📘 ইসলাম ও ঈমান ভঙ্গের কারণ > 📄 কাফিরদেরকে সহযোগিতা করার বিধান

📄 কাফিরদেরকে সহযোগিতা করার বিধান


মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদেরকে সহযোগিতা করা কয়েক ধরনের হতে পারে। (১) কাফিরদের কুফর, শির্ক ও গোমরাহীকে ভালোবেসে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সহযোগিতা করা। এটি নিঃসন্দেহে কুফরে আকবার বা বড় কুফরী। তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেবে।
মহান আল্লাহর বাণী- وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ ) “আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে নিশ্চয়ই তাদেরই একজন।” [সূরা ৫; আল-মায়িদাহ ৫১]
(২) ইচ্ছাকৃতভাবে বা তাদেরকে ভালোবেসে সাহায্য করে না, বরং তাদের মাঝে অবস্থান করার কারণে তাদেরকে সাহায্য করতে বাধ্য হয়, এ ব্যাপারেও কঠিন হুমকি রয়েছে এবং কুফরীর কারণে ঈমান ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বদরের যুদ্ধের দিন কিছু মুসলিম মুশরিকদের সাথে বের হতে বাধ্য হয়, তারা মুশরিকদের পছন্দ করে মক্কায় রয়ে গেছেন তাও নয় বরং তারা তাদের সম্পদ, দেশ ও সন্তান-সন্ততিকে ভালোবেসে মদীনায় হিজরত না করে মক্কায় থেকে যান, তারা কুফরকে, শির্ককে ও কাফিরদেরকে অপছন্দই করতো। এক্ষেত্রে যাদের হিজরতের সামর্থ থাকা সত্ত্বেও হিজরত করেন নি, আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লা তাদেরকে কঠিন শাস্তির ধমক দিয়েছেন, আর যারা হিজরতে সমর্থ ছিল না, আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লা তাদের ওজর গ্রহণ করেছেন। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّهُمُ الْمَلَئِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُSihimْ قَالُوا فِيمَ كُنْتُمْ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُولَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيرًا إِلَّا الْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَ النِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ لَا يَسْتَطِيعُونَ حِيلَةً وَلَا يَهْتَدُونَ سَبِيلًا فَأُولَئِكَ عَسَى اللَّهُ أَنْ يَعْفُوَ عَنْهُمْ وَكَانَ اللَّهُ عَفُوًّا غَفُورًا ))
“নিশ্চয়ই যারা নিজেদের প্রতি যুলমকারী, ফেরেশতারা তাদের জান কবজ করার সময় বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, আমরা জমিনে দুর্বল ছিলাম। ফেরেশতারা বলে, আল্লাহর জমিন কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা তাতে হিজরত করতে? সুতরাং ওরাই তারা, যাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম। আর তা মন্দ প্রত্যাবর্তনস্থল। তবে যে দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুরা কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো রাস্তা খুঁজে পায় না। অতঃপর আশা করা যায় যে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল।” [সূরা ৪; আন-নিসা ৯৭-৯৯]
(৩) যে ব্যক্তি বাধ্য না হয়েও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাহায্য করে, অথচ তার অন্তরে কাফিরদের ধর্মের প্রতি অপছন্দ বিদ্যমান, এটিও নিঃসন্দেহে বড় ধরনের গুনাহ এবং তার ব্যাপারে কুফরীর আশঙ্কা হয়।
(৪) যে সকল কাফিরদের সাথে মুসলিমদের চুক্তি রয়েছে, ঐ সকল কাফিরদের বিরুদ্ধে অন্য কাফিরদের সাহায্য করা, এটাও হারাম। কারণ এর দ্বারা মুসলিমদের চুক্তি ভঙ্গ হয়। চুক্তিবদ্ধ কাফিরদের হত্যা করা জায়েয নয়। কারণ এতে প্রতারণা হয়। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ قَتَلَ مُعَاهَدًا لَمْ يَرَحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ، وَإِنَّ رِيحَهَا تُوْجَدُ مِنْ مَسِيْرَةِ أَرْبَعِيْنَ عامًا»
“যে ব্যক্তি কোনো জিম্মীকে হত্যা করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণ পাবে না। যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব হতে পাওয়া যাবে।” [সহীহ বুখারী: ৩১৬৬]
(৫) কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করে, তাদেরকে ভালোবাসে কিন্তু কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করে না। এ অবস্থাকেও আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লা নিষেধ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُولَبِكَ كَتَبَ فِي قُلُوْبِهِمُ )
“তুমি পাবে না এমন জাতিকে, যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনে, বন্ধুত্ব করতে তার সাথে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে, যদিও তারা তাদের পিতা, অথবা পুত্র, অথবা ভাই, অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। এরাই তারা, যাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন।” [সূরা ৫৮; আল- মুজাদালাহ ২২]
মহান আল্লাহ আরো বলেন,
وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ ابْرَاهِيمَ لِأَبِيْهِ إِلَّا عَنْ مَّوْعِدَةٍ وَعَدَهَا إِيَّاهُ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُوٌّ لِلَّهِ تَبَرًا مِنْهُ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَا وَّالًا حَلِيمٌ )
“নিজ পিতার জন্য ইবরাহীমের ক্ষমা প্রার্থনা তো ছিল একটি ওয়াদার কারণে, যে ওয়াদা সে তাকে দিয়েছিল। অতঃপর যখন তার নিকট স্পষ্ট হয়ে গেল যে, নিশ্চয়ই সে আল্লাহর শত্রু, সে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল। নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিল অধিক প্রার্থনাকারী ও সহনশীল।” [সূরা ৯; আত-তাওবাহ ১১৪]
মহান আল্লাহ আরো বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَآءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِٱلْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُواْ بِمَا جَآءَكُم مِّنَ ٱلْحَقِّ يُخْرِجُونَ ٱلرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَن تُؤْمِنُواْ بِٱللَّهِ رَبِّكُمْ إِن كُنتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَٰدًا فِى سَبِيلِى وَٱبْتِغَآءَ مَرْضَاتِى تُسِرُّونَ إِلَيْهِم بِٱلْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَآ أَعْلَنتُمْ وَمَن يَفْعَلْهُ مِنكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَآءَ ٱلسَّبِيلِ (1) إِن يَثْقَفُوكُمْ يَكُونُواْ لَكُمْ أَعْدَآءً وَيَبْسُطُوٓاْ إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ وَأَلْسِنَتَهُم بِٱلسُّوٓءِ وَوَدُّواْ لَوْ تَكْfُرُونَ (3) لَن تَنفَعَكُمْ أَرْحَامُكُمْ وَلَآ أَوْلَٰدُكُمْ يَوْمَ ٱلْقِيَٰمَةِ يَفْصِلُ بَيْنَكُمْ وَٱللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ (3) قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِىٓ إِبْرَٰهِيمَ وَٱلَّذِينَ مَعَهُۥٓ إِذْ قَالُواْ لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَءَٰٓؤُاْ مِّنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ ٱلْعَدَٰوَةُ وَٱلْبَغْضَآءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤْمِنُواْ بِٱللَّهِ وَحْدَهُۥ ...
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করো না, অথচ তোমাদের কাছে যে সত্য এসেছে তা তারা অস্বীকার করেছে এবং রাসূলকে ও তোমাদেরকে বের করে দিয়েছে এজন্য যে, তোমরা তোমাদের রব আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছ। তোমরা যদি আমার পথে সংগ্রামে ও আমার সন্তুষ্টির সন্ধানে বের হও (তবে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না) তোমরা গোপনে তাদের সাথে বন্ধুত্ব প্রকাশ কর অথচ তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর তা আমি জানি। তোমাদের মধ্যে যে এমন করবে সে সরল পথ হতে বিচ্যুত হবে। তারা যদি সুযোগ পায় তবে তোমাদের শত্রু হবে এবং মন্দ নিয়ে তোমাদের দিকে তাদের হাত ও যবান বাড়াবে; তারা কামনা করে যদি তোমরা কুফরী করতে! কিয়ামত দিবসে তোমাদের আত্মীয়তা ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের কোনো উপকার করতে পারবে না। তিনি তোমাদের মাঝে ফায়সালা করে দেবেন। তোমরা যা কর আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। ইবরাহীম ও তার সাথে যারা ছিল তাদের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। তারা যখন স্বীয় সম্প্রদায়কে বলছিল, তোমাদের সাথে এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যা কিছুর উপাসনা কর তা হতে আমরা সম্পর্কমুক্ত। আমরা তোমাদেরকে অস্বীকার করি এবং উদ্রেক হলো আমাদের- তোমাদের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আন।..." [সূরা ৬০; আল-মুমতাহিনাহ ১-৪]
মহান আল্লাহ আরো বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ قَدْ يَبِسُوا مِنَ الْآخِرَةِ كَمَا يَبِسَ الْكُفَّارُ مِنْ أَصْحُبِ الْقُبُورِ )
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা সেই সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করো না, যাদের প্রতি আল্লাহ রাগান্বিত হয়েছেন। তারা তো আখিরাত সম্পর্কে নিরাশ হয়ে পড়েছে, যেমনিভাবে কাফিররা কবরবাসীদের সম্পর্কে নিরাশ হয়েছে।” [সূরা ৬০; আল-মুমতাহিনাহ ১৩]

📘 ইসলাম ও ঈমান ভঙ্গের কারণ > 📄 কাফিরদের সাথে বৈরিতা পোষণের নীতিমালা

📄 কাফিরদের সাথে বৈরিতা পোষণের নীতিমালা


এ বিষয়ে শরী'আতের কিছু বিধি-বিধান রয়েছে-
(১) মুসলিম নারীকে কোনো কাফির পুরুষের সাথে বিবাহ দেয়ার হুকুম কোনো মুসলিম নারীকে ইয়াহুদী, খ্রিস্টান, মূর্তিপূজারী, প্রকৃতিবাদী বা নাস্তিক পুরুষের সাথে বিবাহ দেয়া বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكْتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَامَةٌ مُّؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُّشْرِكَةٍ وَ لَوْ خَيْرٌ مِنْ مُّشْرِكٍ وَ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُّؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ لَوْ أَعْجَبَكُمْ أُولَبِكَ يَدْعُوْنَ إِلَى النَّارِ ۚ وَاللَّهُ يَدْعُوا إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ )
“আর তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে এবং মুমিন দাসী মুশরিক নারীর চেয়ে নিশ্চয়ই উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে। আর মুশরিক পুরুষদের সাথে বিয়ে দিয়ো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। আর একজন মুমিন দাস একজন মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে। তারা তোমাদেরকে আগুনের দিকে আহবান করে, আর আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে তোমাদেরকে জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন।” [সূরা ২; আল-বাক্বারাহ ২২১]
তবে যখন কুফরী, মূর্তিপূজা, নাস্তিকতা পরিহার করে ইসলামে প্রবেশ করবে, তখন তার সাথে মুসলিম নারীদের বিবাহ বৈধ হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءَكُمُ الْمُؤْمِنتُ مُهْجِرَتٍ فَامْتَحِنُوهُنَّ اللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيْمَانِهِنَّ فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَةٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلَّوْنَ لَهُنَّ )
“হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কাছে মু'মিন মহিলারা হিজরত করে আসলে তোমরা তাদেরকে পরীক্ষা করে দেখ। আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে অধিক অবগত। অতঃপর যদি তোমরা জানতে পার যে, তারা মুমিন মহিলা, তাহলে তাদেরকে আর কাফিরদের নিকট ফেরত পাঠিও না। তারা কাফিরদের জন্য বৈধ নয় এবং কাফিররাও তাদের জন্য হালাল নয়।” [সূরা ৬০; আল- মুমতাহিনাহ ১০]
প্রথমে মুসলিম ছিল, তখন তার সাথে মুসলিম নারীর বিবাহ হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে স্বামীর ঈমান ভেঙে গিয়েছে, তাহলে তাদের বিবাহও ভেঙে যাবে। আর মুসলিম পুরুষ কাফির নারীকে বিবাহ করতে পারবে কি না- এ ব্যাপারে নিয়ম হলো-
কাফির নারী যদি আহলে কিতাব ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বী হয়, তাহলে সর্বসম্মতভাবে তাকে বিবাহ করা বৈধ নয়। মহান আল্লাহর বাণী- وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكْتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ
“আর তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে।” [সূরা ২; আল-বাক্বারাহ ২২১]
আর যদি আহলে কিতাব নারী হয়, তাহলে শর্তসাপেক্ষে তাদেরকে বিবাহ করা জায়েয। মহান আল্লাহ বলেন, الْيَوْمَ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبْتُ وَطَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ حِلٌّ لَكُمْ وَطَعَامُكُمْ حِلٌّ لَّهُمْ وَالْمُحْصَنْتُ مِنَ الْمُؤْمِنَتِ وَالْمُحْصَنْتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلِكُمْ
"আজ তোমাদের জন্য বৈধ করা হলো সব ভালো বস্তু এবং যাদেরকে কিতাব প্রদান করা হয়েছে, তাদের খাবার তোমাদের জন্য বৈধ এবং তোমাদের খাবার তাদের জন্য বৈধ। আর মুমিন সচ্চরিত্রা নারী এবং তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে, তাদের সচ্চরিত্রা নারীদের সাথে তোমাদের বিবাহ বৈধ।” [সূরা ৫; আল-মায়িদাহ ৫]
এ আয়াতে কারীমা থেকে বুঝা যায়, আহলে কিতাবের নারীদের বিবাহ করার জন্য দুটি শর্ত রয়েছে:
প্রথম শর্ত হলো: সচ্চরিত্রবান হওয়া, ব্যভিচারিণী না হওয়া।
মহান আল্লাহ বলেন, وَالزَّانِيَةُ لَا يَنْكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ
“এবং ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী অথবা মুশরিক ছাড়া বিয়ে করবে না। আর মুমিনদের উপর এটা হারাম করা হয়েছে।" [সূরা ২৪; আন-নূর ৩]
দ্বিতীয় শর্ত হলো: আসমানী কিতাবের অনুসারী হওয়া। অর্থাৎ, তাওরাত, ইঞ্জিল বা যাবূরের অনুসারী হতে হবে। প্রকৃত ইয়াহুদী বা খ্রিস্টান হতে হবে। ইয়াহুদী বা খ্রিস্টানের নামে মূর্তিপূজারী, নাস্তিক বা প্রকৃতিপূজারী হওয়া যাবে না।
তবে এখানে একটি প্রশ্ন হতে পারে, ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানেরা আহলে কিতাব হলেও তারা তো কাফিরের অন্তর্ভুক্ত। আর স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে তো ভালোবাসার সম্পর্ক থাকবে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً )
"আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা ৩০; আর-রূম ২১]
তাহলে কাফিরের সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক কিভাবে হবে? অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,
لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصْرَى أَوْلِيَاءَ )
"ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।” [সূরা ৫; আল-মায়িদাহ ৫১]
এর উত্তরে বলা যায় যে, স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা বিবাহের কারণে প্রাকৃতিক ভালোবাসা। এটি দীনের কারণে ঈমানী ভালোবাসা নয়। অমুসলিমদের প্রতি ঈমানী ভালোবাসা বৈধ নয়।
(২) কাফিরদের সাথে বাহ্যিক সদাচরণ বৈধ, যখন তারা আমাদের প্রতি কোনো জুলুম বা অত্যাচার না করে। তবে তাদের সাথে আন্তরিক ভালোবাসা বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেন,
لَا يَنْهُكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِيْنَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّيْنِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ )
“দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করছেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।” [সূরা ৬০; আল-মুমতাহিনাহ ৮]
এ বাহ্যিক সদাচরণ দাওয়াতের ক্ষেত্রে সহায়ক। এ আচরণের ফলে তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হবে।
(৩) কাফিরদের সাথে দুনিয়াবী লেনদেন বৈধ। যেমন- তাদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করা, জিনিস ক্রয়-বিক্রয় করা। মুসলিমগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে কাফিরদের থেকে কাপড়-চোপড়, জুতা-স্যান্ডেল, অস্ত্রশস্ত্র প্রভৃতি ক্রয় করতেন।
(৪) কাফিরদেরকে কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেয়া বৈধ। যে বিষয়ে মুসলিম পারদর্শী কর্মী পাওয়া যাবে না, সে বিষয়গুলোতে অমুসলিমদের নিয়োগ দেয়া যাবে। এটিও ক্রয়-বিক্রয়ের মতোই।
(৫) কাফির পিতামাতার প্রতি সদাচরণ মুসলিম সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। যদিও কাফিরের প্রতি ভালোবাসা বৈধ নয়। মহান আল্লাহর বাণী:
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ ﴾
“এমন জাতিকে তুমি পাবে না যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনে, অথচ বন্ধুত্ব করে তার সাথে, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতায় লিপ্ত, যদি তারা তাদের পিতা, অথবা পুত্র, অথবা ভাই, অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠীও হয়।" [সূরা ৫৮; আল-মুজাদালাহ ২২]
কিন্তু ইসলাম ইহসান ও অনুগ্রহের দীন। এজন্য আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লা নির্দেশ দিয়েছেন,
وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهُنًا عَلَى وَهْنٍ وَ فِصْلُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَى الْمَصِيرُ (٢) وَإِنْ جَاهَدُكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا
"আর আমি মানুষকে তার মাতাপিতার ব্যাপারে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু'বছরে। সুতরাং, আমার ও তোমার পিতামাতার শুকরিয়া আদায় কর। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই। আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শির্ক করতে জোর চেষ্টা করে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তখন তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়ায় তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে।” [সূরা ৩১; লুকমান ১৪-১৫]
(৬) কাফিরদের পক্ষ থেকে অনিষ্টতার আশঙ্কা করলে, তাদের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাদের কিছু সম্পদ দেয়া অথবা জাগতিক কিছু দেয়া বন্ধুত্বের )اَلْمُوَالَا( অন্তর্ভুক্ত নয়।
একে শরী'আতের ভাষায় নরম ব্যবহার )اَلْمُدَارَةُ( বলা হয়। মহান আল্লাহর বাণী: لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً )
“মুমিনরা যেন মুমিনদের ছাড়া কাফিরদেরকে বন্ধু না বানায়। আর যে কেউ এরূপ করবে, আল্লাহর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে যদি তাদের পক্ষ থেকে তোমাদের কোনো ভয়ের আশঙ্কা থাকে।" [সূরা ৩; আলে-ইমরান ২৮]
নরম ব্যবহার )اَلْمُدَارَاةُ( ও চাটুকারিতার )اَلْمُدَاهَنَةُ( মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নরম ব্যবহার )اَلْمُدَارَاةُ( কাফিরদের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে জায়েয। কিন্তু চাটুকারিতার মাধ্যমে )اَلْمُدَاهَنَةُ( কাফিরদের সন্তুষ্ট করার জন্য দীনের কোনো অংশ বাদ দেয়া জায়েয নেই। আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লা বলেন,
فَلَا تُطِعِ الْمُكَذِّبِينَ (2) وَدُّوا لَوْ تُدْهِنُ فَيُدْهِنُونَ ))
“অতএব, তুমি মিথ্যারোপকারীদের আনুগত্য করো না। তারা কামনা করে, যদি তুমি আপোষকামী হও, তবে তারাও আপোষকারী হবে।” [সূরা ৬৮; আল- কুলাম ৮-৯]
যখন কাফিরগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এ প্রস্তাব নিয়ে আসলো যে, তারা এক বছর আল্লাহর ইবাদাত করবে, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বছর তাদের মা'বুদদের ইবাদাত করবেন। আল্লাহ তাআলা সূরা নাযিল করে নিষেধ করে দিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, قُلْ يَأَيُّهَا الْكَفِرُونَ ( لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ ) وَلَا أَنْتُمْ عُبِدُوْنَ مَا اعْبُدُ وَلَا أَنَا عَابِدٌ مَّا عَبَدْتُمْ ) وَلَا أَنْتُمْ عُبِدُونَ مَا أَعْبُدُ لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ ))
“বল, হে কাফিররা, তোমরা যার ইবাদাত কর আমি তার ইবাদাত করি না এবং আমি যার ইবাদাত করি তোমরা তার ইবাদাতকারী নও। আর তোমরা যার ইবাদাত করছ আমি তার ইবাদাতকারী হব না। আর তোমরা যার ইবাদাত করছ আমি তার ইবাদাতকারী হব না। আর আমি যার ইবাদাত করি তোমরা তার ইবাদাতকারী হবে না। তোমাদের জন্য তোমাদের দীন আর আমার জন্য আমার দীন।" [সূরা ১০৯; আল-কাফিরুন]
তাদের এ প্রস্তাবে সাড়া দিতে তাকে নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ আরো বলেন,
وَّإِنْ كَادُوا لَيَفْتِنُونَكَ عَنِ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ لِتَفْتَرِى عَلَيْنَا غَيْرَهُ وَإِذَا لَّا تَّخَذُوكَ خَلِيلًا (73) وَلَوْلَا أَنْ ثَبَّتْنَكَ لَقَدْ كِدْتَ تَرْكَنُ إِلَيْهِمْ شَيْئًا قَلِيلًا () إِذًا لَّا ذَقْنَكَ ضِعْفَ الْحَيُوةِ وَ ضِعْفَ الْمَمَاتِ ثُمَّ لَا تَجِدُ لَكَ عَلَيْنَا نَصِيرًا )
“আর তাদের অবস্থা এমন ছিল যে, আমি তোমাকে যে ওহী দিয়েছি, তা থেকে তারা তোমাকে প্রায় ফিতনায় ফেলে দিয়েছিল, যাতে তুমি আমার নামে এর বিপরীত মিথ্যা রটাতে পার এবং তখন তারা অবশ্যই তোমাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত। আর আমি যদি তোমাকে অবিচল না রাখতাম, তবে অবশ্যই তুমি তাদের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়তে, তখন আমি অবশ্যই তোমাকে আস্বাদন করাতাম জীবনের দ্বিগুণ ও মরণের দ্বিগুণ আযাব। তারপর তুমি তোমার জন্য আমার বিরুদ্ধে কোনো সাহায্যকারী পাবে না।” [সূরা ১৭; আল-ইসরা ৭৩-৭৫]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00