📄 বনি ইসরাইল কেন গোমরাহ হয়েছিল?
বনি ইসরাইলের নতুন ইতিহাসের দিকে যাওয়ার পূর্বে আমাদের জানা উচিত বনি ইসরাইলের গোমরাহির মূল কারণগুলো কী ছিল। আলিমদের মত অনুযায়ী বনি ইসরাইলের গোমরাহির মূল উৎস ছিল নবিদের শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং গাইরুল্লাহর কথাকে ওহির নির্দেশনার ওপর প্রাধান্য দেওয়া। সুলাইমান -এর পর ইসরাইলি সমাজে শিরক, বিদআতসহ বিভিন্ন চারিত্রিক অধঃপতন ও সমস্যা ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
আল্লাহ তাআলা তাদের সংশোধনের জন্য একের পর এক নবি প্রেরণ করেন। যদি আমরা নবিদের চেষ্টা-প্রচেষ্টার ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব যে, সেই নবিদের দাওয়াত চারটি মূল বিষয় নিয়ে ছিল। এক. আল্লাহ তাআলার সাথে চুক্তি ভঙ্গ করা থেকে বিরত থাকা। দুই. উলামায়ে সু'দের আনুগত্য থেকে বিরত থাকা। তিন. বনি ইসরাইলের শিরক-বিদআতের বিরোধিতা। চার. বনি ইসরাইলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া চারিত্রিক সমস্যা; যেমন: মিথ্যা, হিংসা, ঘৃণা, জিনা, সুদ ও জুলুম থেকে বাধা দেওয়া।
প্রথম কারণ : আল্লাহর সাথে চুক্তি ভঙ্গ করা
বনি ইসরাইলের ইতিহাসে আল্লাহ তাআলার সাথে চুক্তি ভঙ্গের অনেক ঘটনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ফিরআওনের কবল থেকে নাজাত দিয়ে তাদের জন্য তাওরাত নাজিল করেছেন, তা সত্ত্বেও তারা বাছুরের পূজা শুরু করে। আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য মান্না-সালওয়া পাঠিয়েছেন; কিন্তু তারা অন্যান্য খাবারের লোভ করে। পরবর্তী সময়ে
আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শহর দখল করার জন্য ইসতিগফার পড়তে পড়তে শহরে প্রবেশের আদেশ দেন; কিন্তু তারা ইসতিগফারের শব্দ পরিবর্তন করে অহংকারের সাথে প্রবেশ করে। যখন আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর জিহাদ আবশ্যক করেন এবং ফিলিস্তিন বিজয়ের আদেশ দেন, তখন তারা এই কথা বলে অস্বীকার করে যে, সেখানে অত্যাচারী গোত্র রয়েছে এবং আমরা তাদের সাথে লড়াইয়ের ক্ষমতা রাখি না। যখন তালুতকে সিপাহসালার নির্ধারণ করে বলা হলো, তাকে মান্য করো, তখন তারা তাকে অপছন্দ করে আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে প্রমাণ চাওয়া শুরু করে। যখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এক কোষ পানি পানের অনুমতি দেন, তখন তারা পেটভরে পান করে।
সুলাইমান -এর পর যখন বনি ইসরাইলের মধ্যে অনেক নাফরমানি ছড়িয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের হিদায়াতের জন্য ধারাবাহিক নবি পাঠাতে থাকেন, যাঁরা তাদের ইসলাহের চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু বনি ইসরাইল সেই নবিদের কথা মানার পরিবর্তে উলামায়ে সু'দের কথা মান্য করতে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে শাস্তিস্বরূপ খ্রি.পৃ. ৪শ বছর পূর্বে বোখতে নসরকে বনি ইসরাইলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, যে তাদেরকে গোলামে পরিণত করে। বনি ইসরাইল নবির কাছে আবারও আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের ওয়াদা করে, তখন আল্লাহ তাআলা জুলকারনাইনের মাধ্যমে তাদেরকে বাবেল থেকে নাজাত দেন। কিন্তু ফিলিস্তিনে ফিরে আসার পর তারা পুনরায় আল্লাহ তাআলার নাফরমানি শুরু করে। এমনকি ঈসা -এর চরম বিরোধিতা করে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত তারা করে। যার ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে (مَغْضُوب) বা গজবগ্রস্ত ঘোষণা দেন।
দ্বিতীয় কারণ: নবিদের পরিবর্তে উলামায়ে সু'দের আনুগত্য
বনি ইসরাইলের গোমরাহির একটি বড় কারণ ছিল নবিদের অনুসরণের পরিবর্তে খাহিশাতপূজারি ভ্রষ্ট আলিমদের আনুগত্য করা। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ সুরা তাওবার তাফসিরে লিখেছেন, বনি ইসরাইল তাদের আলিমদের আনুগত্য করে তাদেরকে রবের স্থানে বসিয়েছিল এবং তাদের সমস্ত কথাকে ওহির সমপর্যায়ের গণ্য করে অনুসরণ করত।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে সেই ভ্রান্ত আলিমরা তাদের কাছে নবিদের থেকেও উঁচু মর্যাদা অর্জন করেছিল? এর কারণ দুটো, প্রথম কারণ দ্বীনের মূল উৎস পরিবর্তন করে দেওয়া। এবং দ্বিতীয় কারণ উলামায়ে সু'দের পক্ষ থেকে নবিদের ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ রটানো।
বনি ইসরাইলের কাছে আল্লাহর কিতাব ছিল তাওরাত, যা একটি পরিপূর্ণ শরিয়াহ। বনি ইসরাইলের দ্বীনের দ্বিতীয় উৎস ছিল নবিগণ এবং তাঁদের কাছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নাজিলকৃত সহিফা ও কিতাবসমূহ। আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন সময় সেগুলো তাঁদের ওপর নাজিল করেছেন, যার মধ্যে জাবুর ও ইনজিল অর্ন্তভুক্ত। তখন এগুলো ব্যতীত দ্বীনের
আর কোনো উৎস ছিল না। বনি ইসরাইল থেকে আল্লাহ তাআলার কাম্য এটাই ছিল যে, তারা সেই কিতাব ও সহিফাগুলোর শিক্ষার ওপর আমল করবে। বোখতে নসরের গোলামির সময় বনি ইসরাইল তাওরাতকে হিফাজত করতে পারেনি। ইহুদিদের বর্ণনা অনুযায়ী বোখতে নসর তাওরাতের সমস্ত কপি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ফলে বাবেলে গোলামির জীবন অতিবাহিত করার সময় কিতাবুল্লাহ তাদের সামনে থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উজাইর আবার তাওরাতকে একত্রিত করেন। তাঁর এই কাজের ফলে কিছু ইহুদি তাঁকে আল্লাহর সন্তান ডাকা শুরু করে।
যখন তাওরাত তাদের সামনে অনুপস্থিত ছিল, তখন দ্বীনের উৎসের মধ্যে আরও একবার পরিবর্তন সাধন হয়। ভ্রান্ত আলিমরা সুযোগ পেয়ে যায় এবং তারা মানুষকে ওহির মূল শিক্ষার পরিবর্তে নিজেদের পক্ষ থেকে বানানো কথা শিক্ষা দেওয়া শুরু করে। দ্বীনের উৎস ছিল তাওরাত, যা আল্লাহ তাআলা মুসা -কে তুর পাহাড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাওরাত না থাকায় দ্বীনের এই উৎসের আলোচনার পরিবর্তে আলিমরা নিজেদের বানানো কাহিনি বর্ণনা করতে শুরু করে। তাদের তালমুদকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য যে কাহিনি বর্ণনা করে, তা ছিল এমন, 'মুসা যখন আল্লাহ তাআলার আহ্বানে তুর পাহাড়ে যান, তখন বনি ইসরাইলের বড় বুজুর্গরাও আল্লাহ তাআলার সাক্ষাৎলাভের ইচ্ছা পোষণ করেন। ফলে মুসা তাদের দশজনকে তুর পাহাড়ে নিয়ে যান। তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকেও হিদায়াত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ইলম দান করেন। এই ইলম কখনোই লিখিত হয়নি; বরং তা শুধু তাদের স্মৃতিতে সংরক্ষিত ছিল। এই ইলম তারা পরবর্তীদের মুখস্থ করায়, যার ধারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে আসছিল। বোখতে নসরের গোলামির সময় সেই ইলমকে লিপিবদ্ধ করার নামে ভ্রান্ত আলিমরা তালমুদ লিখে দেয়; যাতে তা ধ্বংস না হয়ে যায়। আর এভাবেই দ্বীনের উৎস একের জায়গায় দুটি হয়ে যায়। অর্থাৎ একটি তাওরাত ও দ্বিতীয়টি তালমুদ। এটাই ছিল বনি ইসরাইলের সবচেয়ে বড় গোমরাহি। তালমুদ কোনো ওহি বা দ্বীনের উৎস ছিল না; বরং তা ছিল উলামায়ে সুদের মনগড়া বিধানাবলি, যা তারা বনি ইসরাইলের সামনে দ্বীনের উৎস হিসেবে পেশ করেছিল।
অপরদিকে সেই ভ্রান্ত আলিমরা তালমুদ রচনার অপরাধ থেকে আরও অগ্রসর হয়ে নবিদের কাজের বিরুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডা শুরু করে। এই অপপ্রচারের উদ্দেশ্য ছিল নবিদের সাধারণ মানুষের স্তরে নিয়ে আসা, যারা ভুল ও গুনাহ করতে পারে (নাউজুবিল্লাহ)। কারণ, যদি নবিদের গুনাহ ও ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে ওহির মধ্যেও ভুল হতে পারে। তাই আলিম ও নবির মধ্যে কোনো বিশেষ পার্থক্য নেই। এই প্রোপাগাণ্ডাকে প্রমাণ করার জন্য নুহ -কে শরাব পানকারী বলে প্রচার করে (নাউজুবিল্লাহ), লুত -কে অশ্লীল কাজে লিপ্ত হওয়ার অপবাদ দেয় (নাউজুবিল্লাহ), ইয়াকুব -কে নিজের ভাইকে ধোঁকা দেওয়ার মিথ্যা অপবাদ দেয় (নাউজুবিল্লাহ), ইউসুফ, দাউদ, সুলাইমান -এর নামে মিথ্যা প্রেমকাহিনি প্রচার করে (নাউজুবিল্লাহ)। এমনকি সেই ইহুদিদের আলিমদের দাবি অনুযায়ী সুলাইমান বিবির মহব্বতে মূর্তিপূজা শুরু করেন (নাউজুবিল্লাহ)। এগুলো সব মিথ্যা অভিযোগ ও প্রোপাগাণ্ডা। এই সবকিছুর উদ্দেশ্য ছিল তাওরাত ও নবিদের সম্মান কমিয়ে ভ্রান্ত আলিমদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা।
উলামায়ে সু'দের এই চক্রান্ত সফল হওয়ার পর আস্তে আস্তে তালমুদ তাওরাত থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া শুরু হয় এবং নবির স্থান ভ্রান্ত আলিমরা দখল করে নেয়। তখনকার সময়ে নাজিলকৃত কিতাব ও সহিফাগুলো অধ্যয়ন করলে সহজেই বোঝা যায় যে, বোখতে নসরের হামলার কিছু কাল পূর্ব থেকে পরের সকল নবির মূল দাওয়াত সেই আলিমদের বিরুদ্ধে ছিল। এ ছাড়াও সেই কিতাবগুলো অধ্যয়নের পর এমনটাও অনুভূত হয় যে, বনি ইসরাইলের নবিগণ ও উলামায়ে সু'দের মধ্যে এক ধারাবাহিক দ্বন্দ্ব চলমান ছিল। জাকারিয়া, ইয়াহইয়া ও ঈসা -এর জমানায় এই দ্বন্দ্ব অনেক বৃদ্ধি পায়। তখন ভ্রান্ত আলিমরা নবিগণকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তাঁদের হত্যা পর্যন্ত শুরু করে। ভ্রান্ত আলিমদের অধীনে বনি ইসরাইল যেসব অপরাধ করেছিল, তার আলোচনা কুরআনে বিস্তারিত এসেছে। যেমন হককে গোপন করা, হককে বাতিলের সাথে মিলিয়ে ফেলা, নবিদের হত্যা করা ও কিতাবুল্লাহর মধ্যে বিকৃতি ঘটানো ইত্যাদি। এগুলো ছিল এমন অপরাধ, যার মাধ্যমে সত্য দ্বীনকে মানুষের দৃষ্টি থেকে গোপন করে রাখা হয়। ফলে সত্যপন্থী আলিমরা দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং ভ্রান্ত আলিমরা বিজয়ী হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ তাআলার কিতাব ও নবিদের নির্দেশনা ত্যাগ করে তালমুদের বানানো বিধান পালনের ফলে তারা সত্য দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে এক নতুন ধর্মের দিকে চলতে শুরু করে, যাকে আজ ইহুদিবাদ বলা হয়।
তৃতীয় কারণ : বনি ইসরাইলের মধ্যে শিরক ও বিদআতের প্রাদুর্ভাব
বনি ইসরাইলের গোমরাহির তৃতীয় কারণ ছিল তাদের মধ্যে শিরক ও বিদআত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া। আর তাদের মাঝে শিরক-বিদআত ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ ছিল সত্যপন্থী আলিমদের পরিবর্তে ভ্রান্ত আলিমদের আনুগত্য। এর ফলে সমাজে এমন সব সভ্যতা-সংস্কৃতি চালু হয়, যার সাথে আল্লাহর বিধান ও নবিদের দাওয়াতের কোনো সম্পর্ক ছিল না। যা বনি ইসরাইলকে আস্তে আস্তে দ্বীন থেকে সরিয়ে দেয়।
দ্বিতীয় প্রকারের শিরক ছিল আল্লাহ তাআলার সত্তা ও সিফাতের মধ্যে শিরক। যেমন উজাইর -কে আল্লাহ তাআলার সন্তান বলা। আরও কিছু ভয়াবহ শিরক ছিল, যা ফিলিস্তিনের অধিবাসীদের থেকে এসেছিল। আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে ফিলিস্তিন বিজয় করে সেখানে বসবাসকারী জাতিকে পূর্ণভাবে নিঃশেষ করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু বনি ইসরাইল তাদের হত্যা না করে ছেড়ে দেয়, অতঃপর সময়ের সাথে সাথে সেই জাতির সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে তাদের শিরকগুলো গ্রহণ করে নেয়।
ফিলিস্তিনের পূর্বের অধিবাসীরা ছিল মুশরিক, যাদের সবচেয়ে বড় মূর্তির নাম ছিল আইল ও তার স্ত্রীর নাম আশিরা। এদের থেকে আরও মূর্তি জন্ম নেয়, যেগুলোকে অনেক কাজের দায়িত্বশীল মনে করা হতো। কোনোটা রিজিকের মূর্তি ও কোনোটা বিপদদাতা ইত্যাদি (নাউজুবিল্লাহ)। এগুলোর মধ্যে বা'ল (Baal) মূর্তিটি সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে গণ্য হতো, যার বিবির নাম ছিল আস্তারাত (Ashtoreth)। বনি ইসরাইলের ইতিহাসে এই কথা স্বীকৃত যে, তারা পরিপূর্ণভাবে বা'ল ও আস্তারাত পূজায় লিপ্ত ছিল। আল্লাহ তাআলা তাদের হিদায়াতের জন্য ইলইয়াস-কে প্রেরণ করেন এবং উনার মূল দাওয়াত ছিল বা'ল পূজার বিরুদ্ধে। ২২
শিরক ও কুফরের আরেকটি প্রকার বনি ইসরাইলের মধ্যে ব্যাপকতা লাভ করে। সেটা হলো জাদু শিক্ষা ও নিজেদের স্বার্থে তা ব্যবহার করা। এই সমস্যা অনেক ব্যাপকতা লাভ করে, যার আলোচনা কুরআনের সুরা বাকারাতে এসেছে। এই জাদু দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ পর্যন্ত ঘটাত। ২২
টিকাঃ
২২. وَإِنَّ إِلْيَاسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ - إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَلَا تَتَّقُونَ - أَتَدْعُونَ بَعْلًا وَتَذَرُونَ أَحْسَنَ الْخَالِقِين . 'নিশ্চয় ইলইয়াস ছিলেন রাসুল। যখন সে তার সম্প্রদায়কে বলল, "তোমরা কি ভয় করো না? তোমরা কি বা'ল দেবতার ইবাদত করবে এবং সর্বোত্তম স্রষ্টাকে পরিত্যাগ করবে।” (সুরা আস-সাফফাত, ৩৭: ১২৩-১২৫)
২২. দেখুন, সুরা বাকারার ১০২ নং আয়াত।
📄 ইহুদিদের পুরাতন ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত বিশ্বাসসমূহ
ভ্রান্ত আলিমরা যখন বনি ইসরাইলের দ্বীনের উৎস পরিবর্তন করে দিতে সক্ষম হয়, তখন তারা দ্বীনের মধ্যে নিজেদের বানানো বিশ্বাস ছড়ানো শুরু করে। তারা ইহুদিদের নতুন প্রজন্মকে বলা শুরু করে যে, ইহুদিরাই আল্লাহ তাআলার বাছাইকৃত জাতি এবং অন্যদের থেকে অনেক ঊর্ধ্বে ও উত্তম। তাই দুনিয়াকে শাসন করার অধিকার শুধু ইহুদিদের। উলামায়ে সু'রা নতুন প্রজন্মকে আরও বিশ্বাস করায় যে, ফিলিস্তিন ভূখণ্ড আল্লাহ তাআলা চিরদিনের জন্য বনি ইসরাইলকে দিয়ে দিয়েছেন। এই ভূমিতে শুধুই তাদের অধিকার রয়েছে। আর যারা তাদের থেকে এই ভূমি ছিনিয়ে নিয়েছে, সেই খ্রিষ্টান ও মুসলিমরা হচ্ছে জালিম। তাই এই ভূমি ফিরিয়ে আনা তাদের সবচেয়ে বড় সাওয়াবের কাজ। তারা নতুন প্রজন্মকে আরও শিক্ষা দেয় যে, তাদের মূল ইবাদতগৃহ হচ্ছে হাইকালে সুলাইমানি। যে হাইকালের ওপর মুসলিমরা মাসজিদুল আকসা বানিয়ে রেখেছে। সেটাকে ধ্বংস করে হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণ করা ইহুদিদের ইমানের অংশ।
উলামায়ে সু'রা আসমানি কিতাব থেকে নবিদের সুসংবাদগুলো দেখিয়ে নতুন প্রজন্মকে বলে যে, বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরায় তাদের হাতে আসবে এবং হাইকালে সুলাইমানি দ্বিতীয়বার প্রতিষ্ঠিত হবে। যার পর তাদের হাতে সুলাইমান ⚡-এর মতো বৈশ্বিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হবে। যার প্রেক্ষিতেই নতুন প্রজন্ম এই বিশ্বাসকে ধারণ করে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়েছে। তারা নবিদের আনীত কিতাব তাওরাত, জাবুর, ইনজিলসহ সহিফাগুলোর হিদায়াত থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। ফলে এখন শুধু তাদের কাছে রয়েছে বনি ইসরাইলের বংশীয় অধিকারের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনের ভূমির মিথ্যা দাবি, মিথ্যা মাসিহের দাবি, মিথ্যা হাইকালে সুলাইমানির দাবি এবং সুলাইমান ⚡-এর মতো বৈশ্বিক ক্ষমতার স্বপ্ন। এটাই আজকের ইহুদিবাদ ও তাদের ধর্ম, যার সাথে নবিদের শিক্ষা ও আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত হিদায়াতের দূরতম সম্পর্ক নেই।
এখন আমরা ইহুদিদের মিথ্যা বিশ্বাসগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করব:
• আল্লাহ তাআলার প্রিয় জাতি
• অ-ইহুদিদের ব্যাপারে গোয়েম বিশ্বাস
• প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস
• দানিয়েলের দুআ ও মহান লক্ষ্য
• ইলিয়াসংক্রান্ত বিশ্বাস
• মাসিহসংক্রান্ত বিশ্বাস
• হাইকালে সুলাইমানি-সংক্রান্ত বিশ্বাস
আল্লাহ তাআলার প্রিয় জাতি
ইহুদিরা নিজেদের পুরাতন ইতিহাস থেকে প্রথম যে বিশ্বাস গ্রহণ করেছে তা হলো, আল্লাহ তাআলা সমস্ত বনি আদমের মধ্যে শুধু বনি ইসরাইল বংশকে বিশেষভাবে নির্বাচন করেছেন কোনো শর্ত ছাড়াই। অর্থাৎ বনি ইসরাইল যা-ই করুক আল্লাহ তাআলার প্রিয় ও বাছাইকৃত জাতি হিসেবেই থাকবে। এই দুনিয়াকে আল্লাহ তাআলা শুধু ইহুদিদের জন্যই সৃষ্টি করেছেন, কেননা তারা নবিদের সন্তান। এই দাবি প্রমাণের জন্য তারা তাদের ওপর নাজিল হওয়া আল্লাহ তাআলার নিয়ামতগুলো নিয়ে আলোচনা করে। যেমন তাদেরকে ফিরআওন থেকে নাজাত দিয়েছেন। সিনাই মরুতে মান্না-সালওয়া পাঠিয়েছেন। মরুতে পানির ব্যবস্থাস্বরূপ বারোটি ঝরনা প্রবাহিত করেছেন। পুনরায় তাদেরকে ফিলিস্তিনের বাদশাহি ফিরিয়ে দিয়েছেন; যাতে সেখানে বসবাস করতে পারে। যখনই ইহুদিদের সামনে কোনো সমস্যা তৈরি হয়েছে, তাদের জন্য কোনো মাসিহ প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের সেই সমস্যা সমাধানের অসিলা হয়েছেন। সেই মাসিহদের মধ্যে রয়েছেন মুসা, তালুত, দাউদ, বাদশাহ জুলকারনাইন এবং সর্বশেষ আরেকজন মাসিহ রয়েছে, যাকে তারা মাসিহ দাজ্জাল বলে ডাকে।
আল্লাহ তাআলা কুরআনের কয়েক জায়গায় তাদের এই ভুল বিশ্বাসের ভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন।২৩ আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে নিজ নিয়ামত স্মরণ করিয়ে বলেছেন যে, এই ইহসান বনি ইসরাইলের সেই সমস্ত মুসলিমের জন্য ছিল, যারা নবিদের আনুগত্য করত। যখন তাদের থেকে কোনো ভুল প্রকাশিত হতো, তখন তারা গুনাহ থেকে ইসতিগফার করে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে লেগে যেত। আল্লাহ তাআলা এই নিয়ামতের কথা বর্ণনার পাশাপাশি বনি ইসরাইলের অবাধ্য ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে নিয়ামতের অস্বীকার, জিহাদ ত্যাগ করা, নবিদের নাফরমানি, উলামায়ে সু'দের আনুগত্য, নবিদের হত্যা করা, কিতাবুল্লাহতে বিকৃতি ও হক গোপন করার কারণে তাদেরকে অপরাধীও সাব্যস্ত করেছেন।
আলিমরা বলেছেন, আল্লাহ তাআলার এই ইহসান ও নিয়ামতগুলো ছিল বনি ইসরাইলের মধ্যে যারা নবিদের আনুগত্যকারী মুসলিম, তাদের জন্য। এগুলো কাফির ইহুদিদের জন্য নয়, যারা প্রথমে ঈসা-কে অস্বীকার করেছে, অতঃপর মুহাম্মাদ-কে অস্বীকার করেছে। যার মধ্যে আজকের সমস্ত ইহুদি অর্ন্তভুক্ত। কিন্তু তারা গত দু'শ বছর পূর্ব থেকে
নিজেদের এই বিশ্বাসগুলো খ্রিষ্টানদের মাঝেও প্রচার শুরু করে এবং তাদের অধিকাংশকে এটা বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয় যে, ইহুদিরাই হচ্ছে আল্লাহ তাআলার একমাত্র নির্বাচিত জাতি এবং ফিলিস্তিনের ওপর শুধু তাদেরই অধিকার রয়েছে।
অ-ইহুদিদের ব্যাপারে গোয়েম বিশ্বাস
আল্লাহ তাআলার বাছাইকৃত ও নির্বাচিত জাতি হওয়ার বিশ্বাসের ফলে ইহুদিদের ধারণা হচ্ছে সকল মানুষ দুই প্রকার, ইহুদি ও অ-ইহুদি। অ-ইহুদিদের জন্য তাদের কিতাবে 'গোয়েম' (Goyim) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। 'গোয়েম' একটি ইবরানি শব্দ, যার অর্থ নিচু শ্রেণির মানুষ। শব্দটিকে কখনো গোলাম ও কখনো জন্তুর জন্যও ব্যবহার করা হয়। তারা সমস্ত মানুষের থেকে উত্তম হওয়ার ফলে অন্যদের 'গোয়েম' উপাধি দিয়ে থাকে এবং নিজেদের থেকে নিম্নশ্রেণির মনে করে। এই আকিদা অনুযায়ী বাকি সমস্ত মানুষকে মূলত বনি ইসরাইলের খিদমতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই ইহুদিদের জন্য তাদের ওপর যেকোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বৈধ। বিশেষ করে তাদের থেকে বিভিন্নভাবে মোটা অংকের সুদ উসুল করা; যদিও তালমুদের বর্ণনা অনুযায়ী সুদি কারবার হারাম। এমনিভাবে 'গোয়েমদের' জান-মাল ও সম্মানসহ সবকিছু দখল করা ইহুদিদের জন্য বৈধ।
প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস
ইহুদিদের তৃতীয় আকিদা হচ্ছে, প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেই ভূমি, যার প্রতিশ্রুতি বনি ইসরাইলকে দেওয়া হয়েছে। ইহুদিদের আকিদা হচ্ছে, ফিলিস্তিন বিশেষ করে জেরুজালেমকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামত পর্যন্ত ইহুদিদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাই এই ভূমিতে শুধু তাদেরই অধিকার রয়েছে। খ্রিষ্টান ও মুসলিম যারা তাদের নিকট 'গোয়েম', তারা ফিলিস্তিনে অবৈধ দখল করে রেখেছে, আর এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই বর্তমানের ইহুদিরা 'গ্রেটার ইসরাইল' প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে।
ইসরাইলি সাম্রাজ্যের সীমানা কী হবে? এর উত্তর পাওয়ার জন্য আমাদের দ্বিতীয়বার বনি ইসরাইলের ইতিহাসের ওপর নজর বুলাতে হবে। বনি ইসরাইলের শুরু ইয়াকুব থেকে হয়েছে। তাঁর মূল বাসভূমি ছিল ফিলিস্তিনের কিনান। পরবর্তী সময়ে তিনি নিজ বংশধরসহ সন্তান ইউসুফ -এর হুকুমতের সময় মিশরে আবাদ হয়ে যান। পুনরায় তারা মুসা -এর যুগে মিশর থেকে বের হয়ে সিনাই মরুতে অবস্থান গ্রহণ করে। অতঃপর তাঁর অফাতের পর ইউশা -এর সময় তারা ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে। অতঃপর বোখতে নসরের হাতে দেশান্তরিত হওয়ার মাধ্যমে ইরাকের এলাকা ইরান, শাম ও জাজিরাতুল আরবে ছড়িয়ে পড়ে। তেমনিভাবে টাইটাসের সময় এবং তারপর খ্রিষ্টান ও ইসলামের যুগেও ইহুদিরা বিভিন্ন এলাকায় দেশান্তর হয়।
আজকের ইহুদিরা সেই সব এলাকাকে বিশাল ইসরাইলি সাম্রাজ্যের অংশ মনে করে, যেখানে তারা বিভিন্ন সময় বসবাস করত। তাদের স্লোগান হচ্ছে, 'নীল থেকে ফোরাত ও খাইবার থেকে কিনান পর্যন্ত এলাকা তাদের ভূমি।' যদি কেউ বর্তমানের ইসরাইলের পতাকার দিকে লক্ষ করেন, তাহলে প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। সেখানে ওপরে নিচে দুটা নীল দাগ ও মধ্যে ছয় কোণবিশিষ্ট তারা রয়েছে। দুই নীল দাগ হচ্ছে, নীলনদ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত অঞ্চল, যা বিশাল ইসরাইল রাজ্যের সীমানা। ছয় কোণবিশিষ্ট তারকা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী এটা দাউদ-এর নিশানা, যা তাঁর পতাকাতে ছিল। তারা এটাকে 'ডেভিড স্টার' (David Star) বলে থাকে। বর্তমানে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশাল ইসরাইলি সাম্রাজ্যের ওপর দাউদ-এর বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুসা-এর সাথে কৃত ফিলিস্তিন ভূমির ওয়াদা বনি ইসরাইলের অযোগ্যতা, চরিত্রহীনতা ও ভ্রষ্ট বিশ্বাসের কারণে যদিও অনেক পরে অর্জিত হয়েছিল—তবে তা ফিরে পাওয়ার পরেও তারা সেটাকে সংরক্ষণ করতে পারেনি। কিন্তু আজ তারা সময়ের বিবর্তনে ও তাদের মনগড়া বিশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাসকে সত্য বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত। তাদের সমস্ত শক্তি ও ধোঁকার মাধ্যমে তারা এই বিশ্বাস বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ইলিয়াসংক্রান্ত বিশ্বাস
ইহুদিদের প্রতিশ্রুত ভূমিতে ফিরে আসার সফর 'ইলিয়া' (Alizah) নামে প্রসিদ্ধ। পুনরায় জেরুজালেমে ফিরে আসার সফরকে তারা অনেক কঠিন যুক্তি দিয়ে বর্ণনা করে। এই সফরের প্রথম ধাপ হচ্ছে, পুরো দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়া এবং দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে, পুরো দুনিয়ার ওপর কন্ট্রোল প্রতিষ্ঠা করা। ইহুদিদের পুরাতন কিতাবগুলোর মধ্যে এই সফরের নকশা পাওয়া যায়। সেখানে যে সমস্ত এলাকা তার সীমার ভেতর দেখানো হয়েছে, সেগুলোর মোড় উসমানি খিলাফতের দিকে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটেন রাজ্যের সাহায্যে ফিলিস্তিনের বুকে ইহুদিদের স্থানান্তরকে তারা ইলিয়া মনে করে থাকে।
মাসিহসংক্রান্ত বিশ্বাস
মাসিহ বলা হয়, সেই ব্যক্তিকে, যাকে আল্লাহ তাআলা বিশেষ কোনো সময়ে বিশেষ কোনো লক্ষ্যে প্রেরণ করেন, যিনি আল্লাহ তাআলার হুকুমে মানুষকে সাহায্যের জন্য কাজ করেন। ইহুদিরা তাদের কিতাবে কয়েকজন মাসিহের আলোচনা উল্লেখ করেছে, যারা
পূর্বে গত হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী শুধু একজন মাসিহ বাকি রয়েছেন, যিনি এসে তাদের হাতে সুলাইমান-এর মতো সালতানাত প্রতিষ্ঠা করে দেবেন। ইহুদিদের এই মাসিহ মূলত দাজ্জাল, যাকে আসল মাসিহ ঈসা হত্যা করবেন। ইহুদিরা ঈসা-কে মাসিহ মানতে অস্বীকার করে, কারণ তিনি দাউদ-এর বংশ থেকে ছিলেন না। ইহুদি আলিমরা বলত, মাসিহ দাউদ-এর বংশ থেকে আসবে। আর এটা তারা নিজ থেকে বানিয়ে বলত, বাস্তবে আম্বিয়ায়ে কিরাম এমন কোনো কথা বলেননি।
খ্রিষ্টানরা ঈসা-কে মাসিহুল্লাহ মনে করে এবং দ্বিতীয়বার তিনি দুনিয়াতে আসার ওপর বিশ্বাসও রাখে। কিন্তু তারা এই বিশ্বাস করে, ঈসা-এর পুনরায় প্রত্যাবর্তন শুধু খ্রিষ্টানদের মধ্যে হবে, মুসলিম বা ইহুদিদের মধ্যে নয়। তারা বলে, 'তিনি আবার ফিরে এসে সৎ খ্রিষ্টানদের বাছাই করে সাথে নেবেন। ফলে দুনিয়াতে ভালো-খারাপের বিশাল যুদ্ধ হবে, যাকে তারা 'আরমাগেডন' বলে। এই যুদ্ধে সৎ ব্যক্তিরা বিজয়ী হবে এবং ঈসা দুনিয়াতে ইনসাফের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। মুসলিমদের বিশ্বাস হচ্ছে, ঈসা নিহত হননি; বরং তাঁকে আল্লাহর হুকুমে দুনিয়া থেকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইমাম মাহদির সময়ের শেষ দিকে আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি দুনিয়াতে এসে দাজ্জালকে হত্যা করবেন এবং সমস্ত বাতিল দ্বীনকে খতম করে সত্য দ্বীনকে পূর্ণরূপে বিজয়ী করবেন। বর্তমানে ইহুদিরা মাসিহ দাজ্জালের অপেক্ষায় আছে এবং তার সংবর্ধনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
হাইকালে সুলাইমানি-সংক্রান্ত বিশ্বাস
ইহুদিদের বিশ্বাস অনুযায়ী হাইকালে সুলাইমানি, যা সুলাইমান বানিয়েছেন, তা দুবার ধ্বংস হয়েছিল। প্রথমবার বোখতে নসরের হাতে, যা পরে জুলকারনাইনের সময় আবার নির্মিত হয়। দ্বিতীয়বার ৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমান বাদশাহ টাইটাসের হাতে এবং সেই সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত তা আর নির্মাণ করা হয়নি। তাই বর্তমান ইহুদিদের ওপর আবশ্যক হচ্ছে, হাইকালে সুলাইমানিকে দ্বিতীয়বার নির্মাণ করা। তাদের আরও বিশ্বাস হচ্ছে, হাইকালের দ্বিতীয় নির্মাণ তাদের মাসিহ দাউদ এসে করবেন; কিন্তু তার জন্য পরিস্থিতি প্রস্তুত করা তাদের দায়িত্ব। এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তারা যেখানে হাইকাল নির্মাণ করতে চাচ্ছে, সেখানেই মাসজিদুল আকসা নির্মিত রয়েছে। তাই হাইকাল নির্মাণের জন্য মাসজিদুল আকসা ধ্বংস করা আবশ্যক। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য তারা একের পর এক ষড়যন্ত্র ও মসজিদের নিচে সুড়ঙ্গ করছে; বরং তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেও বিশ্বের মানুষকে জানিয়ে দিচ্ছে।
মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী সুলাইমান হাইকাল নির্মাণ করেননি; বরং মাসজিদুল আকসাকেই সম্প্রসারণ করেছেন। এই মসজিদ মুসলিমদের প্রথম কিবলা আর হাইকাল একটি মিথ্যা কাহিনি, যা ইহুদিরা মাসজিদুল আকসা ধ্বংসের জন্য তৈরি করেছে।
তাবুতে সাকিনার বিশ্বাস
তাবুতে সাকিনা একটি কাঠের বাক্স। যার মধ্যে এক বর্ণনামতে সেই তাওরাত রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলা মুসা -কে তুর পাহাড়ে কথা বলার সময় দান করেছিলেন। এ ছাড়াও মুসা-এর লাঠি ও মান্না-সালওয়া রয়েছে। এই বাক্স আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে তাঁর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন। বনি ইসরাইল এটাকে নিজেদের জন্য বরকত ও উত্থানের কারণ মনে করে। এই তাবুত বা বাক্সকে তাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যা তালুতের বাহিনীকে নিদর্শন হিসেবে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অতঃপর বোখতে নসরের সময় দ্বিতীয়বার হারিয়ে যাওয়ার পর উজাইর -এর সময় পুনরায় ফিরে আসে। কিন্তু পরে তা আবারও হারিয়ে যায়। ইহুদিদের বিশ্বাস হচ্ছে, মাসিহে দাউদ দাজ্জালের সময় এই বাক্স পুনরায় ফিরে আসবে এবং তা তাদের চিরকালের উত্থানের কারণ হবে।
দানিয়েল-এর দুআ ও মহান লক্ষ্য
ইহুদিদের কিতাবে নবিদের সহিফাগুলোর একটি সংকলন রয়েছে। সেখানে থাকা সর্বশেষ সহিফাটি 'কিতাবে দানিয়েল' নামে প্রসিদ্ধ। বনি ইসরাইলের বর্ণনা অনুযায়ী বোখতে নসরের গোলামির সময় দানিয়েল ছিলেন তাদের কাছে প্রেরিত সর্বশেষ নবি। বনি ইসরাইলের কাছে দানিয়েল -এর প্রসিদ্ধির দুটি কারণ ছিল। একটা হলো তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যায় অনেক দক্ষ ছিলেন অনেকটা ইউসুফ-এর মতো। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে শেষ জমানায় সংঘটিতব্য ঘটনাগুলোর বিস্তারিত ইলম দান করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাগুলোর 'ভুল ব্যাখ্যা' বনি ইসরাইলের মধ্যে গোমরাহির এক বিশাল দরজা খুলে দেয়।
ইবনে কাসির স্বীয় ইতিহাস-গ্রন্থে দানিয়েল-এর সাথে সংশ্লিষ্ট একটি আশ্চর্য ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আবু মুসা আশআরি যখন ইরানের তাসতার শহর বিজয় করেন, তখন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলে, এই শহরে একটি লাশ আছে, যাকে মানুষ দানিয়েল -এর লাশ মনে করে। এর সাথে সোনা ও রুপার একটি ভান্ডার রয়েছে। আবু মুসা আশআরি যখন লাশের জিয়ারত করেন, তখন সেখানে একটি খাজানা, একটি আংটি ও একটি লিখিত সহিফা দেখতে পান। এই ঘটনা উমর-এর কাছে লিখে পাঠানো হলে তিনি লাশকে দাফন করে খাজানা গরিবদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া ও আংটি আবু মুসা আশআরি -কে দিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। সহিফাটি কাব আহবার অনুবাদ করেন, যিনি ইসরাইলি রিওয়ায়াতে অনেক পারদর্শী ছিলেন। সেই সহিফায় উম্মতে মুহাম্মাদির নিদর্শন ও তাদের উত্থানের বিস্তারিত আলোচনা ছিল।
ইহুদিদের নিকট প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, বনি ইসরাইল যখন বোখতে নসরের কাছে বন্দী ছিল, তখন দানিয়েল-কে তাদের নবি হিসেবে পাঠানো হয়। তারা তখন তাঁর কাছে আবেদন জানায়, যাতে তিনি তাদের মুক্তি ও ফিলিস্তিনে ফিরে যাওয়া এবং হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণের ক্ষমতা প্রাপ্তির জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী দানিয়েল দুআ করেন। যার ফলে আল্লাহ তাআলা স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁকে সুসংবাদ দেন যে, তাঁর দুআ কবুল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা একজন বাদশাহ পাঠাবেন, যিনি তাদেরকে গোলামি থেকে মুক্তির পাশাপাশি ফিলিস্তিনে যেতে সাহায্য করবেন এবং হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণেও সাহায্য করবেন। অতঃপর দুনিয়াতে সুলাইমান-এর মতো তাদের ক্ষমতা একজন মাসিহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইহুদিরা তখন দানিয়েল-এর সুসংবাদকেই তাদের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেয় এবং তা অর্জনের জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে থাকে। এই লক্ষ্যে তিনটি অংশ রয়েছে:
১- ইহুদিদের বাইতুল মুকাদ্দাসে ফিরে যাওয়ার অনুমতি।
২- হাইকালে সুলাইমানি দ্বিতীয়বার নির্মিত হওয়া।
৩- সুলাইমান-এর যুগের মতো বৈশ্বিক ক্ষমতা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
ঈসা-কে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং ইহুদি ও খ্রিষ্টবাদের শুরু
ইসা-এর হত্যার ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে দুনিয়াতে দুটা নতুন ধর্ম অর্থাৎ ইহুদিবাদ ও খ্রিষ্টবাদ জন্ম নেয়। ইহুদিবাদ ছিল সত্য দ্বীন থেকে বিচ্যুত তালমুদের বিধান ও ভ্রান্ত আলিমদের নির্দেশনায় পরিচালিত এক নতুন দ্বীন, যার সাথে মুসা-এর দ্বীনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এখন ইহুদিরা দানিয়েল-এর দুআর ভিত্তিতে একজন মাসিহের অপেক্ষায় রয়েছে, যে তাদের দাবি অনুযায়ী দাউদ-এর বংশ থেকে আসবে, যার নেতৃত্বে তারা প্রতিশ্রুত ভূমি দখল করবে, হাইকালে সুলাইমানি পুনরায় নির্মাণ করবে এবং দুনিয়াতে বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবে।
অপরদিকে খ্রিষ্টানরাও সেই দ্বীনের ওপর টিকে থাকেনি, যা ইসা নিয়ে এসেছেন। তারা এই দ্বীনের মধ্যে তাহরিফ করে এবং সেন্ট পৌল (Saint Paul)-এর ভ্রান্ত ব্যাখ্যা গ্রহণ করে পুরো দ্বীনকেই পরিবর্তন করে ফেলেছে।
টিকাঃ
২৩. وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنِّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ الله وَأَحِبَّاؤُهُ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُمْ بِذُنُوبِكُمْ بَلْ أَنْتُمْ بَشَرٌ مِمَّنْ خَلَقَ يَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَإِلَيْهِ الْمَصِيرُ 'ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বলে, "আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন।" আপনি বলুন, "তবে তিনি তোমাদেরকে পাপের বিনিময়ে কেন শান্তি দান করবেন? বরং তোমরাও অন্যান্য সৃষ্ট মানবের অন্তর্ভুক্ত সাধারণ মানুষ। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শান্তি প্রদান করেন। নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে, তাতে আল্লাহরই আধিপত্য রয়েছে এবং তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।” (সুরা আল-মায়িদা, ৫: ১৮)
📄 দানিয়েল-এর দুআ ও মহান লক্ষ্য
ইহুদিদের কিতাবে নবিদের সহিফাগুলোর একটি সংকলন রয়েছে। সেখানে থাকা সর্বশেষ সহিফাটি 'কিতাবে দানিয়েল' নামে প্রসিদ্ধ। বনি ইসরাইলের বর্ণনা অনুযায়ী বোখতে নসরের গোলামির সময় দানিয়েল ছিলেন তাদের কাছে প্রেরিত সর্বশেষ নবি। বনি ইসরাইলের কাছে দানিয়েল -এর প্রসিদ্ধির দুটি কারণ ছিল। একটা হলো তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যায় অনেক দক্ষ ছিলেন অনেকটা ইউসুফ-এর মতো। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে শেষ জমানায় সংঘটিতব্য ঘটনাগুলোর বিস্তারিত ইলম দান করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাগুলোর 'ভুল ব্যাখ্যা' বনি ইসরাইলের মধ্যে গোমরাহির এক বিশাল দরজা খুলে দেয়।
ইবনে কাসির স্বীয় ইতিহাস-গ্রন্থে দানিয়েল-এর সাথে সংশ্লিষ্ট একটি আশ্চর্য ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আবু মুসা আশআরি যখন ইরানের তাসতার শহর বিজয় করেন, তখন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলে, এই শহরে একটি লাশ আছে, যাকে মানুষ দানিয়েল -এর লাশ মনে করে। এর সাথে সোনা ও রুপার একটি ভান্ডার রয়েছে। আবু মুসা আশআরি যখন লাশের জিয়ারত করেন, তখন সেখানে একটি খাজানা, একটি আংটি ও একটি লিখিত সহিফা দেখতে পান। এই ঘটনা উমর-এর কাছে লিখে পাঠানো হলে তিনি লাশকে দাফন করে খাজানা গরিবদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া ও আংটি আবু মুসা আশআরি -কে দিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। সহিফাটি কাব আহবার অনুবাদ করেন, যিনি ইসরাইলি রিওয়ায়াতে অনেক পারদর্শী ছিলেন। সেই সহিফায় উম্মতে মুহাম্মাদির নিদর্শন ও তাদের উত্থানের বিস্তারিত আলোচনা ছিল।
ইহুদিদের নিকট প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, বনি ইসরাইল যখন বোখতে নসরের কাছে বন্দী ছিল, তখন দানিয়েল-কে তাদের নবি হিসেবে পাঠানো হয়। তারা তখন তাঁর কাছে আবেদন জানায়, যাতে তিনি তাদের মুক্তি ও ফিলিস্তিনে ফিরে যাওয়া এবং হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণের ক্ষমতা প্রাপ্তির জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী দানিয়েল দুআ করেন। যার ফলে আল্লাহ তাআলা স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁকে সুসংবাদ দেন যে, তাঁর দুআ কবুল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা একজন বাদশাহ পাঠাবেন, যিনি তাদেরকে গোলামি থেকে মুক্তির পাশাপাশি ফিলিস্তিনে যেতে সাহায্য করবেন এবং হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণেও সাহায্য করবেন। অতঃপর দুনিয়াতে সুলাইমান-এর মতো তাদের ক্ষমতা একজন মাসিহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইহুদিরা তখন দানিয়েল-এর সুসংবাদকেই তাদের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেয় এবং তা অর্জনের জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে থাকে। এই লক্ষ্যে তিনটি অংশ রয়েছে:
১- ইহুদিদের বাইতুল মুকাদ্দাসে ফিরে যাওয়ার অনুমতি।
২- হাইকালে সুলাইমানি দ্বিতীয়বার নির্মিত হওয়া।
৩- সুলাইমান-এর যুগের মতো বৈশ্বিক ক্ষমতা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
📄 ঈসা-কে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং ইহুদি ও খ্রিষ্টবাদের শুরু
ইসা-এর হত্যার ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে দুনিয়াতে দুটা নতুন ধর্ম অর্থাৎ ইহুদিবাদ ও খ্রিষ্টবাদ জন্ম নেয়। ইহুদিবাদ ছিল সত্য দ্বীন থেকে বিচ্যুত তালমুদের বিধান ও ভ্রান্ত আলিমদের নির্দেশনায় পরিচালিত এক নতুন দ্বীন, যার সাথে মুসা-এর দ্বীনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এখন ইহুদিরা দানিয়েল-এর দুআর ভিত্তিতে একজন মাসিহের অপেক্ষায় রয়েছে, যে তাদের দাবি অনুযায়ী দাউদ-এর বংশ থেকে আসবে, যার নেতৃত্বে তারা প্রতিশ্রুত ভূমি দখল করবে, হাইকালে সুলাইমানি পুনরায় নির্মাণ করবে এবং দুনিয়াতে বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবে।
অপরদিকে খ্রিষ্টানরাও সেই দ্বীনের ওপর টিকে থাকেনি, যা ইসা নিয়ে এসেছেন। তারা এই দ্বীনের মধ্যে তাহরিফ করে এবং সেন্ট পৌল (Saint Paul)-এর ভ্রান্ত ব্যাখ্যা গ্রহণ করে পুরো দ্বীনকেই পরিবর্তন করে ফেলেছে।