📄 ইবাদাতের প্রকারভেদ
ইবাদাতের প্রকারসমূহের মধ্য থেকে কোনো একটি ইবাদাত একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে করলেই সে মুশরিক হয়ে যাবে। চাই তা মূর্তি, পাথর, গাছ, জিন, মানুষ, জীবিত বা মৃত যাই হোক না কেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ تَعَالَوْا اتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا )
"বল, 'এসো, তোমাদের উপর তোমাদের রব যা হারাম করেছেন, তা তিলাওয়াত করি যে, তোমরা তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না।” [সূরা ৬; আল-আন'আম ১৫১]
ইবাদাতকে সালাফে সালেহীনগণ বিভিন্নভাবে ভাগ করেছেন। নিম্নে একটি শ্রেণীভাগ আলোচনা করা হলো-
(১) ক্বালবী ইবাদাত )اَلْعِبَادَاتُ الْقَلْبِيَّةُ(: যে ইবাদাতগুলো ক্বালব দ্বারা হয়। যেমন- ইখলাস, তাওয়াক্কুল, আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, আল্লাহকে ভালোবাসা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসা, সবর, মহান আল্লাহর ভয়, আশা, নিয়্যাত প্রভৃতি। অপরদিকে যা নিষিদ্ধ, যেমন- অহঙ্কার, হিংসা, রিয়া, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া প্রভৃতি।
(২) মৌখিক ইবাদাত )اَلْعِبَادَاتُ الْقَوْلِيَّةُ(: যে ইবাদাতগুলো মুখ দ্বারা করা হয়। যেমন- ঈমানের সাক্ষ্য দেয়া, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ, তাহলীল, যিকর-আযকার, সালাম দেয়া, জবাব দেয়া, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ প্রভৃতি। অপরদিকে যেগুলো নিষিদ্ধ- বিদ'আতী কথা বলা, অপবাদ দেয়া, মুসলিমকে গালি দেয়া, মিথ্যা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া প্রভৃতি।
(৩) আমলী ইবাদাত )اَلْعِبَادَاتُ الْعَمَلِيَّةُ(: ক্বালব ও মুখ ছাড়া অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে যে ইবাদাতগুলো করা হয়। যেমন- ওযু, তায়াম্মুম, সালাত, যাকাত, হজ্জ, সিয়াম, পরিবারের খরচ নির্বাহ করা, সাদাকাহ করা, তাওয়াফ করা প্রভৃতি। নিষিদ্ধ যেমন- মানুষ হত্যা করা, সুদ খাওয়া, ঘুষ খাওয়া, জিনা করা, মদ পান করা প্রভৃতি।
📄 ইবাদাতের স্বরূপ
ইবাদাত মানুষের অন্তরের অবস্থা, তার সকল কথা, কর্ম সব কিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে। একজন মুসলিম মহান আল্লাহকে ভালোবেসে তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যত কিছু করে সবই মহান আল্লাহর ইবাদাত। কোনো কথা বলবে তা আল্লাহর জন্য, কোন কথা বলা পরিহার করবে তাও আল্লাহর জন্য। কোন কাজ করবে তা আল্লাহর জন্য, কোন কাজ করা পরিহার করবে তাও আল্লাহর জন্য। তার জীবনের সমস্ত কিছুই আল্লাহর জন্য, এমনকি তার মৃত্যুও আল্লাহর জন্যই হবে। ইসলামে এটিই ইবাদাতের স্বরূপ। মহান আল্লাহ বলেন,
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ ) “বল, 'নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির রব'। তাঁর কোনো শরীক নেই।” [সূরা ৬; আল-আন'আম ১৬২-১৬৩]
যেমন- ইলম অন্বেষণ করা, রিস্ক অন্বেষণ করা, পরিবারের জন্য খরচ করা, মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ করা, উত্তম চরিত্রে ভূষিত হওয়া প্রভৃতিও মহান আল্লাহর ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত। আবূ হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
كُلُّ سُلَامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ، كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيْهِ الشَّمْسُ قَالَ: تَعْدِلُ بَيْنَ الْاِثْنَيْنِ صَدَقَةٌ، وَتُعِيْنُ الرَّجُلَ فِي دَابَّتِهِ فَتَحْمِلُهُ عَلَيْهَا، أَوْ تَرْفَعُ لَهُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ قَالَ: «وَالْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ خُطْوَةٍ تَمْشِيْهَا إِلَى الصَّلَاةِ صَدَقَةٌ، وَتُمِيطُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
“প্রত্যেক ব্যক্তির শরীরের প্রত্যেকটি গ্রন্থির উপর প্রতিদিনের সাদাক্বাহ্ ধার্য রয়েছে। দু'ব্যক্তির মধ্যে ইনসাফ করে দেয়াও একটি সাদাক্বাহ্। কোনো ব্যক্তিকে সওয়ারির উপর আরোহণে সাহায্য করা অথবা তার মালামাল সওয়ারির উপরে তুলে দেয়াও একটি সাদাক্বাহ্। তিনি আরো বলেন, সকল প্রকার ভালো কথাই এক একটি সাদাক্বাহ্, সালাত আদায়ের জন্য মাসজিদে যেতে যতটি পদক্ষেপ ফেলা হয় তার প্রতিটিই এক একটি সাদাক্বাহ্ এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও একটি সাদাক্বাহ্।” [সহীহ বুখারী: ২৯৮৯; সহীহ মুসলিম: ১০০৯]
আবূ যার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«لَا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوْفِ شَيْئًا، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ
"ভালো কোনো কিছু দান করাকে হীন মনে করো না, এমনকি হোক সেটা ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ দেয়া।" [সহীহ মুসলিম: ২৬২৬]
আবূ যার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে:
أَنَّ نَاسًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالُوا لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ، ذَهَبَ أَهْلُ الدُّثُوْرِ بِالْأُجُوْرِ، يُصَلُّوْنَ كَمَا نُصَلِّي، وَيَصُوْمُوْنَ كَمَا نَصُوْمُ، وَيَتَصَدَّقُوْنَ بِفُضُوْلِ أَمْوَالِهِمْ، قَالَ: «أَوَلَيْْسَ قَدْ جَعَلَ اللهُ لَكُمْ مَا تَصَّدَّقُوْنَ؟ إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ تَكْبِيرَةٍ صَدَقَةً، وَكُلَّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةً، وَكُلَّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةً، وَأَمْرُ بِالْمَعْرُوْفِ صَدَقَةٌ، وَنَهْي عَنْ مُنْكَرٍ صَدَقَةٌ، وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَيَأْتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُوْنُ لَهُ فِيْهَا أَجْرُ؟ قَالَ: «أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرَامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيْهَا وِزْرُ؟ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الْحَلَالِ كَانَ لَهُ أَجْرُ»
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিছু সংখ্যক সাহাবী তার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ধন-সম্পদের মালিকেরা তো সব সাওয়াব নিয়ে নিচ্ছে। কেননা, আমরা যেভাবে সালাত আদায় করি তারাও সেভাবে আদায় করে। আমরা যেভাবে সিয়াম পালন করি তারাও সেভাবে সিয়াম পালন করে। কিন্তু তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে সাওয়াব লাভ করছে অথচ আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা কি তোমাদেরকে এমন অনেক কিছু দান করেননি, যা সাদাকাহ করে তোমরা সাওয়াব পেতে পার? আর তা হলো প্রত্যেক তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ) একটি সাদাকাহ, প্রত্যেক তাকবীর (আল্লাহু আকবার) একটি সাদাকাহ, প্রত্যেক তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বলা একটি সাদাকাহ, প্রত্যেক 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলা একটি সাদাকাহ, প্রত্যেক ভালো কাজের আদেশ দেয়া এবং মন্দ কাজ করতে দেখলে নিষেধ করা ও বাধা দেয়া একটি সাদাকাহ্। এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে সাদাকাহ রয়েছে। অর্থাৎ, আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও একটি সাদাকাহ। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কেউ তার কাম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করবে বৈধ পথে আর এতেও কি তার সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, যদি তোমাদের কেউ হারাম পথে নিজের চাহিদা মেটাত বা যিনা করত তাহলে কি তার গুনাহ হতো না? অনুরূপ যখন সে হালাল বা বৈধ পথে কামাচার করবে তাতে তার সাওয়াব হবে।" [সহীহ মুসলিম: ১০০৬]
আবূ মাসউদ আল-বদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّ الْمُسْلِمَ إِذَا أَنْفَقَ عَلَى أَهْلِهِ نَفَقَةً، وَهُوَ يَحْتَسِبُهَا، كَانَتْ لَهُ صَدَقَةٌ»
“মুসলিম ব্যক্তি সাওয়াবের আশায় তার পরিবার-পরিজনের জন্য যা কিছু খরচ করবে তা সবই তার জন্য সদাকাহ অর্থাৎ দান হিসেবে গণ্য হবে।" [সহীহ বুখারী: ৪০০৬; সহীহ মুসলিম: ১০০২]
📄 ইবাদাতের রুকনসমূহ
প্রত্যেকটি জিনিস কিছু খুঁটির উপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে। খুঁটি যখন সরে যায় তখন জিনিসটি ঢলে পড়ে। মহান আল্লাহর ইবাদাতেরও কয়েকটি খুঁটি রয়েছে, এর যেকোনো একটি খুঁটি সরে গেলে সেটি আর মহান আল্লাহর ইবাদাত থাকে না। ইবাদাতের রুকন তিনটি।
প্রথম রুকন: ভালোবাসা )الْمَحَبَّةُ( মহান আল্লাহকে পরিপূর্ণ ভালোবেসে ইবাদাতটি করতে হবে। যদি এক্ষেত্রে ইবাদাত করে আল্লাহ তাআলার, কিন্তু আল্লাহ তাআলাকে সর্বোচ্চ ভালোবাসে না, তা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত হিসেবে গণ্য হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, وَ مِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ امَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
“আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহকে ভালোবাসার মতো তাদেরকে ভালোবাসে। আর যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালোবাসায় দৃঢ়তর।" [সূরা ২; আল-বাক্বারাহ ১৬৫]
মহান আল্লাহ বলেন,
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَ اَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَ عَشِيْرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَ تِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللَّهِ وَ رَسُوْلِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيْلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ )
"বল, 'তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ, যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সেই ব্যবসা, যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছ এবং সে বাসস্থান, যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত'।" [সূরা ৯; আত-তাওবাহ ২৪]
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
ثَلَاثُ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيْمَانِ: مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبُّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهُ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ أَنْ أَنْقَذَهُ اللهُ مِنْهُ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ»
“তিনটি বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে রয়েছে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ অনুভব করবে- (১) অন্য সবার তুলনায় যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক প্রিয়, (২) যে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তাঁর বান্দাকে ভালোবাসে এবং (৩) যাকে আল্লাহ কুফ্র থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তারপর সে কুফরের দিকে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করে যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে।” [সহীহ বুখারী: ২১; সহীহ মুসলিম: ৪৩]
দ্বিতীয় রুকন: আশা করা )الرَّجَاءُ(
প্রত্যেকটি ইবাদাতের মধ্যে মহান আল্লাহর নিকট থেকে সাওয়াব প্রাপ্তির, রহমত প্রাপ্তির এবং তাঁর সন্তুষ্টির আশা করতে হবে। আশা না থাকলে সেটি মহান আল্লাহর ইবাদাত হিসেবে গণ্য হবে না। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّهُمْ كَانُوا يُسْرِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خُشِعِينَ )
“তারা সৎ কাজে প্রতিযোগিতা করত। আর আমাকে আশা ও ভীতিসহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী।” [সূরা ২১; আল-আম্বিয়া ৯০] মহান আল্লাহ আরো বলেন,
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِّنْ دُونِهِ فَلَا يَمْلِكُونَ كَشْفَ الضُّرِّ عَنْكُمْ وَلَا تَحْوِيلًا أُولَئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا “বল, 'তাদেরকে ডাক, আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে (উপাস্য) মনে কর। তারা তো তোমাদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার ও পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না'। তারা যাদেরকে ডাকে, তারা নিজেরাই তো তাদের রবের কাছে নৈকট্যের মাধ্যম অনুসন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে তাঁর নিকটতর? আর তারা তাঁর রহমতের আশা করে এবং তাঁর আযাবকে ভয় করে। নিশ্চয়ই তোমার রবের আযাব ভীতিকর।” [সূরা ১৭; আল-ইসরা ৫৬-৫৭]
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَبْلَ وَفَاتِهِ بِثَلَاثٍ، يَقُوْلُ: «لَا يَمُوْتَنَّ أَحَدُكُمْ إِلَّا وَهُوَ يُحْسِنُ بِاللَّهِ الظَّنَّ» “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর তিন দিন আগে তাকে আমি এ কথা বলতে শুনেছি যে, তোমাদের সকলেই যেন আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা পোষণরত অবস্থায় মারা যায়।” [মুসলিম: ২৮৭৭; আবূ দাউদ: ৩১১৩]
তৃতীয় রুকন: ভয় করা (الْخَوْفُ)
একজন মুসলিম তার রবের ইবাদাত করবে পরিপূর্ণ ভালোবাসার সাথে, তাঁর থেকে সাওয়াব লাভের আশায়, জান্নাত প্রাপ্তির আশায়, ঠিক একইভাবে তার উদ্দেশ্য থাকবে মহান আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচা, জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করা। মহান আল্লাহকে ভয় করাও ইবাদাতের একটি রুকন। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمُوا ) “বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।" [সূরা ৩৫; ফাতির ২৮]
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«وَاللَّهِ إِنِّي لَأَرْجُوْ أَنْ أَكُونَ أَخْشَاكُمْ لِلَّهِ»
“আল্লাহর শপথ! আমার আশা, আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে সর্বাধিক ভয় করি।” [সহীহ মুসলিম: ১১১০; আবু দাউদ: ২৩৮৯]
📄 ইবাদাত বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ
কিছু বিষয় এমন রয়েছে, যা ইবাদাতকে নষ্ট করে দেয়। এ বিষয়সমূহের কোনো একটি পাওয়া গেলে ঐ ইবাদাতের আর কোনো মূল্য থাকে না। নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইবাদাত ভঙ্গকারী বিষয় আলোচনা করা হলো:
(ক) আল্লাহ তাআলার ইবাদাতে শির্ক করা
মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে অথবা মহান আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ইবাদাতে শরীক করার দ্বারা তার সকল ইবাদাত বিনষ্ট হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَبِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَ لَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ )
“আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” [সূরা ৩৯; আয-যুমার ৬৫]
(খ) ঈমান ভঙ্গ হওয়া:
ইসলাম ও ঈমান ভঙ্গের কোনো একটি কারণ সংঘটিত হলে তার সকল ইবাদাত বিনষ্ট হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَلَا يَزَالُوْنَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَنْ دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُوا وَمَنْ يَرْتَدِدُ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرُ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَ أُولَئِكَ أَصْحُبُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خُلِدُونَ )
"আর তারা তোমাদের সাথে লড়াই করতে থাকবে, যতক্ষণ না তোমাদেরকে তোমাদের দীন থেকে ফিরিয়ে দেয়, তারা যদি পারে। আর যে তোমাদের মধ্য থেকে তাঁর দীন থেকে ফিরে যাবে, অতঃপর কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে। বস্তুত এদের আমলসমূহ দুনিয়া ও আখিরাতে বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।" [সূরা ২; আল-বাক্বারাহ ২১৭]
(গ) রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা
কোনো ইবাদাত মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে করলে ঐ ইবাদাতটি বিনষ্ট হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, (يَأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَا تُبْطِلُوا صَدَقْتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِيْ يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ ) “হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সাদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মতো, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে।” [সূরা ২; আল-বাক্বারাহ ২৬৪]
(ঘ) খোঁটা দেওয়া
ইবাদাত করার পর যদি ঐ ইবাদাতটির খোঁটা দেয়া হয় তাহলে ইবাদাতটি বিনষ্ট হয়ে যায়। যেমন- কাউকে দান করা একটি ইবাদাত। দান করার পর তাকে খোঁটা দিলে ঐ দানের কোনো সাওয়াব পাওয়া যাবে না। আবূ যার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلَا يُزَكِّيْهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ) قَالَ: فَقَرَأَهَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَلَاثَ مِرَارًا، قَالَ أَبُو ذَرٍّ: خَابُوا وَخَسِرُوا، مَنْ هُمْ يَا رَسُوْلَ اللهِ؟ قَالَ: «الْمُسْبِلُ، وَالْمَنَّانُ، وَالْمُنَفِّقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الْكَاذِبِ»
“আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণীর লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না বরং তাদের জন্য রয়েছে ভয়ানক শাস্তি। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাটি তিনবার পাঠ করলেন। আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলে উঠলেন, তার তো ধ্বংস হবে, সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হে আল্লাহর রাসূল! এরা কারা? তিনি বললেন, যে লোক পায়ের গোছার নিচে কাপড় ঝুলিয়ে চলে, কোনো কিছু দান করে খোঁটা দেয় এবং মিথ্যা শপথ করে পণ্যদ্রব্য বিক্রি করে।" [সহীহ মুসলিম: ১০৬]