📄 ফরাসি বিপ্লব থেকে আধুনিক ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত
এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন ও ফরাসি বিপ্লব
একদিকে প্রটেস্টান্টরা ইউরোপে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশাল প্রভাব বিস্তার করছিল, অপরদিকে রোমের গির্জার জুলুমে অতিষ্ঠ হয়ে ধর্মের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট খ্রিষ্টানরা সপ্তদশ শতাব্দীতে গির্জার বিরুদ্ধে মানবাধিকারের নামে একটি আন্দোলন শুরু করে। যাকে তারা ‘এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন’ (Enlightenment Movement) বলে থাকে। এই আন্দোলনের দার্শনিকরা মানবীয় বিবেকের ভিত্তিতে খ্রিষ্টান ধর্মকে অস্বীকার করে বসে। ১৭৮৯ সালের ৪ জুলাই ‘ফরাসি বিপ্লব’ (French Revolution) হয়। যার ফলে গির্জা ও বাদশাহদের ক্ষমতা শেষ হয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয়। এরপর থেকে আস্তে আস্তে পুরো ইউরোপে গণতন্ত্রের আওয়াজ উঁচু হতে শুরু করে। ফরাসি বিপ্লবের দ্বারা আর কারও ফায়দা হোক বা না হোক, ইহুদিদের অনেক ফায়দা হয়। তাদের ওপর থেকে সব বাধা দূর হয়ে যায়। ইতিহাসবিদগণ এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনে ইহুদিদের হাত থাকার অনেক প্রমাণ পেশ করে থাকেন। মোটকথা ফরাসি বিপ্লবের পর ইহুদিদের ওপর থেকে গির্জার সব ধরনের বাধা দূর হয়ে যায়। এই বাধাগুলো দূর হওয়ার পর ইহুদিদের ইসরাইল দখল পর্যন্ত আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
আঠারো শতাব্দীর সূর্য ইহুদিদের উত্থানের সাথে উদিত হয়। ইহুদিরা ইউরোপে তৃতীয় স্তরের নাগরিক ছিল, ফরাসি বিপ্লবের পর গণতান্ত্রিক প্রশাসনের পার্লামেন্টগুলো তাদের সমান অধিকার দিয়ে দেয় এবং এর ফলে ইহুদিরা প্রথম স্তরের নাগরিকে পরিণত হয়। আর এটা ছিল ইসরাইলি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ। যার পর আরও কয়েকটি ধাপের পথ উন্মোচন হয়ে যায়।
ইহুদিদের নতুন ইতিহাসের সবচেয়ে আশ্চর্যকর বিষয় হচ্ছে, ফরাসি বিপ্লব হয়েছিল সব ধর্মের প্রতি অসন্তুষ্টির ফলে এবং যার প্রভাবে পুরো বিশ্বে ধর্মহীনতার শাসন ছড়িয়ে পড়ে এবং সব ধরনের দ্বীনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। অথচ তারাই আবার তাদের ক্ষমতা ও বৈশ্বিক শক্তির সাহায্যে এমন এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যা শুধু ধর্মীয় ও বংশীয় ভিত্তিতে গঠিত। এটাই অনেক বড় প্রমাণ যে, নতুন বিশ্বব্যবস্থা ইহুদিদের তৈরি করা। তারা তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যই তা প্রতিষ্ঠা করেছে। সামনে আমরা পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
ইউরোপে ইসরাইলি হুকুমত প্রতিষ্ঠার বীজ (১৮০০ - ১৯০০ খ্রি.)
১৮ শতকে ইহুদিরা প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টান, এনলাইটেনমেন্টের ধর্মহীন খ্রিষ্টান, আমেরিকা ও ব্রিটেন প্রশাসনের আকৃতিতে এমন কিছু বন্ধু পেয়ে যায়, যারা তাদেরকে দানিয়েল আ-এর দুআ বাস্তবায়নের সফরে সাহায্য করতে সক্ষম ছিল। অন্যদিকে ফরাসি বিপ্লবের পর ইউরোপের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। তখন সেখানে মুক্ত অর্থনীতির নামে ব্যাংক ও নতুন কারেন্সি-ব্যবস্থা চালু করা হয়। ইহুদিরা ছিল এই ময়দানের অগ্রদূত। কেননা, তারা কয়েক শতাব্দী যাবৎ ইউরোপে ব্যাংক ও কারেন্সির ব্যবসা করে আসছিল।
১৮ শতকে তারা ব্যাংকের মাধ্যমে ইউরোপের সকল ব্যবসার ওপর পূর্ণ দখল প্রতিষ্ঠা করে নেয় এবং ইউরোপের সব রাষ্ট্রের ওপর ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়। আর এটাই অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এসে তাদের মূল শক্তিতে পরিণত হয়। এই ঋণের চাপের কারণেই ইউরোপের দেশগুলো ইহুদিদেরকে আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করতে বাধ্য করে। আর এই ক্ষেত্রে প্রটেস্টান্টরা সবচেয়ে বেশি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৮ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তিনটি বিষয় ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা পালন করে। তাদের মধ্যে প্রথম রথচাইল্ড বংশ (House of Rothschild), দ্বিতীয় জায়োনিস্ট আন্দোলনের উত্থান এবং তৃতীয় উসমানি খিলাফতের ধ্বংসের জন্য গ্রেট গেইম বাস্তবায়ন। এখানে আমরা এই তিনটি মৌলিক বিষয় সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করব।
রথচাইল্ড বংশ
ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রথচাইল্ডের কার্যক্রমগুলো বোঝা অনেক কঠিন। রথচাইল্ড অর্থ হচ্ছে, হলুদ ডাল। এই বংশ আজও বিশ্বের অধিকাংশ বড় ব্যাংকগুলোর মালিক এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিরাট অংশের ওপর তাদের কর্তৃত্ব রয়েছে। তখনকার সময়ে রথচাইল্ডের উত্তরাধিকারী মায়ার এমসেলকে (Mayer Amschel) ১৭৪৩ থেকে ১৮১৬ সাল পর্যন্ত ইহুদি আলিম হিসেবে গড়ে তোলা হয়। কিন্তু সে নিজের জন্য ব্যাংকের দায়িত্ব গ্রহণ করে নেয়। মায়ার নিজের ধর্মের প্রতি এতটাই আনুগত্যশীল ছিল যে, পুরো জীবন
সমস্ত দস্তখতে খ্রিষ্টাব্দের পরিবর্তে ইহুদিদের তারিখ ব্যবহার করত। সে ব্যাংকিং খাতে অস্বাভাবিক সফলতা অর্জন করে। এমনকি পুরো ইউরোপে তার ব্যাংকের অনেক শাখা ছড়িয়ে দেয়।
তার সন্তানরাও তাদের পিতার কারবারকে এতটা উন্নতি করে যে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই বংশকে ইউরোপের শাসক ও প্রভাবশীল বংশ হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। সেই শতকে সম্ভবত এমন কোনো ঘটনা সংঘটিত হয়নি, যার মধ্যে এই বংশের সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল না। এই বংশ ইউরোপের বাদশাহদেরকেও ঋণের দ্বারা বেষ্টন করে ফেলেছিল। ব্রিটেন ও ফ্রান্সে সংঘটিত প্রসিদ্ধ 'ওয়াটার লু' যুদ্ধে (Waterloo Battle) রথচাইল্ড বংশ ব্রিটেনের প্রশাসনকে মোটা অঙ্কের ঋণ দেয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মাঝে রেললাইন নির্মাণেও এই বংশের ২৫% শেয়ার রয়েছে। শুধু ইউরোপ নয়; বরং উসমানিদেরকেও রেললাইন নির্মাণের জন্য তারা ঋণ দিয়েছিল।
সেই সময় প্রায় সমস্ত খবরের কাগজ ছিল এই বংশের মালিকানাধীন। এই বংশ ব্রিটেন সরকারকে সুয়েজ খালের (Suez Canal) জায়গা ক্রয় করার জন্য বিশাল ঋণ দিয়েছিল। একপর্যায়ে এসে এই বংশ পুরো ইউরোপ ও উসমানিদেরকে নিজেদের ঋণের দ্বারা আবদ্ধ করে ফেলেছিল। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় 'ঋণের ভিত্তিতে রাজনীতি' এই ইহুদি বংশই শুরু করে। রথচাইল্ড বংশ ফিলিস্তিনে ইহুদিদের ভূমি ক্রয়ের জন্য মাল দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ইলিয়ার বিশ্বাস অনুযায়ী পবিত্র ভূমির দিকে হিজরত করা এবং সেখানে নতুন জীবন শুরু করার জন্য সব ধরনের সাহায্য করেছিল। উল্লেখ্য, ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার জন্য যে অভিশপ্ত চিঠি লিখেছিল, তা এই রথচাইল্ডের উদ্দেশেই লিখিত ছিল। সেই চিঠিকে ইতিহাসে বেলফোর ঘোষণা (Balfour Declaration) বলা হয়।
জায়োনিস্ট কার্যক্রমের সূচনা
১৮৮০ সালে জায়োনিস্ট আন্দোলন (Zionism) দুনিয়ার সামনে আসে। ফিলিস্তিনের একটি পাহাড়ের নাম সাহয়ুন, যার নামে তাদের নাম রাখা হয়েছে সাহয়ুনিয়্যাত। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইহুদি ও অ-ইহুদি সেই সমস্ত ব্যক্তি ও সংগঠন, যারা ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বা প্রতিশ্রুত ভূমি দখলের জন্য প্রচেষ্টা করছে। এই আন্দোলনের ভিত্তি সুইজারল্যান্ডের থিউডর হার্জেল (Theodor herzl) নামক এক ইহুদির হাতে স্থাপিত হয়। হার্জেল ১৮৯৬ সালে ইহুদি রাষ্ট্র (Der Judenstaat) নামে একটি বই লিখে, যেখানে সে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কার্যকর নকশা পেশ করে। সে তার বইয়ে বলে, 'পঞ্চাশ বছরের মধ্যে ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে', আর এমনটাই হয়েছিল।
জেরুজালেমে ইহুদিদের গোপন আবাদি ও ইলিয়ার বিশ্বাস
১৭৮২ সালে জায়োনিস্ট আন্দোলনের প্রধান জোসেফ ফাইনবার্গ ও রথচাইল্ড বংশের প্রধান এডমন্ড ডি রথচাইল্ড (Edmond de Rothschild) ইহুদিদেরকে গোপনে ফিলিস্তিনে আবাদির পরিকল্পনা করে। এই কাজের জন্য সব ধরনের সাহায্য করেছিল রথচাইল্ড এবং সে নিজেও ফিলিস্তিনে কয়েকবার গোপনে সফর করেছিল। রথচাইল্ডের এজেন্টরা সেখানের মুসলিমদের থেকে ভূমি ক্রয় শুরু করে। কিন্তু যখন মুসলিমদের হুঁশ আসে এবং তারা বাধা দেওয়া শুরু করে, ততক্ষণে ফিলিস্তিন ব্রিটেনের কব্জায় চলে গিয়েছে এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের ঘোষণা হয়ে গিয়েছে।
বেলফোর ঘোষণা ও প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস
১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রথচাইল্ড বংশের প্রধান এডমন্ড, যে তখন ব্রিটেনের মন্ত্রীসভার সদস্য ছিল, ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোরকে একটি চিঠি লেখে। আমরা সেই চিঠির বক্তব্য নিচে পেশ করছি।
প্রিয় মিস্টার বেলফোর,
গত শুক্রবারে একটি আর্জি পেশ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমার ধারণামতে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি এদিকে ফেরানো উচিত। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সরকারী ও বেসরকারী জার্মান পত্রিকাগুলো ব্যাপক সংবাদ প্রচার করেছে, যেখানে বলা হচ্ছে নিরাপত্তা চুক্তিগুলোর মধ্যে কেন্দ্রীয় শক্তিকে এই শর্ত দেওয়া উচিত; যাতে জার্মানির অধীন ফিলিস্তিনের এলাকাকে ইহুদিদের ভূমি ঘোষণা দেওয়া হয়। আমি এটাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি যে, ব্রিটেনের ঘোষণাকে এমন একটা আন্দোলনের মাধ্যম বানানো উচিত। যদি আপনার ওয়াদা মুতাবিক আমার সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিতে চান, তাহলে অনুগ্রহপূর্বক মিস্টার ওয়াইজম্যান (ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী)-কে জানিয়ে দিন।
আপনার একান্ত প্রিয় রথচাইল্ড
এই চিঠির জবাবে বেলফোর যে চিঠি লিখেছিল, তা-ই ইতিহাসে বেলফোর ঘোষণা হিসেবে পরিচিত। এই বেলফোর ঘোষণা মূলত ব্রিটেনের পক্ষ থেকে গ্রেটার ইসরাইল প্রতিষ্ঠার অনুমতির ঘোষণা। আমরা সেই প্রত্যুত্তরমূলক চিঠিটি এখানে পেশ করছি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় - ২ নভেম্বর ১৯৯৭
প্রিয় লর্ড রথচাইল্ড,
আপনাকে এটা জানিয়ে আমার খুশি লাগছে যে, ব্রিটেনের বাদশাহর প্রশাসন ইহুদিদের আকাঙ্ক্ষার সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছে। এটা নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ব্রিটিশ প্রশাসন ইহুদি জনগণের জন্য আলাদা জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে পছন্দের দৃষ্টিতে দেখছে এবং নিজেদের সমস্ত চেষ্টা সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যয় করবে। এই কথা স্পষ্টভাবে জেনে নিন যে, এমন কোনো কাজ করা হবে না, যার ফলে ফিলিস্তিনে অবস্থিত ইহুদি ভাইদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকারের ক্ষতি হয় অথবা অন্য কোনো রাষ্ট্রে ইহুদিদের অধিকার ও রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমি কৃতার্থ থাকব যদি আপনি এই ঘোষণা জায়োনিস্ট ফেডারেশনকে জানিয়ে দেন।
আপনার একনিষ্ঠ আর্থার ডি বেলফোর
গ্রেট গেইম বা উসমানি খিলাফতের পতন
গ্রেট গেইমের বিস্তারিত আলোচনা আমরা সামনে করব ইনশাআল্লাহ। এখানে সংক্ষেপে কিছু বিষয় আলোচিত হচ্ছে। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল উসমানি খিলাফত। কেননা, ফিলিস্তিন তাদের অধীনে ছিল। আমিরুল মুমিনিন উমর ফিলিস্তিন বিজয় করে খ্রিষ্টানদের সাথে যে চুক্তি করেছিলেন, সেখানে এই শর্ত ছিল, ইহুদিদের ফিলিস্তিনে বসবাস করতে দেওয়া হবে না। তাই যখন ইহুদিদের গোপন প্রতিনিধি উসমানি খিলাফতের সর্বশেষ শক্তিশালী সুলতান আব্দুল হামীদকে অনেক ঘুষের বিনিময়ে এই আকাঙ্ক্ষা পেশ করে যে, তিনি যেন ফিলিস্তিনে ইহুদিদের আবাদির অনুমতি দেন। তখন তিনি তাদের সমস্ত সম্পদ ফিরিয়ে দেন এবং কঠিন ভাষায় অস্বীকৃতি জানান। ফলে ইহুদিদের নিশ্চিত বিশ্বাস হয়ে যায় যে, উসমানি সালতানাতকে ধ্বংস করা ব্যতীত তারা নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না। উসমানি সালতানাতের পতনের ষড়যন্ত্র তো অনেক পূর্ব থেকে হচ্ছিল। একদিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স আর অপরদিকে রাশিয়ানরা ধারাবাহিকভাবে তাদের দুর্বল করছিল। তারা প্রথমে ইউরোপে উসমানিদের দুর্বল করে। এই ক্ষেত্রে আর্মেনিয়া, বসনিয়া ও বলকানের ষড়যন্ত্র ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। শাম-লেবাননেও এই তিন শক্তি (ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া) খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে মানবাধিকারের স্লোগান নিয়ে কনফারেন্স করত এবং সেখানে খ্রিষ্টানদের স্বাধীনতার কথা বলত। এটা ছিল ৫০ বছরের দীর্ঘ এক চক্রান্ত; যার ফলে উসমানিদের শক্তি অনেক দুর্বল হয়ে যায়। অতঃপর
বলকান যুদ্ধ ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চক্রান্ত ও বিভিন্ন গোপন চুক্তির মাধ্যমে মুসলিমদের মূল কেন্দ্রকে খতম করে দেওয়া হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন আরবকে জাতীয়তাবাদ ও গোত্রপ্রেমের ভিত্তিতে সংগঠিত করে তোলে। তাদেরকে উসমানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সাহায্য করার বিনিময়ে আরববিশ্ব শাসনের স্বপ্ন দেখায়। বর্তমান জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লাহর বাবা হুসাইনের পিতার পরদাদা হুসাইন বিন আলি উসমানিদের অধীনে হিজাজের গভর্নর ছিল, যাকে শরিফে মক্কা বলা হতো। ইংরেজরা প্রথমে তাকে এবং পরে তার ছেলে শাহ ফয়সাল ও শাহ আব্দুল্লাহকে এই শর্তের ওপর ইরাক ও সিরিয়াতে ক্ষমতা প্রদান করতে সম্মত হয় যে, তারা উসমানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। এ ছাড়াও তাদেরকে এর বিনিময়ে প্রতি মাসে পঁচিশ হাজার পাউন্ড সোনা ঘুষ হিসেবে দেওয়া হতো। আরবদেরকে উসমানিদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর এই কাজ ব্রিটেনের সিক্রেট এজেন্সির কর্নেল লরেন্স আঞ্জাম দিয়েছিল, যে 'লরেন্স অফ আরাবিয়া' (Lawrence Of Arabia) নামেও পরিচিত। এভাবেই আরব ও উসমানিদের মধ্যে যুদ্ধ হয়; যার ফলে ফিলিস্তিন ব্রিটেনের হাতে চলে যায়। ১৯২৩ সালে কামাল আতাতুর্ক খিলাফতকে বিলুপ্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
ফিলিস্তিন ব্রিটেনের অধীনে
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত হওয়া লীগ অফ নেশন (League Of Nations) ব্রিটেনকে ফিলিস্তিনের সকল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিনিধি হিসেবে তাদের হাতে সোপর্দ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর লীগ অফ নেশনকে বিলুপ্ত করে জাতিসংঘ গঠন করা হয় এবং ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের হাতে সোপর্দ করে দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ 'ইউএন পার্টিশন' পেশ করে, যেখানে ৫০% এলাকা ইহুদিদের ও ৪৫% এলাকা আরবদেরকে দেওয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়। তবে জেরুজালেম ও বাইতুল মুকাদ্দাসকে দুই জাতির মধ্যবর্তী শহর ঘোষণা দেওয়া হয়। এই প্ল্যানকে ডেভিড বেনগুরিয়ান (Ben-Gurion) সাথে সাথে গ্রহণ করে নেয়; কিন্তু আরবলীগ এটা মানতে অস্বীকার করে। ১৯৪৮ সালের মে মাসে ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথে জাতিসংঘের প্ল্যান মুতাবিক ব্রিটেন তাদের প্রতিনিধিত্বের এলাকা ইসরাইলের হাতে হস্তান্তর করে দেয় এবং বেনগুরিয়ান ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। পরের দিন মিশর, শাম, ইরাক, লেবানন ও ফিলিস্তিনে অবস্থানরত আরবরা যুদ্ধ শুরু করে, যা তেরো মাস পর্যন্ত চলমান ছিল। এটা ছিল প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, যা কোনো ফলাফল ছাড়া শেষ হয়।
১৯৬৭ সালে ইসরাইল মিশরের দিক থেকে হামলার আশঙ্কার বাহানা তৈরি করে যুদ্ধ শুরু করে, যা ছয় দিন চলমান থাকে। এই যুদ্ধে ইসরাইল মিশরের সিনাই মরুভূমি ও ফিলিস্তিনের গাজা এবং শামের গোলান মালভূমির পাহাড়গুলো দখল করে নেয়।
১৯৭৩ সালে মিশর ও শাম মিলে হামলা করে আবার সিনাই মরুভূমি ও গোলানের পাহাড়ি অঞ্চলের কিছু অংশ ফিরিয়ে নিয়ে আসে।
১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি (Camp David Accords), যা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেগিন (Menachem Begin) ও মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত (Anwar Al-Sadat) এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের (Jimmy Carter) মধ্যস্থতায় হয়েছিল, এই চুক্তির অধীনে ইসরাইল সিনাই মরুভূমি ছেড়ে দিতে রাজি হয় এবং ফিলিস্তিনের পূর্বাঞ্চল ও গাজা থেকেও বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। যার বদলে মিশর ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে দেয়।
১৯৮২ সালে ইসরাইল লেবাননে হামলা করে; যাতে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ রুখে দেওয়া যায়। ১৯৮৩ সালের আগস্টে তারা সেখান থেকে বের হয়ে সেটাকে একটি নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে।
১৯৮৮ সালের নভেম্বরে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ঘোষণা দেওয়া হয়।
১৯৯৩ সালের আগস্টে অসলো চুক্তির (Oslo Accords) মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু এই রাষ্ট্রটি স্বাধীনভাবে আজও পর্যন্ত অস্তিত্বে আসতে পারেনি।
📄 ইহুদিদের ইতিহাস থেকে অভিজ্ঞতা
ইহুদিদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস অধ্যয়নের দ্বারা দেখা যায় যে, ইহুদিদের ইতিহাসে মৌলিক দুটি অংশ রয়েছে। একটি পুরাতন ইতিহাস ও আরেকটি নতুন ইতিহাস। ইহুদিদের পুরাতন ইতিহাস শুধু ইহুদিদের ইতিহাস নয়; বরং এখানে তাদের পূর্বযুগের আম্বিয়ায়ে কিরাম ও তাঁদের অনুসারী মুসলিমদের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি এখানে ইহুদিদের ভ্রষ্টদের ইতিহাস ও তাদের গোমরাহির কারণগুলোর বর্ণনা রয়েছে। পূর্বে বনি ইসরাইলের ইতিহাসের আলোচনায় আমরা বলেছি, কীভাবে তারা মুসলিম থেকে ইহুদি হয়েছিল। বনি ইসরাইলের গোমরাহির কারণ ছিল শিরক, বিদআত ও উলামায়ে সু'দের অন্ধ অনুসরণ এবং চারিত্রিক অধঃপতন। তারা দ্বীনের মূল উৎসকে পরিবর্তন ও বিকৃত করে ফেলেছিল। যাকে বনি ইসরাইলের অধিকাংশরাই মেনে নিয়েছিল। আর যখন কোনো দ্বীনের উৎসের ওপর অভিযোগ ওঠে এবং মানুষ তা গ্রহণ করে নিতে থাকে, তখন সেটা দ্বীন হিসেবেই বাকি থাকে না। তারা ভ্রান্ত আলিমদের চাহিদামতো চলা শুরু করে এবং তাদেরকে রবের জায়গায় বসিয়ে দেয়। তাদের শক্তি এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, পরবর্তী যুগে এই ফারিসি আলিমরা শুধু নবিদের বিরোধিতাই করেনি; বরং তাঁদের হত্যা করানোও শুরু করে। এই সমস্ত কারণেই বনি ইসরাইল আল্লাহ তাআলার লানতপ্রাপ্ত জাতিতে পরিণত হয় এবং তাদেরকে ফিলিস্তিন থেকে বের করে দেওয়া হয়।
কিন্তু আধুনিক যুগে তাদের আলিমরা পুরো ইতিহাসকে নতুন রং লাগিয়ে পেশ করতে শুরু করে। তারা নিজেদেরকে আল্লাহ তাআলার বাছাইকৃত জাতি হিসেবে পেশ করে। তারা ইহুদিদেরকে এই বিশ্বাস করানো শুরু করে যে, ফিলিস্তিনের ভূমি আল্লাহ তাআলা তাদেরকে চিরদিনের জন্য দিয়েছেন এবং দানিয়েল-এর দুআর ফলে যে মাসিহের আগমন হবে, তা এখনো পূরণ হয়নি; বরং তিনি সামনে আসবেন। তিনি হাইকাল নির্মাণ করবেন এবং পুরো বিশ্বে একচ্ছত্র রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন। আর এই সমস্ত বিশ্বাস বাস্তবায়নই নতুন যুগের ইহুদিদের মূল লক্ষ্য। ইহুদিরা মুসলিম বা খ্রিষ্টানদের অধীনে যেখানেই থাকুক, তারা সর্বদাই এই উদ্দেশ্য অর্জনের চেষ্টা করেছে। তাই ইহুদিদের নতুন ইতিহাস নিজেদের পক্ষ থেকে ধার্যকৃত লক্ষ্য অর্জনের জন্য এক ধারাবাহিক প্রচেষ্টার নাম।
📄 ইহুদিদের বৃহৎ লক্ষ্য ও তা বাস্তবায়নে বাধাসমূহ
ইহুদিরা তাদের পুরাতন ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছে। কেননা, তারা সেই ইতিহাসের সূত্রেই গাঁথা। কিন্তু ফিলিস্তিন থেকে বের করে দেওয়ার পর থেকেই সারা বিশ্বে তারা ঘুরে ফিরতে থাকে। একদিকে রোমানদের খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়ার ফলে খ্রিষ্টান-দুনিয়া তাদের সামনে সংকীর্ণ হয়ে যায়, অপরদিকে ইসলামের আবির্ভাবের পর তাদের মূল মিশন বা লক্ষ্যের আরেক দাবিদার বৃদ্ধি পায়। এখন তাদের সামনে একের জায়গায় দুই শত্রু হয়ে
যায়। এভাবেই ইহুদিদের নতুন ইতিহাসে তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো অনেক বৃদ্ধি পেতে থাকে। আমরা সেই সমস্যাগুলো ধারাবাহিকভাবে তিনটি শিরোনামের অধীনে আলোচনা করব:
১. ইহুদিরা সংখ্যায় কম হওয়া
২. মুসলিম ও খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের কঠিন দুশমন
৩. ইহুদিদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা
ইহুদিদের সংখ্যা কম হওয়া
ইহুদিদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তাদের সদস্য-সংখ্যা অনেক কম। আর এর মূল কারণ এটা তাদের বংশীয় ধর্ম। সেই ব্যক্তিই ইহুদি হতে পারবে, যে বনি ইসরাইলের বংশের হবে। এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি তাদের আকিদা গ্রহণ করে নিলেও ইহুদি হতে পারবে না। তারা নিজেদেরকে আল্লাহ তাআলার বাছাইকৃত বান্দা (chosen people) বলে থাকে। কুরআনে এসেছে, )وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ اللَّهِ وَأَحِبَّاؤُهُ( (ইয়াহুদ ও নাসারা) বলে, "আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন।”২৫ যার ফলে ইহুদিরা তাদের দ্বীনের দিকে দাওয়াত দেয় না। আর এটাই ইহুদিদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এবং তারা নিজেরাও এই দুর্বলতা খুব ভালো করেই বোঝে। তারা আরও জানে যে, খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মোকাবিলা করা নিজস্ব সদস্য-শক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। কারণ তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেই পরিমাণ সদস্য দরকার ছিল, তা তাদের কাছে নেই।
মুসলিম ও খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের কঠিন দুশমন
বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে বের করে দেওয়ার পর ইহুদিদের সামনে দ্বিতীয় বাধাটি ছিল দুই বড় শত্রু। একদিকে রোমান ক্যাথলিক ও অপরদিকে মুসলিমরা। ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্রথম বাধা ছিল খ্রিষ্টানরা, যারা তাদেরকে ঈসা -এর হত্যার (নাউজুবিল্লাহ) অভিযুক্ত মনে করত এবং এই অপরাধ কোনোভাবেই ক্ষমা করতে রাজি ছিল না। তাই ফরাসি বিপ্লব পর্যন্ত ইউরোপের কোনো সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি বা খ্রিষ্টান আবাদিতে বসবাসের অনুমতিও তাদের ছিল না। ইহুদিদের এই অবস্থাকে ইতিহাসবিদরা রোমান গির্জার বানানো শিকলে বন্দী হওয়ার সাথে সাদৃশ্য দেন। তাদের লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাওয়ার জন্য খ্রিষ্টানদের পক্ষ থেকে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই শিকল হতে মুক্তি আবশ্যক ছিল। ইহুদিদের জন্য দ্বিতীয় বাধা ছিল, ইহুদিদের মতো খ্রিষ্টানরা নিজেদেরকে ফিলিস্তিনের দাবিদার মনে করত।
মুসলিমদের দিক থেকে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল, কুরআনের নির্দেশনার আলোকে মুসলিমরা তাদেরকে নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করত। ফলে তাদেরকে জিম্মি বানিয়ে রাখত। অপরদিকে ইহুদিরা জানত, মুসলিমদের কাছে ফিলিস্তিনের অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তারা মাসজিদুল আকসাকে আল্লাহ তাআলার নিদর্শন ও প্রথম কিবলা গণ্য করে এবং নবিদের ভূমিকে ইহুদিদের থেকেও বেশি নিজেদের অধিকার মনে করে। মুসলিমদের জন্য বিষয়টা শুধু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তারা কোনো ভূমি থেকে বহিষ্কৃত হওয়া অসম্ভব ছিল। কারণ যেখানে কিছু সময়ের জন্যেও শরিয়াহ প্রতিষ্ঠা হয়, তারা সেই ভূমিকে দারুল ইসলাম বলে থাকে। এ ছাড়াও ইহুদিরা যে হাইকাল তৈরি করতে চাচ্ছে, তা মুসলিমদের প্রথম কিবলা মাসজিদুল আকসার ধ্বংসের ফলেই সম্ভব হতে পারে। আর এটাকে ধ্বংসের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে ইহুদিরা এখনো ভীত। খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের দুশমনি ছাড়াও তৃতীয় বাধা ছিল, ফিলিস্তিন ভূমির দাবিদার শুধু তারা একাই ছিল না; বরং মুসলিম ও খ্রিষ্টানরাও নিজেদেরকে ফিলিস্তিনের হকদার মনে করে। খ্রিষ্টানরা ফিলিস্তিনকে ঈসা (আ.)-এর জন্মস্থান মনে করে এবং মুসলিমরা মাসজিদুল আকসাকে প্রথম কিবলা এবং ফিলিস্তিন নবিদের ভূমি ও দারুল ইসলাম হওয়ার ফলে নিজেদের ভূমি মনে করে। ইহুদিদের সামনে এই দুই শত্রু এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, ইহুদিদের একার পক্ষে দুই দুশমনের মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল না।
ইহুদিদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা
ইহুদিদের সামনে তৃতীয় বাধা ছিল সেই শাসনব্যবস্থা, যা মুসলিম ও খ্রিষ্টান-দুনিয়াতে চলমান ছিল। এই শাসনব্যবস্থার ভিত্তি ছিল—মুসলিম-বিশ্ব হোক বা খ্রিষ্টান-বিশ্ব—সকল বিধানের মালিক আল্লাহ তাআলা এবং জমিনে আল্লাহ তাআলার বিধানই প্রয়োগ হবে। ইউরোপের পোপতন্ত্র এই দাবি করত এবং মুসলিমদের খিলাফত এই নীতির ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই বিশ্বাস আপন জায়গায় এতটাই গ্রহণযোগ্য ছিল যে, দুই জাতির সাধারণরা এই বিশ্বাসের সাথে কঠিনভাবে সম্পৃক্ত ছিল। এই দুটি রাজনৈতিক বিশ্বাসের উপস্থিতিতে ইহুদিদের সেই বৈশ্বিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব ছিল না, যার কেন্দ্র হবে প্রতিশ্রুত ভূমি ফিলিস্তিন এবং যেখানে তাদের দাবি অনুযায়ী তারা হাইকালে সুলাইমানি বানিয়ে রবের ইবাদত করবে। এই পোপতন্ত্র ও খিলাফতের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ইহুদিদের জন্য প্রতিকূল ছিল।
এ ছাড়াও মৌলিকভাবে পুরো দুনিয়াতে দুই ধরনের সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। একটি কৃষি জমির ভিত্তিতে কৃষি-সমাজ ও অপরটি রক্তের ভিত্তিতে গোত্রীয় সমাজ। এই সমাজগুলোতে ছিল পুরুষদের নেতৃত্ব এবং কয়েকটি গোত্র মিলে একটি জাতিতে পরিণত হতো। আর এটা এতটাই শক্তিশালী সমাজ ছিল যে, তারা নিজেদের সব প্রয়োজন ও স্বার্থ নিজেরাই রক্ষা করতে পারত। এই সামাজিক ব্যবস্থা ইহুদিদের জন্য সর্বোচ্চ ভয়ানক।
ছিল। কেননা, তা এতটাই মজবুত ছিল যে, কোনো একটি গোত্র একাই ইহুদিদের তছনছ করে দিতে সক্ষম ছিল। এবং তাদের লক্ষ্যের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রাখত। সমাজের এই শক্তিকে কাবু করা ব্যতীত ইহুদিরা কখনোই বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম ছিল না।
ইহুদিদের আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, তারা ছিল ব্যবসায়ী জাতি এবং যেখানে যেত, সেখানেই সুদি অর্থনীতি চালু করত। এই ব্যবস্থা কিছু বছর ঠিকমতো চলত। কিন্তু যখন সুদি ব্যবস্থার দ্বারা ইহুদিরা সমাজের রক্ত চোষা শুরু করে দিত, তখন সেই সমাজ তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যেত এবং তাদের গণহত্যা করত। তাদের সম্পদ দখল করত এবং জীবিতদের দেশান্তর করত। এমন ঘটনা ইতিহাসে বেশ কয়েকবার হয়েছিল। এভাবেই তাদের বানানো সুদি ব্যবস্থা কয়েকবার মূল থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছিল।
টিকাঃ
২৫. সুরা আল-মায়িদা, ৫: ১৮।
📄 মহান লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইহুদিদের কার্যপদ্ধতি
ইহুদিদের লিখিত বই এবং তাদের বিরোধীদের বইগুলো অধ্যয়নের দ্বারা এটা স্পষ্ট হয় যে, ইহুদিরা নিজেদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত ছিল। নিজেদের সংখ্যা কম হওয়া ও দুশমনের শক্তির ব্যাপারে তারা জানত। এই জন্য তারা খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে নিজেদের সহযোগী তৈরি করা শুরু করে, যারা তাদেরকে এই লক্ষ্যসমূহ অর্জনে সাহায্য করবে। তারা সেই সহযোগীদের মাধ্যমে খ্রিষ্টানদের বানানো অবরোধ থেকে বের হয়ে আসে। কেননা, এই অবরোধ থেকে বের হওয়া ব্যতীত তারা কখনোই নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম ছিল না। অতঃপর তাদের সমমনা ব্যক্তিদের সাহায্যে সেই শক্তিগুলো দূর করতে থাকে, যারা তাদের পবিত্র ভূমি দখলের মধ্যে বাধা হয়ে ছিল। যাতে তারা ফিলিস্তিন দখল করে পুরো দুনিয়াকে গোলাম বানিয়ে নিজেদের বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে। তাদের এই বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই সামাজিক শক্তিগুলোকে বিলুপ্ত করা বা দুর্বল করে দেওয়া আবশ্যক ছিল। বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর কব্জা করা ও পুরো দুনিয়াকে কন্ট্রোল করা প্রয়োজন ছিল। কারণ চলমান পুরাতন বিশ্বব্যবস্থা ইহুদিদের কাজে আসছিল না। তাই তাদের পুরো দুনিয়ার সমস্ত সিস্টেমকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। আর এই নতুন ব্যবস্থাকেই নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা নতুন বিশ্বব্যবস্থা বলা হয়।
ইহুদিদের লক্ষ্য কী ছিল? এবং তারা কী চায়? জায়োনিজমের ওপর লিখিত সবগুলো বইয়েই এর কিছু না কিছু উত্তর অবশ্যই পাওয়া যায়। কিন্তু সবচেয়ে বিস্তারিত সামগ্রিক আলোচনা সেই দলিলগুলো থেকে পাওয়া গেছে, যা ১৯০৫ সালে রাশিয়ার এক পাদরির হাতে আসে এবং যাকে 'ইহুদিবাদী গুরুদের নীতিমালা' (Protocols of the Elders of Zion) বলা হয়। সেই গোপন নথিপত্রে ইহুদি গুরুদের পূর্বের শত বছরের কার্যক্রমের পর্যালোচনা এবং তাদের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপগুলোর আলোচনা রয়েছে। সেই নথিতে বর্ণনা করা হয়েছে,
কীভাবে ইহুদিরা ইউরোপে আলোকায়নের নামে ধর্মবিরোধিতা ছড়িয়েছে। ইউরোপের পুরাতন ব্যবস্থাকে বিলুপ্ত করে ভবিষ্যতে তারা কীভাবে অর্থনীতির মাধ্যমে পুরো দুনিয়াতে নিজেদের হুকুমতকে চাপিয়ে দেবে। সেই নথিপত্র খুব গভীরভাবে অধ্যয়নের দ্বারা বোঝা যায়, ইউরোপে বৃদ্ধি পাওয়া ধর্মহীনতার আন্দোলনকে ইহুদিরা কীভাবে দক্ষতার সাথে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে এবং ফরাসি বিপ্লবের পর দুনিয়ার পরিবর্তনগুলো কীভাবে তারা নিয়ন্ত্রণ করেছে।
এই কথাগুলোর সারসংক্ষেপ হচ্ছে, নিজেদের লক্ষ্য পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য ইহুদি ও জায়োনিস্ট সংগঠনগুলো ইউরোপে ও মুসলিম উম্মাহর মধ্যে নিম্নোক্ত শক্তিগুলোকে টার্গেট বানায়:
১. প্রথম টার্গেট ছিল মুসলিম ও খ্রিষ্টান জনগণের মাঝে থাকা বিশ্বাস, আল্লাহ তাআলাই সকল বিধানের উৎস। ইউরোপের মানুষের এই বিশ্বাস ছিল যে, গির্জা হচ্ছে আল্লাহ তাআলার হুকুমত আর পোপরা দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি এবং বাদশাহরা পোপদের প্রতিনিধি। বাদশাহদের কাজ হচ্ছে, রোমের পোপদের আদেশ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা, যে আদেশ খ্রিষ্টানদের দাবি অনুযায়ী আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে। ফলে তখন বাদশাহ ও জনগণের জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করা। অপরদিকে খলিফাদের ব্যাপারে মুসলিমদের বিশ্বাস হচ্ছে, তারা আল্লাহর রাসুলের প্রতিনিধি এবং তাদের কাজ আল্লাহ তাআলার বিধান প্রয়োগ করা এবং মানুষকে শরিয়াহ মুতাবিক পরিচালিত করা। ২৬ সুতরাং সব বিধানের মূল আল্লাহ তাআলার আদেশ, হাকিমিয়্যাতের এই আকিদা সমাজে টিকে থাকা অবস্থায় ইহুদিদের বৈশ্বিক হুকুম প্রতিষ্ঠা সম্ভব ছিল না। তাই তারা এই আকিদাকে এনলাইটেনমেন্টের ধর্মহীন আন্দোলনের মাধ্যমে খতম করে দেয়।
২. দ্বিতীয় শক্তি ছিল গোত্র ও বংশীয় ঐক্য। পুরো দুনিয়াতে গোত্রীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল, যা ইউরোপে জাগিরদার ব্যবস্থার মাধ্যমে চলমান ছিল। এই জাগিরদার ব্যবস্থা মূলত গোত্রীয় শক্তিগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হতো এবং গোত্রীয় শক্তিগুলো বংশধারার ভিত্তিতে চলমান ছিল এবং বংশীয় ব্যবস্থার নেতৃত্ব ছিল পুরুষদের হাতে। যার ফলে এই ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ সমস্ত কার্যক্রম, আচরণবিধি ও অর্থনীতি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য বিশাল শক্তি বিদ্যমান ছিল এবং যতদিন পর্যন্ত তা প্রতিষ্ঠিত থাকত, ততদিন ইহুদিদের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না। তাই এই ব্যবস্থাকে তারা পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের ধোঁকার মাধ্যমে, স্বাধীনতা (Freedom) সমতার (Equality) স্লোগানের সাহায্যে দূর করে দেয়।
৩. তৃতীয় শক্তি ছিল অর্থের শক্তি। ইহুদিরা অনেক বছর যাবৎ ইউরোপের বাণিজ্যের ওপর কর্তৃত্বশীল ছিল। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর কজার জন্য তাদের এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল, যা সমস্ত বিশ্বের প্রতিটা দেশের অর্থনীতিকে একে অপরের মুখাপেক্ষী করে দেবে। ২৭ এই ব্যবস্থা শুধু তখনই বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব ছিল, যখন স্বর্ণকে কারেন্সি থেকে আলাদা করে তার জায়গায় কাগজের কারেন্সি প্রচলন ঘটানো হবে এবং কারেন্সির মূল্যমান নির্ধারণের ক্ষমতা শুধু ব্যাংককে দেওয়া হবে এবং সেই ব্যাংকগুলোও থাকবে ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে। অতঃপর স্বর্ণকে কারেন্সি থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুবাদে ইহুদিদের ব্যাংকগুলো অগণিত কারেন্সি নিজেরাই ছাপানোর সুযোগ পেয়ে যায়। যার ফলে পুরাতন বাণিজ্যব্যবস্থা শেষ হয়ে নতুন বাণিজ্যিক ব্যবস্থার অধীনে সব অঞ্চলের বাণিজ্য একে অপরের ওপর নির্ভরশীল (Interdependant) হয়ে যায়। এই অগণিত কারেন্সি দ্বারা ইহুদিরা পুরো দুনিয়ার উৎপাদন ও বাণিজ্যের ওপর বিজয়ী হয়ে যায়। কারণ দুনিয়ার ওপর তারাই শাসন করে, যাদের হাতে খাদ্যের মজুদ থাকে। কারেন্সি অত্যধিক বেড়ে যাওয়ার দ্বিতীয় ফায়দা হচ্ছে, ইহুদিরা ব্যাংক থেকে প্রত্যেকটা কোম্পানি, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে সুদ-ভিত্তিক ঋণ দিয়ে তাদেরকে গোলাম বানিয়ে রাখে। কারেন্সির এই শক্তি তাদেরকে বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে যেমন সাহায্য করে, তেমনই সামরিক অস্ত্র হিসেবেও কাজ করে।
অপরদিকে ইহুদিরা এই অগণিত কারেন্সির দ্বারা দুনিয়ার অধিকাংশ স্বর্ণের ভান্ডার ক্রয় করে নেয়। যাতে কারেন্সির মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, স্বর্ণের ভান্ডার জমা করা এবং সমস্ত রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে বৈশ্বিকভাবে একে অপরের মুখাপেক্ষী করে দেওয়ার দ্বারা দুনিয়ার
অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই অর্থনৈতিক শক্তিকে তারা যখন চাইবে, ব্যবসার জন্য ব্যবহার করবে, আবার যখন চাইবে সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। সুতরাং নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের বাণিজ্যিক ব্যবস্থা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত হওয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যাকে 'বাজার অর্থনীতি' (Market Economy) বলা হয়, এই দুইটাই আজ পূর্ণভাবে ইহুদিদের প্রতিনিধিত্ব করে। এই ব্যাপারে আমরা বইয়ের দ্বিতীয় অংশে বিস্তারিত আলোচনা করব।
টিকাঃ
২৬. এখানে ইহুদিদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো 'আল্লাহর হাকিমিয়্যাত'-এর আলোচনা উদ্দেশ্য, যা আল্লাহ তাআলার হিদায়াত ও শিক্ষা অনুযায়ী মুসলিমদের খিলাফতে বাস্তবায়িত ছিল। খ্রিষ্টানদের মাঝেও এর একটি অবস্থা বিদ্যমান ছিল এবং তা ইহুদিদের পথে বাধা হয়েছিল; কিন্তু তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বিকৃত। সেখানে পাদরিদেরকে আল্লাহর আদেশের ঊর্ধ্বে স্বয়ং হালাল-হারাম নির্ধারণকারী মনে করা হতো। খ্রিষ্টবাদ মূলত দ্বীনের লিবাসে মানুষকে মানুষের গোলামে পরিণত করত। পক্ষান্তরে ইসলামে শাসক, আলিম ও জনগণ সবাই সমানভাবে এই শরিয়তের অনুগত, যা আল্লাহর নবি নিয়ে এসেছেন। যা আলিম ও শাসক নিজেদেরকেও মানতে হয় এবং জনগণকেও সেই মুতাবিক (নিজের চাহিদা অনুযায়ী নয়) পরিচালনা করতে হয়। এর সবচেয়ে উত্তম উদাহরণ আবু বকর-এর খিলাফত গ্রহণকালে দেখা যায়, যখন তিনি বলেছিলেন, 'যদি আমি সোজা পথে (শরিয়াহ অনুযায়ী) চলি, তাহলে আমাকে আনুগত্য করবে; আর যদি বাঁকা পথে যাই, তাহলে আমাকে সোজা করে দেবে।' মোটকথা এখানে বোঝা আবশ্যক যে, ইসলামকে কখনোই খ্রিষ্টবাদের সদৃশ আখ্যা দেওয়া যাবে না। এখানে কেবল ইহুদিদের পথে একটি বাধা হিসেবে আলোচনা করা উদ্দেশ্য।
২৭. এটাকে Economic Integration বলা হয়। যার দ্বারা উদ্দেশ্য আঞ্চলিক ও রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যকে একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত করে দেওয়া; যাতে আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত বাণিজ্যিক একটি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হয় এবং এর ফলে বৈশ্বিক পুঁজিবাদ (Global Capital) সৃষ্টি হয়। বাহ্যিকভাবে এই শৃঙ্খলার মধ্যে সমস্ত রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে একটি সন্তুষ্টিজনক উন্নতি দেখা যায়; কিন্তু এর ফলে আড়ালে আন্তর্জাতিক স্তরে বসে থাকা ইহুদি পুঁজিবাদী কোম্পানি ও ব্যক্তিরা বিশ্বের সমস্ত সম্পদকে নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়, যার ভয়ানক ফলাফলের দিকে পূর্বের আলোচনায় ইঙ্গিত করা হয়েছে।