📄 দীন থেকে বিমুখ হওয়ার ধরনসমূহ
উল্লিখিত আয়াতসমূহে মহান আল্লাহর দীন থেকে বিমুখ হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। দীন থেকে বিমুখ হওয়ার অর্থ কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিমুখ হওয়া। নিম্নে দীন থেকে বিমুখ হওয়ার কিছু ধরন উল্লেখ করা হলো,
(ক) দীন থেকে বিমুখ হওয়ার অন্যতম নিদর্শন হলো, কুরআন ও সুন্নাহর ইলম না শেখা এবং আমল না করা। এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে সতর্কতামূলক অনেক নির্দেশনা রয়েছে。
মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةً فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّيْنِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُوْنَ ) “আর মুমিনদের জন্য সঙ্গত নয় যে, তারা সকলে একসঙ্গে অভিযানে বের হবে। অতঃপর তাদের প্রতিটি দল থেকে কিছু লোক কেন বের হয় না, যাতে তারা দীনের গভীর জ্ঞান আহরণ করতে পারে এবং আপন সম্প্রদায় যখন তাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে, তখন তাদেরকে সতর্ক করতে পারে, যাতে তারা (গুনাহ থেকে) বেঁচে থাকে।" [সূরা ৯; আত-তাওবাহ ১২২]
মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, مَنْ يُرِدِ اللهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِهْهُ فِي الدِّيْنِ “আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দীনের 'ইল্ম দান করেন।” [সহীহ বুখারী: ৭১; সহীহ মুসলিম: ১০৩৭]
(খ) দীন থেকে বিমুখ হয়ে উপেক্ষা করে দীনের জ্ঞান অর্জন না করা কুফরী।
ঠিক একইভাবে ইলম শিক্ষা লাভ করল, কিন্তু আমল করার কোনো আগ্রহ নেই এটাও কুফরী, তবে অলসতার কারণে বা অক্ষমতার কারণে আমল না করলে তা কুফরী নয়। যখন কেউ সালাত কায়েম করে না, সিয়াম আদায় করে না, যাকাত প্রদান করে না, সামর্থ্য থাকার পরেও হজ্জ করে না, ফরয ইবাদাতগুলো করে না, হারাম কাজ থেকে বিরত থাকে না, অর্থাৎ আমলের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই, এটিও ঈমান ভঙ্গের কারণ।
মুরজিয়াগণ বলে থাকে, ঈমানের জন্য আমলের কোন প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র অন্তরের বিশ্বাস ও সত্যায়নই যথেষ্ট। কিন্তু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের (أَهْلُ السُنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ) মতে, কোনো ব্যক্তির সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে সালাত কায়েম করতে, সিয়াম পালন করতে, যাকাত আদায় করতে, ফরয হজ্জ আদায় করতে, হারাম থেকে বিরত থাকতে অথবা ফরয ইবাদাত আদায় করতে অস্বীকার করে এটাও ঈমান ভঙ্গের কারণ। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿ وَمَنْ يَكْفُرْ بِالْإِيْمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ ﴾
“আর যে ঈমানের সাথে কুফরী করবে, অবশ্যই তার আমল বরবাদ হবে এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” [সূরা ৫; আর-মায়িদাহ ৫]
প্রত্যেক মুসলিমকে অবশ্যই দুটি কাজ করতে হবে। দীনের জ্ঞান অর্জন করতে হবে, তদানুযায়ী আমল করতে হবে। ইলম ও আমল দুটিই আবশ্যক। আমলবিহীন ইলম যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, ঠিক তেমনি ইলমবিহীন আমলও গ্রহণযোগ্য নয়। একটি আরেকটির সাথে সম্পৃক্ত। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿ هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ ﴾
"তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি একে সকল দীনের উপর বিজয়ী করেন।" [সূরা ৯; আত-তাওবাহ ৩৩]
এ আয়াতে হিদায়াত (الْهُدَى) বলতে উপকারী ইলম (الْعِلْمُ النَّافِعُ) এবং সত্য দীন (دِينُ الْحَقِّ) বলতে নেক আমল (الْعَمَلُ الصَّالِحُ)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধুমাত্র ইলম নিয়ে প্রেরিত হননি, আবার শুধুমাত্র আমল নিয়েও প্রেরিত হননি। তিনি ইলম ও আমল দু'টি সহকারেই প্রেরিত হয়েছেন।
সূরা আল-ফাতিহায় আল্লাহ তাআলা দুই শ্রেণীর পথভ্রান্ত লোকের বর্ণনা দিয়েছেন। এক শ্রেণির লোক ইলমকে গ্রহণ করেছে, আমলকে ছেড়ে দিয়েছে, তারা হলো ইহুদী। আল্লাহ তাআলা এদেরকে الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ বা গজবপ্রাপ্ত বলেছেন। আরেক শ্রেণীর লোক আমলকে গ্রহণ করেছে, ইলমকে ছেড়ে দিয়েছে, এরা হলো খ্রিস্টান। এদেরকে আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লা - الضَّالِّينَ বা গোমরাহ বলেছেন। অনুরূপভাবে কিছু ভ্রান্ত সুফী রয়েছে, যারা আল্লাহ আয্যা ওয়া জাল্লার ইবাদাত করেন ইলমবিহীন, মূর্খতার সাথে। তারা বলে তুমি আমল করতে থাকলে ইলম তোমার অন্তরে ঢেলে দেয়া হবে। ইলম কিতাব থেকে নেওয়া লাগে না, ইলম সিনায় সিনায় স্থানান্তরিত হয়। এটাও গোমরাহী। যে ব্যক্তি ইলম থেকে বিমুখ হয়ে ইলম শিক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করে সে কাফির হিসেবে বিবেচিত হবে। আবার যে ব্যক্তি ইলমের পরেও আমলকে প্রত্যাখ্যান করে, সেও কাফির হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইলম শিক্ষা করার উদ্দেশ্য হলো তদানুযায়ী আমল করা। শুধুমাত্র জানার উদ্দেশ্যে বা তাকে আলিম বলার উদ্দেশ্যে বা প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে বা মানুষের নিকট একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করার উদ্দেশ্যে ইলম শিক্ষা লাভ করলে কিয়ামতের দিন জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
আবূ হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
«إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلُ اسْتُشْهِدَ فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا قَالَ قَاتَلْتُ فِيْكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ. قَالَ كَذَبْتَ وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لأَنْ يُقَالَ جَرِيء. فَقَدْ قِيلَ. ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ وَعَلَّمَهُ وَقَرَأَ الْقُرْآنَ فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا قَالَ تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ وَعَلَّمْتُهُ وَقَرَأْتُ فِيْكَ الْقُرْآنَ. قَالَ كَذَبْتَ وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعِلْمَ لِيُقَالَ عَالِمٌ. وَقَرَأْتَ الْقُرْآنَ لِيُقَالَ هُوَ قَارِئُ فَقَدْ قِيلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ. وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ كُلِّهِ فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيْهَا قَالَ مَا تَرَكْتُ مِنْ سَبِيلٍ تُحِبُّ أَنْ يُنْفَقَ فِيْهَا إِلَّا أَنْفَقْتُ فِيهَا لَكَ قَالَ كَذَبْتَ وَلَكِنَّكَ فَعَلْتَ لِيُقَالَ هُوَ جَوَادٌ. فَقَدْ قِيلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ ثُمَّ أُلْقِيَ فِي النَّارِ»
“কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে, সে হচ্ছে এমন একজন, যে শহীদ হয়েছিল। তাঁকে উপস্থিত করা হবে এবং আল্লাহ তাঁর নিয়ামতরাশির কথা তাকে বলবেন এবং সে তার সবটাই চিনতে পারবে (এবং যথারীতি তার স্বীকারোক্তিও করবে।) তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, এর বিনিময়ে 'কী আমল করেছিলে?' সে বলবে, আমি তোমারই পথে যুদ্ধ করেছি এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি বরং এ জন্যেই যুদ্ধ করেছিলে, যাতে লোকে তোমাকে বলে, তুমি বীর। তা বলা হয়েছে, এরপর নির্দেশ দেয়া হবে। সে মতে তাকে উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার করা হবে, যে জ্ঞান অর্জন ও বিতরণ করেছে এবং কুরআন মাজীদ অধ্যয়ন করেছে। তখন তাকে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রদত্ত নিয়ামতের কথা তাকে বলবেন এবং সে তা চিনতে পারবে (এবং যথারীতি তার স্বীকারোক্তিও করবে।) তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, এত বড় নিয়ামত পেয়ে বিনিময়ে তুমি কী করলে? জবাবে সে বলবে, আমি জ্ঞান অর্জন করেছি এবং তা শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমারই সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কুরআন অধ্যয়ন করেছি। জবাবে আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি তো জ্ঞান অর্জন করেছিলে এজন্যে, যাতে লোকে তোমাকে জ্ঞানী বলে। কুরআন তিলাওয়াত করেছিলে এ জন্যে, যাতে লোকে বলে, তুমি একজন ক্বারী। তা বলা হয়েছে। তারপর নির্দেশ দেয়া হবে, সে মতে তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার হবে, যাকে আল্লাহ তাআলা সচ্ছলতা এবং সর্ববিধ বিত্ত-বৈভব দান করেছেন। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে প্রদত্ত নিয়ামতসমূহের কথা তাঁকে বলবেন। সে তা চিনতে পারবে (স্বীকারোক্তিও করবে।) তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, 'এসব নিয়ামতের বিনিময়ে তুমি কী 'আমল করেছ?' জবাবে সে বলবে, সম্পদ ব্যয়ের এমন কোন খাত নেই, যাতে সম্পদ ব্যয় করা তুমি পছন্দ কর, আমি সে খাতে তোমার সন্তুষ্টির জন্যে ব্যয় করেছি। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি বরং এ জন্যে তা করেছিলে, যাতে লোকে তোমাকে 'দানবীর' বলে অভিহিত করে। তা বলা হয়েছে। তারপর নির্দেশ দেয়া হবে। সে মতে তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।" [সহীহ মুসলিম: ১৯০৫; জামে' আত-তিরমিযী: ২৩৮২]
(গ) কিছু মানুষ হককে প্রত্যাখ্যান করে ইলমকে গ্রহণ করে না, এরাও অহংকারীদের অন্তর্ভুক্ত। এটাও হকের প্রতি অহংকার করার কুফরী। মহান আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ كَفَرُوا عَمَّا أُنْذِرُوا مُعْرِضُونَ )
“আর যারা কুফরী করে, তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে তা থেকে তারা বিমুখ।” [সূরা ৪৬; আল-আহক্বাফ ৩]
(ঘ) কিছু মানুষ তাদের বাপ-দাদাদের সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করার জন্য দলীলকে প্রত্যাখ্যান করে, হক গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, তারা পূর্বের অবস্থার উপরে থাকার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়ী। যারা কবরকেন্দ্রিক ইবাদাত করে, তারা হককে গ্রহণ করে না, বরং বাতিল আকীদার প্রচার-প্রসারে ব্যস্ত থাকে। যতই তাদের সামনে কুরআন ও সুন্নাহর দলীল পেশ করা হোক, তাওহীদ ও সুন্নাহর আলোচনা করা হোক, বরং তারা কুরআন ও সুন্নাহর বিকৃত ব্যাখ্যা পেশ করে থাকে, তাওহীদ ও সুন্নাহর আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করে। এটাও বিশুদ্ধ দীন থেকে বিমুখ হওয়া এবং বাতিল দীনের উপর সন্তুষ্ট থাকা। মহান আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ آمَنُوا بِالْبَاطِلِ وَكَفَرُوا بِاللَّهِ أُولَبِكَ هُمُ الْخُسِرُونَ
"আর যারা বাতিলে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহকে অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্থ'।” [সূরা ২৯; আল-'আনকাবূত ৫২]
যখন আবূ তালিবের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে উপস্থিত হলেন। কারণ, আল্লাহর দীনের দাওয়াত ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করার ব্যাপারে তার অনেক অবদান রয়েছে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, «يَا عَمَّ، قُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، كَلِمَةً أَشْهَدُ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ» অর্থাৎ, “চাচাজান! 'লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু' কালেমা পাঠ করুন, তাহলে এর উসীলায় আমি আল্লাহর সমীপে আপনার জন্য সাক্ষী দিতে পারব”। আবূ তালিব সর্বশেষ সিদ্ধান্ত জানালেন, أَنَا عَلَى مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ অর্থাৎ, আমি আবদুল মুত্তালিবের আদর্শের উপরই আছি। [সহীহ বুখারী: ৪৪৯৪; সহীহ মুসলিম: ২৪] তিনি তাওহীদকে প্রত্যাখ্যান করে বাপ-দাদার বাতিল আকীদাকে ধরে রাখলেন।
মহান আল্লাহ বলেন, مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَ الَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ لِا بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَبُ الْجَحِيمِ
“নবী ও মুমিনদের জন্য উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে। যদিও তারা আত্মীয় হয়। তাদের নিকট এটা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে, নিশ্চয়ই তারা প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী।” [সূরা ৯; আত-তাওবাহ ১১৩]
(ঙ) কেউ কেউ বলে, মানুষকে তাওহীদ ও আকীদা শিক্ষা দেয়া জরুরি নয়, তারা তো সবাই মুসলিম। মুসলিম আবার আকীদা শিখতে হবে কেন? এ কথাটুকুও দীন শিক্ষা থেকে বিমুখ হওয়ার শামিল। কারণ, দীনের আকীদা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করা যায় না, এটি ইলমের মাধ্যমে লাভ করা যায়। যে ব্যক্তি لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ মুখে বলে, আর দীন শেখা ও আমল করার প্রয়োজন মনে করে না, এটিও ঈমান ভঙ্গের কারণ। ইসলামে ইলম এর সাথে দীনের সম্পর্ক থাকার কারণে ইলম শিক্ষাকে এত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
আবূ হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيْهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمُ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُوْنَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُوْنَهُ بَيْنَهُمْ إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ
“যে লোক জ্ঞানার্জনের জন্য রাস্তায় বের হয়, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। যখন কোনো সম্প্রদায় আল্লাহর গৃহসমূহের কোনো একটি গৃহে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সাথে মিলে (কুরআন) অধ্যয়নে লিপ্ত থাকে তখন তাদের উপর শান্তিধারা অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখেন। আর আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকটবর্তীদের (ফেরেশতাগণের) মধ্যে তাদের কথা আলোচনা করেন।" [সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯]
ইলম ও উলামায়ে কিরাম না থাকলে উম্মাহ ধ্বংস হয়ে যাবে। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا يَنْتَزِعُهُ مِنَ النَّاسِ وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ حَتَّى إِذَا لَمْ يَتْرُكْ عَالِمًا اتَّخَذَ النَّاسُ رُءُوْسًا جُهَالًا فَسُئِلُوْا فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ فَضَلُّوْا وَأَضَلُّوا»
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মানুষের কাছ থেকে ইলম ছিনিয়ে নেবেন না। তবে তিনি আলিম সম্প্রদায়কে উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ইলম উঠিয়ে নেবেন।
এমনকি যখন একজন আলিমও থাকবে না তখন মানুষেরা মূর্খ মানুষদেরকে নেতা বানিয়ে নেবে। মানুষ তাদের নিকট সামাধান চাইবে, এরপর তারা না জেনে ফাতাওয়া প্রদান করবে। ফলে তারা নিজেরাও গোমরাহ হবে এবং মানুষদের গোমবাহ করবে।" [সহীহ বুখারী: ১০০; সহীহ মুসলিম: ২৬৭৩]
আবূ উমাম'হ 'আল-বাহেলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«فَضْلُ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِي عَلَى أَدْنَاكُمْ ثُمَّ قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ وَأَهْلَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ حَتَّى النَّمْلَةَ فِي جُحْرِهَا وَحَتَّى الْحُوْتَ لَيُصَلُّونَ عَلَى مُعَلِّمِ النَّاسِ الْخَيْرَ»
“তোমাদের সাধারণ ব্যক্তির উপর আমার যতখানি মর্যাদা, ঠিক তেমনি একজন আলিমের মর্যাদা একজন আবিদের উপর। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ্, তাঁর ফেরেশতাগণ এবং আসমান-জমিনের অধিবাসীরা, এমনকি গর্তের পিঁপড়া এবং পানির মাছ পর্যন্ত সেই ব্যক্তির জন্য দু'আ করে যে মানুষকে কল্যাণকর জ্ঞান শিক্ষা দেয়।” [জামে' আত-তিরমিযী: ২৬৮৫; শাইখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন]
আবূ বারযাহ আল-আসলামী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«لَا تَزُوْلُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمْرِهِ فِيْمَا أَفْنَاهُ؟ وَعَنْ عِلْمِهِ فِيْمَا فَعَلَ فِيْهِ؟ وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ؟ وَفِيمَا أَنْفَقَهُ؟ وَعَنْ جِسْمِهِ فِيمَا أَبْلَاهُ؟»
“কোনো বান্দার পদদ্বয় কিয়ামত দিবসে এতটুকুও সরবে না, তাকে এ কয়টি বিষয় সম্পর্কে যে পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ না করা হবে- কিভাবে তার জীবনকালকে অতিবাহিত করেছে; তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কী আমল করেছে; কোথা হতে তার ধন-সম্পদ উপার্জন করেছে ও কোন কোন খাতে ব্যয় করেছে এবং কী কী কাজে তার শরীর বিনাশ করেছে।" [জামে আত-তিরমিযী: ২৪১৭; শাইখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
📄 ইলম শিক্ষা করা দু’ধরনের হয়ে থাকে
প্রথমত: এমন ইলম যা শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নারী ও পুরুষের উপর ফরযে আইন। এ ইলম না শেখার কোনো ওজর গ্রহণযোগ্য নয়। প্রত্যেক মুসলিম নারী ও পুরুষকে অবশ্যই সহীহ আকীদা সম্পর্কে জ্ঞান এবং তার বিপরীত বাতিল আকীদার জ্ঞান লাভ করতেই হবে। ইসলামের পাঁচটি রুকন সম্পর্কে অর্থাৎ শাহাদাতাইন, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্জ ও উমরাহ সম্পর্কে প্রত্যেক মুসলিমকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত: এমন ইলম, যা প্রত্যেকের জন্য ফরযে আইন নয়, এটি অর্জন করা ফরযে কিফায়াহ। সমাজের কিছুসংখ্যক মানুষ এ ইলম অর্জন করলে সবার থেকে ফরয আদায় হয়ে যাবে। এ ইলম হলো- লেনদেন, উত্তরাধিকার, বিবাহ, তালাক, দণ্ডবিধি প্রভৃতির জ্ঞান অর্জন করা।