📄 খিযির আলাইহিস সালামের পরিচয়
(أَهْلُ الْعِلْمِ) খিদির আলাইহিস সালামকে নিয়ে আহলুল ইলমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে-
প্রথমত: তিনি নবী নাকি ওলী?
কারো কারো কাছে- তিনি একজন নবী ছিলেন। কেননা এ সকল অস্বাভাবিক ঘটনা নবীদের মু'জিযার মতো।
কারো কারো কাছে- তিনি নবী ছিলেন না, তিনি একজন ওলী ছিলেন। এ সকল কর্মকাণ্ড মু'জিযা নয়, এগুলো কারামাত।
দ্বিতীয়ত: খিদির আলাইহিস সালাম জীবিত নাকি মৃত? বিশুদ্ধ দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে, খিদির আলাইহিস সালাম মারা গিয়েছেন।
মহান আল্লাহর বাণী- (وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِنْ قَبْلِكَ الْخُلْدَ أَفَإِنْ مِتَّ فَهُمُ الْخَالِدُونَ) "আর তোমার পূর্বে কোনো মানুষকে আমি স্থায়ী জীবন দান করিনি। সুতরাং, তোমার মৃত্যু হলে তারা কি অনন্ত জীবনসম্পন্ন হয়ে থাকবে?” [সূরা ২১; আল- আম্বিয়া ৩৪]
আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লা জানিয়ে দিলেন যে, এ সৃষ্টিজগতের কেউ স্থায়ী নয়, সবাইকে মৃত্যুবরণ করতেই হবে। মহান আল্লাহর বাণী- (كُلٌّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ) “জমিনের উপর যা কিছু রয়েছে, সবই ধ্বংসশীল।” [সূরা ৫৫; আর-রাহমান ২৬]
খিদির আলাইহিস সালাম আল্লাহর একজন বান্দা। তিনি অন্যান্য বান্দাদের মতোই ধ্বংসশীল।
তিনি যদি জীবিত থাকতেন, তাহলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসতেন এবং তাঁর অনুসরণ করতেন। কেননা, তিনি সকল মানুষের নিকট প্রেরিত হয়েছেন। এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়নি যে, খিদির আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসেছেন। এতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন।
তৃতীয়ত: খিদির আলাইহিস সালাম কেন মূসা আলাইহিস সালামের শরী'আত অনুসরণ করেননি?
মূসা আলাইহিস সালামের শরী'আত সমগ্র মানুষের জন্য ছিল না। শুধুমাত্র বনী ইসরাঈলের জন্য খাস ছিল। পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালামগণ একটি নির্দিষ্ট জাতির জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন, শুধুমাত্র মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষের জন্য প্রেরিত হয়েছেন।
জাবির বিন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
(وَكَانَ النَّبِيُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً، وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ كَافَّةً)
"অন্যান্য নবী নিজেদের বিশেষ গোত্রের প্রতি প্রেরিত হতেন আর আমাকে সকল মানবের প্রতি প্রেরণ করা হয়েছে।" [সহীহ বুখারী: ৪৩৮; সহীহ মুসলিম: ৫২১]
খিদির আলাইহিস সালাম মূসা আলাইহিস সালামের শরী'আতের আওতামুক্ত ছিলেন, একথা বলা যাবে না। কারণ, তিনি তো মূলত মূসা আলাইহিস সালামের উম্মাতই ছিলেন না। তাহলে আওতামুক্ত হবেন কিভাবে?
📄 শরী‘আতের আওতামুক্ত মনে করার ধরনসমূহ
(كَيْفِيَّاتُ الْخُرُوجِ عَنْ شَرِيعَةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ)
মুহাম্মাদ আলাইহিস সালামের শরী'আত থেকে বের হওয়া কয়েক ধরনের হতে পারে। তন্মধ্যে কিছু কুফরী, আর কিছু কুফরী নয়, ভ্রষ্টতা )ضَلَالَةٌ(। শরী'আত থেকে সম্পূর্ণ বের হওয়া, অথবা আংশিক বের হওয়া। যদি কোনো ব্যক্তি শরী'আত থেকে বের হয়, আর বের হওয়াকে বৈধ মনে করে তাহলে তা কুফরী হবে। আর কোনো ব্যক্তি শরী'আত থেকে বের হয়েছে, কিন্তু বের হওয়াকে বৈধ মনে করে না, তাহলে এটি কুফরী হবে না, গোমরাহী হবে।
(ক) কিছু সুফী বলে থাকে, যখন কেউ আল্লাহর মা'রিফাতের )الْمَعْرِفَةُ بِاللَّهِ( স্তরে পৌঁছে যায়, তখন তার আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী'আতের অনুসরণ প্রয়োজন হয় না )نَعُوْذُ بِاللهِ(। কারণ, শরী'আত সাধারণ মানুষের জন্য, এ ব্যক্তি এখন আর সাধারণ মানুষ নেই, এ ব্যক্তি এখন আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সুতরাং, এ ব্যক্তির এখন আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী'আত অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই।
তারা আরো বলে, আমরা ইল্ম গ্রহণ করি আল্লাহর থেকে সরাসরি, আর তোমরা ইল্ম গ্রহণ কর মৃত ব্যক্তিদের থেকে। "مَيِّتُ عَنْ مَيِّتٍ” অর্থাৎ হাদীসের সনদ ও তাফসীরকে বুঝায়। তারা আরো বলে, এ ধরনের ব্যক্তি আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার কারণে তাদের থেকে শরী'আত রহিত হয়ে যায়। তাদের আর সালাতের প্রয়োজন নেই, আল্লাহর কোনো ইবাদাতের প্রয়োজন নেই। তারা হালাল-হারামের বিধি-বিধান মানতে বাধ্য নয়, তাদের জন্য ব্যভিচার, সমকামিতা, গান-বাজনা প্রভৃতি হালাল )نَعُوذُ بِاللهِ (।
এ জাতীয় কথা-বার্তা যারা বলে থাকে, তারা আসলেই পাগল। আর পাগলের উপর শরী'আতের বিধি-বিধান প্রযোজ্য নয়। আর যদি কেউ সজ্ঞানে বলে তাহলে তা হবে আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লার প্রতি মিথ্যারোপ এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামগণের প্রতি কুফরী। ইবাদাত, ইলম, আল্লাহর মা'রিফাত যত বেশিই হোক না কেন, কোনো ব্যক্তিরই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী'আত থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই, বরং ইলম যত বাড়বে ততই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ )إِتَّبَاعُ( বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি এ জাতীয় আকীদাসমূহ পোষণ করবে, সে মুরতাদ হয়ে যাবে। কারণ সে কুরআনের প্রতি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি কুফরী করল। তাদের কুফরীর ব্যাপারে উম্মাতের ইজমা হয়ে গিয়েছে।
(খ) আবার কেউ কেউ এ আকীদা পোষণ করে যে, দীন ও রাষ্ট্র আলাদা। দীন ও ইবাদাতসমূহ মসজিদের ভেতর সীমাবদ্ধ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। এগুলো মানুষেরাই নির্ধারণ করবে। এ মতবাদের সূত্র হলো, "ধর্ম আল্লাহর, দেশ সবার )الدَّيْنُ لِلَّهِ وَالْوَطَنُ لِلْجَمِيعِ(” । এ মতবাদে বিশ্বাসীরাও ঐ জাহেল সুফীদের মতোই। অজ্ঞ সুফীরা বলে, কিছু ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী'আত থেকে আওতামুক্ত। এ মতবাদে বিশ্বাসীরা বলে, অর্থনীতি, রাজনীতি প্রভৃতি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী'আতের আওতামুক্ত। সুতরাং এ মতবাদে বিশ্বাসী হলে তাদেরও ঈমান ভেঙে যাবে।
(গ) আবার এক শ্রেণির ধার্মিক রয়েছে, যারা বিশ্বাস করে যে, আকীদার বিষয় কুরআন ও সুন্নাহ থেকে নেওয়া জরুরি নয়। আকীদা আকলী বা যৌক্তিক দলীলের উপর নির্ভরশীল। এজন্য তারা আকীদার ক্ষেত্রে কুরআনের আয়াত ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ হাদীসকে সরল অর্থে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে না, বরং তারা ইলমে কালাম )عِلْمُ الْكَلَام( ও যুক্তিবিদ্যা (عِلْمُ الْمَنْطِقِ) প্রভৃতির মাধ্যমে আকীদা গ্রহণ করে। তারা আকীদাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী'আতের আওতামুক্ত মনে করে। অথচ আক্বীদাই হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী'আতের মূল বিষয়। মহান আল্লাহ বলেন,
وَإِنَّهُ لَكِتَبٌ عَزِيزٌ لَّا يَأْتِيْهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ ﴾تَنزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ ﴿
"...অবশ্যই এক মহিমাময় গ্রন্থ। কোনো মিথ্যা এতে অনুপ্রবেশ করবে না। সম্মুখ হতেও নয়, পশ্চাৎ হতেও নয়; এটা প্রজ্ঞাময় প্রশংসা আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ।" [সূরা ৪১; ফুসসিলাত ৪১-৪২]
(ঘ) আবার কিছু কিছু লোক রয়েছে, যারা বলে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী'আত ঐ যুগের জন্য প্রযোজ্য ছিল। বর্তমানে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে এ শরী'আত প্রযোজ্য নয়। এটিও কুফরী। কারণ মহান আল্লাহ বলেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ﴾
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে ইসলামকে পছন্দ করলাম।" [সূরা ৫; আল-মায়িদাহ ৩]
(ঙ) অনুরূপ তারাও এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে, যারা দীনের মধ্যে কোন বিদ'আত তৈরি করবে, আর বিশ্বাস করবে যে, এ বিদ'আতটিই উত্তম এবং আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লার নিকটবর্তী হওয়ার এটিই সহজ উপায়। এটিও কিছু কিছু বিষয়কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী'আতের বাইরে মনে করার শামিল। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ)
“যে ব্যক্তি এমন কোনো কর্ম করল যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” [সহীহ মুসলিম: ১৭১৮]
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدُّ
"কেউ আমাদের এ শরী'আতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত।” [সহীহ বুখারী: ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম: ১৭১৮]
ইরবাদ ইবনে সারিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ»
“সাবধান! (ধর্মে) প্রতিটি নব আবিষ্কার সম্পর্কে! কারণ প্রতিটি নব আবিষ্কার হলো বিদ'আত এবং প্রতিটি বিদ'আত হলো ভ্রষ্টতা।” [সুনান আবূ দাউদ: ৪৬০৭: শাইখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
এটিও ঈমান ভঙ্গের কারণ। তবে যদি সুন্নাতটিকে উত্তম বলে বিশ্বাস করে, আবার বিদ'আতটিও করে তা কুফরী নয়, তা গোমরাহী।
(চ) অনুরূপ যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে কিয়ামত পর্যন্ত নবুওয়াতের দাবি করবে এবং যারা ঐ মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদারকে অনুসরণ করবে তারা কাফির বলে গণ্য হবে। মহান আল্লাহ বলেন,
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّنَ )
“মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নয়; তবে আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী।” [সূরা ৩৩; আল-আহযাব ৪০]
ছাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي ثَلَاثُوْنَ كَذَّابُوْنَ كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيٌّ وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لَا نَبِيَّ بَعْدِي
“আমার উম্মাতের মধ্যে খুব শীঘ্রই ত্রিশজন ডাহা মিথ্যাবাদীর আবির্ভাব হবে। এদের সকলেই দাবি করবে যে, সে নবী। অথচ আমিই সর্বশেষ নবী, আমার পরে কোনো নবী নেই।” [জামে' আত-তিরমিযী: ২২১৯; সুনান আবু দাউদ: ৪২৫২; শাইখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]