📄 বনি ইসরাইলের (ইহুদিদের) পুরাতন ইতিহাস
'বনি ইসরাইল বা ইহুদিদের পুরাতন ইতিহাস' এটি বর্তমানের নতুন পরিভাষা। বাস্তবে তা শুধু ইহুদিদের ইতিহাস নয়; বরং নবিদের ইতিহাসও এর অন্তর্ভুক্ত। এখানে বনি ইসরাইলের সেই সমস্ত ইমানদার সম্প্রদায়ের ইতিহাসও রয়েছে, যারা নবিদের অনুসরণ করত এবং সেই সমস্ত ব্যক্তির ইতিহাসও রয়েছে, যারা নবিদের নাফরমানি করত এবং যারা পরবর্তীকালে ইহুদি হয়ে গেছে।
বনি ইসরাইলের ইতিহাসকে আমরা চারটি ভাগে ভাগ করতে পারি:
প্রথম যুগ: কিনান থেকে মিশরে আগমন পর্যন্ত (খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ থেকে ১২০০)
দ্বিতীয় যুগ : মিশর থেকে পুনরায় ফিলিস্তিনে আবাদি পর্যন্ত (খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ থেকে ৫৮৬)
তৃতীয় যুগ: বোখতে নসরের হামলা ও বাবেলে দেশান্তর (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ থেকে ৫৩৯)
চতুর্থ যুগ: বাবেল থেকে ফিরে এসে আবার দেশান্তর পর্যন্ত (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ থেকে ৭০ খ্রি.)
প্রথম যুগ: বনি ইসরাইলের কিনান থেকে মিশরে যাওয়া পর্যন্ত (খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ থেকে ১২০০)
ইয়াকুব ▒ ছিলেন ইসহাক ▒-এর ছেলে এবং সকল নবির দাদা ইবরাহিম ▒-এর নাতি। ইয়াকুব ▒-এর এলাকা ছিল ফিলিস্তিনের কিনান অঞ্চলে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে নবি বানিয়ে ইসরাইল উপাধি দিয়েছেন, যার অর্থ আব্দুল্লাহ বা আল্লাহর বান্দা। ইহুদিদের বাতিল বিশ্বাসের একটি হচ্ছে, ইয়াকুব ▒-এর এই উপাধি আল্লাহ তাআলার আকৃতিতে আসা একটি ফেরেশতাকে নৌকার মধ্যে বন্দী করার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল (নাউজুবিল্লাহ)। ইয়াকুব ▒-এর ১২ জন সন্তান ছিল। তাঁর সন্তানদের বংশ এতটাই বিস্তৃতি লাভ করেছিল, যা ১২ গোত্র ধারণ করে। তাদেরকেই কুরআনে বনি ইসরাইল বলা হয়েছে।
আখিরি নবি মুহাম্মাদ যখন মক্কাতে ইসলামের দাওয়াত শুরু করেন, তখন কুরাইশরা একদল লোককে খাইবারের ইহুদিদের কাছে রাসুলের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রেরণ করে। খাইবারের ইহুদিরা তাদের বলে, 'তাঁকে জিজ্ঞেস করো, "বনি ইসরাইল তাদের আসল ভূমি কিনান থেকে মিশর কীভাবে গিয়েছিল?" যদি তিনি সত্য নবি হয়ে থাকেন, তাহলে এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবেন।' যখন রাসুলুল্লাহ -কে এই প্রশ্ন করা হয়,
তখন তাঁর কাছে এর জবাব ছিল না। ফলে আল্লাহ তাআলা ইউসুফ -এর পুরো ঘটনা সুরা ইউসুফের মধ্যে একসাথে বর্ণনা করে জবাব দিয়ে দেন।
যার সারসংক্ষেপ হচ্ছে, ইউসুফ -এর ভাইয়েরা হিংসাবশত তাঁকে বাবার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে এক কূপে নিক্ষেপ করে। যেখান থেকে একটি কাফেলা তাঁকে উদ্ধার করে গোলাম হিসেবে মিশরের মন্ত্রীর কাছে বিক্রি করে দেয়। কিন্তু মন্ত্রীর স্ত্রীর চক্রান্তের ফলে তাঁকে জেলে যেতে হয়। তখন মিশরে কিবতি বংশের বাদশাহর শাসন চলমান ছিল। একদিন বাদশাহ এক আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখে, যার সঠিক ব্যাখ্যা ইউসুফ ছাড়া কেউ বর্ণনা করতে সক্ষম ছিল না। আর এভাবেই তিনি জেল থেকে বের হয়ে বাদশাহর নিকটতম হয়ে যান এবং পরবর্তী সময়ে দুর্ভিক্ষের সময় তাঁকে খাদ্যমন্ত্রী বানিয়ে দেওয়া হয়। সর্বশেষ ইউসুফ নিজের উত্তম কাজের মাধ্যমে মিশরের বাদশাহ হয়ে যান। অতঃপর ইউসুফ তাঁর পিতা ইয়াকুব -সহ ১১ ভাইকে মিশরে ডেকে আনেন; যার ফলে বনি ইসরাইল মিশরে আবাদ হয়ে যায়।
ইউসুফ -এর অফাতের পর বনি ইসরাইল সাত-আটশ বছর পর্যন্ত মিশরের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে। এই সময় তারা আল্লাহ তাআলার আনুগত্যশীল ছিল। কিন্তু একসময় আস্তে আস্তে তাদের মধ্যে খারাপ কাজ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। যার ফলে তাদের থেকে মিশরের বাদশাহি ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং সেখানে ফিরআওনদের বংশীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। যার ফলে বনি ইসরাইল দীর্ঘ সময় মিশরের বাদশাহ থাকার পর এখন তারাই প্রজা ও গোলামে পরিণত হয়। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে বনি ইসরাইলের এই গোলামি আনুমানিক তিন থেকে চারশ বছর পর্যন্ত চলমান ছিল। এটা ছিল তাদের সবচেয়ে খারাপ সময়। তখন ফিরআওনরা তাদেরকে জুলুম করত এবং গোলাম হিসেবে ব্যবহার করত।
সর্বশেষ ফিরআওন 'রামসিস ২য়'-এর সময় গণকরা তাকে বলে, 'বনি ইসরাইলের মধ্যে এমন এক শিশু জন্মাবে, যিনি তার ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেবেন।' 'রামসিস ২য়' ছিল সেই ফিরআওন, যে মুসা -এর সময়ের বাদশাহ এবং তার আলোচনাই কুরআনে এসেছে। সে নিজের বাদশাহি বাঁচানোর জন্য বনি ইসরাইলের সকল শিশুকে হত্যা করার হুকুম দেয়। কিছু বছর একচেটিয়া সমস্ত শিশু হত্যার পর তার সহকারীরা তাকে পরামর্শ দেয় যে, এই ধারাবাহিকতা চলমান থাকলে কিছু দিন পর বনি ইসরাইল থেকে তাদের গোলামের সংখ্যা
অনেক কমে যাবে। তখন ফিরআওন আদেশ দেয় এক বছর সমস্ত বাচ্চাকে হত্যা করা হবে এবং দ্বিতীয় বছরের সকল বাচ্চাকে জীবিত রাখা হবে। সুরা বাকারাতে আল্লাহ তাআলা এই ঘটনার বর্ণনাতে এই সময়টাকে বনি ইসরাইলের ওপর বিশাল আজাব বলেছেন অর্থাৎ এটা ছিল বনি ইসরাইলের ওপর এক বিশাল বিপদ।৬
আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় মুসা সেই বছর জন্মগ্রহণ করেন, যে বছর সকল সন্তানকে হত্যার আদেশ জারি ছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় মুসা -এর মা তাঁকে একটি বাক্সে রেখে নীলনদে ভাসিয়ে দেন। এই বাক্স যখন ফিরআওনের মহলের পাশ দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছিল, তখন ফিরআওনের বিবি আসিয়া সেটাকে উঠিয়ে আনেন। আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে মুসা-এর প্রতি মহব্বত ঢেলে দেন এবং ফিরআওনের বিরোধিতা সত্ত্বেও মুসা-কে নিজের সন্তান বানিয়ে নেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় মুসা ফিরআওনের মহলেই প্রতিপালিত হয়েছিলেন। এখানে মুসা-এর সিরাতের দীর্ঘ আলোচনা উদ্দেশ্য নয়। এখান থেকে আমাদের এতটুকুই জানা জরুরি যে, মুসা-এর নবুওয়াত পাওয়া ও তাঁর দাওয়াত বনি ইসরাইলের ইতিহাসে কতটা প্রভাবশীল ছিল।
আল্লাহ তাআলা মুসা-কে নবুওয়াত দেন এবং তাঁকে ফিরআওন ও বনি ইসরাইলের কাছে হিদায়াতের বাণী পৌঁছানোর জন্য প্রেরণ করেন। ফিরআওন যখন মুসা-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে বনি ইসরাইলকে গোলামি থেকে মুক্তি দিতে অস্বীকার করে, তখন মুসা আল্লাহ তাআলার হুকুমে বনি ইসরাইলকে নিয়ে মিশর থেকে বের হয়ে সিনাই মরুভূমিতে চলে যান। সিনাই মরুভূমি মিশর ও ফিলিস্তিনের মাঝে শত মাইল লম্বা একটি
অঞ্চল। যখন মুসা বনি ইসরাইলকে নিয়ে লোহিত সাগরের (Red Sea) পাড়ে সেই জায়গায় পৌঁছান, যাকে আজ সুয়েজ গালফ (Gulf of Suez) বলা হয়, তখন ফিরআওনও তার বাহিনী নিয়ে মুসা -এর পিছু ধাওয়া করে সেখানে পৌঁছে যায়। মুসা আল্লাহ তাআলার হুকুমে আপন লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করেন; ফলে সেখানে রাস্তা তৈরি হয়ে যায়, যা দিয়ে বনি ইসরাইল সমুদ্র পার হয়ে সিনাই মরুতে পৌঁছে যায়। কিন্তু ফিরআওন যখন পার হতে চেষ্টা করে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের ডুবিয়ে দেন। আর এভাবেই বনি ইসরাইল ফিরআওনের গোলামির জীবন থেকে মুক্ত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বনি ইসরাইলকে নিজের এই ইহসানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
আজকের ইহুদিদের ইতিহাসেও যেদিন তারা মুসা -এর নেতৃত্বে মিশর থেকে বের হয়ে আসে এবং ফিরআওনের গোলামি থেকে মুক্তি লাভ করে, এই পুরো সফরকে তারা অসম্ভব গুরুত্বের সাথে আলোচনা করে। ইহুদিরা আজও সেই দিনকে 'ইয়াউমে কিপুর' (Yom Kippur) ডাকে, যা থেকে তাদের নতুন বছর শুরু হয়। তাদের ইতিহাসে ইয়াকুব -এর কিনান (ফিলিস্তিন) থেকে বের হয়ে মিশর আসা এবং পুনরায় মুসা -এর নেতৃত্বে মিশর থেকে বের হয়ে ফিলিস্তিনের সফর শুরু করা ধর্মীয় তাৎপর্য রাখে। যার কারণে বর্তমান যুগের ইহুদিরা মিশর ও ফিলিস্তিনকে নিজেদের 'প্রতিশ্রুত ভূমি'র অন্তর্ভুক্ত মনে করে, যার আলোচনা সামনে করব ইনশাআল্লাহ।
দ্বিতীয় যুগ : মিশর থেকে দেশান্তর হওয়ার পর থেকে ফিলিস্তিনে আবাদি পর্যন্ত (খ্রি.পৃ. ১২০০ থেকে ৫৮৬)
মুসা থেকে নিয়ে সুলাইমান পর্যন্ত সময়টা ইহুদিদের ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শুধু ফিরআওনের গোলামি থেকেই নাজাত দেননি; বরং তাওরাতের মতো একটি পূর্ণ শরিয়াহ দান করেন। ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং জমিনে পুনরায় তাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যে যুগে তারা সিনাই মরু থেকে বের হয়ে ফিলিস্তিনে শাসন প্রতিষ্ঠা করে, সেই যুগকে তিনটি অংশে ভাগ করা যায়। প্রথম অংশ সিনাই মরুতে ঘুরতে থাকা, দ্বিতীয় অংশ জেরুজালেম বিজয়, তৃতীয় অংশ বনি ইসরাইলের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হওয়া। আমরা সামনের আলোচনায় উল্লেখিত ঘটনাসমূহের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করব।
পূর্বে যেমনটা বর্ণনা করেছি, বনি ইসরাইল মুসা-এর নেতৃত্বে ফিরআওনের গোলামি থেকে বের হয়ে সিনাই মরুতে পৌছায়। সিনাই মরুতে আসার পর আল্লাহ তাআলা মুসা -কে তুর পাহাড়ে ৪০ দিন রোজা রাখার হুকুম দেন। ৪০ দিন পর আল্লাহ তাআলা মুসা -এর সাথে কথা বলেন এবং তাঁর ওপর তাওরাত নাজিল করেন, যা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহ। আল্লাহ তাআলার সাথে কথোপকথনের ফলে মুসা-এর উপাধি হয়ে যায় কালিমুল্লাহ। কিন্তু একদিকে যখন মুসা-এর সাথে আল্লাহ তাআলার কথা হচ্ছিল, তখন অন্যদিকে সামিরি বনি ইসরাইলকে গোমরাহ করে ফেলে এবং তারা বাছুরপূজা করা শুরু করে। মুসা ফিরে এসে এই ফিতনা খতম করেন।
সিনাই মরুতে আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য ১২টি ঝরনা প্রবাহিত করেন এবং আসমান থেকে মান্না-সালওয়া নাজিল করেন। কিন্তু বনি ইসরাইল এই প্রস্তুতকৃত খাবারের ওপর সন্তুষ্ট না হয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার আল্লাহর কাছে চাইতে থাকে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সবকিছুই দান করেন। সিনাই মরুতে থাকা অবস্থায় আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনে হামলা করা ও সেখানের শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদের হুকুম দেন। উলামায়ে কিরাম বর্ণনা করেছেন, বনি ইসরাইল ফিরআওনের গোলামিতে থেকে মানসিকভাবে এতটা দুর্বল ও পরাজিত মানসিকতাসম্পন্ন হয়ে যায় যে, তারা মুসা -এর সামনে বাহানা পেশ করা শুরু করে। তারা বলতে থাকে, 'হে মুসা, সেখানে এক অত্যাচারী জাতি রয়েছে, যাদের সাথে আমাদের লড়াই করার শক্তি নেই।' ফলে তখন পুরো বনি ইসরাইল থেকে শুধু দুজন আল্লাহর হুকুমে লাব্বাইক বলে।১০ তাফসিরে এই দুই ব্যক্তির নাম এসেছে ইউশা বিন নুন ও কালিব বিন ইউফনা।” এই দুজন বনি ইসরাইলের বারোজন নির্বাচিত ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে ইউশা বিন নুন মুসা-এর পরে নবি হয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা ভীরুতার শাস্তি হিসেবে তাদেরকে সিনাই মরুতে ৪০ বছর ঘূর্ণয়নে ফেলে রাখেন। ১২ আর এই সময়ের মধ্যে এমন নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়, যারা ছিল ফিরআওনের গোলামি থেকে মুক্ত। সিনাই মরুতেই মুসা ও হারুন -এর অফাত হয়।
এই দুজন নবির অফাতের পর আল্লাহ তাআলা ইউশা বিন নুন -কে নবুওয়াত দান করেন এবং ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে জিহাদের আদেশ দেন। ইউশা বিন নুন আল্লাহ তাআলার আদেশ বাস্তবায়ন করে পুরো ফিলিস্তিন বিজয় করে নেন। কিন্তু বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের পূর্বেই তাঁর মৃত্যু হয়ে যায়। ইউশা বিন নুন -এর পর কিছু বছর বনি ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের আমালেকা সম্প্রদায়ের মধ্যে যুদ্ধ চলমান থাকে। সেই সময় স্যামুয়েল -কে আল্লাহ তাআলা নবি হিসেবে পাঠান। সেই সময় জেরুজালেমের বাদশাহ ছিল জালুত, যে বনি ইসরাইলের এলাকাগুলো দখল করে হত্যা-ধ্বংসের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল। স্যামুয়েল আল্লাহ তাআলার কাছে জালুতের জুলুমের ব্যাপারে অভিযোগ করেন এবং তাদের জন্য একজন নেতা পাঠানোর দুআ করেন, যিনি তাদেরকে নিয়ে জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন।
এই দুআর ফলে আল্লাহ তাআলা তালুতকে বাদশাহ নির্ধারণ করেন এবং তার নেতৃত্বে জেরুজালেম বিজয়ের জন্য জিহাদের আদেশ দেন। তালুত যেহেতু অপরিচিত ও সমাজের দুর্বল ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, তাই বনি ইসরাইলের সর্দাররা তাঁর নেতৃত্বের ওপর প্রশ্ন উত্থাপন করে। আল্লাহ তাআলা নবির মাধ্যমে বনি ইসরাইলের কাছে স্পষ্ট করে দেন যে, তালুতকে নেতা নির্ধারণের কারণ হলো, সে নিজ জাতির মধ্যে ইলম ও শারীরিক শক্তিতে সবচেয়ে অগ্রগামী। কিন্তু তারপরও বনি ইসরাইল আশ্বস্ত হতে পারেনি; যার ফলে তারা নিজেদের অন্তরের প্রশান্তির জন্য স্যামুয়েল -এর কাছে উনার নেতৃত্বের সত্যতার ব্যাপারে প্রমাণ চাওয়া শুরু করে। স্যামুয়েল আবার দুআ করেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া 'তাবুতে সাকিনা' আপন ইচ্ছায় ফিরিয়ে দেন। যেখানে তাওরাত ও মুসা -এর ব্যবহৃত কিছু জিনিস ছিল, যাকে বনি ইসরাইল অনেক সম্মানিত মনে করত। আর এভাবে বনি ইসরাইল তালুতের নেতৃত্বে জিহাদের জন্য প্রস্তুত হয়। এই ঘটনার বিস্তারিত আলোচনা সুরা বাকারার দ্বিতীয় পারার শেষ দিকে আল্লাহ তাআলা বর্ণনা করেছেন। ১৩
তালুতের নেতৃত্বে মুসলিমদের এই বাহিনী যখন জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য রওয়ানা হয়, তখন আল্লাহ তাআলা সেই বাহিনীকে এক আশ্চর্যজনক পরীক্ষায় ফেলে দেন। আল্লাহ তাআলা স্যামুয়েল -কে ওহির মাধ্যমে আদেশ দেন, যেন এই বাহিনীর পথে যে নদী আসবে, সেখান থেকে কেউ পানি পান না করে। যদি পান করতেই হয়, তাহলে শুধু এক কোষ পান করবে। কিন্তু যখন বাহিনী নদীর কিনারে পৌঁছায়, তখন ৩১৩ জন ব্যতীত সবাই এক কোষ থেকে বেশি পান করে নেয়। ফলে যারাই অতিরিক্ত পান করেছিল, তাদের জিহাদের হিম্মত নষ্ট হয়ে যায় এবং তারা পেছনে থেকে যায়। বারা বিন আজিব থেকে বর্ণিত, 'শুধু আসহাবে বদর যতজন অর্থাৎ ৩১৩ জন টিকে থাকেন। ১৪ আল্লাহ তাআলা
এই অবিচল মুজাহিদ বাহিনীকে সাহায্য করেন এবং জালুতের বাহিনীকে ধ্বংস করে দেন। সেই মুজাহিদ বাহিনীর মধ্যে ছিলেন দাউদ ✊, যিনি জালুতকে হত্যা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা তালুতের পর তাঁকে বাদশাহির সাথে সাথে নবুওয়াতও দান করেছিলেন। অতঃপর দাউদ ✊-এর পর তাঁর ছেলে সুলাইমান ✊-কে বিশাল হুকুমত ও বাদশাহি দান করেছিলেন। সুলাইমান ✊-এর বাদশাহির কথা কল্পনা করে ইহুদিরা আজও এক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে।
বনি ইসরাইল ইউসুফ ✊-এর জমানায় কিনান থেকে মিশর গিয়ে সেখানে বাদশাহ হয়ে যায়, পরে ফিরআউনের হাতে গোলামে পরিণত হয়। মুসা ✊-এর যুগে ফিরআউনের গোলামি থেকে মুক্ত হয়ে সিনাই মরুতে আসে। ইউশা ✊-এর নেতৃত্বে পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিন বিজয় করে এবং তালুতের নেতৃত্বে জেরুজালেম বিজয় করে। দাউদ ✊-এর নেতৃত্বে পুরো ফিলিস্তিনের বাদশাহে পরিণত হয় এবং সুলাইমান ✊-এর সময় এমন বৈশ্বিক ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়, যা পূর্বে ও পরে কাউকে দেওয়া হয়নি। সুলাইমান ✊-এর সময় মাসজিদুল আকসাকে পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হয়। আজকের নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ইহুদিরা সুলাইমান ✊-এর যুগের বাদশাহির মতো পুনরায় বিশ্বের বুকে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। সেই যুগে যেই মাসজিদুল আকসাকে নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটাকে আজকে ইহুদিরা হাইকালে সুলাইমানির জায়গায় নির্মিত মনে করে। এই বিষয়ে আমরা সামনে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
তৃতীয় যুগ : বোখতে নসরের হামলা ও বাবেলে প্রথম দেশান্তর (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ থেকে ৫৩৯)
দাউদ ✊-এর পর আল্লাহ তাআলা তাঁর ছেলে সুলাইমান ✊-কে বাদশাহির সাথে নবুওয়াত দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। সুলাইমান ✊-কে এমন রাজত্ব দেওয়া হয়েছিল, যা পূর্বে ও পরে কাউকে দেওয়া হয়নি। বনি ইসরাইলের বর্ণনা মুতাবিক তাঁর হুকুমতের সময় জেরুজালেমে একটি বিশাল ইবাদতগৃহ নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই ইবাদতগৃহ নির্মাণ নিয়ে মুসলিম ও ইহুদিদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। মুসলিমদের বিশ্বাস হচ্ছে সুলাইমান মাসজিদুল আকসাকেই পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করেছিলেন। মাসজিদুল হারাম ও মাসজিদুল আকসা আল্লাহ তাআলার আদেশে ফেরেশতারা নির্মাণ করেছিল। দুনিয়াতে সর্বপ্রথম যেই গৃহ নির্মিত হয়েছিল, তা ছিল মাসজিদুল হারাম বা কাবা। তাই কুরআনে তাকে বাইতুল আতিক বা পুরাতন গৃহ বলা হয়েছে। দুনিয়ার দ্বিতীয় মসজিদ ছিল মাসজিদুল আকসা, যা মাসজিদুল হারামের ৪০ বছর পর নির্মিত হয়।
এই দুই মসজিদ আদম-এর যুগ থেকেই প্রতিষ্ঠিত এবং এগুলো আল্লাহর দ্বীনের শিআর বা নিদর্শন। পরবর্তীকালে এই দুই মসজিদ নুহ-এর যুগে প্লাবনে ধ্বংস হয়ে যায়। অতঃপর মাসজিদুল হারামকে ইবরাহিম ও ইসমাইল দ্বিতীয়বার নির্মাণ করেন। অন্যদিকে মাসজিদুল আকসাকে ইয়াকুব নির্মাণ করেন এবং দাউদ সম্প্রসারণ করেন। সর্বশেষ সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ হয়েছিল সুলাইমান-এর যুগে জিনদের সাহায্যে।
ইহুদিদের দাবি অনুযায়ী সুলাইমান মাসজিদুল আকসা নয়; বরং তার জায়গায় একটি ইবাদতগৃহ নির্মাণ করেছিলেন, যাকে হাইকালে সুলাইমানি বলা হয়। সেখানে ইহুদিদের জন্য একটি কুরবানিগৃহ ছিল, যেখানে তারা নিজেদের কুরবানি আল্লাহর সামনে পেশ করত। ইহুদিদের দাবি অনুযায়ী হাইকালে সুলাইমানি দুবার ধ্বংস হয়। সর্বপ্রথম বাবেলের বাদশাহর হাতে ও দ্বিতীয়বার রোমান-সম্রাট টাইটাসের সময় পূর্ণভাবে ধ্বংস করে ফেলা হয়। তাই তাদের দাবি হচ্ছে, মাসজিদুল আকসা ধ্বংস করে তার জায়গায় হাইকালে সুলাইমানি পুনর্নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু মুসলিমদের দাবি হচ্ছে, ওই সমস্ত হামলায় হাইকাল নয়; বরং মাসজিদুল আকসা ধ্বংস হয়েছিল। যাকে পরবর্তীকালে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। আজও মাসজিদুল আকসা সেই জায়গায় নির্মিত, যেখানে সুলাইমান নির্মাণ করেছেন।
সুলাইমান বনি ইসরাইলের বনি ইয়াহুদা কবিলার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর ইনতিকালের পরে তাঁর কবিলা বনি ইয়াহুদা হুকুমত শুরু করে; কিন্তু অন্য কবিলাগুলো তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। ফলে ফিলিস্তিনের ভূমি দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়, একটি অংশের নাম ছিল উক্ত কবিলার দিকে সম্পৃক্ত করে ইয়াহুদা (Judah), যা দক্ষিণ দিকে অবস্থিত এবং অপর অংশের নাম ছিল 'সামারিয়া' বা 'ইসরাইল' (Israel) যা পূর্ব দিকে লেবাননে অবস্থিত ছিল। পরবর্তীকালে বনি ইয়াহুদা সামারিয়া হুকুমতকে দখল করে পুরো ফিলিস্তিনে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। যার পর থেকে বনি ইসরাইলের নাম ইহুদি হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের হিদায়াতের জন্য ধারাবাহিকভাবে নবি পাঠাতে থাকেন। আর তাদের বাদশাহরা নবিগণের নির্দেশনা মুতাবিক তাদের শাসন পরিচালনা করতে থাকে।
আস্তে আস্তে বনি ইসরাইলের মধ্যে গোমরাহি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, এমনকি ধর্মীয় অঙ্গনেও উলামায়ে সু তৈরি হতে থাকে। লোকেরা সেই গোমরাহ আলিমদের অনুসরণ করে নবিদের বিরোধিতা করা শুরু করে, যেমনটা কুরআনে কারিমে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। অবস্থা এতটাই নাজুক হয়ে যায় যে, তারা নবিদের হত্যা করে কিতাবুল্লাহর মধ্যে বিকৃতি করা শুরু করে। সেই সময়ে আল্লাহ তাআলা একজন নবি পাঠান, যিনি ছিলেন আরমিয়া। তিনি বনি ইসরাইলকে আল্লাহ তাআলার শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করেন এবং তারা যদি ভ্রষ্টতা বন্ধ না করে, তাহলে তাদের ওপর এমন জালিম বাদশাহ
চাপিয়ে দেওয়ার ভয় দেখান, যে তাদের ঘরে প্রবেশ করে সবাইকে গোলাম বানিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু বনি ইসরাইল তাদের এই নবির কথায় সতর্ক হয়নি। ফলে আল্লাহ তাআলা বাবেলে (বর্তমানের ইরাক) বসবাসকারী (Asszrians) আসিরিয়ানদের বাদশাহ 'বোখতে নসর' (Nebuchadnezzar II)-কে তাদের ওপর চাপিয়ে দেন। বোখতে নসর লক্ষ লক্ষ ইসরাইলিকে হত্যা করে এবং বাকিদেরকে গোলাম বানিয়ে নিজের সাথে ইরাক নিয়ে যায় এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রত্যেকটা ইট ধ্বংস করে দেয়। সুরা বনি ইসরাইলের শুরুর আয়াতগুলোতে তাদের ওপর আপতিত যে দুটি ধ্বংসযজ্ঞের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, অধিকাংশ মুফাসসির এই ঘটনাকে তার প্রথম ধ্বংসযজ্ঞ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।১৫
চতুর্থ যুগ : বাবেল থেকে এসে দ্বিতীয় দেশান্তর পর্যন্ত (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ থেকে ৭০ খ্রি.)
বনি ইসরাইলের পুরাতন ইতিহাসে আরমিয়া-এর সময় থেকে ইসা-এর সময় পর্যন্ত যুগকে খুব গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করা হয়। এবং সেই সময়ের প্রভাব আজকের নতুন বিশ্বেও অনুভূত হয়। এই যুগ শুরু হয়েছে খ্রি.পূ. ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে। যখন ব্যবিলনের (বাবেলের) বাদশাহ বোখতে নসর জেরুজালেমে প্রবেশ করে তা ধ্বংস করে দিয়েছিল। ইহুদিদের বর্ণনা মুতাবিক বোখতে নসর হাইকালে সুলাইমানি ধ্বংস করে বনি ইসরাইলকে গোলাম বানিয়ে নিজের সাথে নিয়ে যায়। ইহুদিদের ইতিহাসে সেই যুগকে 'বাবেলের বন্দিত্ব' (Babzlonian Captivitz)-এর যুগ বলা হয়। বোখতে নসরের গোলামির সময় কিছু গোত্র তখনকার ইরানের আবাদ হয়ে যায়। কিছু গোত্র মদিনা ও খাইবারের দিকে পলায়ন করে চলে আসে। আর বাকি অধিকাংশরাই ইরাকে থেকে যেতে বাধ্য হয়।
বাবেলের সেই গোলামির সময় বনি ইসরাইলের মধ্যে অনেক গোমরাহি জন্ম নেয়, যা পরবর্তীকালে বনি ইসরাইলকে মুসলিম থেকে ইহুদিতে পরিণত করে। ইহুদিদের ইতিহাস মুতাবিক জেরুজালেম ধ্বংসের সময় তাওরাতের সকল কপি নষ্ট হয়ে যায়। তাই পরবর্তীকালে উজাইর তাওরাতকে দ্বিতীয়বার জমা করার চেষ্টা শুরু করেন এবং পুরো তাওরাত নতুন করে একত্রিত করে ফেলেন। যার ফলে কিছু ইহুদি বাড়াবাড়ি করে তাঁকে
'আল্লাহর সন্তান' মনে করে। সেই যুগে শুরু হওয়া আরেকটি ফিতনা ছিল, বনি ইসরাইলের ভ্রান্ত আলিমদের মনগড়া বর্ণনার ভিত্তিতে 'তালমুদ' (Talmud) রচিত হওয়া। উলামায়ে সু'রা তালমুদকে তাদের ভাষায় ইলমে ওহি ও দ্বীনের উৎস হিসেবে ঘোষণা দেয়। তাদের দাবি ছিল, এই ওহি আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের দশজন বুজুর্গের ওপর সেই সময় দান করেন, যখন তারা মুসা -এর সাথে তুর পাহাড়ে গিয়েছিল। এই ওহি সিনা-ব-সিনা সেই বুজুর্গদের বংশের মধ্যেই সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু বাবেলের বন্দিত্বের যুগে তা লিপিবদ্ধ করা জরুরি ছিল; যাতে তা হারিয়ে না যায়। তালমুদ রচনাকারী ও এটাকে ইলমে ওহি গণ্যকারী আলিমদেরকে ফারিসি (Pharisee) বলা হয়। এরা বনি ইসরাইলের মধ্যে নতুন একটি দল তৈরি করে, যাদেরকে 'ফারিসিয়্যিন' (Pharisees) বলা হয়। এই দলই ইসা -এর সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেছিল। ১৬
ব্যবিলনে বন্দী থাকার সময় আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের মাঝে একজন নবি প্রেরণ করেন, যিনি দানিয়েল নামে পরিচিত। বনি ইসরাইল এই নবির কাছে আবেদন করে, যেন তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে বোখতে নসরের গোলামি থেকে মুক্তি ও পুনরায় জেরুজালেমে ফিরে যাওয়ার জন্য দুআ করেন। যাতে সেখানে গিয়ে তারা হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণ করে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করতে পারে এবং তারা সুলাইমান -এর সময়ের মতো ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
দানিয়েল তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করেন, ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে স্বপ্নের মাধ্যমে সুসংবাদ দেন। সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা ছিল, আল্লাহ তাআলা একজন বাদশাহর মাধ্যমে বনি ইসরাইলকে গোলামি থেকে মুক্তি দেবেন। যিনি তাদের পুনরায় পবিত্র ভূমিতে নিয়ে যাবেন এবং পরবর্তীকালে প্রতিশ্রুত মাসিহের হাতে তাদের বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু এই সুসংবাদ ছিল আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও মাসিহুল্লাহর অনুসরণের সাথে শর্তযুক্ত। ইহুদিদের ইতিহাসমতে, পারস্যের বাদশাহ দ্বিতীয় খসরু (Czrus) বাবেলের ওপর হামলা করে আশিরিয়্যুনদের হুকুমত খতম করে বনি ইসরাইলকে মুক্ত করে এবং পুনরায় তাদের পবিত্র ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দেয়। সেই সাথে যেসব সম্পদ বোখতে নসর জেরুজালেম থেকে নিয়ে এসেছিল, তা তাদের ফিরিয়ে দেয় এবং হাইকাল নির্মাণের ক্ষেত্রে সম্পদ দিয়ে সাহায্য করার আদেশ দেয়। কিছু মুহাক্কিকিন সেই বাদশাহকে কুরআনে বর্ণিত বাদশাহ জুলকারনাইন বলে উল্লেখ করেছেন। ১৭ এভাবেই
দানিয়েল-এর দুআর মাধ্যমে প্রাপ্ত স্বপ্নের প্রথম অংশ বাস্তবায়িত হয়। তবে দ্বিতীয় অংশ এখনো বাকি, তা হচ্ছে একজন মাসিহ আগমন করে সুলাইমান-এর মতো বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠা করা।
আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের কাছে ইসা-কে নবি ও মাসিহুল্লাহ হিসেবে প্রেরণ করেন; কিন্তু বনি ইসরাইল তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। এই ক্ষেত্রে ফারিসি আলিমরাই সবচেয়ে এগিয়ে ছিল। ইসা-এর জন্ম ও নবুওয়াতের ঘটনা কুরআনে আল্লাহ তাআলা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এখানে আমরা তার সারসংক্ষেপ আলোচনা করব।
ইসা-এর মাতা ছিলেন মারইয়াম। মারইয়াম-এর পিতার নাম কুরআন মাজিদে ইমরান বলা হয়েছে। ইমরানের স্ত্রী অর্থাৎ মারইয়াম-এর মাতা মান্নত করেছিলেন, যদি তার ছেলে-সন্তান জন্ম হয়, তাহলে তাকে আল্লাহর পথে ওয়াকফ করে দেবেন (যা ছিল তখনকার সময়ের নীতি)। কিন্তু তার গর্ভে মারইয়াম অর্থাৎ মেয়ে-সন্তান জন্ম নেয়। মারইয়াম-এর মা তার মান্নত পূরণের জন্য আপন মেয়ে মারইয়ামকেই রাহিবা বানানোর জন্য জাকারিয়া-এর কাছে নিয়ে আসেন, যিনি সেই সময় বনি ইসরাইলের নবি ছিলেন। একবার জাকারিয়া মারইয়াম-এর ঘরে গিয়ে অ-মৌসুমী ফল দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'এগুলো কোত্থেকে এসেছে?' তখন মারইয়াম বলেন, 'আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এসেছে।' এই নিদর্শন দেখে জাকারিয়া আল্লাহ তাআলার কাছে সন্তানের জন্য দুআ করেন। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ইয়াহইয়া-এর জন্মের সুসংবাদ দেন।
ইয়াহইয়া-এর জন্মের কিছু দিন পরে ইসা-এর জন্ম হয়েছিল। ইসা ছিলেন আল্লাহ তাআলার কুদরতের কারিশমা। আল্লাহ তাআলা ইসা-এর জন্মকে আদম-এর জন্মের সাথে তুলনা করেছেন।১৮ আল্লাহ তাআলা যেমনভাবে আদম-কে মাটি থেকে 'কুন' বলার মাধ্যমে সৃষ্টি করেছিলেন, তেমনই ইসা-এর সৃষ্টিও 'কুন' শব্দের মাধ্যমে
হয়েছিল। তাই ইসা-কে কালিমাতুল্লাহ বলা হয়, এ ছাড়াও তাঁকে রুহুল্লাহ এবং মাসিহুল্লাহও বলা হয়। ইসা পিতাহীন জন্মলাভ করেছেন এবং শিশুকালেই মানুষের সাথে কথা বলেছেন। বড় হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা ইসা-কে মৃতকে জীবিত করা ও জন্মান্ধকে সুস্থ করার মুজিজা দান করেন। আল্লাহ তাআলা কুরআনে তাঁকে আল্লাহর বান্দা ও রাসুল হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ইসা ও ইয়াহইয়া নিজ নিজ এলাকায় ইসলামের দাওয়াত প্রচার করতে থাকেন।
ইসা যখন বনি ইসরাইলকে দাওয়াত দিতে শুরু করেন, তখন তারা মোট পাঁচ ভাগে বিভক্ত ছিল। তাদের মধ্যে প্রথম দল ছিল 'ফারিসি ফিরকা', যারা তালমুদকে ইলমে ওহি ও আলিমদের কথাকে নবিদের বাণীর সমপর্যায়ের দলিল ও হুজ্জত মনে করত। ফারিসিদের আকিদা ছিল বোখতে নসরের হামলার পূর্বে আগমনকারী নবিদের কথা শরিয়তের দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য; কিন্তু তার পরের নবিদের কথা হুজ্জত নয়। তাদের এমন আকিদাও ছিল যে, নবিরা জীবিত থাকা সত্ত্বেও আলিমদের অনুসরণ করা সর্বাবস্থায় আবশ্যক। কোনো আলিম যদি ডান হাতকে বাম হাত বলে, তাহলে তার কথা চোখ বন্ধ করে মেনে নিতে হবে এবং তাকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না, তার সাথে তর্কও করা যাবে না।১৯
এই ফিরকার উত্থানের মূল কারণ ছিল, তারা শাসকদের বিরোধিতা করত না এবং এই আলিমরা সর্বদা শাসকদের পক্ষেই ফতোয়া দিত। ফারিসি ফিরকার লোকেরা যদিও মাসিহুল্লাহর অপেক্ষায় ছিল; কিন্তু যখন ইসা নিজেকে নবি ও মাসিহ ঘোষণা করেন, তখন এই ফিরকার অনুসারীগণই ইসা-এর সবচেয়ে কঠিন বিরোধিতা শুরু করে। তাদের বিশ্বাস ছিল প্রতীক্ষিত মাসিহ দাউদ-এর বংশ থেকে আসবে। ইসা-এর সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা এবং তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র এই ফিরকার লোকেরাই করেছিল। এদের বিরোধিতার মূল কারণ হলো, ইসা-এর দাওয়াতের ভিত্তিই ছিল তালমুদের বিরোধিতা ও ফারিসি আলিমদের রদ করা।
দ্বিতীয় দল ছিল 'সাদুকি ফিরকা' (Sadducees)। তারা ছিল অনেকটা ধর্মহীনদের মতো, যারা প্রতিদান ও সাজা এই দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ত করত। তাদের বিশ্বাস ছিল মানুষ ভালো-খারাপ যেই কাজই করুক, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই দুনিয়াতেই সব প্রতিদান দিয়ে দেবেন। এই দল তালমুদকে ইলমে ওহি হিসেবে গণ্য করত না এবং এটাকে সম্মান করত না। এই দল মাসিহের আকিদাকেও বিশ্বাস করত না। শুরুতে তালমুদের বিরোধিতার কারণে তারা ইসা-এর দাওয়াতের নিকটবর্তী হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের অন্যান্য বিশ্বাসের কারণে ইসা-এর বিরোধিতা শুরু করে।
তৃতীয় দল 'কাতিবিন ফিরকা'। তাদের কাজ ছিল তাওরাত ও তালমুদ লিপিবদ্ধ করা। এই লোকদেরকে বনি ইসরাইলে অনেক সম্মানিত মনে করা হতো; যার ফলে তখনকার সময়ে বাদশাহরাও তাদের অনেক বেশি সম্মান করত। তারা ছিল বনি ইসরাইলের লেখাপড়া জানা শিক্ষিত স্তরের অন্তর্ভুক্ত। তারাও ইসা-এর সাথি হয়নি।
চতুর্থ দল ছিল 'জিয়ালুটস' (Zealots)। তারা ছিল কিছুটা উগ্রপন্থী দল। ফারিসিদের সাথে তাদের অনেকটা মিল আছে। কিন্তু তাদের বিশ্বাস ছিল সকল ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তাআলা, তিনি ব্যতীত কারও হুকুমত গ্রহণযোগ্য নয়। তারা মাসিহের অপেক্ষায় তো অবশ্যই ছিল; কিন্তু তাদের বিশ্বাস ছিল মাসিহের অপেক্ষায় বসে থাকা যাবে না। বরং আল্লাহ তাআলার হুকুমত প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা জারি রাখতে হবে। এই দল ২২ খ্রিষ্টাব্দে রোমানদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে, যার ফলশ্রুতিতে রোমানরা জেরুজালেমের ওপর হামলা করে তা ধ্বংস করে দেয়। তারা সেখান থেকে ইহুদিদের এমনভাবে বহিষ্কার করে, যার ফলে বিংশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত তারা আর সেখানে ফিরে যেতে সক্ষম হয়নি। এই দলটিও ইসা-এর বিরোধিতা করত; কারণ তাদের দাবি অনুযায়ী তিনি রোমানদের বিরুদ্ধে নরম অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।
পঞ্চম দল ছিল 'ইসেনি ফিরকা' (Essenes)। এরা সুফিদের মতো জীবনযাপন করত। তাদের নিয়ম-শৃঙ্খলা অনেক সুসংহত ছিল। তারা ছিল ইবাদতগুজার ও সৃষ্টির সেবায় অনেক সচেষ্ট। তারা ছিল খুবই আতিথেয়তাপরায়ণ। তাদের জীবনযাপন ছিল অনেকটাই সাদাসিধা। এই দলের লোকেরা ইসা-এর দাওয়াত সবচেয়ে বেশি কবুল করেছিল এবং তাঁর সাথি হয়েছিল।
যখন ইসা বনি ইসরাইলের মাঝে দাওয়াতের কাজ শুরু করেন, তখন প্রায় পুরো বিশ্ব রোমান মুশরিকদের কব্জায় ছিল। ফিলিস্তিনও তখন রোম সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। যেখানের বাদশাহ বাহ্যিকভাবে ইহুদি হলেও বাস্তবে রোম প্রশাসনের অনুগত ছিল। ফারিসি ফিরকার আলিমদের পরামর্শে ও রাজনৈতিক বিরোধিতার ভয়ে রোমান প্রশাসন ইসা-কে হত্যার পরিকল্পনা করে। আল্লাহ তাআলা তখন ইসা-কে আসমানে উঠিয়ে নেন। রোমান সেনারা যখন তাঁর গৃহের নিকটে পৌঁছে, তখন আল্লাহ তাআলা ইসা-এর এক সহকারীকে তাঁর মতো বানিয়ে দেন, যাকে রোমানরা গ্রেফতার করে শূলিতে চড়ায়। এক বর্ণনামতে, এই ব্যক্তি ছিল সেই হাওয়ারি, যিনি আখিরাতের বিনিময়ে ইসা-এর জন্য কুরবান হতে প্রস্তুত ছিলেন। আরেক বর্ণনামতে, সে ছিল সেই হাওয়ারি, যে দুনিয়ার সম্পদের লোভে ইসা-এর খবর রোমানদের কাছে পৌছিয়েছিল। ইসা-কে আল্লাহ তাআলা আসমানে উঠিয়ে নেন এবং তাঁর পরিবর্তে রোমানরা তাঁর সাদৃশ্যপূর্ণ ব্যক্তিকে শূলিতে চড়িয়ে দেয়। সেই সময় থেকে এখনো ইহুদিদের দাবি হচ্ছে, ইসা ছিলেন মিথ্যা নবুওয়াত ও মিথ্যা মাসিহের দাবিদার, যাকে হত্যা করা আবশ্যক।
ইহুদিদের এই সমস্ত ঘটনার ফলশ্রুতিতে তাদের ওপর আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয়বার আরেক বাদশাহ চাপিয়ে দেন, যে ছিল রোমান-সম্রাট টাইটাস। সে ৭০ খ্রিষ্টাব্দে ইহুদিদের রোমানবিরোধী আন্দোলন দমানোর জন্য নিজ বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করে এবং দ্বিতীয়বার জেরুজালেম সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু এইবার দেশান্তর হওয়ার পর ইহুদিরা বিংশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত আর উঠে দাঁড়াতে সক্ষম হয়নি। মুফাসসিরদের রায় মুতাবিক এটা ছিল তাদের ওপর আপতিত দুই ফাসাদের দ্বিতীয় ফাসাদ, যার আলোচনা সুরা বনি ইসরাইলের শুরুর আয়াতগুলোতে করা হয়েছে। ২০ ৭০ খ্রিষ্টাব্দে ফিলিস্তিন থেকে বনি ইসরাইলকে বের করে দেওয়ার ঘটনার মাধ্যমে ইহুদিদের পুরাতন ইতিহাস শেষ হয়ে নতুন ইতিহাসের সূচনা হয়।
টিকাঃ
৫. সুরা ইউসুফের শানে নুজুলের অধীনে মুফাসসিরগণ ইহুদিদের প্রশ্নের আলোচনা করেছেন। অনেক মুফাসসির লিখেছেন, ইহুদিরা ইউসুফ -এর ঘটনা জিজ্ঞেস করেছিল। আল্লামা বাগাবি যে প্রশ্নের কথা বলেছেন, এখানে লেখক সেটা উল্লেখ করেছেন। আল্লামা বাগাবি বলেন, 'ইহুদিরা আল্লাহর রাসুলকে ইউসুফ -এর ঘটনা কিংবা বলা হয়, ইয়াকুবের ছেলেরা কিনান থেকে মিশরে গমনের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে; তাই আল্লাহ তাদের জন্য ইউসুফ -এর কাহিনি বর্ণনা করেন।' (মাআলিমুত তানজিল)
৬. وَإِذْ نَجَيْنَاكُمْ مِنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَسُومُونَكُمْ سُوءَ الْعَذَابِ يُذَبِّحُونَ أَبْنَاءَكُمْ وَيَسْتَحْيُونَ نِسَاءَكُمْ وَفِي ذَلِكُمْ بَلَاءُ مِنْ رَبِّكُمْ عَظِيمُ 'আর (স্মরণ করো) সে সময়ের কথা, যখন আমি তোমাদের মুক্তি দান করেছি ফিরআওনের লোকদের কবল থেকে, যারা তোমাদের কঠিন শাস্তি দান করত; তোমাদের পুত্রসন্তানদের জবাই করত এবং তোমাদের স্ত্রীদের অব্যাহতি দিত। বস্তুত, তাতে ছিল তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে মহা পরীক্ষা। (সুরা আল-বাকারা, ২:৪৯)
৭. وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمَّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ - فَالْتَقَطَهُ آلُ فِرْعَوْنَ لِيَكُونَ لَهُمْ عَدُوًّا وَحَزَنًا إِنَّ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا كَانُوا خَاطِئِينَ - وَقَالَتِ امْرَأَتُ فِرْعَوْنَ قُرَّتُ عَيْنٍ لِي وَلَكَ لَا تَقْتُلُوهُ عَسَى أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ 'আমি মুসা-জননীকে আদেশ পাঠালাম যে, “তাকে স্তন্য দান করতে থাকো। অতঃপর যখন তুমি তার সম্পর্কে বিপদের আশঙ্কা করো, তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করো এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবো এবং তাকে পয়গম্বরগণের একজন করব।" অতঃপর ফিরআওন- পরিবার মুসাকে কুড়িয়ে নিল; যাতে সে তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়ে যায়। নিশ্চয় ফিরআওন, হামান, ও তাদের সৈন্যবাহিনী অপরাধী ছিল। ফিরআওনের স্ত্রী বলল, "এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি, তাকে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি।" প্রকৃতপক্ষে পরিণাম সম্পর্কে তাদের কোনো খবর ছিল না।' (সুরা আল-কাসাস, ২৮: ৭-৯)
৮. وَإِذْ فَرَقْنَا بِكُمُ الْبَحْرَ فَأَنجَيْنَاكُمْ وَأَغْرَقْنَا آلَ فِرْعَوْنَ وَأَنتُمْ تَنْظُرُونَ 'আর যখন আমি তোমাদের জন্য সাগরকে দ্বিখণ্ডিত করেছি, অতঃপর তোমাদেরকে বাঁচিয়ে দিয়েছি এবং ডুবিয়ে দিয়েছি ফিরআওনের লোকদের; অথচ তোমরা দেখছিলে।' (সুরা আল-বাকারা, ২: ৫০)
৯. وَإِذْ وَاعَدْنَا مُوسَى أَرْبَعِينَ لَيْلَةً ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَنتُمْ ظَالِمُونَ . 'আর যখন আমি মুসার সাথে ওয়াদা করেছি চল্লিশ রাত্রির, অতঃপর তোমরা গোবৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলে তার অনুপস্থিতিতে। বস্তুত, তোমরা ছিলে জালিম। (সুরা আল-বাকারা, ২: ৫১)
১০. এই ঘটনার আলোচনা সুরা আল-মায়িদার ২০-২৩ নং আয়াতে এসেছে।
১১. তাফসিরুত তাবারি, জাদুল মাসির, তাফসিরু ইবনি কাসির-সহ অন্যান্য তাফসিরের গ্রন্থ দেখা যেতে পারে। তবে কিছু রিওয়ায়াতে কালিবের নাম কালব ও কালুবও এসেছে।
১২. قَالَ فَإِنَّهَا مُحَرَّمَةٌ عَلَيْهِمْ أَرْبَعِينَ سَنَةً يَتِيهُونَ فِي الْأَرْضِ فَلَا تُأْسَ عَلَى الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ . তিনি বললেন, "এ দেশ চল্লিশ বছর পর্যন্ত তাদের জন্য হারাম করা হলো। তারা ভূপৃষ্ঠে উদভ্রান্ত হয়ে ফিরবে। অতএব, আপনি অবাধ্য সম্প্রদায়ের জন্য দুঃখ করবেন না।" (সুরা আল-মায়িদা, ৫: ২৬)
১৩. সুরা আল-বাকারা, ২: ২৪৬-২৫২।
১৪. সহিহুল বুখারি, কিতাবুল মাগাজি, বদরের সদস্য সংখ্যার অধ্যায়।
১৫. কুরআনে সুরা বনি ইসরাইলের ৪-৭ নং আয়াতে এই দুই ফিতনার আলোচনা এসেছে। কিন্তু কুরআন কিংবা হাদিসে এই দুই ফিতনার বিস্তারিত আলোচনা নেই। সাহাবিদের আলোচনায় এসেছে; কিন্তু সেখানেও মতানৈক্য রয়েছে। কেউ জালুতের হামলাকে প্রথম ফিতনা বলেছেন আবার কেউ কেউ বাবেলের বাদশাহ 'সানহারিব'-এর আলোচনা এনেছেন। কতক বোখতে নসরের কথা বলেছেন, যাদের মধ্যে ইবনে ইসহাক রয়েছেন। লেখক এখানে ইবনে ইসহাকের মতটি গ্রহণ করেছেন। অনেকে বোখতে নসরের হামলাকে দ্বিতীয় বলেছেন। (বিস্তারিত তাফসিরে তাবারি)। সারকথা হচ্ছে, নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাবে না। তবে মুফাসসিরদের বর্ণনা, ইসরাইলি রিওয়ায়াত ও ইতিহাস অধ্যয়নের দ্বারা বোঝা যায়, প্রথম ফিতনা দ্বারা বোখতে নসরের হামলা উদ্দেশ্য নেওয়াটাই প্রধান্যপ্রাপ্ত মত।
১৬. এই কারণেই নিউ টেস্টামেন্টে ইসা -এর কথা ফারিসিদের বরাতে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানের খ্রিষ্টানরা যাদের অধিকাংশ প্রটেস্টান্ট এই ফারিসিদেরকেও দুই ভাগ করে। এক ভাগ ভালো, অপর ভাগ খারাপ; যাতে ইহুদিদের রক্ষা করা যায়।
১৭. কুরআন মাজিদে জুলকারনাইনের শুধু ভালো কাজ ও যোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। হাদিস শরিফেও বিস্তারিত কোনো আলোচনা আসেনি। এই কারণেই তার ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না, শুধু ধারণা ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই কথা বলতে হবে। ইতিহাস ও ইসরাইলি বর্ণনা সম্পর্কে জ্ঞাত সাহাবিদের মাঝেও তাকে নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস বলেছেন, সে ছিল আব্দুল্লাহ বিন দাহহাক বিন মাদ। মুআজ বিন জাবাল বলেছেন, 'তার নাম ছিল ইস্কান্দার রুমি।' ইবনে ইসহাক বলেছেন, 'তার নাম মারজাবান বিন মারদাবাহ ইউনানি ছিল।' ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ ও ইবনে হিশাম বলেন, 'তার নাম ছিল ইস্কান্দার মাকদুনি। পরবর্তী অধিকাংশরাই তাকে ইস্কান্দারে মাকদুনি (মহান ইস্কান্দার) মনে করত।' (এই মত গ্রহণে সমস্যা রয়েছে; কেননা, ইস্কান্দার মাকদুনির ব্যাপারে প্রসিদ্ধ যে, সে মুশরিক ছিল। তবে আল্লামা আলুসি স্বীয় তাফসির-গ্রন্থে এই কথা অস্বীকার করেছেন)। বর্তমানে নতুন গবেষণা সামনে এসেছে, যেখানে বাদশাহ জুলকারনাইনকে পারস্য-রোমের শাসক দ্বিতীয় খসরু (Czrus the Great) বলা হয়েছে। তার ভালো কাজগুলো অনেক প্রসিদ্ধ ছিল এবং সে রোম ও পারস্য দুই বিশাল সাম্রাজ্যের ওপর হুকুমত প্রতিষ্ঠা করেছে। সে দ্যানিয়েল-এর সুহবত লাভ করেছে এবং তাঁর পরামর্শে বনি ইসরাইলকে ফিলিস্তিনে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। এই তাহকিক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ স্বীয় তাফসির-গ্রন্থ 'তারজুমানে কুরআন'-এর মাঝে এনেছেন। লেখক এখানে এই তাহকিককে গ্রহণ করেছেন।
১৮. إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ الله كَمَثَلِ آدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تَرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ تال 'নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট ইসার দৃষ্টান্ত হচ্ছে আদমেরই মতো। তাকে মাটি দিয়ে তৈরি করেছিলেন এবং তারপর তাকে বলেছিলেন, "হয়ে যাও," সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেলেন।' (সুরা আলি ইমরান, ৩:৫৯)
১৯. এরা সেই সমস্ত ভ্রান্ত আলিম ছিল, যাদের অনুসরণে বনি ইসরাইল নবিদের মিথ্যাবাদী বলেছে এবং হত্যাও করেছে। এখানে সাধারণ পাঠক যেন উম্মতে মুহাম্মাদির আলিমদের এদের সাথে তুলনা না করে। কেননা, আল্লাহর নবি-এর অফাতের পর আলিমরাই নববি উত্তরাধিকার সামলিয়ে রেখেছেন এবং তাদের মেহনতের ফলেই আজ দ্বীন সংরক্ষিত। তাদের ওপর আল্লাহ তাআলার রহমত বর্ষিত হোক। অবশ্যই এই উম্মতের মধ্যেও কিছু আলিম গোমরাহি ছড়াচ্ছে, যারা মূলত বনি ইসরাইলের আলিমদেরই অনুকরণ করছে।
২০. মুফাসসিরদের মধ্যে আল্লামা আবুল লাইস সমরকন্দি, আল্লামা বাগাবি, আল্লামা ইবনে আদিল, আল্লামা আলুসি, ইবনে আশুর এই ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। এর উৎস হচ্ছে কালবির রিওয়ায়াত, যেমনটা সমরকন্দি তাফসিরে বাহরুল উলুমে আলোচনা করেছেন। আরবিতে টাইটাসকে তাইতুস অথবা তাতবুস বলা হয়ে থাকে।
📄 বনি ইসরাইল কেন গোমরাহ হয়েছিল?
বনি ইসরাইলের নতুন ইতিহাসের দিকে যাওয়ার পূর্বে আমাদের জানা উচিত বনি ইসরাইলের গোমরাহির মূল কারণগুলো কী ছিল। আলিমদের মত অনুযায়ী বনি ইসরাইলের গোমরাহির মূল উৎস ছিল নবিদের শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং গাইরুল্লাহর কথাকে ওহির নির্দেশনার ওপর প্রাধান্য দেওয়া। সুলাইমান -এর পর ইসরাইলি সমাজে শিরক, বিদআতসহ বিভিন্ন চারিত্রিক অধঃপতন ও সমস্যা ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
আল্লাহ তাআলা তাদের সংশোধনের জন্য একের পর এক নবি প্রেরণ করেন। যদি আমরা নবিদের চেষ্টা-প্রচেষ্টার ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব যে, সেই নবিদের দাওয়াত চারটি মূল বিষয় নিয়ে ছিল। এক. আল্লাহ তাআলার সাথে চুক্তি ভঙ্গ করা থেকে বিরত থাকা। দুই. উলামায়ে সু'দের আনুগত্য থেকে বিরত থাকা। তিন. বনি ইসরাইলের শিরক-বিদআতের বিরোধিতা। চার. বনি ইসরাইলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া চারিত্রিক সমস্যা; যেমন: মিথ্যা, হিংসা, ঘৃণা, জিনা, সুদ ও জুলুম থেকে বাধা দেওয়া।
প্রথম কারণ : আল্লাহর সাথে চুক্তি ভঙ্গ করা
বনি ইসরাইলের ইতিহাসে আল্লাহ তাআলার সাথে চুক্তি ভঙ্গের অনেক ঘটনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ফিরআওনের কবল থেকে নাজাত দিয়ে তাদের জন্য তাওরাত নাজিল করেছেন, তা সত্ত্বেও তারা বাছুরের পূজা শুরু করে। আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য মান্না-সালওয়া পাঠিয়েছেন; কিন্তু তারা অন্যান্য খাবারের লোভ করে। পরবর্তী সময়ে
আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শহর দখল করার জন্য ইসতিগফার পড়তে পড়তে শহরে প্রবেশের আদেশ দেন; কিন্তু তারা ইসতিগফারের শব্দ পরিবর্তন করে অহংকারের সাথে প্রবেশ করে। যখন আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর জিহাদ আবশ্যক করেন এবং ফিলিস্তিন বিজয়ের আদেশ দেন, তখন তারা এই কথা বলে অস্বীকার করে যে, সেখানে অত্যাচারী গোত্র রয়েছে এবং আমরা তাদের সাথে লড়াইয়ের ক্ষমতা রাখি না। যখন তালুতকে সিপাহসালার নির্ধারণ করে বলা হলো, তাকে মান্য করো, তখন তারা তাকে অপছন্দ করে আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে প্রমাণ চাওয়া শুরু করে। যখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এক কোষ পানি পানের অনুমতি দেন, তখন তারা পেটভরে পান করে।
সুলাইমান -এর পর যখন বনি ইসরাইলের মধ্যে অনেক নাফরমানি ছড়িয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের হিদায়াতের জন্য ধারাবাহিক নবি পাঠাতে থাকেন, যাঁরা তাদের ইসলাহের চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু বনি ইসরাইল সেই নবিদের কথা মানার পরিবর্তে উলামায়ে সু'দের কথা মান্য করতে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে শাস্তিস্বরূপ খ্রি.পৃ. ৪শ বছর পূর্বে বোখতে নসরকে বনি ইসরাইলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, যে তাদেরকে গোলামে পরিণত করে। বনি ইসরাইল নবির কাছে আবারও আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের ওয়াদা করে, তখন আল্লাহ তাআলা জুলকারনাইনের মাধ্যমে তাদেরকে বাবেল থেকে নাজাত দেন। কিন্তু ফিলিস্তিনে ফিরে আসার পর তারা পুনরায় আল্লাহ তাআলার নাফরমানি শুরু করে। এমনকি ঈসা -এর চরম বিরোধিতা করে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত তারা করে। যার ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে (مَغْضُوب) বা গজবগ্রস্ত ঘোষণা দেন।
দ্বিতীয় কারণ: নবিদের পরিবর্তে উলামায়ে সু'দের আনুগত্য
বনি ইসরাইলের গোমরাহির একটি বড় কারণ ছিল নবিদের অনুসরণের পরিবর্তে খাহিশাতপূজারি ভ্রষ্ট আলিমদের আনুগত্য করা। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ সুরা তাওবার তাফসিরে লিখেছেন, বনি ইসরাইল তাদের আলিমদের আনুগত্য করে তাদেরকে রবের স্থানে বসিয়েছিল এবং তাদের সমস্ত কথাকে ওহির সমপর্যায়ের গণ্য করে অনুসরণ করত।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে সেই ভ্রান্ত আলিমরা তাদের কাছে নবিদের থেকেও উঁচু মর্যাদা অর্জন করেছিল? এর কারণ দুটো, প্রথম কারণ দ্বীনের মূল উৎস পরিবর্তন করে দেওয়া। এবং দ্বিতীয় কারণ উলামায়ে সু'দের পক্ষ থেকে নবিদের ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ রটানো।
বনি ইসরাইলের কাছে আল্লাহর কিতাব ছিল তাওরাত, যা একটি পরিপূর্ণ শরিয়াহ। বনি ইসরাইলের দ্বীনের দ্বিতীয় উৎস ছিল নবিগণ এবং তাঁদের কাছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নাজিলকৃত সহিফা ও কিতাবসমূহ। আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন সময় সেগুলো তাঁদের ওপর নাজিল করেছেন, যার মধ্যে জাবুর ও ইনজিল অর্ন্তভুক্ত। তখন এগুলো ব্যতীত দ্বীনের
আর কোনো উৎস ছিল না। বনি ইসরাইল থেকে আল্লাহ তাআলার কাম্য এটাই ছিল যে, তারা সেই কিতাব ও সহিফাগুলোর শিক্ষার ওপর আমল করবে। বোখতে নসরের গোলামির সময় বনি ইসরাইল তাওরাতকে হিফাজত করতে পারেনি। ইহুদিদের বর্ণনা অনুযায়ী বোখতে নসর তাওরাতের সমস্ত কপি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ফলে বাবেলে গোলামির জীবন অতিবাহিত করার সময় কিতাবুল্লাহ তাদের সামনে থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উজাইর আবার তাওরাতকে একত্রিত করেন। তাঁর এই কাজের ফলে কিছু ইহুদি তাঁকে আল্লাহর সন্তান ডাকা শুরু করে।
যখন তাওরাত তাদের সামনে অনুপস্থিত ছিল, তখন দ্বীনের উৎসের মধ্যে আরও একবার পরিবর্তন সাধন হয়। ভ্রান্ত আলিমরা সুযোগ পেয়ে যায় এবং তারা মানুষকে ওহির মূল শিক্ষার পরিবর্তে নিজেদের পক্ষ থেকে বানানো কথা শিক্ষা দেওয়া শুরু করে। দ্বীনের উৎস ছিল তাওরাত, যা আল্লাহ তাআলা মুসা -কে তুর পাহাড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাওরাত না থাকায় দ্বীনের এই উৎসের আলোচনার পরিবর্তে আলিমরা নিজেদের বানানো কাহিনি বর্ণনা করতে শুরু করে। তাদের তালমুদকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য যে কাহিনি বর্ণনা করে, তা ছিল এমন, 'মুসা যখন আল্লাহ তাআলার আহ্বানে তুর পাহাড়ে যান, তখন বনি ইসরাইলের বড় বুজুর্গরাও আল্লাহ তাআলার সাক্ষাৎলাভের ইচ্ছা পোষণ করেন। ফলে মুসা তাদের দশজনকে তুর পাহাড়ে নিয়ে যান। তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকেও হিদায়াত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ইলম দান করেন। এই ইলম কখনোই লিখিত হয়নি; বরং তা শুধু তাদের স্মৃতিতে সংরক্ষিত ছিল। এই ইলম তারা পরবর্তীদের মুখস্থ করায়, যার ধারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে আসছিল। বোখতে নসরের গোলামির সময় সেই ইলমকে লিপিবদ্ধ করার নামে ভ্রান্ত আলিমরা তালমুদ লিখে দেয়; যাতে তা ধ্বংস না হয়ে যায়। আর এভাবেই দ্বীনের উৎস একের জায়গায় দুটি হয়ে যায়। অর্থাৎ একটি তাওরাত ও দ্বিতীয়টি তালমুদ। এটাই ছিল বনি ইসরাইলের সবচেয়ে বড় গোমরাহি। তালমুদ কোনো ওহি বা দ্বীনের উৎস ছিল না; বরং তা ছিল উলামায়ে সুদের মনগড়া বিধানাবলি, যা তারা বনি ইসরাইলের সামনে দ্বীনের উৎস হিসেবে পেশ করেছিল।
অপরদিকে সেই ভ্রান্ত আলিমরা তালমুদ রচনার অপরাধ থেকে আরও অগ্রসর হয়ে নবিদের কাজের বিরুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডা শুরু করে। এই অপপ্রচারের উদ্দেশ্য ছিল নবিদের সাধারণ মানুষের স্তরে নিয়ে আসা, যারা ভুল ও গুনাহ করতে পারে (নাউজুবিল্লাহ)। কারণ, যদি নবিদের গুনাহ ও ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে ওহির মধ্যেও ভুল হতে পারে। তাই আলিম ও নবির মধ্যে কোনো বিশেষ পার্থক্য নেই। এই প্রোপাগাণ্ডাকে প্রমাণ করার জন্য নুহ -কে শরাব পানকারী বলে প্রচার করে (নাউজুবিল্লাহ), লুত -কে অশ্লীল কাজে লিপ্ত হওয়ার অপবাদ দেয় (নাউজুবিল্লাহ), ইয়াকুব -কে নিজের ভাইকে ধোঁকা দেওয়ার মিথ্যা অপবাদ দেয় (নাউজুবিল্লাহ), ইউসুফ, দাউদ, সুলাইমান -এর নামে মিথ্যা প্রেমকাহিনি প্রচার করে (নাউজুবিল্লাহ)। এমনকি সেই ইহুদিদের আলিমদের দাবি অনুযায়ী সুলাইমান বিবির মহব্বতে মূর্তিপূজা শুরু করেন (নাউজুবিল্লাহ)। এগুলো সব মিথ্যা অভিযোগ ও প্রোপাগাণ্ডা। এই সবকিছুর উদ্দেশ্য ছিল তাওরাত ও নবিদের সম্মান কমিয়ে ভ্রান্ত আলিমদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা।
উলামায়ে সু'দের এই চক্রান্ত সফল হওয়ার পর আস্তে আস্তে তালমুদ তাওরাত থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া শুরু হয় এবং নবির স্থান ভ্রান্ত আলিমরা দখল করে নেয়। তখনকার সময়ে নাজিলকৃত কিতাব ও সহিফাগুলো অধ্যয়ন করলে সহজেই বোঝা যায় যে, বোখতে নসরের হামলার কিছু কাল পূর্ব থেকে পরের সকল নবির মূল দাওয়াত সেই আলিমদের বিরুদ্ধে ছিল। এ ছাড়াও সেই কিতাবগুলো অধ্যয়নের পর এমনটাও অনুভূত হয় যে, বনি ইসরাইলের নবিগণ ও উলামায়ে সু'দের মধ্যে এক ধারাবাহিক দ্বন্দ্ব চলমান ছিল। জাকারিয়া, ইয়াহইয়া ও ঈসা -এর জমানায় এই দ্বন্দ্ব অনেক বৃদ্ধি পায়। তখন ভ্রান্ত আলিমরা নবিগণকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তাঁদের হত্যা পর্যন্ত শুরু করে। ভ্রান্ত আলিমদের অধীনে বনি ইসরাইল যেসব অপরাধ করেছিল, তার আলোচনা কুরআনে বিস্তারিত এসেছে। যেমন হককে গোপন করা, হককে বাতিলের সাথে মিলিয়ে ফেলা, নবিদের হত্যা করা ও কিতাবুল্লাহর মধ্যে বিকৃতি ঘটানো ইত্যাদি। এগুলো ছিল এমন অপরাধ, যার মাধ্যমে সত্য দ্বীনকে মানুষের দৃষ্টি থেকে গোপন করে রাখা হয়। ফলে সত্যপন্থী আলিমরা দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং ভ্রান্ত আলিমরা বিজয়ী হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ তাআলার কিতাব ও নবিদের নির্দেশনা ত্যাগ করে তালমুদের বানানো বিধান পালনের ফলে তারা সত্য দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে এক নতুন ধর্মের দিকে চলতে শুরু করে, যাকে আজ ইহুদিবাদ বলা হয়।
তৃতীয় কারণ : বনি ইসরাইলের মধ্যে শিরক ও বিদআতের প্রাদুর্ভাব
বনি ইসরাইলের গোমরাহির তৃতীয় কারণ ছিল তাদের মধ্যে শিরক ও বিদআত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া। আর তাদের মাঝে শিরক-বিদআত ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ ছিল সত্যপন্থী আলিমদের পরিবর্তে ভ্রান্ত আলিমদের আনুগত্য। এর ফলে সমাজে এমন সব সভ্যতা-সংস্কৃতি চালু হয়, যার সাথে আল্লাহর বিধান ও নবিদের দাওয়াতের কোনো সম্পর্ক ছিল না। যা বনি ইসরাইলকে আস্তে আস্তে দ্বীন থেকে সরিয়ে দেয়।
দ্বিতীয় প্রকারের শিরক ছিল আল্লাহ তাআলার সত্তা ও সিফাতের মধ্যে শিরক। যেমন উজাইর -কে আল্লাহ তাআলার সন্তান বলা। আরও কিছু ভয়াবহ শিরক ছিল, যা ফিলিস্তিনের অধিবাসীদের থেকে এসেছিল। আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে ফিলিস্তিন বিজয় করে সেখানে বসবাসকারী জাতিকে পূর্ণভাবে নিঃশেষ করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু বনি ইসরাইল তাদের হত্যা না করে ছেড়ে দেয়, অতঃপর সময়ের সাথে সাথে সেই জাতির সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে তাদের শিরকগুলো গ্রহণ করে নেয়।
ফিলিস্তিনের পূর্বের অধিবাসীরা ছিল মুশরিক, যাদের সবচেয়ে বড় মূর্তির নাম ছিল আইল ও তার স্ত্রীর নাম আশিরা। এদের থেকে আরও মূর্তি জন্ম নেয়, যেগুলোকে অনেক কাজের দায়িত্বশীল মনে করা হতো। কোনোটা রিজিকের মূর্তি ও কোনোটা বিপদদাতা ইত্যাদি (নাউজুবিল্লাহ)। এগুলোর মধ্যে বা'ল (Baal) মূর্তিটি সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে গণ্য হতো, যার বিবির নাম ছিল আস্তারাত (Ashtoreth)। বনি ইসরাইলের ইতিহাসে এই কথা স্বীকৃত যে, তারা পরিপূর্ণভাবে বা'ল ও আস্তারাত পূজায় লিপ্ত ছিল। আল্লাহ তাআলা তাদের হিদায়াতের জন্য ইলইয়াস-কে প্রেরণ করেন এবং উনার মূল দাওয়াত ছিল বা'ল পূজার বিরুদ্ধে। ২২
শিরক ও কুফরের আরেকটি প্রকার বনি ইসরাইলের মধ্যে ব্যাপকতা লাভ করে। সেটা হলো জাদু শিক্ষা ও নিজেদের স্বার্থে তা ব্যবহার করা। এই সমস্যা অনেক ব্যাপকতা লাভ করে, যার আলোচনা কুরআনের সুরা বাকারাতে এসেছে। এই জাদু দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ পর্যন্ত ঘটাত। ২২
টিকাঃ
২২. وَإِنَّ إِلْيَاسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ - إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَلَا تَتَّقُونَ - أَتَدْعُونَ بَعْلًا وَتَذَرُونَ أَحْسَنَ الْخَالِقِين . 'নিশ্চয় ইলইয়াস ছিলেন রাসুল। যখন সে তার সম্প্রদায়কে বলল, "তোমরা কি ভয় করো না? তোমরা কি বা'ল দেবতার ইবাদত করবে এবং সর্বোত্তম স্রষ্টাকে পরিত্যাগ করবে।” (সুরা আস-সাফফাত, ৩৭: ১২৩-১২৫)
২২. দেখুন, সুরা বাকারার ১০২ নং আয়াত।
📄 ইহুদিদের পুরাতন ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত বিশ্বাসসমূহ
ভ্রান্ত আলিমরা যখন বনি ইসরাইলের দ্বীনের উৎস পরিবর্তন করে দিতে সক্ষম হয়, তখন তারা দ্বীনের মধ্যে নিজেদের বানানো বিশ্বাস ছড়ানো শুরু করে। তারা ইহুদিদের নতুন প্রজন্মকে বলা শুরু করে যে, ইহুদিরাই আল্লাহ তাআলার বাছাইকৃত জাতি এবং অন্যদের থেকে অনেক ঊর্ধ্বে ও উত্তম। তাই দুনিয়াকে শাসন করার অধিকার শুধু ইহুদিদের। উলামায়ে সু'রা নতুন প্রজন্মকে আরও বিশ্বাস করায় যে, ফিলিস্তিন ভূখণ্ড আল্লাহ তাআলা চিরদিনের জন্য বনি ইসরাইলকে দিয়ে দিয়েছেন। এই ভূমিতে শুধুই তাদের অধিকার রয়েছে। আর যারা তাদের থেকে এই ভূমি ছিনিয়ে নিয়েছে, সেই খ্রিষ্টান ও মুসলিমরা হচ্ছে জালিম। তাই এই ভূমি ফিরিয়ে আনা তাদের সবচেয়ে বড় সাওয়াবের কাজ। তারা নতুন প্রজন্মকে আরও শিক্ষা দেয় যে, তাদের মূল ইবাদতগৃহ হচ্ছে হাইকালে সুলাইমানি। যে হাইকালের ওপর মুসলিমরা মাসজিদুল আকসা বানিয়ে রেখেছে। সেটাকে ধ্বংস করে হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণ করা ইহুদিদের ইমানের অংশ।
উলামায়ে সু'রা আসমানি কিতাব থেকে নবিদের সুসংবাদগুলো দেখিয়ে নতুন প্রজন্মকে বলে যে, বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরায় তাদের হাতে আসবে এবং হাইকালে সুলাইমানি দ্বিতীয়বার প্রতিষ্ঠিত হবে। যার পর তাদের হাতে সুলাইমান ⚡-এর মতো বৈশ্বিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হবে। যার প্রেক্ষিতেই নতুন প্রজন্ম এই বিশ্বাসকে ধারণ করে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়েছে। তারা নবিদের আনীত কিতাব তাওরাত, জাবুর, ইনজিলসহ সহিফাগুলোর হিদায়াত থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। ফলে এখন শুধু তাদের কাছে রয়েছে বনি ইসরাইলের বংশীয় অধিকারের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনের ভূমির মিথ্যা দাবি, মিথ্যা মাসিহের দাবি, মিথ্যা হাইকালে সুলাইমানির দাবি এবং সুলাইমান ⚡-এর মতো বৈশ্বিক ক্ষমতার স্বপ্ন। এটাই আজকের ইহুদিবাদ ও তাদের ধর্ম, যার সাথে নবিদের শিক্ষা ও আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত হিদায়াতের দূরতম সম্পর্ক নেই।
এখন আমরা ইহুদিদের মিথ্যা বিশ্বাসগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করব:
• আল্লাহ তাআলার প্রিয় জাতি
• অ-ইহুদিদের ব্যাপারে গোয়েম বিশ্বাস
• প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস
• দানিয়েলের দুআ ও মহান লক্ষ্য
• ইলিয়াসংক্রান্ত বিশ্বাস
• মাসিহসংক্রান্ত বিশ্বাস
• হাইকালে সুলাইমানি-সংক্রান্ত বিশ্বাস
আল্লাহ তাআলার প্রিয় জাতি
ইহুদিরা নিজেদের পুরাতন ইতিহাস থেকে প্রথম যে বিশ্বাস গ্রহণ করেছে তা হলো, আল্লাহ তাআলা সমস্ত বনি আদমের মধ্যে শুধু বনি ইসরাইল বংশকে বিশেষভাবে নির্বাচন করেছেন কোনো শর্ত ছাড়াই। অর্থাৎ বনি ইসরাইল যা-ই করুক আল্লাহ তাআলার প্রিয় ও বাছাইকৃত জাতি হিসেবেই থাকবে। এই দুনিয়াকে আল্লাহ তাআলা শুধু ইহুদিদের জন্যই সৃষ্টি করেছেন, কেননা তারা নবিদের সন্তান। এই দাবি প্রমাণের জন্য তারা তাদের ওপর নাজিল হওয়া আল্লাহ তাআলার নিয়ামতগুলো নিয়ে আলোচনা করে। যেমন তাদেরকে ফিরআওন থেকে নাজাত দিয়েছেন। সিনাই মরুতে মান্না-সালওয়া পাঠিয়েছেন। মরুতে পানির ব্যবস্থাস্বরূপ বারোটি ঝরনা প্রবাহিত করেছেন। পুনরায় তাদেরকে ফিলিস্তিনের বাদশাহি ফিরিয়ে দিয়েছেন; যাতে সেখানে বসবাস করতে পারে। যখনই ইহুদিদের সামনে কোনো সমস্যা তৈরি হয়েছে, তাদের জন্য কোনো মাসিহ প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের সেই সমস্যা সমাধানের অসিলা হয়েছেন। সেই মাসিহদের মধ্যে রয়েছেন মুসা, তালুত, দাউদ, বাদশাহ জুলকারনাইন এবং সর্বশেষ আরেকজন মাসিহ রয়েছে, যাকে তারা মাসিহ দাজ্জাল বলে ডাকে।
আল্লাহ তাআলা কুরআনের কয়েক জায়গায় তাদের এই ভুল বিশ্বাসের ভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন।২৩ আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে নিজ নিয়ামত স্মরণ করিয়ে বলেছেন যে, এই ইহসান বনি ইসরাইলের সেই সমস্ত মুসলিমের জন্য ছিল, যারা নবিদের আনুগত্য করত। যখন তাদের থেকে কোনো ভুল প্রকাশিত হতো, তখন তারা গুনাহ থেকে ইসতিগফার করে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে লেগে যেত। আল্লাহ তাআলা এই নিয়ামতের কথা বর্ণনার পাশাপাশি বনি ইসরাইলের অবাধ্য ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে নিয়ামতের অস্বীকার, জিহাদ ত্যাগ করা, নবিদের নাফরমানি, উলামায়ে সু'দের আনুগত্য, নবিদের হত্যা করা, কিতাবুল্লাহতে বিকৃতি ও হক গোপন করার কারণে তাদেরকে অপরাধীও সাব্যস্ত করেছেন।
আলিমরা বলেছেন, আল্লাহ তাআলার এই ইহসান ও নিয়ামতগুলো ছিল বনি ইসরাইলের মধ্যে যারা নবিদের আনুগত্যকারী মুসলিম, তাদের জন্য। এগুলো কাফির ইহুদিদের জন্য নয়, যারা প্রথমে ঈসা-কে অস্বীকার করেছে, অতঃপর মুহাম্মাদ-কে অস্বীকার করেছে। যার মধ্যে আজকের সমস্ত ইহুদি অর্ন্তভুক্ত। কিন্তু তারা গত দু'শ বছর পূর্ব থেকে
নিজেদের এই বিশ্বাসগুলো খ্রিষ্টানদের মাঝেও প্রচার শুরু করে এবং তাদের অধিকাংশকে এটা বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয় যে, ইহুদিরাই হচ্ছে আল্লাহ তাআলার একমাত্র নির্বাচিত জাতি এবং ফিলিস্তিনের ওপর শুধু তাদেরই অধিকার রয়েছে।
অ-ইহুদিদের ব্যাপারে গোয়েম বিশ্বাস
আল্লাহ তাআলার বাছাইকৃত ও নির্বাচিত জাতি হওয়ার বিশ্বাসের ফলে ইহুদিদের ধারণা হচ্ছে সকল মানুষ দুই প্রকার, ইহুদি ও অ-ইহুদি। অ-ইহুদিদের জন্য তাদের কিতাবে 'গোয়েম' (Goyim) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। 'গোয়েম' একটি ইবরানি শব্দ, যার অর্থ নিচু শ্রেণির মানুষ। শব্দটিকে কখনো গোলাম ও কখনো জন্তুর জন্যও ব্যবহার করা হয়। তারা সমস্ত মানুষের থেকে উত্তম হওয়ার ফলে অন্যদের 'গোয়েম' উপাধি দিয়ে থাকে এবং নিজেদের থেকে নিম্নশ্রেণির মনে করে। এই আকিদা অনুযায়ী বাকি সমস্ত মানুষকে মূলত বনি ইসরাইলের খিদমতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই ইহুদিদের জন্য তাদের ওপর যেকোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বৈধ। বিশেষ করে তাদের থেকে বিভিন্নভাবে মোটা অংকের সুদ উসুল করা; যদিও তালমুদের বর্ণনা অনুযায়ী সুদি কারবার হারাম। এমনিভাবে 'গোয়েমদের' জান-মাল ও সম্মানসহ সবকিছু দখল করা ইহুদিদের জন্য বৈধ।
প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস
ইহুদিদের তৃতীয় আকিদা হচ্ছে, প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেই ভূমি, যার প্রতিশ্রুতি বনি ইসরাইলকে দেওয়া হয়েছে। ইহুদিদের আকিদা হচ্ছে, ফিলিস্তিন বিশেষ করে জেরুজালেমকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামত পর্যন্ত ইহুদিদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাই এই ভূমিতে শুধু তাদেরই অধিকার রয়েছে। খ্রিষ্টান ও মুসলিম যারা তাদের নিকট 'গোয়েম', তারা ফিলিস্তিনে অবৈধ দখল করে রেখেছে, আর এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই বর্তমানের ইহুদিরা 'গ্রেটার ইসরাইল' প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে।
ইসরাইলি সাম্রাজ্যের সীমানা কী হবে? এর উত্তর পাওয়ার জন্য আমাদের দ্বিতীয়বার বনি ইসরাইলের ইতিহাসের ওপর নজর বুলাতে হবে। বনি ইসরাইলের শুরু ইয়াকুব থেকে হয়েছে। তাঁর মূল বাসভূমি ছিল ফিলিস্তিনের কিনান। পরবর্তী সময়ে তিনি নিজ বংশধরসহ সন্তান ইউসুফ -এর হুকুমতের সময় মিশরে আবাদ হয়ে যান। পুনরায় তারা মুসা -এর যুগে মিশর থেকে বের হয়ে সিনাই মরুতে অবস্থান গ্রহণ করে। অতঃপর তাঁর অফাতের পর ইউশা -এর সময় তারা ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে। অতঃপর বোখতে নসরের হাতে দেশান্তরিত হওয়ার মাধ্যমে ইরাকের এলাকা ইরান, শাম ও জাজিরাতুল আরবে ছড়িয়ে পড়ে। তেমনিভাবে টাইটাসের সময় এবং তারপর খ্রিষ্টান ও ইসলামের যুগেও ইহুদিরা বিভিন্ন এলাকায় দেশান্তর হয়।
আজকের ইহুদিরা সেই সব এলাকাকে বিশাল ইসরাইলি সাম্রাজ্যের অংশ মনে করে, যেখানে তারা বিভিন্ন সময় বসবাস করত। তাদের স্লোগান হচ্ছে, 'নীল থেকে ফোরাত ও খাইবার থেকে কিনান পর্যন্ত এলাকা তাদের ভূমি।' যদি কেউ বর্তমানের ইসরাইলের পতাকার দিকে লক্ষ করেন, তাহলে প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাস ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। সেখানে ওপরে নিচে দুটা নীল দাগ ও মধ্যে ছয় কোণবিশিষ্ট তারা রয়েছে। দুই নীল দাগ হচ্ছে, নীলনদ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত অঞ্চল, যা বিশাল ইসরাইল রাজ্যের সীমানা। ছয় কোণবিশিষ্ট তারকা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী এটা দাউদ-এর নিশানা, যা তাঁর পতাকাতে ছিল। তারা এটাকে 'ডেভিড স্টার' (David Star) বলে থাকে। বর্তমানে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশাল ইসরাইলি সাম্রাজ্যের ওপর দাউদ-এর বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুসা-এর সাথে কৃত ফিলিস্তিন ভূমির ওয়াদা বনি ইসরাইলের অযোগ্যতা, চরিত্রহীনতা ও ভ্রষ্ট বিশ্বাসের কারণে যদিও অনেক পরে অর্জিত হয়েছিল—তবে তা ফিরে পাওয়ার পরেও তারা সেটাকে সংরক্ষণ করতে পারেনি। কিন্তু আজ তারা সময়ের বিবর্তনে ও তাদের মনগড়া বিশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন প্রতিশ্রুত ভূমির বিশ্বাসকে সত্য বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত। তাদের সমস্ত শক্তি ও ধোঁকার মাধ্যমে তারা এই বিশ্বাস বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ইলিয়াসংক্রান্ত বিশ্বাস
ইহুদিদের প্রতিশ্রুত ভূমিতে ফিরে আসার সফর 'ইলিয়া' (Alizah) নামে প্রসিদ্ধ। পুনরায় জেরুজালেমে ফিরে আসার সফরকে তারা অনেক কঠিন যুক্তি দিয়ে বর্ণনা করে। এই সফরের প্রথম ধাপ হচ্ছে, পুরো দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়া এবং দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে, পুরো দুনিয়ার ওপর কন্ট্রোল প্রতিষ্ঠা করা। ইহুদিদের পুরাতন কিতাবগুলোর মধ্যে এই সফরের নকশা পাওয়া যায়। সেখানে যে সমস্ত এলাকা তার সীমার ভেতর দেখানো হয়েছে, সেগুলোর মোড় উসমানি খিলাফতের দিকে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটেন রাজ্যের সাহায্যে ফিলিস্তিনের বুকে ইহুদিদের স্থানান্তরকে তারা ইলিয়া মনে করে থাকে।
মাসিহসংক্রান্ত বিশ্বাস
মাসিহ বলা হয়, সেই ব্যক্তিকে, যাকে আল্লাহ তাআলা বিশেষ কোনো সময়ে বিশেষ কোনো লক্ষ্যে প্রেরণ করেন, যিনি আল্লাহ তাআলার হুকুমে মানুষকে সাহায্যের জন্য কাজ করেন। ইহুদিরা তাদের কিতাবে কয়েকজন মাসিহের আলোচনা উল্লেখ করেছে, যারা
পূর্বে গত হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী শুধু একজন মাসিহ বাকি রয়েছেন, যিনি এসে তাদের হাতে সুলাইমান-এর মতো সালতানাত প্রতিষ্ঠা করে দেবেন। ইহুদিদের এই মাসিহ মূলত দাজ্জাল, যাকে আসল মাসিহ ঈসা হত্যা করবেন। ইহুদিরা ঈসা-কে মাসিহ মানতে অস্বীকার করে, কারণ তিনি দাউদ-এর বংশ থেকে ছিলেন না। ইহুদি আলিমরা বলত, মাসিহ দাউদ-এর বংশ থেকে আসবে। আর এটা তারা নিজ থেকে বানিয়ে বলত, বাস্তবে আম্বিয়ায়ে কিরাম এমন কোনো কথা বলেননি।
খ্রিষ্টানরা ঈসা-কে মাসিহুল্লাহ মনে করে এবং দ্বিতীয়বার তিনি দুনিয়াতে আসার ওপর বিশ্বাসও রাখে। কিন্তু তারা এই বিশ্বাস করে, ঈসা-এর পুনরায় প্রত্যাবর্তন শুধু খ্রিষ্টানদের মধ্যে হবে, মুসলিম বা ইহুদিদের মধ্যে নয়। তারা বলে, 'তিনি আবার ফিরে এসে সৎ খ্রিষ্টানদের বাছাই করে সাথে নেবেন। ফলে দুনিয়াতে ভালো-খারাপের বিশাল যুদ্ধ হবে, যাকে তারা 'আরমাগেডন' বলে। এই যুদ্ধে সৎ ব্যক্তিরা বিজয়ী হবে এবং ঈসা দুনিয়াতে ইনসাফের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। মুসলিমদের বিশ্বাস হচ্ছে, ঈসা নিহত হননি; বরং তাঁকে আল্লাহর হুকুমে দুনিয়া থেকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইমাম মাহদির সময়ের শেষ দিকে আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি দুনিয়াতে এসে দাজ্জালকে হত্যা করবেন এবং সমস্ত বাতিল দ্বীনকে খতম করে সত্য দ্বীনকে পূর্ণরূপে বিজয়ী করবেন। বর্তমানে ইহুদিরা মাসিহ দাজ্জালের অপেক্ষায় আছে এবং তার সংবর্ধনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
হাইকালে সুলাইমানি-সংক্রান্ত বিশ্বাস
ইহুদিদের বিশ্বাস অনুযায়ী হাইকালে সুলাইমানি, যা সুলাইমান বানিয়েছেন, তা দুবার ধ্বংস হয়েছিল। প্রথমবার বোখতে নসরের হাতে, যা পরে জুলকারনাইনের সময় আবার নির্মিত হয়। দ্বিতীয়বার ৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমান বাদশাহ টাইটাসের হাতে এবং সেই সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত তা আর নির্মাণ করা হয়নি। তাই বর্তমান ইহুদিদের ওপর আবশ্যক হচ্ছে, হাইকালে সুলাইমানিকে দ্বিতীয়বার নির্মাণ করা। তাদের আরও বিশ্বাস হচ্ছে, হাইকালের দ্বিতীয় নির্মাণ তাদের মাসিহ দাউদ এসে করবেন; কিন্তু তার জন্য পরিস্থিতি প্রস্তুত করা তাদের দায়িত্ব। এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তারা যেখানে হাইকাল নির্মাণ করতে চাচ্ছে, সেখানেই মাসজিদুল আকসা নির্মিত রয়েছে। তাই হাইকাল নির্মাণের জন্য মাসজিদুল আকসা ধ্বংস করা আবশ্যক। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য তারা একের পর এক ষড়যন্ত্র ও মসজিদের নিচে সুড়ঙ্গ করছে; বরং তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেও বিশ্বের মানুষকে জানিয়ে দিচ্ছে।
মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী সুলাইমান হাইকাল নির্মাণ করেননি; বরং মাসজিদুল আকসাকেই সম্প্রসারণ করেছেন। এই মসজিদ মুসলিমদের প্রথম কিবলা আর হাইকাল একটি মিথ্যা কাহিনি, যা ইহুদিরা মাসজিদুল আকসা ধ্বংসের জন্য তৈরি করেছে।
তাবুতে সাকিনার বিশ্বাস
তাবুতে সাকিনা একটি কাঠের বাক্স। যার মধ্যে এক বর্ণনামতে সেই তাওরাত রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলা মুসা -কে তুর পাহাড়ে কথা বলার সময় দান করেছিলেন। এ ছাড়াও মুসা-এর লাঠি ও মান্না-সালওয়া রয়েছে। এই বাক্স আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে তাঁর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন। বনি ইসরাইল এটাকে নিজেদের জন্য বরকত ও উত্থানের কারণ মনে করে। এই তাবুত বা বাক্সকে তাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যা তালুতের বাহিনীকে নিদর্শন হিসেবে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অতঃপর বোখতে নসরের সময় দ্বিতীয়বার হারিয়ে যাওয়ার পর উজাইর -এর সময় পুনরায় ফিরে আসে। কিন্তু পরে তা আবারও হারিয়ে যায়। ইহুদিদের বিশ্বাস হচ্ছে, মাসিহে দাউদ দাজ্জালের সময় এই বাক্স পুনরায় ফিরে আসবে এবং তা তাদের চিরকালের উত্থানের কারণ হবে।
দানিয়েল-এর দুআ ও মহান লক্ষ্য
ইহুদিদের কিতাবে নবিদের সহিফাগুলোর একটি সংকলন রয়েছে। সেখানে থাকা সর্বশেষ সহিফাটি 'কিতাবে দানিয়েল' নামে প্রসিদ্ধ। বনি ইসরাইলের বর্ণনা অনুযায়ী বোখতে নসরের গোলামির সময় দানিয়েল ছিলেন তাদের কাছে প্রেরিত সর্বশেষ নবি। বনি ইসরাইলের কাছে দানিয়েল -এর প্রসিদ্ধির দুটি কারণ ছিল। একটা হলো তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যায় অনেক দক্ষ ছিলেন অনেকটা ইউসুফ-এর মতো। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে শেষ জমানায় সংঘটিতব্য ঘটনাগুলোর বিস্তারিত ইলম দান করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাগুলোর 'ভুল ব্যাখ্যা' বনি ইসরাইলের মধ্যে গোমরাহির এক বিশাল দরজা খুলে দেয়।
ইবনে কাসির স্বীয় ইতিহাস-গ্রন্থে দানিয়েল-এর সাথে সংশ্লিষ্ট একটি আশ্চর্য ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আবু মুসা আশআরি যখন ইরানের তাসতার শহর বিজয় করেন, তখন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলে, এই শহরে একটি লাশ আছে, যাকে মানুষ দানিয়েল -এর লাশ মনে করে। এর সাথে সোনা ও রুপার একটি ভান্ডার রয়েছে। আবু মুসা আশআরি যখন লাশের জিয়ারত করেন, তখন সেখানে একটি খাজানা, একটি আংটি ও একটি লিখিত সহিফা দেখতে পান। এই ঘটনা উমর-এর কাছে লিখে পাঠানো হলে তিনি লাশকে দাফন করে খাজানা গরিবদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া ও আংটি আবু মুসা আশআরি -কে দিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। সহিফাটি কাব আহবার অনুবাদ করেন, যিনি ইসরাইলি রিওয়ায়াতে অনেক পারদর্শী ছিলেন। সেই সহিফায় উম্মতে মুহাম্মাদির নিদর্শন ও তাদের উত্থানের বিস্তারিত আলোচনা ছিল।
ইহুদিদের নিকট প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, বনি ইসরাইল যখন বোখতে নসরের কাছে বন্দী ছিল, তখন দানিয়েল-কে তাদের নবি হিসেবে পাঠানো হয়। তারা তখন তাঁর কাছে আবেদন জানায়, যাতে তিনি তাদের মুক্তি ও ফিলিস্তিনে ফিরে যাওয়া এবং হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণের ক্ষমতা প্রাপ্তির জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী দানিয়েল দুআ করেন। যার ফলে আল্লাহ তাআলা স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁকে সুসংবাদ দেন যে, তাঁর দুআ কবুল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা একজন বাদশাহ পাঠাবেন, যিনি তাদেরকে গোলামি থেকে মুক্তির পাশাপাশি ফিলিস্তিনে যেতে সাহায্য করবেন এবং হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণেও সাহায্য করবেন। অতঃপর দুনিয়াতে সুলাইমান-এর মতো তাদের ক্ষমতা একজন মাসিহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইহুদিরা তখন দানিয়েল-এর সুসংবাদকেই তাদের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেয় এবং তা অর্জনের জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে থাকে। এই লক্ষ্যে তিনটি অংশ রয়েছে:
১- ইহুদিদের বাইতুল মুকাদ্দাসে ফিরে যাওয়ার অনুমতি।
২- হাইকালে সুলাইমানি দ্বিতীয়বার নির্মিত হওয়া।
৩- সুলাইমান-এর যুগের মতো বৈশ্বিক ক্ষমতা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
ঈসা-কে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং ইহুদি ও খ্রিষ্টবাদের শুরু
ইসা-এর হত্যার ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে দুনিয়াতে দুটা নতুন ধর্ম অর্থাৎ ইহুদিবাদ ও খ্রিষ্টবাদ জন্ম নেয়। ইহুদিবাদ ছিল সত্য দ্বীন থেকে বিচ্যুত তালমুদের বিধান ও ভ্রান্ত আলিমদের নির্দেশনায় পরিচালিত এক নতুন দ্বীন, যার সাথে মুসা-এর দ্বীনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এখন ইহুদিরা দানিয়েল-এর দুআর ভিত্তিতে একজন মাসিহের অপেক্ষায় রয়েছে, যে তাদের দাবি অনুযায়ী দাউদ-এর বংশ থেকে আসবে, যার নেতৃত্বে তারা প্রতিশ্রুত ভূমি দখল করবে, হাইকালে সুলাইমানি পুনরায় নির্মাণ করবে এবং দুনিয়াতে বৈশ্বিক হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবে।
অপরদিকে খ্রিষ্টানরাও সেই দ্বীনের ওপর টিকে থাকেনি, যা ইসা নিয়ে এসেছেন। তারা এই দ্বীনের মধ্যে তাহরিফ করে এবং সেন্ট পৌল (Saint Paul)-এর ভ্রান্ত ব্যাখ্যা গ্রহণ করে পুরো দ্বীনকেই পরিবর্তন করে ফেলেছে।
টিকাঃ
২৩. وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنِّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ الله وَأَحِبَّاؤُهُ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُمْ بِذُنُوبِكُمْ بَلْ أَنْتُمْ بَشَرٌ مِمَّنْ خَلَقَ يَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَإِلَيْهِ الْمَصِيرُ 'ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বলে, "আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন।" আপনি বলুন, "তবে তিনি তোমাদেরকে পাপের বিনিময়ে কেন শান্তি দান করবেন? বরং তোমরাও অন্যান্য সৃষ্ট মানবের অন্তর্ভুক্ত সাধারণ মানুষ। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শান্তি প্রদান করেন। নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে, তাতে আল্লাহরই আধিপত্য রয়েছে এবং তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।” (সুরা আল-মায়িদা, ৫: ১৮)
📄 দানিয়েল-এর দুআ ও মহান লক্ষ্য
ইহুদিদের কিতাবে নবিদের সহিফাগুলোর একটি সংকলন রয়েছে। সেখানে থাকা সর্বশেষ সহিফাটি 'কিতাবে দানিয়েল' নামে প্রসিদ্ধ। বনি ইসরাইলের বর্ণনা অনুযায়ী বোখতে নসরের গোলামির সময় দানিয়েল ছিলেন তাদের কাছে প্রেরিত সর্বশেষ নবি। বনি ইসরাইলের কাছে দানিয়েল -এর প্রসিদ্ধির দুটি কারণ ছিল। একটা হলো তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যায় অনেক দক্ষ ছিলেন অনেকটা ইউসুফ-এর মতো। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে শেষ জমানায় সংঘটিতব্য ঘটনাগুলোর বিস্তারিত ইলম দান করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাগুলোর 'ভুল ব্যাখ্যা' বনি ইসরাইলের মধ্যে গোমরাহির এক বিশাল দরজা খুলে দেয়।
ইবনে কাসির স্বীয় ইতিহাস-গ্রন্থে দানিয়েল-এর সাথে সংশ্লিষ্ট একটি আশ্চর্য ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আবু মুসা আশআরি যখন ইরানের তাসতার শহর বিজয় করেন, তখন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলে, এই শহরে একটি লাশ আছে, যাকে মানুষ দানিয়েল -এর লাশ মনে করে। এর সাথে সোনা ও রুপার একটি ভান্ডার রয়েছে। আবু মুসা আশআরি যখন লাশের জিয়ারত করেন, তখন সেখানে একটি খাজানা, একটি আংটি ও একটি লিখিত সহিফা দেখতে পান। এই ঘটনা উমর-এর কাছে লিখে পাঠানো হলে তিনি লাশকে দাফন করে খাজানা গরিবদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া ও আংটি আবু মুসা আশআরি -কে দিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। সহিফাটি কাব আহবার অনুবাদ করেন, যিনি ইসরাইলি রিওয়ায়াতে অনেক পারদর্শী ছিলেন। সেই সহিফায় উম্মতে মুহাম্মাদির নিদর্শন ও তাদের উত্থানের বিস্তারিত আলোচনা ছিল।
ইহুদিদের নিকট প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, বনি ইসরাইল যখন বোখতে নসরের কাছে বন্দী ছিল, তখন দানিয়েল-কে তাদের নবি হিসেবে পাঠানো হয়। তারা তখন তাঁর কাছে আবেদন জানায়, যাতে তিনি তাদের মুক্তি ও ফিলিস্তিনে ফিরে যাওয়া এবং হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণের ক্ষমতা প্রাপ্তির জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী দানিয়েল দুআ করেন। যার ফলে আল্লাহ তাআলা স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁকে সুসংবাদ দেন যে, তাঁর দুআ কবুল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা একজন বাদশাহ পাঠাবেন, যিনি তাদেরকে গোলামি থেকে মুক্তির পাশাপাশি ফিলিস্তিনে যেতে সাহায্য করবেন এবং হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণেও সাহায্য করবেন। অতঃপর দুনিয়াতে সুলাইমান-এর মতো তাদের ক্ষমতা একজন মাসিহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইহুদিরা তখন দানিয়েল-এর সুসংবাদকেই তাদের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেয় এবং তা অর্জনের জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে থাকে। এই লক্ষ্যে তিনটি অংশ রয়েছে:
১- ইহুদিদের বাইতুল মুকাদ্দাসে ফিরে যাওয়ার অনুমতি।
২- হাইকালে সুলাইমানি দ্বিতীয়বার নির্মিত হওয়া।
৩- সুলাইমান-এর যুগের মতো বৈশ্বিক ক্ষমতা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া।