📄 আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল্লার বিধান ছাড়া অন্য বিধান দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করা
যে মুসলিম ব্যক্তি বিশ্বাস করবে যে, যুগ পরিবর্তন হয়ে গেছে, কুরআন ও সুন্নাহর বিধান ঐ যুগে প্রযোজ্য ছিল, বর্তমান যুগে এ বিধানগুলো যুগোপযোগী নয়। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বর্তমান যুগোপযোগী আইন-কানুন প্রয়োগ করা প্রয়োজন, সে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে অর্থাৎ মুরতাদ হয়ে যাবে।
যে মুসলিম ব্যক্তি এ চিন্তা-চেতনা পোষণ করবে যে, শরী'আহ আইন এ যুগে বাস্তবায়ন করা যাবে না, এ যুগে মানুষের তৈরি আইন-কানুন বাস্তবায়ন করতে হবে। এ চিন্তা-চেতনা মহান আল্লাহর প্রতি কুফরী। কারণ শরী'আতের আইন-কানুন কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক স্থানে সমভাবে প্রযোজ্য। এ বিশ্বাস প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানের অংশ।
যদি কেউ বলে, শরী'আতের দণ্ডবিধি বাস্তবায়ন, ব্যভিচারীকে রজম করা, চোরের হাত কর্তন, মুরতাদকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান, হত্যাকারীর কিসাসের বিধান এগুলো কঠিন আইন, বর্বর আইন, বর্তমান সভ্যতার যুগে এ সকল বিধান প্রযোজ্য নয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে।
এমনিভাবে যদি কেউ বলে, ইচ্ছা করলে শরী'আহ আইনও মানা যাবে, আবার ইচ্ছা করলে অন্য আইন-কানুনও মানা যাবে। তারও ঈমান ভেঙে যাবে। কারণ মহান আল্লাহ বলেন, (وَأَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ وَلَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ ) "আর তাদের মধ্যে তার মাধ্যমে ফায়সালা কর, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।” [সূরা ৫; আল-মায়িদাহ ৪৯]
মহান আল্লাহ আরো বলেন, (وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلًا مُّبِينًا ) "আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজেদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না; আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।” [সূরা ৩৩; আল-আহযাব ৩৬]
আল্লাহ তাআলার বিধান অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করা একটি অন্যতম ইবাদাত। তাই আল্লাহর প্রত্যেক বান্দার উপর ফরয, সে আল্লাহর আইনের সামনে মাথা নত করবে। সে এ আকীদা পোষণ করবে যে, এর সমপর্যায়ের অথবা এর থেকে উত্তম আর কোনো আইন পৃথিবীতে নেই। কোনো বান্দা আল্লাহর ইবাদাত করা বা না করার ইখতিয়ার রাখে না।
মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُوْلِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
“মুমিনদেরকে যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এ মর্মে আহ্বান করা হয় যে, তিনি তাদের মধ্যে বিচার, মীমাংসা করবেন, তাদের কথা তো এই হয় যে, তখন তারা বলে, 'আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম'।" [সূরা ২৪; আন-নূর ৫১]
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, “তবে যে ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, মহান আল্লাহর ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আইন ছাড়া অন্য আইন দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করা বৈধ নয়, কিন্তু প্রকৃতির তাড়নায়, সম্পদের লোভের কারণে, পদ-পদবির লোভে, ক্ষমতার মোহে, মহান আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আইন বাস্তবায়ন করে না, তার জন্যও এটা বৈধ নয়, সেও ছোট কুফর (الْكُفْرُ الْأَصْغَرُ) করলো। এটাও আমলী কুফর, কবীরা গুনাহ। তবে সে ব্যক্তি মুরতাদ নয়।" [হাকিম, আল-মুসতাদরাক: ২/৩১৩]
মহান আল্লাহর আইন দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা বলতে কেউ কেউ সম্পদ নিয়ে বিরোধ, বিভিন্ন অধিকার নিয়ে বিরোধ প্রভৃতিকে বুঝে থাকেন। অর্থাৎ আদালতের বিচার-আচারকেই শুধু বুঝে থাকেন। মহান আল্লাহর আইনের বাস্তবায়ন বলতে সহীহ আকীদাও এর অন্তর্ভুক্ত। মানুষের বাতিল আকীদাকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সহীহ আকীদায় ফিরিয়ে আনা এটিও আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের অন্তর্ভুক্ত। এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, আকীদা প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যাপার। আকীদা বাদ দিয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর দীন কায়েম করি, এটি একটি বাতিল কথা। আকীদার ব্যাপারে প্রত্যেকে স্বাধীন, এ বিশ্বাস কুফরী আকীদা। সুতরাং প্রতিপালনের তাওহীদ (تَوْحِيْدُ الرُّبُوبَيَّةِ), নাম ও গুণাবলির তাওহীদ (تَوْحِيدُ الْأَسْمَاءِ وَالصِّفَاتِ) এবং ইবাদাতের তাওহীদ (تَوْحِيْدُ الْأُلُوْهِيَّةِ) এর ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ী আকীদা হওয়া আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের মূল কাজ।
যিনি ইবাদাতের তাওহীদ (تَوْحِيدُ الْأُلُوْهِيَّةِ) বিশুদ্ধ করবেন, এ তাওহীদই তাকে বাধ্য করবে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করতে। কারণ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করা যাবে না, অন্য কারো হুকুম মানা যাবে না, এ সহীহ আকীদাই আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের মূল ভিত্তি। এ জন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু'আজ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়েমেনে পাঠিয়ে নির্দেশ দিলেন,
فَادْعُهُمْ إِلَى شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنِّي رَسُوْلُ اللَّهِ»
"সুতরাং তাদেরকে আহ্বান জানাবে এ সাক্ষ্য দেয়ার জন্য, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো ইলাহ (উপাস্য) নেই আর আমি আল্লাহর রাসূল।" [সহীহ বুখারী: ১৪৫৮; সহীহ মুসলিম: ১৯]
সমস্ত নবী আলাইহিমুস সালামগণই সহীহ আকীদার দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের সূচনা করেন। তারা মানুষের সামনে কুফর, শির্ক প্রভৃতি স্পষ্ট করেন। ঠিক একইভাবে নাম ও গুণাবলির (الْأَسْمَاءُ وَالصَّفَاتُ) ক্ষেত্রে আশা'ইরা (اَلْأَشَاعِرَةُ), মু'তাজিলা (اَلْمُعْتَزِلَةُ), জামিয়্যাহ (الْجَهْمِيَّةُ) - মুরজিয়াহ (الْمُرْجِئةُ), খারেজী (اَلْخَوَارِجُ) ও মাতুরিদিয়্যাহ (الْمَاتُوْرِيدِيَّةُ) দের বাতিল আকীদা দূর করাও আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের অন্তর্ভুক্ত। এ সকল বাতিল আকীদার সাথে আপোষ করাও বাতিল আকীদার অন্তর্ভুক্ত। বিদ'আত দূর করাও আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ প্রত্যেকটি আকীদা ও ইবাদাত কুরআন ও সুন্নাহর আইন অনুযায়ী হবে। এর ব্যতিক্রম হলেই তা বাতিল। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ)
“যে ব্যক্তি এমন কোনো কর্ম করলো, যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” [সহীহ মুসলিম: ১৭১৮]
ইরবাদ ইবনু সারিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُوْرِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ»
“সাবধান! (ধর্মে) প্রতিটি নব আবিষ্কার সম্পর্কে! কারণ প্রতিটি নব আবিষ্কার হলো বিদ'আত এবং প্রতিটি বিদ'আত হলো ভ্রষ্টতা।” [সুনান আবূ দাউদ: ৪৬০৭; শাইখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন]
সুতরাং আল্লাহর আইন কায়েম (اَلْحُكْمُ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ) এটি ব্যাপক। শুধুমাত্র আদালতের বিচার-আচার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং আকীদাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।