📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 মহান লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইহুদিদের কার্যপদ্ধতি

📄 মহান লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইহুদিদের কার্যপদ্ধতি


ইহুদিদের লিখিত বই এবং তাদের বিরোধীদের বইগুলো অধ্যয়নের দ্বারা এটা স্পষ্ট হয় যে, ইহুদিরা নিজেদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত ছিল। নিজেদের সংখ্যা কম হওয়া ও দুশমনের শক্তির ব্যাপারে তারা জানত। এই জন্য তারা খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে নিজেদের সহযোগী তৈরি করা শুরু করে, যারা তাদেরকে এই লক্ষ্যসমূহ অর্জনে সাহায্য করবে। তারা সেই সহযোগীদের মাধ্যমে খ্রিষ্টানদের বানানো অবরোধ থেকে বের হয়ে আসে। কেননা, এই অবরোধ থেকে বের হওয়া ব্যতীত তারা কখনোই নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম ছিল না। অতঃপর তাদের সমমনা ব্যক্তিদের সাহায্যে সেই শক্তিগুলো দূর করতে থাকে, যারা তাদের পবিত্র ভূমি দখলের মধ্যে বাধা হয়ে ছিল। যাতে তারা ফিলিস্তিন দখল করে পুরো দুনিয়াকে গোলাম বানিয়ে নিজেদের বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে। তাদের এই বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই সামাজিক শক্তিগুলোকে বিলুপ্ত করা বা দুর্বল করে দেওয়া আবশ্যক ছিল। বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর কব্জা করা ও পুরো দুনিয়াকে কন্ট্রোল করা প্রয়োজন ছিল। কারণ চলমান পুরাতন বিশ্বব্যবস্থা ইহুদিদের কাজে আসছিল না। তাই তাদের পুরো দুনিয়ার সমস্ত সিস্টেমকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। আর এই নতুন ব্যবস্থাকেই নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা নতুন বিশ্বব্যবস্থা বলা হয়।

ইহুদিদের লক্ষ্য কী ছিল? এবং তারা কী চায়? জায়োনিজমের ওপর লিখিত সবগুলো বইয়েই এর কিছু না কিছু উত্তর অবশ্যই পাওয়া যায়। কিন্তু সবচেয়ে বিস্তারিত সামগ্রিক আলোচনা সেই দলিলগুলো থেকে পাওয়া গেছে, যা ১৯০৫ সালে রাশিয়ার এক পাদরির হাতে আসে এবং যাকে 'ইহুদিবাদী গুরুদের নীতিমালা' (Protocols of the Elders of Zion) বলা হয়। সেই গোপন নথিপত্রে ইহুদি গুরুদের পূর্বের শত বছরের কার্যক্রমের পর্যালোচনা এবং তাদের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপগুলোর আলোচনা রয়েছে। সেই নথিতে বর্ণনা করা হয়েছে,
কীভাবে ইহুদিরা ইউরোপে আলোকায়নের নামে ধর্মবিরোধিতা ছড়িয়েছে। ইউরোপের পুরাতন ব্যবস্থাকে বিলুপ্ত করে ভবিষ্যতে তারা কীভাবে অর্থনীতির মাধ্যমে পুরো দুনিয়াতে নিজেদের হুকুমতকে চাপিয়ে দেবে। সেই নথিপত্র খুব গভীরভাবে অধ্যয়নের দ্বারা বোঝা যায়, ইউরোপে বৃদ্ধি পাওয়া ধর্মহীনতার আন্দোলনকে ইহুদিরা কীভাবে দক্ষতার সাথে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে এবং ফরাসি বিপ্লবের পর দুনিয়ার পরিবর্তনগুলো কীভাবে তারা নিয়ন্ত্রণ করেছে।

এই কথাগুলোর সারসংক্ষেপ হচ্ছে, নিজেদের লক্ষ্য পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য ইহুদি ও জায়োনিস্ট সংগঠনগুলো ইউরোপে ও মুসলিম উম্মাহর মধ্যে নিম্নোক্ত শক্তিগুলোকে টার্গেট বানায়:

১. প্রথম টার্গেট ছিল মুসলিম ও খ্রিষ্টান জনগণের মাঝে থাকা বিশ্বাস, আল্লাহ তাআলাই সকল বিধানের উৎস। ইউরোপের মানুষের এই বিশ্বাস ছিল যে, গির্জা হচ্ছে আল্লাহ তাআলার হুকুমত আর পোপরা দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি এবং বাদশাহরা পোপদের প্রতিনিধি। বাদশাহদের কাজ হচ্ছে, রোমের পোপদের আদেশ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা, যে আদেশ খ্রিষ্টানদের দাবি অনুযায়ী আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে। ফলে তখন বাদশাহ ও জনগণের জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করা। অপরদিকে খলিফাদের ব্যাপারে মুসলিমদের বিশ্বাস হচ্ছে, তারা আল্লাহর রাসুলের প্রতিনিধি এবং তাদের কাজ আল্লাহ তাআলার বিধান প্রয়োগ করা এবং মানুষকে শরিয়াহ মুতাবিক পরিচালিত করা। ২৬ সুতরাং সব বিধানের মূল আল্লাহ তাআলার আদেশ, হাকিমিয়্যাতের এই আকিদা সমাজে টিকে থাকা অবস্থায় ইহুদিদের বৈশ্বিক হুকুম প্রতিষ্ঠা সম্ভব ছিল না। তাই তারা এই আকিদাকে এনলাইটেনমেন্টের ধর্মহীন আন্দোলনের মাধ্যমে খতম করে দেয়।
২. দ্বিতীয় শক্তি ছিল গোত্র ও বংশীয় ঐক্য। পুরো দুনিয়াতে গোত্রীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল, যা ইউরোপে জাগিরদার ব্যবস্থার মাধ্যমে চলমান ছিল। এই জাগিরদার ব্যবস্থা মূলত গোত্রীয় শক্তিগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হতো এবং গোত্রীয় শক্তিগুলো বংশধারার ভিত্তিতে চলমান ছিল এবং বংশীয় ব্যবস্থার নেতৃত্ব ছিল পুরুষদের হাতে। যার ফলে এই ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ সমস্ত কার্যক্রম, আচরণবিধি ও অর্থনীতি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য বিশাল শক্তি বিদ্যমান ছিল এবং যতদিন পর্যন্ত তা প্রতিষ্ঠিত থাকত, ততদিন ইহুদিদের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না। তাই এই ব্যবস্থাকে তারা পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের ধোঁকার মাধ্যমে, স্বাধীনতা (Freedom) সমতার (Equality) স্লোগানের সাহায্যে দূর করে দেয়।

৩. তৃতীয় শক্তি ছিল অর্থের শক্তি। ইহুদিরা অনেক বছর যাবৎ ইউরোপের বাণিজ্যের ওপর কর্তৃত্বশীল ছিল। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর কজার জন্য তাদের এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল, যা সমস্ত বিশ্বের প্রতিটা দেশের অর্থনীতিকে একে অপরের মুখাপেক্ষী করে দেবে। ২৭ এই ব্যবস্থা শুধু তখনই বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব ছিল, যখন স্বর্ণকে কারেন্সি থেকে আলাদা করে তার জায়গায় কাগজের কারেন্সি প্রচলন ঘটানো হবে এবং কারেন্সির মূল্যমান নির্ধারণের ক্ষমতা শুধু ব্যাংককে দেওয়া হবে এবং সেই ব্যাংকগুলোও থাকবে ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে। অতঃপর স্বর্ণকে কারেন্সি থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুবাদে ইহুদিদের ব্যাংকগুলো অগণিত কারেন্সি নিজেরাই ছাপানোর সুযোগ পেয়ে যায়। যার ফলে পুরাতন বাণিজ্যব্যবস্থা শেষ হয়ে নতুন বাণিজ্যিক ব্যবস্থার অধীনে সব অঞ্চলের বাণিজ্য একে অপরের ওপর নির্ভরশীল (Interdependant) হয়ে যায়। এই অগণিত কারেন্সি দ্বারা ইহুদিরা পুরো দুনিয়ার উৎপাদন ও বাণিজ্যের ওপর বিজয়ী হয়ে যায়। কারণ দুনিয়ার ওপর তারাই শাসন করে, যাদের হাতে খাদ্যের মজুদ থাকে। কারেন্সি অত্যধিক বেড়ে যাওয়ার দ্বিতীয় ফায়দা হচ্ছে, ইহুদিরা ব্যাংক থেকে প্রত্যেকটা কোম্পানি, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে সুদ-ভিত্তিক ঋণ দিয়ে তাদেরকে গোলাম বানিয়ে রাখে। কারেন্সির এই শক্তি তাদেরকে বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে যেমন সাহায্য করে, তেমনই সামরিক অস্ত্র হিসেবেও কাজ করে।

অপরদিকে ইহুদিরা এই অগণিত কারেন্সির দ্বারা দুনিয়ার অধিকাংশ স্বর্ণের ভান্ডার ক্রয় করে নেয়। যাতে কারেন্সির মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, স্বর্ণের ভান্ডার জমা করা এবং সমস্ত রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে বৈশ্বিকভাবে একে অপরের মুখাপেক্ষী করে দেওয়ার দ্বারা দুনিয়ার
অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই অর্থনৈতিক শক্তিকে তারা যখন চাইবে, ব্যবসার জন্য ব্যবহার করবে, আবার যখন চাইবে সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। সুতরাং নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের বাণিজ্যিক ব্যবস্থা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত হওয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যাকে 'বাজার অর্থনীতি' (Market Economy) বলা হয়, এই দুইটাই আজ পূর্ণভাবে ইহুদিদের প্রতিনিধিত্ব করে। এই ব্যাপারে আমরা বইয়ের দ্বিতীয় অংশে বিস্তারিত আলোচনা করব।

টিকাঃ
২৬. এখানে ইহুদিদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো 'আল্লাহর হাকিমিয়্যাত'-এর আলোচনা উদ্দেশ্য, যা আল্লাহ তাআলার হিদায়াত ও শিক্ষা অনুযায়ী মুসলিমদের খিলাফতে বাস্তবায়িত ছিল। খ্রিষ্টানদের মাঝেও এর একটি অবস্থা বিদ্যমান ছিল এবং তা ইহুদিদের পথে বাধা হয়েছিল; কিন্তু তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বিকৃত। সেখানে পাদরিদেরকে আল্লাহর আদেশের ঊর্ধ্বে স্বয়ং হালাল-হারাম নির্ধারণকারী মনে করা হতো। খ্রিষ্টবাদ মূলত দ্বীনের লিবাসে মানুষকে মানুষের গোলামে পরিণত করত। পক্ষান্তরে ইসলামে শাসক, আলিম ও জনগণ সবাই সমানভাবে এই শরিয়তের অনুগত, যা আল্লাহর নবি নিয়ে এসেছেন। যা আলিম ও শাসক নিজেদেরকেও মানতে হয় এবং জনগণকেও সেই মুতাবিক (নিজের চাহিদা অনুযায়ী নয়) পরিচালনা করতে হয়। এর সবচেয়ে উত্তম উদাহরণ আবু বকর-এর খিলাফত গ্রহণকালে দেখা যায়, যখন তিনি বলেছিলেন, 'যদি আমি সোজা পথে (শরিয়াহ অনুযায়ী) চলি, তাহলে আমাকে আনুগত্য করবে; আর যদি বাঁকা পথে যাই, তাহলে আমাকে সোজা করে দেবে।' মোটকথা এখানে বোঝা আবশ্যক যে, ইসলামকে কখনোই খ্রিষ্টবাদের সদৃশ আখ্যা দেওয়া যাবে না। এখানে কেবল ইহুদিদের পথে একটি বাধা হিসেবে আলোচনা করা উদ্দেশ্য।
২৭. এটাকে Economic Integration বলা হয়। যার দ্বারা উদ্দেশ্য আঞ্চলিক ও রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যকে একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত করে দেওয়া; যাতে আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত বাণিজ্যিক একটি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হয় এবং এর ফলে বৈশ্বিক পুঁজিবাদ (Global Capital) সৃষ্টি হয়। বাহ্যিকভাবে এই শৃঙ্খলার মধ্যে সমস্ত রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে একটি সন্তুষ্টিজনক উন্নতি দেখা যায়; কিন্তু এর ফলে আড়ালে আন্তর্জাতিক স্তরে বসে থাকা ইহুদি পুঁজিবাদী কোম্পানি ও ব্যক্তিরা বিশ্বের সমস্ত সম্পদকে নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়, যার ভয়ানক ফলাফলের দিকে পূর্বের আলোচনায় ইঙ্গিত করা হয়েছে।

📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 ইহুদিদের গোপন এজেন্ট

📄 ইহুদিদের গোপন এজেন্ট


ইহুদিরা ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে তাদের সমস্যা ও সমাধানের পরিকল্পনাগুলো গোপন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। ইসলামি বিশ্ব ও ইউরোপের ইতিহাস গভীরভাবে অধ্যয়নের দ্বারা এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এমনকি অনেক পশ্চিমা ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও খ্রিষ্টান-বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের প্রশাসনের সামনে ইহুদিদের এই গোপন এজেন্ডার প্রমাণ পেশ করেছে, যা তারা খ্রিষ্টান-বিশ্বের বিরুদ্ধে করছিল। এ ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন খ্রিষ্টান শাসক এই গোপন সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছিল। এই ধরনের একটি আক্রমণের আলোচনা চতুর্দশ শতাব্দীতে ফ্রান্সের প্রসিদ্ধ খ্রিষ্টান বাদশাহ ফিলিপ দ্য ফায়ার (Philip IV, the Fair)-এর ইতিহাসে পাওয়া যায়। বাদশাহ ফিলিপ হঠাৎ প্যারিসে (Knights Templar) নাইট টেম্পলারদের একটি ঘাঁটিতে ক্র্যাকডাউন দিয়ে সেখানের সকল নাইট সিপাহিকে গ্রেফতার করে আনে। এই ধরনের সেনাদের গ্রেফতার করা কোনো সাধারণ ব্যাপার ছিল না। কারণ নাইটরা ছিল ক্রুসেডগুলোর হিরো এবং তাদের ছিল বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদা। গ্রেফতার হওয়া নাইট সিপাহিদের ওপর ধর্মীয় আদালতে মামলা চালানো হয়। তাদের ওপর অভিযোগ ছিল, তারা ক্রুশকে অসম্মান করে এবং শয়তানের পূজা করে। পরবর্তী সময়ে তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছিল যে, এই নাইটরা ইহুদি ছিল এবং তারা খ্রিষ্টানদের বেশ ধারণ করে ফিলিস্তিনে হামলাকারী বাহিনীতে অংশগ্রহণ করেছিল। সেখানে তারা বেশ সাহসিকতার সাথে লড়াই করে অনেক আক্রমণ চালিয়েছিল। কিন্তু তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল খ্রিষ্টানদের উত্থান নয়; বরং ইহুদিদের জন্য ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাস্তা পরিষ্কার করা।

নাইট টেম্পলারদের দ্বিতীয় ঘটনা সেই যুগেই স্কটল্যান্ডের ইতিহাসে পাওয়া যায়। ফ্রান্সের বাদশাহ ফিলিপের আক্রমণ থেকে পলায়ন করে নাইটরা তখন স্কটল্যান্ডের বাদশাহ (Robert Bruce) রবার্ট ব্রোসের আশ্রয়ে চলে যায়। ব্রোস তখন ইংল্যান্ডের সাথে যুদ্ধরত ছিল। সে এই শর্তে নাইটদের আশ্রয় দেয় যে, তারা সেই যুদ্ধে তাকে সম্পদ দিয়ে সাহায্য করবে এবং নাইটরা এতে সম্মত হয়। পরবর্তী সময়ে বাদশাহ ব্রোস এই যুদ্ধে জয় লাভ করে এবং স্কটল্যান্ড ইংরেজদের থেকে স্বাধীন হয়ে যায়। বাদশাহর পক্ষ থেকে সুবিধা পেয়ে নাইটরা স্কটল্যান্ডে তাদের সংগঠনকে এগিয়ে নিতে থাকে।
ইহুদিদের গোপন কার্যক্রমের আরেকটি রেকর্ড পাওয়া যায় অষ্টাদশ শতাব্দীতে যখন ফ্রি মেসন (free Mason) নামের একটি আন্দোলন সামনে আসে। ফ্রি মেসন শব্দের অর্থ হচ্ছে, স্বাধীন স্থাপত্যশিল্পী বা রাজমিস্ত্রী। ফ্রি মেসন আন্দোলনের ভিত্তি ছিল ইহুদিবাদ। তাদের বিশ্বাস ছিল হাইকাল নির্মাণের জন্য সুলাইমান এমন এক রাজমিস্ত্রীকে কাজে লাগান, যে লোহা ব্যতীত শুধু আওয়াজ দিয়েই পাথর কাটতে পারত। আর সেই মাস্টার মেসন বা প্রধান মিস্ত্রী ছিল আবিফ আহিরাম নামক এক ব্যক্তি। যার কাছে জিউমেট্রিক জ্ঞান ছিল এবং এই ব্যক্তি লোহা ব্যতীতই পাথর কাটতে পারত। সুলাইমান আবিফ আহিরামকে হাইকাল নির্মাণের জন্য মাস্টার মেসন অর্থাৎ প্রধান মিস্ত্রী বানিয়েছিলেন। হাইকাল নির্মাণের পর এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সেই মাস্টার মেসনকে হত্যা করা হয়।

ইহুদিদের বিশ্বাস হচ্ছে, এই মাস্টার মেসনের কাছেই হাইকালের গোপন ইঞ্জিনিয়ারিং নকশা ছিল। তাই এই মাস্টার মেসন দ্বিতীয়বার আবির্ভূত হবে এবং তার অধীনে হাইকাল দ্বিতীয়বার নির্মাণ করা হবে। আর ফ্রি মেসনদের জিম্মাদারি হচ্ছে, সেই মেসনের আগমনের জন্য পরিবেশ প্রস্তুত করা। অর্থাৎ তারা চক্রান্তের মাধ্যমে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করবে, যার ফলে পুরো দুনিয়াতে কোনো মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি দখল প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ফ্রি মেসন আন্দোলনের অধীনে অনেক গোপন ও প্রকাশ্য সংগঠন কাজ করে। প্রকাশ্য দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, এমন সংগঠন, যার বাহ্যিক কোনো সাধারণ লক্ষ্য থাকে; কিন্তু যারা এই সংগঠনের গভীরে প্রবেশ করে, তারা জানতে পারে যে, মূলত তাদের উদ্দেশ্য সেটাই, যা ফ্রি মেসনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়। এই সমস্ত সংগঠনের মধ্যে প্রসিদ্ধ হচ্ছে 'লায়ন্স ক্লাব' (International Association of Lions Clubs) এবং 'রোটারি ক্লাব' (Rotary International)

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক বইয়ে এবং অনেক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি মিডিয়ার সামনে ইহুদিদের গোপন চক্রান্তগুলো উন্মোচন করেছে। তাদের মধ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন (Abraham Lincoln), প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব ফোর্ড মটর কোম্পানির (Ford Motor Company) মালিক হেনরি ফোর্ড (Henry Ford), জার্মানির শাসক হিটলার (Adlof Hitler) অন্তর্ভুক্ত। তারা ইউরোপে ইহুদিদের প্রভাব ও বৈশ্বিক ক্ষমতার ওপর তাদের দখলদারির চক্রান্ত প্রকাশ করেছে। এই ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই, যা বিশ্বের সামনে ইহুদিদের চক্রান্ত ও লক্ষ্যগুলোকে স্পষ্ট করেছে, তা হচ্ছে 'প্রটোকলস' অর্থাৎ ইহুদিদের গুরুদের চুক্তি ও নথিপত্র। যার আলোচনা আমরা পূর্বেও করেছি। ইহুদিদের এই সমস্ত প্ল্যানকে বিস্তারিতভাবে জন লরেন্সের (Jhon Lawrence Reynolds) প্রসিদ্ধ বই (Secret Societies) 'সিক্রেট সোসাইটি' এবং ওয়াল্টার ল্যাকারের (Walter Laqueur) বই 'হিস্টোরি অফ জায়োনিজম' (A History of Zionism)-এর মধ্যে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ইহুদিদের এই সমস্ত চালবাজি ও কার্যক্রমের ব্যাপারে গত শতাব্দীতে মুসলিম ও খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকগণ অনেক দলিল-প্রমাণ পেশ করেছেন। তারা প্রমাণ করেছেন, ইহুদিদেরকে ফিলিস্তিন থেকে বের করে দেওয়ার পর থেকেই তারা নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। এই কাজে সব ধরনের ইহুদিরা অংশগ্রহণ করেছিল, এখানে সেসব দৃঢ় বিশ্বাসের ইহুদি ছিল, যারা মাসিহ আসার অপেক্ষায় রয়েছে। যারা মনে করে মাসিহের আগমনের পর ইহুদিদের সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এবং সেসব ইহুদিও ছিল, যারা মনে করে মাসিহের অপেক্ষা না করে বরং আমাদেরকে মাসিহের আগমনের পরিবেশ প্রস্তুতের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এই প্রকারের ইহুদি-যারা মাসিহের আগমনের পরিবেশ তৈরি করছে-তাদের মধ্যে দুটি দল পাওয়া যায়। একটি দল দৃঢ় বিশ্বাসী ইহুদি, যারা তালমুদের বিধানের ওপর আমল করে মাসিহকে পেতে চায়, অপর দলটি জায়োনিস্টদের সাথে সম্পৃক্ত ইহুদি।

এই দুটি দল বনি ইসরাইলের সেই পুরাতন দুই ফিরকার ধারাবাহিকতার ফসল, যাদের মধ্যে একটি দল পরিপূর্ণভাবে বা'ল ও আস্তারাতের পূজায় লিপ্ত ছিল এবং অপর দল ছিল ফারিসি আলিম, যারা দাউদ-এর বংশ থেকে মাসিহের আগমনের অপেক্ষায় ছিল। এই দুই দলই ইসা-এর দাওয়াতকে অস্বীকার করেছিল। কেননা, বনি ইসরাইলের মুশরিক গ্রুপ, যারা বা'ল দেবতার পূজা করত, তারা জেনেবুঝে ইসা-এর মোকাবিলায় শয়তানি শক্তির সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের বিশ্বাস ছিল দুনিয়াতে দুটি শক্তি রয়েছে, ভালো শক্তি অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা ও শিরকি শক্তি অর্থাৎ শয়তান। মানুষের স্বাধীনতা রয়েছে যে, তারা এই দুই শক্তির যেকোনো একটির সাথে থাকতে পারবে। মূলত তারা যে মাসিহের অপেক্ষায় আছে, সেই মাসিহ হচ্ছে শয়তানের পক্ষ থেকে আগমনকারী দাজ্জাল। এই গ্রুপগুলো গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।

অপর দল যারা ফারিসি আলিমদের কারণে দ্বীনের মধ্যে বিকৃতির শিকার হয়েছিল, তারাও সর্বশেষ নবি ও মাসিহের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু ইসা-এর হত্যার ষড়যন্ত্রের ঘটনার পর তারা পরিপূর্ণভাবে গোমরাহ হয়ে যায়। এই দলটি নবিদের ওপর আসা ওহির মাধ্যমে শেষ জমানার ঘটনাগুলোর ব্যাপারে জ্ঞাত ছিল এবং তারা জানত যে, শেষ জমানায় একজন মাসিহ আসবেন, যিনি পুরো দুনিয়াতে শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। এখন যেহেতু এই ইহুদিরা নিজেরাই ভ্রান্ত ও সঠিক রাস্তা থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিল, তাই তারা মাসিহুল্লাহর দুশমন হয়ে যায় এবং মাসিহে দাজ্জালকেই তারা সর্বশেষ জমানার মাসিহ হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। এই দলটি মাসিহের আগমনের জন্য পরিবেশ তৈরি করার ক্ষেত্রে মুশরিক ইহুদিদের সাথে একজোট হয়ে কাজ করছে।

সুতরাং এই দুটি দল-চাই মুশরিক ইহুদি হোক বা বিকৃতির শিকার ইহুদি-তারা সকলেই জায়োনিস্ট আন্দোলনে একত্রিত হয়ে গেছে এবং এখন তাদের সকলেই সেই তিনটি
লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে, যা পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। মোটকথা, জায়োনিজম বা ইহুদিবাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য অনেক গোপন সংগঠন তৈরি করা হয়েছে, যেমনটা আমরা পূর্বে বলেছি। এই সমস্ত শক্তিশালী বাস্তবতা সত্ত্বেও এখানে কেবল তাদের পর্দাবৃত পরিকল্পনার আলোচনার ওপর নির্ভর করা হচ্ছে না; বরং তাদের সেসব ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তগুলোও আলোচনা করা হবে, যা প্রত্যেকের সামনেই দৃশ্যমান এবং যার দলিল-প্রমাণ এখন কোনো গোপন বিষয় নয়।

📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 ইহুদিদের প্রকাশ্য চক্রান্ত

📄 ইহুদিদের প্রকাশ্য চক্রান্ত


ইহুদিদের নতুন ইতিহাসে দৃষ্টিপাত করলে গত দুই হাজার বছরের দ্বীনে হকের সাথে তাদের দুশমনি ও চক্রান্ত, মানুষকে গোমরাহ করা এবং নিজেদের স্বার্থ অর্জনের চেষ্টা- প্রচেষ্টার আলোচনা এখনো সংরক্ষিত দেখতে পাওয়া যায়। ইসা -এর আনীত সত্য দ্বীনের মধ্যে বিকৃতির ক্ষেত্রে সেন্ট পৌলের কার্যক্রম, উসমান -এর শাহাদাতের মধ্যে ইহুদি আব্দুল্লাহ বিন সাবার চক্রান্ত, ইউরোপের মার্টিন লুথারের প্রটেস্টান্ট আন্দোলনের সাথে ইহুদিদের সম্পর্ক, ইউরোপে গির্জার বিরুদ্ধে এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে ইহুদি দার্শনিকদের ভূমিকা, ফরাসি বিপ্লবের মধ্যে ইহুদিদের পদক্ষেপ, নতুন ব্যাংকব্যবস্থা, কারেন্সি ও বাণিজ্যব্যবস্থাকে কাবু করার জন্য ইহুদি বংশের চক্রান্ত, ইউরোপে পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইহুদিদের চক্রান্ত, রাশিয়াতে কমিউনিস্ট আন্দোলনে ইহুদিদের কার্যক্রম, খিলাফত ধ্বংসে ইহুদিদের কার্যক্রম এবং আমেরিকার প্রত্যেকটি অংশে ইহুদিদের দখলদারিত্ব এতটাই স্পষ্ট ও প্রমাণিত বিষয়, যা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। ইহুদিদের চক্রান্ত গোপন হোক বা প্রকাশ্য—তাদের দাবি ও লক্ষ্য একটাই। তা হচ্ছে, আধুনিক যুগে ইহুদিরা নিজেদের পূর্বের ক্ষমতা ও ইতিহাসকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। বর্তমানের নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার মূলত ইহুদিদের আদি ক্ষমতাকে ফিরিয়ে আনার নাম। কারণ নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার মূলত ইহুদি ও তাদের সমমনাদেরই সৃষ্টি। তবে পুরাতন বিশ্বব্যবস্থা হোক বা নতুন বিশ্বব্যবস্থা, মুসলিম উম্মাহর সামনে শত্রু একটাই। আমরা সামনের অধ্যায়ে চক্রান্তগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

ইতিহাস এই কথা স্বীকার করে যে, ইহুদিরা ইউরোপের গির্জার বিরুদ্ধে সৃষ্ট আন্দোলনসমূহকে নিজেদের স্বার্থ অর্জনের জন্য খুব ভালোভাবে ব্যবহার করেছিল। কীভাবে তারা নিজেদের স্বার্থ অর্জন করেছিল—সেই আলোচনার পূর্বে আমরা এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব যে, ইউরোপে খ্রিষ্টানদের উত্থান কীভাবে হয়েছিল? খ্রিষ্টবাদ ইউরোপে কোন ধরনের হুকুমত প্রতিষ্ঠা করেছিল? সেই ব্যবস্থায় কী ধরনের সমস্যা ছিল? সেই সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে কী কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল? গির্জার বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রভাবে ইউরোপের মানুষের মধ্যে কী ধরনের চিন্তাগত পরিবর্তন এসেছিল? সেই চিন্তাগত পরিবর্তন থেকে ইহুদিরা কীভাবে ফায়দা নিয়েছিল? ইহুদিরা ইউরোপে খ্রিষ্টানদের চাপিয়ে
দেওয়া বাধা কীভাবে ভেঙে ফেলেছিল? ইউরোপে মানবাধিকারের যুদ্ধ কীভাবে শুরু হয় এবং কীভাবে ইহুদিরা এর থেকে ফায়দা অর্জন করে? খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা একজোট কীভাবে হয়েছিল? ইহুদিরা ইউরোপের সামাজিক ব্যবস্থা কীভাবে ভেঙে ফেলেছিল? ইহুদিরা বৈশ্বিক বাণিজ্যকে কীভাবে কব্জা করেছে? আজকের ইহুদিরা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে কীভাবে একটা যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে? জাতিসংঘের অধীনে ইহুদিরা কীভাবে বৈশ্বিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এতে তাদের উদ্দেশ্য কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়ে সামনের অধ্যায়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00