📄 খ্রিষ্টবাদের ইতিহাস
ইউরোপ থেকে নয়; বরং ফিলিস্তিন ও শাম থেকে খ্রিষ্টবাদের সূচনা হয়। তখনকার সময় এই অঞ্চলগুলো রোমানদের অধীন ছিল। খ্রিষ্টবাদ সেই সত্য দ্বীন নয়, যা ইসা নিয়ে এসেছেন এবং যার দাওয়াহ তাঁর সাথিগণ দিয়েছিলেন; বরং এটা মানুষের বানানো একটি ধর্ম। এই দ্বীনের উত্থান ইসা-এর আকাশে উঠিয়ে নেওয়ার কিছু বছর পর থেকে শুরু হয়। খ্রিষ্টবাদ মূলত এক ইহুদি আলিম সেন্ট পৌলের মস্তিষ্কের আবিষ্কার। ইসা-এর জীবদ্দশায় সে-ই ইসা-এর সবচেয়ে বড় দুশমন ছিল। কিন্তু ইসা-কে আসমানে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর বাহ্যিকভাবে সে খ্রিষ্টান হয় এবং হাওয়ারিদের সাথে মিলে দাওয়াহ কাজ শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে সে সত্য দ্বীনে বিকৃতি ও নিজের পক্ষ থেকে সংযোজন শুরু করে। পরবর্তী সময়ে মানুষও তার বিকৃতিগুলো গ্রহণ করে সত্য দ্বীন থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। চতুর্থ শতাব্দীতে রোমান বাদশাহ কনস্টান্টাইন (১ম) যখন খ্রিষ্টান হয়ে যায়, তখন সত্য দ্বীন মানুষের দৃষ্টি থেকে পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়ে যায়।
খ্রিষ্টবাদের ইতিহাস কয়েকটা ভাগে বিভক্ত:
• প্রথম যুগ: বিপদ ও পরীক্ষার যুগ (১- ৩০৬ খ্রি.)
• দ্বিতীয় যুগ: খ্রিষ্টবাদের উত্থান (৩০৬-৫৯০ খ্রি.)
• তৃতীয় যুগ: ইউরোপে খ্রিষ্টবাদের উত্থান (আধুনিক পশ্চিমা ঐতিহাসিকদের মতে অন্ধকার যুগ) (৫৯০-৭১৪ খ্রি.)
• চতুর্থ যুগ: ইউরোপে খ্রিষ্টবাদের পতনের সূচনা (আধুনিক পশ্চিমা ঐতিহাসিকদের মতে মধ্যযুগ) (৭১৪-১৪৫৩ খ্রি.)
• পঞ্চম যুগ: খ্রিষ্টবাদের পতন (আধুনিক পশ্চিমা ঐতিহাসিকদের মতে রেনেসাঁর যুগ) (১৪৫৩-১৭৮৯ খ্রি.)
খ্রিষ্টানদেরকে কুরআন মাজিদে নাসারা বলা হয়েছে। এই নামকরণের ব্যাপারে দুটি বর্ণনা এসেছে। একটি মত অনুযায়ী এই নামের সম্বন্ধ হচ্ছে ইসা-এর হাওয়ারিদের দিকে, যারা ইসা -এর প্রশ্নের জবাবে বলেছিল, )نَحْنُ أَنْصَارُ الله( 'আমরা আল্লাহর সাহায্যকারী।' অপর মত হচ্ছে, এর সম্বন্ধ ইসা-এর জন্মের ঘটনার সাথে, যা নাসেরা নামে প্রসিদ্ধ। উপমহাদেশে ইসা -এর নামানুসারে তাদের ইসায়ি বলা হয়। এ ছাড়াও ইসা-এর লকব মাসিহের দিকে সম্পৃক্ত করে তাদের মাসিহিও ডাকা হয়।
ইসা যে দ্বীন এনেছিলেন, তা তাওরাতের শিক্ষা থেকে ভিন্ন ছিল না; বরং ইসা-কে সত্য দ্বীন উজ্জীবিত করা এবং বনি ইসরাইলের হিদায়াতের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল। আর এটা হাওয়ারিরাও জানত; তাই তারা কখনোই বনি ইসরাইলের বাইরে তাবলিগের
চেষ্টা করেনি। ইসা-এর জন্য তাওরাতকেই শরিয়াহ হিসেবে অনুমোদন দেওয়া এর প্রমাণ বহন করে। এ ছাড়াও সুরা আলে ইমরানের মধ্যে তাঁর ব্যাপারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, 'বনি ইসরাইলের দিকে প্রেরিত রাসুল' অর্থাৎ ইসা -কে শুধু বনি ইসরাইলের কাছেই নবি হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। ইসা, তাঁর সাথিবর্গ ও তাঁর ওপর ইমান আনয়নকারীগণ বনি ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে এই সত্য দ্বীনের মধ্যে বিকৃতি ঘটানোর পর তাওহিদের আনুসারী জাতি তিন প্রভুর আনুসারীতে পরিণত হয়। সেই সাথে তারা নিজেদের দাওয়াহকে বৈশ্বিক বানিয়ে নেয় এবং তাওরাতের বিধানের মাঝে অনেক পরিবর্তন করে ফেলে। আশ্চর্যজনক কথা হচ্ছে, এই বিকৃতিগুলোতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা এই ইহুদি আলিম 'সেন্ট পৌল' পালন করেছিল।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে এমনটা বলা ভুল হবে না যে, বর্তমানের খ্রিষ্টবাদ মূলত ইহুদিবাদের বিকৃত রূপ। এই দুটি ধর্ম সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার ফলে কুরআনে তাদের জন্য আহলে কিতাব নামক একক পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে এবং অনেক জায়গায় দুটি দলকে এক শব্দে সম্বোধন করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে খ্রিষ্টবাদ একটি ভিন্ন আকৃতি ধারণ করে; তাই তাদের আলাদা বর্ণনা করা হয়। এখানে এটা বোঝানো উদ্দেশ্য যে, এই দুটি ধর্মের পরস্পর এত এত বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও তাদের মাঝে ঐতিহাসিক ও চিন্তাগত গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
খ্রিষ্টানদের ইতিহাসের যুগগুলোর মধ্যে আমরা প্রথম দুটি যুগের আলোচনা এখানে করব। বাকি তিন যুগের আলোচনা ইউরোপের ইতিহাসের অধ্যায়ে করব। কেননা রোমানরা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পরে খ্রিষ্টবাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ফিলিস্তিন ও পূর্ব ইউরোপ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে মধ্য ইউরোপে চলে যায়। অপরদিকে এই ঘটনাগুলো ইউরোপে সংঘটিত হওয়ার ফলে ঐতিহাসিকগণ এগুলোকে শুধু খ্রিষ্টানদের ইতিহাস নয়; বরং ইউরোপের ইতিহাসের অংশও মনে করে। তৃতীয় কারণ হচ্ছে, পরবর্তী যুগগুলোর মধ্যে মুসলিমদের তৃতীয় দুশমন অর্থাৎ নতুন মুশরিকদের উত্থান হয়েছিল। তাই ইউরোপ ও আমেরিকার ইতিহাস খ্রিষ্টানদের ইতিহাস থেকে আলাদা আলোচনা হওয়াই যথার্থ।
প্রথম যুগ: বিপদ ও পরীক্ষার যুগ (১-৩০৬ খ্রি.)
খ্রিষ্টানদের ইতিহাসের প্রথম যুগকে বিপদের ও পরীক্ষার সময় হিসেবে গণ্য করা হয়। কেননা, খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকদের বর্ণনামতে এই যুগে খ্রিষ্টানদের ওপর মুশরিক রোমান কর্তৃক অনেক জুলুম হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রোমানদের এই জুলুম মূলত ছিল সত্য দ্বীনের অনুসারীদের ওপর। এর প্রমাণ হচ্ছে আসহাবে উখদুদ ও আসহাবে কাহফের ঘটনা এই যুগেই সংঘটিত হয়েছিল, যারা ছিলেন সত্য দ্বীনের অনুসারী। তবে মূলকথা হচ্ছে বিপদের যুগে ইসা -এর সত্য দ্বীন ও সেন্ট পৌলের বানানো মতাদর্শ একই সাথে প্রচারিত হচ্ছিল। যার দৃষ্টান্ত বর্তমানেও রয়েছে। যেমন মুসলিম ও তাদের বিকৃত আকিদায় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের মধ্যে কঠিন দ্বন্দ্ব রয়েছে, যা কখনো কখনো লড়াই পর্যন্ত পৌঁছায়।
আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি যে, আল্লাহ তাআলা ইসা -কে বনি ইসরাইলের হিদায়াতের জন্য প্রেরণ করেছেন; কিন্তু বনি ইসরাইল উলামায়ে সু'দের আনুগত্যের ফলে শুধু ইসা -কে অস্বীকারই করেনি; বরং তাঁকে হত্যার চেষ্টাও করেছে। তারা রোমানদের সাথে মিলে ইসা -কে শূলিতে চড়ানোর চক্রান্ত করে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ইসা -কে রক্ষা করে আসমানে উঠিয়ে নিয়ে যান। ইসা -কে হত্যার চক্রান্ত বনি ইসরাইলের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ঘটনা। কারণ এর পর থেকেই বনি ইসরাইল খ্রিষ্টান ও ইহুদি নামে দুটি নতুন ধর্মে বিভক্ত হয়ে যায়।
ইসা -কে আসমানে উঠিয়ে নেওয়ার পর তাঁর সাহায্যকারীরা বনি ইসরাইলের মধ্যে সত্য দ্বীনের প্রচার করতে থাকে। কিন্তু সেখানে একটি ঘটনা সংঘটিত হয়; যার ফলে ইসা -এর আনীত তাওহিদের দ্বীন ত্রিত্ববাদে পরিবর্তন হয়ে যায়। সাউল নামের এক ইহুদি আলিম-যে ইহুদিদের সবচেয়ে কট্টর দল ফারিসিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে ইসা -এর জীবদ্দশায় তাঁর শিক্ষার কঠিন বিরোধিতা করত; তাঁকে ও তাঁর সাথিদের অনেক কষ্ট দিত; কিন্তু ইসা -এর অফাতের পর সে হঠাৎ খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে। তার দাবি অনুযায়ী এর কারণ ছিল, যখন সে জেরুজালেমে ইহুদি আলিমদের সাথে পরামর্শ করে দামেস্কে রওয়ানা হয়, তখন আসমান থেকে একটি নুর দৃষ্টিগোচর হয় এবং সেখান থেকে একটি আওয়াজ তাকে বলে, 'এই সাউল, তুমি কেন আমার বিরোধিতা করো?' সে বুঝতে পারে এই আওয়াজ ইসা -এর ছিল। সাউলের এই ঘটনাকে শুধু একজন ব্যতীত আর কোনো হাওয়ারি পাত্তা দেয়নি। তবে সে একাই অন্যদের সাউলের একনিষ্ঠতার ব্যাপারে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়। এবং সে সাউলের সাথে মিলে তাবলিগ শুরু করে। সাউল নিজের নাম পরিবর্তন করে 'পৌল' রাখে, যা ইতিহাসে সেন্ট পৌল নামে প্রসিদ্ধ। তার তাবলিগের ফলে বনি ইসরাইলের অসংখ্য মুশরিক খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু যে দ্বীনের দিকে সে আহ্বান করত, সেখানে আস্তে আস্তে নতুন আকিদা ও বিধান প্রবেশ করাতে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক ছিল ইসা -এর উলুহিয়্যাতের আকিদা। যা পরবর্তী সময়ে ত্রিত্ববাদ বা ট্রিনিটির আকৃতি ধারণ করে। যার অর্থ অনেকটা এমন যে, আল্লাহ তাআলা, ইসা ও রুহুল কদুস-এই তিন প্রভু মূলত একজনই।
এ ছাড়াও সে মুসা -এর শরিয়াহর অধিকাংশ বিধানকে খ্রিষ্টানদের জন্য নিষিদ্ধ হিসেবে প্রচার করতে থাকে। অথচ ইসা নতুন কোনো শরিয়তসহ প্রেরিত হননি; বরং যে বিধানগুলো ইহুদিরা মুছে দিয়েছিল, সেগুলোই নতুন আকৃতিতে দ্বিতীয়বার উজ্জীবিত করার আদেশ নিয়ে তিনি এসেছেন। সঠিক আকিদা ও শরিয়তের মধ্যে বিকৃতি ও শিথিলতার ফলে অনেক অ-ইহুদি মুশরিকদের মধ্যে এই দ্বীনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। এই বিকৃতির ফলে পৌল ও হাওয়ারিদের মধ্যে কঠিন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, এমনকি যে হাওয়ারি তাকে সাহায্য করেছিল, সেও তার থেকে আলাদা হয়ে যায়।
মোটকথা তখন সত্য দ্বীনের অনুসারীগণ দুই ধরনের বিপদের মুখোমুখি হয়। একদিকে সেই সমস্ত বিশ্বাসের মুকাবিলা করা, যা সেন্ট পৌল প্রচার করা শুরু করেছে। অপরদিকে সেই জুলুম সহ্য করা, যা রোমান মুশরিকরা ইমানদারদের ওপর শুরু করেছে। সেই সময়েই আসহাবে উখদুদের ঘটনা সংঘটিত হয়, যার আলোচনা কুরআনে সুরা বুরুজে এসেছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় পুরো ঘটনা বর্ণনা করেছেন। যার সারসংক্ষেপ হচ্ছে, ইয়ামানে এক বাদশাহ নিজেকে রব দাবি করত। এই বাদশাহর এক জাদুকর ছিল। জাদুকর বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তার সমস্ত জাদু একজন শাগরিদকে শিক্ষা দেওয়ার আদেশ দেয়। জাদুকর একটি বুদ্ধিমান বালক চায়, যাকে সহজে সবকিছু শিখাতে পারবে। সেই বালক যে রাস্তা দিয়ে জাদুকরের কাছে যেত, সেই রাস্তার পাশে আল্লাহ তাআলার একজন নেক বান্দার খানকা ছিল, যিনি ঈসা আ.-এর আনীত দ্বীনের ওপর সঠিকভাবে ইমান এনেছিলেন। বালক সেই রাহিবের কাছে গিয়ে ইমান গ্রহণ করে নেয়। এই কথা জানার পর বাদশাহ বালককে হত্যার আদেশ দেয়। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় তাকে কোনোভাবেই হত্যা করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ বালক নিজেই বলে, 'যদি আমাকে সত্যিই হত্যা করতে চাও, তাহলে তা-ই করবে, যেমনটা আমি বলব।'
বালক তখন বাদশাহকে বলে, 'যদি সমস্ত মানুষকে এক জায়গায় একত্রিত করে "বালকের রবের নামে" এই কথা বলে তির চালাও, তাহলে আমি মারা যাব।' বাদশাহ যখন সমস্ত মানুষের সামনে এমনটা করে, তখন সেই বালক শহিদ হয়ে যায়। এই বালকের শাহাদাত দেখে সমস্ত মানুষ মুসলিম হয়ে যায়; যার ফলে বাদশাহ অনেক রাগান্বিত হয়। সে তার সেনাদেরকে ময়দানে বড় বড় গর্ত খুঁড়ে সেখানে অগ্নি প্রজ্বলিত করার আদেশ দেয়। অতঃপর একেক জন ব্যক্তিকে ধরে এনে এই সত্য দ্বীন থেকে ফিরে আসার আদেশ দেয়। যারা দ্বীন ত্যাগ করত, তাদের মুক্ত করে দেওয়া হতো। আর যারা করত না, তাদের আগুনে ফেলে দেওয়া হতো। মুফাসসিরগণ বলেছেন, সেদিন খুব স্বল্প সংখ্যক ব্যক্তি দ্বীন থেকে ফিরে গিয়েছিল।
দ্বিতীয় ঘটনা ছিল আসহাবে কাহফের ঘটনা। অধিকাংশ আলিমদের মত হচ্ছে, এই ঘটনা রোমান সাম্রাজ্যের এলাকা জর্ডানে হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা কুরআনে এই ঘটনা মুসলিমদের হিদায়াতের জন্য বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এই যুবকদের সঠিক সংখ্যা আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। এই যুবকরা ঈসা আ.-এর আনীত দ্বীনের ওপর বিশ্বাসী ছিল। কিছু ঐতিহাসিকের মতে তারা বাদশাহর দরবারি লোক ছিল। তাদের ইসলামের ব্যাপারে মুশরিক বাদশাহ জানার পর দ্বীনত্যাগ করার জন্য একদিনের সুযোগ দেয়। এই যুবকরা তাদের ইমান বাঁচানোর জন্য শহর থেকে পলায়ন করে এক পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে যায়। তাদের সাথে তাদের এক কুকুরও ছিল। আল্লাহ তাআলা এদেরকে সাহায্য করেন এবং তাদের ওপর ঘুম চাপিয়ে দেন। তিনশ বছর পর্যন্ত তারা ঘুমেই কাটিয়ে দেয়। যখন জাগ্রত হয়, তখন সেই জমানার রোমানরা খ্রিষ্টবাদ গ্রহণ করে নিয়েছিল। মানুষরা তাদের চিনে ফেলে, কেননা পলায়নকারী ব্যক্তিদের ঘটনা হিসেবে তাদের কথা বড়দের
থেকে শুনেছিল। অতঃপর তারা গুহাতে পুনরায় ফিরে আসার পর আল্লাহ তাআলা তাদের মৃত্যু দিয়ে দেন। এগুলো হচ্ছে সেই সমস্ত ঘটনা, যা আল্লাহ তাআলা কুরআনে বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়াও খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকরা রোমান বাদশাহদের পক্ষ থেকে খ্রিষ্টানদের ওপর অনেক নির্যাতনের ঘটনা বর্ণনা করেছে। সেই জুলুমকারী বাদশাহদের মধ্যে নিরো (Nero), ডিয়োক্লেশন (Diocletian)-সহ আরও অনেকেই আছে।
দ্বিতীয় যুগ : খ্রিষ্টবাদের উত্থানের জমানা (৩০৬-৫৯০ খ্রি.)
৩০৬ খ্রিষ্টাব্দে রোমান বাদশাহ কনস্টান্টাইন প্রথম সিংহাসনে আরোহণের ফলে খ্রিষ্টানদের উত্থান শুরু হয়। বাদশাহর মাতার নাম ছিল হেলেনা (Helena)। ঐতিহাসিকদের মতে হেলেনা ২৫০ থেকে ৩০০ সালের মধ্যে খ্রিষ্টান হয়। হেলেনার শুরুজীবনের ব্যাপারে ইতিহাসে কোনো তথ্য নেই। কিন্তু খ্রিষ্টানদের প্রায় সমস্ত দল তাকে (Saint) সেন্ট-এর মর্যাদা দেয় এবং তার নামে দিবস পালন করে। ইতিহাসে এটাও প্রমাণিত যে, বাদশাহ তার মাকে অনেক মহব্বত করত এবং তার সমস্ত কথা মেনে নিত। রোমান বাদশাহ কনস্টান্টাইন তার মায়ের প্রভাবে খ্রিষ্টান হয়ে যায় এবং ৩২১ সালে বাদশাহ সরকারীভাবে তা ঘোষণা করে। বাদশাহ হওয়ার পর সে খ্রিষ্টানদের ওপর জুলুম বন্ধের পাশাপাশি সমস্ত খ্রিষ্টান বন্দীকে মুক্ত করে দেয় এবং তাদের থেকে পূর্বের বাদশাহদের বাজেয়াপ্ত করা সমস্ত সম্পদ ফিরিয়ে দেয়। এখানে আমরা একটি বাস্তবতা স্পষ্ট করা জরুরি মনে করছি, যে সমস্ত ব্যক্তিকে সেই যুগে ঐতিহাসিকরা ইসায়ি হিসেবে গণ্য করেছেন, তাদের মধ্যে সত্য দ্বীনের অনুসারীরাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকরা এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করেনি; বরং তারা দুই দলের জন্য একই শব্দ উল্লেখ করেছিল।
মুসলিম ঐতিহাসিকগণ এই বাস্তবতা স্পষ্ট করেছেন যে, বাদশাহ কনস্টান্টাইনের সময়ে একদল ছিল সত্যপন্থী ও আরেক দল ছিল গোমরাহ। এই কথার প্রমাণ সেই যুগের ঐতিহাসিকদের আলোচনা থেকেও স্পষ্ট, কেননা তারা খ্রিষ্টানদের মধ্যে আকিদাগত বিভক্তির কথা বলেছেন। তাদের একদল ইসা-কে আল্লাহর সন্তান মনে করত এবং আরেক দল আল্লাহর নবি মনে করত। এই দুই দলের মধ্যে কঠিন দ্বন্দ্ব ছিল এবং কখনো কখনো তাদের মাঝে খুনাখুনিও হতো। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই দ্বন্দ্ব বন্ধ করার জন্য বাদশাহর পক্ষ থেকে ৩২৫ সালে নিকিয়া অঞ্চলে আহ্বান করা একটি প্রসিদ্ধ কনফারেন্স, যাকে ভ্রান্ত খ্রিষ্টবাদের ভিত্তি বলা হয়।
নিকিয়া কনফারেন্স (৩২৫ খ্রি.) ত্রিত্ববাদের জয়
নিকিয়া কনফারেন্সের (Council of Nicaea) বিস্তারিত আলোচনা এমন সব খ্রিষ্টান ঐতিহাসিক করেছে, যারা নিজেরাই ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী ছিল। ৩২৫ সালে বাদশাহ কনস্টান্টাইন খ্রিষ্টবাদের মাঝে মতানৈক্য নিঃশেষ করার জন্য তার রাজ্যের প্রায় এক হাজার পাদরি ও আলিমকে দাওয়াতনামা পাঠায়, যাদের প্রত্যেকের সাথে দুজন করে শাগরিদকেও আনার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু এই এক হাজারের মধ্যে আড়াইশ থেকে তিনশ জন অংশগ্রহণ করে। এদের মধ্যে শাম, ফিলিস্তিন ও তুর্কির সদস্য বেশি ছিল অর্থাৎ রাজ্যের পূর্বাংশ থেকে বেশি লোক অংশগ্রহণ করেছিল, অন্যদিকে রাজ্যের পশ্চিমের অংশগ্রহণ কম ছিল।
এই কনফারেন্সের এজেন্ডা ছিল ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী এবং তার বিরোধীদের মধ্যে একটি ঐকমত্য তৈরি করা। এই কনফারেন্সে কয়েক মাস আলোচনা-পর্যালোচনার পর সকলেই একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। যেখানে ত্রিত্ববাদের বিশ্বাসকে খ্রিষ্টবাদের অংশ ঘোষণা করা হয় এবং পুরো দুনিয়ার শুধু চারটি ইনজিলের ওপর একমত হয়ে বাকি সমস্ত ইনজিলকে ভুল ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। এই বাতিল ঘোষিত ইনজিলের মধ্যে আল্লাহ তাআলার কিতাবও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা আল্লাহর নবি ইসা-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের ওপর তিনজন ব্যতীত সবাই স্বাক্ষর করেছিল। যার ফলে খ্রিষ্টানদের মধ্যে সেন্ট পৌল থেকে ছড়ানো শিরকি বিশ্বাস একটি সরকারী ধর্মে পরিণত হয়। নিকিয়া কনফারেন্সের এই সিদ্ধান্ত আজকের সমস্ত খ্রিষ্টানদের মূল বিশ্বাস। যদিও পরবর্তীকালে ৩৮১ ও ৪৩১ সালের কনফারেন্সগুলোতে কিছু শাব্দিক পরিবর্তন ও সংযোজন করা হয়েছে; কিন্তু মৌলিক বিশ্বাস তা-ই ছিল, যা নিকিয়াতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
নিকিয়ার সিদ্ধান্তগুলো সেই দ্বীন ছিল না, যা ইসা এনেছেন এবং সেখানে সেই ইনজিল গ্রহণ করা হয়নি, যা আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত ছিল। সেখানে সেন্ট পৌলের বিকৃত বিশ্বাস ও উলামায়ে সু'দের লিখিত বইসমূহ একটি দ্বীনের আকার ধারণ করে। ফলে খ্রিষ্টবাদ সরকারী ধর্ম ও নিকিয়া কনফারেন্সের বিশ্বাসগুলো তাদের মূল বিশ্বাসে পরিণত হয়। কেউ যদি এই আকিদা ও ইনজিলগুলোর সমালোচনা বা বিরোধিতা করত, তখন প্রশাসনের নির্যাতনের শিকার হতো। যার ফলে ইমানদারদের ওপর জুলুমের নতুন ধারা শুরু হয়, যা রাসুলুল্লাহ-এর নবুওয়াত পর্যন্ত চলমান ছিল। সত্য দ্বীন মানুষের দৃষ্টি থেকে বিলুপ্ত হয়ে শুধু সরকারী বিশ্বাসগুলো টিকে থাকে। মোটকথা, খ্রিষ্টান ধর্ম রোমান বাদশাহদের দরবারে প্রতিপালিত হতে থাকে। এই জন্য তা জন্ম থেকেই আপসবাদী ও চাটুকারিতার ধর্মে পরিণত হয়। ২৮ শুরু থেকেই খ্রিষ্টানদের দুটি বড় কেন্দ্র ছিল। একটি কনস্টান্টিনোপল-যা আজকের তুর্কির ইস্তাম্বুল ও অপরটি আজকের ইতালির শহর রোম।
ধর্মহীনতার ফিতনা প্রতিরোধ
গ্রিক সূচনাকাল থেকেই শিরক ও ধর্মহীনতার উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো। আনুমানিক খ্রি.পূ. তিনশ সালে সেখানে এরিস্টটল (Aristotle) ও প্লেটোর (Plato) দর্শনের জন্ম হয় এবং ইউরোপের অনেক অংশকে তা প্রভাবিত করে। গ্রিক দর্শনের ভিত্তি ছিল আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার ও ইলমে ওহির বিপরীতে মানববুদ্ধিকে অগ্রগামী প্রমাণ করা। গ্রিকের ধর্মহীন দর্শন মূলত ছিল ধর্মের বিরোধিতা। খ্রিষ্টানরা শুরু থেকে এই দর্শনের মোকাবিলা করতে থাকে। একসময় পঞ্চম শতাব্দীতে যখন রোমান সাম্রাজ্যের এলাকাগুলোতে এই ফিতনা ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তখন খ্রিষ্টান ইতিহাসের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ পাদরি সেন্ট অগাস্টিন (Saint Augustine) (৩৫৪-৪৩০ খ্রি.) ময়দানে নেমে আসে। সে বুদ্ধিপূজার এই ফিতনাকে বিতর্ক ও প্রশাসনিক শক্তি দ্বারা প্রতিহত করে পরিপূর্ণভাবে মিটিয়ে দেয়। কিছু খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকের মতে সেন্ট অগাস্টিনই সে ব্যক্তি, যে ধর্মহীনতার বিরুদ্ধে প্রথমবার সেক্যুলার ও ধর্মবিরোধিতার পরিভাষা ব্যবহার করে। মোটকথা, এই ফিতনাগুলো নিঃশেষ হয়ে যায়। এবং পঞ্চম শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত আনুমানিক ৯শ বছর খ্রিষ্টান ইউরোপে আর ধর্মহীনতার ফিতনা মাথা উঁচু করার সুযোগ পায়নি। কিন্তু চতুর্দশ শতাব্দীতে এসে গির্জার দুর্নীতির সুযোগে ধর্মহীনতা পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে গির্জাকে পরাজিত করে। যার আলোচনা আমরা সামনে করব ইনশাআল্লাহ।
রোমান সাম্রাজ্যের বিভক্তি
৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম ইউরোপের রোমান সাম্রাজ্য (Roman Empire) পতনোন্মুখ হয়ে পড়ে। ইউরোপের মধ্যে তাদের অধঃপতনের কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ সমস্যা। ঐতিহাসিকগণ চারিত্রিক অশ্লীলতা ও অন্তর্দ্বন্দ্বকে পতনের মূল কারণ মনে করেন। পশ্চিম ইউরোপের রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ক্ষমতা পূর্ণভাবে পূর্ব ইউরোপের হাতে চলে আসে, যাকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য (Byzantine Empire) বলা হয়। এই সাম্রাজ্যের সাথেই ইসলামের শুরুতে সাহাবিদের মোকাবিলা হয়েছে। ষষ্ঠ শতাব্দীতে সেন্ট বেনেডিক অফ নর্সিয়া (Saint Benedict of Nursia) খ্রিষ্টানদের মধ্যে রুহবানিয়্যাতের (বৈরাগ্যবাদ) ব্যবস্থা চালু করে, যা আজও প্রচলিত রয়েছে। এই ক্ষেত্রে খ্রিষ্টান পুরুষ বা মহিলা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন ও ইবাদতের উদ্দেশ্যে নিজেকে গির্জার কাছে সোপর্দ করে দিত। তারা সেখানে বিবাহ করতে পারত না এবং কোনো বৈধ চাহিদাও পূরণ করতে পারত না। এই ব্যবস্থা গির্জার ভেতরে অশ্লীলতার এক নতুন রাস্তা খুলে দেয়, যা পরবর্তী সময়ে গির্জার ধ্বংসের কারণ হয়।
খ্রিষ্টানদের পরবর্তী যুগগুলো আলোচনার পূর্বে আমরা এই সময় পর্যন্ত জন্ম নেওয়া খ্রিষ্টবাদের মৌলিক বিশ্বাসগুলো আলোচনা করব; যাতে সামনের ঐতিহাসিক আলোচনায় মূল খ্রিষ্টবাদের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে।
টিকাঃ
২৮. মুসলিম দেশগুলোর পরাজিত মানসিকতার সেক্যুলার শ্রেণি ইসলামকে খ্রিষ্টবাদের ইতিহাসের দৃষ্টিতে দেখে ও দেখায়। যেমন, তারা মিথ্যা দাবি করে যে, খ্রিষ্টবাদের পোপতন্ত্র ও ইসলামের আলিম ও মাদরাসাগুলোর কার্যক্রম একই। বাস্তবতা হচ্ছে এই যুক্তি অনেকগুলো কারণে ভুল। এর একটি মূল কারণ হলো, খ্রিষ্টবাদ সর্বদাই সরকারী দরবারি ধর্ম হিসেবে ছিল। খ্রিষ্টান পাদরিরা শাসকদের জুলুমে অংশীদার ছিল এবং শাসকদের জুলুমকে বৈধতা দেওয়ার জন্য তারা দ্বীনের মৌলিক শিক্ষাকে বিকৃত করে ফেলেছিল। পক্ষান্তরে ইসলামের পুরো ইতিহাস সাক্ষী যে, আমাদের আলিমরা মৌলিকভাবে সর্বদা শাসকদের বিরোধী ও দরবার থেকে দূরে ছিলেন। যখনই কুরআন ও শাসক দুয়ের যেকোনো একটি বাছাইয়ের পরিবেশ এসেছে, তখন তারা কুরআনকেই বাছাই করেছেন। এই সর্বশেষ মুসলিম জাতির সামষ্টিক অনুভূতিও এমন যে, তারা কখনো ভ্রান্ত আলিমদের সম্মান করেনি। বরং জেলে মৃত্যুবরণকারী আবু হানিফা, গাধায় চড়িয়ে ঘুরানো মালিক বিন আনাস, চাবুকের আঘাতপ্রাপ্ত আহমাদ বিন হাম্বল, মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদকারী ইবনে তাইমিয়াকে নিজেদের ইমাম মেনেছে।
📄 খ্রিষ্টবাদের বিশ্বাস
খ্রিষ্টাব্দ ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত সেন্ট পৌলের আবিষ্কৃত খ্রিষ্টবাদের আকিদাসমূহ : • ত্রিত্ববাদের বিশ্বাস • শূলিতে চড়ানো ও কাফফারার বিশ্বাস • খ্রিষ্টান হওয়ার পদ্ধতি • পবিত্র ক্রুশ • ইসা-এর পুনর্জন্মের বিশ্বাস
ত্রিত্ববাদের বিশ্বাস
খ্রিষ্টানদের কাছে রব হলো তিনজনের নাম কিংবা তাদের পরিভাষায় রব তিন জিনিসের সমষ্টি: বাবা, সন্তান ও পবিত্র আত্মা। তাদের দাবি অনুযায়ী এই তিনজন মিলে একজন খোদা, তিনজন মিলে তিন খোদা নয়। খ্রিষ্টানদের মধ্যে এই তিনজনের সম্পর্ক নিয়েও অনেক মতানৈক্য পাওয়া যায়। ইসায়িরা বলে বাবা হলো আল্লাহ তাআলার সত্তা, সন্তান আল্লাহ তাআলার সিফাতে কালাম এবং রুহুল কুদুস তার সিফাতে হায়াত এবং মহব্বত। আর এই গুণটি ইসা-এর শরীরে প্রবেশ করেছিল।
জেনে রাখা দরকার, কুরআনে ইসা-কে কালিমাতুল্লাহ বলা হয়েছে, যা দ্বারা উদ্দেশ্য তাঁর জন্মের জন্য আল্লাহ তাআলার হুকুম। আল্লাহ তাআলার সিফাত বা সিফাতের হুলুল কখনোই এখানে উদ্দেশ্য নয়। কারণ এই বিশ্বাসকে মেনে নেওয়ার দ্বারা হুলুল ও দেহবাদের শিরকি আকিদা সাব্যস্ত করা আবশ্যক হয়ে যায়। হুলুল ও তাজসিম দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহ তাআলার কোনো সিফাত বা অংশ মাখলুকের ভেতর প্রবেশ করা বা মাখলুকের আকৃতি ধারণ করা, যা আল্লাহ তাআলার ক্ষেত্রে কঠিন শিরকি বিশ্বাস।
শূলিতে চড়ানো ও কাফফারার বিশ্বাস
ইসা-এর ইলাহি সিফাত ধারণ ও তাঁকে আল্লাহর সন্তান ঘোষণা দেওয়ার পর শূলিতে চড়ানোর ঘটনাকে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য খ্রিষ্টানরা কাফফারার বিশ্বাস আবিষ্কার করে। যার মূল বিষয় হচ্ছে, আদম ও হাওয়া থেকে সংঘটিত ভুলের দায়ভার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছড়িয়ে যেতে থাকে। আল্লাহ তাআলার ইনসাফের দাবি হলো, সমস্ত মানুষের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করা। অপরদিকে রহমতের দাবি হলো অপরাধীদের ক্ষমা করে দেওয়া। এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা (নাউজুবিল্লাহ) ইসা-এর মধ্যে নিজের রহমতের সিফাত ঢেলে দেন। ইসা-এর মানব-শরীরে সবার অপরাধ প্রবেশ করিয়ে দেন এবং রুহুল কুদ্দুসের হুলুলের মাধ্যমে সিফাতে রহমত তাঁর শরীরের চলে আসে।
সন্তানের মধ্যে থাকা সিফাতে রহমত সমস্ত মানুষকে ক্ষমা করার জন্য কাফফারা হিসেবে নিজেই নিজেকে ক্রুশে চড়িয়ে দেন। এখন মানুষ দোজখের আগুন থেকে বাঁচার জন্য শুধু এতটুকুই কর্তব্য যে, সে আল্লাহ তাআলার এই কাজকে স্বীকার করে নেবে। অর্থাৎ ইসা -কে আল্লাহর সন্তান মেনে খ্রিষ্টান হয়ে যাবে (নাউজুবিল্লাহ)।
খ্রিষ্টান হওয়ার পদ্ধতি
খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস গ্রহণের জন্য ইসায়ি ধর্মের ব্যপ্টিজম (Baptism) ও খোদায়ি খাবার (Lord's Supper) উৎসব পালন করা হয়। ব্যপ্টিজম হচ্ছে যখন কেউ খ্রিষ্টান হয়, তখন তার ওপর বিশেষ পানি ছিটিয়ে পবিত্র করা হয়। এই সময় খ্রিষ্টান হওয়া ব্যক্তি সাদা কাপড় পরিধান করে। খ্রিষ্টানদের ব্যপ্টিজমের ভিত্তি হচ্ছে, যখন ইসা মানুষকে তাওবা করাতেন, তখন নদীতে গোসলের আদেশ দিতেন, তারপর আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে খাদ্যের ব্যবস্থা করতেন, সেখানে শরবত ও বিশেষ রুটি বণ্টিত হতো।
পবিত্র ক্রুশ
ইসা-কে ক্রুশে চড়ানোর ওপর নিজেদের বিশ্বাস প্রকাশের জন্য তারা পবিত্র ক্রুশের বিশ্বাস চালু করে। এটি শুরু হয় কনস্টান্টাইনের সময় থেকে, কারণ সে নাকি শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় আকাশে ক্রুশের চিহ্ন দেখতে পায় এবং এর ফলে যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়। অতঃপর ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী বাদশাহর মা সেন্ট হেলেনা কোনো এক জায়গা থেকে সেই ক্রুশ নাকি পেয়ে যায়, যেটাকে ইসা-কে শূলিতে চড়ানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে যেকোনো বিপদের সময় এই ক্রুশকে উঁচু করে ধরা হতো। এরপর থেকে খ্রিষ্টানরা প্রত্যেক পবিত্র কাজের শুরুতে, খুশি ও খারাপ সংবাদে আঙুলের ইশারায় চেহারা ও বুকের ওপর ক্রুশের চিহ্ন অঙ্কন করে এবং ক্রুশকে তাবিজ বানিয়ে গলায় লটকাতে থাকে।
ইসা-এর পুনর্জন্মের বিশ্বাস
খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস হচ্ছে, ইসা কিয়ামতের পূর্বে দ্বিতীয়বার আগমন করবেন এবং বিশাল হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবেন। এই বিশ্বাসকেই দ্বিতীয় জীবন বলা হয়। খ্রিষ্টানদের কাছে এই বিশ্বাসের ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ তাআলার সিফাতে হায়াত। তাদের দাবি অনুযায়ী ক্রুশে চড়ানোর তৃতীয় দিন হাওয়ারিদের সামনে ইসা নিজেই এসেছিলেন এই সুসংবাদ দেওয়ার জন্য যে, তিনি দ্বিতীয়বার দুনিয়াতে আসবেন। তখন দুনিয়ার খারাপ শক্তিগুলোকে পরাজিত করে বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবেন। এই আকিদা মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যে থাকা মাসিহের আকিদার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
📄 ইউরোপের ইতিহাস
খ্রিষ্টবাদের প্রথম দুই যুগের সম্পর্ক ছিল তুর্কি, শাম ও ফিলিস্তিনের সাথে; কেননা খ্রিষ্টানদের উত্থান সেই এলাকাগুলো থেকেই হয়েছিল। এগুলো ছিল খ্রিষ্টানদের পূর্বাংশ এবং ইউরোপকে খ্রিষ্টানদের পশ্চিমাংশ বলা হতো। সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আত্মপ্রকাশ ও সাহাবিদের বিজয়সমূহ খ্রিষ্টানদের পূর্বাংশকে পরিপূর্ণভাবে নিঃশেষ করে দেয়। ফলে খ্রিষ্টবাদ শুধু ইউরোপে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় এবং সেখানে তারা নিজেদের শক্তিশালী করার জন্য মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপে এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। তাই যদি এটা বলা হয়, ইউরোপকে নতুনভাবে গঠনকারী শক্তি রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টানরা, তাহলে তা ভুল হবে না।
যেমনটা আমরা ওপরে বলে এসেছি, খ্রিষ্টানদের বাকি যুগগুলোর আলোচনা ইউরোপের ইতিহাসে করব, কেননা এগুলো ইউরোপের ইতিহাসেরও অংশ। ইউরোপের নতুন ইতিহাস তিনটি বড় অংশে বিভক্ত। যার শেষ অংশে আবার দুটি ভাগ রয়েছে।
• অন্ধকার যুগ (৫৯০-৮০০ খ্রি.) • মধ্যযুগ (৮০০-১৪৫৩ খ্রি.) • রেনেসাঁর যুগ (১৪৫৩-১৭৮৯ খ্রি.) ০ যুক্তিবাদের যুগ (১৪৫৩-১৬৭৫ খ্রি.) • আলোকায়নের যুগ (১৬৭৫-১৭৮৯ খ্রি.)
ইউরোপের ইতিহাসের ধাপগুলোর ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। কোনো কোনো এতিহাসিকের মতে, এই বিন্যাসটি সেক্যুলার ঐতিহাসিকরা পেশ করেছে, যারা খ্রিষ্টানদের উত্থানকে অন্ধকার যুগ ও পতনকে আলোকিত যুগ হিসেবে বিবেচনা করে। বর্তমান সময়ে যেহেতু সেক্যুলার ব্যবস্থা ও তাদের চিন্তাধারা বিজয়ী, তাই এখন ইউরোপের ইতিহাসের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিন্যাস হিসেবে এটাকেই বিবেচনা করা হয়। তাই আমরাও এটাকে উল্লেখ করেছি। কারণ এখানে ইউরোপের ইতিহাস বর্ণনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং সেসব প্রতিক্রিয়াকে মুসলিমদের সামনে নিয়ে আসা উদ্দেশ্য, যার সাথে বর্তমান সময়ের মুসলিম উম্মাহ ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর সম্পর্ক রয়েছে।
📄 ইউরোপের অন্ধকার যুগ (৫৯০-৮০০ খ্রি.)
ইউরোপের ইতিহাসে ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত সময়কে ডার্ক এজ বা অন্ধকার যুগ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। ঐতিহাসিকগণ এর তিনটি কারণ বর্ণনা করেছেন, যা নিচে আলোচনা করা হচ্ছে।
১. ইউরোপে রোমান সাম্রাজ্যের পতন
কিছু ঐতিহাসিকের মতানুযায়ী এই পরিভাষার সর্বপ্রথম ব্যবহার ১৩৩০ সালে ইতালির ঐতিহাসিক পেত্রার্ক করেছিল। সে পঞ্চম শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্যের পতনকে ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের পতন হিসেবে গণ্য করে অন্ধকার যুগ ঘোষণা দিয়েছিল। এছাড়াও বলেছিল, রোমানরা আবারও উন্নতি করবে এবং ইউরোপের এই অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসবে।
২. ইউরোপের অন্ধকার যুগ ও ইসলামের উত্থান
সপ্তম শতাব্দীতে জাজিরাতুল আরবে ইসলামের আত্মপ্রকাশ ঘটে। অতঃপর ৩০ বছরের কম সময়ে এই দ্বীন পুরো আরবে বিজয়ী হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ -এর অফাতের পর প্রথম খলিফা আবু বকর শামের বাদশাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। যেখানে সে সময় রোমান খ্রিষ্টানদের আবাদি ছিল এবং জুলিয়াস সিজারের শাসন চলমান ছিল। তিনি তাদের বিরুদ্ধে চারটি বাহিনী প্রেরণ করেন। মুসলিম জেনারেলরা কয়েক বছরের মধ্যে রোমান সাম্রাজ্যের পূর্বাংশ পূর্ণভাবে বিজয় করে নেন। কায়সারের ক্ষমতা সংকীর্ণ হয়ে শুধু কনস্টান্টিনোপলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। খ্রিষ্টবাদ যা রোমান সাম্রাজ্যের আবশ্যকীয় অংশ, তা ছোট হয়ে ইউরোপের অনেক সীমিত এলাকায় আবদ্ধ হয়ে যায়। সাহাবিদের হাতে পূর্বাংশে পরাজিত হয়ে আজও খ্রিষ্টবাদ পূর্ণভাবে ইউরোপে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। খ্রিষ্টানদের ইউরোপে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সেই সময়কে অন্ধকার যুগ বলা হয়ে থাকে।
৩. ইউরোপে খ্রিষ্টসমাজ কর্তৃক থিক দর্শনের বিরোধিতা
অন্ধকার যুগ বলার তৃতীয় কারণ সেক্যুলারিজম। কিছু সেক্যুলার ঐতিহাসিকের নিকট এই যুগে গির্জার পক্ষ থেকে গ্রিক দর্শন, সেক্যুলারিজম বা ধর্মহীনতাকে প্রশাসনিক চাপের মাধ্যমে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। এবং এই আক্রমণ ও চাপের ফলে তাদের দাবি অনুযায়ী ইউরোপ বিজ্ঞানের উন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। সেই সাথে খ্রিষ্টান পাদরিদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও বাড়াবাড়ির ফলে ইউরোপে এমন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হয়, যার ফলে ইউরোপে বিজ্ঞানের আলোচনা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। তাদের দাবি অনুযায়ী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বুদ্ধি, জ্ঞান ও স্বাধীনতার ওপর এই বাড়াবাড়ি প্রয়োগ হওয়াই ইউরোপে অন্ধকার যুগের কারণ। অনেক ঐতিহাসিকরা এই পরিভাষাকেই সঠিক মনে করেন না এবং এটাকে সেক্যুলার ঐতিহাসিকদের পক্ষ থেকে খ্রিষ্টান ধর্মের বিরোধিতা মনে করে। এটি অনেক দীর্ঘ এক আলোচনার বিষয়। কিন্তু এখান থেকে যে বিষয়টা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, তা হলো সেই যুগে খ্রিষ্টবাদের পূর্ব ও পশ্চিম দুই অংশেই পতন শুরু হয়। অতঃপর এই যুগের শেষে এসে মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপের মূর্খ ও হিংস্র গোত্রগুলোকে বাধ্য করে খ্রিষ্টান বানানো হয়।
ইউরোপের ইতিহাসের এই প্রথম যুগ পশ্চিম ইউরোপে রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংস থেকে শুরু হয়ে অষ্টম শতাব্দীতে ফ্রান্সের বাদশাহ চার্লিম্যানের সিংহাসনে বসা পর্যন্ত চলমান ছিল। আরও ব্যাপকভাবে বললে, এই সময় ৫শ থেকে ১০০০ সাল পর্যন্ত চলমান ছিল। এই সময়ে ইউরোপে একদিকে গৃহযুদ্ধ চলছিল এবং অপরদিকে খ্রিষ্টবাদ ছড়িয়ে পড়ছিল। জেনে রাখা আবশ্যক যে, এই সময়ে পুরো ইউরোপে খ্রিষ্টানদের ক্ষমতার পথে কোনো বাধার সৃষ্টি হয়নি। কেননা পূর্ব ইউরোপের রোমান সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য খ্রিষ্টানদের ক্ষমতা পূর্ণভাবে টিকিয়ে রেখেছিল। অতঃপর পশ্চিমে ৫৯০ সালে যখন গ্রেগোরি (১ম) পোপ হয়, তখন সে খ্রিষ্টবাদের প্রচারের সীমা জার্মানি ও ব্রিটেন পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়।
সেই সময় খ্রিষ্টান বা রোমান ক্যাথলিক চার্চই ছিল ইউরোপের একক শক্তিধর, যারা ইউরোপকে একত্রিত রেখেছিল। এমনকি চার্চ, স্টেট ও গির্জার ক্ষমতার এতটাই উত্থান হয়েছিল যে, ফ্রান্সের বাদশাহ চার্লিম্যানের সিংহাসনে বসার সময় তার মাথার মুকুট গির্জার পোপ রেখেছিল। সেই খ্রিষ্টান বাদশাহ মুশরিকদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড যুদ্ধের মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ এলাকা দখল করে নিয়েছিল। অতঃপর নিজেকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যের অনুগত হওয়ার ঘোষণা করেছিল।
টিকাঃ
২৯. এখানে রোম সাম্রাজ্যের পতন দ্বারা উদ্দেশ্য পশ্চিম ইউরোপে রোম সাম্রাজ্যের পতন, সামষ্টিকভাবে খ্রিষ্টবাদের পতন নয়। কেননা, রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর পূর্ব ইউরোপে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মাধ্যমে খ্রিষ্টানরা প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তী সময়ে নবম শতকে পশ্চিম ইউরোপেও রোমান ক্যাথলিক চার্চের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা হয়, যারা হোলি রোমান সাম্রাজ্যের ভিত্তি রেখেছিল।