেতৃত্বে ছাউনি থেকে রওয়ানা হয় এবং আম্বেলা উপত্যকার দুই পাশের পাহাড়ে চৌকি প্রতিষ্ঠা করে। যার মধ্যে উত্তর চৌকির নাম ছিল ঈগলের দৃষ্টি এবং দক্ষিণ চৌকির নাম ছিল ক্র্যাগ পিক্ট। ১৮৬৩ সালের ২২ অক্টোবর যখন ইংরেজ বাহিনী জেনারেল চার্লিম্যানের নেতৃত্বে এই অঞ্চলে প্রবেশ করে, তখন তাদের নিজেদের ভুল বুঝতে পারে। কারণ মুজাহিদরা পূর্ব থেকেই সেখানে প্রস্তুত ছিল। সোয়াত, বাজুর, বুনেরের মুজাহিদ সিংহরা আল্লাহ তাআলার দুশমনদের মোকাবিলার জন্য আম্বেলার অঞ্চলে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল।

মুজাহিদরা ১৮৬৩ সালের ৩০ অক্টোবর ক্রেগ পিক্টের ওপর হামলা করে। ফলে সেখানে থাকা প্রথম পাঞ্জাব ব্যাটালিয়ন পিছপা হতে বাধ্য হয়। ১ম ও ২০তম পাঞ্জাব ব্যাটালিয়ন এই পিক্টকে দখল করার জন্য পাল্টা হামলা করে। ফলে মুজাহিদরা পিছপা হয়। এই ২০তম পাঞ্জাব ব্যাটালিয়ন বর্তমান পাক বাহিনীর পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অংশ। ১৮৬৩ সালের ১৩ নভেম্বর মুজাহিদরা আবার ক্রেগ পিক্ট দখল করে নেয়। কিন্তু কিছু দিন পর তাদের দ্বিতীয়বার পিছপা হতে হয়। ২০ নভেম্বর মুজাহিদরা তৃতীয়বার ক্রেগ পিক্ট দখল করে নেয়। এইবার হামলায় ইংরেজ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল জেনারেল চার্লিম্যান নিজেই। সে হামলায় কঠিনভাবে আহত হয়ে ময়দান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। যুদ্ধের এই স্তরে এসে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ইংরেজ বাহিনী অন্যের সাহায্য ব্যতীত এই যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারবে না। তাই লাহোর, শিয়ালকোট ও চেহলাম থেকে নতুন বাহিনী রওয়ানা হয়, যাদের নেতৃত্বে ছিল জেনারেল গার্ভাক। এই গার্ভাক এসে চার্লিম্যানের জায়গায় বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করে।

তবে এই সাহায্য দ্বারা কোনো ফায়দাই হয়নি। ইংরেজ বাহিনী এই আক্রমণ তিন সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার জন্য বের হয়েছিল। কিন্তু তিন মাস অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরেও আম্বেলা সীমানাতেই পূর্ণভাবে প্রবেশ করতে পারেনি। ইংরেজরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এই নীতি জানত যে, যদি সরাসরি যুদ্ধে বিজয় না আসে, তাহলে পেছন দিয়ে গাদ্দার সৃষ্টি করতে হবে। এখানেও বুনেরের মালিক ও খানরা সোয়া লাখ রুপিতে গাদ্দারি করতে রাজি হয়। তারা প্ল্যান করে যে, ইংরেজ বাহিনীর একটি দল খানদের সহায়তায় মুজাহিদদের মারকাজে গিয়ে তা জ্বালিয়ে দেবে। অতঃপর এমনটাই হয়, এই খানদের সহায়তায় ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের একটি টিম মালকায় মুজাহিদদের ঘাঁটিতে গিয়ে আগুন লাগিয়ে ফিরে আসে।

আসে। ইংরেজ বাহিনীতে থাকা পাকিস্তানের বাহিনীর পাঞ্জাব ও ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের সেনারা এই কাজে মূল ভূমিকা পালন করে। মুজাহিদ বাহিনীর মধ্যে মোল্লা আখন্দ সোয়াতির সাথে মুজাহিদদের আমির মাওলানা নিয়ামাতুল্লাহর ছেলে মাওলানা আব্দুল্লাহও ছিলেন। তারা মুজাহিদদের সুসংগঠিত করেছিলেন। এটা ছিল আম্বেলা যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন লড়াই। এই যুদ্ধের ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মত হচ্ছে, যদি ইংরেজরা এই খানদের সাথে মিলে ষড়যন্ত্র না করত, তাহলে সম্ভবত চিরদিনের জন্য তাদেরকে পুরো সীমান্ত এলাকা থেকে হাত গুটিয়ে নিতে হতো।

**দক্ষিণ কাবায়েলি যুদ্ধক্ষেত্র ও মৌলভি গোলাবুদ্দিন**
সেই সময় উত্তর কাবায়েলি এলাকা ছাড়াও দক্ষিণ কাবায়েলি এলাকাতে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালিত হচ্ছিল। এখানের বিশেষভাবে কয়েকজন ব্যক্তিত্ব আলোচনার যোগ্য, যারা এই জিহাদকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মৌলভি গোলাবুদ্দিন, মোল্লা পাওয়েন্দা, শাহজাদা ফজলুদ্দিন ও ফকির আইপি।

দক্ষিণ কবিলাগুলোতে মৌলভি গোলাবুদ্দিনই প্রথম জিহাদের সূচনা করেছেন। তিনি ওয়াজিরের মৌলভি হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি ১৮৫২ সালে প্রথমবার ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা করে শৃঙ্খলাবদ্ধ আন্দোলন শুরু করেন। এই যুদ্ধে তার কাছে ওয়াজির, মাসুদ, দাউদ, বেলুচ ও খাটাক-সহ সমস্ত কবিলা একত্রিত হয়ে যায়। তিনি দাউদ শাহ ও মেহমান্দ খাইলে ইংরেজদের মোকাবিলা করেন। কিন্তু ইংরেজরা যখন সেখানে তার ওপর বিজয়ী হয়ে যায়, তখন কিজুরিস্থানে মারকাজ বানিয়ে নেন। সেখানে তিনি বন্দুক ও তোপ বানানোর জন্য অস্ত্রাগার নির্মাণ করেন। সেই সময়ের একটি তোপ আজও ওয়াজিরিদের এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি স্পেনাম, গ্রিউম ও দুসলি অঞ্চলেও কেল্লা নির্মাণ করেন, যেখানে সর্বদা আট-দশ হাজার সেনা উপস্থিত থাকত। এই প্রচেষ্টার ফলে ইংরেজরা তার জীবদ্দশায় উত্তর ওয়াজিরিস্তানে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়নি। তিনি তারবিয়াতের এমন গঠনমূলক কার্যক্রম চালু করেছিলেন, যার ফলে তিনি জীবিত থাকা অবস্থাতেই মোল্লা পাওয়েন্দার মতো ব্যক্তিত্ব জিহাদের ময়দানে তৈরি হয়। কিজুরিতেই তিনি মারা যান।

**ক্রিমিয়া যুদ্ধ এবং মধ্য এশিয়া ও বলকানের ওপর রাশিয়ার দখলদারিত্ব**
১৮৫৩ সালে রাশিয়া ও উসমানিদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। যাকে ইতিহাসে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ বলা হয়। এই যুদ্ধের কারণ ছিল, রাশিয়া খ্রিষ্টানদের পবিত্র স্থান বাইতুল মুকাদ্দাসের জিম্মাদারি নিতে চাচ্ছিল, যা উসমানিরা এক চুক্তির ভিত্তিতে ফ্রান্সকে দিয়ে দিয়েছিল। রাশিয়ার জার ছিল অর্থডক্স গির্জার মূল সদস্য। অন্যদিকে ফ্রান্স রোমান ক্যাথলিক গির্জার পক্ষ থেকে এই জিম্মাদারি গ্রহণ করেছিল। রাশিয়ার জার খলিফার কাছে আবদার পেশ করে, যাতে বাইতুল মুকাদ্দাসের দায়িত্ব ফ্রান্স থেকে নিয়ে তাকে দেওয়া হয়। ফ্রান্স এতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে রাশিয়ার জার নিকোলাস ক্রিমিয়ার ওপর হামলা করে, যা কৃষ্ণ সাগরের নিকটবর্তী উসমানিদের এলাকা ছিল এবং একসময় তা দখল করে নেয়। ফলে উসমানিরা যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং ব্রিটেন ও ফ্রান্স এই যুদ্ধে উসমানিদের সাথে অংশ নেয়। ১৭৫৬ সালে এই যুদ্ধ সমাপ্ত হয় এবং রাশিয়া সেই এলাকা ফিরিয়ে দেয়। যুদ্ধ শেষে হয় প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে।

গ্রেট গেইমের ইউরোপীয় যুগ শুরু হয় ১৮৫৬ সালের প্যারিস চুক্তির পর থেকেই। এই চুক্তিতে ইউরোপের সমস্ত রাষ্ট্র উসমানিদেরকে ইউরোপের অংশ হিসেবে মেনে নেয় এবং তাদের এলাকা রক্ষারও দায়িত্ব নেয়। কিন্তু কয়েক বছর পরেই এই চুক্তির বিরুদ্ধে চক্রান্ত শুরু হয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের লক্ষ্য ছিল উসমানিদের ভেতর থেকে খিলাফতের শক্তিকে দুর্বল করা। এই কাজের জন্য তারা উসমানি অঞ্চলে থাকা খ্রিষ্টানদের সাহায্যে শাম, লেবানন ও বুলগেরিয়াতে বিশৃঙ্খলা ঘটায় এবং তাদেরকে রক্ষার নামে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। অপরদিকে তুর্কি যুবকদের দল ইয়াং তুর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। যার মাধ্যমে স্বাধীনতা ও সমতার স্লোগান প্রচার করতে থাকে। এই সমস্ত কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ছিল খলিফার শক্তিকে দুর্বল করে দেওয়া।

অপরদিকে রাশিয়া আবারও উঠে দাঁড়ায় এবং সে দক্ষিণ দিকে সীমানা বাড়িয়ে ১৮৬৫ সালে প্রথমে তাশকান্দ দখল করে এবং তিন বছর পর ১৮৬৮ সালে বুখারা, অতঃপর পাঁচ বছর পর ১৮৭৩ সালে ককেশাস দখল করে নেয়। ফলে হিন্দুস্থানের ইংরেজ জেনারেল লর্ড ল্যাটিন ব্রিটেন সাম্রাজ্যের কাছে অর্থডক্স রাশিয়ানদের পক্ষ থেকে বিপদের আশঙ্কা ব্যক্ত করতে থাকে। কেননা, এর ফলে রাশিয়া ব্রিটেনের সাম্রাজ্য থেকে মাত্র চারশ কিলো দূরে চলে এসেছিল। অপরদিকে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোও চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছিল। কারণ রাশিয়া ১৮৭৭ সালে বলকানের ওপর হামলা করে, যা ছিল উসমানিদের অঞ্চল। বলকান রাষ্ট্রও স্বাধীনতার নামে রাশিয়ার সাথে মিলিত হয়ে যায়।

'আন্ডার নোপেল' দখলের সাথে সাথে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অনুভূত হয় যে, রাশিয়া হয়তো সমস্ত অঞ্চল বিজয় করে নিতে চাচ্ছে। তাই ব্রিটেন নিজেদের সামুদ্রিক বহর মর্মর সাগরে পাঠিয়ে দেয়; যার ফলে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর যুদ্ধের বিস্তারিত পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর 'বার্লিন চুক্তি' হয়; যেখানে মান্টিনিগ্রো, গ্রিক, রোমানিয়া, সার্বিয়াকে উসমানি খিলাফতের অধীন থেকে স্বাধীন ও স্বকীয় রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। অপরদিকে উসমানিদের এলাকা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা অস্ট্রিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয়। আর এভাবেই উসমানিদের পুরো ইউরোপিয়ান অঞ্চল হাতছাড়া হয়ে যায়।

**উসমানিদের আইনি (পার্লামেন্টারি) যুগ (১৮৭৬-১৯০৯ খ্রি.)**
যেমনটা ওপরে বলা হয়েছে, ফরাসি বিপ্লবের প্রভাবে সুলতান মাহমুদ ও পরবর্তী সুলতানরা পরিস্থিতিকে উন্নত করার নামে সালতানাতে নতুন পরিবর্তনের ধারা শুরু করে। আর এর উদ্দেশ্য ছিল সালতানাতকে পশ্চিমা ধাঁচে সজ্জিত করা। কিন্তু নতুনভাবে পরিবর্তনের ফলে কোনো উন্নতি তো হয়নি, উলটো 'ইয়াং তুর্ক' নামের এমন সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়, যাদের দাবি ছিল, রাষ্ট্রের জন্য মানব-রচিত আইন বানাতে হবে এবং পার্লামেন্ট বানিয়ে রাষ্ট্রের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। সুলতান আব্দুল হামীদ দ্বিতীয় রাষ্ট্রে সর্বপ্রথম পার্লামেন্ট তৈরির অনুমতি দেন। এর অধীনে কোনো পার্টি ব্যতীত ১৮৭৭ সালে প্রথম পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ১৮৭৮ সালে এই পার্লামেন্টকে আব্দুল হামীদ ভেঙে দেন। ১৮৭৮ সালে আবারও পার্লামেন্টের জন্য নির্বাচন হয়। অতঃপর এটাকেও বিভিন্ন মতানৈক্যের ফলে ভেঙে দেওয়া হয়। যার ফলে রাষ্ট্রের অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে যায়। রাষ্ট্রের কয়েকটি অংশের মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়। এই ধারা ১৯০৮ সাল পর্যন্ত চলমান থাকে। ১৯০৮ সালে জনগণের চাপে সুলতান আব্দুল হামীদ আবারও পার্লামেন্ট চালু করেন। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। ১৯০৯ সালে সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়। তাকে হটিয়ে তার ভাই মুহাম্মাদ পঞ্চম সিংহাসন দখল করে। আব্দুল হামীদের বিরুদ্ধে তুর্কি যুবকদের এই বিদ্রোহে তিনজন পাশা সাহায্য করেছিল। এই তিনজন ছিলেন আনোয়ার পাশা, তালাত পাশা ও জামাল পাশা। এই তিন পাশার ওপরই অভিযোগ ছিল যে, তারা উসমানিদেরকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করেছিল। এর আলোচনা সামনে করা হবে ইনশাআল্লাহ।

**সুয়েজ খাল নির্মাণ, ব্রিটেনের মিশর দখল ও মাহদি সুদানির জিহাদ**
মিশর ষোড়শ শতাব্দীতে সুলতান প্রথম সালিমের সময় উসমানিদের অধীনে এসেছিল এবং ১৮৮২ সাল পর্যন্ত তাদের অধীনেই থাকে। এই সময়ের মধ্যে কয়েকবার ক্ষমতার পালাবদল হয়। ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মিশর দখল করে। পরবর্তী সময়ে নেপোলিয়ন মিশর থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়। নেপোলিয়ন বের হওয়ার পর মুহাম্মাদ আলি পাশা মিশর দখল করে। মুহাম্মাদ আলি পাশার বংশ ১৮০৫-১৯৫২ পর্যন্ত মিশরে রাজত্ব করে। পরবর্তী সময়ে এক সেনা বিদ্রোহের মাধ্যমে জামাল আব্দুন নাসের শাহ ফারুকের বাদশাহি বিলুপ্ত করে তাকে দেশান্তর করে দেয়। ১৮৫৯ সালে সাদি পাশা ফ্রান্সের সাহায্যে লোহিত সাগর ও ভূমধ্য সাগরকে মিলিত করার জন্য খাল খননের পরিকল্পনা করে। যার ফলে মিশরের গুরুত্ব বেড়ে যায়। শুরুতে ব্রিটেন এই পরিকল্পনাকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। কেননা, ইঞ্জিনিয়ারদের মতে এটা ছিল একটি অসম্ভব ব্যাপার।

কিন্তু ১৮৬৯ সালে ইসমাইল পাশার সময় এই প্ল্যান বাস্তবায়িত হয়ে যায়। যার ফলে ইউরোপ থেকে হিন্দের পথ এক-তৃতীয়াংশ থেকেও কমে যায়। এর ফলে এই রাস্তার গুরুত্ব ব্রিটেনের কাছে অনেক বৃদ্ধি পায়। ১৮৭৫ সালে ব্রিটেন মিশরের কাছ থেকে সুয়েজ খালের অংশ ক্রয় করে নেয়। ইসমাইল পাশার পর তাওফিক পাশার সময় এই বিক্রির বিরুদ্ধে আহমাদ আরাবি নামের এক জাতীয়তাবাদী নেতা বিদ্রোহ করে বসে। আরাবি ছিল মিশরে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের অনুপ্রবেশের বিরোধী। এই বিদ্রোহ ব্রিটেন ও ফ্রান্সের জন্য বিপদ হয়ে দেখা দেয় এবং আরাবির সফলতার ফলে সুয়েজ খাল ব্রিটেন ও ফ্রান্সের হাত থেকে ছুটে যায়। ব্রিটেন তাওফিক পাশার সাহায্যে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বাহিনী পাঠায়, যেখানে হিন্দুস্থান থেকে আসা সাত হাজার সেনাও ছিল। এই বাহিনী তেল আল-কাবিরের যুদ্ধে আরাবির বাহিনীকে পরাজিত করে। ফলে মিশর ব্রিটেনের দখলে চলে যায় এবং ক্রোমারকে মিশরের ভাইসরয় বানিয়ে দেওয়া হয়।

মিশর বিজয়ের পর ব্রিটেন দ্বিতীয়বার সুদান (যা পূর্বে মিশরের অংশ ছিল) বিজয়ের জন্য পরিকল্পনা করে। এই প্রদেশটি ছিল মুহাম্মাদ আহমাদ বিন আব্দুল্লাহর দখলে, যে মাহদি সুদানি নামে প্রসিদ্ধ। মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ নিজেকে মাহদি দাবি করে সুদান দখল করে। ১৮৮৪ সালে মাহদি সুদানি খার্তুম দখল করে এবং ব্রিটেনের গভর্নর জর্জ গর্ডনকে হত্যা করে। গর্ডনের সাহায্যে মিশর থেকে প্রেরিত দুটি বাহিনীকে মাহদি সুদানির বাহিনী পরাজিত করে। ১৮৮৫ সালে মাহদি সুদানির মৃত্যু হয়। মাহদির উত্তরসূরিরা সেখানে শরিয়াহ বাস্তবায়ন শুরু করে। সুদানির প্রতিষ্ঠিত এই শাসন প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই সময়ে সেই বাহিনী ইথিওপিয়া ও মিশর দখলের চেষ্টা করে।

১৮৯৬ সালে ব্রিটেনের জেনারেল কিচেনার সুদানে হামলা করে। দুই বছরের কঠিন যুদ্ধের পর ১৮৯৮ সালে 'আমদারমান' লড়াইয়ে সুদানির বাহিনী পরাজিত হয়। আমদারমানের পরাজয়ের কারণ ছিল নতুন পদ্ধতির যুদ্ধ না বোঝা। এই যুদ্ধে মেশিনগান দ্বারা হাজারো মুজাহিদকে শহিদ করা হয়। মুজাহিদদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল তারা তোপ ও মেশিনগানের ফায়ারের সামনে কোনো প্রতিরক্ষা ছাড়াই সোজা চলে আসত। যার ফলে এই যুদ্ধে প্রায় ৩৫ হাজার মুজাহিদ শহিদ বা আহত হয়। এক যুদ্ধে এত বিশাল ক্ষতি এই আন্দোলনের সামরিক শক্তিকে পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয় এবং সুদান তাদের হাত থেকে ছুটে যায়। এই যুদ্ধে মুজাহিদদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে।

**কাবায়েলি অঞ্চলের ওপর ব্রিটেনের আক্রমণ পলিসি (১৮৮৭-১৯০০ খ্রি.)**
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বৈশ্বিক রাজনীতিতে কয়েকটি পরিবর্তন আসে। তখন রাশিয়া মধ্য এশিয়ার অনেক অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল। উজবেকিস্তানের কোকান্দেও তারা পৌঁছে গিয়েছিল। পূর্ব ইউরোপেও রাশিয়া নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করে ফেলেছিল। মধ্য এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো দখলের ফলে রাশিয়া হিন্দুস্থান থেকে মাত্র চারশ কিলো দূরে চলে এসেছিল। তাদের দৃষ্টি ছিল তখন আফগানের ওপর। এই সব অবস্থা হিন্দুস্থানের ইংরেজদের জন্য অনেক বেশি চিন্তার কারণ ছিল। তাদের গৃহীত বন্ধ বর্ডার পলিসি জিহাদের ফলে ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল। তাই তারা হিন্দুস্থানের কাবায়েলি এলাকার জন্য আক্রমণাত্মক পলিসি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। এই পলিসির মধ্যে তিনটি ধাপ ছিল:

১. ইংরেজরা সামনে বেড়ে কাবায়েলি এলাকাগুলো দখল করবে এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা-লাইন তৈরি করবে।
২. ইংরেজরা আফগান পূর্ণভাবে দখল করে নেবে অথবা আফগান সরকারের সাথে রাশিয়ার হামলায় ব্রিটেনকে সাহায্যের চুক্তি করবে।
৩. আফগান ও ব্রিটেনের মাঝে একটি সীমান্ত নির্ধারণ করা হবে। এই সমস্ত পরিস্থিতি দ্বিতীয় আফগান-যুদ্ধের জন্ম দেয়।

**দ্বিতীয় আফগান-যুদ্ধ (১৮৭৯ খ্রি.)**
১৮৭৭ সালে স্যার রবার্ট স্যান্ডম্যান গভর্নর জেনারেল অফ ইন্ডিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে বেলুচিস্থানে আসে। এখানে সে কালাতের খানের সাথে একটি চুক্তি করে। যার মাধ্যমে ব্রিটেন চমান, ডেরা বুলান ও ডেরা খুজাক দখল করে নেয়। এই সফলতা দেখে সান্ডিমান বন্ধ বর্ডার পলিসি ত্যাগ করে আক্রমণাত্মক পলিসি নির্ধারণ করে এবং তা সে আফগান সীমান্তে প্রয়োগের চেষ্টা করে। এই পলিসির দুটি বড় লক্ষ্য ছিল। একটি হলো রাশিয়াকে যতটা সম্ভব তাদের সাম্রাজ্য থেকে দূরে রাখা। অপরটি ছিল দায়িত্বশীল নির্ধারণ করে আফগানের সাথে সীমানা বন্ধ করে দেওয়া। ব্রিটেনের এই সম্প্রসারণ নীতির ফলে আফগানের শাসক আমির দোস্ত মুহাম্মাদের ছেলে আমির শের আলি বিপদ অনুধাবন করে।

তখনকার অবস্থা ছিল একদিকে ব্রিটেন আফগানে নিজেদের ইচ্ছাধীন শাসক প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছিল এবং অপরদিকে রাশিয়াও তাদের চাহিদা মুতাবিক শাসক নির্ধারণ করতে চাচ্ছিল। কিন্তু আফগান প্রশাসন এই দুই শক্তির কোনোটার অধীন হতে রাজি ছিল না। রাশিয়া তার ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য কাবুলে তার এক প্রতিনিধি পাঠায়, যে শের আলির সাথে মুলাকাত করে। কিন্তু সে কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ঠিক সেই সময় ব্রিটেনের জেনারেল চার্লিম্যানের নেতৃত্বে ব্রিটেনের প্রতিনিধিও কাবুলে পৌঁছায়; কিন্তু শের আলি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকার করে। যখন লর্ড ল্যাটনের কাছে এই খবর পৌঁছায়, তখন সে শের আলিকে নিশ্চিত কোনো জবাব দেওয়ার জন্য পনেরো দিনের সুযোগ দেয়। কিন্তু শের আলি তাকে কোনো পাত্তাই দেয়নি। সময় শেষ হওয়ার পর ব্রিটেনের বাহিনী তিন দিক অর্থাৎ খাইবার, করম ও কান্দাহারের দিক থেকে আফগানের ওপর হামলা করে। এটাই ছিল ১৮৭৮ সালের দ্বিতীয় আফগান-যুদ্ধের শুরু। কান্দাহারের দিকে রওয়ানাকৃত বাহিনী সহজেই কান্দাহার দখল করে নেয়। কিন্তু খাইবার ও করমের দিকে আগত বাহিনীকে কবিলাগুলো কঠিনভাবে মোকাবিলা করে। কিন্তু সর্বশেষ তারা কাবুল দখলে সক্ষম হয়। শের আলি রাশিয়ার দিকে পলায়ন করে এবং সেখানেই সে মৃত্যুবরণ করে। শের আলির ছেলে ইয়াকুব খান ১৮৭৯ সালের ২৬ মে গান্দামাক অঞ্চলে ইংরেজদের সাথে একটি চুক্তি করে, যার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো ছিল:

১. ইয়াকুব খান রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্রিটেনের সাথে যুদ্ধে অংশ নেবে।
২. এই কাজের জন্য ব্রিটেন ইয়াকুবকে বৎসরে ২০ হাজার পাউন্ড দেবে।
৩. যদি রাশিয়া আফগানের ওপর হামলা করে, তাহলে ব্রিটেন তাদের সামরিক সাহায্য পাঠাবে।
৪. দিল্লিতে আফগান দূতাবাস তৈরি করা হবে।

এটি গান্দামাক চুক্তি (Treaty of Gandamak) নামে প্রসিদ্ধ। এই চুক্তির পর ব্রিটেনের এক প্রতিনিধি দল ক্যাভানারির (Sir Pierre Cavagnari) নেতৃত্বে আফগানে পৌঁছায়।

কিন্তু পূর্বের নীতি অনুযায়ী আফগান জাতি নিজেদের ধর্মীয় অবস্থানকে টিকিয়ে রাখার জন্য মোল্লা মেশকে আলমের ডাকে লাব্বাইক বলে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর জন্য বের হয়ে আসে। ১৮৭৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মুজাহিদরা ব্রিটেনের প্রতিনিধি দলকে ঘিরে ফেলে। সেই সময় তাদের সাথে ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের ৭৫ জন সেনা ছিল। মুজাহিদরা এই বাহিনীর মুসলিম সেনাদের আলাদা হওয়ার আদেশ দেয়। কিন্তু হতভাগ্যরা ইংরেজদের নিমকহারামি করতে অস্বীকার করে এবং তাদের সাথে জাহান্নামে চলে যায়। এই হত্যার বদলা নেওয়ার জন্য ১৮৭৯ সালের ২১ অক্টোবর জেনারেল রবার্টসের (Frederick Roberts) নেতৃত্বে করমের পথে ব্রিটেনের বাহিনী কাবুলের ওপর হামলা করে সেখানে প্রবেশ করে। কিন্তু মুজাহিদরা গাজি জান মুহাম্মাদ ওয়ার্দাকের নেতৃত্বে এই বাহিনীর শেরপুর সেনানিবাসকে ঘেরাও দিয়ে ফেলে।

সেই সময়ে মোল্লা মেশকে আলমের চেষ্টায় কান্দাহারের মুজাহিদরাও প্রস্তুত হয়ে যায়। তারা হেরাতের গভর্নর আইয়ুব খানের নেতৃত্বে কান্দাহারে হামলা করে। 'মেওয়ান্দে' আইয়ুব খান ও জেনারেল স্টিওয়ার্ট (Gen Donald Stewart)-এর বাহিনীর মধ্যে ঐতিহাসিক লড়াই হয়। যেখানে আইয়ুব খান কান্দাহার দখল করে সেখানের অধিকাংশ সেনাকে হত্যা ও বন্দী করে। বাধ্য হয়ে রবার্টস কান্দাহারের বাহিনীকে সাহায্যের জন্য কাবুল থেকে সেনা পাঠায়। যাদের সাহায্যে বাকি বাহিনী কান্দাহার থেকে বের হতে সক্ষম হয়। ফলাফল এই দাঁড়ায় যে, ব্রিটেনের কাছে তখন কান্দাহারের যুদ্ধক্ষেত্র এবং কাবুলের যুদ্ধক্ষেত্র সামলানোর জন্য প্রয়োজনীয় বাহিনী ছিল না। তাই তারা আফগান থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়। ইংরেজরা বের হয়ে যাওয়ার পর শের আলির এক আত্মীয় আব্দুর রহমান কাবুলের সিংহাসনে বসে এবং ইংরেজদের সাথে কৃত 'গান্দামাক চুক্তি' অনুযায়ী চলার ওয়াদা করে। ইংরেজ বাহিনীকে আফগান থেকে বের করে দেওয়ার মাধ্যমে দ্বিতীয় আফগান-যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

**ডুরান্ড লাইন (১৮৯৩ খ্রি.)**
দ্বিতীয় আফগান-যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর ইংরেজরা সীমান্তে নিজেদের নিরাপদ মনে করছিল না। একদিকে রাশিয়ার ভয় ও অপরদিকে আফগান কবিলাগুলোর ভয়, যারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। এই অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তারা বেলুচিস্থানের চলমান আক্রমণাত্মক পলিসিকে কাবায়েলি এলাকাতেও ছড়িয়ে দেওয়ার ফয়সালা করে। এই নীতির দুটি লক্ষ্যের মধ্যে একটি লক্ষ্য ছিল আফগান ও পাকিস্তানের মাঝে সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া। এটা বাস্তবায়নের জন্য ১৮৯৩ সালে ইংরেজ প্রতিনিধি স্যার ডুরান্ড ও আফগানের আমির আব্দুর রহমানের মাঝে সীমান্তচুক্তি হয়। এই চুক্তির ফলে আমির আব্দুর রহমান কাবিলাগুলো নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিবর্তে কাবায়েলি এলাকা থেকে আলাদা হয়ে যায়। যার ফলে আফগান ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমানা সর্বদার জন্য অমীমাংসিত থেকে যায়। এই ফয়সালা বাস্তবায়নের জন্য ইংরেজরা কাবায়েলি এলাকাতে সেনা-চৌকি নির্মাণ শুরু করে। কিন্তু কবিলাগুলো এই সমস্ত কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অপছন্দের দৃষ্টিতে দেখছিল এবং মোল্লা পাওয়েন্দার নেতৃত্বে এই চৌকিগুলোর ওপর আক্রমণ শুরু করে। যার ফলে দক্ষিণ কাবায়েলি এলাকায় যুদ্ধে অনেক উত্তপ্ততা চলে আসে।

**মোল্লা পাওয়েন্দার জিহাদি আন্দোলন (দক্ষিণ কাবায়েলি যুদ্ধক্ষেত্র)**
নাম মহিউদ্দিন, তিনি মাসুদ গোত্রের ছিলেন। তিনি ১৮৬৩ সালে দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা বিন্নর এক মাদরাসায় অর্জন করেন। উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি সোয়াত চলে যান এবং সেখানকার আলিমদের সুহবতে থাকেন। অতঃপর সেখানে এক মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে থাকা শুরু করেন। এ ছাড়াও তিনি সেখানে ইলমে দ্বীন শিক্ষা ও তাবলিগে জিহাদের ধারাবাহিক দরস চালু করেন। সেই সাথে সোয়াতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও পূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করেন। যার ফলে একসময় ইংরেজরা তাকে ব্রিটেন সাম্রাজ্যের অধীনে সোয়াতের শাসন ও বাৎসরিক সত্তর হাজার রুপি দেওয়ার লোভ দেখায়; যাতে তিনি যুদ্ধ বন্ধ করে দেন। কিন্তু তিনি তা অস্বীকার করেন। পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে নিজ এলাকা ওয়াজিরিস্তানে চলে আসেন এবং ব্রিটেন বাহিনীর বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করেন। তার সাহসিকতার ফলে তাকে 'ওয়াজিরিস্তানের বাদশাহ' হিসেবে গণ্য করা হতে থাকে। তিনি বলতেন, 'আমি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও মুসলিম-ভূমি রক্ষার জন্য জিহাদ শুরু করেছি। যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে একাই লড়াই চালিয়ে যাব; তবুও ইংরেজদেরকে ওয়াজিরিস্তান থেকে তাড়িয়েই ছাড়ব।' শুরুতে তিনি গোপনে কার্যক্রম শুরু করেন। কিন্তু যখন পাঁচ হাজার সদস্য হয়ে যায়, তখন প্রকাশ্যে জিহাদ শুরু করেন।

১৮৯৬ সালে ইংরেজদের এক গোপন নথিতে পাওয়া যায়, মোল্লা পাওয়েন্দা ছিলেন ওয়াজিরিস্তানের সর্বোচ্চ আলিমদের একজন, যিনি ইংরেজদের জন্য কঠিন সমস্যা তৈরি করেন। তার জিহাদের ফলে সীমান্ত এলাকার দক্ষিণ অংশে ইংরেজদের পেরেশানি বৃদ্ধি পায়। যার ফলে লর্ড কার্জন মোল্লা পাওয়েন্দাকে এক নম্বর বদমাশ ঘোষণা দেয়। ইংরেজরা সর্বদাই তাকে ওয়াফাদারির বদলাস্বরূপ বিভিন্ন ব্যক্তিগত স্বার্থ ও লোভ দেখাত; কিন্তু তিনি কখনো তা গ্রহণ করেননি। পরবর্তী সময়ে ইংরেজরা তার বিরুদ্ধে তেরো জন সাধারণ নাগরিক হত্যাসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ তুলে মামলা করে এবং তার ভূমি দখল করে নেয়।

মৃত্যুর পর তার ব্যাপারে জেনারেল এলিট বলেছিল, 'মোল্লা পাওয়েন্দা ব্রিটেনের সমস্ত চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছিল। নিজ কবিলার দৃষ্টিতে তিনি অবশ্যই সম্মানের উপযুক্ত ছিলেন। স্বতন্ত্র চিন্তা ও দৃঢ় মানসিকতার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে অবৈধ কর্মকাণ্ড করেছিলেন।' মনে রাখতে হবে, তখনকার 'বদমাশ' আজকের সময়ের 'সন্ত্রাসী' উপাধির সমার্থক এবং 'অবৈধ কর্মকাণ্ড' আজকের সময়ের সন্ত্রাসবাদের সমার্থক। তিনি কাবায়েলি এলাকাগুলোতে আলিমদের এক বড় জামাআত তৈরি করেন, যারা সেখানে দ্বীনের ইলম ও জিহাদের শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৯১৩ সালে তিনি মারা যান।

**লর্ড কার্জনের পলিসি**
কাবায়েলি যুদ্ধের চাপে ইংরেজরা কাবায়েলিদের সামনে হাতিয়ার ফেলে দেয়। কিন্তু লর্ড কার্জন হিন্দুস্থানের ভাইসরয় হয়ে আসার পর সে আবার চক্রান্ত শুরু করে। এই চক্রান্তে কবিলাগুলোতে এমন ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয়, যা আজও প্রতিষ্ঠিত। সে ১৯০১ সালে পেশওয়ার, মার্দান, কোহাট ও ডেরা ইসমাইল খানকে পাঞ্জাব থেকে আলাদা করে সীমান্ত প্রদেশের নামে একটি আলাদা অঞ্চল গঠন করে। কবিলাগুলোর স্বাধীন ক্ষমতাকে মেনে নেয় এবং ইংরেজদের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধিকে পলিটিক্যাল এজেন্ট হিসেবে কবিলাগুলোর সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য পাঠানো হয়। এই পলিটিক্যাল এজেন্ট কাওয়ায়েলি মালিকদের সাথে সম্পর্ক রাখত। এভাবেই কাবায়েলি এলাকা ও ইংরেজদের মধ্যে একটি সীমানা তৈরি হয়ে যায়।

**রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মির নতুন গঠন**
দ্বিতীয় আফগান জিহাদের পর ব্রিটেন সাম্রাজ্যে হিন্দুস্থানি বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে অনেক পর্যালোচনা হতে থাকে। তখন বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল রবার্ট একটি রিপোর্ট তৈরি করে। এই রিপোর্টে সে হিন্দুস্থানি বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে পর্যালোচনা করে বলে, 'এই বাহিনী লর্ড ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংস এর থিউরি অনুযায়ী গঠিত হয়েছে। সেই সময় চ্যালেঞ্জ ছিল হিন্দুস্থানকে অভ্যন্তরীণভাবে বিজয়ী করা ও ব্রিটেনের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে তা রক্ষা করা। কিন্তু এখন ব্রিটেনের চ্যালেঞ্জ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদেরকে এখন অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বহিরাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। প্রথম চ্যালেঞ্জ পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে আফগানের দিকে রাশিয়ার অগ্রসরতাকে বাধা দেওয়া এবং দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ সমুদ্রপথ রক্ষা করা, যা ব্রিটেনকে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে সুয়েজ খাল হয়ে হিন্দুস্থান পর্যন্ত নিয়ে আসে। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিকভাবে রাশিয়া ও উসমানিদের পরাজিত করে ব্রিটেনকে সুপার পাওয়ার বানানো। কিন্তু হিন্দুস্থানি বাহিনী এই তিন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় পূর্ণভাবে অক্ষম; তাই রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মিকে নতুনভাবে গঠন করতে হবে।'

রবার্টসের এই পরিকল্পনাকে ব্রিটেন-প্রশাসন অনেক গুরুত্বের সাথে নেয় এবং এই প্ল্যানের ওপর কাজ শুরু করে। শুরুতে ১৮৯৫ সালে হিন্দুস্থানি বাহিনীর একটি নতুন গঠন হয়েছিল। যেখানে মাদ্রাজ, বোম্বাই ও বাঙ্গালের বাহিনীকে হিন্দুস্থানের ওপর রাশিয়ার হামলা প্রতিরোধের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মির আসল প্রতিষ্ঠাতা ছিল লর্ড কিচেনার। ১৯০৩ সালে লর্ড কিচেনারকে হিন্দুস্থানের বাহিনীর কমান্ডার নির্ধারণ করা হয়, যে ছিল মুসলিমদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট দুশমন। সে-ই মাহদি সুদানির আন্দোলনকে দমানোর জন্য সেখানের মুসলিমদের ওপর চরম নির্যাতন চালিয়েছিল, অতঃপর উসমানিদের বিরুদ্ধে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের যুদ্ধমন্ত্রী ছিল। ১৯০৩ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত কিচেনার রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মিকে যেই নতুন গঠন করেছিল, তার গুরুত্ব বোঝার জন্য এটা জানাই যথেষ্ট যে, পাক বাহিনী আজও সেই গঠনেই রয়েছে। হিন্দুস্থানি বাহিনীর এই নতুন গঠনে কিচেনার চারটি মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য সেনাদের যোগ্যতা বৃদ্ধি করে, যার নির্দেশনা জেনারেল রবার্টস তার রিপোর্টে দিয়েছিল। সেই লক্ষ্যগুলো ছিল:

১. দেশের অভ্যন্তরে ল এন্ড অর্ডার প্রতিষ্ঠিত রাখা।
২. হিন্দুস্থানের পশ্চিম সীমান্তকে রাশিয়া ও কাবায়েলি হামলা থেকে নিরাপদ রাখা।
৩. ইউরোপ থেকে হিন্দুস্থান পর্যন্ত সামুদ্রিক রাস্তাকে নিরাপদ করা।
৪. উসমানিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেট গেইম যুদ্ধে ব্রিটেনের পক্ষে সেনা সরবরাহ করা।

এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য সে ইস্ট ইন্ডিয়া আর্মির পুরাতন গঠনকে—যা বাঙ্গাল, মাদ্রাজ ও বোম্বাই বাহিনীর নামে ছিল—বিলুপ্ত করে তিন বাহিনীকে একত্রিত করে ফেলে। অতঃপর এর গঠন নতুন সামরিক সিস্টেম অনুযায়ী ব্যাটালিয়ন, ব্রিগেড ও ডিভিশন হিসেবে সাজিয়ে তোলে। কিচেনার এই বাহিনীকে নয়টা ডিভিশনে ভাগ করে, যার মধ্যে প্রত্যেক ডিভিশনের সাথে একটি ঘোড়-সওয়ার ব্রিগেড ও তিনটি করে পদাতিক ব্রিগেড অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতঃপর হিন্দুস্থানের উত্তর ও দক্ষিণ কমান্ড নামে এই নয় ডিভিশনকে সেই এলাকাগুলোতে ভাগ করে দেওয়া হয়। উত্তর কমান্ডে রাওয়ালপিন্ডি, পেশওয়ার ও কোয়েটাতে একেকটি করে ডিভিশনকে রাখা হয়। দক্ষিণ কমান্ডে মাহোয়া, লক্ষ্ণৌ এবং সিকান্দারাবাদে একটি করে ব্রিগেড রাখা হয়। এই বাহিনীর একটি ডিভিশন বার্মাতেও স্থাপন করা হয়েছিল। সামুদ্রিক রাস্তাকে হিফাজতের জন্য একটি ব্রিগেড ইয়ামানের এডেন বন্দরে রাখা হয়। এদের এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়, যাতে উপযুক্ত সময়ে তারা উসমানিদের বিরুদ্ধে সেনা সাপোর্ট দিতে পারে।

জেনারেল কিচেনারের এই নতুন গঠন শুধু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এখানে সদস্য নির্বাচন ও নিযুক্ত করার ক্ষেত্রেও নতুন সিস্টেম ছিল। যা রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মির মুসলিম নামধারী সেনাদেরকেও এমন বানিয়ে দিয়েছিল যে, তারা ব্রিটেনের সম্মানে যেকোনো মুসলিমশক্তির সাথে টক্কর দিতেও কোনো পরোয়া করত না। এমনকি এই বাহিনীর কার্যক্রমের দ্বারা যদি মুসলিমদের খিলাফত ধ্বংস ও মুসলিম উম্মাহ টুকরা টুকরা হয়ে যায়, তাহলেও তাদের ইমানে কোনো আঁচ লাগবে না। এই বাহিনী বাইতুল মুকাদ্দাসকে মুসলিমদের হাত থেকে ছিনিয়ে খ্রিষ্টানদের হাতে সোপর্দ করে দেওয়ার পরেও নিজেরা এই স্বীকৃতি দেবে যে, আমরা এখনো মুসলিম। এই গোলামির ফলে তারা ব্রিটেন সাম্রাজ্যের বড় থেকে বড় পদে ভূষিত হচ্ছিল, তারপরেও তারা নিজেদের মুসলিম উম্মাহর অংশ মনে করত।

যদিও এটা এক আশ্চর্যজনক বিষয়; কিন্তু এটাই ছিল বাস্তবতা, এমনটাই হয়েছিল এবং আজও এমনটাই হচ্ছে। এই কার্যক্রম ছিল পশ্চিমাদের 'ধর্মহীন যুদ্ধ থিউরির' ফল, যা প্রুশিয়ার জেনারেল ক্লজউইজ খ্রিষ্টানদের যুদ্ধ-বিশ্বাসের মোকাবিলায় ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে পেশ করেছিল। যা পরবর্তী সময়ে পুরো ইউরোপের সমস্ত বাহিনী গ্রহণ করে নেয় এবং আজ পুরো দুনিয়ার সমস্ত স্থানীয় বাহিনীগুলোর সমর-বিশ্বাস এমনটাই। ক্লজউইজের এই সামরিক মতাদর্শ রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মির মূল বিশ্বাস হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং সেই ভিত্তিতে নতুনভাবে সাজানো হয়।

ক্লজউইজের এই যুদ্ধনীতি অনুযায়ী কোনো বাহিনী লড়াই করা ও নিজেদের জান বিলিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা চারটি লক্ষ্যের মাধ্যমে অর্জিত হয়:

১. দেশের ভালোবাসার জন্য,
২. নিজ রেজিমেন্ট বা ব্যাটালিয়নের সম্মানের জন্য,
৩. নিজ পেশার জন্য,
৪. নিজের কোনো বন্ধু বা সাথির জন্য, যাকে ইংরেজিতে (Buddy) বলা হয়।

দেশপ্রেম এমন এক নেশা, যার জন্য মানুষ নিজের জান কুরবান করতে পারে। তেমনিভাবে যেই রেজিমেন্টের প্রাচীন ইতিহাস ও শক্তিশালী ঐতিহ্য আছে, তা সেই সিপাহির জন্য একটি গোত্রের মতো হয়ে যায়; ফলে সেই সিপাহি তার এই কবিলার জন্য জান দিতে প্রস্তুত থাকে। রেজিমেন্টের মর্যাদা দুটি বিষয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়। একটি হচ্ছে রেজিমেন্টের ইতিহাস ও তার ঐতিহ্য। আবার কখনো মানুষ তার পেশা ও দায়িত্বের জন্য জান দিয়ে দেয়। তাই প্রত্যেক সিপাহিকে পেশাদার যোদ্ধা হিসেবে জান দেওয়ার জন্য গড়ে তোলা হয়। এ ছাড়াও মানুষ তার নিজের বন্ধুর জান বাঁচানোর জন্য নিজ জান দিয়ে দিতে পারে।

এটাই ছিল সেই থিউরি, যার ভিত্তিতে জেনারেল কিচেনার রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মিকে প্রশিক্ষিত করে তোলে। তখন হিন্দে মিলিটারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল অষ্টম শ্রেণি থেকেই বাচ্চাদেরকে দেশপ্রেম, রেজিমেন্ট ও বন্ধুদের মাঝে পেশাদার সিপাহির মতো গড়ে তোলা হবে। সেই পরিবেশে পড়াশুনাকারী ক্যাডেট যখন পশ্চিমা সমরনীতি অনুযায়ী গড়ে ওঠে, তখন তাকে মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণে ভর্তি করা হয়। অফিসার হওয়ার পর তার একাডেমিক দক্ষতার ভিত্তিতে সেই রেজিমেন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যার ইতিহাস ও ঐতিহ্য অধিক মজবুত, অর্থাৎ যে ক্যাডেটের দক্ষতা যত বেশি, তাকে তত পুরাতন ইতিহাসসমৃদ্ধ রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই কার্যক্রমের অধীনে ১৯০৭ সালে কোয়েটা শহরে অফিসারদের প্রশিক্ষণের জন্য 'কমান্ড ও স্টাফ কলেজ' প্রতিষ্ঠা করা হয়। এভাবেই তখন সেই বাহিনীর গঠন, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলার এমন সিস্টেম চালু হয়, যার ফলে রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মির মুসলিম সিপাহি এবং অফিসাররাও ভবিষ্যতে উসমানিদেরকে ১লা বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত করে উম্মাহকে টুকরা টুকরা করে বহু রাষ্ট্রে ভাগ করে ফেলতে প্রস্তুত হয়ে ওঠে।

একদিকে মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মিকে নতুনভাবে গঠন করা হচ্ছিল। অন্যদিকে দিল্লি থেকে কিছু দূরে অবস্থিত এক ছোট মাদরাসায় একজন মধ্যবয়সী ও দুর্বল শরীরবিশিষ্ট-কিন্তু গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন আলিমে রব্বানি এই পরিস্থিতিকে খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। হিন্দুস্থান ও পাকিস্তানে নিজেদের গাদ্দারির ফলে মুসলিমদের পতন তার চোখের সামনে ছিল। এই পতনের ফলে ইংরেজদের সেই শক্তি অর্জিত হয়, যার দ্বারা তারা খিলাফতকে ধ্বংসের পরিকল্পনা করছিল। ইউরোপ থেকে উসমানিদের ক্ষমতা বিলুপ্তির জন্য গ্রেট গেইমে ফ্রান্স, ব্রিটেন ও রাশিয়ার গোপন চক্রান্তগুলোও তার সামনে স্পষ্ট ছিল। তার দূরদৃষ্টি এটাও দেখছিল যে, সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এই তিন দুশমন মিলে মুসলিমদের কেন্দ্র খিলাফতকে ধ্বংস করে ফেলবে। তিনি জানতেন, ইতিহাসে পূর্বে যখনই মুসলিমদের ওপর এমন নাজুক পরিস্থিতি এসেছিল, তখন সত্যপন্থী আলিমরা কোনোভাবেই বসে থাকেননি। তাই তিনিও কিছু করে যাওয়ার সংকল্প করেন।

তিনি জানতেন যে, ইংরেজদের মূল পুঁজি ছিল সেই সম্পদ, যা হিন্দুস্থান থেকে লুণ্ঠন করেছিল এবং মূল শক্তি ছিল সেই বাহিনী, যা হিন্দুস্থান থেকে সংগ্রহ করেছিল। হিন্দুস্থান ব্যতীত ইংরেজরা কিছুই করতে সক্ষম নয়। যদি হিন্দুস্থান থেকে ইংরেজদের ক্ষমতা শেষ করে দেওয়া যায়, তাহলে তারা কোনোভাবেই উসমানিদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে পারবে না। সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে তিনি এটাও বুঝেছিলেন যে, মুসলিমদেরকে ব্রিটিশ বাহিনীতে ভর্তি হওয়া থেকে বাধা দিতে হবে। তাদেরকে এই কথা বোঝাতে হবে যে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাথে মিলে লড়াই করা সুস্পষ্ট কুফুরি, ইসলামে যার কোনো সুযোগ নেই। এই চিন্তাগুলোকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য তিনি জিহাদি বৃক্ষের সমস্ত শাখাকে একত্রিত করার প্রয়োজন অনুভব করেন; যাতে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে জিহাদ শুরু হয়। সেই লক্ষ্যেই এই বুজুর্গ মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দ মাদরাসায় নিজ হুজরা থেকে বের হয়ে পুরো হিন্দুস্থানে এক বিশাল আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। যার বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ।

**প্রথম বিশ্বযুদ্ধ**
গ্রেট গেইম তখন তার সফল সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ১৮৫৬ সালের প্যারিস কনফারেন্স থেকে ১৯১২ সালের বলকান যুদ্ধ পর্যন্ত ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া—এই তিন শক্তি মিলে এমন কোনো সুযোগ হাতছাড়া করেনি, যার দ্বারা তারা ইউরোপে উসমানিদের শক্তিকে দুর্বল করতে পারবে। ক্রিমিয়ার যুদ্ধ হোক বা বলকান রাষ্ট্র রক্ষা হোক; উদ্দেশ্য ছিল উসমানিদেরকে ইউরোপ থেকে উৎখাত করা বা দুর্বল করা। ১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী ফার্ডিনান্ড সার্বিয়া সফরে থাকাকালীন আততায়ীর হাতে নিহত হয়। অস্ট্রিয়া তার হত্যাকারীকে গ্রেফতার করে তাদের হাতে হস্তান্তরের দাবি জানায়। অপরদিকে সার্বিয়া ব্রিটেনের সাহায্য আবেদন করে। কয়েক দিনের মধ্যেই ছোট এই বিষয় একটি বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়। ব্রিটেন, রাশিয়া ও ফ্রান্স একজোট হয়ে যায়। অন্যদিকে অস্ট্রিয়া, জার্মানি ও উসমানিরা তাদের বিরোধী জোটে পরিণত হয়। জার্মানি বেলজিয়াম ও ফ্রান্সে হামলা করে। তাদের বাঁধা দেওয়ার জন্য ব্রিটেন ও ফ্রান্স এক যৌথ বাহিনী তৈরি করে। জার্মানি ফ্রান্সে নিজের প্রতিরক্ষা-লাইনকে শক্ত করার জন্য মোর্চা দ্বারা এক প্রতিরোধ-লাইন তৈরি করে। এর বিপরীতে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সও নিজ নিজ প্রতিরক্ষা-মোর্চা তৈরি করে ফেলে। তাই এই যুদ্ধকে মোর্চার যুদ্ধ বা ট্রাঞ্চ ওয়ারও বলা হয়।

অপরদিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের জন্য এটি ছিল এক সোনালি মুহূর্ত, যেখানে তারা উসমানিদের খতম করে উম্মতে মুসলিমার সমস্ত সম্পদ দখল করে নিতে পারবে। সেই সময় কিচেনার ছিল যুদ্ধমন্ত্রী এবং চার্চিল ছিল পরামর্শদাতা ও পরিকল্পনার দায়িত্বে। ব্রিটেন ও ফ্রান্স তুর্কির ওপর সরাসরি হামলা করার ফয়সালা করে। কিন্তু মূল প্রশ্ন ছিল, ব্রিটেনের কাছে কি এত সামরিক শক্তি আছে, যার দ্বারা তারা যুদ্ধে লড়তে পারবে? জি, হ্যাঁ। ব্রিটেনের কাছে পনেরো লক্ষ হিন্দুস্থানি সেনা ছিল, যার অর্ধেকই ছিল মুসলিম। তারা হিন্দু ও শিখদের সাথে মিলে নিজেদের ভাই ও খিলাফতকে খতম করার জন্য ছিল পূর্ণ প্রস্তুত।

**প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হিন্দুস্থান ও রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মির ভূমিকা**
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মিকে এক্সপেডিশনারি ফোর্স বা দ্রুত আক্রমণকারী বাহিনী হিসেবে প্রস্তুত করে :

• ব্রিটেনের প্রথম এক্সপেডিশনারি ফোর্স, যা রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মির লাহোর ও মিরাঠি বাহিনী থেকে গঠিত ছিল। তারা প্রথমে ফ্রান্স যায় এবং সেখানে অনেক ক্ষতির শিকার হওয়ার পর তাদেরকে চতুর্থ এক্সপেডিশনারি ফোর্সের সাথে মিশর পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
• দ্বিতীয় এক্সপেডিশনারি ফোর্স, যা বেঙ্গালোর ব্রিগেড, সিকান্দারাবাদ ডিভিশন ও ইম্পেরিয়াল সোর্স ব্রিগেড থেকে গঠিত হয়েছিল। তাদেরকে পূর্ব আফ্রিকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়; যাতে সেখানের জার্মান বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।
• তৃতীয় এক্সপেডিশনারি ফোর্স, যা ইম্পেরিয়াল সোর্স ও পাঞ্জাব ব্যাটালিয়ন থেকে গঠিত ছিল। তাদেরকে উগান্ডা থেকে মোম্বাসা রেললাইন রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
• চতুর্থ এক্সপেডিশনারি ফোর্স, যা গ্রিস ডিভিশন থেকে গঠিত ছিল। জেনারেল টাউন শেডের নেতৃত্বে তুর্কিদের হাতে পরাজিত হয়। এরপর ছয় ডিভিশন সেনা জেনারেল মোডির নেতৃত্বে সাজানো হয়। যা মিরাঠ ও ইন্ডিয়ান ডিভিশন থেকে গঠিত ছিল। তাদের কাজ ছিল বাগদাদ বিজয় করা।
• পঞ্চম এক্সপেডিশনারি ফোর্স ঘোড়-সওয়ার ডিভিশন, মিরাঠ ও লাহোরের পদাতিক ডিভিশন থেকে গঠিত হয়েছিল, যাদের নেতৃত্ব ছিল জেনারেল এলেনবির হাতে। তাদের লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিন ও শাম বিজয় করা।
• ষষ্ঠ এক্সপেডিশনারি ফোর্স ইন্ডিয়ান ডিভিশন থেকে গঠিত হয়েছিল, তাদের লক্ষ্য ছিল সুয়েজ খালকে রক্ষা করা।
• সপ্তম এক্সপেডিশনারি ফোর্স, যা ২৯তম ইন্ডিয়ান ব্রিগেডের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তারা গ্যালিপলি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মিশর ফিরে আসে।

**তুর্কি দখলে ব্রিটেনের পরিকল্পনা**
১৯১৫ সালে চার্চিল ব্রিটেনের প্রশাসনকে একটি পরিকল্পনাপত্র পাঠায়। যেখানে ব্রিটেনের সামুদ্রিক ও স্থল বাহিনীকে মর্মর সাগরে যৌথ হামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রথমে ব্রিটেনের সামুদ্রিক বহর মর্মর সাগরে হামলা করে ব্রিটিশ সেনাদের সেখানে নামিয়ে দেবে। তারপর মর্মর সাগরে প্রবেশ করে সাগরের অপর প্রান্ত দখল করবে এবং ইস্তাম্বুলকে ব্রিটেনের গোলার অধীনে নিয়ে আসবে। চার্চিলের ধারণা ছিল এর ফলে উসমানি হুকুমত যেকোনো মূল্যে সন্ধি করতে বাধ্য হবে। কিন্তু যুদ্ধমন্ত্রী কিচেনার এই প্ল্যানকে এই বলে বাতিল করে যে, এখন ইউরোপের যেকোনো অঞ্চল থেকে সেনা সরানো অনেক ক্ষতিকর হবে। কিচেনার ও এডমিরাল জন ফিশারের অসম্মতির জবাবে চার্চিল পরামর্শ দেয় যে, যদি এটা সম্ভব না হয়, তাহলে স্থলপথে হামলার পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত বাহিনী দিয়ে শুধু সমুদ্রপথে হামলা করা হবে; তবুও এই লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। কিন্তু জন ফিশার এই প্ল্যানের ব্যাপারেও অসম্মতি জানায়। সেই সময় হঠাৎ উসমানি সামুদ্রিক বাহিনীর একটি তারবার্তা তাদের হাতে পৌঁছায়, যেখানে গোলা-বারুদের কমতির অভিযোগ করে কেন্দ্রের কাছে সাহায্য চাওয়া হয়েছিল। এই তারবার্তা পাওয়ার পর জন ফিশারের কাছে এই প্ল্যানের সফলতার ব্যাপারে বিশ্বাস জন্ম নেয় এবং সে এই প্ল্যান বাস্তবায়নে প্রস্তুত হয়ে যায়।

১৯১৫ সালের ১৫ মার্চ ১৬টি জাহাজের এক বহর এডমিরাল কার্ডনের নেতৃত্ব ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সমুদ্রসীমা ও প্রশান্ত মহাসাগর থেকে তুর্কির দিকে রওয়ানা হয়। হামলার একদিন পূর্বে কার্ডনের মস্তিষ্কে রোগ দেখা দেয়। তাই সে এই হামলার নেতৃত্ব তার সহকারী রোবেকের কাছে হস্তান্তর করে দেয়। ১৮ মার্চ এই বহর তুর্কির উপকূলীয় চৌকিগুলোর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, যেখানে প্রতিরক্ষার জন্য তুর্কি বাহিনী পানিতে মাইন বিছিয়ে রেখেছিল। রোবেক ভালোভাবেই জানত যে, এই মাইনগুলো বিছানো থাকবে। তাই সে সুড়ঙ্গ পরিষ্কারের আদেশ দেয়। সুড়ঙ্গ পরিষ্কারের কাজ শুরুর সাথে সাথে ইতালির একটি জাহাজ মাইনের সাথে টক্কর খেয়ে দুই মিনিটের মাঝে ডুবে যায়। জাহাজের ক্যাপ্টেন নিজেকে কামরায় আবদ্ধ করে ফেলেছিল; যার ফলে সমস্ত প্ল্যান এই জাহাজের সাথেই ডুবে যায়। এ ছাড়া দুটি ব্রিটেনি জাহাজ মাইনের আঘাত লেগে ডুবে যায়। আরও তিনটি জাহাজ—যেখানে ব্রিটেনের একটি ও ফ্রান্সের দুটি ছিল—মাইনের সাথে টক্কর খেয়ে অকেজো হয়ে যায়।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মিত্র বাহিনীর ছয়টি জাহাজ ধ্বংসের ফলে রোবেকের তখন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন হয় যে, সে এই হামলা জারি রাখবে নাকি ফিরে যাবে? সে কমান্ডারের সাথে পরামর্শ করে। সে পরামর্শ দেয় যে, পেছনে ফিরে আসার পূর্বে কিছু সেনা শুকনো ভূমিতে নামিয়ে একদিকের এলাকা দখল করে নেওয়া উচিত। এই প্ল্যানকে তারবার্তার মাধ্যমে লন্ডন পাঠানো হয়। ফলে তাদের এমনটা করার অনুমতি দেওয়া হয়।

চার্চিল পেছনে ফিরে আসার কঠিন বিরোধিতা করে, কেননা ইস্তাম্বুল তখন শুধু কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত ছিল। সে দ্বিতীয়বার হামলার পরামর্শ দেয়; কিন্তু জন ফিশার আবারও হামলা করতে অস্বীকার করে। যার ফলে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের হামলা ব্যর্থ হয়ে যায়।

**তুর্কি বাহিনীর সুয়েজ খাল হামলা**
১৯১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি উসমানিরা সিনাই মরুর দিক থেকে ব্রিটেনের দখলকৃত সুয়েজ খালে হামলার জন্য জামাল পাশার নেতৃত্বে এক বাহিনী পাঠায়। এই খাল ব্রিটেনের জন্য শাহরগের মতো ছিল। এই খালকে ব্রিটেন হিন্দুস্থান থেকে সম্পদ ও সামরিক সাহায্যের চলাচলের জন্য ব্যবহার করত। যদি এই রাস্তাকে দখল করা যেত, তাহলে ব্রিটেন কঠিন আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। জামাল পাশার নেতৃত্বে ১৫ হাজার সেনা সিনাই মরুতে শত মাইল সফর করে সুয়েজ খালের ওপর হামলার জন্য পৌঁছে। ২২ ফেব্রুয়ারি এই বাহিনী হামলা করে। জামাল পাশার মোকাবিলায় সুয়েজ খালের হিফাজতে থাকা বেলুচ রেজিমেন্ট এগিয়ে আসে, যা হিন্দুস্থানের ষষ্ঠ এক্সপেডিশনারি ফোর্স ও ইন্ডিয়ান বাহিনীর অংশ ছিল। ধারাবাহিক হামলা সত্ত্বেও জামাল পাশা সুয়েজ খাল দখল করতে পারেনি। ফলে তাকে পুনরায় মরুর দিকে ফিরে আসতে হয়।

**গ্যালিপলির যুদ্ধ**
জেনারেল কিচেনার প্রথম দিকে মধ্যপ্রাচ্যে বাহিনী প্রেরণের কঠিন বিরোধী ছিল; কিন্তু এখন সে চার্চিলের প্ল্যান অনুযায়ী তুর্কির ওপর সামরিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্ল্যান সমর্থন করে নেয় এবং সেখানে স্থলবাহিনী প্রেরণে প্রস্তুত হয়ে যায়। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ বাহিনী যা অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ফ্রান্সের বাহিনী থেকে গঠিত ছিল, মর্মর সাগরের পশ্চিম কিনার গ্যালিপলির ওপর হামলার জন্য জাহাজে সওয়ার হয়। এই বাহিনীর কমান্ডার ছিল জেনারেল হ্যামিলটন। তার কাছে এই আদেশ আসে যে, গ্যালিপলি দখলের পর সে ইস্তাম্বুল দখল করে নেবে। লন্ডনে বসে ব্রিটিশ কমান্ডাররা কয়েক দিনের মধ্যে বড় এক বিজয়ের অপেক্ষা করছিল। ১৯১৫ সালের ২৫ এপ্রিল ৮০ হাজারের ব্রিটিশ বাহিনী এনজ্যাক কোভ (Anzac Cove) ও ক্যাপ হেলেস (Cape Helles)-এ অবতরণ করে। অন্যদিকে ফ্রান্সের বাহিনী (Kum Kale) কোমকেলিতে অবতরণ করে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বাহিনী-যাদেরকে এনজ্যাক বলা হয়, তারা কাঙ্ক্ষিত স্থান থেকে এক মাইল দূরে অবতরণ করে। যার ফলে তারা সেখানে ধারণার বিপরীত সমতল ভূমির পরিবর্তে পাহাড়ি ভূমির মুখোমুখি হয়। উঁচু ভূমির অবস্থা এমন ছিল, যা তাদের যুদ্ধক্ষেত্রগুলোকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে রেখেছিল।

এনজ্যাক বাহিনী হামলা করে বসে। সেখানের কমান্ডার ছিল কর্নেল মুস্তফা কামাল ও তার সাথে ছিল তুর্কি এক ডিভিশন সেনা। হামলা এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে, কামাল তার ঊর্ধ্বতন কমান্ডার থেকে কোনো আদেশ আনার সময় পায়নি। কিন্তু তাকে তো কিছু করতে হবে! তুর্কি বাহিনী আপন জায়গা ছেড়ে পিছপা হওয়া শুরু করে; কিন্তু সে তাদের স্থির থাকার আদেশ দেয় এবং নিজেই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ফয়সালা করে। সেই সময় হঠাৎ কামাল শক্তিশালী বাহিনীর সাহায্য পেয়ে যায় এবং ফলে সে এনজ্যাকদের হামলা প্রতিহত করে দেয়।

অপরদিকে হেলেস উপকূলে ব্রিটেনের বাহিনী দিনের আলোতে হামলা করে। তাদের দুই ব্যাটালিয়ন সেনা জাহাজ থেকে অবতরণ করেছিল, তাদের অধিকাংশই উপকূলে পৌঁছার পূর্বেই তুর্কিদের গোলার আঘাতে ধ্বংস হয়ে যায়। ব্রিটেনের এক বৈমানিক, যে সেই এলাকা দিয়ে বিমান উড়াচ্ছিল, সে রিপোর্ট পাঠায় যে, উপকূল থেকে ৫০ গজ পর্যন্ত সমুদ্রের পানি রক্তে লাল হয়ে গেছে। রাতের অন্ধকারে তাদের আক্রমণের সুযোগ ছিল; কিন্তু জোট বাহিনী কোনো লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থান তুর্কিদের হাতে ছিল। এই অবস্থায় তিন সপ্তাহ পার হয়ে যায়। তুর্কিরা এনজ্যাক বাহিনীকে উপকূলের দিকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য হামলা করে। কিন্তু তারা এতে ব্যর্থ হয়। তখন এই যুদ্ধের সাধারণ বিষয় হয়ে গিয়েছিল যে, ব্রিটেন অনেক কষ্টে সামরিক কোনো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখলের কিছু দিন পরেই তুর্কি হামলা করে তা ফিরিয়ে নিত। এভাবেই লড়াই চলতে থাকে।

১৯১৫ সালের ৬ আগস্ট ব্রিটেনের বাহিনী এনজ্যাক কোভের উত্তরে অবস্থিত সুভেলা বের ওপর শক্তিশালী বাহিনী দ্বারা হামলা করে। যদিও এই হামলা অনেক দ্রুত করা হয়েছিল; কিন্তু তারপরেও এই হামলা ব্যর্থ হয়। কিছুদিন পর মুস্তফা কামালের নেতৃত্বে তুর্কিরা সুভেলা বের ওপর হামলা করে ব্রিটিশ বাহিনীকে আধা মাইল সমুদ্রের ভেতর ঠেলে দেয়। তুর্কিরা আরও একবার সামরিক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো দখল করে নেয়। ব্রিটিশ বাহিনী সংখ্যায় তাদের থেকে কয়েক গুণ কম সেনাবাহিনীর হাতে বারবার পরাজিত হচ্ছিল। গরমের মৌসুম পার হয়ে গিয়েছিল এবং শীতের মৌসুম চলে আসছিল। কিন্তু গ্যালিপলির ময়দান তখনও গরম ছিল। তুর্কিরা সামরিক গুরুত্বপূর্ণ সকল স্থান এমনভাবে দখল করে রেখেছিল, যেমনভাবে শুরু থেকেই ছিল। ব্রিটিশ বাহিনীতে অসুস্থতা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সেনাদের মধ্যে আমাশয় ও ডায়রিয়া রোগ অনেক বেড়ে যায়। হিন্দুস্থান থেকে আসা ৭ম এক্সপেডিশনারি ফোর্সকে গ্যালিপলিতে পাঠানো হয়েছিল; যাতে তারা সেখানে ফেঁসে যাওয়া বাহিনীর সাহায্য করতে সক্ষম হয়। কিন্তু এই বাহিনীকে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার পর মিশর পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

১৯১৫ সালের পহেলা অক্টোবর লন্ডনে যুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে হ্যামিলটনের কাছে পেছনে ফিরে আসার ব্যাপারে পরামর্শ চাওয়া হয়। তখন সে জবাব দেয়, পেছনে ফিরে আসা এতটাই ভয়ানক হবে যে, এর ফলে অর্ধেক বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাবে। কয়েক দিন পর হ্যামিলটনের জায়গায় চার্লসকে নতুন কমান্ডার নির্ধারণ করা হয়। সে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট পাঠায়, এই বাহিনী লড়াইয়ের উপযুক্ত নেই এবং তাদেরকে এখনই যুদ্ধ থেকে বের করে আনতে হবে। নভেম্বরে যুদ্ধমন্ত্রী স্বয়ং ময়দান পরিদর্শন করে পিছপা হওয়ার আদেশ জারি করে। ডিসেম্বরে ব্রিটিশ বাহিনী সামুদ্রিক জাহাজের মাধ্যমে পেছনে ফিরে আসার জন্য সওয়ার হওয়া শুরু হয়। এই পরাজয়ের পর চার্চিলকে সাজা হিসেবে সাধারণ সেনা বানিয়ে দেওয়া হয়।

**ইরাকে ব্রিটেনের প্রথম হামলা**
অপরদিকে ব্রিটিশ বাহিনী ১৯১৫ সালের এপ্রিলে জেনারেল টাউন শেডের নেতৃত্বে দজলার পাশ দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। উদ্দেশ্য ছিল ইরাকের তেলক্ষেত্র দখল করা। মে মাস পর্যন্ত তারা তুর্কিদেরকে নদীর অপর পাশে আটকিয়ে রাখে। জেনারেল জন নিক্সন, যে জেনারেল টাউন শেডের কমান্ডার ছিল, সে সেনা কম হওয়া সত্ত্বেও টাউন শেডের কাছ থেকে অধিক বিজয়ের আশায় চাপ দিতে থাকে। তার দাবি ছিল, বছরের শেষ পর্যন্ত বাগদাদ বিজয় করে নেওয়া যাবে। সেপ্টেম্বরে টাউন শেডের বাহিনী 'কুতুল ইমারা'র ওপর হামলা করে এবং সন্ধ্যার পূর্বেই শহর বিজয় করে নেয়। টাউন শেডের সাথে হিন্দুস্থান থেকে আসা ৪র্থ এক্সপেডিশনারি বাহিনীও ছিল। জেনারেল নিক্সন শুধু এতটুকু বিজয়ে আশ্বস্ত হয়নি, সে আরও অধিক সামনে আগানোর জন্য চাপ দেয়। ফলে টাউন শেড ১১ হাজার সেনা নিয়ে টিজেফন আর্চের দিকে এগিয়ে যায়।

টিজেফন শহরে নুরুদ্দিন পাশার নেতৃত্বে ২০ হাজার তুর্কি সেনা তার মোকাবিলা করে। টিজেফনের লড়াই চার দিন ও চার রাত চলমান থাকে; কিন্তু জেনারেল টাউন শেড তুর্কিদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়ে কুতুল ইমারাতে ফিরে আসে। তুর্কি বাহিনী তাদের পিছু ধাওয়া করে চার দিন পর কুতুল ইমারা অবরোধ করে নেয়। টাউন শেডের কাছে অস্ত্র ও রসদের ভান্ডার ছিল; তাই সে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ফয়সালা করে। ইরাকের কুতুল ইমারা অঞ্চলে টাউন শেডের তেরো হাজার সেনা তুর্কিদের ঘেরাওয়ে ছিল। তুর্কিরা এক শক্তিশালী সামরিক বাহিনী কুতুল ইমারার জন্য একত্রিত করেছিল। সেই সময় ইস্তাম্বুল থেকে জার্মানির ফিল্ড মার্শাল ভন ডার গোল্টস গল (Colmar von der Goltz) ইরাকে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নেতৃত্বের জন্য পৌঁছায়। তার কর্মপদ্ধতি ছিল, শত্রুকে অবরোধ করে তাদেরকে হাতিয়ার ফেলে দিতে বাধ্য করা। তাই তারা ব্রিটেনের বাহিনীর ওপর অবরোধ কঠিন করতে থাকে।

জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এফ.জে.এলমারের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী বাইর থেকে তুর্কিদের অবরোধকে ভেঙে দেওয়ার জন্য কঠিন আক্রমণ চালায়। কিন্তু তাদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এই সময় টাউন শেডের অবরুদ্ধ বাহিনীর কাছে রসদ ও অস্ত্রের ভান্ডার খতম হওয়া শুরু করে। জেনারেল এলমার দজলার নদীপথে নৌকার মাধ্যমে রসদ পৌছানোর চেষ্টা করে। চাঁদনি রাতে একটি নৌকা দজলাতে রওয়ানা হয়; কিন্তু এটি খুব দ্রুতই নদীতে থাকা তুর্কিদের হাতে আটক হয়ে যায়। স্পষ্ট পরাজয়ের প্রভাব দেখে ১৯১৫ সালের ২৭ এপ্রিলে ব্রিটিশ বাহিনী তাদের তোপগুলো ধ্বংস করা শুরু করে; যাতে তা তুর্কিদের হস্তগত না হয়।

২৯ এপ্রিল তেরো হাজার ব্রিটিশ ও হিন্দুস্থানি বাহিনী তাদের কমান্ডারসহ তুর্কিদের সামনে হাতিয়ার ফেলে দেয়। এই যুদ্ধে ব্রিটেনের ক্ষতি অনুমানের জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে, টাউন শেডের তেরো হাজার বাহিনীকে বন্দী করা ছাড়াও অবরোধকে ভাঙার চেষ্টায় এলমারের ২৩ হাজার সেনা নিহত হয়। এই যুদ্ধের ফলে ব্রিটেনে মাতম শুরু হয়ে যায়। অপরদিকে তুর্কিরা দজলার কিনারে নিজেদের পজিশন দৃঢ় করতে থাকে। কেননা, তারা জানত অবশ্যই ব্রিটিশ বাহিনী বাগদাদ বিজয়ের জন্য আবারও চেষ্টা করবে।

**ইরাকে ব্রিটেনের দ্বিতীয় হামলা**
গ্যালিপলি ও কুতুল ইমারার পরাজয় ব্রিটেনের জনগণকে প্রধানমন্ত্রী হার্বার্ডের বিরোধী বানিয়ে দিয়েছিল। ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনে জনগণ ডেভিড জর্জকে প্রধানমন্ত্রী বানায়। জর্জ ছিল মুসলিমদের কঠিন শত্রু। সে উসমানিদের ধ্বংস করাকে নিজের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেয়। ইরাকের পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্রিটেনের যুদ্ধ-মন্ত্রণালয় ব্রিটেনের বাহিনীকে নতুনভাবে সজ্জিত করে এবং জেনারেল 'পার্সিলেক'কে ইরাকের যুদ্ধক্ষেত্রে কমান্ডার নির্ধারণ করে। পার্সিলেকের এক লক্ষের বাহিনীর দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য ছিল হিন্দুস্থানি সেনা। সে জেনারেল স্টেনলে মোডিকে বাগদাদ বিজয়ের আদেশ দেয়। মোডির সাথে হিন্দুস্থানে ৪র্থ এক্সপেডিশনারি ফোর্স ছিল। এই বাহিনী ষষ্ঠ ইন্ডিয়ান ডিভিশন থেকে গঠিত ছিল। ১৯১৭ সালের জানুয়ারিতে তারা কুতুল ইমারা হামলা করে অবরোধ করে নেয়। তুর্কিরা বাগদাদের দিকে পিছপা হয়ে যায়। যার ফলে ব্রিটেনের বাহিনী দ্বিতীয়বার কুতুল ইমারা দখল করে নেয়। মোডি তুর্কিদের পিছু ধাওয়া করে এবং তাদেরকে বাগদাদের উত্তর দিকে নিয়ে যায়। যার ফলে বাগদাদের প্রতিরক্ষা ভেঙে যায়। ১১ মার্চ মোডি কোনো ধরনের যুদ্ধ ছাড়াই বাগদাদ দখল করে নেয়।

**উসমানিদের রাশিয়ান যুদ্ধক্ষেত্র**
১৯১৪ সালের ডিসেম্বরে উসমানি বাহিনী ককেশাসের দিকে আগানো শুরু করে, যা আগ থেকেই রাশিয়া দখল করে রেখেছিল। তুর্কিরা চাচ্ছিল রাশিয়াকে সেখান থেকে হটিয়ে দেবে। কিন্তু বরফাবৃত অঞ্চলে তুর্কিদের অবস্থা অনেক নাজুক হয়ে যায়। ১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে তুর্কিরা অগণিত লাশ পেছনে ফেলে পিছু হটে আসে। ফলে ককেশাস অঞ্চল রাশিয়ানদের জন্য নিরাপদ ও উসমানিদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে যায়। ১৯১৫ সালের মে মাসে রাশিয়া এরজুরাম শহরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। সেখানে জেনারেল নিকোলাই এর আশি হাজারের সেনাবাহিনী ভান শহর বিজয়ের পর মাশ শহরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় ৮৫ হাজার তুর্কি সেনা প্রতিরোধ করে। কিন্তু তাদের কাছে অস্ত্র ও রসদের ভান্ডার অনেক কম ছিল। এই যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত-মুহূর্তে অস্ত্র ও রসদ পৌঁছানো অনেক কঠিন ছিল। কেননা সড়ক ও রেললাইনগুলো অপূর্ণাঙ্গ ছিল। ইরাক থেকে গ্যালিপলি পর্যন্ত বাহিনী যাওয়া তো সহজ ছিল; কিন্তু গ্যালিপলি থেকে পূর্ব যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত পৌছার জন্য ৬-৮ সপ্তাহ লাগত। এত বিপদ সত্ত্বেও তুর্কিরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠিন আক্রমণ চালায় এবং তাদের বিজিত এলাকাগুলো ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

এই যুদ্ধে দুই পক্ষেরই জান ও সম্পদের অনেক বেশি ক্ষতি হয়। এই অবস্থা দেখে রাশিয়ার জার ১৯১৫ সালে ককেশাস যুদ্ধক্ষেত্রে নিজ চাচা গ্রান্ড ডিউক নিকোলাসকে পাঠায়। যুদ্ধের অবস্থা দেখে সে এক বছর পর্যন্ত যুদ্ধ না করার আদেশ দেয়। এই সময় সে পরবর্তী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকে। ১৯১৬ সালে সে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ শুরু করে এবং তুর্কিদের আস্তে আস্তে পরাজিত করে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। তুর্কিরা পিছু হটে এরজুরাম কেল্লাতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ১৯১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এরজুরাম কেল্লাও তুর্কিদের হাত থেকে ছুটে যায়। এরজুরাম কেল্লার পতন ছিল তুর্কিদের জন্য অনেক বড় ধাক্কা। এই খবর কয়েক মাস পর্যন্ত সুলতানকেও জানানো হয়নি। আগস্ট পর্যন্ত এই বাহিনী উসমানিদের অনেক এলাকা দখলে নিয়ে নেয়। এই যুদ্ধে তুর্কির দ্বিতীয় ও তৃতীয় বাহিনী রাশিয়ার হাতে অনেক আর্থিক ও দৈহিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

**তাহরিকে শাইখুল হিন্দ**
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একদিকে ফ্রান্স, রাশিয়া ও ব্রিটেন মিলে উসমানিদের পতনের চক্রান্ত করছিল। তখন অপরদিকে শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান হিন্দুস্থানে ইংরেজ বাহিনীর ওপর কঠিন হামলার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। তিনি জানতেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের শক্তির উৎস হিন্দুস্থান। তাই তার পরিকল্পনা ছিল আফগান শাসক ও কাবায়েলি জনগণকে সাথে নিয়ে জিহাদ করে হিন্দুস্থান থেকে ইংরেজদের হুকুমত খতম করে দেবেন। যদি হিন্দুস্থানে ব্রিটেন পরাজিত হয়, তাহলে তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানিদের বিরুদ্ধে টিকতে পারবে না। এই পরিকল্পনা সফলতা লাভের জন্য আবশ্যক ছিল-প্রথমত, উসমানিদের কাছ থেকে ফতোয়া বা অনুমতিনামা এনে আফগান আমির হাবিবুল্লাহকে জিহাদের জন্য বের হতে বলা। দ্বিতীয়ত, কাবায়েলি উলামা ও মুজাহিদদের জিহাদের জন্য প্রস্তুত করা। তৃতীয়ত, হিন্দুস্থানের বাহিনীতে থাকা মুসলিম সেনাদেরকে এই কথা জানানো যে, ইংরেজদের সাথে মিলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করা কুফুরি। এই ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি সরাসরি কাফির ও জাহান্নামি।

মুজাহিদ ও কাবায়েলিদের মাঝে যেই সম্পর্ক ছিল, তার ফলে তারা সবাই প্রস্তুত ছিল। এভাবে শাইখুল হিন্দের আন্দোলনের মধ্যে জিহাদি বৃক্ষের সমস্ত শাখা একত্রিত হয়ে যায়। উত্তর কাবায়েল, বাজুর, মেহমান্দ ও আফ্রিদি এলাকা হাজি সাহেব তারাংজায়ির নেতৃত্বে এবং দক্ষিণ কাবায়েল ওয়াজিরিস্তানের শাহজাদা ফজলুদ্দিনের নেতৃত্বে একত্রিত ছিল। ১৯১৫ সালে শাইখুল হিন্দ মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধিকে আমির হাবিবুল্লাহর কাছে পাঠান এবং নিজে হিজাজের গভর্নর গালিব পাশার সাথে সাক্ষাতের জন্য মক্কার দিকে রওয়ানা হন। যাতে উসমানিদের পক্ষ থেকে জিহাদ শুরু করার অনুমতি অর্জন করা যায়।

মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধি ১৯১৫ সালের অক্টোবরে কাবুল পৌঁছান এবং আফগান আমির হাবিবুল্লাহকে হিন্দুস্থানে জিহাদের আহ্বান জানান। আমির হাবিবুল্লাহ ছিল ইংরেজদের রক্ষাকারী। কিন্তু সে তা প্রকাশ করতে পারত না। কেননা তার ভাই ও নায়িবে আমির নাসরুল্লাহ ইংরেজ-বিরোধী ছিল এবং আফগানের পুরো জাতি ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য প্রস্তুত ছিল। আমির হাবিবুল্লাহ যখন এই কাজের জন্য আহলে শুরার পরামর্শ চায়, তখন সমস্ত সদস্য জিহাদের পক্ষে রায় দেয়; ফলে হাবিবুল্লাহর সামনে সমর্থন করা ছাড়া কোনো পথ অবশিষ্ট থাকেনি।

হাবিবুল্লাহ তার দুটি চেহারা বানিয়ে নিয়েছিল। একটি ইংরেজদের দেখানোর জন্য, যা ছিল তার আসল চেহারা; দ্বিতীয়টি জিহাদি চেহারা, যা জনগণ ও মুজাহিদদের দেখানোর জন্য। সে ইংরেজদের কাছে এই কথা স্পষ্ট করেছিল যে, সে জনগণ ও মুজাহিদদেরকে বাধা দিতে পারবে না। কেননা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে সবাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য তৈরি ছিল। কিন্তু সে ইংরেজদের এতটুকু গোলামি করতে সক্ষম ছিল যে, জনগণ ও মুজাহিদদের এই কার্যক্রমকে ধীর করে দেবে বা তাদের পথে বাধা তৈরি করবে যাতে ইংরেজদের উসমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কোনো সমস্যা না হয়। ইংরেজরা তার এই চক্রান্তের সাথে সহমত পোষণ করে। হাবিবুল্লাহ সরাসরি জিহাদের বিরোধিতা না করে বলে, 'জিহাদের জন্য আমির ও বাইআতের প্রয়োজন। তাই যারাই জিহাদ করতে চায়, তারা যেন আমির নাসরুল্লাহর কাছে দরখাস্ত করে।' অপরদিকে সে বাহানা বানায় যে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে আক্রমণের ভয় রয়েছে, যা থেকে নিশ্চিন্ত হওয়া ব্যতীত ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ সম্ভব নয়। হাবিবুল্লাহর এই বাহানায় আফগান জনগণ প্রভাবিত হয়ে যায়। কিন্তু কাবায়েলি এলাকাতে জিহাদের আগুন প্রজ্বলিত হতে থাকে। শাহজাদা ফজলুদ্দিন ও হাজি সাহেব তারাংজায়ি ময়দানে নেমে আসার জন্য কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন।

যখন শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান গালিব পাশা থেকে আফগান, কাবায়েলি ও হিন্দুস্থানের মুসলিমদের নামে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের অনুমতি এবং ফতোয়া নিয়ে হিন্দুস্থানের দিকে রওয়ানা হন, তখন হিজাজে শরিফ হুসাইনের বিদ্রোহ শুরু হয়ে গিয়েছিল। শরিফ হুসাইন শাইখুল হিন্দ, মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানি ও তাদের সাথিদের গ্রেফতার করে ইংরেজদের হাতে সোপর্দ করে দেয়। ইংরেজরা তাদেরকে মাল্টার দ্বীপে পাঠিয়ে দেয়। সেখান থেকে তারা ১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মুক্তি পান। মুক্তির কয়েক মাস পরেই শাইখুল হিন্দ ইনতিকাল করেন। শাইখুল হিন্দের গ্রেফতারির ফলে জিহাদি আন্দোলনের বিশাল ক্ষতি হয়েছিল এবং এই কার্যক্রম ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার কার্যক্রম হিন্দুস্থান ও আফগানে বিশাল প্রভাব ফেলেছিল। যার আলোচনা আমরা উপযুক্ত স্থানে করব।

**ফিলিস্তিনে ব্রিটেনের হামলা**
গ্যালিপলি ও কুতুল ইমারাতে (উসমানিদের) কঠিন পরাজয়ের পর ব্রিটিশ বাহিনী পরিকল্পনা করে যে, তারা এখন মিশর থেকে গিয়ে ফিলিস্তিনে হামলা করবে। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল জেনারেল আর্চিবাল্ড মোডির হাতে। এই হামলার পূর্বে জেনারেল মোডি হাজারো সেনা ও মিশরি শ্রমিকের সাহায্যে এক ফুট প্রস্থ পানির পাইপলাইন বিছায় এবং তার সাথে সাথে রেললাইন বিছানোর কাজ শুরু করে। এই সব কাজ জেনারেল মোডি ছয় মাসে শেষ করে। যার ফলে ব্রিটিশ বাহিনী যুদ্ধের জন্য পূর্ণভাবে প্রস্তুত হয়ে যায়। উসমানিদের চতুর্থ বাহিনী ব্রিটেনের এই হামলাকে বাধা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। জেনারেল মোডির সাথে হিন্দুস্থানি পঞ্চম এক্সপেডিশনারি ফোর্সও ছিল। এই বাহিনী আজকের পাকিস্তানের ঘোড়-সওয়ার রেজিমেন্টের অন্তর্ভুক্ত।

**গাজার প্রথম লড়াই**
জেনারেল মোডি গাজা দখলের সিদ্ধান্ত নেয়। সে জেনারেল চার্লস ডোবেলকে আদেশ দেয়, যাতে গাজার ওপর হামলা করে। ডোবেলের কাছে উপযুক্ত সামরিক শক্তি ছিল। বিশেষ করে তার সাথে মরুতে যুদ্ধের সক্ষমতা রাখে এমন ঘোড়-সওয়ার বাহিনী ছিল। কিন্তু এই ঘোড়-সওয়ার বাহিনীর সাথে দশ হাজার ঘোড়াও ছিল, যেগুলোর পান করার জন্য পানির দরকার ছিল। আর পানির ভান্ডার ছিল গাজায়। তাই তার পরিকল্পনার সফলতা গাজার পানির উৎসগুলোর সাথে সম্পৃক্ত ছিল। ১৯১৭ সালে বসন্তের মৌসুমের শুরুতে জেনারেল মোডি নিজ বাহিনীর বড় অংশ গাজা বিজয়ের জন্য পাঠায়। উসমানিরাও শিবা লেক থেকে গাজা পর্যন্ত প্রতিরক্ষা-মোর্চা তৈরি করে। ব্রিটিশ বাহিনী এই প্রতিরক্ষা-লাইনকে ভাঙার চেষ্টায় যুদ্ধের একসময় গাজাকে পূর্ণভাবে অবরোধ করে নেয়। তখন উসমানি বাহিনী গাজা থেকে বের হয়ে ব্রিটেনের ঘোড়-সওয়ার বাহিনীর ওপর আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসে; কিন্তু জেনারেল মোডি তাদের নিয়ে পেছনে ফিরে আসে। ঘোড়সওয়ার বাহিনীর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়ে ব্রিটিশ পদাতিক বাহিনী তুর্কি বাহিনীর হামলায় পিছপা হতে বাধ্য হয়।

**গাজার দ্বিতীয় লড়াই**
১৯১৮ সালের ১৭ এপ্রিল জেনারেল মোডি গাজার ওপর দ্বিতীয় হামলা করে, যার জবাবে তুর্কি বাহিনী কঠিনভাবে লড়াই করে। তাদের বাহিনী এক মোর্চা থেকে অপর মোর্চাতে ছোটাছুটি করে যুদ্ধ করে এবং ইংরেজদের হামলাকে ব্যর্থ করে দেয়। তুর্কিদের এই জবাবি হামলার ফলে ব্রিটেনের বাহিনী পিছপা হতে বাধ্য হয়। এই ব্যর্থতার ফলে জেনারেল মোডিকে পরিবর্তন করে ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে জেনারেল এলেনবিকে এই যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। এলেনবি পুরো গরমকাল যুদ্ধপ্রস্তুতির মধ্যে ব্যস্ত থাকে।

**গাজার তৃতীয় লড়াই**
১৯১৭ সালে অক্টোবর মাসে এলেনবি গাজার ওপর তৃতীয় হামলা করে। ১৯১৭ সালের ৩১ অক্টোবর ব্রিটিশ বাহিনী গাজায় পৌঁছে যায়। এই বাহিনী একই সাথে গাজা ও শিবাহ লেকের ওপর হামলা করে। এলেনবির পরিকল্পনা ছিল দুই দিকে তুর্কিদের ব্যস্ত রেখে প্রথমে শিবাহ লেক দখল করে নেবে। অতঃপর দুই শক্তি একত্রিত করে গাজা দখল করে নেবে। তার এই প্ল্যান সফল হয়েছিল এবং শিবাহ লেক বিজয় হয়ে যায়। কিন্তু তারা যখন গাজার ওপর হামলা করে, তখন তুর্কি বাহিনী চরম সাহসিকতার দৃষ্টান্ত পেশ করে। গাজার মুজাহিদরা নয় মাস সর্বোচ্চ বাহাদুরির সাথে তাদের থেকে কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী বাহিনীর মোকাবিলা করে। সর্বশেষে রসদ ও অস্ত্রের কমতির ফলে তারা পিছপা হতে বাধ্য হয়। যার ফলে গাজা ব্রিটেনের দখলে চলে যায়।

এলেনবির মূল লক্ষ্য ছিল বাইতুল মুকাদ্দাস, যা মুসলিমদের প্রথম কিবলা ও সুলতান সালাহুদ্দিনের সময় থেকে তখন পর্যন্ত ৭৪০ বছর মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ব্রিটেনের কট্টর প্রধানমন্ত্রী লর্ড জর্জ এলেনবিকে আদেশ দেয়, যেন জেরুজালেমকে যেকোনো মূল্যে খ্রিষ্টানদের 'বড় দিন' আসার পূর্বেই বিজয় করে নেয়—যাতে জাতিকে ইদে এই সুসংবাদ দিতে পারে। খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকরা লিখে, এই যুদ্ধ মূলত ক্রুসেড যুদ্ধ ছিল। কিন্তু যেহেতু এলেনবির সাথে হিন্দুস্থান থেকে আসা মুসলিম সেনারাও ছিল, তাই সে এই যুদ্ধকে ক্রুসেড যুদ্ধ বলা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু খ্রিষ্টান সেনারা এটাকে ক্রুসেড যুদ্ধই মনে করত। ১৯১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর এলেনবি বাইতুল মুকাদ্দাসে হামলা করে, যেখানে মাত্র ১৫ হাজার তুর্কি সেনা তাদের থেকে কয়েক গুণ বড় বাহিনীর মোকাবিলা করে। কিন্তু তারা দ্রুতই পরাজিত হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। যার ফলে উসমানিদের চারশ বছরের ক্ষমতা শেষ হয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস খ্রিষ্টানদের হাতে চলে যায়। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)

**মুসলিম উম্মাহর গাদ্দার**
এই পরাজয়ের পরেও ব্রিটেন এবং তার মিত্ররা জানত যে, মুসলিমদের মধ্যে তখনও এতটুকু শক্তি ছিল যে, তারা যেকোনো মুহূর্তে আবার উঠে দাঁড়িয়ে নিজেদের দখলকৃত জায়গাগুলো ফিরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা রাখে। ঠিক সেই সময় ব্রিটেন ও তাদের মিত্র-শক্তিরা তিনটি বড় ধাক্কা খায়।

প্রথমটি ছিল রাশিয়া, যেখানে জারদের হুকুমত ছিল এবং যে ব্রিটেনের মিত্রও ছিল। সেখানে হঠাৎ সমাজতন্ত্রের বিপ্লব শুরু হয়। এই বিপ্লবের নেতৃত্ব ছিল ভ্লাদিমির লেনিনের হাতে। সে ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে জার্মানি ও উসমানিদের সাথে নিরাপত্তা-চুক্তি করে নেয়। যার ফলে এই দুই রাষ্ট্র বড় এক শত্রুর হাত থেকে পূর্ণভাবে মুক্ত হয়ে তাদের সমস্ত শক্তি ব্রিটেন ও ফ্রান্সের দিকে নিবদ্ধ করে।

দ্বিতীয়টি ছিল আমেরিকা, যারা যুদ্ধে ব্রিটেনের সাথে মিলিত হওয়ার ওয়াদা করেছিল; কিন্তু তারা তখনও পর্যন্ত যুদ্ধে অবতরণ করেনি।

তৃতীয়টি ছিল, তারা জানতে পারে যে, জার্মানি ১৯১৮ সালে ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে বড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই তিনটি ধাক্কা সামাল দেওয়ার জন্য ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এলেনবিকে আদেশ দেয়; যাতে সে তার সব অতিরিক্ত অস্ত্র ও সেনা এই মুহূর্তে ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেয়। যার ফলে এলেনবি এশিয়াতে তার বিজয়ের ধারা জারি রাখার সক্ষমতা হারিয়ে
ফেলে। কারণ ধারাবাহিকতা জারি রাখার জন্য তার সেনা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ব্রিটেনের অধিকাংশ সেনা তখন ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যস্ত ছিল। এলেনবি বিজয়কে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি কৌশল অবলম্বন করে এবং মুসলিমদের মধ্য থেকেই গাদ্দার তৈরি করার চেষ্টা করে।

'শরিফ হুসাইন' ছিল হিজাজের কাবায়েলি সর্দার ও আরব জাতীয়তাবাদের আহ্বায়ক। ব্রিটেনের গোপন এজেন্সি তার সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে এবং সে এই শর্তে ব্রিটেনের সাথে অংশ নিতে প্রস্তুত হয় যে, যুদ্ধের পর ব্রিটেন আরবদের জন্য আলাদা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে। ব্রিটেন সমর্থন প্রকাশ করে; যদিও এই সবই ছিল মিথ্যা। ব্রিটেন শুধুই উসমানিদেরকে পতনের চক্রান্তে লিপ্ত ছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত ছিল। সেনা-ঘাটতির ফলে তখন কিছু সময়ের জন্য আরব কাবিলাগুলোর সাহায্য প্রয়োজন ছিল। আরব কবিলাগুলোকে এই এই মিথ্যা আশ্বাসে উসমানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। যেহেতু তাদের কাছে কোনো সুশৃঙ্খল নেতৃত্ব ছিল না, তাই এলেনবি এডওয়ার্ড লরেন্সকে এই কাজের দায়িত্ব দেয়। লরেন্স এসে আরবের সামরিক বিদ্রোহকে সংগঠিত করে। অপরদিকে শরিফ হুসাইনের ছেলে ফয়সাল নেতৃত্বের ঘাটতি পূরণ করে।

লরেন্স বিদ্রোহের জন্য অস্ত্র ও স্বর্ণ সাপ্লাই দেয়। লরেন্স ও ফয়সাল গোপনে সাক্ষাৎ করছিল এবং এই দুজন মিলে আরব-বিশ্বে উসমানিদের ক্ষমতা নিঃশেষের পরিকল্পনা প্রস্তুত করছিল। তাদের প্ল্যান ছিল যে, আরব কবিলাগুলো উসমানিদের সামরিক ঘাঁটিতে হামলার পরিবর্তে উসমানিদের বিরুদ্ধে 'আঘাত করো এবং পলায়ন করো' এই নীতিতে যুদ্ধ শুরু করবে। তাদের দ্বিতীয় প্ল্যান ছিল মদিনা থেকে দামেস্ক পর্যন্ত রেললাইনকে উড়িয়ে দেওয়া, যা ফিলিস্তিনের যুদ্ধের জন্য শাহরগের মতো ছিল। ১৯১৭ সালের ৭ জুলাই আরব গেরিলা বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে উসমানিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আকাবা দখল করে নেয়। এটা ব্রিটেনের জন্য এমন এক সফলতা ছিল, যা ব্রিটিশ জেনারেল স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। আকাবা দখলের পর লরেন্স এলেনবির সাথে সাক্ষাতে মিশরে যায় এবং সেই সাক্ষাতে এলেনবি লরেন্সকে আরও অধিক স্বর্ণ ও অস্ত্রের প্রতিশ্রুতি দেয়। ১৯১৭ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত এই আরব বিদ্রোহ উসমানিদেরকে তাদের ৩০ হাজার সেনাকে যুদ্ধ থেকে ফিরিয়ে এনে এই বিদ্রোহ দমানোর কাজে ব্যবহার করতে বাধ্য করে। আর এটাই ছিল বিদ্রোহ থেকে অর্জিত ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় সফলতা।

আরব বিদ্রোহীদের এই সফলতার ফলে এলেনবির জন্য স্বল্প সেনা নিয়ে দামেস্ক বিজয় করে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। ১৯১৮ সালের ডিসেম্বরে এলেনবি দামেস্কে হামলার প্রস্তুতি নেয়। এলেনবি এই হামলা শুরু করার পর আরব বিদ্রোহীরা সাহায্যের জন্য মদিনা থেকে দামেস্কের রেললাইনের চার মাইল লোহার পাত বারুদের সাহায্যে উড়িয়ে দেয়। এই হামলার ফলে উসমানিদের যুদ্ধের সক্ষমতা অনেক কমে যায় এবং তাদের পক্ষে দামেস্কের প্রতিরক্ষা অসম্ভব হয়ে যায়। যত সময় পার হচ্ছিল এই বিদ্রোহের শক্তি ততই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ঐতিহাসিকরা লিখেছে যে, আরব বিদ্রোহীদের এই যুদ্ধ যতটা না ছিল স্বাধীনতার জন্য তার থেকে বেশি সম্পদ লুণ্ঠনের যুদ্ধ ছিল। এলেনবির দামেস্কের ওপর হামলার জবাবে উসমানিরা তাদের প্রতিরক্ষা পজিশন দৃঢ় করা শুরু করে এবং এর জন্য তারা জার্মান জেনারেলকে দায়িত্ব দেয়। বাহিনীর কাছে অস্ত্র ও রসদের সাহায্যও তারা পৌঁছে দিয়েছিল।

**ম্যাগিডু'র যুদ্ধ**
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উসমানিদের পরিস্থিতি অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আনোয়ার পাশার ইরাক থেকে বাহিনী নিয়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার বাহিনী ইউরোপে পৌঁছা এবং শরিফ হুসাইনের গাদ্দারির ফলে ফিলিস্তিনে জেনারেল এলেনবির অবস্থা অনেক শক্তিশালী হয়ে গিয়েছিল। আর সে এই সুযোগকে গনিমত হিসেবে গ্রহণ করে ১৯১৮ সালের ডিসেম্বরে উসমানিদের ওপর হামলা করে বসে। এই যুদ্ধ ইতিহাসে ম্যাগিডু যুদ্ধ নামে প্রসিদ্ধ। এই যুদ্ধে উসমানিরা পরাজিত হয়ে পিছু হটে এবং অনেক তুর্কি সেনা গ্রেফতার হয়। ব্রিটেনের বিমান হামলার ফলে রাস্তায় অসংখ্য লাশ পড়ে ছিল। ম্যাগিডু যুদ্ধের পরাজয়ের পর এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, মধ্যপ্রাচ্যে উসমানিরা হেরে গিয়েছে এবং এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, কখন শত্রুবাহিনী তুর্কিতে প্রবেশ করবে।

**কেন্দ্রীয় শক্তির পরাজয়**
অপরদিকে জার্মানির ফিল্ড মার্শাল 'হিন্ডেনবার্গ' ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে চূড়ান্ত হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ১৯১৮ সালের ২১ মার্চ জার্মানি একটি বড় হামলা করে বসে। ফলে জার্মানির বিজয় প্রকাশ হতে শুরু করে। এই হামলার ফলে পেরেশান হয়ে ব্রিটেনের যুদ্ধমন্ত্রী এলেনবিকে ৯০ হাজার সেনা, অস্ত্র-রসদসহ ফিরে আসার আদেশ দেয়। ঠিক সেই সময় উসমানিদের যুদ্ধমন্ত্রী ছিল আনোয়ার পাশা। সে সিদ্ধান্ত নেয় উসমানিদের সেই অঞ্চলগুলো ফিরিয়ে আনা আবশ্যক, যা রাশিয়া দখল করেছে। তাই আনোয়ার পাশা কাফকাজের (ককেশাসের) যুদ্ধক্ষেত্র দ্বিতীয়বার খুলে দেয় এবং হঠকারীমূলকভাবে ফিলিস্তিনে থাকা বাহিনীর দক্ষ সেনাদের বের করে কাফকাজের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেয়। যার ফলে ফিলিস্তিনের প্রতিরক্ষা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি সেখানের তুর্কি বাহিনীতে অস্ত্র ও রসদের ঘাটতি দেখা দেয়। অসুস্থ ও আহতদের দেখভাল করারও কেউ ছিল না। অপরদিকে আমেরিকান বাহিনী ইউরোপে পৌঁছা শুরু করে। ফলে জার্মানি এতদিন সফলতার দিকে এগিয়ে গেলেও এখন পিছপা হতে শুরু করে।

তখন তুর্কি বাহিনীও পিছু হটে তুর্কির সীমানায় ঢুকে পড়েছিল। এই অবস্থা দেখে সর্বশেষ উসমানি সুলতান মুহাম্মাদ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উইলসনের কাছে সন্ধির আবেদন করে; কিন্তু সে তাতে অস্বীকার করে। টাউন শেড যে কুতুল ইমারাতে হাতিয়ার ফেলে দিয়েছিল, সে তখন উসমানিদের হাতে বন্দী ছিল। সে সন্ধির কথাবার্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। যার ফলে ব্রিটেন ও উসমানিদের মাঝে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি হয়। এটাকে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি না বলে অস্ত্র ফেলে দেওয়ার চুক্তি বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। এই চুক্তির অধীনে জোট বাহিনীর এই অধিকার অর্জিত হয়ে যায় যে, তারা উসমানি সাম্রাজ্যের যেকোনো অংশ চাইলেই দখল নিতে পারবে। অপরদিকে ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে জার্মানি বিজয়ের অধিক নিকটবর্তী হয়ে যাওয়ার পরেও আমেরিকার নব উদ্যমী বাহিনীর আসার ফলে তারা পরাজিত হয়ে যায় এবং ১৯১৮ সালে যুদ্ধ বন্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যায়।

**ভার্সাই চুক্তি**
এটা ছিল প্রথম চুক্তি, যা বিজয়ী জোট (ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা) ও জার্মানির মধ্যে ফ্রান্সের শহর ভার্সাইলে হয়েছিল। এটা ছিল জার্মানির পরাজয়ের চুক্তি। ভার্সাই চুক্তির চারটি মৌলিক পয়েন্ট ছিল:

১. এই যুদ্ধ শুরুর একক দায়ভার জার্মানির এবং সমস্ত অপরাধ জার্মানির। তাই তাদের বাদশাহর ওপর মুকাদ্দামা চালানো হবে।

২. জার্মান বাহিনীর সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হবে। জার্মানিকে শুধু এক লাখ স্থলসেনা ও ১৫ হাজার নৌসেনা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। অথচ জার্মানির কাছে ১৮টি যুদ্ধজাহাজ ও ১২টি টরপেডো-বোট ছিল। এমনকি সাবমেরিন রাখতেও বাধা দেওয়া হয়। এ ছাড়াও জার্মানির ওপর রাইফেল, মেশিন গান, ট্যাঙ্ক ও বিমান বানানোতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

৩. জার্মানির অঞ্চলগুলোকে বণ্টন করে দেওয়া হবে। বর্তমান আধুনিক জার্মানি ১৮৭১ সালের বিপ্লবের পর জার্মেনিক বংশের এলাকাগুলো একত্রিত করে গঠন করা হয়েছিল। পূর্বে যা ফ্রান্স, সুইডেন, পোল্যান্ড ও অস্ট্রিয়া ইত্যাদি অঞ্চলের অধীনে ছিল। এই চুক্তির অধীনে অ্যালসেস ও লোরেইন এলাকা ফ্রান্সকে দিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে রাইনল্যান্ড কোনো পক্ষের অধীনে না রেখে স্বতন্ত্র রাখা হয়। উত্তর শ্লেসভিগ এলাকা ডেনমার্ককে দিয়ে দেওয়া হয়। সাইলেসিয়ার কিছু অঞ্চল যুগোস্লাভিয়াকে দেওয়া হয়। সাইলেসিয়ার পূর্ব অংশ পোল্যান্ডকে দেওয়া হয়। ইউপেন ও ম্যালমেডি এলাকা বেলজিয়ামকে দেওয়া হয়। ক্লেপেডো এলাকা লিথুনিয়াকে দেওয়া হয়, প্রুশিয়ার কিছু অঞ্চল পোল্যান্ডকে দেওয়া হয়। অস্ট্রিয়াকে জার্মানি থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়।

৪. মিত্রবাহিনীর যুদ্ধের সমস্ত ব্যয়ভার জার্মানিকে পূরণ করতে হবে। এর পরিমাণ ছিল ২২৬ বিলিয়ন স্বর্ণমুদ্রা, যা পরে কমিয়ে ১৩২ বিলিয়ন স্বর্ণমুদ্রায় নিয়ে আসা হয়। ১৯২৯ সালে সিদ্ধান্ত হয়, জার্মানি এই ব্যয়ভার ৫৯ বছরব্যাপী কিস্তিতে ১৯৮৮ সালে পূরণ করবে।

ঐতিহাসিকরা বলেন, এই চুক্তি বিশ্বের বুকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ব্যতীত আর কিছুই ছিল না।

এই চুক্তির ফলে জার্মানির অবস্থা সেই ব্যক্তির মতো হয়ে যায়, যাকে হাত-পা বেঁধে গভীর সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে এবং তাকে সাঁতার কেটে সমুদ্র পার হয়ে জান বাঁচানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে। সমস্ত নিরপেক্ষ দর্শক ও ঐতিহাসিকগণ এই চুক্তির ব্যাপারে আলোচনা করে বলেন, এখন জার্মানির সামনে সারা জীবন গোলাম হয়ে থাকা অথবা এই চুক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে আরও একটি বিশ্বযুদ্ধ লাগানো ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। ২৮ বছর পর এই ভবিষ্যদ্বাণীই বাস্তবায়িত হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়।

**ইসরাইল প্রতিষ্ঠা**
অন্যদিকে ১৯১৮ সালে ফয়সাল ও তার সাথিরা বিজয়ীবেশে দামেস্কে প্রবেশ করে। যুদ্ধে ব্রিটেনকে সাহায্যের ফলে আরব সাগর থেকে ফিলিস্তিন পর্যন্ত বিশাল আরব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের নিকটবর্তী চলে এসেছিল। কিন্তু যখন তারা জেনারেল এলেনবির সাথে সাক্ষাৎ করে, তখন সে তাদের সামনে এই কথা স্পষ্ট করে দেয় যে, যে ওয়াদা ব্রিটেন তাদের জন্য করেছিল, তা পূরণ করা অসম্ভব। কারণ শাম ও লেবানন ফ্রান্সের এবং ফিলিস্তিন, হিজাজ ও ইরাক ব্রিটেনের অধীন থাকবে। এ ছাড়া ফয়সালের কাছে এই কথা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ফিলিস্তিনে ব্রিটেনের অধীনে এক ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। এই কথায় ফয়সাল অনেক অসন্তুষ্ট হয়। কিন্তু তাদের কাছে এক গাদ্দারের অসন্তুষ্টির কোনো গুরুত্ব ছিল না।

এলেনবি ব্রিটেনের যুদ্ধ-মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করে যে, বাহিনী ঘর থেকে বের হওয়ার পর কয়েক বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। এখন যদি তাদেরকে নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া না হয়, তাহলে বাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহের আশঙ্কা রয়েছে। এই আবেদনকে যুদ্ধ মন্ত্রণালয় গ্রহণ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাহিনীর বড় অংশকে ফিরে আসার আদেশ দেয়। কিন্তু এভাবে বাহিনী কমিয়ে ফেলার দ্বারা ব্রিটেনের মধ্যপ্রাচ্যে দখলকৃত এলাকাগুলোতে নিজেদের মনমতো কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়। তাই তখন তাদের আরেকটি মিত্রের প্রয়োজন হয়, যা পূরণে এগিয়ে ছিল গ্রিস। গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী ভেনিজেলোসের ইচ্ছা ছিল দক্ষিণ তুর্কিকে গ্রিসের অংশ বানানো। তাই তারা তাদের সেনা পাঠাতে সম্মত হয়। অপরদিকে মুসলিম উম্মাহর গাদ্দার ফয়সাল ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ফিলিস্তিন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত হয়ে যায়। ফলে তখন ইউরোপে জায়োনিস্টরা চেম উইজম্যানের নেতৃত্বে জোরেশোরে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানাতে থাকে। এর জবাবে ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর ১৯১৭ সালের দুই নভেম্বর জায়ানবাদী আন্দোলনের উদ্দেশে এক অভিশপ্ত চিঠি পাঠায়, যা ইতিহাসে 'বেলফোর ঘোষণা' নামে প্রসিদ্ধ। এই চিঠিকেই ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ঘোষণা বলা হয়।

**সেভ্রে চুক্তি**
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বন্ধের পর ১৯২০ সালের ১০ আগস্ট উসমানি এবং জোট বাহিনীর (ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালি) মধ্যে ফ্রান্সের সেভ্রে অঞ্চলে এক চুক্তি হয়, যাকে সেভ্রে চুক্তি বলা হয়। এই চুক্তি মূলত মুসলিম উম্মাহর মানচিত্রকে খণ্ড-বিখণ্ড করার চুক্তি ছিল। সুলতান মুহাম্মাদ পঞ্চমের অবস্থা তখন জোট বাহিনীর হাতে কয়েদির মতো ছিল। মিত্রবাহিনী তাকে যা-ই আদেশ করত, সে তার ওপরেই দস্তখত করত। সেভ্রে চুক্তির অধীনে ইরাক, হিজাজ, ফিলিস্তিন, লেবানন ও জর্ডান ব্রিটেনকে দিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে শাম, আনাতুলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অংশ ফ্রান্সকে দেওয়া হয় এবং বাকি অংশ গ্রিসকে দিয়ে দেওয়া হয়। এই চুক্তি ছিল মূলত সাইক্স-পিকোর গোপন চুক্তির বাস্তবায়ন, যা ১৯১৬ সালে ফ্রান্স-ব্রিটেনের মধ্যে ইসলামি বিশ্বকে বণ্টনের জন্য হয়েছিল।

**মুস্তফা কামালের উত্থান ও উম্মাহকে ছিন্নভিন্ন করা**
সেভ্রে চুক্তি সম্পাদন ও যুদ্ধ বন্ধের সাথে সাথে সমস্ত ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্য ও উসমানি এলাকাগুলো দখল করা শুরু করে। আর্মেনিয়ার বাহিনী পূর্ব তুর্কি দখল করে নেয়। দক্ষিণ মধ্যপ্রাচ্যের আদনাহ অঞ্চল ফ্রান্স ও আর্মেনিয়ার বাহিনী দখল করে নেয়। ইতালি দক্ষিণ তুর্কি দখল করে নেয়। পশ্চিম তুর্কি অঞ্চল গ্রিস দখল করে। এই সময়টাতে উসমানিদের কেন্দ্র তুর্কির ওপর পুরো দুনিয়ার শক্তিগুলো দখল প্রতিষ্ঠার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অভ্যন্তরীণভাবে তাদের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আইনহীনভাবে দেশ চলছিল। ইস্তাম্বুলে থাকা সুলতানের অবস্থা জোট বাহিনীর হাতে কয়েদির মতো ছিল। পুরো তুর্কিতে কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। এটা এমন এক শূন্যতা ছিল, যা কামাল আতাতুর্ক পূরণ করেছিল। সে সামরিক ও বেসামরিক নেতাদেরকে তুর্কি জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার স্লোগানের অধীনে একত্রিত করে। কামালের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল আরববিশ্ব থেকে বিমুখ হয়ে শুধু তুর্কিকে পশ্চিমা শক্তির হাত থেকে স্বাধীন করে নেওয়া। সে সুলতানকে পশ্চিমা শক্তির খেলনা হিসেবে ঘোষণা করে এবং বলে, 'সুলতান তুর্কিকে বিক্রি করে ফেলছে।' সে একই সাথে সুলতান ও পশ্চিমাদের বিরোধিতা করছিল। তুর্কি জাতি যারা যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার ফলে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, মুস্তফা কামালের স্লোগানে তারা নতুন জীবন ফিরে পায়। ১৯১৯ সালে রাষ্ট্রীয় নির্বাচনে কামালের সাথিরা বিজয় অর্জন করে নেয়।

এই বিজয় কামালের আন্দোলনকে এক নতুন জীবন দান করে। তখন তারা আংকারাতে নিজেদের কেন্দ্র বানিয়ে পশ্চিমাদের থেকে স্বাধীন এক গণতান্ত্রিক তুর্কি রাষ্ট্রের দাবি জানাতে থাকে এবং সেভ্রে চুক্তিকে মেনে নেওয়াকে অস্বীকার করতে থাকে। এই জায়গা থেকে তুর্কির যুদ্ধ নতুন দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এখন তুর্কির যুদ্ধে মূল লক্ষ্য হয়ে যায় সমস্ত মুসলিম এলাকা থেকে মুখ ফিরিয়ে তুর্কি জাতীয়তা সংরক্ষণ এবং এই জাতীয়তার অধীনে তুর্কি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা। ফলে এই আন্দোলন জাতীয়তাবাদীদের হাতে চলে গিয়েছিল, যাদের নেতা ছিল কামাল আতাতুর্ক। এই জাতীয়তাবাদী জজবা ছিল খিলাফতের মৃত্যু।

১৯১৮ সালে যখন রাশিয়ান বাহিনী আর্মেনিয়া থেকে ফিরে যায়, তখন সেখানে এক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয় এবং আর্মেনিয়ার নতুন রাষ্ট্র পূর্ব তুর্কিকে আর্মেনিয়ার অংশ মনে করতে থাকে। যেহেতু তারা উসমানিদের দুর্বলতার ফলে পূর্ব তুর্কি দখল করে নিয়েছিল। পক্ষান্তরে কামাল এটাকে তুর্কির অংশ মনে করত। ১৯১৯ সালের শীতের মৌসুমে তুর্কি বাহিনী জেনারেল কাজেমের নেতৃত্বে আর্মেনিয়ার ওপর হামলা করে তাদের বাহিনীকে পরাজিত করে। ১৯২০ সালে আর্মেনিয়া তুর্কির সাথে শান্তিচুক্তি করে। সেই বছরেই কামাল রাশিয়ার সাথে চুক্তি করে নেওয়ার ফলে তুর্কির পূর্ব সীমানা নিরাপদ হয়ে যায়।

পূর্ব সীমানা নিরাপদ হয়ে যাওয়ার পর তুর্কিরা দক্ষিণ-পশ্চিম সীমানার দিকে ধাবিত হয়, যেখানে আর্মেনিয়া ও ফ্রান্সের বাহিনী ছিল। তুর্কি বাহিনীর হামলার ফলে ফ্রান্সের অবস্থান দুর্বল হয়ে যায়। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার কামালের সাথে সন্ধি করতে চাচ্ছিল; কিন্তু ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এর বিরোধিতা করে তার অতিরিক্ত সেনাদেরকে ইস্তাম্বুল পাঠিয়ে দেয়। সেই সময় রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক প্রশাসন কামালের হুকুমতকে অর্থ দিয়ে সাহায্যের ঘোষণা দেয়। ১৯২১ সালে গরমের মৌসুমে ফ্রান্স কামালের হুকুমতের সাথে শান্তিচুক্তি করে; যার ফলে ফ্রান্স প্রথমবার অফিসিয়ালভাবে কামালের হুকুমতকে মেনে নেয়। এর অর্থ ছিল, জোট বাহিনীর সেই সেভ্রে চুক্তি, যা তারা সুলতানের সাথে করেছিল, তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যার ফলে ব্রিটেনের পজিশনও খারাপ হয়ে যায় এবং ব্রিটেন ও ফ্রান্সের জোট বিপদে পড়ে যায়। ১৯২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই চুক্তির অধীনে ফ্রান্স ও আর্মেনিয়ার সকল বাহিনী তুর্কি থেকে বের হয়ে যায়।

এখন কামালের হুকুমতের পূর্ণ লক্ষ্য সামনে গ্রিসের বাহিনীর দিকে ফিরে। ১৯২০ সালের জুন মাসে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী লর্ড জর্জ কামালের শক্তিকে বাধা দেওয়ার জন্য গ্রিসের বাহিনীকে তুর্কির ওপর হামলা করতে উসকে দেয়। তুর্কি বাহিনী গ্রিসের তিনটি হামলাকে ব্যর্থ করে দেয়। ফলে গ্রিসের বাদশাহ কনস্টান্টাইন নিজেই বাহিনীর নেতৃত্ব সামলিয়ে এগিয়ে আসেন এবং তার প্রথম হামলার ফলেই তুর্কিরা পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এই অবস্থা দেখে কামাল তার পার্টির কাছে তিন মাসের জন্য গ্রিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাহিনীর পূর্ণ নেতৃত্ব কাঁধে নেওয়ার দাবি জানায়। ফলে তাকে এর অনুমতি দেওয়া হয়। ১৯২২ সালের আগস্টে তুর্কিরা বার্সাহ ও আজমিরে একই সাথে হামলা করে। কয়েক দিনের কঠিন যুদ্ধে গ্রিসের বাহিনী পরাজিত হয়ে আজমিরের দিকে চলে যায়। তুর্কিরা পিছু ধাওয়া করে আজমিরে চলে আসে। গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী লর্ড জর্জের কাছে সাহায্যের দাবি জানায়। কিন্তু সে সাহায্য করতে অস্বীকার করে। তখন গ্রিসের বাহিনী এই দুরবস্থার মধ্যেই বিভিন্ন রাষ্ট্রের সামুদ্রিক জাহাজে চড়ে আজমির থেকে পলায়নে সক্ষম হয়। এই অবস্থায় আজমির শহরে হঠাৎ আগুন লেগে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। কামালের বাহিনী যখন শহরে প্রবেশ করে, তখন সেখানে গ্রিসের কোনো সেনা উপস্থিত ছিল না। তখন কামাল তার সব নিশানা ব্রিটেনের বাহিনীর দিকে ঘুরিয়ে দেয়, যারা তখন ইস্তাম্বুল দখলে রেখেছিল। ব্রিটেন বিপদ আঁচ করে কামালের সাথে সন্ধি করে নেয়; ফলে কামাল বিজয়ী বেশে ইস্তাম্বুলে প্রবেশ করে।

**লুজিয়ান চুক্তি**
যেহেতু কামালের আন্দোলন সেভ্রে চুক্তিকে বাতিল করে ফেলেছিল, তাই ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ইসলামি অঞ্চলগুলো ভাগ-বণ্টনের জন্য সেভ্রে চুক্তিকে দ্বিতীয়বার উজ্জীবিত করার প্রয়োজন পড়ে। তাই ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালি সুইজারল্যান্ডের লুজিয়ান শহরে আরও একটি কনফারেন্সের আয়োজন করে, যেখানে সুলতান মুহাম্মাদের পরিবর্তে কামালের জাতীয়তাবাদী পার্টিকে দাওয়াত দেওয়া হয়। ১৯২৩ সালের ২৪ জুলাই আট মাসের আলোচনার পর লুজিয়ান চুক্তি হয়। এই চুক্তিতে তুর্কিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। আনাতুলিয়া ও তুর্কির কয়েকটি এলাকাকে তুর্কির সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়। মর্মর সাগরকে আন্তর্জাতিক অঞ্চল বানিয়ে দেওয়া হয় এবং বাকিগুলো সেভ্রে চুক্তিতে যেমন ছিল তেমনই থাকে। সেভ্রে ও লুজিয়ান চুক্তি ফ্রান্সে হওয়া সাইক্স-পিকোর গোপন পরিকল্পনার বাহ্যিক বাস্তবায়ন ছিল। যা ব্রিটেন ও ফ্রান্স ১৯১৫ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে মুসলিম উম্মাহকে টুকরো টুকরো করার জন্য করেছিল।

**মুসলিম উম্মাহর কী অর্জিত হলো?**
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে এবং মুসলিম উম্মাহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ইসলামি রাষ্ট্রগুলোকে অসংখ্য ভাগে বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে। মুসলিমদেরকে স্বাধীনতা, সমতা, উন্নতি ও দেশপ্রেমের ধর্মহীন স্লোগান শেখানো হয়ে গেছে, এখন তারা এই সব স্লোগানের ভিত্তিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ বানানো শুরু করে দিয়েছে। সেই সাথে মুসলিম উম্মাহ শরিফ হুসাইন ও তার ছেলে আব্দুল্লাহ ও ফয়সালের মতো গাদ্দারও পেয়ে গেছে, যারা ফিলিস্তিন ও বাইতুল মুকাদ্দাসকে বিক্রি করে ইহুদিদের হাওয়ালা করে দিয়েছে। আরবের বাদশাহ হওয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা এবং আরব জাতির উন্নতির দাবিদাররা এখন আরবকেই হিজাজ, ইরাক ও জর্ডানে ভাগ করে নিয়েছে। শরিফ হুসাইন হিজাজে, ফয়সাল ইরাকে ও আব্দুল্লাহ জর্ডানের বাদশাহ হয়ে গেছে। ১৯২৭ সালে শেখ আব্দুল আজীজ আলে সৌদ শরিফ হুসাইন থেকে হিজাজ ছিনিয়ে নেয় এবং সে ১৯৩১ সালে জর্ডানে দেশান্তরিত অবস্থায় মারা যায়। ১৯৩৩ সালে তার ছেলে ফয়সাল ইরাকে মারা যায়। ১৯৩৯ সালে ফয়সালের ছেলে গাজি গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যায়। গাজির পাঁচ বছরের ছেলেকে ফয়সাল ২য় নামে সিংহাসনে বসানো হয়। ১৯৫৮ সালে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয় এবং তাকে হত্যা করে ফেলা হয়। এটাই ছিল উম্মাহর ঐক্যকে বিনষ্টকারী বংশের পরিণতি, যারা আরব-বিশ্বের বাদশাহ হওয়ার জন্য পুরো উম্মাহকে বিক্রি করে দিয়েছিল। তারা এখন শুধু জর্ডানেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। ১৯৫১ সালে ফয়সাল ২য় এর ছেলে আব্দুল্লাহকে হত্যা করা হয়। অতঃপর তার ছেলে তালাল বাদশাহ হয়; কিন্তু মানসিক অসুস্থতার ফলে তাকে অপসারণ করা হয়। তারপর তালালের ছেলে শাহ হুসাইন বাদশাহ হয়। ১৯৯৯ সালে শাহ হুসাইনের মারা যাওয়ার পর তার ছেলে শাহ আব্দুল্লাহ ২য় নামে জর্ডানের বাদশাহ হয়, যে আজও রয়েছে।

তুর্কিতে কামাল পুরো জাতিকে স্বাধীনতা, সমতা, গণতন্ত্র ও উন্নতির স্লোগান শিখিয়ে দ্বীন থেকে দূরে ঠেলে দেয়। তুর্কিতে আরবি শব্দের ব্যবহার বিলুপ্ত করে ইংরেজি শব্দ চালু করা হয়। ইংরেজদের পোশাক গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয় এবং সেটাকে তুর্কিদের জাতীয় পোশাক ঘোষণা দেওয়া হয়। ধর্মীয় নিদর্শন আজান, পর্দা, দাড়ি ইত্যাদিকে বিলুপ্ত করে পশ্চিমা সংস্কৃতি চালু করা হয়। সময়ের সাথে সাথে তুর্কিতে কামালের প্রভাবে ধর্মহীন সংবিধান বাস্তবায়িত হতে শুরু করে, যা আজও চলমান রয়েছে। আল্লাহর নবি যখন দুনিয়া থেকে অফাত হন, তখন নিজের পরে খিলাফতে রাশিদাকে রেখে যান। ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে বড় বড় শক্তিশালী সুলতানগণ অতিবাহিত হয়েছেন। যাদের মধ্যে গজনবি, সেলজুকি, আইয়ুবি, জিংকি ও মামলুকরা অন্তর্ভুক্ত। তারা প্রত্যেকেই আব্বাসি খিলাফতকে প্রতিষ্ঠিত রাখাকে নিজেদের জন্য আবশ্যকীয় মনে করেছেন। তাতারদের হামলার পর যখন বাগদাদের আব্বাসি খিলাফতের পতন হয়, তখন সুলতান বাইবার্স হালাকু খানকে আইনে জালুতে পরাজিত করার পর খিলাফতকে প্রতিষ্ঠা করা নিজের সর্বপ্রথম দায়িত্ব হিসেবে নেন এবং দ্বিতীয়বার আব্বাসি খিলাফতকে প্রতিষ্ঠা করে মুসলিমদের কেন্দ্রকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, মুসলিমদের আসল শাসনব্যবস্থা হলো খিলাফত।

মানবাধিকার, ধর্ম ও বিজ্ঞানে দ্বন্দ্ব, বুদ্ধি ও ইলমে ওহির দ্বন্দ্বের মতো স্লোগান ও পরিভাষা ব্যবহার করে পশ্চিমারা ফরাসি বিপ্লবে খ্রিষ্টানদের পরাজিত করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলিমদের মুনাফিক শাসকরা এই সমস্ত বাস্তবতা-বিবর্জিত স্লোগান ও মিথ্যা পরিভাষাগুলো মুসলিমদের শিক্ষা দেয় এবং পুরো উম্মাহকে এই কথা বোঝায় যে, তোমাদের আসল উদ্দেশ্য এর দ্বারাই অর্জিত হবে এবং সবকিছুর সমাধান স্বাধীনতা, সমতা ও উন্নতি এসব গণতন্ত্রের মাধ্যমে অর্জিত হবে। উসমানিদের পতনের পর ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া মুসলিমদের সমস্ত সম্পদ দখল করে নেয়। এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করেছিল ব্রিটেন। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে হিন্দুস্থানের বাহিনী ছাড়া ব্রিটেন কি এই বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হতো? এর জবাব অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে। শুধুই 'না' ব্যতীত আর কিছু হবে না। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া মিলেও এমন অবস্থানে ছিল না যে, তারা উসমানিদের পরাজিত করতে সক্ষম হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম তিন বছরে ব্রিটেন ও ফ্রান্সে কোনোই সফলতা অর্জিত হয়নি।

ইস্তাম্বুলে ব্যর্থ হামলা, গ্যালিপলিতে পরাজয়, কুতুল ইমারাতে ব্রিটিশ বাহিনীর পরাজয় এবং গাজার প্রথম দুই যুদ্ধের পরাজয়সহ এই ঘটনাগুলো আমাদের চিৎকার করে বলছে, উসমানিদের পতন ব্রিটেন করেনি; বরং ১৫ লাখ হিন্দুস্থানি সেনাই করেছিল। যাদের ৭৪ হাজার সদস্য যুদ্ধে মারা যায় এবং ৬৪ হাজার সেনা আহত হয়। এই পনেরো লাখের বাহিনীতে পাঞ্জাব রেজি., বেলুচ রেজি. ও ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের সমস্ত সেনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পনেরো লাখের মধ্যে অর্ধেকই মুসলিম ছিল, যাদের মধ্যে বেলুচিস্তানের খুদাদাদ খান, ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের দোস্ত খান, পাঞ্জাব রেজি.-এর শাহ আহমাদ খান ইংরেজদের সাথে লড়াই করে ব্রিটেন থেকে নিজেদের বাহাদুরির সম্মানস্বরূপ ভিক্টোরিয়া ক্রস অর্জন করে। তারা কি মুসলিম ছিল? তারা বাহাদুরি দেখিয়েছে কীসের জন্য? যে বাহাদুরির সম্মান তাদের অর্জিত হয়েছে, তা কী ধরনের বাহাদুরির জন্য ছিল? এই ব্যক্তিদের ব্যাপারে কুরআনের ফয়সালা স্পষ্ট এবং যার ব্যাখ্যায় উলামায়ে সালাফ ও খালাফের মধ্যে কোনো ইখতিলাফ নেই। যে কেউ মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেকোনোভাবে কাফিরদের সাহায্য করে, সে কুফুরি করেছে এবং সে কুফুরির সর্বনিকৃষ্ট অবস্থায় লিপ্ত হয়েছে।

শাইখুল হিন্দের আন্দোলন, যাকে রেশমি রুমাল আন্দোলনও বলা হয়, এই আন্দোলন আপন উদ্দেশ্য তথা হিন্দ থেকে ইংরেজদের হুকুমতকে বিলুপ্ত করতে সক্ষম হয়নি। এর মূল কারণ ছিল, মাওলানা মাহমুদুল হাসান-এর গ্রেফতারি ও আমিরে আফগান হাবিবুল্লাহর দ্বিমুখী নীতি, যে এই আন্দোলনকে সঠিক সময়ে কাজ করা থেকে বাধা দিয়েছিল। ফলে যদিও হাবিবুল্লাহর কোনো ফায়দা হয়নি এবং ১৯১৯ সালে জালালাবাদে সে মারা যায়; কিন্তু তা ইংরেজদেরকে উসমানিদের পতন ঘটানোর অনেক সুন্দর সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। ঐতিহাসিকরা এই কথার ওপর একমত যে, যদি হাবিবুল্লাহ দ্বিমুখী না হতো এবং মুজাহিদদের সাহায্য করত, তাহলে সেটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফলে গভীর প্রভাব ফেলতে পারত।

**প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উপমহাদেশে ব্রিটেনের অবস্থা**
শাইখুল হিন্দের আন্দোলনের পর ইংরেজরা সেই পুরাতন প্রশ্নের উত্তর স্পষ্টভাবে পেয়ে গিয়েছিল, হিন্দুস্থানে ইংরেজদের ভবিষ্যৎ কী হবে? এর জবাব ইংরেজদের গোপন রিপোর্টে এটা ছিল যে, যদি বিশ্বযুদ্ধের মতো অবস্থা থাকে, তাহলে হিন্দুস্থানকে ভবিষ্যতে ইংরেজরা দখল করে রাখা অসম্ভব। তাই ইংরেজরা যুদ্ধের পর হিন্দুস্থানে এমন ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা শুরু করে, যার সাহায্যে হিন্দুস্থান ছেড়ে যাওয়ার পরেও তার ওপর তারা পরোক্ষ দখলদারিত্ব ধরে রাখতে পারবে।

এই নীতির ওপরেই বাহিনী ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানো শুরু করে। ১৯২২ সালে বাহিনীকে চতুর্থবারের মতো নতুনভাবে গঠন করে, যাকে 'হিন্দুস্থানি-করণ' বলা যায়। ১৯৩৭ সালে ও পরে ১৯৪৬ সালে নির্বাচন সংঘটিত হয়। যা ইংরেজদের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়ার আলামত ছিল। ইউরোপে ১৯২৯ সালের অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং ১৯৩৯ সালে হিটলারের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু এই দুঃস্বপ্নের মধ্যে সর্বশেষ পেরেক হিসেবে কাজ করেছিল। ১৯৪০ সালে পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হয়ে আলাদা পাকিস্তান গঠিত হয়ে যায়। পাকিস্তান আন্দোলনের সফলতায় মুসলিম লীগের ভূমিকা বাড়িয়ে বলে বাস্তবতাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। পাকিস্তান আন্দোলন এমন এক প্লাটফর্ম ছিল, যেখানে বিভিন্ন পার্টি ও পক্ষ অন্তর্ভুক্ত ছিল। মুসলিম লীগ শুধু একটি পক্ষ ছিল, যেখানে তাহরিকে মুজাহিদিন ও কাবায়েলি মুজাহিদিন থেকে নিয়ে শাইখুল হিন্দ পর্যন্ত সবারই শক্তিশালী ভূমিকা ছিল। সৎ ধারণার ভিত্তিতে মুসলিম লীগের প্রচেষ্টাকে মুসলিমদের রক্ষার এমন এক চেষ্টা বলা হয়, যা প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশ্নবাণে জর্জরিত। অন্যদিকে মুজাহিদ ও আলিমদের চেষ্টা শুধুই দ্বীন বিজয়ের চেষ্টা ছিল। এই দুই গ্রুপ যদি একত্রিত হয়ে থাকে, তাহলে শুধু এই কথার ওপরেই ছিল যে, আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে সেখানে কেবলই ইসলামি শরিয়াহ বাস্তবায়িত হবে। সত্যপন্থী আলিমরা যখন এই আন্দোলনের সাথে অংশগ্রহণ করে, তখন এমন এক শক্তি অর্জিত হয়, যা দ্বারা বাংলা ও সীমান্তের বিদ্রোহ সফল হয়েছিল এবং পাকিস্তানের স্বপ্ন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছিল।

**তৃতীয় আফগান-যুদ্ধ (১৯১৯-১৯২০ খ্রি.)**
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উসমানি সাম্রাজ্যের পতন সত্ত্বেও শাইখুল হিন্দের আন্দোলন উপমহাদেশে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছিল। অনেক হিন্দু ও শিখ আন্দোলন তাদেরকে সাহায্য করতে শুরু করে। হিন্দুস্থানের ইংরেজ বাহিনীর মধ্যে শক্তিশালী বিদ্রোহ শুরু হয়। তন্মধ্যে সিঙ্গাপুর বিদ্রোহ সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিল। এই বিদ্রোহে এক হাজার থেকেও অধিক মুসলিম সেনা বিদ্রোহ করেছিল এবং এই বিদ্রোহ পুরো সিঙ্গাপুরে ছড়িয়ে গিয়েছিল। এই বিদ্রোহ দমনের জন্য ফ্রান্স ও রাশিয়ান সামুদ্রিক বহরকে সাহায্যের জন্য ডাকা হয়েছিল। তেমনিভাবে লাহোর, ফিরোজপুর ও আগ্রার বাহিনীতেও বিদ্রোহ হয়েছিল। বাঙ্গাল বিদ্রোহ এতটাই ছড়িয়েছিল যে, সেখানের সব কাজ স্থবির হয়ে গিয়েছিল। বিদ্রোহ ইরান, সিজিস্থান ও বেলুচিস্তান পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিল। কিছু বেলুচ কবিলা ইংরেজদের থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা করে দেয়। ফলে ইংরেজরা বেলুচ থেকে করাচি পর্যন্ত এলাকা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

অপরদিকে আফগান হাবিবুল্লাহ-যে ইংরেজদের একনিষ্ঠ সেবক ছিল এবং আফগান জনগণকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বাধা দিতে সক্ষম হয়েছিল-তার গোলামি তার জন্যই ক্ষতি ডেকে নিয়ে আসে। ১৯১৯ সালে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয় এবং তাকে দেশান্তরিত অবস্থায় হত্যা করা হয়। অতঃপর তার ছেলে আমানুল্লাহকে আফগানের আমির নির্ধারণ করা হয়। সে আমির হওয়ার প্রথম দিনেই ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে গান্দামাক চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয় এবং বলে দেয়, 'আজকের পর আফগান নিজেদের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত কাজে স্বাধীন। আফগান এখন চাইলে ব্রিটেনের সাথে থাকতে পারবে বা চাইলে রাশিয়ার সাথে থাকবে অথবা ইচ্ছা করলে কারোর সাথেই থাকবে না।' আমানুল্লাহর এই ঘোষণার ফলে তৃতীয় আফগান জিহাদ শুরু হয়।

প্রথম ও দ্বিতীয় আফগান-যুদ্ধের বিপরীতে তৃতীয় আফগান-যুদ্ধে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে আফগানরাই প্রথম হামলা করতে এগিয়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ইউরোপ ও ব্রিটেনের শক্তি দুর্বল হতে দেখে আফগান-আমির আমানুল্লাহ হিন্দুস্থানের ওপর তিন দিকে অর্থাৎ খাইবার, করম ও কান্দাহার থেকে হামলা করে। এর ফলেই তৃতীয় আফগান-যুদ্ধের শুরু হয়। এই যুদ্ধের ফলাফল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই যুদ্ধের ফলে কাবায়েলি এলাকায় জিহাদের নতুন অগ্নি প্রজ্বলিত হয়। যখন আফগান বাহিনী পাকিস্তানের থাল অঞ্চল দখল করে, তখন খাইবার ও ওয়াজিরিস্তানের বাহিনী বিদ্রোহ করে মুজাহিদদের সাথে অংশ নেয়। ফলে ইংরেজ বাহিনী দুই বছরের জন্য ওয়াজিরিস্তান খালি করে চলে যেতে বাধ্য হয় এবং ব্রিটেন সাম্রাজ্যের সাথে আফগানের একটি চুক্তি হয়, যা 'রাওয়ালপিন্ডি চুক্তি' নামে প্রসিদ্ধ। এই চুক্তির ফলে ব্রিটেন সাম্রাজ্য আফগানকে স্বাধীন ও স্বকীয় রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেয়, যারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত কাজে স্বাধীন হবে এবং পাশাপাশি ভবিষ্যতে আফগানে অনুপ্রবেশ না করার ওয়াদাও করে। আফগান সর্বদাই স্বাধীন ছিল, তবে শেষ ৭০ বছরে ব্রিটেন তাদের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত কার্যক্রমে বারবার অনুপ্রবেশ করতে চাচ্ছিল। কিন্তু জিহাদের বরকতে তারা তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে কখনোই সফল হয়নি।

**শাহজাদা ফজলুদ্দিন (দক্ষিণ কাবায়েলি যুদ্ধক্ষেত্র)**
শাইখুল হিন্দের আন্দোলনের প্রভাবে দক্ষিণ কাবায়েলি জিহাদি কার্যক্রমের আকার ও শক্তি বৃদ্ধি হয়। এখানে মোল্লা পাওয়েন্দা -এর মৃত্যুর পর মাসুদ কবিলা একটি বৈঠকের আয়োজন করে, যাদের নেতা ছিল মোল্লা হামজা উরফে মৌলভি আব্দুল হাকীম। এই বৈঠকে মোল্লা পাওয়েন্দা -এর অসিয়ত পাঠ করা হয়। যেখানে কাবায়েলিদের সাধারণ নাসিহার পাশাপাশি তার ১৪ বছরের সন্তান ফজলুদ্দিনকে তার স্থলাভিষিক্ত করার বিষয়টিও ছিল। সবাই শাহজাদা ফজলুদ্দিনকে নিজেদের বাদশাহ বানিয়ে নেয় এবং মোল্লা পাওয়েন্দার সমস্ত ক্ষমতা তাকে দিয়ে দেয়। অন্যদিকে সরকারী প্রশাসন তার বড় ভাই সাহেবুদ্দিনকে স্থলাভিষিক্ত করতে চাচ্ছিল। তাই প্রথমে তারা ইংরেজদের পক্ষ থেকে মৌলভি আব্দুল হাকীমকে বলে, তিনি যেন ফজলুদ্দিনের পক্ষাবলম্বন না করেন। কিন্তু মৌলভি সরাসরি তা অস্বীকার করে দেয়। অতঃপর তারা সাহেবুদ্দিনকে প্ররোচিত করে মৌলভি আব্দুল হাকীমকে হত্যার জন্য পরিকল্পনা সাজায়। কিন্তু এই হামলা থেকেও তিনি বেঁচে যান।

ঘরোয়া মতানৈক্য থেকে মুক্ত হয়ে শাহজাদা ফজলুদ্দিন কাবুলে সফর করেন, যেখানে আফগান-বাদশাহ আমানুল্লাহ তাকে অনেক আগ্রহভরে অভিনন্দন জানান এবং একুশ হাজার পাঁচশ রুপি হাদিয়া দেন। সেই সময় ইংরেজরা জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে ফেঁসে গিয়েছিল এবং আমানুল্লাহও ইংরেজদের ওপর কঠিনভাবে হামলা করেছিল। কাবুল থেকে ফিরেই ফজলুদ্দিন এক বড় বৈঠকের মধ্যে হুকুমতকে ১৪ দিনের নোটিশ দেয়; যাতে বেলুচ রেজি.-এর পাহারাধীন মাসুদ গোত্রের মুজাহিদদের মুক্ত করে মাসুদ কবিলাকে ছেড়ে যায়। সময় শেষ হওয়ার পর মুজাহিদরা কিজুরির ওপর হামলা করে, যেখানে দশ সিপাহি মারা যায় এবং তিনজন আহত হয়। এরপর তিনি মুজাহিদদের আদেশ দেন, যাতে তারা ছোট ছোট টুলের ওপর আক্রমণ করে এবং কাফিরদের ওপর ধারাবাহিক হামলা শুরু করে। ইংরেজরা এই হামলাগুলোর ফলে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে, হিন্দুস্থানের ভাইসরয় ঘোষণা দেয়, 'মাসুদ কবিলার অপরাধের সীমা পার হয়ে গেছে এবং আমরা বহিরাগত যুদ্ধ থেকে মুক্ত হয়েই তাদের থেকে হিসাব মিটিয়ে নেব।'

কিন্তু আন্তর্জাতিক যুদ্ধ থেকে অবসর হওয়ার পূর্বেই তারা মাসুদ গোত্রের মুজাহিদদের ওপর সেনা আক্রমণের পরিকল্পনা করে। এই জন্য তাদের যাতায়াত ও রসদ আনা-নেওয়ার জন্য মানজাই থেকে সুরুইকাই পর্যন্ত সড়ক পথের দরকার ছিল। যখনই ইংরেজরা সড়ক নির্মাণ শুরু করে, তখন মাসুদ কবিলা ঘোষণা দেয় যে, ঘোমল এলাকাতে ইংরেজদের কোনো ধরনের সড়ক বানাতে দেবে না। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোল্লা হামজা ও শাহজাদা ফজলুদ্দিন সুরুইকাই-এর ওপর বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নেয়। যার ফলে দুই পক্ষের মধ্যে কঠিন যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। মুজাহিদরা ইংরেজদের অনেক ক্ষতি সাধন করে সুরুইকাই কেল্লাতে অবরুদ্ধ করে ফেলে। কিন্তু ট্যাংক রোড থেকে ইংরেজদের জন্য রসদ পৌঁছা ও জিহাদি বাহিনীর রসদ শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে অবরোধ ছেড়ে আসতে হয়। এই ঘটনার পরও ইংরেজদের ওপর হামলার ধারা চলমান ছিল। সর্বশেষ ইংরেজ বাহিনী বিমানের মাধ্যমে দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে সেনা অবতরণ করায়; যার ফলে ইংরেজ ও মাসুদ গোত্রের মধ্যে চুক্তি হয়। যেখানে ইংরেজদের সমস্ত এলাউন্স ও সেবা চালু করা এবং সমস্ত বন্দীকে মুক্ত করার ফয়সালা হয়। পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তও হয় যে, এই এলাকাতে তারা কোনো ধরনের সড়ক নির্মাণ করতে পারবে না।

যখন আমানুল্লাহ ইংরেজদের বিরুদ্ধে তৃতীয় আফগান-যুদ্ধ শুরু করে, তখন মাসুদ মুজাহিদরাও পুনরায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দেয়। এই যুদ্ধে ওয়াজিরিস্তানের পাঠান মিলিশিয়া বিদ্রোহ করে শাহজাদা ফজলুদ্দিনের সাথে মিলিত হয় এবং নিজেদের বাহিনীকে ডেরা ইসমাইল খানের সীমান্ত পর্যন্ত হটিয়ে নিয়ে যায়। এর পর শাহজাদা ফজলুদ্দিন ব্যক্তিগত কারণে জিহাদের দায়িত্ব মির্জা আলি খানের কাঁধে সোপর্দ করে দেয়।

**মির্জা আলি খান ওরফে ফকির আই.পি. (১৮৯৭-১৯৬০ খ্রি.)**
হাজি মির্জা আলি খান ওয়াজিরিস্তানে ফকির আইপি নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তার জন্ম উত্তর ওয়াজিরিস্তানে কামসাম গ্রামে; কিন্তু তার সম্বন্ধ ছিল ওয়াজিরিদের শাখা তুরিখাইলের সাথে। ১৯৩১ সালে তিনি বড় দুই ছেলেসহ ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদে লিপ্ত ছিলেন। যুদ্ধে তার দুই ছেলেই শহিদ হয়ে যান এবং তিনিও আহত হন। হাজি সাহেব তখন জালালাবাদে ছিলেন। তিনি ফিরে এসে শাহজাদা ফজলুদ্দিনের সাথে মিলে জিহাদ শুরু করেন। শাহজাদা ফজলুদ্দিন তার স্তর বৃদ্ধি করে নিজের পরামর্শক বানিয়ে নেন। শাহজাদা ফজলুদ্দিনের এই অনুভূতি হয় যে, মাসুদ কবিলা এখন নিজ দায়িত্ব পালনে সক্ষম নয়; তাই হাজি সাহেবকে তিনি উত্তর ওয়াজিরিস্তানের দিকে অভিমুখী হওয়ার জন্য বলেন। হাজি সাহেব কিছুদিন অপেক্ষা করে অল্প সরঞ্জাম সংগ্রহ করে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে জিহাদ শুরু করে দেন। তিনি জিহাদের পাশাপাশি মাদরাসাতেও দরস আরম্ভ করেন। আলেকজান্ডার পোস্ট, খাইসুরা, কোট ও সিপলাটুই স্থানে লড়াই করে তিনি ইংরেজদের কঠিনভাবে পরাজিত করেন। এমনকি সীমান্ত প্রদেশের ইংরেজ গভর্নর ঘোষণা করে যে, যে ব্যক্তি ফকির আইপি ও প্রশাসনের মাঝে সন্ধি করে দিতে পারবে, তাকে অনেক বড় পুরস্কার দেওয়া হবে। ফকির আইপিকেও বার্তা দেওয়া হয় যে, যদি সে বন্ধুত্ব করে, তাহলে ওয়াজিরিস্তানকে সোয়াতের মতো আলাদা রাষ্ট্র বানিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ইংরেজদের এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানের দক্ষিণ সীমান্তের গভর্নর মিস্টার ডান্ডাস, পলিটিক্যাল এজেন্ট ও কাবায়েলি এজেন্ট মেজর কাক্স-সহ এরা সবাই ইংরেজদের পক্ষ থেকে নিযুক্ত ছিল। যারা ব্রিটেনের বিরোধীদের পাকিস্তানেরও বিরোধী মনে করত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত যখন পাকিস্তানে প্রথম মুসলিম প্রধান নির্বাচিত হয়, তখন সেও ব্রিটেনের নীতিকেই গ্রহণ করে নেয়। এবং ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে উত্তর ওয়াজিরিস্তানের পলিটিক্যাল এজেন্ট আতাউল্লাহ হাজি সাহেবের বৈঠকের ওপর পাকিস্তানি বিমান বাহিনী দ্বারা হামলা করায়। যার ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি শাহাদাত বরণ করে। এরপর হাজি সাহেব উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের এজেন্সির কাছে একটি স্বাধীন ও স্বকীয় রাষ্ট্রের দাবি জানায়। যাদের বহিরাগত নীতি, প্রতিরক্ষা ও কারেন্সি পাকিস্তানের অধীনেই থাকবে; কিন্তু প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থা স্বাধীনভাবে শরিয়াহ মুতাবিক পরিচালিত হবে। কিন্তু পাকিস্তানি হুকুমত না বুঝে এবং মুনাফিকি করে এমনটা হতে বাধা দেয়। শেষ জীবনে হাজি সাহেব অক্ষম হয়ে যান এবং ১৯৬০ সালে তিনি মারা যান।

**রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মির দ্বিতীয় গঠন (১৯২২ খ্রি.)**
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মির গঠন পরিবর্তন করা হয়। এই পরিবর্তনকে বাহিনীকে হিন্দুস্থানি-করণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তখন বাহিনীতে অফিসারের সংখ্যা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়। দুই ধরনের অফিসার বৃদ্ধি করা হয়; এক. যাদের শিক্ষা ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমিতে হয়েছে, তাদের ভাইসরয় কমিশন নাম দেওয়া হয়। এই অফিসারদের শুধু ইন্ডিয়ান বাহিনীর ওপরেই ক্ষমতা ছিল। দুই. সে সমস্ত অফিসার, যাদেরকে কংগ্রেস কমিশন বলা হতো, তাদের প্রশিক্ষণ হতো 'রয়েল সেন্ট হার্ট মিলিটারি একাডেমি ব্রিটেনে'। এই অফিসারদের ক্ষমতা হিন্দুস্থানি ও ব্রিটিশ উভয় বাহিনীর ওপর ছিল।

এই বাহিনীকে নতুন গঠনে মাদ্রাজ বাহিনীর পাঞ্জাব ও পাঠান রেজিমেন্টের সাথে মিলিয়ে ফেলা হয়, যা আজকের পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অংশ। এ ছাড়া বোম্বাই রেজি.-এর বেলুচ ইনফেন্টারি এবং মাদ্রাজ বাহিনীর মিক্লাউড প্লাটুনকে মিলিয়ে বেলুচ রেজি. বানিয়ে দেওয়া হয়, যা আজ পাক বেলুচ রেজি.। তেমনিভাবে গাইডের ঘোড়-সওয়ার ও পদাতিকদের আলাদা বাহিনী বানিয়ে দেওয়া হয়। পদাতিক বাহিনীর নাম ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রাখা হয়, যা আজও এই নামে রয়েছে।

পাকিস্তানের ট্যাঙ্ক রেজিমেন্টের নতুন গঠন এই সময়েই হয়েছিল। সেই যুগে তখনও ট্যাঙ্ক ব্যাপক হয়নি; তাই এই বাহিনীকে ঘোড়-সওয়ার ফোর্স বা কেভেলরি বলা হতো। এই বাহিনী ঘোড়া ও লাঞ্চার চালাত। আজও এই রেজিমেন্টকে এই নামেই ডাকা হয়। পার্থক্য শুধু এতটুকুই যে, আজ এই রেজিমেন্টের কাছে ঘোড়ার পরিবর্তে ট্যাঙ্ক ও গাড়ি রয়েছে।

টিকাঃ
৩৮. ১৭৬৪ সালে নওয়াব মীর কাসেম ও তার মিত্রশক্তির সাথে ইংরেজদের লড়াইকে বক্সার যুদ্ধ বলে।
৩৯. এই শব্দগুলোকে আমাদের পরিভাষা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ প্রতিটি শব্দের পেছনেই পশ্চিমাদের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি আছে। যার সাথে ইসলামের মৌলিক সংঘর্ষ বিদ্যমান। বিস্তারিত জানতে হিউম্যান বিয়িং বইটি পড়া যেতে পারে।
৪০. জাহিলি দেশাত্ববোধের মূল কথা হলো, দ্বীনি দায়িত্ব ও মুসলিম ভ্রাতৃত্বকে পরিত্যাগ করে দেশপ্রেমকে প্রাধান্য দেওয়া।
৪১. এটাই সেই থিউরি, যার গর্ত থেকে গণতন্ত্র জন্ম নিয়েছে। আজ বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রে প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এই নিকৃষ্ট দর্শনের ভিত্তিতেই চলছে, যার প্রতিষ্ঠাতা দ্বীনবিরোধী এক জাহিল। আমাদের ওপর আল্লাহ তাআলার অগণিত নিয়ামত যে, তিনি আমাদেরকে এমন পরিপূর্ণ হিদায়াত দান করেছেন, যার পরে আমাদের আর মানুষের বানানো দর্শনের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে, আমাদের সমাজের লোকেরাই এই কথা বুঝতে প্রস্তুত নয় এবং তারা পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়া এই গণতন্ত্রের ওপর নিশ্চিন্ত হয়ে বসে আছে।
৪২. কর্পোরেট সমাজের দ্বারা এমন সমাজ উদ্দেশ্য, যেখানে প্রত্যেক সদস্য শুধু কাজ আর কাজ করে এবং তাদের মাঝে পারস্পরিক সম্পর্ক পেশার (Professions) সীমা পর্যন্তই হয়ে থাকে। এই সমাজে ভ্রাতৃত্বের কোনো স্থান থাকে না এবং বংশীয় সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আমেরিকা ও ইউরোপের সমাজগুলো এমনই সমাজ, যেখানে মানুষের সম্পর্ক শুধু পেশার ভিত্তিতেই হয়ে থাকে, যেন জানোয়ারের মতো তাদের মধ্যে শুধু প্রয়োজনের ভিত্তিতে সম্পর্ক থাকে। আফসোস হচ্ছে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বিশ্বের ওপর চেপে বসার পর এখন মুসলিম সমাজও এই পথে এগিয়ে চলছে।
৪৩. এই সমাজে জনগণ প্রশাসনের অধীনে আবদ্ধ হয় এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যেও প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে। এর স্পষ্ট উদাহরণ হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের রাশিয়া। মুসলিমদের ওপর আল্লাহ তাআলার অনেক বড় ইহসান যে, তিনি আমাদেরকে বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি থেকে মুক্ত ভারসাম্যতার ওপর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা দান করেছেন, যার ভিত্তিতে মুসলিম উম্মাহ তেরো শতাব্দী পর্যন্ত আমল করেছে, সর্বশেষ উসমানিদের পতন হয়। যার পরের অবস্থা সামনে আলোচনা হবে।
৪৪. আদেশ ও নীতির পরিভাষা মূলত ম্যানেজমেন্টের প্রসিদ্ধ পরিভাষা। বর্তমানে এই পরিভাষা বিশেষভাবে বাহিনীর শৃঙ্খলা ও নীতির জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে। কমান্ড কোনো ক্ষমতাশালীর আদেশকে বলা হয়। আর কন্ট্রোল সেই নীতিকে বলা হয়, যা কাজের শৃঙ্খলার জন্য মাপকাঠি হিসেবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। যার ফলে কাজ নিজে নিজেই সেই কন্ট্রোল অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
৪৫. শীতকালে সমুদ্রের পানি বরফে জমে গেলে তা দিয়ে জাহাজ ইত্যাদি জলযান চলাচল ব্যাহত হয়। তাই রাশিয়ার এমন এক সামুদ্রিক যোগাযোগপথ প্রয়োজন ছিল, যার পানি শীতকালেও স্বাভাবিক থাকে, আর এর উপযোগী সমুদ্র ছিল কৃষ্ণ সাগর। রাশিয়া এ কৃষ্ণ সাগরে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার এবং তাতে ওয়ার্ম ওয়াটার পোর্ট স্থাপনের জন্য মরিয়া ছিল।
৪৬. ফাতাওয়ায়ে আজীজি: ১/৩৫।
৪৭. এর জন্য শরিয়তে 'আল-হুব্বু ফিল্লাহ ওয়াল বুগজু ফিল্লাহ'র পরিভাষা ব্যবহার করা হয়। আমাদের উপমহাদেশে এই আকিদা 'মুওয়ালাত ওয়া মুআদাত' হিসেবে পরিচিত। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, কোনো মুসলিম তার রব, তার রাসুল এবং সমস্ত আহলে ইমানের সাথে-তাওহিদের আকিদার ভিত্তিতে-বন্ধুত্ব, মহব্বত ও সাহায্যের সম্পর্ক রাখে। অন্যদিকে কাফিরদের সাথে তার সম্পর্ক হয় ঘৃণা, বিদ্বেষ এবং শত্রুতার। এই আকিদা তাওহিদের আবশ্যকীয় চাহিদা।
৪৮. সে-ই ছিল অভিশপ্ত কামাল আতাতুর্ক, যে খিলাফত বিলুপ্তির ঘোষণা দিয়েছিল এবং তুর্কি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রেখেছিল। সে-ই তুর্কিতে ইসলামের পরিবর্তে জোরপূর্বক সেক্যুলারিজম চালু করেছিল।
৪৯. পরিচয়ে অস্পষ্টতা আছে।
৫০. এই চুক্তি মূলত সেই গোপন বৈঠকগুলোতে হয়েছিল, যা ১৯১৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৯১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে হয়েছিল, তখন রাশিয়ার সাথেও তাদের সৌজন্যমূলক সম্পর্ক ছিল। এই বৈঠকগুলোতে ব্রিটেন ও ফ্রান্স খিলাফতে উসমানির অধীনে থাকা আরব অঞ্চলকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলা অবস্থাতেই নিজেদের মাঝে বণ্টন করে নিয়েছিল, যেখানে ভবিষ্যতে তাদের দখল প্রতিষ্ঠা করবে। চুক্তির নাম সাইক্স-পিকো চুক্তি এই জন্য হয়েছিল, কারণ এই চুক্তি ফ্রান্সের কূটনৈতিক জর্জ পিকো ও ব্রিটেনের কূটনৈতিক মার্ক সাইক্সের মধ্যে হয়েছিল।

📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের দ্বিতীয় যুগ : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত (১৯১৯-১৯৪৫ খ্রি.)

📄 নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের দ্বিতীয় যুগ : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত (১৯১৯-১৯৪৫ খ্রি.)


ফ্যাসিবাদ ও গণতন্ত্রের যুদ্ধ
যেমনটা আমরা পূর্বে বর্ণনা করেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভার্সাই চুক্তির ফলে। কারণ এর মাধ্যমে জার্মানির ওপর সামরিক অবরোধ আরোপ করা হয়। তাদের সম্পদসমৃদ্ধ এলাকা ফ্রান্সকে দিয়ে দেওয়া হয়। শুধু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জার্মানিকে যুদ্ধ শুরুর অপরাধে সমস্ত জোটশক্তির যুদ্ধব্যয় আদায়ে বাধ্য করা হয়। জার্মানির কাছে তখন সম্পদসমৃদ্ধ এলাকা এবং জমানো কোনো অর্থ বাকি ছিল না। জার্মান জাতির মধ্যে এই চুক্তির বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিক্রিয়া জন্ম নিয়েছিল। বিশেষ করে চুক্তির সেই পয়েন্টের কারণে যেখানে জার্মানিকে যুদ্ধের একক দায়ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়। জার্মান জাতি এই চুক্তিকে জাতীয় অপমান হিসেবে গণ্য করে। এই চুক্তি জার্মান জাতির জন্য এটা ব্যতীত আর কোনো রাস্তা খোলা রাখেনি যে, তারা হয়তো সারা জীবন গোলামের মতো ট্যাক্স আদায় করে যাবে, নতুবা এই চুক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। বিদ্রোহের জন্য তাদের শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল, যা হিটলার এসে পূরণ করে দেয়।

**হিটলার ও ফ্যাসিবাদের উত্থান**
হিটলার ১৮৮৯ সালে অস্ট্রিয়াতে জন্মগ্রহণ করে। তার ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে আর্টিস্ট হবে, তাই আর্টিস্ট হওয়ার জন্য সে অস্ট্রিয়ার ভিয়ানাতে আসে। কিন্তু সে আর্ট কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। ফলে তার ইতিহাস, ভূগোল ও দর্শন নিয়ে পড়ার সুযোগ হয়। সেগুলো অধ্যয়নের পর হিটলার এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, ইউরোপের সমস্যাগুলোর বড় কারণ দুটি। এক. গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আর দুই. ইহুদি জাতি। তার ধারণামতে ইহুদিরা পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্যকে দখল করে নিয়েছে এবং প্রত্যেক ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের পেছনে তাদের হাত রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সে ধারণা করত গণতন্ত্র ইহুদিদের শাসনব্যবস্থা। যা মানুষকে দুর্বল নেতৃত্ব দেয় এবং সেই নেতৃত্বকে ইহুদিরা সহজেই কব্জা করে নেয়। সে ভিয়ানাতে থাকাকালীন ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। হিটলার তাতে অংশ নেওয়ার জন্য জার্মান বাহিনীতে ভর্তি হয়, যেখানে সে দুবার আহত হয়। যুদ্ধে হিটলারের বীরত্ব অনেক প্রসিদ্ধি লাভ করে। তার বাহাদুরির ফলে তাকে জার্মানির সবচেয়ে বড় সামরিক সম্মাননা আইরোন ক্রস প্রদান করা হয়। ১৯১৯ সালে সে যুদ্ধের ময়দানে বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই জার্মানির পরাজয়ের খবর তার কাছে পৌঁছায়।

এই পরাজয় হিটলারের জীবন পরিবর্তন করে দেয়। সে রাজনীতিতে প্রবেশের ইচ্ছা করে। কিন্তু হিটলারের সামনে তখন এই প্রশ্ন আসে যে, সে রাজনীতির জন্য কোন পার্টিতে অন্তর্ভুক্ত হবে। সেই সময় তার সাক্ষাৎ হয় একটি ছোট দল নাজি পার্টির সাথে, যেখানে সর্বসাকুল্যে ২৫ জন সদস্য ছিল। এই পার্টি জার্মান জাতিকে বিদ্যমান সমস্যা থেকে বের করার দৃঢ় ইচ্ছা রাখত। হিটলারের দৃঢ় প্রতিজ্ঞাও তাদের সাথে মিলে যায়। সে এই পার্টিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সময় জার্মানির অবস্থা ছিল এমন যে, ভার্সাই চুক্তি জার্মানির সমাজকে ধ্বংসের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। এই অবস্থা হিটলারের কাছে উপযুক্ত মনে হয়। তার ভাষণগুলো পুরো জার্মানিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। সে মৃতপ্রায় জার্মান জাতির মধ্যে এই অনুভূতি সৃষ্টি করে যে, জার্মানরা দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তম জাতি এবং এই জাতিকে গোলাম বানানোর অধিকার কারও নেই। পুরো ইউরোপকে শাসন করার অধিকার একমাত্র জার্মানিদেরই রয়েছে। সে ভার্সাই চুক্তিকে বিলুপ্ত করে দেয় এবং এই চুক্তির ওপর দস্তখত করার সমস্ত অভিযোগ রাষ্ট্রের সকল স্যোশালিস্ট ও ইহুদি পার্টির ওপর চাপিয়ে দেয়। সে জার্মানিদের সমস্যার মূল কারণ ইহুদিদেরকে সাব্যস্ত করে এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করে যে, সে শক্তিশালী হওয়ার পর পুরো ইউরোপ থেকে ইহুদিদের বের করে দেবে। সে জার্মান জাতির সাথে প্রতিজ্ঞা করে, যদি ক্ষমতায় যায়, তাহলে ভার্সাই চুক্তির বাস্তবায়নকে বন্ধ করে দেবে। এটাই ছিল সেই স্লোগান, যা ১৯২০ সালের সেই সময়ে জার্মান জাতি শুনতে এবং মানতে উন্মুখ হয়ে ছিল।

১৯৩১ সালে হিটলারের নাজি পার্টি সামান্য কিছু ভোট নিয়ে পার্লামেন্টে যায়। কিন্তু ১৯৩৩ সালে এই পার্টি ক্ষমতায় যেতে সক্ষম হয়ে যায়। সেই বছরেই হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হয়ে যায়; কিন্তু সে চ্যান্সেলর উপাধি ধারণের পরিবর্তে 'ফুয়েরার' উপাধি ধারণ করে। যার অর্থ ছিল 'নেতা'। ক্ষমতায় যাওয়ার পর তার সমস্ত কাজ ভার্সাই চুক্তির বিরুদ্ধে যাওয়া শুরু করে। সে সমস্ত ধারা বাস্তবায়নে বাধা দেয় এবং অপরদিকে সে জার্মান বাহিনীকে নতুনভাবে সজ্জিত করতে থাকে। সেই সাথে সে ট্যাঙ্ক, কামান ও বিমান বানানোর আদেশ জারি করে। ১৯৩৬ সালে সে রাইনল্যান্ড হামলা করে দখল করে নেয়। ১৯৩৮ সালে যুদ্ধ ছাড়াই সে অস্ট্রিয়া দখল করে নেয়। এরপর ১৯৩৮ সালে হিটলার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর সাথে এক চুক্তির মাধ্যমে যুগোস্লাভিয়ার জার্মানির অংশ দখল করে নেয় এবং কয়েক মাসে পুরো দেশ দখল করে নেয়।

পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে হিটলার মুসোলিনির পেশ করা ফ্যাসিবাদকে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। হিটলারের উত্থানের সাথে সাথে ফ্যাসিবাদও ইউরোপে উত্থান হতে থাকে। ফ্যাসিবাদের উত্থানের ফলে ইউরোপে পুঁজিবাদী গণতন্ত্র বিপদে পড়ে যায়। ফ্যাসিবাদের ভিত্তি ছিল দুটি থিউরির ওপর :
**জাতীয়তাবাদ**
**একনায়কতন্ত্র**

হিটলার একদিকে জার্মান জাতীয়তাবাদকে উজ্জীবিত করে নিজেকে সবচেয়ে উত্তম ও সবার ওপর রাজত্ব করার অধিকারী প্রমাণ করে। অপরদিকে সে এই পদ্ধতিতে জার্মানিদের পরিচালিত করে যে, পুরো জাতি শুধু একজন ব্যক্তির ইশারায় চলতে থাকে।

**দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ**
১৯৩৯ সালে হিটলার পোল্যান্ডে হামলা করে ১৮ দিন যুদ্ধের পর পোল্যান্ড দখল করে নেয়। পোল্যান্ড দখল করার সাথে সাথেই ব্রিটেন ও ফ্রান্স যুদ্ধের জন্য লাফঝাঁপ শুরু করে। আর এভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এই যুদ্ধে ইতালি জার্মানির সাথে অংশ নেয়। জার্মানরা পোল্যান্ডের পর ফ্রান্স ও নরওয়ে দখল করে নেয়। পশ্চিম ইউরোপের পর জার্মানি তার নিশানা পূর্ব ইউরোপের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। সে রাশিয়ার ওপর তিনবার হামলা করে; কিন্তু প্রতিকূল মৌসুমি অবস্থার ফলে মস্কো দখল করতে পারেনি। আর এখান থেকেই তার পতন শুরু হয়। রাশিয়ার ওপর হামলার সাথে সাথে সে ইতালির সাহায্যে ব্রিটেনের অধীন মিশরের ওপরও হামলা করে বসে।

জার্মানির এই বিজয়গুলোর সামনে ১৯৪১ সালে যখন ব্রিটেনের পরাজয় নিশ্চিত হচ্ছিল, তখনই আমেরিকা তাদের সাহায্যে ময়দানে নামে। অন্যদিকে জাপান আমেরিকার সাথে শত্রুতার ভিত্তিতে জার্মানির সাথে অংশ নেয়। যার ফলে একদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার জোট হয় এবং অপরদিকে জার্মানি, ইতালি ও জাপানের জোট হয়। রাশিয়া কোনো জোটে প্রবেশ করা ব্যতীতই জার্মানির বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। হিটলারের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল, সে বিভিন্ন অঞ্চলে ও বিভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে একই সাথে যুদ্ধফ্রন্ট খুলে রেখেছিল। যার ফলে এই অবস্থায় যুদ্ধকে দীর্ঘ দিন টিকিয়ে রাখতে সে সক্ষম হয়নি। এই যুদ্ধে আমেরিকা জাপানের ওপর এটম বোমা নিক্ষেপ করে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে জার্মানির পরাজয় জোটবাহিনীকে চতুষ্পার্শ্ব থেকে জার্মানির ওপর হামলা করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। যার ফলে জার্মানির পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। পশ্চিমারা এই যুদ্ধকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করে।

**দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মির ভূমিকা**
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ব্রিটেন হিন্দুস্থানের রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মিকে ব্যবহার করে। রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মি তার প্রভুদের গোলামির জন্য ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাহিনী গঠন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের ২১টি পদাতিক ডিভিশন ও চারটি আর্মার্ড ডিভিশন অংশ নিয়েছিল। যা সর্বমোট ২৫ লাখ সদস্যের সমষ্টি ছিল। এই সেনারা বার্মা, মালয়, ইরাক, ইরান, শাম, লেবানন, ইতালি, সিঙ্গাপুর, তিউনিসিয়া, মিশর ও পূর্ব আফ্রিকার অঞ্চলগুলোতে ব্রিটেনের খিদমত আঞ্জাম দেয়। এই বাহিনীর ৮৭ হাজার সেনা যুদ্ধে নিজের প্রভুদের জন্য জান কুরবান করে এবং ৩০ জন ব্রিটেনের সামরিক পদক ভিক্টোরিয়া ক্রেস্ট অর্জন করে। এই যুদ্ধে বাহিনীতে সেনা ভর্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পাঞ্জাবে থাকা ইউনিয়নিস্ট পার্টির প্রধান সিকান্দার হায়াত খান।

**দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফল**
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কার্যতভাবে পশ্চিমাদের সেই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জিত হয়ে যায়, যার স্বপ্ন তারা দেখছিল। এই সফলতায় অন্তর্ভুক্ত ছিল জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা, ইসরাইল রাষ্ট্রকে অফিসিয়ালি স্বীকৃতি দেওয়া, নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং জার্মান-ইতালির ফ্যাসিবাদের সমাপ্তি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00