📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে দুটি বড় অংশে ভাগ করা যায়, প্রথম প্রকার হচ্ছে, যারা আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের ওপর (কোনো না কোনোভাবে) বিশ্বাস রাখে এবং তাঁর কাছে প্রতিদানের আশা রাখে। এই ধরনের মানুষদের তিনটি বড় শাখা রয়েছে: মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিষ্টান। এ ছাড়া সেই সমস্ত মুশরিকও এই প্রকারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, যারা আল্লাহ তাআলার ওপর বিশ্বাস রাখে; কিন্তু নিজেদের দেবদেবীকে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করে।

দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে, যারা আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের ওপর বিশ্বাস রাখে না এবং তাঁর কাছে প্রতিদানের কোনো আশাও করে না। এই প্রকারে সেই সমস্ত মূর্তিপূজারি অন্তর্ভুক্ত, যারা নিজেদের বানানো মূর্তিগুলোকে খালিক, মালিক ও রিজিকদাতা মনে করে এবং তাদের থেকেই প্রতিদানের আশা করে। এই প্রকারের মধ্যে অপর আরেকটি দল হচ্ছে, সেই সমস্ত ব্যক্তি, যারা দাবি করে, তারা শুধু মানবতার জন্যই কাজ করে। এই স্লোগানের অধীনে তারা মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। তবে তারা এই কাজের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বা অতি প্রাকৃতিক কোনো সত্তা থেকে প্রতিদানের আশা করে না। পুরো মানব ইতিহাস এই শ্রেণির মানুষদের মধ্যবর্তী দ্বন্দ্বেরই নাম। মুসলিম উম্মাহর জন্য আবশ্যক হচ্ছে, এই বাতিল মতবাদগুলোর মোকাবিলা করা ও দুনিয়াতে সত্য দ্বীন মোতাবেক জীবন পরিচালনা করা এবং আসমানি হিদায়াত প্রচার-প্রসার করা।

আজ আমরা যে যুগ অতিবাহিত করছি এবং যে বিশ্বে বসবাস করছি, তা গঠনের পেছনে মানব ইতিহাসের চারটি ঘটনা মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।¹ সেগুলো হলো:

• প্রথম ঘটনা, খ্রিষ্টপূর্ব তিনশ সালে গ্রিক দর্শনের উৎপত্তি।
• দ্বিতীয় ঘটনা, খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতাব্দীতে ইহুদিদের পক্ষ থেকে ঈসা -কে হত্যার চেষ্টা এবং তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া।
• তৃতীয় ঘটনা, উসমান-এর শাহাদাত, যা উম্মতের মধ্যে ফিতনা প্রবেশের দরজা হিসেবে গণ্য হয়।২
• চতুর্থ ঘটনা, ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ফরাসি বিপ্লব। যার পর থেকে পুরো ইউরোপ গির্জার প্রতিষ্ঠিত আল্লাহর শাসন ও মানুষের শাসনের ব্যবস্থাকে পূর্ণরূপে অস্বীকার করে তার স্থানে ধর্মহীনতার বিশ্বাসকে গ্রহণ করে নিয়েছিল।

প্রথম ঘটনা : খ্রিষ্টপূর্ব তিনশ সালে গ্রিক দর্শনের উৎপত্তি
ঈসা-এর জন্মের তিনশ সাল পূর্বে ইউরোপের ইউনান বা গ্রিক অঞ্চলে এমন একটি মতাদর্শ প্রচারিত হয়, যা ইলমে ওহি ও মানুষের বুদ্ধির মাঝে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলার ভাবনা ও ইলমে ওহির দিক-নির্দেশনা ব্যতীত শুধু মানুষের বুদ্ধি অনুযায়ী জীবন পরিচালনার আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলন অনেক প্রসিদ্ধ দার্শনিক জন্ম দেয়, যাদের মধ্যে এরিস্টটল ও প্লেটো অনেক প্রসিদ্ধি পেয়েছিল। সেখানে এমন সব আলোচনা ও কার্যক্রম শুরু হয়, যেখানে মানুষ ইলমে ওহি থেকে বিচ্যুত হয়ে তাদের নিজেদের সমস্যার সমাধান শুধুই বুদ্ধি দ্বারা করা শুরু করে। এই দার্শনিকদের বিশ্বাসগুলো ছিল আসমানি কিতাবগুলোর আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক, বিশেষ করে তাকদিরের আকিদার বিপরীত।

তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, কেউ অসুস্থতার কারণে মারা গেলে ধর্মের দেওয়া বক্তব্য 'সব আল্লাহ তাআলার ইচ্ছাতেই হয়েছে' তা ভুল। কারণ, তার কাছে যদি টাকা থাকত এবং সে চিকিৎসা করাতো, তাহলে সে বেঁচে যেত। তারা বলে, ধর্ম মানুষকে আফিমের মতো নেশাগ্রস্ত করে রাখে। মানুষের মধ্যে এমন ক্ষমতা আছে, যার দ্বারা সে নিজেই নিজের সব সমস্যার সমাধান করতে পারে। কিন্তু ধর্মের শিকল মানুষকে এই কাজের অনুমতি দেয় না; তাই মানুষকে ধর্মের বাঁধন থেকে মুক্ত করতে হবে।

মোটকথা, এই সমস্ত দার্শনিক প্রকাশ্যে আসমানি ধর্মের বিরোধিতা শুরু করে। যার ফলে মানুষ নিজেদের সমস্যাগুলো সমাধানে আল্লাহ-প্রদত্ত শিক্ষার বিপরীতে নতুন শিক্ষা ও দর্শন গ্রহণ করতে শুরু করে। তারা ধর্মের বিরুদ্ধে বিষ ঢালা শুরু করে এবং মানুষকে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আমল করার দিকে উদ্বুদ্ধ করার পরিবর্তে মনগড়া পথে পরিচালিত করতে থাকে। আর এখান থেকেই মানুষের সব সমস্যা শুধু বুদ্ধি দ্বারা সমাধানের এক নতুন চিন্তাধারা ও দর্শনের জন্ম নেয়।

শুরুতে এই দার্শনিকদের গোমরাহ মতাদর্শ কোনো সমাজেই স্থান পায়নি; চাই তা ইহুদি সমাজ হোক বা হিন্দু সমাজ। বরং তাদেরকে ধর্মহীন ও ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে খুব কঠোরতার সাথে দমিয়ে রাখা হয়। খলিফা মামুনুর রশিদের দারুল হুকুমত যখন গ্রিক দর্শনের বইগুলো আরবিতে অনুবাদ করানো শুরু করে, তখন মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এই সমস্ত দর্শনের প্রচার শুরু হয়। এই অনুবাদগুলোর মাধ্যমেই মুসলিম উম্মাহর মধ্যে মুতাজিলা ফিতনার উৎপত্তি হয়। শুধু মানুষের বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে আকায়িদ ও ইলমে কালামের নতুন নতুন আলোচনা সামনে আসতে শুরু করে। যা উম্মতের মধ্যে নতুন সব ফিতনার দরজা খুলে দিতে থাকে। হকপন্থী আলিমগণ এই সমস্ত ফিতনা খুব ভালোভাবে মোকাবিলা করেন এবং দলিলের মাধ্যমে এগুলো বাতিল হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করে দেন। কিন্তু অপরদিকে কয়েক যুগ পর পশ্চিমা খ্রিষ্টানদের মাঝে এই সমস্ত ভ্রান্ত চিন্তাধারা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ফরাসি বিপ্লব ছিল এই সমস্ত চিন্তারই ফসল। আজ এই ধর্মহীনতার দর্শনই পুরো দুনিয়াতে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে।

দ্বিতীয় ঘটনা: ইসা -কে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া

গ্রিক দার্শনিকদের সম্পর্ক সেই সব দলের মানুষের সাথে ছিল, যারা আল্লাহ তাআলা থেকে কোনো প্রতিদানের আশা করত না। কিন্তু যারা আল্লাহ তাআলা থেকে প্রতিদানের আশা রেখে আমল করত, তাদের চিন্তা-চেতনা নষ্ট হওয়া শুরু হয় বনি ইসরাইলের মাধ্যমে। যারা ইসা -কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং হত্যার ষড়যন্ত্র করে; যার ফলে তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলা ইসা -কে হত্যার ব্যাপারে ইহুদিদের চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দেন। ইয়াকুব থেকে ইসা পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা সত্য দ্বীনের প্রচারের জন্য বনি ইসরাইলকে নির্বাচন করেছিলেন। তাদেরকে হিদায়াতের দিকে নিয়ে আসার জন্য ধারাবাহিকভাবে নবিগণকে প্রেরণ করেছেন। ইসা ছিলেন এই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ ইসরাইলি নবি।

বনি ইসরাইলের অধিকাংশই কঠিন গোমরাহিতে লিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তারা প্রথমে ইয়াহইয়া -কে শহিদ করে, তারপর তাঁর পিতা জাকারিয়া -কে শহিদ করে। তাদের সর্বশেষ লক্ষ্য ছিল ইসা -কে শহিদ করা। ইসা -কে রাস্তা থেকে সরানোর জন্য বনি
ইসরাইলের উলামায়ে সু'রা রোমান বাদশাহর কাছে তাঁকে শূলিতে চড়ানোর দাবি পেশ করে। রোমানরা যখন ইসা-কে শূলিতে চড়ানোর ফয়সালা করে, তখন আল্লাহ তাআলা ইসা-কে জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নেন। কিন্তু ইহুদিরা ভাবতে থাকে ইসা -কে হত্যা করে ফেলা হয়েছে, কারণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদেরকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীকালে খ্রিষ্টানরাও সন্দেহের মধ্যে নিপতিত হয়।

এই ঘটনার ফলে বনি ইসরাইল-যারা এতদিন পর্যন্ত সত্য দ্বীনের ধারক ও প্রচারক হিসেবে আল্লাহ তাআলার বাছাইকৃত জাতি ও বাইতুল মুকাদ্দাসের উত্তরাধিকারী ছিল-তারা কাফির এবং আল্লাহ তাআলার ক্রোধপ্রাপ্ত জাতিতে পরিণত হয়। অতঃপর এই দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব ইসা-এর বারোজন সহকারীর ওপর অর্পিত হয়, যারা দ্বীন প্রসারের কাজ শুরু করে। কিছু বছর পর ইহুদি আলিম সেন্ট পৌল সত্য দ্বীন গ্রহণের ঘোষণা দেয় এবং ইসা-এর সহকারীদের সাথে মিলে দ্বীন প্রচারের কাজ শুরু করে। কিন্তু আস্তে আস্তে সে দ্বীনি বিশ্বাসের সাথে নিজের পক্ষ থেকে ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাস মিশিয়ে প্রচার শুরু করে এবং একসময় খ্রিষ্টানরাও সেন্ট পৌলের বিশ্বাসে প্রভাবিত হয়ে গোমরাহ হয়ে যায়। সর্বশেষ ইসলামের আত্মপ্রকাশের পূর্বে পুরো মানবজাতি গোমরাহির অন্ধকারে ডুবে ছিল। তাই আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ নবি মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াতের উদ্দেশ্য ছিল ইহুদি ও নাসারাদের গোমরাহি খতম করে হিদায়াত ও সত্য দ্বীনকে ছড়িয়ে দেওয়া।৪

ইসা-কে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। কারণ, এই ঘটনা ছিল আল্লাহ তাআলা থেকে প্রতিদানের আশাকারী তিন দল অর্থাৎ ইহুদি, নাসারা ও মুসলিমদের মাঝে চিন্তা ও আদর্শগত বিরোধের সূচনা, পাশাপাশি তা রাজনৈতিক দিক থেকেও পুরো বিশ্ব পরিচালনা-ব্যবস্থার মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল; চাই তা (Old World Order) হোক বা (New World Order)। অর্থাৎ পুরাতন বিশ্বব্যবস্থা হোক বা নতুন বিশ্বব্যবস্থা।

গুড ওয়ার্ড অর্ডার মূলত আল্লাহ তাআলার ওপর বিশ্বাস রেখে জীবনযাপনকারী মানুষদের দু’টা বড় দলের পুরাতন বিশ্বব্যবস্থা; যেখানে মুসলিম ও রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলমান ছিল। আর নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার এই দলগুলোরই নতুন বিশ্বব্যবস্থার নাম, যেখানে রোমান ক্যাথলিকদের জায়গায় প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টান, ধর্মহীন খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা অনেক বেশি স্পষ্ট শত্রুতার সাথে সামনে এগিয়ে এসেছে। মূলত তারা সকলেই মুসলিম উম্মাহর শত্রু; কিন্তু নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার হচ্ছে সেই পুরাতন শিকারীর নতুন ফাঁদ, যার বিস্তারিত আলোচনা আমরা সামনে করব ইনশাআল্লাহ।

তৃতীয় ঘটনা : উসমান ﷴ -এর শাহাদাত

উসমান ﷴ-এর শাহাদাত হয়েছিল আব্দুল্লাহ বিন সাবার তৈরি রাফিজি ফিতনার হাতে। এই ভয়ানক সাবায়ি ফিতনা তার পরবর্তীকালে জন্ম হওয়া অসংখ্য ফিতনার দরজা এমনভাবে খুলে দিয়েছিল, যা উসমান ﷴ-এর শাহাদাত থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বন্ধ হয়নি। অপরদিকে উসমান ﷴ-এর শাহাদাতের বদলা নেওয়ার দাবিতে আলি ও মুয়াবিয়া �-এর মাঝে জেগে সিফফিন সংঘটিত হয়। সেই যুদ্ধে কিছু লোক অন্যায়ভাবে ফয়সালা করার অভিযোগ তোলে; যার ফলে সেখান থেকে খারিজী ফিতনার উৎপত্তি হয়। আর এই খারিজী ফিতনা পরবর্তী সময়ে মুতাজিলা ও মুরজিয়া ফitnar উৎপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এভাবেই উসমান ﷴ-এর শাহাদাতের দুঃখজনক ঘটনা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে চিন্তাগত ও রাজনৈতিক ফিতনার এক বিশাল দরজা হিসেবে পরিণত হয়।

সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে এই ফিতনাগুলো নতুন আকৃতি ধারণ করে মুসলিম উম্মাহর অনেক ক্ষতি সাধন করতে থাকে। সত্যপন্থী উলামায়ে কিরাম এসব ফিতনাই অনেক কঠোরভাবে মোকাবিলা করেন এবং মুসলিমদের মাঝে অকাট্য দলিলের দ্বারা সুন্নাহ-বিদআত ও দ্বীন-দ্বীনহীনতার মাঝে পার্থক্য আলোচনা করে মুক্তিপ্রাপ্ত দলের সীমা স্পষ্ট করে দেন, যারা ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’ নামে পরিচিত। তাদের চেষ্টার ফলে আল্লাহর ইচ্ছায় কোনো বাতিল ও গোমরাহ আকিদা-আদর্শ কখনো ইসলামের মধ্যে স্থান করতে পারেনি এবং ইসলাম ধর্ম সকল ভ্রষ্টতা থেকে মুক্ত থেকে যায়। পাশাপাশি সত্যপন্থী উলামায়ে কিরাম সেই সমস্ত আকিদা ও কাজগুলো স্পষ্ট করে দেন, যা বিশ্বাস ও করার মাধ্যমে কোনো মুসলিম ইসলাম থেকে বের হয়ে কাফিরে পরিণত হয়।

চতুর্থ ঘটনা : ফরাসি বিপ্লব (নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার)

ঈসা -কে হত্যার ষড়যন্ত্রের পর থেকে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুশরিকদের মাঝে বিরোধ চলমান ছিল। অতঃপর সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আত্মপ্রকাশের পর ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিমদের মাঝে ধারাবাহিক যুদ্ধ শুরু হয়। সেই সময়টাকে পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার (Old World Order) নামকরণ করেছে। সর্বশেষ ফরাসি বিপ্লবের পর সমগ্র বিশ্ব প্রকাশ্যভাবে আরেকটি নতুন যুগে প্রবেশ করে, যা ছিল মূলত সেই গ্রিক দর্শনের ধর্মহীন মতাদর্শের ফসল। এই সময়টাকে ইতিহাসে 'নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার' (New World Order) হিসেবে নামকরণ করা হয়। বাহ্যিকভাবে দেখা যায়, এই নতুন বিশ্বব্যবস্থা মানুষের জীবনে বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতার দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যাবে পূর্বের কিছুই পরিবর্তিত হয়নি। কারণ এই নতুন বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব রয়েছে ইহুদি ও তাদের মিত্র প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টানদের হাতে। ফলে পুরাতন বিশ্বব্যবস্থায় মুসলিম উম্মাহর মোকাবিলা ছিল রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সাথে আর এখন মোকাবিলা হচ্ছে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের থেকেই তৈরি হওয়া এক নতুন জোটের সাথে।

নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার মূলত ইহুদিদের সেই পুরাতন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির নাম, যেখানে তারা ফিলিস্তিন দখল করা থেকে নিয়ে মাসজিদুল আকসা ধ্বংস ও সেখানে হাইকালে সুলাইমানি নির্মাণ করা এবং নিজেদের মিথ্যা মাসিহের সাহায্যে পুরো বিশ্বে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। এই নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার মূলত পুরাতন শিকারির নতুন জাল। কারণ এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুশরিকরা তাদের সেই পুরাতন শিরক, সুদি অর্থনীতি ও অশ্লীলতা-বেহায়াপনাগুলোই আঁকড়ে ধরে রেখেছে। পার্থক্য শুধু এতটুকুই যে, পুরাতন নাম ও পরিভাষাগুলোর জায়গায় নতুন নাম, পরিভাষা ও সিস্টেম বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

তারা এই সব নতুন নাম, পরিভাষা ও ব্যবস্থার ফাঁদে ফেলে অসংখ্য মুসলিমকে শিকার করে নিয়েছে। অপরদিকে মুসলিম উম্মাহর অধঃপতনের সময় থেকে এই অবস্থা একটি মহামারির মতো মুসলিম উম্মাহর মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। তবে নতুন এসব ভ্রান্ত চিন্তার প্রসার ও ইরতিদাদের সময়েও আল্লাহ তাআলা সত্যপন্থী আলিমগণ ও মুজাহিদদেরকে এই সমস্ত ফিতনার মোকাবিলার জন্য প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন, যারা সর্বদাই মুসলিম উম্মাহর সামনে সেই পুরাতন শিকারির নতুন জালের পর্দা উন্মোচন করে দিচ্ছেন।

আমাদের এই কিতাবের মূল উদ্দেশ্য ইহুদি, নাসারা বা মুসলিমদের ইতিহাস বর্ণনা করা নয়। বরং আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মুসলিম উম্মাহর প্রতি দরদ রাখে, এমন অসংখ্য যুবকের সামনে সঠিক চিন্তার দ্বার উন্মোচিত করে দেওয়া, যারা বর্তমান সময়ের পশ্চিমা সভ্যতা ও জিহাদের চিন্তাধারার ভিত্তি সম্পর্কে অবগত নন, অথবা যারা অল্প যা কিছু জানেন, তা স্বল্প কিছু ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং তারা এতটুকু সক্ষমতা রাখে না, যা দ্বারা সেই ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা বুঝতে সক্ষম হবে।

আমাদের প্রচেষ্টা হচ্ছে সেই সব ঘটনাকে একত্রিত করা, যা বর্তমান সময়ের পশ্চিমা সভ্যতার চিন্তাধারা ও জিহাদি আন্দোলনকে বোঝার জন্য জরুরি ও আবশ্যক। অতঃপর সেই ঘটনাগুলো সহজ ও ধারাবাহিকতার সাথে আলোচনা করা; যাতে মূল বিষয়গুলো
সহজে বোঝা যায়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই উদ্দেশ্যে সফলতা দান করুন এবং নিজের পক্ষ থেকে এই কাজ আঞ্জাম দেওয়ার তাওফিক দান করুন।

কিতাবটিকে আমরা দুটি অংশ ও একটি উপসংহারে ভাগ করেছি: • প্রথম খণ্ড: ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা পুরাতন বিশ্বব্যবস্থা • দ্বিতীয় খণ্ড: নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা নতুন বিশ্বব্যবস্থা

কিতাবের প্রথম অংশ ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডারে দুটি অধ্যায় রয়েছে: • প্রথম অধ্যায়: ইহুদি জাতি ও ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার • দ্বিতীয় অধ্যায়: পশ্চিমা বিশ্ব ও ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার

প্রথম অধ্যায়ে আমরা ব্যাখ্যা করব, ইহুদিদের পুরাতন ইতিহাসের কী কী বিশ্বাস ও ঘটনা রয়েছে, যার দ্বারা তারা প্রথমে পুরাতন বিশ্বব্যবস্থা ও পরে নতুন বিশ্বব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে? সেই কারণগুলো কী, যার ভিত্তিতে বনি ইসরাইল মুসলিম থেকে ইহুদিতে পরিণত হয়েছে?

দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব ঈসা-এর পর সত্য দ্বীনের মধ্যে খ্রিষ্টানরা কোন ধরনের পরিবর্তন করেছিল? অতঃপর ইউরোপে খ্রিষ্টবাদের উত্থান ও তাতে যে সমস্ত বিকৃতি করা হয়েছিল, তা নিয়ে। সর্বশেষ ফরাসি বিপ্লবের দ্বারা ইউরোপের পুরাতন বিশ্বব্যবস্থা ধ্বংসের কারণ ও তার ফলাফল নিয়ে আলোচনা করব।

কিতাবের দ্বিতীয় অংশ 'নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার' চারটি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে: • নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের প্রথম যুগ: ফরাসি বিপ্লব থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত • নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের দ্বিতীয় যুগ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত • নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের তৃতীয় যুগ: রাশিয়া ও আমেরিকার মাঝে স্নায়ুযুদ্ধ • নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের চতুর্থ যুগ: স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত

এই অংশে আমরা ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত মানবসভ্যতা যে সমস্ত মতাদর্শ ও ভৌগলিক পরিবর্তনের ধাপ পাড়ি দিয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা করব। এখানে যেসব প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করব, নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার অর্থাৎ নতুন বিশ্বব্যবস্থা, যা বর্তমানে অনেক আলোচিত হচ্ছে, এটা মূলত কী? এর চিন্তাগত ভিত্তি কী? এটা কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে? তার উদ্দেশ্য কী? ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের মধ্যে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে? নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারকে গ্রহণের ফলে মুসলিমদের কী ক্ষতি হয়েছে? নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার মুসলিম উম্মাহকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে?
উপসংহারের মধ্যে পুরো ইতিহাস মন্থন করে নতুন বিশ্বব্যবস্থার যত ভুল-ভ্রান্তি রয়েছে, তা স্পষ্ট করা হবে এবং বর্তমান আধুনিক শক্তিগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর সর্বশেষ এই পুরো দৃশ্য দেখানোর পর মুসলিম উম্মাহর সামনে এই সমস্যার সমাধান পেশ করা হবে। সেখানে এমন সব কার্যক্রম নির্ধারণ করব, যেগুলো ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের পরিচালিত বিশ্বব্যবস্থাকে পরাজিত করা, উম্মাহকে স্বাধীন করা ও খিলাফাহ আলা মিনহাজিন নবুওয়্যাহকে ফিরিয়ে আনার জন্য জরুরি ও আবশ্যক।

এই কিতাব লিখা হয়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ও তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে, যেখানে তাদের সামনে বর্তমান সময়ের ঘটনাগুলোর সঠিক বিশ্লেষণ ও সমাধান পেশ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ সন্দেহাতীতভাবে সকল চিন্তাশীল মুসলিম জানে, 'ইহুদিদের গোলাম' মিডিয়াগুলো বিশ্বের বাস্তব চিত্র আমাদের সামনে গোপন করে রাখে আর এর পেছনে তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, মুসলিমরা যাতে বাস্তবতা থেকে দূরে সন্দেহ ও সংশয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে। ফলে মুসলিম উম্মাহ যেন 'এক জাতি' হিসেবে কোথাও জেগে না ওঠে এবং তাদের মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে না যায় এবং সেই খিলাফাহ পুনরায় প্রতিষ্ঠিত না হয়, যা সহস্র বছর ধরে দুনিয়াকে পরাশক্তি হিসেবে শাসন করেছে।

আমরা আমাদের প্রিয় মুসলিম উম্মাহর সামনে এই কথা স্পষ্ট করতে চাই যে, আমাদের জন্য জরুরি হলো, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে বুঝে সতর্কতার সাথে পদক্ষেপ নেওয়া। নিজেদের সোনালি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে পৃথিবীতে ইনসাফের সমাজ কায়েম করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের এই প্রচেষ্টাকে কবুল করুন এবং বইটিকে মুসলিম উম্মাহর উত্থানের কারণ হিসেবে কবুল ও মঞ্জুর করে নিন, আমিন।

হেদায়াতুল্লাহ মেহমান্দ

টিকাঃ
১. বর্তমানে পুরো দুনিয়ার মধ্যে যে বিশেষ আদর্শিক, ভৌগলিক ও সামাজিক শৃঙ্খলাবদ্ধ হুকুমতব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে-লেখক এই গঠনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এখানে যেন এই সন্দেহ সৃষ্টি না হয় যে, তিনি হয়তো মানব ইতিহাসের সর্বদিক বিবেচনায় এই চারটি ঘটনাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। ইতিহাসে শুধু একটি ঘটনা এমন রয়েছে, যা ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতিসহ দুনিয়ার সব শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলেছে এবং শুধু প্রভাব ফেলেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং সেগুলোকে আসমানি হিদায়াত অনুযায়ী পরিশুদ্ধ করেছে। আর সেই মহান ঘটনা হলো, মুহাম্মাদ -এর নবুওয়াত।
২. এখানে একটি মৌলিক বিষয় জেনে রাখা উচিত, উসমান-এর শাহাদাতের পর সাহাবায়ে কিরামের মাঝে বিভিন্ন ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, অধিকাংশ সালাফ আলিমগণ এগুলোকে আল্লাহ তাআলার প্রতি সোপর্দ করে দিয়েছেন। কারণ তাঁরা সকল সাহাবায়ে কিরামের ব্যাপারে এই বিশ্বাস রাখতেন যে, কোনো সন্দেহ ছাড়া আল্লাহ তাআলা তাঁদের সকলের ওপর সন্তুষ্ট এবং তাঁরা ইজতিহাদ করেছেন, যার ফলে তাঁরা উত্তম প্রতিদান লাভ করবেন। আমরা সাহাবিদের ব্যাপারে এই বিশ্বাস রাখি এবং তাঁদেরকে এই সবের কারণে দোষারোপ করি না; বরং আল্লাহ তাআলার কাছে পুরস্কারপ্রাপ্ত মনে করি। এখানে লেখক উসমান-এর ঘটনা উল্লেখ করে সেই ফিতনাগুলোর দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন, যা এই ঘটনার পর জন্ম নিয়েছে এবং সেগুলো আকিদা ও রাজনীতির অধ্যায়ে কী প্রভাব ফেলেছে। এখানে সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে কোনো আলোচনা করেননি। তাই এই ক্ষেত্রে পাঠকদের নিকট অনুরোধ, তারাও যেন সাহাবিদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের অধ্যায়ে কোনো প্রাচ্যবিদ বা তাদের দ্বারা প্রভাবিত কোনো ব্যক্তির আলোচনা ও তাদের বর্ণিত ইতিহাসের দিকে কোনোভাবেই দৃষ্টি না দেন, কেননা এগুলোর কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং বিশেষ করে যখন এই অধ্যায়ের ভিত্তি শিয়া রাফিজিদের মনগড়া কাহিনি।
وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا .. فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينَا - بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا 'আর তাদের এ কথা বলার কারণে যে, আমরা মারইয়াম-পুত্র ইসা মাসিহকে হত্যা করেছি, যিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুল। অথচ তারা না তাকে হত্যা করেছে, আর না শূলিতে চড়িয়েছে; বরং তারা এরূপ ধাঁধায় পতিত হয়েছিল। বস্তুত তারা এ ব্যাপারে নানা রকম কথা বলে, তারা এ ক্ষেত্রে সন্দেহের মাঝে পড়ে আছে, শুধু অনুমান করা ছাড়া তারা এ বিষয়ে কোনো খবরই রাখে না। আর নিশ্চয় তাকে তারা হত্যা করেনি। বরং তাকে উঠিয়ে নিয়েছেন আল্লাহ তাআলা নিজের কাছে। আর আল্লাহ হচ্ছেন মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সুরা আন-নিসা, ৪: ১৫৭-১৫৮)
৪. هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ .8 'তিনিই প্রেরণ করেছেন আপন রাসুলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীন সহকারে; যেন এ দ্বীনকে অপরাপর দ্বীনের ওপর জয়যুক্ত করেন; যদিও মুশরিকরা তা অপ্রীতিকর মনে করে। (সুরা আত-তাওবা, ৯ : ৩৩)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00