📘 ইসলাম ও ঈমান ভঙ্গের কারণ > 📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ

📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ


এ কথার দ্বারা বুঝানো হয়- চরিত্রের ক্ষেত্রে, শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে, দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে, মানুষের সাথে আচার-ব্যবহারের ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ।
জাবির বিন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ وَخَيْرُ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم
"উত্তম বাণী হলো আল্লাহর কিতাব এবং উত্তম পথ হলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত পথ।” [সহীহ মুসলিম: ৮৬৭]
তিনি মানুষের সাথে আচার-ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ আদর্শবান ছিলেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,
(وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ ) “আর নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত।” [সূরা ৬৮; আল-ক্বালাম ৪] মহান আল্লাহ আরো বলেন,
( فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ )
“অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের জন্য নম্র হয়েছিলেন। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের, কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর।” [সূরা ৪; আলে-ইমরান ১৫৯]
তিনি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুন্দর পদ্ধতিতে শিক্ষাদান করতেন। তিনি এক্ষেত্রে রাগ ও কঠোরতা পরিহার করতেন। যেমন আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত ঐ ব্যক্তির ঘটনা, যিনি মসজিদে ঢুকে প্রস্রাব করে দিয়েছিলেন। তিনি তাকে প্রস্রাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত ধমক না দিতে নির্দেশ দিলেন। অতঃপর এক বালতি পানি ঢেলে দিতে বললেন। আর তাকে বললেন,
( إِنَّ هَذِهِ الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلُحُ لِشَيْءٍ مِنْ هَذَا الْبَوْلِ وَلَا الْقَذَرِ إِنَّمَا هِيَ لِذِكْرِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ وَالصَّلَاةِ وَقِرَاءَةِ الْقُرْآنِ»
“এটা হলো মাসজিদ। এখানে প্রস্রাব করা কিংবা ময়লা আবর্জনা ফেলা যায় না বরং এ হলো আল্লাহর যিকর, সালাত আদায় এবং কুরআন পাঠ করার স্থান।” [সহীহ বুখারী: ২১৯; সহীহ মুসলিম: ২৮৫]
এছাড়াও আরো অনেক ঘটনা রয়েছে, যার মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম আদর্শ তা প্রমাণিত হয়। এছাড়াও তিনি মানুষকে কষ্ট দেয়ার জন্য বা তাকে কেউ কষ্ট দিলেও রাগ করতেন না বরং এ ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করতেন। তবে তিনি আল্লাহর অধিকারের ক্ষেত্রে আল্লাহর জন্য রাগ করতেন।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
وَمَا انْتَقَمَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِنَفْسِهِ فِي شَيْءٍ قَطُّ، إِلَّا أَنْ تُنْتَهَكَ حُرْمَةُ اللَّهِ، فَيَنْتَقِمَ بِهَا لِلَّهِ
অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্য কখনো কোনো ব্যাপারে প্রতিশোধ নিতেন না, অবশ্য কেউ আল্লাহ্ নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য তার প্রতিশোধ নিতেন। [সহীহ বুখারী: ৬১২৬; সহীহ মুসলিম: ২৩২৭]
এমনিভাবে আবূ হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে, যখন এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ঋণ পরিশোধ করার জন্য তাঁর উপর কঠোর হলো, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
«دَعُوهُ فَإِنَّ لِصَاحِبِ الْحَقِّ مَقَالًا ثُمَّ قَالَ أَعْطُوهُ سِنَّا مِثْلَ سِنِهِ قَالُوْا يَا رَسُوْلَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا أَمْثَلَ مِنْ سِنِهِ فَقَالَ أَعْطُوْهُ فَإِنَّ مِنْ خَيْرِكُمْ أَحْسَنَكُمْ قَضَاءً»
“তাকে ছেড়ে দাও। কেননা, পাওনাদারদের কড়া কথা বলার অধিকার রয়েছে। তারপর তিনি বললেন, তার উটের সমবয়সী একটি উট তাকে দিয়ে দাও। তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা নেই। এর চেয়ে উত্তম উট রয়েছে। তিনি বললেন, তাই দিয়ে দাও। তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোৎকৃষ্ট, যে ঋণ পরিশোধের বেলায় উত্তম।" [সহীহ বুখারী: ২৩০৬; সহীহ মুসলিম: ১৬০১]
তিনি তাঁর পরিবারের সাথে আচার-আচরণের ক্ষেত্রেও 'সর্বোত্তম আদর্শ' ছিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي وَإِذَا مَاتَ صَاحِبُكُمْ فَدَعُوهُ
"তোমাদের মাঝে সে-ই ভালো যে তার পরিবারের নিকট ভালো। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চেয়ে উত্তম। আর তোমাদের কোনো সঙ্গী মৃত্যুবরণ করলে তার সমালোচনা পরিত্যাগ করো।” [ জামে' আত-তিরমিযী: ৩৮৯৫; শাইখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
এ সকল ক্ষেত্রে যদি কেউ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাইতে অন্য কাউকে উত্তম আদর্শ মনে করে, সে বড় কুফরী (الْكُفْرُ الْأَكْبَرُ) করবে। যদি কেউ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের বা ফায়সালার চাইতে অন্য কারো নির্দেশকে উত্তম মনে করে, সে কুফরী করলো। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লার পক্ষ থেকে পৌঁছানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত (مُبَلِّغُ)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ মূলত: আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লার নির্দেশ। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرِكَ اللَّهُ "নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি যথাযথভাবে কিতাব নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষের মধ্যে ফায়সালা কর সে অনুযায়ী, যা আল্লাহ তোমাকে দেখিয়েছেন।" [সূরা ৪; আন-নিসা ১০৫]
মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَأَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ ... “আর তাদের মধ্যে তার মাধ্যমে ফায়সালা কর, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন...।” [সূরা ৫; আল-মায়িদাহ ৪৯]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করা ঈমানের অন্যতম শর্ত। মহান আল্লাহ বলেন, فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا “অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফায়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়।" [সূরা ৪; আন-নিসা ৬৫]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ থেকে বিমুখ হওয়া কোনো মুমিন নারী ও পুরুষের জন্য বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلًا مُبِينًا "আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজেদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না; আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।” [সূরা ৩৩; আল-আহযাব ৩৬]
মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَ مَا آتَكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَ مَا نَهِكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ )
“রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে তিনি তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।” [সূরা ৫৯; আল-হাশর ৭]
মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى ))
“আর সে মনগড়া কথা বলে না। তা তো কেবল ওহী, যা তাঁর প্রতি ওহীরূপে প্রেরণ করা হয়।” [সূরা ৫৩; আন-নাজম ৩-৪]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লার পক্ষ থেকে ওহী, আল-কুরআনুল কারীমের তাফসীর এবং ইসলামী শরী'আতের দ্বিতীয় উৎস। ফলে কুরআনকে যেভাবে সম্মান করতে হবে, সহীহ হাদীসকেও সেভাবে সম্মান করতে হবে। কুরআনকে যেভাবে গ্রহণ করতে হবে, সহীহ হাদীসকেও সেভাবে গ্রহণ করতে হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ)
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রবর্তী হয়ো না এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” [সূরা ৪৯; আল-হুজুরাত ১]
প্রত্যেক মুসলিমের উপর এটি দায়িত্ব ও কর্তব্য যে, তিনি শরী'আতের সমস্ত হুকুম-আহকাম মহান আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ থেকে গ্রহণ করবেন। দলীলবিহীন অথবা ভালো মনে করে নিজের মতানুযায়ী কোনো হুকুম-আহকাম গ্রহণ করা যাবে না। কোনো ব্যক্তির মতকে আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনার উপরে স্থান দেয়া যাবে না। অতএব, যে ব্যক্তি এ বিশ্বাস পোষণ করবে যে, আল্লাহ আয্যা ওয়া জাল্লার নির্দেশের চাইতে অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের চাইতে অন্য কোনো মাখলুকের নির্দেশ অধিক সুন্দর বা উত্তম সে কুফরী করলো এটি ঈমান ও ইসলাম ভঙ্গের অন্যতম কারণ。

📘 ইসলাম ও ঈমান ভঙ্গের কারণ > 📄 আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল্লার বিধান ছাড়া অন্য বিধান দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করা

📄 আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল্লার বিধান ছাড়া অন্য বিধান দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করা


যে মুসলিম ব্যক্তি বিশ্বাস করবে যে, যুগ পরিবর্তন হয়ে গেছে, কুরআন ও সুন্নাহর বিধান ঐ যুগে প্রযোজ্য ছিল, বর্তমান যুগে এ বিধানগুলো যুগোপযোগী নয়। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বর্তমান যুগোপযোগী আইন-কানুন প্রয়োগ করা প্রয়োজন, সে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে অর্থাৎ মুরতাদ হয়ে যাবে।
যে মুসলিম ব্যক্তি এ চিন্তা-চেতনা পোষণ করবে যে, শরী'আহ আইন এ যুগে বাস্তবায়ন করা যাবে না, এ যুগে মানুষের তৈরি আইন-কানুন বাস্তবায়ন করতে হবে। এ চিন্তা-চেতনা মহান আল্লাহর প্রতি কুফরী। কারণ শরী'আতের আইন-কানুন কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক স্থানে সমভাবে প্রযোজ্য। এ বিশ্বাস প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানের অংশ।
যদি কেউ বলে, শরী'আতের দণ্ডবিধি বাস্তবায়ন, ব্যভিচারীকে রজম করা, চোরের হাত কর্তন, মুরতাদকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান, হত্যাকারীর কিসাসের বিধান এগুলো কঠিন আইন, বর্বর আইন, বর্তমান সভ্যতার যুগে এ সকল বিধান প্রযোজ্য নয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে।
এমনিভাবে যদি কেউ বলে, ইচ্ছা করলে শরী'আহ আইনও মানা যাবে, আবার ইচ্ছা করলে অন্য আইন-কানুনও মানা যাবে। তারও ঈমান ভেঙে যাবে। কারণ মহান আল্লাহ বলেন, (وَأَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ وَلَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ ) "আর তাদের মধ্যে তার মাধ্যমে ফায়সালা কর, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।” [সূরা ৫; আল-মায়িদাহ ৪৯]
মহান আল্লাহ আরো বলেন, (وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلًا مُّبِينًا ) "আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজেদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না; আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।” [সূরা ৩৩; আল-আহযাব ৩৬]
আল্লাহ তাআলার বিধান অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করা একটি অন্যতম ইবাদাত। তাই আল্লাহর প্রত্যেক বান্দার উপর ফরয, সে আল্লাহর আইনের সামনে মাথা নত করবে। সে এ আকীদা পোষণ করবে যে, এর সমপর্যায়ের অথবা এর থেকে উত্তম আর কোনো আইন পৃথিবীতে নেই। কোনো বান্দা আল্লাহর ইবাদাত করা বা না করার ইখতিয়ার রাখে না।
মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُوْلِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
“মুমিনদেরকে যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এ মর্মে আহ্বান করা হয় যে, তিনি তাদের মধ্যে বিচার, মীমাংসা করবেন, তাদের কথা তো এই হয় যে, তখন তারা বলে, 'আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম'।" [সূরা ২৪; আন-নূর ৫১]
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, “তবে যে ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, মহান আল্লাহর ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আইন ছাড়া অন্য আইন দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করা বৈধ নয়, কিন্তু প্রকৃতির তাড়নায়, সম্পদের লোভের কারণে, পদ-পদবির লোভে, ক্ষমতার মোহে, মহান আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আইন বাস্তবায়ন করে না, তার জন্যও এটা বৈধ নয়, সেও ছোট কুফর (الْكُفْرُ الْأَصْغَرُ) করলো। এটাও আমলী কুফর, কবীরা গুনাহ। তবে সে ব্যক্তি মুরতাদ নয়।" [হাকিম, আল-মুসতাদরাক: ২/৩১৩]
মহান আল্লাহর আইন দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা বলতে কেউ কেউ সম্পদ নিয়ে বিরোধ, বিভিন্ন অধিকার নিয়ে বিরোধ প্রভৃতিকে বুঝে থাকেন। অর্থাৎ আদালতের বিচার-আচারকেই শুধু বুঝে থাকেন। মহান আল্লাহর আইনের বাস্তবায়ন বলতে সহীহ আকীদাও এর অন্তর্ভুক্ত। মানুষের বাতিল আকীদাকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সহীহ আকীদায় ফিরিয়ে আনা এটিও আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের অন্তর্ভুক্ত। এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, আকীদা প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যাপার। আকীদা বাদ দিয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর দীন কায়েম করি, এটি একটি বাতিল কথা। আকীদার ব্যাপারে প্রত্যেকে স্বাধীন, এ বিশ্বাস কুফরী আকীদা। সুতরাং প্রতিপালনের তাওহীদ (تَوْحِيْدُ الرُّبُوبَيَّةِ), নাম ও গুণাবলির তাওহীদ (تَوْحِيدُ الْأَسْمَاءِ وَالصِّفَاتِ) এবং ইবাদাতের তাওহীদ (تَوْحِيْدُ الْأُلُوْهِيَّةِ) এর ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ী আকীদা হওয়া আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের মূল কাজ।
যিনি ইবাদাতের তাওহীদ (تَوْحِيدُ الْأُلُوْهِيَّةِ) বিশুদ্ধ করবেন, এ তাওহীদই তাকে বাধ্য করবে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করতে। কারণ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করা যাবে না, অন্য কারো হুকুম মানা যাবে না, এ সহীহ আকীদাই আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের মূল ভিত্তি। এ জন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু'আজ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়েমেনে পাঠিয়ে নির্দেশ দিলেন,
فَادْعُهُمْ إِلَى شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنِّي رَسُوْلُ اللَّهِ»
"সুতরাং তাদেরকে আহ্বান জানাবে এ সাক্ষ্য দেয়ার জন্য, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো ইলাহ (উপাস্য) নেই আর আমি আল্লাহর রাসূল।" [সহীহ বুখারী: ১৪৫৮; সহীহ মুসলিম: ১৯]
সমস্ত নবী আলাইহিমুস সালামগণই সহীহ আকীদার দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের সূচনা করেন। তারা মানুষের সামনে কুফর, শির্ক প্রভৃতি স্পষ্ট করেন। ঠিক একইভাবে নাম ও গুণাবলির (الْأَسْمَاءُ وَالصَّفَاتُ) ক্ষেত্রে আশা'ইরা (اَلْأَشَاعِرَةُ), মু'তাজিলা (اَلْمُعْتَزِلَةُ), জামিয়‍্যাহ (الْجَهْمِيَّةُ) - মুরজিয়াহ (الْمُرْجِئةُ), খারেজী (اَلْخَوَارِجُ) ও মাতুরিদিয়‍্যাহ (الْمَاتُوْرِيدِيَّةُ) দের বাতিল আকীদা দূর করাও আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের অন্তর্ভুক্ত। এ সকল বাতিল আকীদার সাথে আপোষ করাও বাতিল আকীদার অন্তর্ভুক্ত। বিদ'আত দূর করাও আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ প্রত্যেকটি আকীদা ও ইবাদাত কুরআন ও সুন্নাহর আইন অনুযায়ী হবে। এর ব্যতিক্রম হলেই তা বাতিল। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ)
“যে ব্যক্তি এমন কোনো কর্ম করলো, যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” [সহীহ মুসলিম: ১৭১৮]
ইরবাদ ইবনু সারিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُوْرِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ»
“সাবধান! (ধর্মে) প্রতিটি নব আবিষ্কার সম্পর্কে! কারণ প্রতিটি নব আবিষ্কার হলো বিদ'আত এবং প্রতিটি বিদ'আত হলো ভ্রষ্টতা।” [সুনান আবূ দাউদ: ৪৬০৭; শাইখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন]
সুতরাং আল্লাহর আইন কায়েম (اَلْحُكْمُ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ) এটি ব্যাপক। শুধুমাত্র আদালতের বিচার-আচার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং আকীদাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00