📄 অমুসলিমদের সাথে আচরণ
যদি আপনার প্রতিবেশীর মধ্যে কেউ অমুসলিম থাকে, তবে তার সাথে ইসলামি আদবের অনুসরণ করার চেষ্টা করুন। ইসলাম ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।
একজন মুসলিম হিসেবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সামনে ইসলামের মহত্ত্ব ও সৌন্দর্য তুলে ধরা উচিত। প্রত্যেকের সঙ্গে মার্জিত ও সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে। বুখারি ও মুসলিমে খাদিমে রাসূল আনাস রা.-এর উদ্ধৃতিতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সা. বলেছেন, "যে ব্যক্তি নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও যদি একই জিনিস পছন্দ করতে না পারে, তবে সে ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
মুসলিমের অপর বর্ণনায় হাদিসটি এভাবে এসেছে, "নিজের জন্য পছন্দসই কোনো বিষয় বা বস্তুকে একজন মানুষ যদি তার ভাই বা প্রতিবেশীর জন্যও বাছাই করতে না পারে, তবে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
আলিমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে যে 'ভাই' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা সাধারণভাবেই করা হয়েছে। ভাইয়ের এই ধারণার মধ্যে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষই অন্তর্ভুক্ত। একজন মুসলিমকে তার অমুসলিম ভাইয়ের জন্য ঠিক সেই বিষয়টাই পছন্দ করতে হবে, যা সে তার নিজের জন্য করে থাকে। আর মানসিকভাবে ততটা উদার ও বড়ো মনের হতে পারলেই একজন মুসলিম ইসলামের সত্যিকারের সৌন্দর্য ধারণ করতে এবং অমুসলিমদের সামনে ইসলামের সৌন্দর্যকে যথার্থভাবে উপস্থাপন করতে পারবে।
প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব হলো তার অমুসলিম ভাই-বোনদের হিদায়াতপ্রাপ্তির জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করা। একইসঙ্গে, মুসলিম ভাই-বোনদের জন্যও দুআ করা, যেন তারা দ্বীনের পথে অটল থাকতে পারে এবং আন্তরিক ও একনিষ্ঠভাবে ইসলামের অনুশাসনগুলো মেনে চলতে পারেন। কুরআন মাজিদের সূরা মুমতাহিনায় আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেছে এবং বহিষ্কারকার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই জালিম।” সূরা মুমতাহিনা : ৮-৯
তাই অমুসলিম ব্যক্তি যদি আল্লাহর শানে এবং ইসলাম সম্বন্ধে বাজে কথা না বলে, তবে তাদের প্রতি আমাদের অবশ্যই দয়ালু, উদার ও সহনশীল হতে হবে। হয়তো এই সদাচরণের ফলে তারা একসময় ইসলামের প্রতি দরদ অনুভব করবে। হয়তো তারা ইসলাম কবুল করতে অনুপ্রাণিত হবে।
উল্লেখ্য, অমুসলিমদের সাথে ভালো ব্যবহারের অর্থ এমন নয় যে- আমরা তাদের মতো করেই সব কাজ করব অথবা মুসলিম হিসেবে আমাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বিসর্জন দেবো। বরং ভালো ব্যবহারের অর্থ হলো, আমরা তাদের সাথে সব সময় সত্যনিষ্ঠ, সহানুভূতিশীল ও নমনীয় আচরণ করব।
এ প্রসঙ্গে ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, “যারা মুসলিমদের হেয় করেনি বা তাদের ওপর আক্রমণ করেনি, তাদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও সহনশীল আচরণ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা নির্দেশনা দিয়েছেন।”
ইমাম কুরতুবি এক্ষেত্রে উদাহরণ দিতে গিয়ে আবদুর রহমান ইবনে জায়েদ রহ.-এর একটি মন্তব্যকেও সামনে নিয়ে আসেন। ইবনে জায়েদ অভিমত দিয়েছিলেন, “অমুসলিমদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের নীতিগুলো ইসলামের প্রথম যুগে প্রণীত হয়, যখন পর্যন্ত কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফয়সালা আসেনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অনেক যুদ্ধ হলেও অমুসলিমদের সাথে উত্তম ব্যবহারের এই রীতিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।”
এরপর ইমাম কুরতুবি রা. প্রখ্যাত তাবেয়ি কাতাদা রহ.-এর একটি মন্তব্যও তুলে ধরেন। কাতাদা দাবি করেন, কুরআনের উপরোক্ত আয়াতটি আর প্রয়োগযোগ্য থাকবে না। কারণ, পরবর্তী সময়ে সূরা তাওবার নিম্নোক্ত আয়াতটিও আল্লাহ নাজিল করেছেন।
“অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের যেখানে পাও, সেখানেই হত্যা করো। তাদের বন্দি করো এবং অবরোধ করো। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওত পেতে বসে থাকো। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” সূরা তাওবা : ৫
আবদুর রহমান ইবনে জায়েদ এবং কাতাদার দুটি মন্তব্য উপস্থাপন করার পর উপসংহারে ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, অধিকাংশ আলিম ও মুফাসসিরগণ মনে করেন, সূরা তাওবার উক্ত আয়াত নাজিল হওয়ায় অমুসলিমদের সাথে সদ্ব্যবহারের আয়াতটি অকার্যকর হয়ে যায়নি। এক্ষেত্রে বুখারি ও মুসলিম শরিফে আসমা বিনতে আবু বকর রা.-এর একটি ঘটনার কথা জানা যায়।
একবার তিনি নবি সা.-কে প্রশ্ন করলেন, 'আমার বাড়িতে যদি কোনো অমুসলিম নারী বেড়াতে আসে, তবে কি তার সেবা করতে পারব, দরদি আচরণ করতে পারব?' রাসূল সা. জবাব দিয়েছিলেন, 'অবশ্যই পারবে।'
সূরা মুমতাহিনার যে আয়াতে অমসলিমদের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও সহনশীল আচরণ করার কথা বলা হয়েছে, সেই আয়াতটি নাজিল হওয়ার একটি প্রেক্ষাপট আছে। আল মাওয়ার্দি এবং আবু দাউদ উদ্ধৃত করেন, আমর বিন আবদুল্লাহ বিন যুবাইর রহ. বর্ণনা করেন, তাঁর বাবা তাকে বলেছেন, ইসলাম গ্রহণের আগে আবু বকর রা. তাঁর স্ত্রী কুতাইলাকে তালাক দিয়েছিলেন। এই কুতাইলার গর্ভেই আসমা রা.-এর জন্ম হয়। আসমা হিজরত করে বাবা আবু বকরের কাছে মদিনায় চলে যান।
যাহোক, হিজরতের বেশ কয়েক বছর পর, কুরাইশ পৌত্তলিকদের সঙ্গে যখন নবিজির চুক্তি হয়, তখন কুতাইলা মদিনায় তার মেয়েকে দেখতে আসেন। তিনি মেয়ের জন্য কানের দুল এবং আরও উপহারসামগ্রী নিয়ে আসেন। মা অমুসলিম হওয়ায় তার উপহার নেওয়ার ব্যাপারে আসমা বিনতে আবু বকর রা. সংশয়ে ছিলেন। তিনি রাসূল সা.-এর মতামত জানতে চাইলেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তায়ালা উপরোক্ত আয়াতটি নাজিল করেন।
আল্লাহ তায়ালা অমুসলিমদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করার জন্য মুসলিমদের আদেশ করেছেন। 'আর যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি', বলে তাদেরকেই বোঝানো হয়েছে, যারা সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি। বিশেষ করে বনু খোজায়া গোত্র এবং এ জাতীয় অন্যান্য গোত্রগুলো, যারা মুসলিমদের সঙ্গে এই মর্মে মৈত্রী চুক্তি করেছিল, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। সেইসঙ্গে মুসলিমদের প্রতিপক্ষদেরও সহযোগিতা করবে না। আল্লাহ তায়ালা চুক্তিতে আবদ্ধ এই সব গোত্রগুলোর সাথেও সহানুভূতিশীল আচরণ করার জন্য মুসলিমদের নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
অন্যদিকে কাজি আবু বকর আল আরাবি রহ. বলেন, “কুরআনের আয়াতে এখানে যে ইনসাফের কথা বলা হয়েছে, তা ন্যায়বিচার সম্পর্কিত নয়; বরং অংশীদারিত্বের হিসেবে। অর্থাৎ একজন মুসলিম তার অমুসলিম ভাইয়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে তার প্রাপ্য অর্থ তাকে অবশ্যই প্রদান করবে। আর শত্রু বা মিত্র যাই হোক না কেন, ন্যায়বিচার পাওয়া সকলেরই অধিকার।”
ইমাম বুখারি এবং আহমাদ রহ. এ প্রসঙ্গে আনাস বিন মালিক রা.-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। এক ইহুদি কিশোর ছিল, যে নবিজির অজুর পানি, জুতো এগিয়ে দিত। একবার সেই কিশোরটি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। খবর পেয়ে নবিজি সা. তাকে দেখতে গেলেন। তিনি দেখলেন, ছেলেটি একেবারে মুত্যুসজ্জার বিছানায় শুয়ে আছে; তার পিতা শিয়রে বসে আছে।
রাসূল সা. কিশোরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং আহ্বান করলেন, 'বলো, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।' কিশোর ছেলেটি তার পিতার দিকে তাকাল, কিন্তু তার বাবা তখনও নীরব। নবিজি সা. আবারও অনুরোধ করলেন। এবারও ছেলেটি বাবার মুখপানে চেয়ে রইল। অবশেষে বাবা বললেন, 'আবুল কাসেম (নবিজি) যা বলতে বলছেন, বলো।' ছেলেটি ঠিক মৃত্যুর আগ মুহূর্তে বলল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আর আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল।' এটা শোনার পর নবিজি সা. গভীর ভালোবাসার সাথে বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, আমি তাকে বাঁচাতে সক্ষম হলাম।'
ইবনে হাজার রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, “মুসলিমরা অমুসলিমদের কাজে নিয়োগ করতে পারবে, অসুস্থ হলে দেখতে যেতে পারবে। এই হাদিসটি একইসঙ্গে অমুসলিমদের প্রতি আন্তরিক হওয়ার তাগিদ দেয়। তরুণ ও যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য, তাদের ইসলামের পথে নিয়ে আসার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালানোরও নির্দেশনা প্রদান করে।"
অন্যদিকে, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস বদরুদ্দিন আইনি রহ. বলেন, “অমুসলিমদের অসুস্থ অবস্থায় দেখতে যাওয়া এবং অমুসলিম প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হওয়ার জন্য ইসলাম যে তাগিদ দিয়েছে, তার মাধ্যমে ইসলামের সহনশীলতা এবং উদারতাই প্রকাশ পায়। ইসলামের এই ঔদার্যের কারণেই অমুসলিমরা সব সময় ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। তরুণ-যুবাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য ইসলাম কতটা আন্তরিক, তাও এই বর্ণনা থেকে অনুধাবন করা যায়।”
কোনো অমুসলিমের প্রতি শোক জানাতে হলে অবশ্যই সঠিক বচনে শোক জানাতে হবে। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. কিতাবুল খারাজ-এর শেষাংশে একটি স্মৃতিচারণে বলেন, "আমার শিক্ষক ইমাম আবু হানিফার কাছে জানতে চেয়েছি, 'কোনো পরিচিত ইহুদি ও খ্রিষ্টান যদি আপনজন হারায় বা শোকে মুহ্যমান থাকে, তবে তাদের প্রতি কীভাবে শোক প্রকাশ করা যায়?' উত্তরে তিনি বলেন, 'তুমি বলবে- আল্লাহ সকল সৃষ্টির জন্যই মৃত্যু নির্ধারিত করে রেখেছেন। আমরা শুধু আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারি, যাতে সবার ভাগ্যেই উত্তম মৃত্যু জোটে। আমরা সবাই আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি আবার তাঁর কাছেই ফিরে যাব। তাই ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে শোকাবহ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে হবে'।"
ইমাম আবু ইউসুফ আরও বলেন, হাসান বসরি রহ.-এর কাছে একজন খ্রিষ্টান পড়তে আসত। সেই খ্রিষ্টান ছাত্রের ভাইকেও ইমাম বসরি রহ. সান্ত্বনা দিতে গিয়েছিলেন। কারও মৃত্যুর পর সেই পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে ইমাম বসরি রহ. এভাবে দুআ করতেন, “আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রকৃত অনুসারীদের জন্য যে পুরস্কার নির্ধারণ করে রেখেছেন, তা যেন এই মরহুমকেও দান করেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের মৃত্যুকে নিয়ামতে পূর্ণ করে দেন। আমরা যে পরম সৌভাগ্য কামনা করি, আমাদের জন্য তা নসিব করে দিন। এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য দান করুন।"
মৃত্যু এমন একটি নিয়তি যা আমরা কেউ-ই অস্বীকার করতে পারব না। তাই মৃত মানুষদের জন্য স্বস্তিদায়ক দুআ করা উচিত এবং সব সময় নিজেদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
ইবনে আবেদিন রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুখতার-এ ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর একটি মন্তব্য উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, "একজন অমুসলিম পরিজনের মৃত্যুতে দেখতে গেলে আপনি সেখানে তার মুসলিম পরিজনদের প্রতি সহানুভূতি জানাতে পারেন। এরকম অবস্থায় আপনি এভাবেও অমুসলিমদের জন্যও দুআ করতে পারেন, 'আল্লাহ তায়ালা আপনাকে উত্তম ধৈর্য দান করুন।' আবার কোনো অমুসলিম ব্যক্তি যখন তার কোনো মুসলিম পরিজনকে হারায়, তখন আপনি এভাবে দুআ করতে পারেন যে, 'আল্লাহ মরহুমের যাবতীয় গুনাহকে মাফ করে দিন এবং তাকে জান্নাত দান করুন'।"
যদি আপনার প্রতিবেশীর মধ্যে কেউ অমুসলিম থাকে, তবে তার সাথে ইসলামি আদবের অনুসরণ করার চেষ্টা করুন। ইসলাম ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।
একজন মুসলিম হিসেবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সামনে ইসলামের মহত্ত্ব ও সৌন্দর্য তুলে ধরা উচিত। প্রত্যেকের সঙ্গে মার্জিত ও সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে। বুখারি ও মুসলিমে খাদিমে রাসূল আনাস রা.-এর উদ্ধৃতিতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সা. বলেছেন, "যে ব্যক্তি নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও যদি একই জিনিস পছন্দ করতে না পারে, তবে সে ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
মুসলিমের অপর বর্ণনায় হাদিসটি এভাবে এসেছে, "নিজের জন্য পছন্দসই কোনো বিষয় বা বস্তুকে একজন মানুষ যদি তার ভাই বা প্রতিবেশীর জন্যও বাছাই করতে না পারে, তবে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
আলিমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে যে 'ভাই' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা সাধারণভাবেই করা হয়েছে। ভাইয়ের এই ধারণার মধ্যে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষই অন্তর্ভুক্ত। একজন মুসলিমকে তার অমুসলিম ভাইয়ের জন্য ঠিক সেই বিষয়টাই পছন্দ করতে হবে, যা সে তার নিজের জন্য করে থাকে। আর মানসিকভাবে ততটা উদার ও বড়ো মনের হতে পারলেই একজন মুসলিম ইসলামের সত্যিকারের সৌন্দর্য ধারণ করতে এবং অমুসলিমদের সামনে ইসলামের সৌন্দর্যকে যথার্থভাবে উপস্থাপন করতে পারবে।
প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব হলো তার অমুসলিম ভাই-বোনদের হিদায়াতপ্রাপ্তির জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করা। একইসঙ্গে, মুসলিম ভাই-বোনদের জন্যও দুআ করা, যেন তারা দ্বীনের পথে অটল থাকতে পারে এবং আন্তরিক ও একনিষ্ঠভাবে ইসলামের অনুশাসনগুলো মেনে চলতে পারেন। কুরআন মাজিদের সূরা মুমতাহিনায় আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেছে এবং বহিষ্কারকার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই জালিম।” সূরা মুমতাহিনা : ৮-৯
তাই অমুসলিম ব্যক্তি যদি আল্লাহর শানে এবং ইসলাম সম্বন্ধে বাজে কথা না বলে, তবে তাদের প্রতি আমাদের অবশ্যই দয়ালু, উদার ও সহনশীল হতে হবে। হয়তো এই সদাচরণের ফলে তারা একসময় ইসলামের প্রতি দরদ অনুভব করবে। হয়তো তারা ইসলাম কবুল করতে অনুপ্রাণিত হবে।
উল্লেখ্য, অমুসলিমদের সাথে ভালো ব্যবহারের অর্থ এমন নয় যে- আমরা তাদের মতো করেই সব কাজ করব অথবা মুসলিম হিসেবে আমাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বিসর্জন দেবো। বরং ভালো ব্যবহারের অর্থ হলো, আমরা তাদের সাথে সব সময় সত্যনিষ্ঠ, সহানুভূতিশীল ও নমনীয় আচরণ করব।
এ প্রসঙ্গে ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, “যারা মুসলিমদের হেয় করেনি বা তাদের ওপর আক্রমণ করেনি, তাদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও সহনশীল আচরণ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা নির্দেশনা দিয়েছেন।”
ইমাম কুরতুবি এক্ষেত্রে উদাহরণ দিতে গিয়ে আবদুর রহমান ইবনে জায়েদ রহ.-এর একটি মন্তব্যকেও সামনে নিয়ে আসেন। ইবনে জায়েদ অভিমত দিয়েছিলেন, “অমুসলিমদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের নীতিগুলো ইসলামের প্রথম যুগে প্রণীত হয়, যখন পর্যন্ত কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফয়সালা আসেনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অনেক যুদ্ধ হলেও অমুসলিমদের সাথে উত্তম ব্যবহারের এই রীতিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।”
এরপর ইমাম কুরতুবি রা. প্রখ্যাত তাবেয়ি কাতাদা রহ.-এর একটি মন্তব্যও তুলে ধরেন। কাতাদা দাবি করেন, কুরআনের উপরোক্ত আয়াতটি আর প্রয়োগযোগ্য থাকবে না। কারণ, পরবর্তী সময়ে সূরা তাওবার নিম্নোক্ত আয়াতটিও আল্লাহ নাজিল করেছেন।
“অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের যেখানে পাও, সেখানেই হত্যা করো। তাদের বন্দি করো এবং অবরোধ করো। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওত পেতে বসে থাকো। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” সূরা তাওবা : ৫
আবদুর রহমান ইবনে জায়েদ এবং কাতাদার দুটি মন্তব্য উপস্থাপন করার পর উপসংহারে ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, অধিকাংশ আলিম ও মুফাসসিরগণ মনে করেন, সূরা তাওবার উক্ত আয়াত নাজিল হওয়ায় অমুসলিমদের সাথে সদ্ব্যবহারের আয়াতটি অকার্যকর হয়ে যায়নি। এক্ষেত্রে বুখারি ও মুসলিম শরিফে আসমা বিনতে আবু বকর রা.-এর একটি ঘটনার কথা জানা যায়।
একবার তিনি নবি সা.-কে প্রশ্ন করলেন, 'আমার বাড়িতে যদি কোনো অমুসলিম নারী বেড়াতে আসে, তবে কি তার সেবা করতে পারব, দরদি আচরণ করতে পারব?' রাসূল সা. জবাব দিয়েছিলেন, 'অবশ্যই পারবে।'
সূরা মুমতাহিনার যে আয়াতে অমসলিমদের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও সহনশীল আচরণ করার কথা বলা হয়েছে, সেই আয়াতটি নাজিল হওয়ার একটি প্রেক্ষাপট আছে। আল মাওয়ার্দি এবং আবু দাউদ উদ্ধৃত করেন, আমর বিন আবদুল্লাহ বিন যুবাইর রহ. বর্ণনা করেন, তাঁর বাবা তাকে বলেছেন, ইসলাম গ্রহণের আগে আবু বকর রা. তাঁর স্ত্রী কুতাইলাকে তালাক দিয়েছিলেন। এই কুতাইলার গর্ভেই আসমা রা.-এর জন্ম হয়। আসমা হিজরত করে বাবা আবু বকরের কাছে মদিনায় চলে যান।
যাহোক, হিজরতের বেশ কয়েক বছর পর, কুরাইশ পৌত্তলিকদের সঙ্গে যখন নবিজির চুক্তি হয়, তখন কুতাইলা মদিনায় তার মেয়েকে দেখতে আসেন। তিনি মেয়ের জন্য কানের দুল এবং আরও উপহারসামগ্রী নিয়ে আসেন। মা অমুসলিম হওয়ায় তার উপহার নেওয়ার ব্যাপারে আসমা বিনতে আবু বকর রা. সংশয়ে ছিলেন। তিনি রাসূল সা.-এর মতামত জানতে চাইলেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তায়ালা উপরোক্ত আয়াতটি নাজিল করেন।
আল্লাহ তায়ালা অমুসলিমদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করার জন্য মুসলিমদের আদেশ করেছেন। 'আর যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি', বলে তাদেরকেই বোঝানো হয়েছে, যারা সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি। বিশেষ করে বনু খোজায়া গোত্র এবং এ জাতীয় অন্যান্য গোত্রগুলো, যারা মুসলিমদের সঙ্গে এই মর্মে মৈত্রী চুক্তি করেছিল, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। সেইসঙ্গে মুসলিমদের প্রতিপক্ষদেরও সহযোগিতা করবে না। আল্লাহ তায়ালা চুক্তিতে আবদ্ধ এই সব গোত্রগুলোর সাথেও সহানুভূতিশীল আচরণ করার জন্য মুসলিমদের নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
অন্যদিকে কাজি আবু বকর আল আরাবি রহ. বলেন, “কুরআনের আয়াতে এখানে যে ইনসাফের কথা বলা হয়েছে, তা ন্যায়বিচার সম্পর্কিত নয়; বরং অংশীদারিত্বের হিসেবে। অর্থাৎ একজন মুসলিম তার অমুসলিম ভাইয়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে তার প্রাপ্য অর্থ তাকে অবশ্যই প্রদান করবে। আর শত্রু বা মিত্র যাই হোক না কেন, ন্যায়বিচার পাওয়া সকলেরই অধিকার।”
ইমাম বুখারি এবং আহমাদ রহ. এ প্রসঙ্গে আনাস বিন মালিক রা.-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। এক ইহুদি কিশোর ছিল, যে নবিজির অজুর পানি, জুতো এগিয়ে দিত। একবার সেই কিশোরটি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। খবর পেয়ে নবিজি সা. তাকে দেখতে গেলেন। তিনি দেখলেন, ছেলেটি একেবারে মুত্যুসজ্জার বিছানায় শুয়ে আছে; তার পিতা শিয়রে বসে আছে।
রাসূল সা. কিশোরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং আহ্বান করলেন, 'বলো, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।' কিশোর ছেলেটি তার পিতার দিকে তাকাল, কিন্তু তার বাবা তখনও নীরব। নবিজি সা. আবারও অনুরোধ করলেন। এবারও ছেলেটি বাবার মুখপানে চেয়ে রইল। অবশেষে বাবা বললেন, 'আবুল কাসেম (নবিজি) যা বলতে বলছেন, বলো।' ছেলেটি ঠিক মৃত্যুর আগ মুহূর্তে বলল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আর আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল।' এটা শোনার পর নবিজি সা. গভীর ভালোবাসার সাথে বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, আমি তাকে বাঁচাতে সক্ষম হলাম।'
ইবনে হাজার রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, “মুসলিমরা অমুসলিমদের কাজে নিয়োগ করতে পারবে, অসুস্থ হলে দেখতে যেতে পারবে। এই হাদিসটি একইসঙ্গে অমুসলিমদের প্রতি আন্তরিক হওয়ার তাগিদ দেয়। তরুণ ও যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য, তাদের ইসলামের পথে নিয়ে আসার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালানোরও নির্দেশনা প্রদান করে।"
অন্যদিকে, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস বদরুদ্দিন আইনি রহ. বলেন, “অমুসলিমদের অসুস্থ অবস্থায় দেখতে যাওয়া এবং অমুসলিম প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হওয়ার জন্য ইসলাম যে তাগিদ দিয়েছে, তার মাধ্যমে ইসলামের সহনশীলতা এবং উদারতাই প্রকাশ পায়। ইসলামের এই ঔদার্যের কারণেই অমুসলিমরা সব সময় ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। তরুণ-যুবাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য ইসলাম কতটা আন্তরিক, তাও এই বর্ণনা থেকে অনুধাবন করা যায়।”
কোনো অমুসলিমের প্রতি শোক জানাতে হলে অবশ্যই সঠিক বচনে শোক জানাতে হবে। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. কিতাবুল খারাজ-এর শেষাংশে একটি স্মৃতিচারণে বলেন, "আমার শিক্ষক ইমাম আবু হানিফার কাছে জানতে চেয়েছি, 'কোনো পরিচিত ইহুদি ও খ্রিষ্টান যদি আপনজন হারায় বা শোকে মুহ্যমান থাকে, তবে তাদের প্রতি কীভাবে শোক প্রকাশ করা যায়?' উত্তরে তিনি বলেন, 'তুমি বলবে- আল্লাহ সকল সৃষ্টির জন্যই মৃত্যু নির্ধারিত করে রেখেছেন। আমরা শুধু আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারি, যাতে সবার ভাগ্যেই উত্তম মৃত্যু জোটে। আমরা সবাই আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি আবার তাঁর কাছেই ফিরে যাব। তাই ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে শোকাবহ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে হবে'।"
ইমাম আবু ইউসুফ আরও বলেন, হাসান বসরি রহ.-এর কাছে একজন খ্রিষ্টান পড়তে আসত। সেই খ্রিষ্টান ছাত্রের ভাইকেও ইমাম বসরি রহ. সান্ত্বনা দিতে গিয়েছিলেন। কারও মৃত্যুর পর সেই পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে ইমাম বসরি রহ. এভাবে দুআ করতেন, “আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রকৃত অনুসারীদের জন্য যে পুরস্কার নির্ধারণ করে রেখেছেন, তা যেন এই মরহুমকেও দান করেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের মৃত্যুকে নিয়ামতে পূর্ণ করে দেন। আমরা যে পরম সৌভাগ্য কামনা করি, আমাদের জন্য তা নসিব করে দিন। এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য দান করুন।"
মৃত্যু এমন একটি নিয়তি যা আমরা কেউ-ই অস্বীকার করতে পারব না। তাই মৃত মানুষদের জন্য স্বস্তিদায়ক দুআ করা উচিত এবং সব সময় নিজেদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
ইবনে আবেদিন রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুখতার-এ ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর একটি মন্তব্য উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, "একজন অমুসলিম পরিজনের মৃত্যুতে দেখতে গেলে আপনি সেখানে তার মুসলিম পরিজনদের প্রতি সহানুভূতি জানাতে পারেন। এরকম অবস্থায় আপনি এভাবেও অমুসলিমদের জন্যও দুআ করতে পারেন, 'আল্লাহ তায়ালা আপনাকে উত্তম ধৈর্য দান করুন।' আবার কোনো অমুসলিম ব্যক্তি যখন তার কোনো মুসলিম পরিজনকে হারায়, তখন আপনি এভাবে দুআ করতে পারেন যে, 'আল্লাহ মরহুমের যাবতীয় গুনাহকে মাফ করে দিন এবং তাকে জান্নাত দান করুন'।"