📄 পশ্চিমাদের ইতিহাস থেকে অভিজ্ঞতা
যেভাবে আমরা পূর্বের অধ্যায়ের শেষে ইহুদিদের ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ পেশ করেছিলাম, এখানেও আমরা পশ্চিমাদের ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরব। পশ্চিমাদের ইতিহাস পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের মূল আলোচ্য বিষয় হবে, পুরাতন বিশ্বব্যবস্থা বা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার কীভাবে আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা বা নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারে পরিবর্তন হয়।
**খ্রিষ্টবাদের স্বরূপ**
খ্রিষ্টবাদ মূলত আপসপূর্ণ দরবারি এক ধর্ম ছিল। প্রথমে তারা ইহুদিদের ষড়যন্ত্রে ত্রিত্ববাদকে গ্রহণ করে নেয়। যার ফলে তারা বিশ্বাস করতে থাকে যে, ঈসা প্রভুর সন্তান, যিনি মানুষের গুনাহের কাফফারা আদায়ের জন্য নিজেই নিজেকে ক্রুশে চড়িয়েছিলেন। এখন মানুষের মুক্তির মাধ্যম হলো, তারা এই ঘটনার ওপর ইমান আনবে এবং নিজেকে আল্লাহ তাআলার জান্নাতের উপযুক্ত মনে করবে। মানুষকে গুনাহ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য তারা মিশনারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে দুনিয়াতে খ্রিষ্টবাদের দাওয়াত শুরু করে। আফ্রিকা ও আমেরিকাসহ কয়েকটি মহাদেশে তারা এই বিশ্বাস সেখানের বাসিন্দাদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়। তাদের দাবি অনুযায়ী যখন পরিবেশ প্রস্তুত হয়ে যাবে, তখন ঈসা পুনরায় দুনিয়াতে এসে সমস্ত বেইমানকে খতম করবেন। আর তখন দুনিয়াতে রবের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে।
**খ্রিষ্টবাদ প্রটেস্টান্টিজমে রূপান্তর**
ইহুদিদের চক্রান্তে খ্রিষ্টবাদ আরও একবার নিজের বিশ্বাস পরিবর্তন করে। নতুন খ্রিষ্টানদের প্রটেস্টান্ট বলা হয়। এদের সদস্যরা পশ্চিমে পরিবর্তনের নতুন রাস্তা করে দেয়। তারা একদিকে খ্রিষ্টান ইউরোপে সেক্যুলার ধর্মহীনতার দরজা খুলে দেয় এবং অপরদিকে ইহুদিদের বিশ্বাসকে গ্রহণ করে তাদের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে সাহায্য করতে থাকে। তারা খ্রিষ্টানদের মধ্যে এই বিশ্বাস ব্যাপক করে দেয় যে, ইহুদিদের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের পরেই ঈসা আগমন করবেন। কেমন যেন এই আধুনিক খ্রিষ্টানরা ইহুদি ও খ্রিষ্টান দুই ধর্মের বিশ্বাসকে একীভূত করে ফেলে।
**পশ্চিমাদের মধ্যে সেক্যুলারিজমের উত্থান ও তার কারণসমূহ**
পশ্চিমে সেক্যুলারিজমের উত্থানের কিছু কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো :
১. মানবাধিকার আন্দোলন
মানবাধিকার আজকের সমাজে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য এবং মুখরোচক স্লোগান। মানবাধিকার আন্দোলনের শুরু মেঘনা কার্টা থেকে হয়েছে। কিন্তু পাঁচশ বছরের ইতিহাসে এই আন্দোলন বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। কখনো এই যুদ্ধ ছিল শুধু গির্জার বিরুদ্ধে, আবার কখনো ছিল বাদশাহর বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধ কখনো ইউরোপের জনগণের পরিবর্তনের জন্য সংঘটিত হতো, আবার কখনো হতো ইহুদিদের স্বাধীনতার জন্য। এই আন্দোলনের ফলে পুরো বিশ্বে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই আন্দোলনকেই মুসলিম ও উসমানি খিলাফতের বিরুদ্ধে খুব কঠিনভাবে ব্যবহার করা হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানবাধিকার আন্দোলন আধুনিক পশ্চিমাদের খুব প্রভাবশালী মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হয়।
২. ধর্ম ও বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে জন্ম নেওয়া, গিল্ড সমাজে শুরু হওয়া ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের চিন্তাগুলো সেক্যুলারিজমের পক্ষে অনেক উপকারী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ফরাসি বিপ্লবে বিজ্ঞান খ্রিষ্টান ধর্মকে পরাজিত করে ফেলে। অতঃপর ব্রিটেন ও ফ্রান্সের উপনিবেশ বিজ্ঞানকে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে গাদ্দার তৈরিতে ব্যবহার করতে থাকে। স্পষ্ট বিষয় হচ্ছে, যে যুদ্ধ খ্রিষ্টান ও বিজ্ঞানের মধ্যে হয়েছিল, তার সাথে ইসলাম ধর্মের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
৩. খ্রিষ্টান ধর্মের শরয়ি উৎসে পরিবর্তন
ঠিক এই সময়টাতেই রিফরমেশন আন্দোলনের উত্থান হয়। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য বাহ্যিকভাবে গির্জার সংশোধন হলেও তার ফলে খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উৎস পরিবর্তন হয়ে যায়। কিতাবুল মুকাদ্দাসের ব্যাখ্যার অধিকার পাদরিদের সাথে সাথে এখন জনগণের বিবেকের কাছেও অর্পণ করা হয়। এই আন্দোলনই খ্রিষ্টানদের মাঝে নতুন বিভাজন তৈরি করে এবং এনলাইটেনমেন্ট যুগের একটি মাইলফলক হিসেবে প্রমাণিত হয়।
৪. আধুনিক অর্থব্যবস্থার উত্থান
এমনিভাবে মহামারি থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতির ফলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৈশ্বিক কোম্পানি, কারেন্সি ও ব্যাংকের উত্থান হয়। যা পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অতঃপর যখন ধর্মহীনতা ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে খ্রিষ্টানদের পরাজিত করে, তখন এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে মানুষ জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। এবং এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেই পরিচালনার জন্য গণতন্ত্রকে রাজনৈতিক সংবিধান বানিয়ে পেশ করা হয়।
**খ্রিষ্টান-ইহুদি জোট**
ইহুদিরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য খ্রিষ্টান-দুনিয়াতে এমন কিছু আন্দোলন ঘটায়, যার দ্বারা খ্রিষ্টান ধর্মে নতুন গ্রুপ তৈরির পাশাপাশি পুরাতন গ্রুপগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। পুরাতন ও নতুন গ্রুপগুলো বিভিন্নভাবে ইহুদিদের রক্ষা করতে থাকে। এখানে আমরা সেই গ্রুপগুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরছি, যার ইতিহাস আমরা পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করে এসেছি।
*প্রটেস্টান্ট 'জায়োনবাদী' খ্রিষ্টান*
ইহুদিরা প্রথমে এই পদক্ষেপ নিয়েছিল যে, তাদের দুশমনদেরই কিছু লোককে নিজেদের লক্ষ্যের পথে সাহায্যকারী বানিয়ে নেবে। এই লক্ষ্যে গির্জার পোপতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়াজ উত্তোলনকারী মার্টিন লুথারের প্রটেস্টান্ট আন্দোলনের সাথে ইহুদিদের খুব গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়, যা আজও টিকে রয়েছে। এই আন্দোলনের ফলে ক্যাথলিক খ্রিষ্টানরা দুই অংশে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। একটি ছিল মৌলবাদী পুরাতন খ্রিষ্টান ও আরেকটি ছিল সংস্কারপন্থী মডারেট খ্রিষ্টান। দ্বিতীয় দলের একটি বিশেষ বিশ্বাস ছিল, পুরাতন আসমানি কিতাব এবং শরিয়াহগুলোও গ্রহণ করে নিতে হবে। এই চিন্তা প্রটেস্টান্ট দলকে ব্যাপকভাবে ইহুদিদের নিকটবর্তী করে দেয়। এমনকি প্রটেস্টান্ট গ্রুপের অনেকেই বিশ্বাস করে, ফিলিস্তিন ভূমিকে জবরদস্তির মাধ্যমে দখল করার পূর্ণ অধিকার ইহুদিদের রয়েছে। যখন ক্যাথলিক চার্চ এই দলের বিরোধিতা করে, তখন এই দলের অনেক গ্রুপ গির্জার জুলুমের শিকার হয়ে আমেরিকা চলে যেতে থাকে। যা তাদের স্থায়ী বাসস্থানে পরিণত হয়। আস্তে আস্তে ইহুদিদের সাথে এই দলটির নৈকট্য এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, তাদের বিরোধীরা তাদেরকে 'ইহুদিবাদী খ্রিষ্টান' বলা শুরু করে।
*ধর্মহীন খ্রিষ্টান*
মর্ডানিস্ট খ্রিষ্টানরা কিতাবুল মুকাদ্দাসের ব্যাখ্যার অধিকার সাধারণ-বিশেষ নির্বিশেষে সকল জনগণকে প্রদান করে খ্রিষ্টানদের মধ্যে ধর্মহীন শ্রেণি সৃষ্টি করে। যারা দ্বীনের বিধানগুলোর সমালোচনা করত এবং সেগুলোকে নিয়ে বিদ্রূপ করত। যার ফলে পুরাতন ধারার খ্রিষ্টানদের বিশেষ অংশ আলাদা হয়ে যায় এবং অন্যদের বিদ্রুপ ও হাস্যরসের পাত্র হয়ে যায়। কারণ তারা ধর্মহীনতার স্রোতের মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়। ফরাসি বিপ্লবের পর অনেক মানুষ এমন ছিল, যাদের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক ছিল না, এ সত্ত্বেও তারা নিজেদের খ্রিষ্টান মনে করত। এই শ্রেণি পরবর্তী শতাব্দীতে ইউরোপের পার্লামেন্টে ইহুদিদের জন্য মানবাধিকারের ভিত্তিকে শক্তিশালী করে তোলে এবং তাদেরকে সমান নাগরিক অধিকার দিয়ে দেয়। এভাবেই দীর্ঘ শতাব্দী যাবৎ রোমান গির্জার কাছে আবদ্ধ ইহুদিরা মুক্ত হয়ে যায় এবং নিজেদের লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাওয়ার পথে আর বড় কোনো বাধা তাদের জন্য ছিল না।
*রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান*
যদিও এদেরকে ইহুদিদের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করা হতো; কিন্তু এদের ও সাধারণ খ্রিষ্টানদের মধ্যে দূরত্ব এবং ইউরোপের রাজনৈতিক ক্ষমতায় ইহুদিদের শক্তি অর্জিত হওয়ার পর তারাও নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অবস্থা শুধু পরিবর্তনই হয়নি; বরং সম্পূর্ণভাবে উলটে যায়। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রোমের পোপ জন দ্বিতীয় রেখেছিল। সে ইহুদি-বংশের প্রতি ঘৃণাকে প্রভুর সাথে ঘৃণার সমপর্যায়ের সাব্যস্ত করে এবং ইহুদিদের ধর্মীয় বড় ভাই হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৩ সালে সে রোমের গির্জাকে ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করে। পরবর্তী সময়ে সে নিজেই ইসরাইল গিয়ে পবিত্র দেয়ালের নিচে ইহুদিদের জন্য দুআ করে এবং লিখিত একটি মাগফিরাতনামা দেয়ালের চিড়ের মধ্যে রেখে আসে। এই দেয়াল মাসজিদুল আকসার পশ্চিম দিকে রয়েছে। যেখানে ইহুদিরা এসে ইবাদত ও তাওরাত তিলাওয়াত করে। তাদের ধারণামতে এই দেয়াল হাইকালে সুলাইমানির ধ্বংসাবশেষ, যেখানে আবার তা তৈরি করা হবে। এভাবেই ইহুদিরা খ্রিষ্টানদের মধ্যে নিজেদের সমর্থক পেয়ে যায় এবং কম-বেশি সকল খ্রিষ্টানকে এই কথা বোঝাতে সফল হয় যে, এখন ফিলিস্তিনের ওপর ক্ষমতার অধিকার শুধু ইহুদিদের। এমনকি খ্রিষ্টানরাও ইহুদিদের সাথে মিলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধে শামিল হয়ে যায়। এখানে এই কথা জেনে রাখা উচিত যে, ইহুদিরা যেভাবে খ্রিষ্টানদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে নিজেদের এজেন্ট বানিয়ে নিয়েছিল, তেমন চক্রান্ত তারা আজ নতুনভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে করছে।
**ফরাসি বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট তিনটি শূন্যতা এবং হিউম্যানের জেনারেল উইল (আধুনিক শিরক)**
পশ্চিমাদের ইতিহাস অধ্যয়নের ফলে এই কথা বুঝে আসে যে, এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন পুরো ইউরোপে এই বিষয়টি প্রচার করে যে, 'মানুষ আল্লাহ তাআলার বান্দা নয়; বরং নিজের ইচ্ছা ও চাহিদা অনুযায়ী জীবনযাপনকারী হিউম্যান। তাকে ধর্মের অন্ধকার চিন্তাধারা থেকে বের করে নতুন আলোকিত চিন্তা গ্রহণ করে নেওয়া উচিত।' এনলাইটেনমেন্টের দর্শন মানুষকে এই কথা বোঝায় যে, তাকে নিরাপদ ও সুখী থাকা চাই। এই নিরাপত্তা ও সুখের জন্য তাকে বস্তুগত উন্নতি অর্জন করতে হবে। বস্তুগত এই উন্নতির পথে ধর্মের হালাল-হারামের বাধা বিলুপ্ত করা জরুরি। এ ছাড়া বাদশাহরাও এই পথে বড় একটি বাধা; তাই তাদের থেকেও স্বাধীনতা চাই। এই স্বাধীনতা পুরুষ ও নারীর মধ্যে সাম্যের ভিত্তিতে হবে। এই এনলাইটেনমেন্ট চিন্তাধারার প্রভাবে পশ্চিমাদের মধ্যে ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়।
ফরাসি বিপ্লবের অধীনে আমরা আলোচনা করেছি যে, এটি সমাজের মধ্যে তিনটি শূন্যতা তৈরি করে। প্রথমত, গির্জার দাবি ছিল, তারা দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি। তারা ইউরোপের বাদশাহদের খ্রিষ্টবাদ গ্রহণের পর তাদেরকে আল্লাহ তাআলার ছায়া হিসেবে ঘোষণা দিত। এখন গির্জার হুকুমত বিলুপ্তির পর হঠাৎ সার্বভৌমত্বের স্থান খালি হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, অতীতকাল থেকে প্রতিষ্ঠিত বাদশাহি ব্যবস্থা বিলুপ্তির ফলে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। তৃতীয়ত, সমাজে দ্বীনহীনতার ফলে মানুষের সামাজিক আচার-ব্যবহারের মধ্যে শূন্যতা তৈরি হয়। এই শূন্যতাগুলো পূরণের জন্য ধর্মহীনতার ধর্ম, গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার বিস্তারিত আলোচনা দ্বিতীয় অধ্যায়ে আসবে ইনশাআল্লাহ।