📄 ইহুদিদের পুরাতন ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত বিশ্বাসসমূহ
ভ্রান্ত আলিমরা যখন বনি ইসরাইলের দ্বীনের উৎস পরিবর্তন করে দিতে সক্ষম হয়, তখন তারা দ্বীনের মধ্যে নিজেদের বানানো বিশ্বাস ছড়ানো শুরু করে। তারা ইহুদিদের নতুন প্রজন্মকে বলা শুরু করে যে, ইহুদিরাই আল্লাহ তাআলার বাছাইকৃত জাতি এবং অন্যদের থেকে অনেক ঊর্ধ্বে ও উত্তম। তাই দুনিয়াকে শাসন করার অধিকার শুধু ইহুদিদের। উলামায়ে সু'রা নতুন প্রজন্মকে আরও বিশ্বাস করায় যে, ফিলিস্তিন ভূখণ্ড আল্লাহ তাআলা চিরদিনের জন্য বনি ইসরাইলকে দিয়ে দিয়েছেন। এই ভূমিতে শুধুই তাদের অধিকার রয়েছে। আর যারা তাদের থেকে এই ভূমি ছিনিয়ে নিয়েছে, সেই খ্রিষ্টান ও মুসলিমরা হচ্ছে জালিম। তাই এই ভূমি ফিরিয়ে আনা তাদের সবচেয়ে বড় সাওয়াবের কাজ। তারা নতুন প্রজন্মকে আরও শিক্ষা দেয় যে, তাদের মূল ইবাদতগৃহ হচ্ছে হাইকালে সুলাইমানি। যে হাইকালের ওপর মুসলিমরা মাসজিদুল আকসা বানিয়ে রেখেছে। সেটাকে ধ্বংস করে হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণ করা ইহুদিদের ইমানের অংশ।
উলামায়ে সু'রা আসমানি কিতাব থেকে নবিদের সুসংবাদগুলো দেখিয়ে নতুন প্রজন্মকে বলে যে, বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরায় তাদের হাতে আসবে এবং হাইকালে সুলাইমানি দ্বিতীয়বার প্রতিষ্ঠিত হবে। যার পর তাদের হাতে সুলাইমান ⚡-এর মতো বৈশ্বিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হবে। যার প্রেক্ষিতেই নতুন প্রজন্ম এই বিশ্বাসকে ধারণ করে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়েছে। তারা নবিদের আনীত কিতাব তাওরাত, জাবুর, ইনজিলসহ সহিফাগুলোর হিদায়াত থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। ফলে এখন শুধু তাদের কাছে রয়েছে বনি ইসরাইলের বংশীয় অধিকারের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনের ভূমির মিথ্যা দাবি, মিথ্যা মাসিহের দাবি, মিথ্যা হাইকালে সুলাইমানির দাবি এবং সুলাইমান ⚡-এর মতো বৈশ্বিক ক্ষমতার স্বপ্ন। এটাই আজকের ইহুদিবাদ ও তাদের ধর্ম, যার সাথে নবিদের শিক্ষা ও আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত হিদায়াতের দূরতম সম্পর্ক নেই।
এখন আমরা ইহুদিদের মিথ্যা বিশ্বাসগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করব:
• আল্লাহ তাআলার প্রিয় জাতি
• অ-ইহুদিদের ব্যাপারে গোয়েম বিশ্বাস
• প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস
• দানিয়েলের দুআ ও মহান লক্ষ্য
• ইলিয়াসংক্রান্ত বিশ্বাস
• মাসিহসংক্রান্ত বিশ্বাস
• হাইকালে সুলাইমানি-সংক্রান্ত বিশ্বাস
আল্লাহ তাআলার প্রিয় জাতি
ইহুদিরা নিজেদের পুরাতন ইতিহাস থেকে প্রথম যে বিশ্বাস গ্রহণ করেছে তা হলো, আল্লাহ তাআলা সমস্ত বনি আদমের মধ্যে শুধু বনি ইসরাইল বংশকে বিশেষভাবে নির্বাচন করেছেন কোনো শর্ত ছাড়াই। অর্থাৎ বনি ইসরাইল যা-ই করুক আল্লাহ তাআলার প্রিয় ও বাছাইকৃত জাতি হিসেবেই থাকবে। এই দুনিয়াকে আল্লাহ তাআলা শুধু ইহুদিদের জন্যই সৃষ্টি করেছেন, কেননা তারা নবিদের সন্তান। এই দাবি প্রমাণের জন্য তারা তাদের ওপর নাজিল হওয়া আল্লাহ তাআলার নিয়ামতগুলো নিয়ে আলোচনা করে। যেমন তাদেরকে ফিরআওন থেকে নাজাত দিয়েছেন। সিনাই মরুতে মান্না-সালওয়া পাঠিয়েছেন। মরুতে পানির ব্যবস্থাস্বরূপ বারোটি ঝরনা প্রবাহিত করেছেন। পুনরায় তাদেরকে ফিলিস্তিনের বাদশাহি ফিরিয়ে দিয়েছেন; যাতে সেখানে বসবাস করতে পারে। যখনই ইহুদিদের সামনে কোনো সমস্যা তৈরি হয়েছে, তাদের জন্য কোনো মাসিহ প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের সেই সমস্যা সমাধানের অসিলা হয়েছেন। সেই মাসিহদের মধ্যে রয়েছেন মুসা, তালুত, দাউদ, বাদশাহ জুলকারনাইন এবং সর্বশেষ আরেকজন মাসিহ রয়েছে, যাকে তারা মাসিহ দাজ্জাল বলে ডাকে।
আল্লাহ তাআলা কুরআনের কয়েক জায়গায় তাদের এই ভুল বিশ্বাসের ভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন।২৩ আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে নিজ নিয়ামত স্মরণ করিয়ে বলেছেন যে, এই ইহসান বনি ইসরাইলের সেই সমস্ত মুসলিমের জন্য ছিল, যারা নবিদের আনুগত্য করত। যখন তাদের থেকে কোনো ভুল প্রকাশিত হতো, তখন তারা গুনাহ থেকে ইসতিগফার করে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে লেগে যেত। আল্লাহ তাআলা এই নিয়ামতের কথা বর্ণনার পাশাপাশি বনি ইসরাইলের অবাধ্য ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে নিয়ামতের অস্বীকার, জিহাদ ত্যাগ করা, নবিদের নাফরমানি, উলামায়ে সু'দের আনুগত্য, নবিদের হত্যা করা, কিতাবুল্লাহতে বিকৃতি ও হক গোপন করার কারণে তাদেরকে অপরাধীও সাব্যস্ত করেছেন।
আলিমরা বলেছেন, আল্লাহ তাআলার এই ইহসান ও নিয়ামতগুলো ছিল বনি ইসরাইলের মধ্যে যারা নবিদের আনুগত্যকারী মুসলিম, তাদের জন্য। এগুলো কাফির ইহুদিদের জন্য নয়, যারা প্রথমে ঈসা-কে অস্বীকার করেছে, অতঃপর মুহাম্মাদ-কে অস্বীকার করেছে। যার মধ্যে আজকের সমস্ত ইহুদি অর্ন্তভুক্ত। কিন্তু তারা গত দু'শ বছর পূর্ব থেকে
নিজেদের এই বিশ্বাসগুলো খ্রিষ্টানদের মাঝেও প্রচার শুরু করে এবং তাদের অধিকাংশকে এটা বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয় যে, ইহুদিরাই হচ্ছে আল্লাহ তাআলার একমাত্র নির্বাচিত জাতি এবং ফিলিস্তিনের ওপর শুধু তাদেরই অধিকার রয়েছে।
অ-ইহুদিদের ব্যাপারে গোয়েম বিশ্বাস
আল্লাহ তাআলার বাছাইকৃত ও নির্বাচিত জাতি হওয়ার বিশ্বাসের ফলে ইহুদিদের ধারণা হচ্ছে সকল মানুষ দুই প্রকার, ইহুদি ও অ-ইহুদি। অ-ইহুদিদের জন্য তাদের কিতাবে 'গোয়েম' (Goyim) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। 'গোয়েম' একটি ইবরানি শব্দ, যার অর্থ নিচু শ্রেণির মানুষ। শব্দটিকে কখনো গোলাম ও কখনো জন্তুর জন্যও ব্যবহার করা হয়। তারা সমস্ত মানুষের থেকে উত্তম হওয়ার ফলে অন্যদের 'গোয়েম' উপাধি দিয়ে থাকে এবং নিজেদের থেকে নিম্নশ্রেণির মনে করে। এই আকিদা অনুযায়ী বাকি সমস্ত মানুষকে মূলত বনি ইসরাইলের খিদমতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই ইহুদিদের জন্য তাদের ওপর যেকোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বৈধ। বিশেষ করে তাদের থেকে বিভিন্নভাবে মোটা অংকের সুদ উসুল করা; যদিও তালমুদের বর্ণনা অনুযায়ী সুদি কারবার হারাম। এমনিভাবে 'গোয়েমদের' জান-মাল ও সম্মানসহ সবকিছু দখল করা ইহুদিদের জন্য বৈধ।
প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস
ইহুদিদের তৃতীয় আকিদা হচ্ছে, প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেই ভূমি, যার প্রতিশ্রুতি বনি ইসরাইলকে দেওয়া হয়েছে। ইহুদিদের আকিদা হচ্ছে, ফিলিস্তিন বিশেষ করে জেরুজালেমকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামত পর্যন্ত ইহুদিদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাই এই ভূমিতে শুধু তাদেরই অধিকার রয়েছে। খ্রিষ্টান ও মুসলিম যারা তাদের নিকট 'গোয়েম', তারা ফিলিস্তিনে অবৈধ দখল করে রেখেছে, আর এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই বর্তমানের ইহুদিরা 'গ্রেটার ইসরাইল' প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে।
ইসরাইলি সাম্রাজ্যের সীমানা কী হবে? এর উত্তর পাওয়ার জন্য আমাদের দ্বিতীয়বার বনি ইসরাইলের ইতিহাসের ওপর নজর বুলাতে হবে। বনি ইসরাইলের শুরু ইয়াকুব থেকে হয়েছে। তাঁর মূল বাসভূমি ছিল ফিলিস্তিনের কিনান। পরবর্তী সময়ে তিনি নিজ বংশধরসহ সন্তান ইউসুফ -এর হুকুমতের সময় মিশরে আবাদ হয়ে যান। পুনরায় তারা মুসা -এর যুগে মিশর থেকে বের হয়ে সিনাই মরুতে অবস্থান গ্রহণ করে। অতঃপর তাঁর অফাতের পর ইউশা -এর সময় তারা ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে। অতঃপর বোখতে নসরের হাতে দেশান্তরিত হওয়ার মাধ্যমে ইরাকের এলাকা ইরান, শাম ও জাজিরাতুল আরবে ছড়িয়ে পড়ে। তেমনিভাবে টাইটাসের সময় এবং তারপর খ্রিষ্টান ও ইসলামের যুগেও ইহুদিরা বিভিন্ন এলাকায় দেশান্তর হয়।
আজকের ইহুদিরা সেই সব এলাকাকে বিশাল ইসরাইলি সাম্রাজ্যের অংশ মনে করে, যেখানে তারা বিভিন্ন সময় বসবাস করত। তাদের স্লোগান হচ্ছে, 'নীল থেকে ফোরাত ও খাইবার থেকে কিনান পর্যন্ত এলাকা তাদের ভূমি।' যদি কেউ বর্তমানের ইসরাইলের পতাকার দিকে লক্ষ করেন, তাহলে প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। সেখানে ওপরে নিচে দুটা নীল দাগ ও মধ্যে ছয় কোণবিশিষ্ট তারা রয়েছে। দুই নীল দাগ হচ্ছে, নীলনদ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত অঞ্চল, যা বিশাল ইসরাইল রাজ্যের সীমানা। ছয় কোণবিশিষ্ট তারকা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী এটা দাউদ-এর নিশানা, যা তাঁর পতাকাতে ছিল। তারা এটাকে 'ডেভিড স্টার' (David Star) বলে থাকে। বর্তমানে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশাল ইসরাইলি সাম্রাজ্যের ওপর দাউদ-এর বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুসা-এর সাথে কৃত ফিলিস্তিন ভূমির ওয়াদা বনি ইসরাইলের অযোগ্যতা, চরিত্রহীনতা ও ভ্রষ্ট বিশ্বাসের কারণে যদিও অনেক পরে অর্জিত হয়েছিল—তবে তা ফিরে পাওয়ার পরেও তারা সেটাকে সংরক্ষণ করতে পারেনি। কিন্তু আজ তারা সময়ের বিবর্তনে ও তাদের মনগড়া বিশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাসকে সত্য বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত। তাদের সমস্ত শক্তি ও ধোঁকার মাধ্যমে তারা এই বিশ্বাস বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ইলিয়াসংক্রান্ত বিশ্বাস
ইহুদিদের প্রতিশ্রুত ভূমিতে ফিরে আসার সফর 'ইলিয়া' (Alizah) নামে প্রসিদ্ধ। পুনরায় জেরুজালেমে ফিরে আসার সফরকে তারা অনেক কঠিন যুক্তি দিয়ে বর্ণনা করে। এই সফরের প্রথম ধাপ হচ্ছে, পুরো দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়া এবং দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে, পুরো দুনিয়ার ওপর কন্ট্রোল প্রতিষ্ঠা করা। ইহুদিদের পুরাতন কিতাবগুলোর মধ্যে এই সফরের নকশা পাওয়া যায়। সেখানে যে সমস্ত এলাকা তার সীমার ভেতর দেখানো হয়েছে, সেগুলোর মোড় উসমানি খিলাফতের দিকে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটেন রাজ্যের সাহায্যে ফিলিস্তিনের বুকে ইহুদিদের স্থানান্তরকে তারা ইলিয়া মনে করে থাকে।
মাসিহসংক্রান্ত বিশ্বাস
মাসিহ বলা হয়, সেই ব্যক্তিকে, যাকে আল্লাহ তাআলা বিশেষ কোনো সময়ে বিশেষ কোনো লক্ষ্যে প্রেরণ করেন, যিনি আল্লাহ তাআলার হুকুমে মানুষকে সাহায্যের জন্য কাজ করেন। ইহুদিরা তাদের কিতাবে কয়েকজন মাসিহের আলোচনা উল্লেখ করেছে, যারা
পূর্বে গত হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী শুধু একজন মাসিহ বাকি রয়েছেন, যিনি এসে তাদের হাতে সুলাইমান-এর মতো সালতানাত প্রতিষ্ঠা করে দেবেন। ইহুদিদের এই মাসিহ মূলত দাজ্জাল, যাকে আসল মাসিহ ঈসা হত্যা করবেন। ইহুদিরা ঈসা-কে মাসিহ মানতে অস্বীকার করে, কারণ তিনি দাউদ-এর বংশ থেকে ছিলেন না। ইহুদি আলিমরা বলত, মাসিহ দাউদ-এর বংশ থেকে আসবে। আর এটা তারা নিজ থেকে বানিয়ে বলত, বাস্তবে আম্বিয়ায়ে কিরাম এমন কোনো কথা বলেননি।
খ্রিষ্টানরা ঈসা-কে মাসিহুল্লাহ মনে করে এবং দ্বিতীয়বার তিনি দুনিয়াতে আসার ওপর বিশ্বাসও রাখে। কিন্তু তারা এই বিশ্বাস করে, ঈসা-এর পুনরায় প্রত্যাবর্তন শুধু খ্রিষ্টানদের মধ্যে হবে, মুসলিম বা ইহুদিদের মধ্যে নয়। তারা বলে, 'তিনি আবার ফিরে এসে সৎ খ্রিষ্টানদের বাছাই করে সাথে নেবেন। ফলে দুনিয়াতে ভালো-খারাপের বিশাল যুদ্ধ হবে, যাকে তারা 'আরমাগেডন' বলে। এই যুদ্ধে সৎ ব্যক্তিরা বিজয়ী হবে এবং ঈসা দুনিয়াতে ইনসাফের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। মুসলিমদের বিশ্বাস হচ্ছে, ঈসা নিহত হননি; বরং তাঁকে আল্লাহর হুকুমে দুনিয়া থেকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইমাম মাহদির সময়ের শেষ দিকে আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি দুনিয়াতে এসে দাজ্জালকে হত্যা করবেন এবং সমস্ত বাতিল দ্বীনকে খতম করে সত্য দ্বীনকে পূর্ণরূপে বিজয়ী করবেন। বর্তমানে ইহুদিরা মাসিহ দাজ্জালের অপেক্ষায় আছে এবং তার সংবর্ধনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
হাইকালে সুলাইমানি-সংক্রান্ত বিশ্বাস
ইহুদিদের বিশ্বাস অনুযায়ী হাইকালে সুলাইমানি, যা সুলাইমান বানিয়েছেন, তা দুবার ধ্বংস হয়েছিল। প্রথমবার বোখতে নসরের হাতে, যা পরে জুলকারনাইনের সময় আবার নির্মিত হয়। দ্বিতীয়বার ৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমান বাদশাহ টাইটাসের হাতে এবং সেই সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত তা আর নির্মাণ করা হয়নি। তাই বর্তমান ইহুদিদের ওপর আবশ্যক হচ্ছে, হাইকালে সুলাইমানিকে দ্বিতীয়বার নির্মাণ করা। তাদের আরও বিশ্বাস হচ্ছে, হাইকালের দ্বিতীয় নির্মাণ তাদের মাসিহ দাউদ এসে করবেন; কিন্তু তার জন্য পরিস্থিতি প্রস্তুত করা তাদের দায়িত্ব। এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তারা যেখানে হাইকাল নির্মাণ করতে চাচ্ছে, সেখানেই মাসজিদুল আকসা নির্মিত রয়েছে। তাই হাইকাল নির্মাণের জন্য মাসজিদুল আকসা ধ্বংস করা আবশ্যক। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য তারা একের পর এক ষড়যন্ত্র ও মসজিদের নিচে সুড়ঙ্গ করছে; বরং তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেও বিশ্বের মানুষকে জানিয়ে দিচ্ছে।
মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী সুলাইমান হাইকাল নির্মাণ করেননি; বরং মাসজিদুল আকসাকেই সম্প্রসারণ করেছেন। এই মসজিদ মুসলিমদের প্রথম কিবলা আর হাইকাল একটি মিথ্যা কাহিনি, যা ইহুদিরা মাসজিদুল আকসা ধ্বংসের জন্য তৈরি করেছে।
তাবুতে সাকিনার বিশ্বাস
তাবুতে সাকিনা একটি কাঠের বাক্স। যার মধ্যে এক বর্ণনামতে সেই তাওরাত রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলা মুসা -কে তুর পাহাড়ে কথা বলার সময় দান করেছিলেন। এ ছাড়াও মুসা-এর লাঠি ও মান্না-সালওয়া রয়েছে। এই বাক্স আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে তাঁর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন। বনি ইসরাইল এটাকে নিজেদের জন্য বরকত ও উত্থানের কারণ মনে করে। এই তাবুত বা বাক্সকে তাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যা তালুতের বাহিনীকে নিদর্শন হিসেবে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অতঃপর বোখতে নসরের সময় দ্বিতীয়বার হারিয়ে যাওয়ার পর উজাইর -এর সময় পুনরায় ফিরে আসে। কিন্তু পরে তা আবারও হারিয়ে যায়। ইহুদিদের বিশ্বাস হচ্ছে, মাসিহে দাউদ দাজ্জালের সময় এই বাক্স পুনরায় ফিরে আসবে এবং তা তাদের চিরকালের উত্থানের কারণ হবে।
দানিয়েল-এর দুআ ও মহান লক্ষ্য
ইহুদিদের কিতাবে নবিদের সহিফাগুলোর একটি সংকলন রয়েছে। সেখানে থাকা সর্বশেষ সহিফাটি 'কিতাবে দানিয়েল' নামে প্রসিদ্ধ। বনি ইসরাইলের বর্ণনা অনুযায়ী বোখতে নসরের গোলামির সময় দানিয়েল ছিলেন তাদের কাছে প্রেরিত সর্বশেষ নবি। বনি ইসরাইলের কাছে দানিয়েল -এর প্রসিদ্ধির দুটি কারণ ছিল। একটা হলো তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যায় অনেক দক্ষ ছিলেন অনেকটা ইউসুফ-এর মতো। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে শেষ জমানায় সংঘটিতব্য ঘটনাগুলোর বিস্তারিত ইলম দান করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাগুলোর 'ভুল ব্যাখ্যা' বনি ইসরাইলের মধ্যে গোমরাহির এক বিশাল দরজা খুলে দেয়।
ইবনে কাসির স্বীয় ইতিহাস-গ্রন্থে দানিয়েল-এর সাথে সংশ্লিষ্ট একটি আশ্চর্য ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আবু মুসা আশআরি যখন ইরানের তাসতার শহর বিজয় করেন, তখন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলে, এই শহরে একটি লাশ আছে, যাকে মানুষ দানিয়েল -এর লাশ মনে করে। এর সাথে সোনা ও রুপার একটি ভান্ডার রয়েছে। আবু মুসা আশআরি যখন লাশের জিয়ারত করেন, তখন সেখানে একটি খাজানা, একটি আংটি ও একটি লিখিত সহিফা দেখতে পান। এই ঘটনা উমর-এর কাছে লিখে পাঠানো হলে তিনি লাশকে দাফন করে খাজানা গরিবদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া ও আংটি আবু মুসা আশআরি -কে দিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। সহিফাটি কাব আহবার অনুবাদ করেন, যিনি ইসরাইলি রিওয়ায়াতে অনেক পারদর্শী ছিলেন। সেই সহিফায় উম্মতে মুহাম্মাদির নিদর্শন ও তাদের উত্থানের বিস্তারিত আলোচনা ছিল।
ইহুদিদের নিকট প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, বনি ইসরাইল যখন বোখতে নসরের কাছে বন্দী ছিল, তখন দানিয়েল-কে তাদের নবি হিসেবে পাঠানো হয়। তারা তখন তাঁর কাছে আবেদন জানায়, যাতে তিনি তাদের মুক্তি ও ফিলিস্তিনে ফিরে যাওয়া এবং হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণের ক্ষমতা প্রাপ্তির জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী দানিয়েল দুআ করেন। যার ফলে আল্লাহ তাআলা স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁকে সুসংবাদ দেন যে, তাঁর দুআ কবুল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা একজন বাদশাহ পাঠাবেন, যিনি তাদেরকে গোলামি থেকে মুক্তির পাশাপাশি ফিলিস্তিনে যেতে সাহায্য করবেন এবং হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণেও সাহায্য করবেন। অতঃপর দুনিয়াতে সুলাইমান-এর মতো তাদের ক্ষমতা একজন মাসিহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইহুদিরা তখন দানিয়েল-এর সুসংবাদকেই তাদের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেয় এবং তা অর্জনের জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে থাকে। এই লক্ষ্যে তিনটি অংশ রয়েছে:
১- ইহুদিদের বাইতুল মুকাদ্দাসে ফিরে যাওয়ার অনুমতি।
২- হাইকালে সুলাইমানি দ্বিতীয়বার নির্মিত হওয়া।
৩- সুলাইমান-এর যুগের মতো বৈশ্বিক ক্ষমতা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
ঈসা-কে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং ইহুদি ও খ্রিষ্টবাদের শুরু
ইসা-এর হত্যার ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে দুনিয়াতে দুটা নতুন ধর্ম অর্থাৎ ইহুদিবাদ ও খ্রিষ্টবাদ জন্ম নেয়। ইহুদিবাদ ছিল সত্য দ্বীন থেকে বিচ্যুত তালমুদের বিধান ও ভ্রান্ত আলিমদের নির্দেশনায় পরিচালিত এক নতুন দ্বীন, যার সাথে মুসা-এর দ্বীনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এখন ইহুদিরা দানিয়েল-এর দুআর ভিত্তিতে একজন মাসিহের অপেক্ষায় রয়েছে, যে তাদের দাবি অনুযায়ী দাউদ-এর বংশ থেকে আসবে, যার নেতৃত্বে তারা প্রতিশ্রুত ভূমি দখল করবে, হাইকালে সুলাইমানি পুনরায় নির্মাণ করবে এবং দুনিয়াতে বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবে।
অপরদিকে খ্রিষ্টানরাও সেই দ্বীনের ওপর টিকে থাকেনি, যা ইসা নিয়ে এসেছেন। তারা এই দ্বীনের মধ্যে তাহরিফ করে এবং সেন্ট পৌল (Saint Paul)-এর ভ্রান্ত ব্যাখ্যা গ্রহণ করে পুরো দ্বীনকেই পরিবর্তন করে ফেলেছে।
টিকাঃ
২৩. وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنِّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ الله وَأَحِبَّاؤُهُ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُمْ بِذُنُوبِكُمْ بَلْ أَنْتُمْ بَشَرٌ مِمَّنْ خَلَقَ يَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَإِلَيْهِ الْمَصِيرُ 'ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বলে, "আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন।" আপনি বলুন, "তবে তিনি তোমাদেরকে পাপের বিনিময়ে কেন শান্তি দান করবেন? বরং তোমরাও অন্যান্য সৃষ্ট মানবের অন্তর্ভুক্ত সাধারণ মানুষ। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শান্তি প্রদান করেন। নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে, তাতে আল্লাহরই আধিপত্য রয়েছে এবং তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।” (সুরা আল-মায়িদা, ৫: ১৮)
📄 দানিয়েল-এর দুআ ও মহান লক্ষ্য
ইহুদিদের কিতাবে নবিদের সহিফাগুলোর একটি সংকলন রয়েছে। সেখানে থাকা সর্বশেষ সহিফাটি 'কিতাবে দানিয়েল' নামে প্রসিদ্ধ। বনি ইসরাইলের বর্ণনা অনুযায়ী বোখতে নসরের গোলামির সময় দানিয়েল ছিলেন তাদের কাছে প্রেরিত সর্বশেষ নবি। বনি ইসরাইলের কাছে দানিয়েল -এর প্রসিদ্ধির দুটি কারণ ছিল। একটা হলো তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যায় অনেক দক্ষ ছিলেন অনেকটা ইউসুফ-এর মতো। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে শেষ জমানায় সংঘটিতব্য ঘটনাগুলোর বিস্তারিত ইলম দান করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাগুলোর 'ভুল ব্যাখ্যা' বনি ইসরাইলের মধ্যে গোমরাহির এক বিশাল দরজা খুলে দেয়।
ইবনে কাসির স্বীয় ইতিহাস-গ্রন্থে দানিয়েল-এর সাথে সংশ্লিষ্ট একটি আশ্চর্য ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আবু মুসা আশআরি যখন ইরানের তাসতার শহর বিজয় করেন, তখন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলে, এই শহরে একটি লাশ আছে, যাকে মানুষ দানিয়েল -এর লাশ মনে করে। এর সাথে সোনা ও রুপার একটি ভান্ডার রয়েছে। আবু মুসা আশআরি যখন লাশের জিয়ারত করেন, তখন সেখানে একটি খাজানা, একটি আংটি ও একটি লিখিত সহিফা দেখতে পান। এই ঘটনা উমর-এর কাছে লিখে পাঠানো হলে তিনি লাশকে দাফন করে খাজানা গরিবদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া ও আংটি আবু মুসা আশআরি -কে দিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। সহিফাটি কাব আহবার অনুবাদ করেন, যিনি ইসরাইলি রিওয়ায়াতে অনেক পারদর্শী ছিলেন। সেই সহিফায় উম্মতে মুহাম্মাদির নিদর্শন ও তাদের উত্থানের বিস্তারিত আলোচনা ছিল।
ইহুদিদের নিকট প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, বনি ইসরাইল যখন বোখতে নসরের কাছে বন্দী ছিল, তখন দানিয়েল-কে তাদের নবি হিসেবে পাঠানো হয়। তারা তখন তাঁর কাছে আবেদন জানায়, যাতে তিনি তাদের মুক্তি ও ফিলিস্তিনে ফিরে যাওয়া এবং হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণের ক্ষমতা প্রাপ্তির জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী দানিয়েল দুআ করেন। যার ফলে আল্লাহ তাআলা স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁকে সুসংবাদ দেন যে, তাঁর দুআ কবুল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা একজন বাদশাহ পাঠাবেন, যিনি তাদেরকে গোলামি থেকে মুক্তির পাশাপাশি ফিলিস্তিনে যেতে সাহায্য করবেন এবং হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণেও সাহায্য করবেন। অতঃপর দুনিয়াতে সুলাইমান-এর মতো তাদের ক্ষমতা একজন মাসিহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইহুদিরা তখন দানিয়েল-এর সুসংবাদকেই তাদের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেয় এবং তা অর্জনের জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে থাকে। এই লক্ষ্যে তিনটি অংশ রয়েছে:
১- ইহুদিদের বাইতুল মুকাদ্দাসে ফিরে যাওয়ার অনুমতি।
২- হাইকালে সুলাইমানি দ্বিতীয়বার নির্মিত হওয়া।
৩- সুলাইমান-এর যুগের মতো বৈশ্বিক ক্ষমতা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
📄 ঈসা-কে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং ইহুদি ও খ্রিষ্টবাদের শুরু
ইসা-এর হত্যার ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে দুনিয়াতে দুটা নতুন ধর্ম অর্থাৎ ইহুদিবাদ ও খ্রিষ্টবাদ জন্ম নেয়। ইহুদিবাদ ছিল সত্য দ্বীন থেকে বিচ্যুত তালমুদের বিধান ও ভ্রান্ত আলিমদের নির্দেশনায় পরিচালিত এক নতুন দ্বীন, যার সাথে মুসা-এর দ্বীনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এখন ইহুদিরা দানিয়েল-এর দুআর ভিত্তিতে একজন মাসিহের অপেক্ষায় রয়েছে, যে তাদের দাবি অনুযায়ী দাউদ-এর বংশ থেকে আসবে, যার নেতৃত্বে তারা প্রতিশ্রুত ভূমি দখল করবে, হাইকালে সুলাইমানি পুনরায় নির্মাণ করবে এবং দুনিয়াতে বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবে।
অপরদিকে খ্রিষ্টানরাও সেই দ্বীনের ওপর টিকে থাকেনি, যা ইসা নিয়ে এসেছেন। তারা এই দ্বীনের মধ্যে তাহরিফ করে এবং সেন্ট পৌল (Saint Paul)-এর ভ্রান্ত ব্যাখ্যা গ্রহণ করে পুরো দ্বীনকেই পরিবর্তন করে ফেলেছে।
📄 ইহুদিদের নতুন ইতিহাস
ইহুদিদের নতুন ইতিহাস অনেক জটিল এবং এই ইতিহাস পুরো দুনিয়াতে বিস্তৃত। ইহুদিদের একই সময়ে কয়েকটি যুগের এবং কয়েকটি এলাকার ইতিহাস আছে। যখন তাদেরকে রোমানরা জেরুজালেম থেকে বের করে দিয়েছিল, তখন তারা শাম, ইরাক, জাজিরাতুল আরব, ইয়ামান, পারস্য ও আস্তাকিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে যেহেতু এই এলাকাগুলোতেও রোমানদের কঠিন দখল প্রতিষ্ঠিত ছিল, তাই প্রত্যেক অঞ্চলেই তারা নতুন শাসক ও বিপদের মুখোমুখি হয়। আর এই সবই আলাদা আলাদা ইতিহাস। কিন্তু চতুর্দশ শতাব্দীতে রোমান বাদশাহ কনস্টানটাইন (Constantine) যখন খ্রিষ্টান হয়ে যায়, তখন শামে ইহুদিরা নতুন বিপদের মুখোমুখি হয়। সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আগমনের পর জাজিরাতুল আরব ও ইয়ামানে ইহুদিরা আবার নতুন সমস্যার মুখোমুখি হয়। পরবর্তী সময়ে তাদেরকে আরব থেকেও বের করে দেওয়া হয়।
ইসলামের উত্থানের সময় যখন ইসায়িরা পূর্ব ইউরোপে পোপতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে, তখন সেখানে ইহুদিরা নতুন বিপদের সম্মুখীন হয়। এয়োদশ শতাব্দীতে কাফকাজের (ককেশাসের) খিসার জাতি (Khazars)-যারা ইহুদিবাদ গ্রহণ করেছিল—তাতারদের হামলার ফলে সেখান থেকে পলায়ন করে পূর্ব ইউরোপে চলে আসতে বাধ্য হয়; ফলে ইউরোপে ইহুদিদের নতুন ইতিহাস শুরু হয়। তেমনিভাবে পঞ্চদশ শতাব্দীতে যখন আন্দালুস খ্রিষ্টানরা দখল করে নেয়, তখন মুসলিমদের সাথে ইহুদিরাও সেখান থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়; ফলে তখন তারা ইতালি ও উসমানি সালতানাতের দিকে চলে আসে। সর্বশেষ ফরাসি বিপ্লবের পর ইহুদিরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। মোটকথা ইহুদিদের ইতিহাস এতগুলো ধাপ পাড়ি দিয়েছে, যা এই কিতাবে আলাদা আলাদা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। তাই আমরা এখানে ইহুদিদের ইতিহাসকে পাঁচটি বড় অংশে ভাগ করে সেগুলোর ধারাবাহিক আলোচনা করব।
* মুশরিক রোমান সাম্রাজ্যে ইহুদিরা * খ্রিষ্টান রোমান সাম্রাজ্যে ইহুদিরা * ইসলামি সালতানাতে ইহুদিরা * ইউরোপে ইহুদিরা * ফরাসি বিপ্লব থেকে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত
মুশরিক রোমান সাম্রাজ্যে ইহুদিরা
১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে রোমানরা যখন ইহুদিদেরকে জেরুজালেম থেকে বের করে দেয়, তখন তারা শাম, ইরাক, ইরান, মদিনা ও তুর্কি ইত্যাদি এলাকাতে ছড়িয়ে পড়ে। এটা ছিল তাদের অনেক কষ্টের যুগ। তাদের স্বপ্নের ভূমি তাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাদের সাথে রোমানদের আচরণ ছিল অনেক কঠোর। শামে ইহুদিদেরকে দুই দিক থেকে চাপ মোকাবিলা করতে হতো। একদিকে ছিল মুশরিক রোম, অন্যদিকে ইসা-এর আনীত সত্য দ্বীনের অনুসারীগণ। ইহুদিদের ষড়যন্ত্রে সত্য দ্বীনের মধ্যে পৌলের মতবাদ মিশ্রিত হওয়ার পর এই নতুন সৃষ্ট খ্রিষ্টবাদ তখন সত্যপন্থী দ্বীনদার ও ইহুদিদের বিরোধিতা শুরু করে।
সেই যুগেও তাদের ওপর কয়েকবার গণহত্যা চালানো হয়েছিল। আল্লাহ তাআলার শাস্তির ফলে তখন তারা এক স্থান থেকে অপর স্থানে ঘুরপাক খেতে থাকে এবং পুরো দুনিয়াতে লাঞ্ছনার জীবনযাপন করতে থাকে। অথচ সেই সময়ও ভ্রান্ত আলিমরা তাদের পিছু ছাড়েনি। তাদের এই কথা বোঝাতে থাকে যে, তারা আল্লাহ তাআলার শান্তির কারণে জেরুজালেম থেকে বহিষ্কৃত হয়নি; বরং রোমানদের জুলুমের ফলে এমন হয়েছে। সুতরাং তারা একটি মাজলুম জাতি এবং ফিলিস্তিন ভূমি তাদেরকে চিরকালের জন্য লিখে দেওয়া হয়েছে; তাই তাদের পুনরায় ফিরে যেতে হবে। এই চিন্তা-দর্শন নিয়েই ইহুদিরা আজ পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছে।
রোমান সাম্রাজ্যে ইহুদিরা
ইহুদিরা একদিকে ধারাবাহিক গণহত্যা ও দেশান্তরের শিকার হয়ে অপদস্থতার জীবনযাপন করছিল, অপরদিকে ইসা-এর আনীত সত্য দ্বীনের বিপরীতে তাদের চক্রান্তও পুরো দমে চলছিল। তারা ইসা-এর সঙ্গীদের মধ্যে একজন চক্রান্তকারী প্রবেশ করিয়ে দেয়। সে ছিল এক ইহুদি আলিম, যে 'সেন্ট পৌল' নামে পরিচিত। সে ধোঁকা দেওয়ার জন্য সত্য দ্বীন গ্রহণ করে এবং অগ্রসর হয়ে একসময় হাওয়ারিদের সাথে মিলে দ্বীনের প্রচার করতে থাকে। যখন হাওয়ারিগণসহ সবাই সেন্ট পৌলকে বিশ্বাস করে নেয়, তখন সে সত্য দ্বীনের মধ্যে বিকৃতি শুরু করে। সে ইসা-কে আল্লাহ তাআলার সন্তান এবং তার থেকে মানবসত্তা বিলুপ্ত হওয়ার বিশ্বাস প্রচার শুরু করে। আস্তে আস্তে ইসা-এর আনীত সত্য দ্বীন সেন্ট পৌলের শিরকি বিশ্বাসের স্রোতে হারিয়ে যেতে থাকে। এর বিস্তারিত আলোচনা সামনের অধ্যায়ে করা হবে ইনশাআল্লাহ।
ইহুদিদের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল যখন ইসা-এর জন্মের তিনশ বছর পরে রোমান-সম্রাট খ্রিষ্টান হয়ে যায়। কনস্টানটাইন খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়ার পর ইহুদিদের সামনে পুরো দুনিয়া উলটে যায়। সে ইহুদিদের ওপর ব্যাপকভাবে জুলুম-নির্যাতন শুরু
করে। কেননা, তাদের বিশ্বাসমতে ইহুদিরা প্রভুর সন্তান (নাউজুবিল্লাহ) ঈসা -কে ঘৃণা করে এবং রোমানদের সাথে মিলে চক্রান্ত করে উনাকে শূলিতে চড়িয়ে হত্যা করেছে। রোমের খ্রিষ্টানরা ইহুদিদেরকে খ্রিষ্টান হতে বাধ্য করত এবং যারা খ্রিষ্টান হতে অস্বীকার করত, তাদের হত্যা করা হতো। এটা ইহুদিদের ইতিহাসে কঠিন এক যুগ ছিল।
মুসলিম সাম্রাজ্যে ইহুদিরা
ইহুদিদের ওপর খ্রিষ্টানদের এই নির্যাতন সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত চলমান ছিল। সপ্তম শতাব্দীতে আরবে ইসলামের সূর্য উদিত হয়। আল্লাহর নবি ﷺ মদিনায় হিজরতের সময় সেখানে ইহুদিদের তিনটি গোত্র বনি কুরাইজা, বনি কাইনুকা ও বনি নাজির বাস করত। তারা আল্লাহর নবির আনীত দ্বীনের সত্যতা জানার পরও তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে তাদেরকে গাদ্দারি ও চুক্তি ভঙ্গের কারণে মদিনা থেকে বের করে দেওয়া হয়। অতঃপর উমর রা.-এর সময় আল্লাহর রাসুলের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদেরকে পুরো জাজিরাতুল আরব থেকে বের করে দেওয়া হয়। যখন উমর রা.-এর সময় বাইতুল মুকাদ্দাস বিজিত হয়, তখন ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমির নাম ছিল ইলিয়া এবং সেখানে শাসক ছিল রোমান খ্রিষ্টান। বাইতুল মুকাদ্দাসের খ্রিষ্টান পাদরিরা খিলাফতের অধীনে জিম্মি হিসেবে থাকাকে গ্রহণ করে নেয়। যখন উমর রা. তাদের থেকে শহরের চাবি নেওয়ার জন্য বাইতুল মুকাদ্দাসে যান, তখন একটি চুক্তিপত্র লিখেন। যেখানে একটি মূলনীতি ছিল, ফিলিস্তিনে খ্রিষ্টানদের মতো ইহুদিরা বসবাসের কোনো অনুমতি পাবে না। ২৪
মুসলিমদের হাতে ফিলিস্তিন বিজয় ছিল ইহুদিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ ইহুদিদের সামনে তখন খ্রিষ্টানদের পর আরেকটি শক্তিশালী দ্বীন ফিলিস্তিন ভূমির দাবি নিয়ে এসেছে এবং সেই ভূমি দখলও করে নিয়েছে। সেই সাথে খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মাঝে 'ক্রুসেড' নামে যুদ্ধের এক নতুন ধারা শুরু হয়। এই যুদ্ধগুলোতে ইহুদিরা সরাসরি অংশ নিত না। কেননা, তাদের সংখ্যা এত বেশি ছিল না, যার দ্বারা তারা দুটো বড় শক্তির মোকাবিলা করতে পারবে। তাই তারা চক্রান্তের মাধ্যমে কাজ করতে থাকে এবং এটাই তাদের নতুন ইতিহাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদিরা বড় বড় ষড়যন্ত্র করে। তারা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে হত্যার চক্রান্তও করেছিল। কিন্তু সবচেয়ে সফল চক্রান্ত ছিল উসমান রা.-এর যুগের এক ইহুদির মাধ্যমে সংঘটিত ফিতনা। সে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ ষড়যন্ত্র শুরু করে। তাঁর বিভিন্ন কাজের সমালোচনা করতে থাকে এবং আলি রা.-এর ব্যাপারে বিভিন্ন কিছু প্রচার করতে থাকে। আলি রা.-কে খিলাফতের অধিক হকদার ও নবি
এক্স-এর সহকারী হিসেবে প্রচার করতে থাকে। তার এই কার্যক্রম সফল হয় এবং এর ফলে মুসলিমদের মধ্যে একটি দল উসমান-এর ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা শুরু করে। এই ভয়ানক কাজের সর্বশেষ ফল হিসেবে উসমান শাহাদাত বরণ করেন। উসমান-এর শাহাদাতের ফলে উম্মাহর মধ্যে শিয়া ও রাফিজি ফিতনার এমন ভয়ানক দরজা খুলে যায়, যা সম্ভবত শেষ জমানা পর্যন্ত খোলা থাকবে। এখানে এই ফিতনার বিস্তারিত আলোচনা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইহুদিদের চক্রান্তের মুখোশ উন্মোচন করা। ইহুদি আব্দুল্লাহ বিন সাবার কাজগুলো সেন্ট পৌলের কার্যক্রমের সাথে অনেক সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল, যে ইসা-এর আনীত সত্য দ্বীনের মধ্যে বিকৃতি ঘটিয়ে তাকে খ্রিষ্টবাদে পরিণত করে ফেলেছে।
কিন্তু আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত সর্বশেষ কিতাবের ভিন্ন শক্তি ও বৈশিষ্ট্য ছিল। ফারিসি আলিমরা তাওরাতের শিক্ষাকে পরিবর্তন করেছিল এবং সেন্ট পৌল ইসা-এর আনীত দ্বীনকে পূর্ণ বিপরীত বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আব্দুল্লাহ বিন সাবার কুফুরি বিশ্বাসগুলো থেকে এই উম্মাহকে সংরক্ষিত রাখার জন্য আল্লাহ তাআলা এমন হকপন্থী আলিমদেরকে দাঁড় করিয়ে দেন, যারা অসম্ভব মেহনতের মাধ্যমে আহলুস সুন্নাহর আকিদা ও রাফিজিদের গোমরাহিকে পূর্ণরূপে স্পষ্ট করে দেন; যাতে এই দ্বীন কিয়ামত পর্যন্ত সকল ধরনের বিকৃতি থেকে মুক্ত থাকে।
ইসলামি খিলাফতের পরবর্তী যুগে ইহুদিরা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জিম্মি হিসেবে নিরাপত্তার সাথে বসবাস করতে থাকে। সেই সময় মুসলিমদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও চিন্তাগত উন্নতির সুযোগ গ্রহণ করে তারাও উন্নত হয় এবং আবার উত্থানের জন্য তৈরি হতে থাকে। বিশেষত আন্দালুসের মুসলিম শাসনকে এখনও তারা নিজেদের সোনালি যুগ হিসেবে স্মরণ করে।
ইউরোপে ইহুদিরা
১৮০৮ সালে কাফকাজের খিসার গোত্রের বাদশাহ পুরো জাতিকে নিয়ে ইহুদিবাদ গ্রহণ করে নেয়। বলা হয়ে থাকে, ইহুদিদের উলামায়ে সু'রা সেই কওমকে ইবরাহিম-এর বংশধর প্রমাণ করে তাদের ইহুদি হওয়াকে কবুল করে নেয়। অন্যথায় ইহুদিরা তাদের দ্বীন প্রচার করে না এবং তাদের রক্ত-সম্পর্ক ছাড়া কাউকে নিজেদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না। এয়োদশ শতাব্দীতে তাতারদের হামলার কারণে খিসার গোত্র কাফকাজ থেকে বের হতে বাধ্য হয় এবং পুরো ইউরোপ বিশেষত পোল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ইহুদিকে এস্কিনাজিক ইহুদি (Ashkenazic Jews) বলা হয়। আর যে সমস্ত ইহুদি মুসলিমদের এলাকা অর্থাৎ তুর্কি ও পূর্ব আফ্রিকাতে ছিল, তাদের সেপার্ডিক ইহুদি (Sephardic Jews) বলা হয়। আজ ইসরাইলের আশি শতাংশ এস্কিনাজিক ইহুদি এবং বাকি বিশ শতাংশ সেপার্ডিক ইহুদি অর্থাৎ তারাই হচ্ছে বর্তমান মূল ইহুদি। ফলে বর্তমান ইসরাইলের আশি শতাংশ জনগণ বনি ইসরাইলের বংশের থেকে নয়; বরং খিসার বংশের সাথে সম্পৃক্ত।
ইউরোপে ইহুদিরা গোলামের মতো জীবনযাপন করত। রোমান ক্যাথলিক গির্জা তাদেরকে ঈসা-এর হত্যাকারী মনে করত। তাই ইহুদিদেরকে অভিশপ্ত ঘোষণা দিয়ে খ্রিষ্টানদের এলাকায় থাকতে নিষেধ করে এবং খ্রিষ্টানদের বসতির বাইরে আলাদা কলোনিতে থাকতে বাধ্য করে। সেই আলাদা কলোনিগুলো ইতিহাসে 'ইহুদিদের বাড়ি' (Jewish Ghettos) নামে প্রসিদ্ধ। তাদের সরকারি কোনো পেশায় চাকরি করার অনুমতি ছিল না। ইউরোপে তাদের একটাই পেশা গ্রহণের অনুমতি ছিল, তা হচ্ছে ব্যবসা। কারণ ব্যবসা ইউরোপের জাগিরদার সমাজে তৃতীয় শ্রেণির পেশা হিসেবে গণ্য হতো।
ইউরোপে ইহুদিদেরকে গণহত্যা ছিল একটি সাধারণ বিষয়। মুসলিমদের সাথে খ্রিষ্টানদের ক্রুসেড যুদ্ধের সময়ে খ্রিষ্টানরা তাদের কয়েকবার গণহত্যা করে। ইহুদিদের গণহত্যার একটি মূল কারণ ছিল, তারা সুদের ভিত্তিতে সম্পদ লোন দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিত; ফলে সেই সমাজের লোকেরা তাদের ওপর বিদ্রোহ করে গণহত্যা করত।
ইতিহাসে ইহুদিদের গণহত্যার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ১২০৯ খ্রিষ্টাব্দে তাদেরকে ইংল্যান্ড থেকে গণহত্যার পর দেশান্তর করা হয়, ফ্রান্সে প্রথম ১৩০৬ ও পরে ১৩৯৪ খ্রিষ্টাব্দে, বেলজিয়াম থেকে ১৩৭০ সালে, যুগোস্লাভিয়াতে ১৩৮০ সালে, হল্যান্ডে ১৪৪৪ সালে, রাশিয়াতে ১৫১০ সালে, ইতালিতে ১৫৪০ সালে এবং জার্মানিতে ১৫৫১ সালে গণহত্যা ও দেশান্তর করা হয়। আন্দালুস খ্রিষ্টানরা দখল করার পর মুসলিমদের সাথে ইহুদিদেরকেও দেশান্তর করা হয়। তাদের দেশান্তর ও গণহত্যার এই ধারা পুরো ইউরোপে সময়ে সময়ে সংঘটিত হয়েছে।
ইহুদিবাদ ও মার্টিন লুথারের রিফরমেশন আন্দোলন
ইউরোপে ইহুদিদের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল জার্মান পাদরি (Martin Luther) মার্টিন লুথারের (Reformation) রিফরমেশন আন্দোলনে সফলতা। মার্টিন লুথারের এই আন্দোলন গির্জা ও পাদরিদের সংশোধনের জন্য শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই আন্দোলনের একটি বিশেষ দিক ছিল, মার্টিন লুথার রোমান ক্যাথলিক ধর্ম-বিশ্বাসের বিপরীতে তাওরাত-জাবুরসহ ওল্ড টেস্টামেন্টে (Old Testament) প্রাপ্ত সহিফাগুলোকে খ্রিষ্টানদের দ্বীনের উৎস হিসেবে গণ্য করত। আরও এমন কিছু বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া মার্টিন লুথারের রিফরমেশন আন্দোলনকে অনেক ঐতিহাসিক ইহুদিদের চক্রান্ত মনে করেন। কিছু ইতিহাসবিদের মত হচ্ছে, মার্টিন লুথার নিজেই ইহুদি ছিল, যে পরবর্তী সময়ে খ্রিষ্টান হয়। কয়েকজনের মত হচ্ছে, তার মা ইহুদি ছিল, আল্লাহু আ'লাম। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তার আন্দোলন খ্রিষ্টানদের মধ্যে এমন এক নতুন দলের জন্ম দেয়, যারা
ইহুদিদের ধর্মীয় বড় ভাই মনে করে। তারা ওল্ড টেস্টামেন্টকেই দ্বীনের মূল উৎস মনে করার পাশাপাশি ইহুদিদের ধর্মীয় বিশ্বাস প্রতীক্ষিত ভূমি, হাইকালে সুলাইমানি, দানিয়েল -এর দুআর ওপরেও বিশ্বাস রাখে এবং ইহুদিদেরকে ফিলিস্তিনের অধিকারী মনে করে। এই দলকে আজ আমরা প্রটেস্টান্ট (Protestant) নামে চিনি। এভাবেই খ্রিষ্টানদের মধ্যে ইহুদিদের জন্য অনেক বড় বন্ধু ও সাহায্যকারী মিলে যায়।
ব্রিটেন সাম্রাজ্য ও প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টান
১৫৩২ সালে ব্রিটেনের বাদশাহ হেনরি অষ্টম (Henrz VIII) তার সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কিন্তু রোমান গির্জা এই বিয়েকে প্রত্যাখ্যান করে; যার ফলে বাদশাহর দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান এলিজাবেথ প্রথম (Elizabeth I) সিংহাসনে বসার অযোগ্য হয়ে যায়। এই অবস্থায় এলিজাবেথের সামনে প্রটেস্টান্ট মতাদর্শ গ্রহণ করা ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা ছিল না, যার মাধ্যমে সে বাদশাহির যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে এলিজাবেথ এমনটাই করে এবং নিজের সৎ বোন ম্যারিকে (Queen Marz I) সিংহাসনচ্যুত করে নিজে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। আর এভাবেই ব্রিটেনে প্রটেস্টান্ট মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এলিজাবেথের পর জেমস প্রথম (James I) ও দ্বিতীয় (James II)-এর যুগে রোমান ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট মতাদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলমান থাকে। ১৬৮৮ সালে অনেক যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডে 'চার্চ অফ ইংল্যান্ড' প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাকে ১৬৮৮ সালের 'মহান বিপ্লব' বলা হয়। চার্চ অফ ইংল্যান্ডের দাবি অনুযায়ী এটি এমন এক গির্জা ছিল, যা প্রটেস্টান্ট বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। যাহোক, ১৬৮৮ সালেই এই বিপ্লব ইহুদিদের জন্য অনেক উপকারী প্রমাণিত হয়। যার ফলে ১৭ শতকে ইংল্যান্ড ইহুদিদের ঘাঁটিতে পরিণত হয়। আর এটা ছিল প্রটেস্টান্ট ও ইহুদিদের প্রথম বড় সফলতা, যার বিস্তারিত আলোচনা সামনে পশ্চিমাদের অধ্যায়ে করা হবে।
ইউরোপে ৩০ বছরের যুদ্ধ ও প্রটেস্টান্টদের উত্থান
ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপের রাজ্যগুলোতে ৩০ বছরের ধারাবাহিক এক যুদ্ধ শুরু হয়। যেখানে ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইংল্যান্ডের বাদশাহ ও শাহজাদারা নিজ নিজ স্বার্থের জন্য পরস্পর যুদ্ধ করে। সেই যুদ্ধের কারণগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল রোমান ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্টদের মধ্যে শত্রুতা। ১৭৭৪ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে এই যুদ্ধ শেষ হয়, যাকে ওয়েস্ট ফেলিয়া চুক্তি (Peace of Westphalia treatz) বলা হয়। এই চুক্তির অধীনে সকল পক্ষকে অধিকার দেওয়া হয়, প্রত্যেকেই ইচ্ছা করলে যেকোনো মতবাদ গ্রহণ করে নিতে পারবে। যার ফলে ব্রিটেনের পর পুরো ইউরোপে প্রটেস্টান্ট মতাদর্শকে আলাদা একটি ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া শুরু হয়। প্রটেস্টান্ট ফিরকা যেখানেই অবস্থান গ্রহণ করত, সেখানেই ইহুদিদের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে যেত। কেননা, প্রটেস্টান্ট দল ইহুদিদেরকে তাদের ধর্মীয় বড় ভাই হিসেবে গণ্য করে।
ইহুদিবাদ ও আমেরিকার আবিষ্কার
১৪৯২ সালে স্পেনের নাবিল ক্রিস্টোফার কলম্বাস (Christopher columbus) আমেরিকা আবিষ্কার করে। আমেরিকা আবিষ্কারের পর ইউরোপের সব শাসক সেই নতুন ভূমিতে নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করে। যার মধ্যে স্পেন, ব্রিটেন ও ফ্রান্স অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমেরিকা আবিষ্কার ইহুদি ও তাদের সাহায্যকারী প্রটেস্টান্টদের জন্য অনেক বড় সুসংবাদ ছিল। ১৭২৭ সালে এই দুই দল রোমান ক্যাথলিক গির্জার জুলুমের শিকার হয়ে অনেক কষ্টে আমেরিকায় চলে যেতে শুরু করে। আমেরিকাতে রোমান ক্যাথলিকদের বেশি শক্তি ছিল না; তাই অনেক কম সময়ের মধ্যে এই দুই দল আমেরিকাতে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে ফেলে এবং এখনো তারা সেখানে বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আছে।
টিকাঃ
২৪. ইমাম তাবারি রহ. চুক্তির যে বক্তব্য পেশ করেছেন, সেখানে এই বাক্য ছিল, (ولا يسكن بإيلياء معهم) أحد من اليهود । কোনো ইহুদি তাদের সাথে ইলিয়াতে বসবাস করতে পারবে না।