📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 ঈসা-কে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং ইহুদি ও খ্রিষ্টবাদের শুরু

📄 ঈসা-কে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং ইহুদি ও খ্রিষ্টবাদের শুরু


ইসা-এর হত্যার ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে দুনিয়াতে দুটা নতুন ধর্ম অর্থাৎ ইহুদিবাদ ও খ্রিষ্টবাদ জন্ম নেয়। ইহুদিবাদ ছিল সত্য দ্বীন থেকে বিচ্যুত তালমুদের বিধান ও ভ্রান্ত আলিমদের নির্দেশনায় পরিচালিত এক নতুন দ্বীন, যার সাথে মুসা-এর দ্বীনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এখন ইহুদিরা দানিয়েল-এর দুআর ভিত্তিতে একজন মাসিহের অপেক্ষায় রয়েছে, যে তাদের দাবি অনুযায়ী দাউদ-এর বংশ থেকে আসবে, যার নেতৃত্বে তারা প্রতিশ্রুত ভূমি দখল করবে, হাইকালে সুলাইমানি পুনরায় নির্মাণ করবে এবং দুনিয়াতে বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবে।

অপরদিকে খ্রিষ্টানরাও সেই দ্বীনের ওপর টিকে থাকেনি, যা ইসা নিয়ে এসেছেন। তারা এই দ্বীনের মধ্যে তাহরিফ করে এবং সেন্ট পৌল (Saint Paul)-এর ভ্রান্ত ব্যাখ্যা গ্রহণ করে পুরো দ্বীনকেই পরিবর্তন করে ফেলেছে।

📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 ইহুদিদের নতুন ইতিহাস

📄 ইহুদিদের নতুন ইতিহাস


ইহুদিদের নতুন ইতিহাস অনেক জটিল এবং এই ইতিহাস পুরো দুনিয়াতে বিস্তৃত। ইহুদিদের একই সময়ে কয়েকটি যুগের এবং কয়েকটি এলাকার ইতিহাস আছে। যখন তাদেরকে রোমানরা জেরুজালেম থেকে বের করে দিয়েছিল, তখন তারা শাম, ইরাক, জাজিরাতুল আরব, ইয়ামান, পারস্য ও আস্তাকিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে যেহেতু এই এলাকাগুলোতেও রোমানদের কঠিন দখল প্রতিষ্ঠিত ছিল, তাই প্রত্যেক অঞ্চলেই তারা নতুন শাসক ও বিপদের মুখোমুখি হয়। আর এই সবই আলাদা আলাদা ইতিহাস। কিন্তু চতুর্দশ শতাব্দীতে রোমান বাদশাহ কনস্টানটাইন (Constantine) যখন খ্রিষ্টান হয়ে যায়, তখন শামে ইহুদিরা নতুন বিপদের মুখোমুখি হয়। সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আগমনের পর জাজিরাতুল আরব ও ইয়ামানে ইহুদিরা আবার নতুন সমস্যার মুখোমুখি হয়। পরবর্তী সময়ে তাদেরকে আরব থেকেও বের করে দেওয়া হয়।

ইসলামের উত্থানের সময় যখন ইসায়িরা পূর্ব ইউরোপে পোপতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে, তখন সেখানে ইহুদিরা নতুন বিপদের সম্মুখীন হয়। এয়োদশ শতাব্দীতে কাফকাজের (ককেশাসের) খিসার জাতি (Khazars)-যারা ইহুদিবাদ গ্রহণ করেছিল—তাতারদের হামলার ফলে সেখান থেকে পলায়ন করে পূর্ব ইউরোপে চলে আসতে বাধ্য হয়; ফলে ইউরোপে ইহুদিদের নতুন ইতিহাস শুরু হয়। তেমনিভাবে পঞ্চদশ শতাব্দীতে যখন আন্দালুস খ্রিষ্টানরা দখল করে নেয়, তখন মুসলিমদের সাথে ইহুদিরাও সেখান থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়; ফলে তখন তারা ইতালি ও উসমানি সালতানাতের দিকে চলে আসে। সর্বশেষ ফরাসি বিপ্লবের পর ইহুদিরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। মোটকথা ইহুদিদের ইতিহাস এতগুলো ধাপ পাড়ি দিয়েছে, যা এই কিতাবে আলাদা আলাদা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। তাই আমরা এখানে ইহুদিদের ইতিহাসকে পাঁচটি বড় অংশে ভাগ করে সেগুলোর ধারাবাহিক আলোচনা করব।

* মুশরিক রোমান সাম্রাজ্যে ইহুদিরা * খ্রিষ্টান রোমান সাম্রাজ্যে ইহুদিরা * ইসলামি সালতানাতে ইহুদিরা * ইউরোপে ইহুদিরা * ফরাসি বিপ্লব থেকে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত

মুশরিক রোমান সাম্রাজ্যে ইহুদিরা
১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে রোমানরা যখন ইহুদিদেরকে জেরুজালেম থেকে বের করে দেয়, তখন তারা শাম, ইরাক, ইরান, মদিনা ও তুর্কি ইত্যাদি এলাকাতে ছড়িয়ে পড়ে। এটা ছিল তাদের অনেক কষ্টের যুগ। তাদের স্বপ্নের ভূমি তাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাদের সাথে রোমানদের আচরণ ছিল অনেক কঠোর। শামে ইহুদিদেরকে দুই দিক থেকে চাপ মোকাবিলা করতে হতো। একদিকে ছিল মুশরিক রোম, অন্যদিকে ইসা-এর আনীত সত্য দ্বীনের অনুসারীগণ। ইহুদিদের ষড়যন্ত্রে সত্য দ্বীনের মধ্যে পৌলের মতবাদ মিশ্রিত হওয়ার পর এই নতুন সৃষ্ট খ্রিষ্টবাদ তখন সত্যপন্থী দ্বীনদার ও ইহুদিদের বিরোধিতা শুরু করে।

সেই যুগেও তাদের ওপর কয়েকবার গণহত্যা চালানো হয়েছিল। আল্লাহ তাআলার শাস্তির ফলে তখন তারা এক স্থান থেকে অপর স্থানে ঘুরপাক খেতে থাকে এবং পুরো দুনিয়াতে লাঞ্ছনার জীবনযাপন করতে থাকে। অথচ সেই সময়ও ভ্রান্ত আলিমরা তাদের পিছু ছাড়েনি। তাদের এই কথা বোঝাতে থাকে যে, তারা আল্লাহ তাআলার শান্তির কারণে জেরুজালেম থেকে বহিষ্কৃত হয়নি; বরং রোমানদের জুলুমের ফলে এমন হয়েছে। সুতরাং তারা একটি মাজলুম জাতি এবং ফিলিস্তিন ভূমি তাদেরকে চিরকালের জন্য লিখে দেওয়া হয়েছে; তাই তাদের পুনরায় ফিরে যেতে হবে। এই চিন্তা-দর্শন নিয়েই ইহুদিরা আজ পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছে।

রোমান সাম্রাজ্যে ইহুদিরা

ইহুদিরা একদিকে ধারাবাহিক গণহত্যা ও দেশান্তরের শিকার হয়ে অপদস্থতার জীবনযাপন করছিল, অপরদিকে ইসা-এর আনীত সত্য দ্বীনের বিপরীতে তাদের চক্রান্তও পুরো দমে চলছিল। তারা ইসা-এর সঙ্গীদের মধ্যে একজন চক্রান্তকারী প্রবেশ করিয়ে দেয়। সে ছিল এক ইহুদি আলিম, যে 'সেন্ট পৌল' নামে পরিচিত। সে ধোঁকা দেওয়ার জন্য সত্য দ্বীন গ্রহণ করে এবং অগ্রসর হয়ে একসময় হাওয়ারিদের সাথে মিলে দ্বীনের প্রচার করতে থাকে। যখন হাওয়ারিগণসহ সবাই সেন্ট পৌলকে বিশ্বাস করে নেয়, তখন সে সত্য দ্বীনের মধ্যে বিকৃতি শুরু করে। সে ইসা-কে আল্লাহ তাআলার সন্তান এবং তার থেকে মানবসত্তা বিলুপ্ত হওয়ার বিশ্বাস প্রচার শুরু করে। আস্তে আস্তে ইসা-এর আনীত সত্য দ্বীন সেন্ট পৌলের শিরকি বিশ্বাসের স্রোতে হারিয়ে যেতে থাকে। এর বিস্তারিত আলোচনা সামনের অধ্যায়ে করা হবে ইনশাআল্লাহ।

ইহুদিদের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল যখন ইসা-এর জন্মের তিনশ বছর পরে রোমান-সম্রাট খ্রিষ্টান হয়ে যায়। কনস্টানটাইন খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়ার পর ইহুদিদের সামনে পুরো দুনিয়া উলটে যায়। সে ইহুদিদের ওপর ব্যাপকভাবে জুলুম-নির্যাতন শুরু
করে। কেননা, তাদের বিশ্বাসমতে ইহুদিরা প্রভুর সন্তান (নাউজুবিল্লাহ) ঈসা -কে ঘৃণা করে এবং রোমানদের সাথে মিলে চক্রান্ত করে উনাকে শূলিতে চড়িয়ে হত্যা করেছে। রোমের খ্রিষ্টানরা ইহুদিদেরকে খ্রিষ্টান হতে বাধ্য করত এবং যারা খ্রিষ্টান হতে অস্বীকার করত, তাদের হত্যা করা হতো। এটা ইহুদিদের ইতিহাসে কঠিন এক যুগ ছিল।

মুসলিম সাম্রাজ্যে ইহুদিরা

ইহুদিদের ওপর খ্রিষ্টানদের এই নির্যাতন সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত চলমান ছিল। সপ্তম শতাব্দীতে আরবে ইসলামের সূর্য উদিত হয়। আল্লাহর নবি ﷺ মদিনায় হিজরতের সময় সেখানে ইহুদিদের তিনটি গোত্র বনি কুরাইজা, বনি কাইনুকা ও বনি নাজির বাস করত। তারা আল্লাহর নবির আনীত দ্বীনের সত্যতা জানার পরও তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে তাদেরকে গাদ্দারি ও চুক্তি ভঙ্গের কারণে মদিনা থেকে বের করে দেওয়া হয়। অতঃপর উমর রা.-এর সময় আল্লাহর রাসুলের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদেরকে পুরো জাজিরাতুল আরব থেকে বের করে দেওয়া হয়। যখন উমর রা.-এর সময় বাইতুল মুকাদ্দাস বিজিত হয়, তখন ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমির নাম ছিল ইলিয়া এবং সেখানে শাসক ছিল রোমান খ্রিষ্টান। বাইতুল মুকাদ্দাসের খ্রিষ্টান পাদরিরা খিলাফতের অধীনে জিম্মি হিসেবে থাকাকে গ্রহণ করে নেয়। যখন উমর রা. তাদের থেকে শহরের চাবি নেওয়ার জন্য বাইতুল মুকাদ্দাসে যান, তখন একটি চুক্তিপত্র লিখেন। যেখানে একটি মূলনীতি ছিল, ফিলিস্তিনে খ্রিষ্টানদের মতো ইহুদিরা বসবাসের কোনো অনুমতি পাবে না। ২৪

মুসলিমদের হাতে ফিলিস্তিন বিজয় ছিল ইহুদিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ ইহুদিদের সামনে তখন খ্রিষ্টানদের পর আরেকটি শক্তিশালী দ্বীন ফিলিস্তিন ভূমির দাবি নিয়ে এসেছে এবং সেই ভূমি দখলও করে নিয়েছে। সেই সাথে খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মাঝে 'ক্রুসেড' নামে যুদ্ধের এক নতুন ধারা শুরু হয়। এই যুদ্ধগুলোতে ইহুদিরা সরাসরি অংশ নিত না। কেননা, তাদের সংখ্যা এত বেশি ছিল না, যার দ্বারা তারা দুটো বড় শক্তির মোকাবিলা করতে পারবে। তাই তারা চক্রান্তের মাধ্যমে কাজ করতে থাকে এবং এটাই তাদের নতুন ইতিহাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদিরা বড় বড় ষড়যন্ত্র করে। তারা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে হত্যার চক্রান্তও করেছিল। কিন্তু সবচেয়ে সফল চক্রান্ত ছিল উসমান রা.-এর যুগের এক ইহুদির মাধ্যমে সংঘটিত ফিতনা। সে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ ষড়যন্ত্র শুরু করে। তাঁর বিভিন্ন কাজের সমালোচনা করতে থাকে এবং আলি রা.-এর ব্যাপারে বিভিন্ন কিছু প্রচার করতে থাকে। আলি রা.-কে খিলাফতের অধিক হকদার ও নবি
এক্স-এর সহকারী হিসেবে প্রচার করতে থাকে। তার এই কার্যক্রম সফল হয় এবং এর ফলে মুসলিমদের মধ্যে একটি দল উসমান-এর ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা শুরু করে। এই ভয়ানক কাজের সর্বশেষ ফল হিসেবে উসমান শাহাদাত বরণ করেন। উসমান-এর শাহাদাতের ফলে উম্মাহর মধ্যে শিয়া ও রাফিজি ফিতনার এমন ভয়ানক দরজা খুলে যায়, যা সম্ভবত শেষ জমানা পর্যন্ত খোলা থাকবে। এখানে এই ফিতনার বিস্তারিত আলোচনা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইহুদিদের চক্রান্তের মুখোশ উন্মোচন করা। ইহুদি আব্দুল্লাহ বিন সাবার কাজগুলো সেন্ট পৌলের কার্যক্রমের সাথে অনেক সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল, যে ইসা-এর আনীত সত্য দ্বীনের মধ্যে বিকৃতি ঘটিয়ে তাকে খ্রিষ্টবাদে পরিণত করে ফেলেছে।

কিন্তু আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত সর্বশেষ কিতাবের ভিন্ন শক্তি ও বৈশিষ্ট্য ছিল। ফারিসি আলিমরা তাওরাতের শিক্ষাকে পরিবর্তন করেছিল এবং সেন্ট পৌল ইসা-এর আনীত দ্বীনকে পূর্ণ বিপরীত বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আব্দুল্লাহ বিন সাবার কুফুরি বিশ্বাসগুলো থেকে এই উম্মাহকে সংরক্ষিত রাখার জন্য আল্লাহ তাআলা এমন হকপন্থী আলিমদেরকে দাঁড় করিয়ে দেন, যারা অসম্ভব মেহনতের মাধ্যমে আহলুস সুন্নাহর আকিদা ও রাফিজিদের গোমরাহিকে পূর্ণরূপে স্পষ্ট করে দেন; যাতে এই দ্বীন কিয়ামত পর্যন্ত সকল ধরনের বিকৃতি থেকে মুক্ত থাকে।

ইসলামি খিলাফতের পরবর্তী যুগে ইহুদিরা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জিম্মি হিসেবে নিরাপত্তার সাথে বসবাস করতে থাকে। সেই সময় মুসলিমদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও চিন্তাগত উন্নতির সুযোগ গ্রহণ করে তারাও উন্নত হয় এবং আবার উত্থানের জন্য তৈরি হতে থাকে। বিশেষত আন্দালুসের মুসলিম শাসনকে এখনও তারা নিজেদের সোনালি যুগ হিসেবে স্মরণ করে।

ইউরোপে ইহুদিরা

১৮০৮ সালে কাফকাজের খিসার গোত্রের বাদশাহ পুরো জাতিকে নিয়ে ইহুদিবাদ গ্রহণ করে নেয়। বলা হয়ে থাকে, ইহুদিদের উলামায়ে সু'রা সেই কওমকে ইবরাহিম-এর বংশধর প্রমাণ করে তাদের ইহুদি হওয়াকে কবুল করে নেয়। অন্যথায় ইহুদিরা তাদের দ্বীন প্রচার করে না এবং তাদের রক্ত-সম্পর্ক ছাড়া কাউকে নিজেদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না। এয়োদশ শতাব্দীতে তাতারদের হামলার কারণে খিসার গোত্র কাফকাজ থেকে বের হতে বাধ্য হয় এবং পুরো ইউরোপ বিশেষত পোল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ইহুদিকে এস্কিনাজিক ইহুদি (Ashkenazic Jews) বলা হয়। আর যে সমস্ত ইহুদি মুসলিমদের এলাকা অর্থাৎ তুর্কি ও পূর্ব আফ্রিকাতে ছিল, তাদের সেপার্ডিক ইহুদি (Sephardic Jews) বলা হয়। আজ ইসরাইলের আশি শতাংশ এস্কিনাজিক ইহুদি এবং বাকি বিশ শতাংশ সেপার্ডিক ইহুদি অর্থাৎ তারাই হচ্ছে বর্তমান মূল ইহুদি। ফলে বর্তমান ইসরাইলের আশি শতাংশ জনগণ বনি ইসরাইলের বংশের থেকে নয়; বরং খিসার বংশের সাথে সম্পৃক্ত।

ইউরোপে ইহুদিরা গোলামের মতো জীবনযাপন করত। রোমান ক্যাথলিক গির্জা তাদেরকে ঈসা-এর হত্যাকারী মনে করত। তাই ইহুদিদেরকে অভিশপ্ত ঘোষণা দিয়ে খ্রিষ্টানদের এলাকায় থাকতে নিষেধ করে এবং খ্রিষ্টানদের বসতির বাইরে আলাদা কলোনিতে থাকতে বাধ্য করে। সেই আলাদা কলোনিগুলো ইতিহাসে 'ইহুদিদের বাড়ি' (Jewish Ghettos) নামে প্রসিদ্ধ। তাদের সরকারি কোনো পেশায় চাকরি করার অনুমতি ছিল না। ইউরোপে তাদের একটাই পেশা গ্রহণের অনুমতি ছিল, তা হচ্ছে ব্যবসা। কারণ ব্যবসা ইউরোপের জাগিরদার সমাজে তৃতীয় শ্রেণির পেশা হিসেবে গণ্য হতো।

ইউরোপে ইহুদিদেরকে গণহত্যা ছিল একটি সাধারণ বিষয়। মুসলিমদের সাথে খ্রিষ্টানদের ক্রুসেড যুদ্ধের সময়ে খ্রিষ্টানরা তাদের কয়েকবার গণহত্যা করে। ইহুদিদের গণহত্যার একটি মূল কারণ ছিল, তারা সুদের ভিত্তিতে সম্পদ লোন দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিত; ফলে সেই সমাজের লোকেরা তাদের ওপর বিদ্রোহ করে গণহত্যা করত।

ইতিহাসে ইহুদিদের গণহত্যার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ১২০৯ খ্রিষ্টাব্দে তাদেরকে ইংল্যান্ড থেকে গণহত্যার পর দেশান্তর করা হয়, ফ্রান্সে প্রথম ১৩০৬ ও পরে ১৩৯৪ খ্রিষ্টাব্দে, বেলজিয়াম থেকে ১৩৭০ সালে, যুগোস্লাভিয়াতে ১৩৮০ সালে, হল্যান্ডে ১৪৪৪ সালে, রাশিয়াতে ১৫১০ সালে, ইতালিতে ১৫৪০ সালে এবং জার্মানিতে ১৫৫১ সালে গণহত্যা ও দেশান্তর করা হয়। আন্দালুস খ্রিষ্টানরা দখল করার পর মুসলিমদের সাথে ইহুদিদেরকেও দেশান্তর করা হয়। তাদের দেশান্তর ও গণহত্যার এই ধারা পুরো ইউরোপে সময়ে সময়ে সংঘটিত হয়েছে।

ইহুদিবাদ ও মার্টিন লুথারের রিফরমেশন আন্দোলন

ইউরোপে ইহুদিদের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল জার্মান পাদরি (Martin Luther) মার্টিন লুথারের (Reformation) রিফরমেশন আন্দোলনে সফলতা। মার্টিন লুথারের এই আন্দোলন গির্জা ও পাদরিদের সংশোধনের জন্য শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই আন্দোলনের একটি বিশেষ দিক ছিল, মার্টিন লুথার রোমান ক্যাথলিক ধর্ম-বিশ্বাসের বিপরীতে তাওরাত-জাবুরসহ ওল্ড টেস্টামেন্টে (Old Testament) প্রাপ্ত সহিফাগুলোকে খ্রিষ্টানদের দ্বীনের উৎস হিসেবে গণ্য করত। আরও এমন কিছু বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া মার্টিন লুথারের রিফরমেশন আন্দোলনকে অনেক ঐতিহাসিক ইহুদিদের চক্রান্ত মনে করেন। কিছু ইতিহাসবিদের মত হচ্ছে, মার্টিন লুথার নিজেই ইহুদি ছিল, যে পরবর্তী সময়ে খ্রিষ্টান হয়। কয়েকজনের মত হচ্ছে, তার মা ইহুদি ছিল, আল্লাহু আ'লাম। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তার আন্দোলন খ্রিষ্টানদের মধ্যে এমন এক নতুন দলের জন্ম দেয়, যারা
ইহুদিদের ধর্মীয় বড় ভাই মনে করে। তারা ওল্ড টেস্টামেন্টকেই দ্বীনের মূল উৎস মনে করার পাশাপাশি ইহুদিদের ধর্মীয় বিশ্বাস প্রতীক্ষিত ভূমি, হাইকালে সুলাইমানি, দানিয়েল -এর দুআর ওপরেও বিশ্বাস রাখে এবং ইহুদিদেরকে ফিলিস্তিনের অধিকারী মনে করে। এই দলকে আজ আমরা প্রটেস্টান্ট (Protestant) নামে চিনি। এভাবেই খ্রিষ্টানদের মধ্যে ইহুদিদের জন্য অনেক বড় বন্ধু ও সাহায্যকারী মিলে যায়।

ব্রিটেন সাম্রাজ্য ও প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টান

১৫৩২ সালে ব্রিটেনের বাদশাহ হেনরি অষ্টম (Henrz VIII) তার সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কিন্তু রোমান গির্জা এই বিয়েকে প্রত্যাখ্যান করে; যার ফলে বাদশাহর দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান এলিজাবেথ প্রথম (Elizabeth I) সিংহাসনে বসার অযোগ্য হয়ে যায়। এই অবস্থায় এলিজাবেথের সামনে প্রটেস্টান্ট মতাদর্শ গ্রহণ করা ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা ছিল না, যার মাধ্যমে সে বাদশাহির যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে এলিজাবেথ এমনটাই করে এবং নিজের সৎ বোন ম্যারিকে (Queen Marz I) সিংহাসনচ্যুত করে নিজে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। আর এভাবেই ব্রিটেনে প্রটেস্টান্ট মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এলিজাবেথের পর জেমস প্রথম (James I) ও দ্বিতীয় (James II)-এর যুগে রোমান ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট মতাদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলমান থাকে। ১৬৮৮ সালে অনেক যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডে 'চার্চ অফ ইংল্যান্ড' প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাকে ১৬৮৮ সালের 'মহান বিপ্লব' বলা হয়। চার্চ অফ ইংল্যান্ডের দাবি অনুযায়ী এটি এমন এক গির্জা ছিল, যা প্রটেস্টান্ট বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। যাহোক, ১৬৮৮ সালেই এই বিপ্লব ইহুদিদের জন্য অনেক উপকারী প্রমাণিত হয়। যার ফলে ১৭ শতকে ইংল্যান্ড ইহুদিদের ঘাঁটিতে পরিণত হয়। আর এটা ছিল প্রটেস্টান্ট ও ইহুদিদের প্রথম বড় সফলতা, যার বিস্তারিত আলোচনা সামনে পশ্চিমাদের অধ্যায়ে করা হবে।

ইউরোপে ৩০ বছরের যুদ্ধ ও প্রটেস্টান্টদের উত্থান

ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপের রাজ্যগুলোতে ৩০ বছরের ধারাবাহিক এক যুদ্ধ শুরু হয়। যেখানে ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইংল্যান্ডের বাদশাহ ও শাহজাদারা নিজ নিজ স্বার্থের জন্য পরস্পর যুদ্ধ করে। সেই যুদ্ধের কারণগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল রোমান ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্টদের মধ্যে শত্রুতা। ১৭৭৪ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে এই যুদ্ধ শেষ হয়, যাকে ওয়েস্ট ফেলিয়া চুক্তি (Peace of Westphalia treatz) বলা হয়। এই চুক্তির অধীনে সকল পক্ষকে অধিকার দেওয়া হয়, প্রত্যেকেই ইচ্ছা করলে যেকোনো মতবাদ গ্রহণ করে নিতে পারবে। যার ফলে ব্রিটেনের পর পুরো ইউরোপে প্রটেস্টান্ট মতাদর্শকে আলাদা একটি ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া শুরু হয়। প্রটেস্টান্ট ফিরকা যেখানেই অবস্থান গ্রহণ করত, সেখানেই ইহুদিদের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে যেত। কেননা, প্রটেস্টান্ট দল ইহুদিদেরকে তাদের ধর্মীয় বড় ভাই হিসেবে গণ্য করে।
ইহুদিবাদ ও আমেরিকার আবিষ্কার

১৪৯২ সালে স্পেনের নাবিল ক্রিস্টোফার কলম্বাস (Christopher columbus) আমেরিকা আবিষ্কার করে। আমেরিকা আবিষ্কারের পর ইউরোপের সব শাসক সেই নতুন ভূমিতে নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করে। যার মধ্যে স্পেন, ব্রিটেন ও ফ্রান্স অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমেরিকা আবিষ্কার ইহুদি ও তাদের সাহায্যকারী প্রটেস্টান্টদের জন্য অনেক বড় সুসংবাদ ছিল। ১৭২৭ সালে এই দুই দল রোমান ক্যাথলিক গির্জার জুলুমের শিকার হয়ে অনেক কষ্টে আমেরিকায় চলে যেতে শুরু করে। আমেরিকাতে রোমান ক্যাথলিকদের বেশি শক্তি ছিল না; তাই অনেক কম সময়ের মধ্যে এই দুই দল আমেরিকাতে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে ফেলে এবং এখনো তারা সেখানে বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আছে।

টিকাঃ
২৪. ইমাম তাবারি রহ. চুক্তির যে বক্তব্য পেশ করেছেন, সেখানে এই বাক্য ছিল, (ولا يسكن بإيلياء معهم) أحد من اليهود । কোনো ইহুদি তাদের সাথে ইলিয়াতে বসবাস করতে পারবে না।

📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 ফরাসি বিপ্লব থেকে আধুনিক ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত

📄 ফরাসি বিপ্লব থেকে আধুনিক ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত


এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন ও ফরাসি বিপ্লব

একদিকে প্রটেস্টান্টরা ইউরোপে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশাল প্রভাব বিস্তার করছিল, অপরদিকে রোমের গির্জার জুলুমে অতিষ্ঠ হয়ে ধর্মের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট খ্রিষ্টানরা সপ্তদশ শতাব্দীতে গির্জার বিরুদ্ধে মানবাধিকারের নামে একটি আন্দোলন শুরু করে। যাকে তারা ‘এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন’ (Enlightenment Movement) বলে থাকে। এই আন্দোলনের দার্শনিকরা মানবীয় বিবেকের ভিত্তিতে খ্রিষ্টান ধর্মকে অস্বীকার করে বসে। ১৭৮৯ সালের ৪ জুলাই ‘ফরাসি বিপ্লব’ (French Revolution) হয়। যার ফলে গির্জা ও বাদশাহদের ক্ষমতা শেষ হয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয়। এরপর থেকে আস্তে আস্তে পুরো ইউরোপে গণতন্ত্রের আওয়াজ উঁচু হতে শুরু করে। ফরাসি বিপ্লবের দ্বারা আর কারও ফায়দা হোক বা না হোক, ইহুদিদের অনেক ফায়দা হয়। তাদের ওপর থেকে সব বাধা দূর হয়ে যায়। ইতিহাসবিদগণ এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনে ইহুদিদের হাত থাকার অনেক প্রমাণ পেশ করে থাকেন। মোটকথা ফরাসি বিপ্লবের পর ইহুদিদের ওপর থেকে গির্জার সব ধরনের বাধা দূর হয়ে যায়। এই বাধাগুলো দূর হওয়ার পর ইহুদিদের ইসরাইল দখল পর্যন্ত আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

আঠারো শতাব্দীর সূর্য ইহুদিদের উত্থানের সাথে উদিত হয়। ইহুদিরা ইউরোপে তৃতীয় স্তরের নাগরিক ছিল, ফরাসি বিপ্লবের পর গণতান্ত্রিক প্রশাসনের পার্লামেন্টগুলো তাদের সমান অধিকার দিয়ে দেয় এবং এর ফলে ইহুদিরা প্রথম স্তরের নাগরিকে পরিণত হয়। আর এটা ছিল ইসরাইলি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ। যার পর আরও কয়েকটি ধাপের পথ উন্মোচন হয়ে যায়।
ইহুদিদের নতুন ইতিহাসের সবচেয়ে আশ্চর্যকর বিষয় হচ্ছে, ফরাসি বিপ্লব হয়েছিল সব ধর্মের প্রতি অসন্তুষ্টির ফলে এবং যার প্রভাবে পুরো বিশ্বে ধর্মহীনতার শাসন ছড়িয়ে পড়ে এবং সব ধরনের দ্বীনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। অথচ তারাই আবার তাদের ক্ষমতা ও বৈশ্বিক শক্তির সাহায্যে এমন এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যা শুধু ধর্মীয় ও বংশীয় ভিত্তিতে গঠিত। এটাই অনেক বড় প্রমাণ যে, নতুন বিশ্বব্যবস্থা ইহুদিদের তৈরি করা। তারা তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যই তা প্রতিষ্ঠা করেছে। সামনে আমরা পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে আলোচনা করব।

ইউরোপে ইসরাইলি হুকুমত প্রতিষ্ঠার বীজ (১৮০০ - ১৯০০ খ্রি.)

১৮ শতকে ইহুদিরা প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টান, এনলাইটেনমেন্টের ধর্মহীন খ্রিষ্টান, আমেরিকা ও ব্রিটেন প্রশাসনের আকৃতিতে এমন কিছু বন্ধু পেয়ে যায়, যারা তাদেরকে দানিয়েল আ-এর দুআ বাস্তবায়নের সফরে সাহায্য করতে সক্ষম ছিল। অন্যদিকে ফরাসি বিপ্লবের পর ইউরোপের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। তখন সেখানে মুক্ত অর্থনীতির নামে ব্যাংক ও নতুন কারেন্সি-ব্যবস্থা চালু করা হয়। ইহুদিরা ছিল এই ময়দানের অগ্রদূত। কেননা, তারা কয়েক শতাব্দী যাবৎ ইউরোপে ব্যাংক ও কারেন্সির ব্যবসা করে আসছিল।

১৮ শতকে তারা ব্যাংকের মাধ্যমে ইউরোপের সকল ব্যবসার ওপর পূর্ণ দখল প্রতিষ্ঠা করে নেয় এবং ইউরোপের সব রাষ্ট্রের ওপর ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়। আর এটাই অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এসে তাদের মূল শক্তিতে পরিণত হয়। এই ঋণের চাপের কারণেই ইউরোপের দেশগুলো ইহুদিদেরকে আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করতে বাধ্য করে। আর এই ক্ষেত্রে প্রটেস্টান্টরা সবচেয়ে বেশি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৮ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তিনটি বিষয় ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা পালন করে। তাদের মধ্যে প্রথম রথচাইল্ড বংশ (House of Rothschild), দ্বিতীয় জায়োনিস্ট আন্দোলনের উত্থান এবং তৃতীয় উসমানি খিলাফতের ধ্বংসের জন্য গ্রেট গেইম বাস্তবায়ন। এখানে আমরা এই তিনটি মৌলিক বিষয় সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করব।

রথচাইল্ড বংশ

ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রথচাইল্ডের কার্যক্রমগুলো বোঝা অনেক কঠিন। রথচাইল্ড অর্থ হচ্ছে, হলুদ ডাল। এই বংশ আজও বিশ্বের অধিকাংশ বড় ব্যাংকগুলোর মালিক এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিরাট অংশের ওপর তাদের কর্তৃত্ব রয়েছে। তখনকার সময়ে রথচাইল্ডের উত্তরাধিকারী মায়ার এমসেলকে (Mayer Amschel) ১৭৪৩ থেকে ১৮১৬ সাল পর্যন্ত ইহুদি আলিম হিসেবে গড়ে তোলা হয়। কিন্তু সে নিজের জন্য ব্যাংকের দায়িত্ব গ্রহণ করে নেয়। মায়ার নিজের ধর্মের প্রতি এতটাই আনুগত্যশীল ছিল যে, পুরো জীবন
সমস্ত দস্তখতে খ্রিষ্টাব্দের পরিবর্তে ইহুদিদের তারিখ ব্যবহার করত। সে ব্যাংকিং খাতে অস্বাভাবিক সফলতা অর্জন করে। এমনকি পুরো ইউরোপে তার ব্যাংকের অনেক শাখা ছড়িয়ে দেয়।

তার সন্তানরাও তাদের পিতার কারবারকে এতটা উন্নতি করে যে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই বংশকে ইউরোপের শাসক ও প্রভাবশীল বংশ হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। সেই শতকে সম্ভবত এমন কোনো ঘটনা সংঘটিত হয়নি, যার মধ্যে এই বংশের সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল না। এই বংশ ইউরোপের বাদশাহদেরকেও ঋণের দ্বারা বেষ্টন করে ফেলেছিল। ব্রিটেন ও ফ্রান্সে সংঘটিত প্রসিদ্ধ 'ওয়াটার লু' যুদ্ধে (Waterloo Battle) রথচাইল্ড বংশ ব্রিটেনের প্রশাসনকে মোটা অঙ্কের ঋণ দেয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মাঝে রেললাইন নির্মাণেও এই বংশের ২৫% শেয়ার রয়েছে। শুধু ইউরোপ নয়; বরং উসমানিদেরকেও রেললাইন নির্মাণের জন্য তারা ঋণ দিয়েছিল।

সেই সময় প্রায় সমস্ত খবরের কাগজ ছিল এই বংশের মালিকানাধীন। এই বংশ ব্রিটেন সরকারকে সুয়েজ খালের (Suez Canal) জায়গা ক্রয় করার জন্য বিশাল ঋণ দিয়েছিল। একপর্যায়ে এসে এই বংশ পুরো ইউরোপ ও উসমানিদেরকে নিজেদের ঋণের দ্বারা আবদ্ধ করে ফেলেছিল। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় 'ঋণের ভিত্তিতে রাজনীতি' এই ইহুদি বংশই শুরু করে। রথচাইল্ড বংশ ফিলিস্তিনে ইহুদিদের ভূমি ক্রয়ের জন্য মাল দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ইলিয়ার বিশ্বাস অনুযায়ী পবিত্র ভূমির দিকে হিজরত করা এবং সেখানে নতুন জীবন শুরু করার জন্য সব ধরনের সাহায্য করেছিল। উল্লেখ্য, ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার জন্য যে অভিশপ্ত চিঠি লিখেছিল, তা এই রথচাইল্ডের উদ্দেশেই লিখিত ছিল। সেই চিঠিকে ইতিহাসে বেলফোর ঘোষণা (Balfour Declaration) বলা হয়।

জায়োনিস্ট কার্যক্রমের সূচনা

১৮৮০ সালে জায়োনিস্ট আন্দোলন (Zionism) দুনিয়ার সামনে আসে। ফিলিস্তিনের একটি পাহাড়ের নাম সাহয়ুন, যার নামে তাদের নাম রাখা হয়েছে সাহয়ুনিয়‍্যাত। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইহুদি ও অ-ইহুদি সেই সমস্ত ব্যক্তি ও সংগঠন, যারা ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বা প্রতিশ্রুত ভূমি দখলের জন্য প্রচেষ্টা করছে। এই আন্দোলনের ভিত্তি সুইজারল্যান্ডের থিউডর হার্জেল (Theodor herzl) নামক এক ইহুদির হাতে স্থাপিত হয়। হার্জেল ১৮৯৬ সালে ইহুদি রাষ্ট্র (Der Judenstaat) নামে একটি বই লিখে, যেখানে সে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কার্যকর নকশা পেশ করে। সে তার বইয়ে বলে, 'পঞ্চাশ বছরের মধ্যে ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে', আর এমনটাই হয়েছিল।
জেরুজালেমে ইহুদিদের গোপন আবাদি ও ইলিয়ার বিশ্বাস

১৭৮২ সালে জায়োনিস্ট আন্দোলনের প্রধান জোসেফ ফাইনবার্গ ও রথচাইল্ড বংশের প্রধান এডমন্ড ডি রথচাইল্ড (Edmond de Rothschild) ইহুদিদেরকে গোপনে ফিলিস্তিনে আবাদির পরিকল্পনা করে। এই কাজের জন্য সব ধরনের সাহায্য করেছিল রথচাইল্ড এবং সে নিজেও ফিলিস্তিনে কয়েকবার গোপনে সফর করেছিল। রথচাইল্ডের এজেন্টরা সেখানের মুসলিমদের থেকে ভূমি ক্রয় শুরু করে। কিন্তু যখন মুসলিমদের হুঁশ আসে এবং তারা বাধা দেওয়া শুরু করে, ততক্ষণে ফিলিস্তিন ব্রিটেনের কব্জায় চলে গিয়েছে এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের ঘোষণা হয়ে গিয়েছে।

বেলফোর ঘোষণা ও প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস

১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রথচাইল্ড বংশের প্রধান এডমন্ড, যে তখন ব্রিটেনের মন্ত্রীসভার সদস্য ছিল, ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোরকে একটি চিঠি লেখে। আমরা সেই চিঠির বক্তব্য নিচে পেশ করছি।

প্রিয় মিস্টার বেলফোর,

গত শুক্রবারে একটি আর্জি পেশ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমার ধারণামতে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি এদিকে ফেরানো উচিত। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সরকারী ও বেসরকারী জার্মান পত্রিকাগুলো ব্যাপক সংবাদ প্রচার করেছে, যেখানে বলা হচ্ছে নিরাপত্তা চুক্তিগুলোর মধ্যে কেন্দ্রীয় শক্তিকে এই শর্ত দেওয়া উচিত; যাতে জার্মানির অধীন ফিলিস্তিনের এলাকাকে ইহুদিদের ভূমি ঘোষণা দেওয়া হয়। আমি এটাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি যে, ব্রিটেনের ঘোষণাকে এমন একটা আন্দোলনের মাধ্যম বানানো উচিত। যদি আপনার ওয়াদা মুতাবিক আমার সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিতে চান, তাহলে অনুগ্রহপূর্বক মিস্টার ওয়াইজম্যান (ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী)-কে জানিয়ে দিন।

আপনার একান্ত প্রিয় রথচাইল্ড

এই চিঠির জবাবে বেলফোর যে চিঠি লিখেছিল, তা-ই ইতিহাসে বেলফোর ঘোষণা হিসেবে পরিচিত। এই বেলফোর ঘোষণা মূলত ব্রিটেনের পক্ষ থেকে গ্রেটার ইসরাইল প্রতিষ্ঠার অনুমতির ঘোষণা। আমরা সেই প্রত্যুত্তরমূলক চিঠিটি এখানে পেশ করছি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় - ২ নভেম্বর ১৯৯৭

প্রিয় লর্ড রথচাইল্ড,

আপনাকে এটা জানিয়ে আমার খুশি লাগছে যে, ব্রিটেনের বাদশাহর প্রশাসন ইহুদিদের আকাঙ্ক্ষার সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছে। এটা নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ব্রিটিশ প্রশাসন ইহুদি জনগণের জন্য আলাদা জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে পছন্দের দৃষ্টিতে দেখছে এবং নিজেদের সমস্ত চেষ্টা সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যয় করবে। এই কথা স্পষ্টভাবে জেনে নিন যে, এমন কোনো কাজ করা হবে না, যার ফলে ফিলিস্তিনে অবস্থিত ইহুদি ভাইদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকারের ক্ষতি হয় অথবা অন্য কোনো রাষ্ট্রে ইহুদিদের অধিকার ও রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমি কৃতার্থ থাকব যদি আপনি এই ঘোষণা জায়োনিস্ট ফেডারেশনকে জানিয়ে দেন।

আপনার একনিষ্ঠ আর্থার ডি বেলফোর

গ্রেট গেইম বা উসমানি খিলাফতের পতন

গ্রেট গেইমের বিস্তারিত আলোচনা আমরা সামনে করব ইনশাআল্লাহ। এখানে সংক্ষেপে কিছু বিষয় আলোচিত হচ্ছে। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল উসমানি খিলাফত। কেননা, ফিলিস্তিন তাদের অধীনে ছিল। আমিরুল মুমিনিন উমর ফিলিস্তিন বিজয় করে খ্রিষ্টানদের সাথে যে চুক্তি করেছিলেন, সেখানে এই শর্ত ছিল, ইহুদিদের ফিলিস্তিনে বসবাস করতে দেওয়া হবে না। তাই যখন ইহুদিদের গোপন প্রতিনিধি উসমানি খিলাফতের সর্বশেষ শক্তিশালী সুলতান আব্দুল হামীদকে অনেক ঘুষের বিনিময়ে এই আকাঙ্ক্ষা পেশ করে যে, তিনি যেন ফিলিস্তিনে ইহুদিদের আবাদির অনুমতি দেন। তখন তিনি তাদের সমস্ত সম্পদ ফিরিয়ে দেন এবং কঠিন ভাষায় অস্বীকৃতি জানান। ফলে ইহুদিদের নিশ্চিত বিশ্বাস হয়ে যায় যে, উসমানি সালতানাতকে ধ্বংস করা ব্যতীত তারা নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না। উসমানি সালতানাতের পতনের ষড়যন্ত্র তো অনেক পূর্ব থেকে হচ্ছিল। একদিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স আর অপরদিকে রাশিয়ানরা ধারাবাহিকভাবে তাদের দুর্বল করছিল। তারা প্রথমে ইউরোপে উসমানিদের দুর্বল করে। এই ক্ষেত্রে আর্মেনিয়া, বসনিয়া ও বলকানের ষড়যন্ত্র ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। শাম-লেবাননেও এই তিন শক্তি (ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া) খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে মানবাধিকারের স্লোগান নিয়ে কনফারেন্স করত এবং সেখানে খ্রিষ্টানদের স্বাধীনতার কথা বলত। এটা ছিল ৫০ বছরের দীর্ঘ এক চক্রান্ত; যার ফলে উসমানিদের শক্তি অনেক দুর্বল হয়ে যায়। অতঃপর
বলকান যুদ্ধ ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চক্রান্ত ও বিভিন্ন গোপন চুক্তির মাধ্যমে মুসলিমদের মূল কেন্দ্রকে খতম করে দেওয়া হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন আরবকে জাতীয়তাবাদ ও গোত্রপ্রেমের ভিত্তিতে সংগঠিত করে তোলে। তাদেরকে উসমানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সাহায্য করার বিনিময়ে আরববিশ্ব শাসনের স্বপ্ন দেখায়। বর্তমান জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লাহর বাবা হুসাইনের পিতার পরদাদা হুসাইন বিন আলি উসমানিদের অধীনে হিজাজের গভর্নর ছিল, যাকে শরিফে মক্কা বলা হতো। ইংরেজরা প্রথমে তাকে এবং পরে তার ছেলে শাহ ফয়সাল ও শাহ আব্দুল্লাহকে এই শর্তের ওপর ইরাক ও সিরিয়াতে ক্ষমতা প্রদান করতে সম্মত হয় যে, তারা উসমানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। এ ছাড়াও তাদেরকে এর বিনিময়ে প্রতি মাসে পঁচিশ হাজার পাউন্ড সোনা ঘুষ হিসেবে দেওয়া হতো। আরবদেরকে উসমানিদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর এই কাজ ব্রিটেনের সিক্রেট এজেন্সির কর্নেল লরেন্স আঞ্জাম দিয়েছিল, যে 'লরেন্স অফ আরাবিয়া' (Lawrence Of Arabia) নামেও পরিচিত। এভাবেই আরব ও উসমানিদের মধ্যে যুদ্ধ হয়; যার ফলে ফিলিস্তিন ব্রিটেনের হাতে চলে যায়। ১৯২৩ সালে কামাল আতাতুর্ক খিলাফতকে বিলুপ্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করে।

ফিলিস্তিন ব্রিটেনের অধীনে

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত হওয়া লীগ অফ নেশন (League Of Nations) ব্রিটেনকে ফিলিস্তিনের সকল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিনিধি হিসেবে তাদের হাতে সোপর্দ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর লীগ অফ নেশনকে বিলুপ্ত করে জাতিসংঘ গঠন করা হয় এবং ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের হাতে সোপর্দ করে দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ 'ইউএন পার্টিশন' পেশ করে, যেখানে ৫০% এলাকা ইহুদিদের ও ৪৫% এলাকা আরবদেরকে দেওয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়। তবে জেরুজালেম ও বাইতুল মুকাদ্দাসকে দুই জাতির মধ্যবর্তী শহর ঘোষণা দেওয়া হয়। এই প্ল্যানকে ডেভিড বেনগুরিয়ান (Ben-Gurion) সাথে সাথে গ্রহণ করে নেয়; কিন্তু আরবলীগ এটা মানতে অস্বীকার করে। ১৯৪৮ সালের মে মাসে ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথে জাতিসংঘের প্ল্যান মুতাবিক ব্রিটেন তাদের প্রতিনিধিত্বের এলাকা ইসরাইলের হাতে হস্তান্তর করে দেয় এবং বেনগুরিয়ান ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। পরের দিন মিশর, শাম, ইরাক, লেবানন ও ফিলিস্তিনে অবস্থানরত আরবরা যুদ্ধ শুরু করে, যা তেরো মাস পর্যন্ত চলমান ছিল। এটা ছিল প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, যা কোনো ফলাফল ছাড়া শেষ হয়।

১৯৬৭ সালে ইসরাইল মিশরের দিক থেকে হামলার আশঙ্কার বাহানা তৈরি করে যুদ্ধ শুরু করে, যা ছয় দিন চলমান থাকে। এই যুদ্ধে ইসরাইল মিশরের সিনাই মরুভূমি ও ফিলিস্তিনের গাজা এবং শামের গোলান মালভূমির পাহাড়গুলো দখল করে নেয়।
১৯৭৩ সালে মিশর ও শাম মিলে হামলা করে আবার সিনাই মরুভূমি ও গোলানের পাহাড়ি অঞ্চলের কিছু অংশ ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি (Camp David Accords), যা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেগিন (Menachem Begin) ও মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত (Anwar Al-Sadat) এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের (Jimmy Carter) মধ্যস্থতায় হয়েছিল, এই চুক্তির অধীনে ইসরাইল সিনাই মরুভূমি ছেড়ে দিতে রাজি হয় এবং ফিলিস্তিনের পূর্বাঞ্চল ও গাজা থেকেও বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। যার বদলে মিশর ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে দেয়।

১৯৮২ সালে ইসরাইল লেবাননে হামলা করে; যাতে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ রুখে দেওয়া যায়। ১৯৮৩ সালের আগস্টে তারা সেখান থেকে বের হয়ে সেটাকে একটি নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে।

১৯৮৮ সালের নভেম্বরে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ঘোষণা দেওয়া হয়।

১৯৯৩ সালের আগস্টে অসলো চুক্তির (Oslo Accords) মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু এই রাষ্ট্রটি স্বাধীনভাবে আজও পর্যন্ত অস্তিত্বে আসতে পারেনি।

📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 ইহুদিদের ইতিহাস থেকে অভিজ্ঞতা

📄 ইহুদিদের ইতিহাস থেকে অভিজ্ঞতা


ইহুদিদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস অধ্যয়নের দ্বারা দেখা যায় যে, ইহুদিদের ইতিহাসে মৌলিক দুটি অংশ রয়েছে। একটি পুরাতন ইতিহাস ও আরেকটি নতুন ইতিহাস। ইহুদিদের পুরাতন ইতিহাস শুধু ইহুদিদের ইতিহাস নয়; বরং এখানে তাদের পূর্বযুগের আম্বিয়ায়ে কিরাম ও তাঁদের অনুসারী মুসলিমদের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি এখানে ইহুদিদের ভ্রষ্টদের ইতিহাস ও তাদের গোমরাহির কারণগুলোর বর্ণনা রয়েছে। পূর্বে বনি ইসরাইলের ইতিহাসের আলোচনায় আমরা বলেছি, কীভাবে তারা মুসলিম থেকে ইহুদি হয়েছিল। বনি ইসরাইলের গোমরাহির কারণ ছিল শিরক, বিদআত ও উলামায়ে সু'দের অন্ধ অনুসরণ এবং চারিত্রিক অধঃপতন। তারা দ্বীনের মূল উৎসকে পরিবর্তন ও বিকৃত করে ফেলেছিল। যাকে বনি ইসরাইলের অধিকাংশরাই মেনে নিয়েছিল। আর যখন কোনো দ্বীনের উৎসের ওপর অভিযোগ ওঠে এবং মানুষ তা গ্রহণ করে নিতে থাকে, তখন সেটা দ্বীন হিসেবেই বাকি থাকে না। তারা ভ্রান্ত আলিমদের চাহিদামতো চলা শুরু করে এবং তাদেরকে রবের জায়গায় বসিয়ে দেয়। তাদের শক্তি এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, পরবর্তী যুগে এই ফারিসি আলিমরা শুধু নবিদের বিরোধিতাই করেনি; বরং তাঁদের হত্যা করানোও শুরু করে। এই সমস্ত কারণেই বনি ইসরাইল আল্লাহ তাআলার লানতপ্রাপ্ত জাতিতে পরিণত হয় এবং তাদেরকে ফিলিস্তিন থেকে বের করে দেওয়া হয়।

কিন্তু আধুনিক যুগে তাদের আলিমরা পুরো ইতিহাসকে নতুন রং লাগিয়ে পেশ করতে শুরু করে। তারা নিজেদেরকে আল্লাহ তাআলার বাছাইকৃত জাতি হিসেবে পেশ করে। তারা ইহুদিদেরকে এই বিশ্বাস করানো শুরু করে যে, ফিলিস্তিনের ভূমি আল্লাহ তাআলা তাদেরকে চিরদিনের জন্য দিয়েছেন এবং দানিয়েল-এর দুআর ফলে যে মাসিহের আগমন হবে, তা এখনো পূরণ হয়নি; বরং তিনি সামনে আসবেন। তিনি হাইকাল নির্মাণ করবেন এবং পুরো বিশ্বে একচ্ছত্র রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন। আর এই সমস্ত বিশ্বাস বাস্তবায়নই নতুন যুগের ইহুদিদের মূল লক্ষ্য। ইহুদিরা মুসলিম বা খ্রিষ্টানদের অধীনে যেখানেই থাকুক, তারা সর্বদাই এই উদ্দেশ্য অর্জনের চেষ্টা করেছে। তাই ইহুদিদের নতুন ইতিহাস নিজেদের পক্ষ থেকে ধার্যকৃত লক্ষ্য অর্জনের জন্য এক ধারাবাহিক প্রচেষ্টার নাম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00