📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 খ্রিষ্টবাদের বিশ্বাস

📄 খ্রিষ্টবাদের বিশ্বাস


খ্রিষ্টাব্দ ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত সেন্ট পৌলের আবিষ্কৃত খ্রিষ্টবাদের আকিদাসমূহ : • ত্রিত্ববাদের বিশ্বাস • শূলিতে চড়ানো ও কাফফারার বিশ্বাস • খ্রিষ্টান হওয়ার পদ্ধতি • পবিত্র ক্রুশ • ইসা-এর পুনর্জন্মের বিশ্বাস
ত্রিত্ববাদের বিশ্বাস

খ্রিষ্টানদের কাছে রব হলো তিনজনের নাম কিংবা তাদের পরিভাষায় রব তিন জিনিসের সমষ্টি: বাবা, সন্তান ও পবিত্র আত্মা। তাদের দাবি অনুযায়ী এই তিনজন মিলে একজন খোদা, তিনজন মিলে তিন খোদা নয়। খ্রিষ্টানদের মধ্যে এই তিনজনের সম্পর্ক নিয়েও অনেক মতানৈক্য পাওয়া যায়। ইসায়িরা বলে বাবা হলো আল্লাহ তাআলার সত্তা, সন্তান আল্লাহ তাআলার সিফাতে কালাম এবং রুহুল কুদুস তার সিফাতে হায়াত এবং মহব্বত। আর এই গুণটি ইসা-এর শরীরে প্রবেশ করেছিল।

জেনে রাখা দরকার, কুরআনে ইসা-কে কালিমাতুল্লাহ বলা হয়েছে, যা দ্বারা উদ্দেশ্য তাঁর জন্মের জন্য আল্লাহ তাআলার হুকুম। আল্লাহ তাআলার সিফাত বা সিফাতের হুলুল কখনোই এখানে উদ্দেশ্য নয়। কারণ এই বিশ্বাসকে মেনে নেওয়ার দ্বারা হুলুল ও দেহবাদের শিরকি আকিদা সাব্যস্ত করা আবশ্যক হয়ে যায়। হুলুল ও তাজসিম দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহ তাআলার কোনো সিফাত বা অংশ মাখলুকের ভেতর প্রবেশ করা বা মাখলুকের আকৃতি ধারণ করা, যা আল্লাহ তাআলার ক্ষেত্রে কঠিন শিরকি বিশ্বাস।

শূলিতে চড়ানো ও কাফফারার বিশ্বাস

ইসা-এর ইলাহি সিফাত ধারণ ও তাঁকে আল্লাহর সন্তান ঘোষণা দেওয়ার পর শূলিতে চড়ানোর ঘটনাকে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য খ্রিষ্টানরা কাফফারার বিশ্বাস আবিষ্কার করে। যার মূল বিষয় হচ্ছে, আদম ও হাওয়া থেকে সংঘটিত ভুলের দায়ভার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছড়িয়ে যেতে থাকে। আল্লাহ তাআলার ইনসাফের দাবি হলো, সমস্ত মানুষের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করা। অপরদিকে রহমতের দাবি হলো অপরাধীদের ক্ষমা করে দেওয়া। এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা (নাউজুবিল্লাহ) ইসা-এর মধ্যে নিজের রহমতের সিফাত ঢেলে দেন। ইসা-এর মানব-শরীরে সবার অপরাধ প্রবেশ করিয়ে দেন এবং রুহুল কুদ্দুসের হুলুলের মাধ্যমে সিফাতে রহমত তাঁর শরীরের চলে আসে।
সন্তানের মধ্যে থাকা সিফাতে রহমত সমস্ত মানুষকে ক্ষমা করার জন্য কাফফারা হিসেবে নিজেই নিজেকে ক্রুশে চড়িয়ে দেন। এখন মানুষ দোজখের আগুন থেকে বাঁচার জন্য শুধু এতটুকুই কর্তব্য যে, সে আল্লাহ তাআলার এই কাজকে স্বীকার করে নেবে। অর্থাৎ ইসা -কে আল্লাহর সন্তান মেনে খ্রিষ্টান হয়ে যাবে (নাউজুবিল্লাহ)।

খ্রিষ্টান হওয়ার পদ্ধতি

খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস গ্রহণের জন্য ইসায়ি ধর্মের ব্যপ্টিজম (Baptism) ও খোদায়ি খাবার (Lord's Supper) উৎসব পালন করা হয়। ব্যপ্টিজম হচ্ছে যখন কেউ খ্রিষ্টান হয়, তখন তার ওপর বিশেষ পানি ছিটিয়ে পবিত্র করা হয়। এই সময় খ্রিষ্টান হওয়া ব্যক্তি সাদা কাপড় পরিধান করে। খ্রিষ্টানদের ব্যপ্টিজমের ভিত্তি হচ্ছে, যখন ইসা মানুষকে তাওবা করাতেন, তখন নদীতে গোসলের আদেশ দিতেন, তারপর আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে খাদ্যের ব্যবস্থা করতেন, সেখানে শরবত ও বিশেষ রুটি বণ্টিত হতো।

পবিত্র ক্রুশ

ইসা-কে ক্রুশে চড়ানোর ওপর নিজেদের বিশ্বাস প্রকাশের জন্য তারা পবিত্র ক্রুশের বিশ্বাস চালু করে। এটি শুরু হয় কনস্টান্টাইনের সময় থেকে, কারণ সে নাকি শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় আকাশে ক্রুশের চিহ্ন দেখতে পায় এবং এর ফলে যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়। অতঃপর ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী বাদশাহর মা সেন্ট হেলেনা কোনো এক জায়গা থেকে সেই ক্রুশ নাকি পেয়ে যায়, যেটাকে ইসা-কে শূলিতে চড়ানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে যেকোনো বিপদের সময় এই ক্রুশকে উঁচু করে ধরা হতো। এরপর থেকে খ্রিষ্টানরা প্রত্যেক পবিত্র কাজের শুরুতে, খুশি ও খারাপ সংবাদে আঙুলের ইশারায় চেহারা ও বুকের ওপর ক্রুশের চিহ্ন অঙ্কন করে এবং ক্রুশকে তাবিজ বানিয়ে গলায় লটকাতে থাকে।

ইসা-এর পুনর্জন্মের বিশ্বাস

খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস হচ্ছে, ইসা কিয়ামতের পূর্বে দ্বিতীয়বার আগমন করবেন এবং বিশাল হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবেন। এই বিশ্বাসকেই দ্বিতীয় জীবন বলা হয়। খ্রিষ্টানদের কাছে এই বিশ্বাসের ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ তাআলার সিফাতে হায়াত। তাদের দাবি অনুযায়ী ক্রুশে চড়ানোর তৃতীয় দিন হাওয়ারিদের সামনে ইসা নিজেই এসেছিলেন এই সুসংবাদ দেওয়ার জন্য যে, তিনি দ্বিতীয়বার দুনিয়াতে আসবেন। তখন দুনিয়ার খারাপ শক্তিগুলোকে পরাজিত করে বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবেন। এই আকিদা মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যে থাকা মাসিহের আকিদার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 ইউরোপের ইতিহাস

📄 ইউরোপের ইতিহাস


খ্রিষ্টবাদের প্রথম দুই যুগের সম্পর্ক ছিল তুর্কি, শাম ও ফিলিস্তিনের সাথে; কেননা খ্রিষ্টানদের উত্থান সেই এলাকাগুলো থেকেই হয়েছিল। এগুলো ছিল খ্রিষ্টানদের পূর্বাংশ এবং ইউরোপকে খ্রিষ্টানদের পশ্চিমাংশ বলা হতো। সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আত্মপ্রকাশ ও সাহাবিদের বিজয়সমূহ খ্রিষ্টানদের পূর্বাংশকে পরিপূর্ণভাবে নিঃশেষ করে দেয়। ফলে খ্রিষ্টবাদ শুধু ইউরোপে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় এবং সেখানে তারা নিজেদের শক্তিশালী করার জন্য মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপে এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। তাই যদি এটা বলা হয়, ইউরোপকে নতুনভাবে গঠনকারী শক্তি রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টানরা, তাহলে তা ভুল হবে না।

যেমনটা আমরা ওপরে বলে এসেছি, খ্রিষ্টানদের বাকি যুগগুলোর আলোচনা ইউরোপের ইতিহাসে করব, কেননা এগুলো ইউরোপের ইতিহাসেরও অংশ। ইউরোপের নতুন ইতিহাস তিনটি বড় অংশে বিভক্ত। যার শেষ অংশে আবার দুটি ভাগ রয়েছে।

• অন্ধকার যুগ (৫৯০-৮০০ খ্রি.) • মধ্যযুগ (৮০০-১৪৫৩ খ্রি.) • রেনেসাঁর যুগ (১৪৫৩-১৭৮৯ খ্রি.) ০ যুক্তিবাদের যুগ (১৪৫৩-১৬৭৫ খ্রি.) • আলোকায়নের যুগ (১৬৭৫-১৭৮৯ খ্রি.)

ইউরোপের ইতিহাসের ধাপগুলোর ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। কোনো কোনো এতিহাসিকের মতে, এই বিন্যাসটি সেক্যুলার ঐতিহাসিকরা পেশ করেছে, যারা খ্রিষ্টানদের উত্থানকে অন্ধকার যুগ ও পতনকে আলোকিত যুগ হিসেবে বিবেচনা করে। বর্তমান সময়ে যেহেতু সেক্যুলার ব্যবস্থা ও তাদের চিন্তাধারা বিজয়ী, তাই এখন ইউরোপের ইতিহাসের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিন্যাস হিসেবে এটাকেই বিবেচনা করা হয়। তাই আমরাও এটাকে উল্লেখ করেছি। কারণ এখানে ইউরোপের ইতিহাস বর্ণনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং সেসব প্রতিক্রিয়াকে মুসলিমদের সামনে নিয়ে আসা উদ্দেশ্য, যার সাথে বর্তমান সময়ের মুসলিম উম্মাহ ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর সম্পর্ক রয়েছে।

📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 ইউরোপের অন্ধকার যুগ (৫৯০-৮০০ খ্রি.)

📄 ইউরোপের অন্ধকার যুগ (৫৯০-৮০০ খ্রি.)


ইউরোপের ইতিহাসে ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত সময়কে ডার্ক এজ বা অন্ধকার যুগ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। ঐতিহাসিকগণ এর তিনটি কারণ বর্ণনা করেছেন, যা নিচে আলোচনা করা হচ্ছে।
১. ইউরোপে রোমান সাম্রাজ্যের পতন
কিছু ঐতিহাসিকের মতানুযায়ী এই পরিভাষার সর্বপ্রথম ব্যবহার ১৩৩০ সালে ইতালির ঐতিহাসিক পেত্রার্ক করেছিল। সে পঞ্চম শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্যের পতনকে ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের পতন হিসেবে গণ্য করে অন্ধকার যুগ ঘোষণা দিয়েছিল। এছাড়াও বলেছিল, রোমানরা আবারও উন্নতি করবে এবং ইউরোপের এই অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসবে।
২. ইউরোপের অন্ধকার যুগ ও ইসলামের উত্থান
সপ্তম শতাব্দীতে জাজিরাতুল আরবে ইসলামের আত্মপ্রকাশ ঘটে। অতঃপর ৩০ বছরের কম সময়ে এই দ্বীন পুরো আরবে বিজয়ী হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ -এর অফাতের পর প্রথম খলিফা আবু বকর শামের বাদশাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। যেখানে সে সময় রোমান খ্রিষ্টানদের আবাদি ছিল এবং জুলিয়াস সিজারের শাসন চলমান ছিল। তিনি তাদের বিরুদ্ধে চারটি বাহিনী প্রেরণ করেন। মুসলিম জেনারেলরা কয়েক বছরের মধ্যে রোমান সাম্রাজ্যের পূর্বাংশ পূর্ণভাবে বিজয় করে নেন। কায়সারের ক্ষমতা সংকীর্ণ হয়ে শুধু কনস্টান্টিনোপলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। খ্রিষ্টবাদ যা রোমান সাম্রাজ্যের আবশ্যকীয় অংশ, তা ছোট হয়ে ইউরোপের অনেক সীমিত এলাকায় আবদ্ধ হয়ে যায়। সাহাবিদের হাতে পূর্বাংশে পরাজিত হয়ে আজও খ্রিষ্টবাদ পূর্ণভাবে ইউরোপে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। খ্রিষ্টানদের ইউরোপে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সেই সময়কে অন্ধকার যুগ বলা হয়ে থাকে।
৩. ইউরোপে খ্রিষ্টসমাজ কর্তৃক থিক দর্শনের বিরোধিতা
অন্ধকার যুগ বলার তৃতীয় কারণ সেক্যুলারিজম। কিছু সেক্যুলার ঐতিহাসিকের নিকট এই যুগে গির্জার পক্ষ থেকে গ্রিক দর্শন, সেক্যুলারিজম বা ধর্মহীনতাকে প্রশাসনিক চাপের মাধ্যমে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। এবং এই আক্রমণ ও চাপের ফলে তাদের দাবি অনুযায়ী ইউরোপ বিজ্ঞানের উন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। সেই সাথে খ্রিষ্টান পাদরিদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও বাড়াবাড়ির ফলে ইউরোপে এমন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হয়, যার ফলে ইউরোপে বিজ্ঞানের আলোচনা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। তাদের দাবি অনুযায়ী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বুদ্ধি, জ্ঞান ও স্বাধীনতার ওপর এই বাড়াবাড়ি প্রয়োগ হওয়াই ইউরোপে অন্ধকার যুগের কারণ। অনেক ঐতিহাসিকরা এই পরিভাষাকেই সঠিক মনে করেন না এবং এটাকে সেক্যুলার ঐতিহাসিকদের পক্ষ থেকে খ্রিষ্টান ধর্মের বিরোধিতা মনে করে। এটি অনেক দীর্ঘ এক আলোচনার বিষয়। কিন্তু এখান থেকে যে বিষয়টা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, তা হলো সেই যুগে খ্রিষ্টবাদের পূর্ব ও পশ্চিম দুই অংশেই পতন শুরু হয়। অতঃপর এই যুগের শেষে এসে মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপের মূর্খ ও হিংস্র গোত্রগুলোকে বাধ্য করে খ্রিষ্টান বানানো হয়।
ইউরোপের ইতিহাসের এই প্রথম যুগ পশ্চিম ইউরোপে রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংস থেকে শুরু হয়ে অষ্টম শতাব্দীতে ফ্রান্সের বাদশাহ চার্লিম্যানের সিংহাসনে বসা পর্যন্ত চলমান ছিল। আরও ব্যাপকভাবে বললে, এই সময় ৫শ থেকে ১০০০ সাল পর্যন্ত চলমান ছিল। এই সময়ে ইউরোপে একদিকে গৃহযুদ্ধ চলছিল এবং অপরদিকে খ্রিষ্টবাদ ছড়িয়ে পড়ছিল। জেনে রাখা আবশ্যক যে, এই সময়ে পুরো ইউরোপে খ্রিষ্টানদের ক্ষমতার পথে কোনো বাধার সৃষ্টি হয়নি। কেননা পূর্ব ইউরোপের রোমান সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য খ্রিষ্টানদের ক্ষমতা পূর্ণভাবে টিকিয়ে রেখেছিল। অতঃপর পশ্চিমে ৫৯০ সালে যখন গ্রেগোরি (১ম) পোপ হয়, তখন সে খ্রিষ্টবাদের প্রচারের সীমা জার্মানি ও ব্রিটেন পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়।
সেই সময় খ্রিষ্টান বা রোমান ক্যাথলিক চার্চই ছিল ইউরোপের একক শক্তিধর, যারা ইউরোপকে একত্রিত রেখেছিল। এমনকি চার্চ, স্টেট ও গির্জার ক্ষমতার এতটাই উত্থান হয়েছিল যে, ফ্রান্সের বাদশাহ চার্লিম্যানের সিংহাসনে বসার সময় তার মাথার মুকুট গির্জার পোপ রেখেছিল। সেই খ্রিষ্টান বাদশাহ মুশরিকদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড যুদ্ধের মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ এলাকা দখল করে নিয়েছিল। অতঃপর নিজেকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যের অনুগত হওয়ার ঘোষণা করেছিল।

টিকাঃ
২৯. এখানে রোম সাম্রাজ্যের পতন দ্বারা উদ্দেশ্য পশ্চিম ইউরোপে রোম সাম্রাজ্যের পতন, সামষ্টিকভাবে খ্রিষ্টবাদের পতন নয়। কেননা, রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর পূর্ব ইউরোপে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মাধ্যমে খ্রিষ্টানরা প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তী সময়ে নবম শতকে পশ্চিম ইউরোপেও রোমান ক্যাথলিক চার্চের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা হয়, যারা হোলি রোমান সাম্রাজ্যের ভিত্তি রেখেছিল।

📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 মধ্যযুগ (৮০০-১৪৫০ খ্রি.)

📄 মধ্যযুগ (৮০০-১৪৫০ খ্রি.)


ইউরোপের ইতিহাসের দ্বিতীয় যুগ হচ্ছে মধ্যযুগ (Middle Ages)। অন্ধকার যুগের পরিভাষার মতো মধ্যযুগের পরিভাষার ব্যাপারেও অনেক মতানৈক্য রয়েছে। এই পরিভাষাকে ইউরোপের সেক্যুলার ঐতিহাসিকরা ব্যবহার করে। তাদের নিকট এই যুগটি খ্রিষ্টানদের উত্থানের যুগ এবং এই সময়ে বাদশাহ ও গির্জার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থা উন্নতির চূড়ায় পৌঁছে যায়। এই যুগেই খ্রিষ্টানরা ক্রুসেড যুদ্ধের মাধ্যমে বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করে নেয় এবং স্পেনের অনেক অঞ্চল মুসলিমদের থেকে ছিনিয়ে নেয়। অপরদিকে গির্জার খারাপ কাজের কারনে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার ফলে গ্রিক দর্শনের মতাদর্শগুলো গ্রহণযোগ্যতা পেতে থাকে, যা ছিল সেক্যুলার ঐতিহাসিকদের নিকট মানুষের অন্ধকার যুগ থেকে আলোকিত যুগের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই যুগে তাদের ধর্মহীন চিন্তার শিকড় খুব কঠিনভাবে গেড়ে বসে এবং এই যুগকে ইউরোপে রেনেসাঁ (Renaissance) ও এনলাইটেনমেন্ট (Enlightenment) আন্দোলনের প্রবেশদ্বার হিসেবে গণ্য করা হয়। কিছু সেক্যুলার ঐতিহাসিক এই পরিভাষাকে বিপরীত অর্থে ব্যবহার করে। আর তা হচ্ছে, এটা ওই হাজার বছরের এক ইতিহাস, যা হিউম্যানিজম (Humanism) আন্দোলনের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মোটকথা আধুনিক যুগের চিন্তাগত ভিত্তি বোঝার জন্য ইউরোপের মধ্যযুগ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানের সবচেয়ে বড় ফিতনা মানবাধিকার (Human Rights) আন্দোলন ও গণতন্ত্রের অভ্যুত্থান সেই যুগেই হয়েছিল। এগুলো ছিল গির্জা ও বাদশাহদের সেই শাসনব্যবস্থার বিরোধী প্রতিক্রিয়া, যা সেন্ট অগাস্টিনের দর্শন অনুযায়ী 'আল্লাহ তাআলার হুকুমত ও মানুষের হুকুমত' এই থিউরির মাধ্যমে গঠন করা হয়েছিল। তাই আমাদের জন্য এই বিষয়গুলো খুব গভীরভাবে অনুধাবন করা আবশ্যক।
এই যুগের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ইউরোপের মধ্যে সেক্যুলারিজম দ্বিতীয়বার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা। যা পরবর্তী সময়ে গির্জা ও বাদশাহদের শাসনব্যবস্থাকে পরাজিত করে।
এই যুগের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ব্ল‍্যাক-ডেথ বা সেই মহামারি, যা পুরো ইউরোপের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ আবাদি খতম করে দেয়। ফলে ইউরোপীয় সমাজগুলো কৃষি শিল্প ত্যাগ করে অন্য কাজ বেছে নিতে বাধ্য হয়। এই ঘটনা ইউরোপের সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে বিশাল পরিবর্তন সৃষ্টি করে, যা আস্তে আস্তে কোম্পানি-ভিত্তিক বাণিজ্য ও নতুন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পরিবর্তন হয় এবং ফরাসি বিপ্লবের পর এটা পুঁজিবাদী সিস্টেমে পরিবর্তন হয়ে আজ আমাদের মাথার ওপর চেপে বসেছে। অপরদিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও উন্নতির ধাপ পাড়ি দিয়ে ফরাসি বিপ্লবের পর এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে পরিচালনাকারী সংবিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তৃতীয়ত, এই যুগেই ক্রুসেড যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা দুইশ বছর চলমান ছিল।
যেহেতু এই সবগুলোর সাথে বর্তমান জিহাদের চিন্তাগত ভিত্তিগুলো বোঝার সাথে গভীর সম্পর্ক আছে। তাই আমাদের চেষ্টা থাকবে এই যুগে সংঘটিত ঘটনা ও কার্যক্রমগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা।
সেন্ট অগাস্টিনের থিউরি (আল্লাহর শহর ও মানুষের শহর)
যেমনটা আমরা পূর্বে বর্ণনা করেছি, পঞ্চম শতাব্দীতে ইউরোপে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর তা টুকরা টুকরা হয়ে যায়। যেহেতু রোমান বাদশাহরা গির্জার সংরক্ষণকারী হিসেবে গণ্য হয়, তাই সেই সাম্রাজ্যের পতনের ফলে পশ্চিমা খ্রিষ্টানরা ঝুঁকির মুখে পড়ে যায় এবং সেই অবস্থাতেই সেন্ট অগাস্টিন—যে রোমান গির্জার পাদরি ছিল—৪১৫ সালে 'আল্লাহর শহর ও মানুষের শহর' এই প্রসিদ্ধ মতাদর্শ পেশ করে। সেন্ট অগাস্টিনের এই থিউরি গির্জা, বাদশাহ ও জনগণের মাঝে পারস্পরিক দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করে। ইউরোপের অন্ধকার যুগে এই শাসনব্যবস্থার ভিত্তি রাখা হয় এবং মধ্যযুগে এই শাসনব্যবস্থা উন্নতির চূড়ায় পৌঁছে যায়। এটাই ছিল সেই শাসনব্যবস্থা, যাকে আজকের ঐতিহাসিকগণ ইউরোপের ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার বলে থাকে। সামনে আমরা এই শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
সেন্ট অগাস্টিনের পেশকৃত থিউরিতে চারটি অংশ ছিল:
• গির্জা
• বাদশাহ
• জাগিরদার
• জনসাধারণ
অগাস্টিনের থিউরি অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা দুই ধরনের বিশ্ব বানিয়েছেন। একটি চিরস্থায়ী দুনিয়া, যেখানে মৃত্যুর পর সমস্ত মানুষ চিরকাল থাকবে এবং অপরটি পারিপার্শ্বিক দুনিয়া, যেখানে আজ মানুষরা রয়েছে। চিরস্থায়ী দুনিয়াতে শুধু আল্লাহ তাআলাই হুকুমত চলে এবং সেখানে থাকার মর্যাদা অর্জন করাই মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। সেই চিরস্থায়ী দুনিয়ার সম্পর্ক মানুষের রুহের সাথে। কিন্তু ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সম্পর্ক মানুষের শরীর ও তার প্রয়োজনাদির সাথে। পৃথিবীতে থাকা গির্জাগুলোর সম্পর্ক মূলত চিরস্থায়ী দুনিয়ার সাথে। মূল গির্জা হচ্ছে আসমানে অবস্থিত আল্লাহ তাআলার ঘর, সেই গির্জার প্রধান হচ্ছেন ঈসা আলাইহিস সালাম। জমিনের গির্জার পাদরি ও রাহিবরা রুহানিভাবে আসমানি গির্জার সাথে সম্পৃক্ত। অগাস্টিনের মতানুযায়ী ঈসা আলাইহিস সালাম সেই চিরস্থায়ী দুনিয়ার গির্জার প্রধান এবং দুনিয়ার বাকি গির্জাগুলো শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মতো। মাথা ও শরীরের মধ্যকার যেমন সম্পর্ক, ঈসা আলাইহিস সালাম ও পাদরিদের মধ্যে তেমনই সম্পর্ক।
এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াতে গির্জাই চিরস্থায়ী দুনিয়ায় আল্লাহ তাআলার হুকুমতের প্রতিনিধি, জমিনের মধ্যে যা রোমে অবস্থিত। গির্জা ও পোপরা এই দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি হিসেবে শাসন পরিচালনা করে। যেই ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়, তারা আল্লাহ তাআলার হুকুমতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তাদের মধ্যে রয়েছে পাদরি, বিশপ ও রাহিব। তারা আল্লাহর শহরে বসবাস করে। তাই আজও রোমের গির্জার শহরকে ভ্যাটিকান বা আল্লাহর শহর বলা হয়। আল্লাহ তাআলার এই হুকুমতের বাইরে হচ্ছে মানব-হুকুমত। কিন্তু মানুষের হুকুমতের উদ্দেশ্য এই নয় যে, তারা আল্লাহর হুকুমত থেকে মুক্ত হয়ে নিজের মনমতো চলবে; বরং মানুষের হুকুমত আল্লাহ তাআলার হুকুমতেরই আনুগত্য করে চলবে। গির্জার পাদরিরাই বাদশাহকে জনগণের ওপর শাসন করার আল্লাহ- প্রদত্ত ক্ষমতা প্রদান করত। এই ক্ষমতা প্রদানের পরেই সে জনগণের বৈধ শাসক হিসেবে গণ্য হতো। তাই বৈধ শাসক সে-ই হতো, যাকে গির্জার পক্ষ থেকে নির্ধারণ করা হতো। আর সমস্ত জনগণকে এই বিশ্বাস অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হতো। বাদশাহদের কাজ হতো, নিজের অধীন জনগণকে এই বিশ্বাস অনুযায়ী পরিচালিত করা।
শুরুতে গির্জা দুভাগে বিভক্ত ছিল। একটি পূর্বাংশ, যার কেন্দ্র ছিল কনস্টান্টিনোপল, যার প্রধানকে বিশপ বলা হয়। অপরদিকে পশ্চিমাংশের কেন্দ্র ছিল ইতালির রোম, যার প্রধান পাদরিকে পোপ বলা হতো। যেহেতু খ্রিষ্টানদের উত্থান পূর্বাংশ থেকে হয়েছিল, তাই মহা বিশপকে বড় ও রোমের পোপকে দ্বিতীয় অবস্থানে গণ্য করা হতো। পশ্চিমে খ্রিষ্টানদের উত্থানের ফলে রোমের পোপের পাল্লাও ভারী হয়ে যায়। আস্তে আস্তে পূর্বাংশের গির্জা ও পশ্চিমের গির্জার মধ্যে মতানৈক্য হয়ে দুটাই একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যায়। কনস্টান্টিনোপলের গির্জা অর্থডক্স খ্রিষ্টানদের কেন্দ্র হয়ে যায় এবং রোমের গির্জা ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের কেন্দ্রে পরিণত হয়। এভাবেই খ্রিষ্টানরা দুই দলে ভাগ হয়ে যায়।
পোপ ল্যাটিন শব্দ, যার অর্থ পিতা। এটি খ্রিষ্টানদের মধ্যে একটি উপাধি হিসেবে প্রচলিত হয়ে যায়। যা রোমের বড় পাদরির জন্য নির্দিষ্ট। খ্রিষ্টানদের মধ্যে এই বিশ্বাস ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে, মাসিহের সাথে তার কিছু প্রিয় বান্দার সর্বদা কথা হয়, যাদের কথা ও কাজ আমাদের জন্য হুজ্জত বা দ্বীনের উৎস। যেহেতু তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বুজুর্গ ব্যক্তিকে গির্জার প্রধান হিসেবে নির্বাচন করা হতো, তাই প্রধান পোপের আদেশকে আল্লাহ তাআলার আদেশ হিসেবে মান্য করা হতো। খ্রিষ্টানদের পরিচালনা করার পরিপূর্ণ ক্ষমতা রোমের ক্যাথলিক গির্জার হাতেই ছিল। তাদের সর্বোচ্চ হাকিমিয়্যাহ বা বিধানদাতার বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গির স্বাভাবিক চাহিদা এই ছিল যে, বাদশাহ ও জাগিরদারদের সমস্ত শক্তি গির্জার সম্মান ও পোপের আনুগত্যে ব্যয় করবে।
গির্জার শাসনব্যবস্থা ও বাদশাহর অবস্থান
যেহেতু খ্রিষ্টানদের নিকট মানুষের ক্ষমতা স্বাধীন ক্ষমতা নয়; বরং গির্জার অধীনে পরিচালিত; তাই বাদশাহ গির্জার প্রণীত সিদ্ধান্তের অধীনেই শাসন পরিচালনা করতে বাধ্য। ৯ম শতাব্দীতে চার্লিম্যানই প্রথম বাদশাহ, যে সরকারীভাবে রোমের পোপ গ্রেগোরির হাতে মুকুট পরিধান করে এবং সারা জীবন গির্জার বিজয়ের পথে ব্যয় করে। সে রোমের পোপের আদেশে অনেক মুশরিক গোত্রকে খ্রিষ্টান বানায় এবং তার যুগে ইউরোপে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য বা হোলি রোমান এস্প্যায়ার প্রতিষ্ঠিত হয়। খ্রিষ্টানরা সর্বপ্রথম তার যুগেই ইংল্যান্ডে পৌঁছে এবং দশম শতাব্দীতে এই রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতা জার্মান জাতির হাতে চলে যায়। যারা তাদের শাসনের যুগে এই সাম্রাজ্যকে অনেক শক্তিশালী করে। এমনকি মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের পুরো এলাকাতে এর সীমানা ছড়িয়ে পড়ে। রোমান সাম্রাজ্য সেন্ট অগাস্টিনের সংবিধানকে পূর্ণভাবে গ্রহণ করে নেয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে হোলি রোমান এস্প্যায়ারের শাসন দুর্বল হতে থাকে এবং কয়েকটি অংশে বিভক্ত হয়ে কয়েকটি সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। তা সত্ত্বেও ফরাসি বিপ্লব পর্যন্ত এই সমস্ত সাম্রাজ্য গির্জার আনুগত্যশীল ছিল।
সপ্তদশ শতাব্দীতে খ্রিষ্টানদের রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রগুলোর মাঝে ৩০ বছরের দীর্ঘ এক যুদ্ধ হয়, যা ওয়েস্ট ফেলিয়া চুক্তির দ্বারা শেষ হয়। এই চুক্তির ফলে ইউরোপে নতুন নতুন স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা হতে থাকে। যার মধ্যে ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, জার্মান, বেলজিয়াম ও ইতালি অন্তর্ভুক্ত। এগুলোই ছিল আজকের নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। পরবর্তী সময়ে যখন ধর্মহীনতার ফিতনা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং হিউম্যানিজম বা মানবাধিকার আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন এই রাষ্ট্রগুলোকে বৈধ রাষ্ট্র বানিয়ে দেওয়া হয় অর্থাৎ এই রাষ্ট্রগুলো নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই রাষ্ট্রগুলোতে হোলি রোমান এস্প্যায়ারের ছাপ স্পষ্ট ছিল। সর্বশেষ ১৮০৬ সালে ফ্রান্সের বাদশাহ নেপোলিয়ন এই নিদর্শনকেও নিঃশেষ করে দেয়। যার আলোচনা সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ।
গির্জার শাসনে দুর্নীতি
ইউরোপে এক হাজার বছর যাবৎ আল্লাহর হুকুমত ও মানুষের হুকুমতের শাসনব্যবস্থা চলমান ছিল। কিন্তু সেখানে দুর্নীতি ছিল অনেক বেশি। গির্জা যেহেতু রাজনৈতিক শক্তির পাশাপাশি আধ্যাত্মিক শক্তির কেন্দ্র ছিল, তাই যেমনিভাবে ইউরোপে বাদশাহ নির্বাচনের ক্ষেত্রে রোমান পোপদের বিশেষ ভূমিকা ছিল, তেমনিভাবে ইউরোপের প্রত্যেক বাদশাহও চাইত, যাতে তার ইচ্ছানুযায়ী নতুন পোপ নির্বাচন করা হয়। অপরদিকে প্রত্যেকটা বাদশাহর কাছে গির্জার পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি পাঠানো হতো, যাকে রোমের গির্জার প্রতিনিধি বলা হতো। প্রত্যেক বাদশাহর ইচ্ছা ছিল, তার কাছে পাঠানো প্রতিনিধি তার ইচ্ছানুযায়ী নির্ধারিত হবে। আর এভাবে বাদশাহ ও গির্জার মধ্যকার চাহিদাগুলোই তাদের মাঝে দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যার অনেক উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি আমরা এখানে উল্লেখ করছি।
গির্জা ও বাদশাহদের দ্বন্দ্ব
ইউরোপের গির্জা ও বাদশাহদের মধ্যে বিজয়ী সে-ই হতো, যে অধিক শক্তিশালী হতো। যখন রোমের পোপ শক্তিশালী হতো, তখন সে বিজয়ী হতো এবং কখনো বাদশাহ শক্তিশালী হলে সে বিজয়ী হয়ে যেত। এই ঝগড়া রোমান সাম্রাজ্য ও নতুন পোপ নির্বাচনের ওপর ভিত্তি করে শুরু হয়। রোমান সাম্রাজ্য যেহেতু মজবুত ছিল, তাই তারা পোপ নির্বাচনে প্রভাব ফেলত। গির্জার কার্যক্রমে বাদশাহদের অনুপ্রবেশের ফলে রোমের পোপরা অনেক অসন্তুষ্ট থাকত। অতঃপর হেনরি প্রথম যখন রোমান সাম্রাজ্যের বাদশাহ হয়, তখন সে ছিল বাচ্চা। তখন এর সুযোগ নিয়ে রোমের গির্জা বাদশাহদের পক্ষ থেকে পোপ নির্বাচনে অনুপ্রবেশকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কারণ হিসেবে বলা হয়, এটি একটি নিছক ধর্মীয় বিষয়; তাই এতে অধর্মীয় ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশের কোনো অনুমতি নেই। এর পরিবর্তে পোপ নির্বাচনের জন্য দশজন পাদরির একটি কমিটি গঠন করা হয়। হেনরি বড় হওয়ার পর সে পোপদের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বসে। কিন্তু এই বিরোধিতার জবাবে পোপরা তার থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়ার ফরমান দেয়। ফলে জনগণ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তার ছেলেকে বাদশাহ বানিয়ে দেয়। ১১২২ সালে গির্জা ও বাদশাহদের মাঝে একটি চুক্তির মাধ্যমে দশ জনের কমিটিকে মেনে নেওয়া হয়। আজ পর্যন্ত এই কমিটিই পোপ নির্বাচন করে।
গির্জা ও বাদশাহদের মধ্যে দ্বন্দ্বের দ্বিতীয় উদাহরণ পোপ বোনিফেস ও ফ্রান্সের বাদশাহ ফিলিপ দ্যা ফ্যায়ারের লড়াই। রোমের পোপ বোনিফেস ইউরোপের বাদশাহদেরকে এই ফরমান পাঠায় যে, মানুষের হুকুমতের প্রত্যেক সদস্যকে কোনো মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি আল্লাহর হুকুমতের অধীন করে দেওয়া হোক। ফ্রান্সের বাদশাহ ফিলিপ এমনটা করতে অস্বীকার করে। ফলে রোমের পোপ ফিলিপ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে তাকে অবৈধ ঘোষণা করে। কিন্তু ফিলিপ ছিল শক্তিশালী বাদশাহ। সে ১৩০৩ সালে পোপ বোনিফেসকে গ্রেফতার করে; কিন্তু তিন দিন পর ছেড়ে দেয়। এই সমস্যা ছয় মাস পর পোপের মৃত্যুতে শেষ হয়। কিন্তু গির্জা ও বাদশাহর দ্বন্দ্ব চলমান থাকে এবং একসময় ফ্রান্সের বাদশাহ গির্জাকে রোম থেকে সরিয়ে ফ্রান্সের এভিগনন (Avignon) শহরে স্থানান্তরিত করে ফেলে। ফলে প্রায় একশ বছর পর্যন্ত রোমের পোপ ফ্রান্সের বাদশাহদের অধীনে থাকতে বাধ্য হয়। গির্জা ও বাদশাহদের দ্বন্দ্বের প্রমাণ 'মেঘনা কার্টা' (Megna Carta) প্রসিদ্ধ চুক্তি থেকেও দৃষ্টিগোচর হয়, যা জনগণ ও ব্রিটেনের বাদশাহ কিং জনের (King John) মধ্যে সম্পাদিত হয়েছিল। এই চুক্তিতে গির্জা জনগণের সাথে ছিল। এই চুক্তির প্রথম অংশ ছিল বাদশাহ গির্জার কার্যক্রমে অনুপ্রবেশ করবে না। ইংল্যান্ডের বাদশাহ দ্বিতীয় হেনরির হাতে গির্জার প্রতিনিধি (Thomas Becket) থমাস বেকেটের হত্যা এই দ্বন্দ্বের একটি উদাহরণ। প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধে জেরুজালেমের পাদরি নির্বাচনের ক্ষেত্রে গির্জা ও বাদশাহদের দ্বন্দ্ব সামনে আসে। ইউরোপের পুরো ইতিহাস এই সমস্ত উদাহরণে ভরপুর। এই সমস্ত দ্বন্দ্বে জনগণ গির্জা ও বাদশাহদের চাপে পিষে মরছিল।
গির্জা ও বাদশাহদের দ্বন্দ্ব ছাড়াও গির্জার অভ্যন্তরীণ অনেক দুর্নীতি ছিল। গির্জার রাহিবদের মধ্যে অনেক চারিত্রিক নোংরামি ছিল। ইতিহাসে পাদরি ও রাহিবদের অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের অনেক ঘটনা আছে। এ ছাড়াও দানের সম্পদ নিজেদের স্বার্থে খরচ করা, এই সম্পদ দ্বারা পাদরিদের আলিশান জীবনযাপন একটি প্রসিদ্ধ বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।
সর্বশেষ গির্জার ইতিহাসে 'মাফনামা' বণ্টন অনেক বড় দুর্নীতি হিসেবে সামনে আসে। পোপ ইনোসেন্ট দ্বিতীয় এই নীতি তৈরি করে যে, কেউ যদি গির্জায় বড় ধরনের দান করে বা কোনো গির্জা বানিয়ে দেয়, তাহলে গির্জা থেকে তাকে মাফনামা দেওয়া হবে। যার অর্থ এই ব্যক্তি যত অপরাধ করুক ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। তা ছাড়া সেই সময়ে সবচেয়ে বেশি বদনাম সেই আদালতগুলো নিয়ে হয়েছিল, যা 'ইনকুইজিশন' নামে প্রসিদ্ধ। এই আদালত থেকে ইউরোপ ও স্পেনের মুসলিমরাসহ অনেক খ্রিষ্টানও রক্ষা পেত না। সামান্য থেকে সামান্য কারণে বা গির্জার কোনো কিছুর বিরোধিতা করলেই সাথে সাথে তার ওপর ধর্মত্যাগের মুকাদ্দামা চালানো হতো এবং তাকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। স্পেনের অসংখ্য মুসলিমকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। অনেক ইহুদি এবং প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টানও এই আদালতের বলি হয়।
গির্জার মধ্যে বিভক্তি (১০৫৪ খ্রি.)
মধ্যযুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১০৫৪ সালের রোমান ক্যাথলিক ও কনস্টান্টাইনের মধ্যে বিশাল বিভক্তি (Great Schism)। এই বিভক্তির কারণ ছিল একই সাথে বিশ্বাসগত, বংশীয় ও রাজনৈতিক। বিশ্বাস কেন্দ্রিক মতানৈক্য ছিল বাপ, ছেলে ও রুহুল কুদ্দুসের অবস্থান নিয়ে। বংশীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিভক্তি ছিল পূর্ব দিকের গির্জা ইউনানি ও পশ্চিমের গির্জা ইতালিয়ান হওয়াকে কেন্দ্র করে। রোমান সাম্রাজ্য প্রথম থেকেই দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে ইউরোপে দুটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্ব ইউরোপে অর্থডক্স খ্রিষ্টানদের অধীনে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয় এবং পশ্চিম ইউরোপে গৃহযুদ্ধের পর বাদশাহ চার্লিম্যানের হাতে রোমান ক্যাথলিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
পূর্ব দিকের গির্জাগুলো অর্থডক্স নামে প্রসিদ্ধ ছিল, যাদের কেন্দ্র ছিল কনস্টান্টিনোপল। আজও তুর্কি, শাম, লেবানন, আর্মেনিয়া, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর বসবাসকারী খ্রিষ্টানরা অর্থডক্স গির্জার অনুসরণ করে। অন্যদিকে পশ্চিম দিকের গির্জাগুলো রোমান ক্যাথলিক নামে প্রসিদ্ধ ছিল, যাদের কেন্দ্র ইতালির রোম শহর। এদের সবার প্রধান ছিল পোপ। রোম শহরে ১১০ একর জায়গা আলাদা করা হয়, যার নাম ভ্যাটিকান সিটি। যাকে ১৯২৯ সালে ইতালির প্রশাসন পোপদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য রোমের পোপের অধীনে স্বাধীন পোপীয় রাষ্ট্র ঘোষণা করে দেয়। ভ্যাটিকান সিটি এখনো পশ্চিমা বিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। এই ধর্মের অনুসারী ইউরোপ ও আমেরিকাতেও পাওয়া যায়।
খ্রিষ্টানদের বিভক্তির দুইশ বছর পর রোমের পোপ দুই দলের মধ্যে ঐক্য করার চেষ্টা করে এবং তাতে কিছু সফলতাও অর্জন করে। কিন্তু এই চেষ্টায় পানি ঢেলে দেওয়া হয়, যখন চতুর্থ ক্রুসেড যুদ্ধে ক্রুসেডার সেনারা জেরুজালেম বিজয়ের জন্য বের হওয়ার পর সম্পদের ঘাটতি শুরু হয়। নিজেদের এই সমস্যা দূর করার জন্য ক্রুসেডাররা কনস্টান্টিনোপলের ওপর হামলা করে এবং সেখানে অনেক লুটপাট করে। উগ্রতার শিকার হয়ে সেখানের অর্থডক্স দলের সবচেয়ে বড় গির্জা আয়া সুফিয়াকে অসম্মানিত করে। তাদের প্রধান পাদরির সামনে বসে নাচ-গান করে। এই ঘটনার ফলে এই দুই দল আর কখনোই একে অপরের সাথে মিলিত হতে পারেনি।
ইউরোপের শ্রেণি বিভাজনব্যবস্থা (জাগিরদার বনাম জনগণ)
যখনই জাগিরদারি ব্যবস্থার আলোচনা করা হয়, তখনই আমাদের সামনে জালিম জাগিরদারদের ছবি ভেসে ওঠে। যে নিজের খেত-খামারে মানুষকে বিনা পারিশ্রমিকে খাটায়; কিন্তু তাদের অসুস্থ বাচ্চার জন্য টাকা দেয় না বা তাদের যুবতি মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে আসে ইত্যাদি। এই বিষয়গুলো জাগিরদারি ব্যবস্থার একটি দিক; কিন্তু এর মূল অংশটি মানুষের দৃষ্টি থেকে অদৃশ্য।
জাগিরদার ব্যবস্থা হচ্ছে, আঞ্চলিকভাবে জনগণের শৃঙ্খলা-বিন্যাস পরিচালনার সবচেয়ে পুরাতন সিস্টেম, যা বাদশাহরা জনগণকে পরিচালনা করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই ব্যবস্থা অনেক ইসলামি অঞ্চলেও প্রচলিত ছিল। এই ব্যবস্থা খ্রিষ্টান ইউরোপ, রাশিয়া, পূর্ব চীন ও হিন্দুস্থানে প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই ব্যবস্থা মানবজাতির সবচেয়ে বেশি সময় যাবৎ প্রচলিত ও সবচেয়ে সফল ব্যবস্থা। তবে জেনে রাখা উচিত যে, এই ব্যবস্থার ভিত্তি, নীতিমালা ও পদ্ধতি প্রত্যেক এলাকা ও বাদশাহর ভিন্নতায় ভিন্ন হয়ে থাকে। যেখানে এই ব্যবস্থায় বা জাগিরদারের ক্ষমতায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছিল কিংবা বাদশাহরা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, তখন জাগিরদাররা নিজেরাই সেই এলাকার বাদশাহ হয়ে যেত এবং তাদের জুলুম ও নির্যাতন চরম আকার ধারণ করত, যা আজও ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত রয়েছে। বাদশাহ ও জাগিরদারদের এই জুলুমের ফলেই জনগণের মধ্যে সেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল, যা ইউরোপে মানবাধিকার আন্দোলনের জন্ম দেয় এবং সেটাই পরবর্তী সময়ে বর্তমান গণতন্ত্রের আকৃতি ধারণ করে। তাই আমরা মনে করি, বর্তমান জিহাদের চিন্তাগত ভিত্তি বোঝার জন্য মুসলিমদেরকে জাগিরদার ব্যবস্থাকে বিস্তারিত বোঝা জরুরি।
জাগিরদারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাদশাহদের তিনটি বড় উদ্দেশ্য ছিল। এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্দেশ্য ছিল জনগণ থেকে অর্থনৈতিক সেবা গ্রহণ করা। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল এলাকার শৃঙ্খলা-বিন্যাস পরিচালনা করা এবং তৃতীয় উদ্দেশ্য ছিল সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা। পূর্বের জমানার জনগণ কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং এই কৃষি কাজ ফসলি জমিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাই বাদশাহ যখন কাউকে কোনো এলাকার পরিচালনার জিম্মাদারি দিত, তখন ফসলি জমির বিশাল অংশ তাকে দিয়ে দেওয়া হতো। অতঃপর জাগিরদাররা এই ভূমির ফসল ও আমদানি দ্বারা এলাকার শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিচালনা করত।
এই ব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হতো ভূমির মালিকানা নিয়ে। এই ভূমি বাদশাহ জাগিরদারকে তার ব্যক্তি মালিকানাধীন বানিয়ে দেবে, নাকি এই ভূমির মালিকানা প্রশাসনের হাতে থাকবে এবং জাগিরদার শুধু তার ব্যবস্থাপক হবে? প্রথম অবস্থাতে জাগিরদারকে যখন জমিনের মালিকানা দেওয়া হতো, তখন সেই জাগিরদার অনেক শক্তিশালী হয়ে যেত এবং একসময় তার সন্তানরা সেই এলাকার বাদশায় পরিণত হতো।
ইউরোপের ইতিহাসে বাদশাহদের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি ছিল জাগিরদারকে ভূমির ব্যক্তিগত মালিক বানিয়ে দেওয়া। মালিক হয়ে যাওয়ার ফলে ইউরোপের জাগিরদারদের আলাদা একটি শ্রেণি তৈরি হয়ে যায়। যা আস্তে আস্তে এতটাই শক্তিশালী হয়ে যায় যে, তারা জনগণকে নিজেদের গোলাম বানিয়ে ফেলে।
অন্যদিকে মুসলিমরা এই ব্যবস্থাকে ভিন্ন পদ্ধতিতে পরিচালনা করত। ভূমি দেওয়ার সময় বাদশাহ জাগিরদারদের মালিকানা ও সরকারী মালিকানার ভূমি আলাদা করে দিত। জমিনের যেই অধিকাংশ অংশ দ্বারা এলাকার কার্যক্রম পরিচালিত হতো, সেটা সরকারী মালিকানাধীন থাকত। যার ফলে বিশেষ শ্রেণি ও জনগণের মধ্যে অতিরিক্ত পার্থক্য তৈরি হতো না। অপরদিকে ইসলামি এলাকাগুলোতে শরিয়াহ বাস্তবায়িত ছিল এবং জাকাত-উশরের ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ভূমির মালিক ও কৃষকের মাঝে স্পষ্ট ন্যায়-ভিত্তিক শরয়ি নীতিমালা ছিল; যার ফলে কোনো সমস্যা দেখা দিত না।
মুসলিমদের অঞ্চলেও জাগিরদারির অস্তিত্ব ছিল। জাগিরদার ব্যবস্থা বিকৃত হয়ে জুলুমের আকৃতি ধারণ করে, যখন তারা দ্বীনের বিধান বাস্তবায়ন ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু ইউরোপের খ্রিষ্টানদের কাছে কোনো শরিয়াহ ছিল না; তাই এই ব্যবস্থা রোমের পোপ ও বাদশাহরা নিজেদের বানানো নীতিমালা দিয়ে পরিচালনা করত। এই নীতিগুলোর ক্ষেত্রে সম্মানিত শ্রেণির জন্য সহজ ব্যবস্থা রাখা হলেও জনগণের ওপর সমস্ত বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হতো।
জাগিরদার ব্যবস্থার দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল এলাকার শৃঙ্খলা ও বিন্যাস ঠিক রাখার জন্য উৎপাদিত ফসল থেকে এলাকার কাজি, পুলিশ ও প্রশাসনের সমস্ত কর্মচারীর বেতন সরবরাহ করা। এ ছাড়াও এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমের অর্থ এই ভূমি থেকেই অর্জিত হতো। যার দ্বারা বুঝে আসে, এই ব্যবস্থা এলাকার শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনাদিও পূরণ করত। এই ব্যবস্থার তৃতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে, বাদশাহর জন্য প্রয়োজনের সময় বাহিনীর রসদ সরবরাহ করা এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা সদস্যের বেতন ও ঘোড়ার খোরাকিও এই জাগিরদারদের জিম্মাদারি ছিল। এই আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, জাগিরদার ব্যবস্থা জাগিরদারকে ক্ষমতা দানের পাশাপাশি অনেক বড় দায়িত্বও চাপিয়ে দিত।
ইউরোপে যা হতো, দায়িত্ব ও ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্যহীনতার ফলে জুলুম ও বাড়াবাড়ি শুরু হতো। জাগিরদারকে জমির মালিক বানিয়ে দেওয়ার কারণে পুরো সমাজের মধ্যে শ্রেণি-বৈষম্য শুরু হয়ে যায়। যেখানে সবার ওপরে থাকত রোমের পোপ ও গির্জা। তাদের পরে যারা শাহি বংশের সাথে সম্পর্ক রাখত, তাদেরকে উঁচু শ্রেণি হিসেবে গণ্য করা হতো। এদের পরেই ছিল সম্মানিত শ্রেণি, যেখানে জাগিরদার, সেনাবাহিনীর বড় অফিসার ও নাইট এবং এলাকার পাদরিরা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর বাইরে বাকি সমস্ত জনগণ ছিল সাধারণ শ্রেণির। ব্রিটেনে তাদেরকে কমন্স (Commons) বলা হতো। সেই সময় বাস্তবিকভাবে সাধারণ জনগণের অবস্থা গোলাম থেকেও নিচে ছিল, যাদের কাজ ছিল শুধু জাগিরদারদের খিদমত করা। এর বিনিময়ে যা-ই পেত, সেটাই তাদের মেনে নিতে হতো। সাধারণ জনগণের এতটুকু ক্ষমতা ছিল না যে, তারা কোনো জাগিরদারদের পক্ষ থেকে জুলুমের শিকার হলে নিজের ইচ্ছা মুতাবিক অন্য জাগিরদারের কাছে কাজ করবে অথবা সমস্ত জাগিরদারদের থেকে দূরে গিয়ে অনাবাদি জমিনকে আবাদ করবে। এটা এমন অপরাধ ছিল, যার শাস্তি বন্দিত্ব বা মৃত্যু।
গির্জা, বাদশাহ ও জাগিরদারদের শয়তানি ত্রিভুজ পোপ, বাদশাহ ও জাগিরদাররা জুলুম ও নির্যাতনের পাহাড় গড়ে তুলেছিল। একেবারে সাধারণ কারণে জনগণের ওপর জুলুম ও নির্যাতনের পাহাড় চাপিয়ে দিত। তাদের থেকে ফসল ছিনিয়ে নেওয়ার পর তাদের প্রয়োজনীয় খাবারের ব্যবস্থাটুকু পর্যন্ত করা হতো না। সম্পদ জমা করা তাদের জন্য নিষিদ্ধের পর্যায়ে ছিল। ব্যবসা বা অন্যান্য পেশাদার ব্যক্তিদের ওপর সাধ্যের অতিরিক্ত ট্যাক্স বসানো হতো। যদি আদায় করতে না পারত, তখন তাকে ও তার ব্যবসাকে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত করত যে, তাকে ব্যবসা থেকে স্থায়ীভাবে হাত গুটিয়ে নিতে হতো। এমনকি তার ঘর এবং ইজ্জত-সম্মানটুকুও রক্ষা পেত না। ভয়াবহ ব্যাপার হলো, এই সমস্ত কাজ গির্জার ছত্রছায়ায় আল্লাহ তাআলার নাম ব্যবহার করে করা হতো।
মধ্যযুগে ইউরোপের জনগণের সামনে একদিকে ছিল গির্জা, অপরদিকে বাদশাহ ও তৃতীয় দিকে জাগিরদার। জনগণের অবস্থা এই ত্রিপক্ষীয় চাপে একজন গোলামের থেকেও বেশি খারাপ ছিল। এই অবস্থাটাই ইউরোপের মধ্যে ধর্মহীনতার সয়লাবের সুযোগ তৈরি করে দেয়। আর এই ধর্মহীনতা মানবাধিকার আন্দোলনের রূপ নেয়, যা সময়ের সাথে সাথে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন হয়ে যায়।
মেঘনা কার্টা বা স্বাধীনতার মহান দলিল (১২১৫ খ্রি.)
১১৯৯ সালে এপ্রিল মাসে ইউরোপের খ্রিষ্টান হিরো ও ইংল্যান্ডের বাদশাহ (Richard, the Lion Hearted) রিচার্ড দ্যা লায়ন হার্টের মৃত্যুর পর তার ভাই 'জন' (John I) ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসে। জন তার শাসনের শুরুতেই বিপদে পড়ে যায়, যখন তার ও রোমের পোপের মধ্যে পাদরি নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। উভয় গ্রুপ তাদের নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে ইংল্যান্ডের পাদরি নির্ধারণ করতে চাচ্ছিল। এই দ্বন্দ্ব এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, একসময় গির্জার পক্ষ থেকে রোমের বাদশাহ জন-এর বাদশাহি ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং ফ্রান্সের বাদশাহকে তার দখলকৃত অঞ্চলগুলো ফিরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাদশাহ জন-এর জন্য পরিস্থিতি অনেক খারাপ হয়ে যায়। বাদশাহর সিংহাসন থেকে অপসারিত হওয়ার সময়কালে ইংল্যান্ডের সমস্ত গির্জায় ইবাদত বন্ধ হয়ে যায়। জনগণের মধ্যে সমস্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অপরদিকে জাগিরদাররাও বাদশাহ জন-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসে।
বাদশাহ জন-এর সামনে নিজের শাসন-ক্ষমতা বাঁচানোর জন্য তখন গির্জার সামনে হাতিয়ার ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না; তাই সে এমনটা করে এবং বাদশাহি বাঁচিয়ে নেয়। কিন্তু বাদশাহর বিরুদ্ধে জনগণ ও জাগিরদারদের বিদ্রোহ পুরোদমে চলমান ছিল। বাদশাহ এই বিদ্রোহ দমনের জন্য গির্জার কাছে অনুরোধ জানায়, তখন গির্জা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বাদশাহ ও জনগণের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়, যা ল্যাটিন ভাষায় লিখিত। এই চুক্তিকে মেঘনা কার্টা (Megna Carta) বা স্বাধীনতার মহান দলিল বলা হয়। এই চুক্তির অধীনে বাদশাহ জনগণের কিছু দাবি মেনে নেয়। যার মধ্যে একটি ছিল, কোনো অপরাধ ব্যতীত কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না, যা বর্তমান পরিভাষায় নিরপরাধ গ্রেফতারের নীতি বলা হয়। এই চুক্তিতে আরেকটি বিষয় ছিল জনগণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা। যেই কমিটির কাজ হবে শুধু জনসাধারণের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাদশাহকে পরামর্শ দেওয়া। ইউরোপের ঐতিহাসিকগণ এটাকে পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ মনে করে। বাস্তবে এমনটাই হয়েছিল, কারণ এক শতাব্দীর ভেতরেই বাদশাহ জন-এর পৌত্র এডওয়ার্ড প্রথম পার্লামেন্টের ভিত্তি স্থাপন করে। এটা শুধু ইংল্যান্ড নয়; বরং পুরো ইউরোপের প্রথম পার্লামেন্ট ছিল। মেঘনা কার্টা চুক্তি বাদশাহ উইলিয়ামের সেই চুক্তিকেও বাতিল করে দেয়, যেখানে বাদশাহ একটি বিরান ভূমিকে নিজ এলাকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল।
মোটকথা মেঘনা কার্টা চুক্তি ইউরোপীয় বিশ্বে পরবর্তী বছরগুলোতে অনেক গভীর প্রভাব ফেলেছিল। মেঘনা কার্টাকে আজকের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় থাকা প্রত্যেকটা আইন এবং মানুষের বানানো নীতিমালার উৎস ও ভিত্তি মনে করা হয়। এই মেঘনা কার্টাই আজকের মানবাধিকার আন্দোলনের শুরু, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে পশ্চিমাদের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং আজও হচ্ছে। মেঘনা কার্টাই ছিল পশ্চিমে সেক্যুলারিজম ছড়িয়ে দেওয়ার মূল উৎস।
মধ্যযুগে সেক্যুলারিজমের সূচনা
মধ্যযুগে ধর্মহীনতার বিষাক্ত কীটগুলো ইউরোপে জন্ম নিতে শুরু করে। ঐতিহাসিকরা এর তিনটি কারণ উল্লেখ করে থাকে। প্রথমটি মেঘনা কার্টা চুক্তি, দ্বিতীয়টি অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা, তৃতীয়টি প্যারিস ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রিক দর্শনের শিক্ষকদের বহিষ্কার, যারা পরবর্তী সময়ে অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজে এসে শিক্ষকতা শুরু করে। কিছু ঐতিহাসিকের মত হচ্ছে, মেঘনা কার্টা চুক্তির অধীনে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে অনাবাদি জমি সাধারণ মানুষরা ব্যবহার শুরু করে। এই সমস্ত ভূমি আবাদের ফলে নতুন সমাজাচার অস্তিত্বে আসা শুরু হয়। সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবীরা এখানে আসতে থাকে, যারা পোপ ও জাগিরদার ব্যবস্থার অধীনে অনেক নির্যাতিত হচ্ছিল। তেমনিভাবে বিভিন্ন শহর গড়ে ওঠে, যেখানে ব্যবসা ও কারখানা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। কারিগরি ও ব্যবসায়িক পেশার জন্য তারা সেখানে নতুন প্রতিষ্ঠান ও কারখানা বানাতে শুরু করে। এই আবাদিগুলো ইতিহাসে 'গিল্ড' নামে পরিচিত।
শুরুতে এই আবাদিগুলোর জনগণ বাদশাহ বা গির্জার পক্ষ থেকে কোনো প্রকার নাগরিক অধিকার প্রাপ্ত হয়নি। যেহেতু সেই সময় শিক্ষা দেওয়ার অধিকার শুধু গির্জার হাতেই ছিল, তাই গিল্ড আবাদিগুলোর শিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়। সেই সময় জনগণের কাছে প্যারিস ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষা সমাপ্তকারী কিছু ব্যক্তি আসে, যাদেরকে গির্জার পক্ষ থেকে ধর্মহীন ঘোষণা করা হয়েছিল। কারণ তারা গ্রিক দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা শিক্ষার পর খ্রিষ্ট ধর্মের কিছু মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। তাদের চিন্তাধারাকে গির্জা কর্তৃক ধর্মত্যাগ (heresy) নাম দেওয়া হয়েছিল। এই ধর্মহীন ব্যক্তিরা ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডে আসে এবং সেখানের জনগণের মধ্যে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করে, যারা গির্জার চিন্তা-চেতনা ও শিক্ষা থেকে দূরে ছিল। এভাবেই গিল্ড সমাজে ধর্মহীনতা ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী দুই শতকের মধ্যে ক্যামব্রিজ ও অক্সফোর্ড শহরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ভার্সিটিগুলো ইউরোপে এমনভাবে প্রসিদ্ধি পায় যে, পুরো ইউরোপ সেখান থেকে জ্ঞানের পিপাসা মেটাতে বাধ্য হয়। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আজকে ক্যামব্রিজ ও অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি নামে পরিচিত।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় দেড়শ বছর যাবৎ মুসলিম ভূখণ্ডে মুনাফিক বাহিনী তৈরি করে পাঠাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইন্টিফিক সোসাইটি গঠন করা হয়, যাদের বাহ্যিক উদ্দেশ্য পুরো দুনিয়ার বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও রিসার্চগুলো একত্রিত করে প্রচার করা।
যাতে বিজ্ঞানের উন্নতি ও অগ্রগতিতে সাহায্য করা যায়। কিন্তু মূলত তারা এর আড়ালে খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে ইউরোপে বিজ্ঞান ও ধর্মের দ্বন্দ্বের সূচনা করে।
পরবর্তী সময়ে এই সমাজগুলো থেকেই ইংল্যান্ডে ধর্মহীনতার আন্দোলন শুরু হয়। সরকার ও ধর্মহীন জনগণের মধ্যে মানবাধিকারের নামে অনেক মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও সামরিক যুদ্ধ হয়। যার ফলশ্রুতিতে মেঘনা কার্টা চুক্তির অধীনে প্রতিষ্ঠিত পার্লামেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অতঃপর ইংল্যান্ড থেকে যখন এই বিষয়গুলো পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তখন গির্জা ফ্রান্সের ধর্মহীনতার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করে। ফ্রান্সের বাদশাহগণ—যারা নিজেরাই কট্টর খ্রিষ্টান ছিল, তারাও গির্জাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে।
ওয়াইক্লিফের সংশোধন আন্দোলন (১৩৮৪ খ্রি.)
মধ্যযুগে গির্জার অনেক দুর্নীতি সামনে আসা শুরু হয়। কিন্তু এই দুর্নীতি প্রতিরোধে সক্ষম কোনো শক্তি তখন ছিল না। এমনকি যারাই তাদের বিরুদ্ধে সাহসের সাথে কথা বলত, তাদেরই মুখ বন্ধ করে দেওয়া হতো। এমনই একটি আন্দোলন ছিল ওয়াইক্লিফের আন্দোলন। (১৩৩০-১৩৮৪ খ্রি.) ওয়াইক্লিফকে রিফরমেশন বা সংশোধন আন্দোলনের জনক বলা হয়। ওয়াইক্লিফ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে দর্শন শাস্ত্রে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে এবং পরবর্তী সময়ে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করে। পাশাপাশি সে আলাদা স্থানে রোমের গির্জা থেকে স্বাধীন এক চার্চে পাদরির দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে থাকে। যখন ব্রিটেনের বাদশাহ তৃতীয় এডওয়ার্ডের কাছে তাকে রোমের গির্জার প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করা হয়, তখন সে প্রসিদ্ধি লাভ করে। ওয়াইক্লিফ পোপের বিরুদ্ধে ও পার্লামেন্টের ক্ষমতা নিয়ে কয়েকটি ছোট বই প্রচার করেছিল। যার ফলে এই বিষয়টা সমাধানের জন্য বাদশাহ পোপের প্রতিনিধিদের সাথে হওয়া কনফারেন্সে তাকেও প্রতিনিধি বানায়।
যদিও কনফারেন্স ব্যর্থ হয়েছিল; কিন্তু পার্লামেন্টে ওয়াইক্লিফ অনেক প্রসিদ্ধি অর্জন করে ফেলে। এরপর ওয়াইক্লিফ এমন একটি বই লিখে, যার মধ্যে চার্চ অফ ইংল্যান্ডের ওপর অসততার অভিযোগ তোলা হয়। সেই সাথে সে অক্সফোর্ডে তার সাথিদের নিয়ে ল্যাটিন বাইবেলকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে প্রচার শুরু করে দেয়। যা সেই সময় গির্জার নীতিতে নিষিদ্ধ ছিল। এই কাজের ফলে তাকে খ্রিষ্টান আদালতে পেশ করা হয়। আদালত থেকে তাকে ধর্মহীন ঘোষণা করা হয় এবং অক্সফোর্ড থেকে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু সে নিজের মিশন চালিয়ে যায় এবং নিজের চার্চে পাদরির দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে থাকে। সে প্রচারকদের একটি দল তৈরি করে, যারা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিতে শুরু করে।
তার মৌলিক শিক্ষা ছিল—
• আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক করার জন্য কোনো পাদরি বা গির্জার প্রয়োজন নেই।
• যে কেউ খ্রিষ্টানদের পবিত্র কিতাবের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে নিজের জীবনকে আলোকিত করে নিতে পারবে।
• খ্রিষ্টান আলিমদের জন্য উচিত ইনজিলে আলোচিত মাসিহ ও হাওয়ারিদের মতো ফকিরি জীবনযাপন করা।
• খ্রিষ্টবাদের মধ্যে যোদ্ধাবাজ ও গোলামের মতো শ্রম দেওয়ার কোনো বৈধতা নেই।
১৩৮৪ সালে তার মৃত্যুর পর শাগরিদরা তার অনূদিত ইনজিলকে ব্যাপকভাবে প্রচার করে; কিন্তু তাদের কেউই তার আন্দোলনকে ধরে রাখতে পারেনি। তারপর অনেক সংশোধনকারী ব্যক্তি জন্ম নেয়, যার মধ্যে 'বোহেমিয়া'-এর 'জন হাস' অনেক প্রসিদ্ধ। সে যখন ওয়াইক্লিফের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রচার করে, তখন তাকে গির্জার হুকুমে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি স্বয়ং ওয়াইক্লিফের লাশকে কবর থেকে বের করে জ্বালানো হয়। অতঃপর সর্বশেষ ষোড়শ শতাব্দীতে মার্টিন লুথারের রিফরমেশন আন্দোলন সফল হয়, যার আলোচনা আমরা সামনে করব। এমনকি মার্টিন লুথার পর্যন্ত স্বীকার করেছিল যে, সে এই ক্ষেত্রে ওয়াইক্লিফের কাছে ঋণী।
ক্রুসেড যুদ্ধ (১০৯৫-১২৭১ খ্রি.)
মধ্যযুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ক্রুসেড যুদ্ধ। মূলত মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মাঝে ক্রুসেড যুদ্ধ আল্লাহর নবির জীবদ্দশা থেকেই শুরু হয়। মুতার যুদ্ধ ছিল প্রথম যুদ্ধ, যা মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদ প্রথমবার মুসলিমদের জেনারেল হিসেবে সামনে আসেন। নবি -এর জীবনে তাবুক যুদ্ধ ছিল দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধ, যেখানে আল্লাহর নবি নিজেই অংশগ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু সেখানে কোনো লড়াই হয়নি। রোমান খ্রিষ্টানদের সাথে দ্বিতীয় যুদ্ধ হয় উমর -এর যুগে, যেখানে সাহাবায়ে কিরামের বিজয় অর্জিত হয়। বনু উমাইয়্যা ও বনু আব্বাসের সাথে কনস্টান্টিনোপলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে যুদ্ধ চলমান থাকে। কুসতুনতিনিয়া বিজয়ের প্রতি মুসলিমদের সর্বদাই আগ্রহ ছিল। কারণ কুসতুনতিনিয়া বিজয়কারী বাহিনীর জন্য আল্লাহর নবি জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। এই ফজিলত অর্জনের জন্য সাহাবায়ে কিরাম নিজেদের বৃদ্ধ বয়সেও কুসতুনতিনিয়ার ওপর হামলাকারী বাহিনীতে অংশগ্রহণ করতেন। এমনই এক যুদ্ধে আবু আইয়ুব আনসারি অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেখানেই তাঁর অফাত হওয়ায় তাঁকে কুসতুনতিনিয়া দুর্গের দেয়ালের পাশে কবর দেওয়া হয়।
পরবর্তী যুগে সেলজুক সুলতানরা বাইজেন্টাইনের ওপর আক্রমণ করে। এই সমস্ত যুদ্ধকেও ক্রুসেড যুদ্ধ বলা হয়। তবে ইতিহাসে দশম শতাব্দীর শেষ থেকে শুরু হয়ে এয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত চলমান যুদ্ধগুলো ক্রুসেড যুদ্ধ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। সম্ভবত এর কারণ ছিল ক্রুসেডারদের বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করা। প্রথমবার আকসা মুসলিমদের হাত থেকে ছুটে যাওয়া ছিল ইতিহাসের অনেক বড় একটি ঘটনা। সেই সাথে ইমাদুদ্দিন জিনকি, নুরুদ্দিন জিনকি ও সালাহুদ্দিন আইয়ুবী-এর নেতৃত্বের প্রসিদ্ধিও এর একটি কারণ হতে পারে, যারা মুসলিমদের হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে আনেন। আবার এই ক্ষেত্রে সুলতান জাহির বাইবার্সের ব্যক্তিত্বও একটি কারণ হতে পারে, কেননা তিনি আইনে জালুতের যুদ্ধে শুধু হালাকু খানকে পরাজিত করেই ক্ষান্ত হননি; বরং খ্রিষ্টানদেরকে ফিলিস্তিন থেকে বের করে পৌনে দুইশ বছরের চলমান যুদ্ধকে সমাপ্ত করেন।
ক্রুসেড যুদ্ধ এখানেই শেষ হয়নি, উসমানি খিলাফতের সময় সংঘটিত পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের যুদ্ধগুলোও ক্রুসেড যুদ্ধের অন্তর্ভুক্ত। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেন ও ফ্রান্স কর্তৃক মুসলিম উম্মাহর ওপর উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করাও ক্রুসেড যুদ্ধ ছিল। কিন্তু সেগুলো ছিল ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, ভিন্ন অবস্থান ও ভিন্ন ধরনের যুদ্ধ। ঊনবিংশ শতাব্দীর এই যুদ্ধগুলোকে ক্রুসেড-জায়োনিস্ট যুদ্ধ বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। সেই যুদ্ধগুলোর বিস্তারিত আলোচনা আমরা এই কিতাবের দ্বিতীয় অংশে করব। এখানে আমরা মধ্যযুগের পৌনে দুইশ বছরের ক্রুসেড যুদ্ধগুলো নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব।
প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধ (১০৯৫-১০৯৯ খ্রি.)
প্রথম ক্রুসেড শুরু হয় ১০৯৫ সালে রোমের পোপ উরবান ২য়-এর ঘোষণার মাধ্যমে। রোমের পোপ খ্রিষ্টান-বিশ্বে ছোটাছুটি করে সমস্ত বাদশাহকে আকসা ও ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি বিজয়ের জন্য প্রস্তুত করে। অতঃপর ইউরোপের সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনী ধীরে ধীরে হামলা করে ফিলিস্তিন ও শামের বিশাল অংশ দখল করে নিতে সক্ষম হয় এবং ১০৯৯ সালে বাইতুল মুকাদ্দাসকে দখল করে নেয়। এরপর মুসলিমদের সাথে এমন পশুত্বের আচরণ করে, যার উদাহরণ ইতিহাসে অনেক কম পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকগণ বলেছেন, বাইতুল মুকাদ্দাসে খ্রিষ্টানদের ঘোড়ার খুর পর্যন্ত মুসলিমদের রক্তে ডুবে গিয়েছিল।
দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধ (১১৪৭-১১৪৯ খ্রি.)
দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধ শুরু হয় হালাবের আমির ইমামুদ্দিন জিনকি খ্রিষ্টানদের শহর এডেসা দখলের মাধ্যমে। সে সময় যখন দুর্ভাগ্যবশত মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে যায়, সেলজুক বাদশাহ-যাদেরকে মুসলিমদের উত্থান ও উন্নতির নিদর্শন মনে করা হতো-তারা তখন পতনের দিকে ধাবিত হয়। বাগদাদের খলিফা ও সেলজুকিদের মধ্যে অনেক ভুল বোঝাবুঝি ছড়িয়ে পড়ে। সেলজুকিদের মধ্যে যদিও তখন সুলতান সানজার ও সুলতান মাসুদ জীবিত ছিলেন, যাদেরকে অনেক শক্তিশালী সুলতান মনে করা হতো; কিন্তু তারাও গৃহযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ ভুল বোঝাবুঝির ফলে মুসলিমদের এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার দিকে দৃষ্টি দিতে পারছিলেন না। তখনই আল্লাহ তাআলা আতাবাকি বংশ থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকি-কে শামের মসুল অঞ্চলে উত্থান ঘটান।
ইমাদুদ্দিন জিনকির অন্তর খ্রিষ্টানদের ফিলিস্তিন দখলের ফলে সর্বদা অস্থির থাকত। তিনি শাম ও ফিলিস্তিনকে খ্রিষ্টানদের দখল থেকে মুক্ত করার জন্য সুসংগঠিত কার্যক্রম শুরু করেন। তার সবচেয়ে বড় কাজ ছিল শামের এডেসা শহর বিজয় করা। যা সেই সময় খ্রিষ্টানদের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছিল। এডেসা বিজয়ে পুরো ইউরোপে আগুন লেগে যায়। ফ্রান্সের বাদশাহ লুই অষ্টম ও রোমের প্রতিনিধি কনরাড তৃতীয় রোমের পোপের আদেশে সৈন্যবাহিনী নিয়ে বের হয়। সেই সময় ইমাদুদ্দিন -এর ছেলে নুরুদ্দিন জিনকি মাসুলের বাদশাহ ছিলেন। খ্রিষ্টানরা এসে দামেস্কে হামলা করে। দামেস্কে তখন একটি স্বাধীন হুকুমত ছিল এবং তারা নিজেদের প্রতিরোধে সক্ষম ছিল না। নুরুদ্দিন জিনকি দামেস্কের প্রতিরক্ষা করার পাশাপাশি এই অঞ্চলকে নিজের হুকুমতের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। আর এভাবেই দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধে খ্রিষ্টানদের মুখে লাগাম পরিয়ে দেন।
তৃতীয় ক্রুসেড (১১৮৭-১১৯২ খ্রি.)
তৃতীয় ক্রুসেড সালাহুদ্দিন আইয়ুবি -এর ফিলিস্তিনে হামলা ও বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের পর থেকে শুরু হয়। নুরুদ্দিন জিনকি শিরকুহকে মিশরের গভর্নর বানান। তার অফাতের পর তার ভাতিজা সালাহুদ্দিন মিশরের গভর্নর হন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়কে নিজের জীবনের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেন। হিত্তিনের প্রসিদ্ধ যুদ্ধে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার বাহিনীকে পরাজিত করে বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয় করে নেন। ফিলিস্তিনে পরাজিত হওয়ার খবর শুনে পুরো ইউরোপে মাতম শুরু হয়। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানির বাদশাহ নিজেদের বাহিনী নিয়ে বের হয়ে আসে, যা ছিল তৃতীয় ক্রুসেড। ইংল্যান্ডের বাদশাহ রিচার্ড আক্কা ও জাফা বিজয় করে নেয়; কিন্তু বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করতে পারেনি। পরবর্তীকালে সালাহুদ্দিন -এর সাথে চুক্তি করে ফিরে যায়।
চতুর্থ ক্রুসেড (১১৯৭ খ্রি.)
১১৯৭ সালে রোমের পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট পুনরায় বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের জন্য কাজ শুরু করে। ১২০৬ সালে ফ্রান্সসহ অনেক রাষ্ট্র নিজেদের বাহিনী প্রেরণ করে। ফয়সালা হয় এই বাহিনী ইতালির শহর ভেনিস থেকে সমুদ্রপথে মিশরের দিকে রওয়ানা হবে। এই সফরের জন্য ৮১ হাজার রুপার মুদ্রা প্রয়োজন ছিল; কিন্তু খ্রিষ্টানদের কাছে ছিল মাত্র ৫১ হাজার রুপার মুদ্রা। ফলে খ্রিষ্টানদের যুদ্ধ-কার্যক্রম শুরু থেকেই অর্থনৈতিক সমস্যার শিকার হয়ে যায়। এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য তারা হাঙ্গেরির খ্রিষ্টান রাজ্য জারা বিজয় করে নেয়। অতঃপর বাইজেন্টাইনিদের কুসতুনতিনিয়া দখল করে সেখানে এত পরিমাণ হত্যা-লুণ্ঠন করে যে, খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকরা বলেছে, যদি মুসলিমরা সেই অঞ্চল দখল করত, তাহলে এমন কিছুই করত না, যা খ্রিষ্টানরা করেছিল। এই কাজের ফলে তারা জেরুজালেমের দিকে রওয়ানা হতেই পারেনি; বরং খ্রিষ্টানদের এলাকাতেই মতানৈক্যের শিকার হয়ে দমে যায়।
পঞ্চম ক্রুসেড (১২১৭-১২২১ খ্রি.)
পঞ্চম ক্রুসেডে হাঙ্গেরি ও অস্ট্রিয়ার বাদশাহ অংশগ্রহণ করে। তারা মিশরের সুলতানুল কামেলের ওপর হামলা করে কিছু প্রাথমিক সফলতা অর্জন করে। কিন্তু সবশেষে খ্রিষ্টানরা পরাজিত হয় এবং তারা আট বছরের নিরাপত্তা চুক্তি করে ফিরে আসে।
ষষ্ঠ ক্রুসেড (১২২৮-১২২৯ খ্রি.)
রোমান সাম্রাজ্যের বাদশাহ দ্বিতীয় ফ্রেডরিক বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের শপথ করে। সেই সময় সুলতান কামেলের হুকুমত দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। অনেক যুদ্ধের পর বাদশাহ কামেল ফ্রেডরিকের সাথে দশ বছরের চুক্তি করে। এই চুক্তির অধীনে জেরুজালেম, নাসেরা ও বাইতুল লাহম দশ বছরের জন্য খ্রিষ্টানদের দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মাসজিদুল আকসা ও কুব্বাতে সাখরা মুসলিমদের হাতেই রয়ে যায়। ১২৪৪ সালের মধ্যে মুসলিমরা এই সমস্ত এলাকা আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে। যার ফলে সপ্তম ক্রুসেড শুরু হয়।
সপ্তম ক্রুসেড (১২৪৮-১২৫৪ খ্রি.)
১২৪৮ সালে তাতারদের হামলা থেকে পিছপা হয়ে মিশর-ফেরত খাওয়ারিজম বাহিনী জেরুজালেমে থাকা খ্রিষ্টান বাহিনীকে পরাজিত করে শহরকে দখল করে নেয়। তার জবাবে ফ্রান্সের বাদশাহ লুই নবম মিশরে হামলা করে। ফ্রান্সের বাদশাহ তোরান শাহের হাতে পরাজিত হয় এবং নিজেও গ্রেফতার হয়। পরবর্তী সময়ে পঞ্চাশ হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে মুক্ত হয়। এই যুদ্ধের বিশেষ বিষয় ছিল, এই যুদ্ধ জহির বাইবার্সের উত্থানের যুদ্ধ ছিল। যিনি পরবর্তী সময়ে হালাকু খানের বাহিনীকে পরাজিত করার সাথে সাথে খ্রিষ্টান বাহিনীকেও চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন।
অষ্টম ক্রুসেড (১২৭০ খ্রি.)
ফ্রান্সের বাদশাহ লুই নবম ১২৭০ সালে অষ্টম ক্রুসেড যুদ্ধের দামামা বাজায়। সেই সময় খ্রিষ্টানরা উত্তর আফ্রিকা থেকে ক্রুসেড হামলা শুরু করে। লুই নবম তার সেনাবাহিনী নিয়ে তিউনিসিয়া পৌঁছে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। ফলে এই হামলা সেখানেই শেষ হয়ে যায়।
নবম ক্রুসেড (১২৭১-১২৭২ খ্রি.)
লুইয়ের মৃত্যুর পর ইংল্যান্ডের বাদশাহ নবম ক্রুসেড যুদ্ধ শুরুর চেষ্টা করে। কিন্তু সে ব্যর্থ হয়। সেই সময় মিশরের মামলুক সুলতান বাইবার্স আইনে জালুত স্থানে হালাকু খানের বাহিনীকে চরমভাবে পরাজিত করার পর খ্রিষ্টান অধিকৃত অঞ্চলসমূহ-যার মধ্যে আন্তাকিয়া, আক্কা, তারাবুলুস ও জাজায়ির রোড অন্তর্ভুক্ত ছিল-দখল করে পৌনে তিনশ বছরের চলমান ক্রুসেড যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায়।
মহামারি বা ব্ল্যাক ডেথ (১৩৪৭-১৩৫১ খ্রি.)
মধ্যযুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যেই ঘটনা ইউরোপের ভবিষ্যতের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তা হচ্ছে ভয়ংকর মহামারি, যা ইতিহাসে ব্ল‍্যাক ডেথ নাম প্রসিদ্ধ। ১৩৪৭-১৩৫১ সালে ইউরোপে মহামারি ছড়িয়ে গিয়েছিল; যার ফলে ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ আবাদি খতম হয়ে গিয়েছিল। তখনকার সময় এই মহামারিকে বিশাল ধ্বংস (Great Mortality) বলা হতো। ইউরোপের বিভিন্ন অবস্থা থেকে এই ঘটনার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এর একটি ফলাফল ছিল, খ্রিষ্টান অধিবাসীরা নিজেদের রাগ-দুঃখ ইহুদি ও অন্যান্য বহিরাগত দুর্বল শ্রেণির ওপর প্রয়োগ করতে শুরু করে। তারা অপবাদ দেয় যে, তারা পানি ও বাতাস খারাপ করে দিয়েছিল। যার ফলে এই মহামারি ছড়িয়ে গিয়েছে। এর ফলে অনেক স্থানে খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের একত্রিত করে জীবন্ত জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
এর দ্বিতীয় প্রভাব ছিল, ইউরোপের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়া। শ্রমিকের ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায় এবং জাগিরদারদের আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। যার ফলে ইউরোপের জাগিরদার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়। মানুষ রোজগারের আশায় কৃষি জমি ফেলে শহরের দিকে আসতে শুরু করে। সেই সাথে জাগিরদার ও শ্রমিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে অধিকারের আন্দোলনে পরিণত হয়।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নষ্ট হওয়ার আরও কিছু প্রভাব দেখা দিয়েছিল। প্রথমত, ইউরোপের জনশক্তি এতটাই কমে গিয়েছিল যে, সেখানে সব ধরনের ভাড়াটে শ্রমিক দুর্লভ হয়ে গিয়েছিল। যার দরুন যেসব শ্রমিক ছিল তাদের পারিশ্রমিক এতটাই বেশি হতো যে, কোনো জিনিস তৈরির পর তা অনেক দামি হয়ে যেত। কেউ তা খরিদ করতে পারত না। দ্বিতীয়ত, জনশক্তি কমে যাওয়ার ফলে বাজারে ক্রেতা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। আর এই অবস্থাই ইউরোপের সব রাষ্ট্রকে বিশ্বের নতুন নতুন বাজারের তালাশে বের হতে বাধ্য করে। সেই সময় হিন্দুস্থান পুরো দুনিয়াতে কাপড় ও বিভিন্ন দ্রব্য রপ্তানি করত; তাই সমস্ত রাষ্ট্রের আগ্রহ হিন্দুস্থানের দিকে ঘুরে যায়। সর্বপ্রথম পর্তুগাল অতঃপর হল্যান্ড-ফ্রান্স সর্বশেষ ব্রিটেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে হিন্দুস্থানে ব্যবসা শুরু করে। জাতীয় পর্যায়ে কোম্পানির ব্যবসার ক্ষেত্রে যখন অধিক অর্থের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন ব্যাংক ও নতুন কারেন্সির প্রচলন ঘটে। এখান থেকে নতুন এক ধরনের বাণিজ্য শুরু হয়। আর এর মাধ্যমে একদিকে পেপার কারেন্সি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর উন্নতি হতে থাকে। যা পরবর্তীকালে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়। অপরদিকে ব্যবসার আড়ালে ব্রিটেন হিন্দুস্থানের ওপর দখল প্রতিষ্ঠা করে বসে। হিন্দুস্থানের ওপর ব্রিটেনের দখল ছিল পুরো বিশ্বে পশ্চিমাদের উত্থানের উৎস। যার বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ।
কিছু ঐতিহাসিকের মতানুযায়ী মহামারির আরেকটি প্রভাব হলো, এর ফলে ধর্মহীনতা ও সেক্যুলারিজম জনগণের মাঝে গ্রহণীয় হতে শুরু করে। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে সেক্যুলার দার্শনিকরা ধর্মের ওপর কঠিন অভিযোগ করতে থাকে। তারা বলতে থাকে যে, গির্জা এই বিপদকে কাবু করার পরিবর্তে শুধু ধৈর্যের পরামর্শ দিয়েছে। যদি মানুষ ধর্মের আনুগত্য না করে এই বিপদ থেকে মুক্তির চেষ্টা করত, তাহলে এই বিপদ থেকে অনেক আগেই মুক্তি মিলে যেত। এই চিন্তা পরবর্তী শতাব্দীতে শক্তিশালী হতে থাকে, যা সর্বশেষ ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে গির্জার পরাজয় ও ধর্মহীনতার বিজয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে।
মধ্যযুগ ও ইহুদিবাদ
ইউরোপের ইহুদিদের সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছিল মধ্যযুগে। তখনকার যুগে ইহুদিরা মুসলিমদের আন্দালুসে বসবাস করত। তারা নিজেরাই সেই সময়কে ইহুদিদের সোনালি যুগ হিসেবে গণ্য করে। এখানে তারা উত্তর আফ্রিকার মুসলিম এলাকাগুলো থেকে এসেছিল। ইহুদিরা ইউরোপে আসার দ্বিতীয় রাস্তা ছিল তুর্কি হয়ে। কিন্তু এই পথে অনেক কম ইহুদি ইউরোপে এসেছিল, কেননা তারা মুসলিম-বিশ্বে জিম্মি হিসেবে নিরাপদে বসবাস করতে পারলেও খ্রিষ্টানদের হাতে গণহত্যার শিকার হতো। এই দুই রাস্তা দিয়ে আসা ইহুদিদের আজ সাফার্ডিক ইহুদি বলা হয়, তারা আজকের সমস্ত ইহুদির বিশ শতাংশ। এরাই বনি ইসরাইলের মূল বংশধর।
ইউরোপের মধ্যে ইহুদিদের সবচেয়ে বেশি আগমন ঘটে মোঙ্গলদের রাশিয়ার ওপর হামলার পর। তখন তারা রাশিয়া থেকে পলায়ন করে পোল্যান্ড এবং ইউরোপের পূর্বাংশে চলে আসে। আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি, কাফকাজের খিসার গোত্রের শাসক অষ্টম শতাব্দীতে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করে নেয়। ইহুদিরা খিসার গোত্রের মধ্যে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার জীবনযাপন করছিল। কিন্তু রাশিয়ার ওপর তাতারদের আক্রমণের ফলে সেখান থেকে পলায়ন করে পূর্ব ইউরোপে চলে আসতে বাধ্য হয়। অতঃপর এখান থেকে পুরো ইউরোপের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। রাশিয়া ও পোল্যান্ড থেকে ছড়িয়ে পড়া ইহুদিদেরকে আশকানাজি ইহুদি বলা হয়, যারা আজকের সমস্ত ইহুদির আশি শতাংশ। এই আশি শতাংশ হচ্ছে মূলত ইহুদি দাবিদার, তারা আসল ইহুদি নয়; বরং খিসার গোত্রের ইহুদি।
মধ্যযুগ ছিল ইউরোপের ইহুদিদের জন্য বিপদের যুগ। ইউরোপের খ্রিষ্টানরা ইসা-কে হত্যার চেষ্টার অপরাধের দরুন তাদের ক্ষমা করতে প্রস্তুত ছিল না। তাই ইহুদিদের জন্য খ্রিষ্টান এলাকায় থাকা বা সরকারী চাকরি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। সেই সময়ের ইহুদিদের খ্রিষ্টান এলাকাগুলো থেকে দূরে নতুন আবাদি করে বসবাসের নির্দেশ ছিল। সেই ইহুদি আবাদিগুলোকে রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের বার (ghetto) বলা হতো। এই শব্দটাকে পশু ও বদ্ধভূমির জন্য ব্যবহার করা হয়।
মধ্যযুগের ইউরোপে ইহুদিদের কয়েকবার গণহত্যা করা হয়। এগুলোর তিনটি বড় কারণ ছিল:
- প্রথম কারণ ছিল ইউরোপের ক্রুসেড যুদ্ধে বের হওয়া। যখন ইউরোপে ক্রুসেডার বাহিনী যুদ্ধের জন্য বের হয়, তখন এই ক্রুসেডাররা ইউরোপের যেই সমস্ত এলাকার ওপর দিয়ে অতিবাহিত হতো, সেখানে ইহুদিদের গণহত্যা করত।
- দ্বিতীয় কারণ ছিল মহামারি। যখন ইউরোপে মহামারি ছড়িয়ে পড়ে, তখন এর জন্য ইহুদিদের দায়ী করে তাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়। ইউরোপের প্রায় প্রত্যেকটি দেশেই এই গণহত্যা সংঘটিত হয়।
- তৃতীয় কারণ ছিল চক্রাকারে সুদি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তারা ইউরোপের সমাজকে ঋণের চাপে জর্জরিত করে ফেলত। যখন তাদের জুলুম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাত, তখন সেই সমাজ তাদের গণহত্যা করত এবং তাদেরকে দেশত্যাগে বাধ্য করত। এই ধরনের একটি প্রসিদ্ধ গণহত্যা ও দেশান্তরের ঘটনা ফ্রান্সের বাদশাহ ফিলিপ দ্যা ফায়ারের শাসনামলে ফ্রান্সে হয়েছিল। আরেকটি গণহত্যা ইংল্যান্ডের বাদশাহ এডওয়ার্ডের সময় হয়েছিল এবং গণহত্যার পর বেঁচে যাওয়া বাকি ইহুদিদেরকে ইংল্যান্ড থেকে বের করে দেওয়া হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ইহুদিদের গণহত্যাকারী ব্রিটেন ও ফ্রান্সই পরবর্তীকালে ইহুদিদের জন্য উসমানিদের হাত থেকে ফিলিস্তিনকে বিজয় করার পাশাপাশি সেখানে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যও সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল।
আর এটাই সেই গোপন রহস্য, যা বোঝা আমাদের এই কিতাবের মূল উদ্দেশ্য।

টিকাঃ
৩০. এরাই সেই শ্রেণি, যারা মানবাধিকারের যুদ্ধ শুরু করেছিল। অতঃপর মেঘনা কার্টা চুক্তিতে তাদের কিছু অধিকার মেনেও নেওয়া হয়েছিল। তাদের হওয়ার একটি জোট গঠন করা হয়, যাকে 'হাউস অফ কমন্স' বলা হয়। আজও ব্রিটেনের পার্লামেন্টের নিম্ন কক্ষকে এই নামে ডাকা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00