📘 ইসলাম ও ঈমান ভঙ্গের কারণ > 📄 ইবাদাতের রুকনসমূহ

📄 ইবাদাতের রুকনসমূহ


প্রত্যেকটি জিনিস কিছু খুঁটির উপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে। খুঁটি যখন সরে যায় তখন জিনিসটি ঢলে পড়ে। মহান আল্লাহর ইবাদাতেরও কয়েকটি খুঁটি রয়েছে, এর যেকোনো একটি খুঁটি সরে গেলে সেটি আর মহান আল্লাহর ইবাদাত থাকে না। ইবাদাতের রুকন তিনটি।
প্রথম রুকন: ভালোবাসা )الْمَحَبَّةُ( মহান আল্লাহকে পরিপূর্ণ ভালোবেসে ইবাদাতটি করতে হবে। যদি এক্ষেত্রে ইবাদাত করে আল্লাহ তাআলার, কিন্তু আল্লাহ তাআলাকে সর্বোচ্চ ভালোবাসে না, তা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত হিসেবে গণ্য হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, وَ مِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ امَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
“আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহকে ভালোবাসার মতো তাদেরকে ভালোবাসে। আর যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালোবাসায় দৃঢ়তর।" [সূরা ২; আল-বাক্বারাহ ১৬৫]
মহান আল্লাহ বলেন,
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَ اَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَ عَشِيْرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَ تِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللَّهِ وَ رَسُوْلِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيْلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ )
"বল, 'তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ, যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সেই ব্যবসা, যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছ এবং সে বাসস্থান, যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত'।" [সূরা ৯; আত-তাওবাহ ২৪]
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
ثَلَاثُ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيْمَانِ: مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبُّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهُ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ أَنْ أَنْقَذَهُ اللهُ مِنْهُ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ»
“তিনটি বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে রয়েছে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ অনুভব করবে- (১) অন্য সবার তুলনায় যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক প্রিয়, (২) যে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তাঁর বান্দাকে ভালোবাসে এবং (৩) যাকে আল্লাহ কুফ্র থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তারপর সে কুফরের দিকে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করে যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে।” [সহীহ বুখারী: ২১; সহীহ মুসলিম: ৪৩]
দ্বিতীয় রুকন: আশা করা )الرَّجَاءُ(
প্রত্যেকটি ইবাদাতের মধ্যে মহান আল্লাহর নিকট থেকে সাওয়াব প্রাপ্তির, রহমত প্রাপ্তির এবং তাঁর সন্তুষ্টির আশা করতে হবে। আশা না থাকলে সেটি মহান আল্লাহর ইবাদাত হিসেবে গণ্য হবে না। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّهُمْ كَانُوا يُسْرِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خُشِعِينَ )
“তারা সৎ কাজে প্রতিযোগিতা করত। আর আমাকে আশা ও ভীতিসহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী।” [সূরা ২১; আল-আম্বিয়া ৯০] মহান আল্লাহ আরো বলেন,
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِّنْ دُونِهِ فَلَا يَمْلِكُونَ كَشْفَ الضُّرِّ عَنْكُمْ وَلَا تَحْوِيلًا أُولَئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا “বল, 'তাদেরকে ডাক, আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে (উপাস্য) মনে কর। তারা তো তোমাদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার ও পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না'। তারা যাদেরকে ডাকে, তারা নিজেরাই তো তাদের রবের কাছে নৈকট্যের মাধ্যম অনুসন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে তাঁর নিকটতর? আর তারা তাঁর রহমতের আশা করে এবং তাঁর আযাবকে ভয় করে। নিশ্চয়ই তোমার রবের আযাব ভীতিকর।” [সূরা ১৭; আল-ইসরা ৫৬-৫৭]
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَبْلَ وَفَاتِهِ بِثَلَاثٍ، يَقُوْلُ: «لَا يَمُوْتَنَّ أَحَدُكُمْ إِلَّا وَهُوَ يُحْسِنُ بِاللَّهِ الظَّنَّ» “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর তিন দিন আগে তাকে আমি এ কথা বলতে শুনেছি যে, তোমাদের সকলেই যেন আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা পোষণরত অবস্থায় মারা যায়।” [মুসলিম: ২৮৭৭; আবূ দাউদ: ৩১১৩]
তৃতীয় রুকন: ভয় করা (الْخَوْفُ)
একজন মুসলিম তার রবের ইবাদাত করবে পরিপূর্ণ ভালোবাসার সাথে, তাঁর থেকে সাওয়াব লাভের আশায়, জান্নাত প্রাপ্তির আশায়, ঠিক একইভাবে তার উদ্দেশ্য থাকবে মহান আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচা, জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করা। মহান আল্লাহকে ভয় করাও ইবাদাতের একটি রুকন। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمُوا ) “বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।" [সূরা ৩৫; ফাতির ২৮]
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«وَاللَّهِ إِنِّي لَأَرْجُوْ أَنْ أَكُونَ أَخْشَاكُمْ لِلَّهِ»
“আল্লাহর শপথ! আমার আশা, আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে সর্বাধিক ভয় করি।” [সহীহ মুসলিম: ১১১০; আবু দাউদ: ২৩৮৯]

📘 ইসলাম ও ঈমান ভঙ্গের কারণ > 📄 ইবাদাত বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ

📄 ইবাদাত বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ


কিছু বিষয় এমন রয়েছে, যা ইবাদাতকে নষ্ট করে দেয়। এ বিষয়সমূহের কোনো একটি পাওয়া গেলে ঐ ইবাদাতের আর কোনো মূল্য থাকে না। নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইবাদাত ভঙ্গকারী বিষয় আলোচনা করা হলো:
(ক) আল্লাহ তাআলার ইবাদাতে শির্ক করা
মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে অথবা মহান আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ইবাদাতে শরীক করার দ্বারা তার সকল ইবাদাত বিনষ্ট হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَبِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَ لَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ )
“আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” [সূরা ৩৯; আয-যুমার ৬৫]
(খ) ঈমান ভঙ্গ হওয়া:
ইসলাম ও ঈমান ভঙ্গের কোনো একটি কারণ সংঘটিত হলে তার সকল ইবাদাত বিনষ্ট হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَلَا يَزَالُوْنَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَنْ دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُوا وَمَنْ يَرْتَدِدُ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرُ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَ أُولَئِكَ أَصْحُبُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خُلِدُونَ )
"আর তারা তোমাদের সাথে লড়াই করতে থাকবে, যতক্ষণ না তোমাদেরকে তোমাদের দীন থেকে ফিরিয়ে দেয়, তারা যদি পারে। আর যে তোমাদের মধ্য থেকে তাঁর দীন থেকে ফিরে যাবে, অতঃপর কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে। বস্তুত এদের আমলসমূহ দুনিয়া ও আখিরাতে বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।" [সূরা ২; আল-বাক্বারাহ ২১৭]
(গ) রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা
কোনো ইবাদাত মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে করলে ঐ ইবাদাতটি বিনষ্ট হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, (يَأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَا تُبْطِلُوا صَدَقْتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِيْ يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ ) “হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সাদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মতো, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে।” [সূরা ২; আল-বাক্বারাহ ২৬৪]
(ঘ) খোঁটা দেওয়া
ইবাদাত করার পর যদি ঐ ইবাদাতটির খোঁটা দেয়া হয় তাহলে ইবাদাতটি বিনষ্ট হয়ে যায়। যেমন- কাউকে দান করা একটি ইবাদাত। দান করার পর তাকে খোঁটা দিলে ঐ দানের কোনো সাওয়াব পাওয়া যাবে না। আবূ যার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلَا يُزَكِّيْهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ) قَالَ: فَقَرَأَهَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَلَاثَ مِرَارًا، قَالَ أَبُو ذَرٍّ: خَابُوا وَخَسِرُوا، مَنْ هُمْ يَا رَسُوْلَ اللهِ؟ قَالَ: «الْمُسْبِلُ، وَالْمَنَّانُ، وَالْمُنَفِّقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الْكَاذِبِ»
“আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণীর লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না বরং তাদের জন্য রয়েছে ভয়ানক শাস্তি। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাটি তিনবার পাঠ করলেন। আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলে উঠলেন, তার তো ধ্বংস হবে, সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হে আল্লাহর রাসূল! এরা কারা? তিনি বললেন, যে লোক পায়ের গোছার নিচে কাপড় ঝুলিয়ে চলে, কোনো কিছু দান করে খোঁটা দেয় এবং মিথ্যা শপথ করে পণ্যদ্রব্য বিক্রি করে।" [সহীহ মুসলিম: ১০৬]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00