📘 ইসলামিক ম্যানারস > 📄 আপনার অবস্থান সম্পর্কে পরিবারকে জানিয়ে রাখুন

📄 আপনার অবস্থান সম্পর্কে পরিবারকে জানিয়ে রাখুন


যদি কখনও নিয়মিত কাজের বাইরে অন্য কোনো কাজে দূরে কোথাও যেতে হয়, তবে পরিবারকে গন্তব্য সম্পর্কে অবহিত করা উচিত। আপনি কোথায় আছেন- এটা জানতে পারলে তারাও মানসিকভাবে স্বস্তি অনুভব করবে।

প্রখ্যাত তাবেয়ি কাতাদা রহ. গন্তব্য সম্পর্কে পরিবারকে অবহিত না করে দূরে কোথাও যাওয়াকে অনুমোদন দেননি। ইমাম আহমাদ রহ. তাঁর একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। “একবার কাতাদা রহ. আবু মাশারকে সাথে নিয়ে শাবিকে দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছালে শাবির পরিবার তাদের জানায়, তিনি বাড়িতে নেই। কাতাদা বাড়ির লোকদের প্রশ্ন করলেন, 'তিনি কোথায় গেছেন?' তারা উত্তর দিলেন, 'আমরা জানি না।' কাতাদা তখন আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, 'তার মানে তোমরা কি বলতে চাইছো, তিনি কোথায় গেছেন তা বলে যাননি? পরিবারের লোকেরা বলল, 'হ্যাঁ, তিনি কিছুই বলে যাননি।' কাতাদা রহ. শাবির এ আচরণ অপছন্দ করলেন।"

পরিবারকে গন্তব্য সম্পর্কে অবহিত করা হলে তাদের দুশ্চিন্তা লাঘব হয়। সফরকারী ব্যক্তি এবং তার পরিবার স্বস্তিতে থাকে। কোনো কারণে আপনার ফিরতে দেরি হলেও তারা অহেতুক দুশ্চিন্তা করে না।

যদি কখনও নিয়মিত কাজের বাইরে অন্য কোনো কাজে দূরে কোথাও যেতে হয়, তবে পরিবারকে গন্তব্য সম্পর্কে অবহিত করা উচিত। আপনি কোথায় আছেন- এটা জানতে পারলে তারাও মানসিকভাবে স্বস্তি অনুভব করবে।
প্রখ্যাত তাবেয়ি কাতাদা রহ. গন্তব্য সম্পর্কে পরিবারকে অবহিত না করে দূরে কোথাও যাওয়াকে অনুমোদন দেননি। ইমাম আহমাদ রহ. তাঁর একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। “একবার কাতাদা রহ. আবু মাশারকে সাথে নিয়ে শাবিকে দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছালে শাবির পরিবার তাদের জানায়, তিনি বাড়িতে নেই। কাতাদা বাড়ির লোকদের প্রশ্ন করলেন, 'তিনি কোথায় গেছেন?' তারা উত্তর দিলেন, 'আমরা জানি না।' কাতাদা তখন আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, 'তার মানে তোমরা কি বলতে চাইছো, তিনি কোথায় গেছেন তা বলে যাননি? পরিবারের লোকেরা বলল, 'হ্যাঁ, তিনি কিছুই বলে যাননি।' কাতাদা রহ. শাবির এ আচরণ অপছন্দ করলেন।"
পরিবারকে গন্তব্য সম্পর্কে অবহিত করা হলে তাদের দুশ্চিন্তা লাঘব হয়। সফরকারী ব্যক্তি এবং তার পরিবার স্বস্তিতে থাকে। কোনো কারণে আপনার ফিরতে দেরি হলেও তারা অহেতুক দুশ্চিন্তা করে না।

📘 ইসলামিক ম্যানারস > 📄 ভ্রাতৃত্ববোধের শিষ্টাচার

📄 ভ্রাতৃত্ববোধের শিষ্টাচার


ভ্রাতৃত্ববোধ তখনই মজবুত ও সুদৃঢ় হবে, যখন আমরা বস্তুগত কোনো প্রাপ্তির জন্য নয় কিংবা পার্থিব কোনো ফায়দা বা পদবি পাওয়ার লোভে নয়; বরং শুধু আল্লাহর জন্যই আমরা কাউকে ভালোবাসতে পারব। কাউকে যখন আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসতে পারব, তখন দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই সফলতার মুখ দেখতে পাব। রাসূল সা. বলেন, "কিয়ামতের দিন আল্লাহ প্রশ্ন করবেন, সেই সব বান্দারা কোথায়; যারা আমার সম্মানে একে অপরকে ভালোবেসেছিল। আজ আমি তাদেরকে আমার আরশের ছায়ায় আশ্রয় দান করব।” মুসলিম: ২৫৬৬

যখন আমরা আমাদের কোনো ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করব, চেষ্টা করব যাতে আর কিছু না পারি অন্তত মুখে হাসি ধরে রাখতে। মুসলিমদের প্রাথমিক আদব ও শিষ্টাচার হলো, সে যখনই তার দ্বীনি ভাইয়ের সাথে দেখা করবে, তখনই সে হাসবে। অহংকারী হবে না, বরং কথাবার্তায় ও আচরণে বিনয়ী হওয়ার চেষ্টা করবে। আবু জার গিফারি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “ন্যায়সংগত ও কল্যাণকর কাজের কোনো বিষয়কেই যেন তোমাদের কেউ তুচ্ছ মনে না করে। সে (ভালো করার মতো) কিছু না পেলে অন্তত তার ভাইয়ের সাথে যেন হাসিমুখে মিলিত হয়।" মুসলিম: ২৬২৬, তিরমিজি: ১৮৩৩

মার্জিত আচরণ, ভালোবাসা, সহানুভূতি ও দয়া- এই মানবিক গুণগুলো ভ্রাতৃত্ববোধকে মজবুত করে। আল্লাহ নিজে দয়ালু ও কোমল, তাই যারা সকল ক্ষেত্রে কোমলতা প্রদর্শন ও ধারণ করতে পারে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। কোমলতা দিয়ে যা আদায় করা যায়, তা কখনোই কঠোরতা দিয়ে আদায় করা যায় না। ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, “আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেবো না, কোন ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম হারাম এবং জাহান্নামের জন্য কোন ব্যক্তি হারাম? যে ব্যক্তি মানুষের কাছাকাছি (জনপ্রিয়), সহজ-সরল, নম্রভাষী ও সদাচারী।" আহমাদ: ৩৯২৮, তিরমিজি: ২৪৮৮

ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের অন্যতম দাবি হলো সুপরামর্শ দেওয়া। এর মাধ্যমে পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধতাও প্রমাণিত হয়। তামিম দারি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা, উত্তম উপদেশ ও সুপরামর্শ; দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা, উত্তম উপদেশ ও সুপরামর্শ; দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা, উত্তম উপদেশ ও সুপরামর্শ।” সাহাবিগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! কার জন্য?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ, তাঁর রাসূল, মুমিন নেতাগণ এবং সর্বসাধারণের জন্য।'

আপনি যদি আপনার ভাই ও বন্ধুর প্রতি আন্তরিক থাকতে চান, তা হলে সব সময় তার জন্য শুভ কামনা করতে হবে। তার কাছে সত্যটাই তুলে ধরতে হবে। অহেতুক সেই ব্যক্তির তোষামোদিতে লিপ্ত হওয়া যাবে না। তার সামনে প্রকৃত অবস্থা উপস্থাপন করতে হবে। তাকে ভুল বুঝিয়ে সত্য থেকে দূরে রাখা এক ধরনের প্রতারণার শামিল। তাকে সব সময় ভালো কাজের আদেশ দিতে হবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। তবে মনে রাখবেন, কাউকে পরামর্শ দিতে গেলে আপনার ভেতর সেই সংক্রান্ত যথাযথ জ্ঞান থাকা জরুরি।

নিজের অন্তরকে রাগ, ঘৃণা ও হিংসামুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। অন্তরকে কলুষতামুক্ত রাখার জন্য রাসূল সা. নিয়মিত দুআ করতেন। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. দুআ করতেন এবং বলতেন, “হে আল্লাহ! আমাকে সহযোগিতা করো এবং আমার বিরুদ্ধে (কাউকে) সহযোগিতা করো না। আমাকে সাহায্য করো এবং আমার বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করো না। আমার পরিকল্পনাকে সফল করে দাও; আমার বিরুদ্ধে করা সকল পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দাও। আমাকে হিদায়াত দান করো, আমার জন্য হিদায়াতের পথ সহজসাধ্য করো। যে আমার ওপর জুলুম ও সীমালঙ্ঘন করে, তার বিরুদ্ধে আমাকে সহযোগিতা করো। হে আল্লাহ! আমাকে তোমার কৃতজ্ঞ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো। আমাকে তোমার অধিক জিকরকারী, তোমাকে বেশি ভয়কারী, তোমার নিবিড় আনুগত্যকারী, তোমার কাছে অনুনয়-বিনয়কারী ও তোমার দিকে প্রত্যাবর্তনকারী করো। হে আমার রব! আমার তওবা কবুল করো, আমার সকল গুনাহ ধুয়ে-মুছে দাও। আমার দুআ কবুল করো। আমার পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ বহাল করো। আমার জবানকে দৃঢ় করো। আমার অন্তরে হিদায়াত দান করো এবং আমার বুক হতে সমস্ত হিংসা দূর করে দাও।” আবু দাউদ : ১৫১০, আহমাদ : ১৯৯৮, তিরমিযি: ৩৫৫১

উপরোক্ত হাদিসটিতে দেখা যাচ্ছে, যারা জুলুম করেছে তাদের বিরুদ্ধেও রাসূল সা. প্রতিশোধ নিতে চাননি। বরং তিনি তাদেরকে মোকাবিলায় আল্লাহর সহযোগিতা চেয়েছেন। সেই সাথে রাসূল সা. নিজের বুক থেকে হিংসা দূর করার জন্যও দুআ করেছেন। কেননা, এটা খুব সহজ নয়।

কেউ যদি আপনার হক নষ্ট করে, আপনার সাথে প্রতারণা করে, তা হলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া সত্যিই কঠিন। তাই অধিকাংশ মানুষই একটি অন্যায়ের বিপরীতে আরেকটি অন্যায় করে বিষয়টার সূরাহা করতে চায়। ফলে তার মর্যাদাবান ভালো মানুষ হয়ে উঠা হয় না। কিন্তু কেউ যদি সত্যি নিজেকে সংযত করতে পারে, বুক থেকে হিংসাকে মুছে ফেলতে পারে, তা হলে সে চারিত্রিক উৎকর্ষতা লাভ করতে পারবে।

বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বরক্ষার অন্যতম উপায় হলো, মিথ্যা অনুমান ও ভুল ধারণা থেকে বিরত থাকা। কোনোভাবেই কারও আড়ালে তার গিবত ও পরনিন্দা না করা। আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অত্যধিক ধারণা বা অনুমান করা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, কোনো কোনো ধারণা পাপ। তোমরা অপরের গোপন বিষয় সন্ধান করো না, তোমাদের কেউ যেন কারও আড়ালে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই করো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।" সূরা হুজুরাত : ১২

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবিজি সা. বলেছেন, “সাবধান! তোমরা সন্দেহ করা থেকে মুক্ত থাকো। কারণ, সন্দেহ সবচেয়ে বড়ো মিথ্যাচার। পরস্পরের বিরুদ্ধে তথ্য তালাশ করো না এবং গোয়েন্দাগিরি করো না।" বুখারি : ৫১৪৪, মুসলিম : ২৫৬৩, আবু দাউদ : ৪৯১৭

অনেকে হিংসা ও শত্রুতা করতে গিয়ে এতটাই বেপরোয়া হয়ে যায় যে, সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দিতেও পরোয়া করে না। কিন্তু রাসূল সা. এই ধরনের আচরণকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করে গেছেন। আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “তোমরা পরস্পরকে ঘৃণা করো না, হিংসা করো না, একে অপরের পেছনে গোয়েন্দাগিরি করো না; বরং আল্লাহর বান্দারা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও। যেকোনো মুসলিমের জন্য তার কোনো ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক বিচ্ছেদ করা জায়েজ নয়।” বুখারি : ৬০৬৫, মুসলিম : ২৫৫৯, আবু দাউদ : ৪৯১০

অসংখ্য হাদিস থেকে জানা যায় যে, দুজন বা তার বেশি মুসলিমদের মধ্যে বিবাদ নিরসনে কেউ যদি এগিয়ে আসে এবং সফলভাবে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে পারে, তা হলে তার জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে উত্তম পুরস্কার ও সম্মান রয়েছে। সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার একটা বড়ো কারণ অন্যের গোপন কোনো তথ্য ফাঁস করে দেওয়া। তাই আপনার কাছে কেউ যদি কোনো গোপন তথ্য শেয়ার করে, আপনি তা গোপন রাখবেন; যত্রতত্র বলে বেড়াবেন না। মনে রাখবেন, মুনাফিকের যে তিনটি নিদর্শন তার মধ্যে একটি হলো, আমানতের খেয়ানত করা। আর অন্যের গোপন কথা নিজের মধ্যে গোপন রাখাটাও বড়ো আকারের আমানত।

ভ্রাতৃত্ববোধ তখনই মজবুত ও সুদৃঢ় হবে, যখন আমরা বস্তুগত কোনো প্রাপ্তির জন্য নয় কিংবা পার্থিব কোনো ফায়দা বা পদবি পাওয়ার লোভে নয়; বরং শুধু আল্লাহর জন্যই আমরা কাউকে ভালোবাসতে পারব। কাউকে যখন আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসতে পারব, তখন দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই সফলতার মুখ দেখতে পাব। রাসূল সা. বলেন, "কিয়ামতের দিন আল্লাহ প্রশ্ন করবেন, সেই সব বান্দারা কোথায়; যারা আমার সম্মানে একে অপরকে ভালোবেসেছিল। আজ আমি তাদেরকে আমার আরশের ছায়ায় আশ্রয় দান করব।” মুসলিম: ২৫৬৬
যখন আমরা আমাদের কোনো ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করব, চেষ্টা করব যাতে আর কিছু না পারি অন্তত মুখে হাসি ধরে রাখতে। মুসলিমদের প্রাথমিক আদব ও শিষ্টাচার হলো, সে যখনই তার দ্বীনি ভাইয়ের সাথে দেখা করবে, তখনই সে হাসবে। অহংকারী হবে না, বরং কথাবার্তায় ও আচরণে বিনয়ী হওয়ার চেষ্টা করবে। আবু জার গিফারি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “ন্যায়সংগত ও কল্যাণকর কাজের কোনো বিষয়কেই যেন তোমাদের কেউ তুচ্ছ মনে না করে। সে (ভালো করার মতো) কিছু না পেলে অন্তত তার ভাইয়ের সাথে যেন হাসিমুখে মিলিত হয়।" মুসলিম: ২৬২৬, তিরমিজি: ১৮৩৩
মার্জিত আচরণ, ভালোবাসা, সহানুভূতি ও দয়া- এই মানবিক গুণগুলো ভ্রাতৃত্ববোধকে মজবুত করে। আল্লাহ নিজে দয়ালু ও কোমল, তাই যারা সকল ক্ষেত্রে কোমলতা প্রদর্শন ও ধারণ করতে পারে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। কোমলতা দিয়ে যা আদায় করা যায়, তা কখনোই কঠোরতা দিয়ে আদায় করা যায় না। ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, “আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেবো না, কোন ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম হারাম এবং জাহান্নামের জন্য কোন ব্যক্তি হারাম? যে ব্যক্তি মানুষের কাছাকাছি (জনপ্রিয়), সহজ-সরল, নম্রভাষী ও সদাচারী।" আহমাদ: ৩৯২৮, তিরমিজি: ২৪৮৮
ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের অন্যতম দাবি হলো সুপরামর্শ দেওয়া। এর মাধ্যমে পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধতাও প্রমাণিত হয়। তামিম দারি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা, উত্তম উপদেশ ও সুপরামর্শ; দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা, উত্তম উপদেশ ও সুপরামর্শ; দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা, উত্তম উপদেশ ও সুপরামর্শ।” সাহাবিগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! কার জন্য?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ, তাঁর রাসূল, মুমিন নেতাগণ এবং সর্বসাধারণের জন্য।'
আপনি যদি আপনার ভাই ও বন্ধুর প্রতি আন্তরিক থাকতে চান, তা হলে সব সময় তার জন্য শুভ কামনা করতে হবে। তার কাছে সত্যটাই তুলে ধরতে হবে। অহেতুক সেই ব্যক্তির তোষামোদিতে লিপ্ত হওয়া যাবে না। তার সামনে প্রকৃত অবস্থা উপস্থাপন করতে হবে। তাকে ভুল বুঝিয়ে সত্য থেকে দূরে রাখা এক ধরনের প্রতারণার শামিল। তাকে সব সময় ভালো কাজের আদেশ দিতে হবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। তবে মনে রাখবেন, কাউকে পরামর্শ দিতে গেলে আপনার ভেতর সেই সংক্রান্ত যথাযথ জ্ঞান থাকা জরুরি।
নিজের অন্তরকে রাগ, ঘৃণা ও হিংসামুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। অন্তরকে কলুষতামুক্ত রাখার জন্য রাসূল সা. নিয়মিত দুআ করতেন। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. দুআ করতেন এবং বলতেন, “হে আল্লাহ! আমাকে সহযোগিতা করো এবং আমার বিরুদ্ধে (কাউকে) সহযোগিতা করো না। আমাকে সাহায্য করো এবং আমার বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করো না। আমার পরিকল্পনাকে সফল করে দাও; আমার বিরুদ্ধে করা সকল পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দাও। আমাকে হিদায়াত দান করো, আমার জন্য হিদায়াতের পথ সহজসাধ্য করো। যে আমার ওপর জুলুম ও সীমালঙ্ঘন করে, তার বিরুদ্ধে আমাকে সহযোগিতা করো। হে আল্লাহ! আমাকে তোমার কৃতজ্ঞ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো। আমাকে তোমার অধিক জিকরকারী, তোমাকে বেশি ভয়কারী, তোমার নিবিড় আনুগত্যকারী, তোমার কাছে অনুনয়-বিনয়কারী ও তোমার দিকে প্রত্যাবর্তনকারী করো। হে আমার রব! আমার তওবা কবুল করো, আমার সকল গুনাহ ধুয়ে-মুছে দাও। আমার দুআ কবুল করো। আমার পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ বহাল করো। আমার জবানকে দৃঢ় করো। আমার অন্তরে হিদায়াত দান করো এবং আমার বুক হতে সমস্ত হিংসা দূর করে দাও।” আবু দাউদ : ১৫১০, আহমাদ : ১৯৯৮, তিরমিযি: ৩৫৫১
উপরোক্ত হাদিসটিতে দেখা যাচ্ছে, যারা জুলুম করেছে তাদের বিরুদ্ধেও রাসূল সা. প্রতিশোধ নিতে চাননি। বরং তিনি তাদেরকে মোকাবিলায় আল্লাহর সহযোগিতা চেয়েছেন। সেই সাথে রাসূল সা. নিজের বুক থেকে হিংসা দূর করার জন্যও দুআ করেছেন। কেননা, এটা খুব সহজ নয়।
কেউ যদি আপনার হক নষ্ট করে, আপনার সাথে প্রতারণা করে, তা হলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া সত্যিই কঠিন। তাই অধিকাংশ মানুষই একটি অন্যায়ের বিপরীতে আরেকটি অন্যায় করে বিষয়টার সূরাহা করতে চায়। ফলে তার মর্যাদাবান ভালো মানুষ হয়ে উঠা হয় না। কিন্তু কেউ যদি সত্যি নিজেকে সংযত করতে পারে, বুক থেকে হিংসাকে মুছে ফেলতে পারে, তা হলে সে চারিত্রিক উৎকর্ষতা লাভ করতে পারবে।
বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বরক্ষার অন্যতম উপায় হলো, মিথ্যা অনুমান ও ভুল ধারণা থেকে বিরত থাকা। কোনোভাবেই কারও আড়ালে তার গিবত ও পরনিন্দা না করা। আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অত্যধিক ধারণা বা অনুমান করা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, কোনো কোনো ধারণা পাপ। তোমরা অপরের গোপন বিষয় সন্ধান করো না, তোমাদের কেউ যেন কারও আড়ালে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই করো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।" সূরা হুজুরাত : ১২
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবিজি সা. বলেছেন, “সাবধান! তোমরা সন্দেহ করা থেকে মুক্ত থাকো। কারণ, সন্দেহ সবচেয়ে বড়ো মিথ্যাচার। পরস্পরের বিরুদ্ধে তথ্য তালাশ করো না এবং গোয়েন্দাগিরি করো না।" বুখারি : ৫১৪৪, মুসলিম : ২৫৬৩, আবু দাউদ : ৪৯১৭
অনেকে হিংসা ও শত্রুতা করতে গিয়ে এতটাই বেপরোয়া হয়ে যায় যে, সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দিতেও পরোয়া করে না। কিন্তু রাসূল সা. এই ধরনের আচরণকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করে গেছেন। আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “তোমরা পরস্পরকে ঘৃণা করো না, হিংসা করো না, একে অপরের পেছনে গোয়েন্দাগিরি করো না; বরং আল্লাহর বান্দারা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও। যেকোনো মুসলিমের জন্য তার কোনো ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক বিচ্ছেদ করা জায়েজ নয়।” বুখারি : ৬০৬৫, মুসলিম : ২৫৫৯, আবু দাউদ : ৪৯১০
অসংখ্য হাদিস থেকে জানা যায় যে, দুজন বা তার বেশি মুসলিমদের মধ্যে বিবাদ নিরসনে কেউ যদি এগিয়ে আসে এবং সফলভাবে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে পারে, তা হলে তার জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে উত্তম পুরস্কার ও সম্মান রয়েছে। সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার একটা বড়ো কারণ অন্যের গোপন কোনো তথ্য ফাঁস করে দেওয়া। তাই আপনার কাছে কেউ যদি কোনো গোপন তথ্য শেয়ার করে, আপনি তা গোপন রাখবেন; যত্রতত্র বলে বেড়াবেন না। মনে রাখবেন, মুনাফিকের যে তিনটি নিদর্শন তার মধ্যে একটি হলো, আমানতের খেয়ানত করা। আর অন্যের গোপন কথা নিজের মধ্যে গোপন রাখাটাও বড়ো আকারের আমানত।

📘 ইসলামিক ম্যানারস > 📄 দরিদ্রদের সম্মান করা

📄 দরিদ্রদের সম্মান করা


যদি কোনো জনসমাগমস্থলে কোনো দরিদ্র ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয় কিংবা কোনো দরিদ্র ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান, তবে তার প্রতি অবহেলাভরে তাকাবেন না। দরিদ্র হওয়ায় তাকে হেয় মনে করবেন না। দারিদ্র্য এমন কোনো রোগ বা সংকট নয়, যার জন্য সে ছোটো হয়ে থাকবে কিংবা আপনি তাকে অবহেলা করার সুযোগ পাবেন।

দরিদ্র অতিথি ও বন্ধুদের সঙ্গে শ্রদ্ধাশীল আচরণ করুন। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় হাসিমুখে কথা বলুন। কোমল ভাষা ও উত্তম শব্দ প্রয়োগ করুন। দরিদ্রতা কোনো পাপ নয়। অনেক দরিদ্র ব্যক্তি আছেন, যারা অন্য অনেকের তুলনায় অনেক বেশি সৎ ও তাকওয়াবান।

ইসলাম বিয়ের দাওয়াত গ্রহণ করাকে জরুরি বলে ঘোষণা করেছে। মুসলিমদের বিয়েতে যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এমনও দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়- সাহাবি রোজাদার, তারপরও তিনি বিয়ের দাওয়াত রক্ষার্থে সেই অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছেন। হাদিসে এসেছে, “যে ইচ্ছাকৃতভাবে বিয়ের দাওয়াত অগ্রাহ্য করল, সে প্রকারান্তরে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যকে অস্বীকার করল।” আবু দাউদ : ৩৭৪২

অথচ আরেকটি বিপরীত বাস্তবতাও আছে। হাদিসে সেই বিয়ের খাবারকে সবচেয়ে জঘন্য খাবার বলা হয়েছে, যে বিয়েতে দরিদ্র ব্যক্তিকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। তাই আমাদের দাওয়াতের তালিকায় যেন শুধু বড়োলোক আত্মীয় বা পরিচিতজনরাই না থাকে; বরং অভাবী মানুষগুলোকেও যেন গুরুত্বের সঙ্গে দাওয়াত দেওয়া হয়।

রাসূল সা. বলেছেন, “সবচেয়ে খারাপ খাবার হলো সেই বিয়ের অনুষ্ঠানের খাবার, যেখানে শুধু ধনী লোকদেরই দাওয়াত করা হয়। আর দরিদ্রদের অবজ্ঞার সঙ্গে এড়িয়ে যাওয়া হয়।" বুখারি: ৫১৭৭, মুসলিম : ১৪৩২

আমাদের মধ্যে এমন অনেককেই দেখা যায়, যারা প্রায়শ বাড়ির কাজের লোকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। পত্র-পত্রিকায় গৃহ পরিচারিকাদের ওপর নির্মম নির্যাতনের অনেক ছবি ও সংবাদ পাওয়া যায়। অথচ ইসলাম এ ধরনের আচরণকে অনুমোদন করে না। কাজের লোকদের প্রতি সহানুভূতিশীল, দয়ার্দ্র হওয়া ইসলামের শিক্ষা। এমনকি কাজের লোকেরা কোনো ভুল করলেও রাসূল সা. তাদের ক্ষমা করে দেওয়ার কথা বলেছেন।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি রাসূল সা.-এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কাজের লোককে প্রতিদিন কতবার মাফ করব?' তিনি চুপ থাকলেন। লোকটি আবার একই প্রশ্ন করলে এবারও তিনি চুপ থাকলেন। তৃতীয়বার প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, 'প্রতিদিন সত্তর বার'।” আবু দাউদ : ৫১৬৪

যদি কোনো জনসমাগমস্থলে কোনো দরিদ্র ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয় কিংবা কোনো দরিদ্র ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান, তবে তার প্রতি অবহেলাভরে তাকাবেন না। দরিদ্র হওয়ায় তাকে হেয় মনে করবেন না। দারিদ্র্য এমন কোনো রোগ বা সংকট নয়, যার জন্য সে ছোটো হয়ে থাকবে কিংবা আপনি তাকে অবহেলা করার সুযোগ পাবেন।
দরিদ্র অতিথি ও বন্ধুদের সঙ্গে শ্রদ্ধাশীল আচরণ করুন। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় হাসিমুখে কথা বলুন। কোমল ভাষা ও উত্তম শব্দ প্রয়োগ করুন। দরিদ্রতা কোনো পাপ নয়। অনেক দরিদ্র ব্যক্তি আছেন, যারা অন্য অনেকের তুলনায় অনেক বেশি সৎ ও তাকওয়াবান।
ইসলাম বিয়ের দাওয়াত গ্রহণ করাকে জরুরি বলে ঘোষণা করেছে। মুসলিমদের বিয়েতে যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এমনও দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়- সাহাবি রোজাদার, তারপরও তিনি বিয়ের দাওয়াত রক্ষার্থে সেই অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছেন। হাদিসে এসেছে, “যে ইচ্ছাকৃতভাবে বিয়ের দাওয়াত অগ্রাহ্য করল, সে প্রকারান্তরে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যকে অস্বীকার করল।” আবু দাউদ : ৩৭৪২
অথচ আরেকটি বিপরীত বাস্তবতাও আছে। হাদিসে সেই বিয়ের খাবারকে সবচেয়ে জঘন্য খাবার বলা হয়েছে, যে বিয়েতে দরিদ্র ব্যক্তিকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। তাই আমাদের দাওয়াতের তালিকায় যেন শুধু বড়োলোক আত্মীয় বা পরিচিতজনরাই না থাকে; বরং অভাবী মানুষগুলোকেও যেন গুরুত্বের সঙ্গে দাওয়াত দেওয়া হয়।
রাসূল সা. বলেছেন, “সবচেয়ে খারাপ খাবার হলো সেই বিয়ের অনুষ্ঠানের খাবার, যেখানে শুধু ধনী লোকদেরই দাওয়াত করা হয়। আর দরিদ্রদের অবজ্ঞার সঙ্গে এড়িয়ে যাওয়া হয়।" বুখারি: ৫১৭৭, মুসলিম : ১৪৩২
আমাদের মধ্যে এমন অনেককেই দেখা যায়, যারা প্রায়শ বাড়ির কাজের লোকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। পত্র-পত্রিকায় গৃহ পরিচারিকাদের ওপর নির্মম নির্যাতনের অনেক ছবি ও সংবাদ পাওয়া যায়। অথচ ইসলাম এ ধরনের আচরণকে অনুমোদন করে না। কাজের লোকদের প্রতি সহানুভূতিশীল, দয়ার্দ্র হওয়া ইসলামের শিক্ষা। এমনকি কাজের লোকেরা কোনো ভুল করলেও রাসূল সা. তাদের ক্ষমা করে দেওয়ার কথা বলেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি রাসূল সা.-এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কাজের লোককে প্রতিদিন কতবার মাফ করব?' তিনি চুপ থাকলেন। লোকটি আবার একই প্রশ্ন করলে এবারও তিনি চুপ থাকলেন। তৃতীয়বার প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, 'প্রতিদিন সত্তর বার'।” আবু দাউদ : ৫১৬৪

📘 ইসলামিক ম্যানারস > 📄 অমুসলিমদের সাথে আচরণ

📄 অমুসলিমদের সাথে আচরণ


যদি আপনার প্রতিবেশীর মধ্যে কেউ অমুসলিম থাকে, তবে তার সাথে ইসলামি আদবের অনুসরণ করার চেষ্টা করুন। ইসলাম ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।

একজন মুসলিম হিসেবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সামনে ইসলামের মহত্ত্ব ও সৌন্দর্য তুলে ধরা উচিত। প্রত্যেকের সঙ্গে মার্জিত ও সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে। বুখারি ও মুসলিমে খাদিমে রাসূল আনাস রা.-এর উদ্ধৃতিতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সা. বলেছেন, "যে ব্যক্তি নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও যদি একই জিনিস পছন্দ করতে না পারে, তবে সে ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”

মুসলিমের অপর বর্ণনায় হাদিসটি এভাবে এসেছে, "নিজের জন্য পছন্দসই কোনো বিষয় বা বস্তুকে একজন মানুষ যদি তার ভাই বা প্রতিবেশীর জন্যও বাছাই করতে না পারে, তবে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”

আলিমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে যে 'ভাই' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা সাধারণভাবেই করা হয়েছে। ভাইয়ের এই ধারণার মধ্যে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষই অন্তর্ভুক্ত। একজন মুসলিমকে তার অমুসলিম ভাইয়ের জন্য ঠিক সেই বিষয়টাই পছন্দ করতে হবে, যা সে তার নিজের জন্য করে থাকে। আর মানসিকভাবে ততটা উদার ও বড়ো মনের হতে পারলেই একজন মুসলিম ইসলামের সত্যিকারের সৌন্দর্য ধারণ করতে এবং অমুসলিমদের সামনে ইসলামের সৌন্দর্যকে যথার্থভাবে উপস্থাপন করতে পারবে।

প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব হলো তার অমুসলিম ভাই-বোনদের হিদায়াতপ্রাপ্তির জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করা। একইসঙ্গে, মুসলিম ভাই-বোনদের জন্যও দুআ করা, যেন তারা দ্বীনের পথে অটল থাকতে পারে এবং আন্তরিক ও একনিষ্ঠভাবে ইসলামের অনুশাসনগুলো মেনে চলতে পারেন। কুরআন মাজিদের সূরা মুমতাহিনায় আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেছে এবং বহিষ্কারকার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই জালিম।” সূরা মুমতাহিনা : ৮-৯

তাই অমুসলিম ব্যক্তি যদি আল্লাহর শানে এবং ইসলাম সম্বন্ধে বাজে কথা না বলে, তবে তাদের প্রতি আমাদের অবশ্যই দয়ালু, উদার ও সহনশীল হতে হবে। হয়তো এই সদাচরণের ফলে তারা একসময় ইসলামের প্রতি দরদ অনুভব করবে। হয়তো তারা ইসলাম কবুল করতে অনুপ্রাণিত হবে।

উল্লেখ্য, অমুসলিমদের সাথে ভালো ব্যবহারের অর্থ এমন নয় যে- আমরা তাদের মতো করেই সব কাজ করব অথবা মুসলিম হিসেবে আমাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বিসর্জন দেবো। বরং ভালো ব্যবহারের অর্থ হলো, আমরা তাদের সাথে সব সময় সত্যনিষ্ঠ, সহানুভূতিশীল ও নমনীয় আচরণ করব।

এ প্রসঙ্গে ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, “যারা মুসলিমদের হেয় করেনি বা তাদের ওপর আক্রমণ করেনি, তাদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও সহনশীল আচরণ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা নির্দেশনা দিয়েছেন।”

ইমাম কুরতুবি এক্ষেত্রে উদাহরণ দিতে গিয়ে আবদুর রহমান ইবনে জায়েদ রহ.-এর একটি মন্তব্যকেও সামনে নিয়ে আসেন। ইবনে জায়েদ অভিমত দিয়েছিলেন, “অমুসলিমদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের নীতিগুলো ইসলামের প্রথম যুগে প্রণীত হয়, যখন পর্যন্ত কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফয়সালা আসেনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অনেক যুদ্ধ হলেও অমুসলিমদের সাথে উত্তম ব্যবহারের এই রীতিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।”

এরপর ইমাম কুরতুবি রা. প্রখ্যাত তাবেয়ি কাতাদা রহ.-এর একটি মন্তব্যও তুলে ধরেন। কাতাদা দাবি করেন, কুরআনের উপরোক্ত আয়াতটি আর প্রয়োগযোগ্য থাকবে না। কারণ, পরবর্তী সময়ে সূরা তাওবার নিম্নোক্ত আয়াতটিও আল্লাহ নাজিল করেছেন।

“অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের যেখানে পাও, সেখানেই হত্যা করো। তাদের বন্দি করো এবং অবরোধ করো। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওত পেতে বসে থাকো। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” সূরা তাওবা : ৫

আবদুর রহমান ইবনে জায়েদ এবং কাতাদার দুটি মন্তব্য উপস্থাপন করার পর উপসংহারে ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, অধিকাংশ আলিম ও মুফাসসিরগণ মনে করেন, সূরা তাওবার উক্ত আয়াত নাজিল হওয়ায় অমুসলিমদের সাথে সদ্ব্যবহারের আয়াতটি অকার্যকর হয়ে যায়নি। এক্ষেত্রে বুখারি ও মুসলিম শরিফে আসমা বিনতে আবু বকর রা.-এর একটি ঘটনার কথা জানা যায়।

একবার তিনি নবি সা.-কে প্রশ্ন করলেন, 'আমার বাড়িতে যদি কোনো অমুসলিম নারী বেড়াতে আসে, তবে কি তার সেবা করতে পারব, দরদি আচরণ করতে পারব?' রাসূল সা. জবাব দিয়েছিলেন, 'অবশ্যই পারবে।'

সূরা মুমতাহিনার যে আয়াতে অমসলিমদের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও সহনশীল আচরণ করার কথা বলা হয়েছে, সেই আয়াতটি নাজিল হওয়ার একটি প্রেক্ষাপট আছে। আল মাওয়ার্দি এবং আবু দাউদ উদ্ধৃত করেন, আমর বিন আবদুল্লাহ বিন যুবাইর রহ. বর্ণনা করেন, তাঁর বাবা তাকে বলেছেন, ইসলাম গ্রহণের আগে আবু বকর রা. তাঁর স্ত্রী কুতাইলাকে তালাক দিয়েছিলেন। এই কুতাইলার গর্ভেই আসমা রা.-এর জন্ম হয়। আসমা হিজরত করে বাবা আবু বকরের কাছে মদিনায় চলে যান।

যাহোক, হিজরতের বেশ কয়েক বছর পর, কুরাইশ পৌত্তলিকদের সঙ্গে যখন নবিজির চুক্তি হয়, তখন কুতাইলা মদিনায় তার মেয়েকে দেখতে আসেন। তিনি মেয়ের জন্য কানের দুল এবং আরও উপহারসামগ্রী নিয়ে আসেন। মা অমুসলিম হওয়ায় তার উপহার নেওয়ার ব্যাপারে আসমা বিনতে আবু বকর রা. সংশয়ে ছিলেন। তিনি রাসূল সা.-এর মতামত জানতে চাইলেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তায়ালা উপরোক্ত আয়াতটি নাজিল করেন।

আল্লাহ তায়ালা অমুসলিমদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করার জন্য মুসলিমদের আদেশ করেছেন। 'আর যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি', বলে তাদেরকেই বোঝানো হয়েছে, যারা সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি। বিশেষ করে বনু খোজায়া গোত্র এবং এ জাতীয় অন্যান্য গোত্রগুলো, যারা মুসলিমদের সঙ্গে এই মর্মে মৈত্রী চুক্তি করেছিল, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। সেইসঙ্গে মুসলিমদের প্রতিপক্ষদেরও সহযোগিতা করবে না। আল্লাহ তায়ালা চুক্তিতে আবদ্ধ এই সব গোত্রগুলোর সাথেও সহানুভূতিশীল আচরণ করার জন্য মুসলিমদের নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

অন্যদিকে কাজি আবু বকর আল আরাবি রহ. বলেন, “কুরআনের আয়াতে এখানে যে ইনসাফের কথা বলা হয়েছে, তা ন্যায়বিচার সম্পর্কিত নয়; বরং অংশীদারিত্বের হিসেবে। অর্থাৎ একজন মুসলিম তার অমুসলিম ভাইয়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে তার প্রাপ্য অর্থ তাকে অবশ্যই প্রদান করবে। আর শত্রু বা মিত্র যাই হোক না কেন, ন্যায়বিচার পাওয়া সকলেরই অধিকার।”

ইমাম বুখারি এবং আহমাদ রহ. এ প্রসঙ্গে আনাস বিন মালিক রা.-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। এক ইহুদি কিশোর ছিল, যে নবিজির অজুর পানি, জুতো এগিয়ে দিত। একবার সেই কিশোরটি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। খবর পেয়ে নবিজি সা. তাকে দেখতে গেলেন। তিনি দেখলেন, ছেলেটি একেবারে মুত্যুসজ্জার বিছানায় শুয়ে আছে; তার পিতা শিয়রে বসে আছে।

রাসূল সা. কিশোরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং আহ্বান করলেন, 'বলো, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।' কিশোর ছেলেটি তার পিতার দিকে তাকাল, কিন্তু তার বাবা তখনও নীরব। নবিজি সা. আবারও অনুরোধ করলেন। এবারও ছেলেটি বাবার মুখপানে চেয়ে রইল। অবশেষে বাবা বললেন, 'আবুল কাসেম (নবিজি) যা বলতে বলছেন, বলো।' ছেলেটি ঠিক মৃত্যুর আগ মুহূর্তে বলল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আর আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল।' এটা শোনার পর নবিজি সা. গভীর ভালোবাসার সাথে বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, আমি তাকে বাঁচাতে সক্ষম হলাম।'

ইবনে হাজার রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, “মুসলিমরা অমুসলিমদের কাজে নিয়োগ করতে পারবে, অসুস্থ হলে দেখতে যেতে পারবে। এই হাদিসটি একইসঙ্গে অমুসলিমদের প্রতি আন্তরিক হওয়ার তাগিদ দেয়। তরুণ ও যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য, তাদের ইসলামের পথে নিয়ে আসার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালানোরও নির্দেশনা প্রদান করে।"

অন্যদিকে, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস বদরুদ্দিন আইনি রহ. বলেন, “অমুসলিমদের অসুস্থ অবস্থায় দেখতে যাওয়া এবং অমুসলিম প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হওয়ার জন্য ইসলাম যে তাগিদ দিয়েছে, তার মাধ্যমে ইসলামের সহনশীলতা এবং উদারতাই প্রকাশ পায়। ইসলামের এই ঔদার্যের কারণেই অমুসলিমরা সব সময় ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। তরুণ-যুবাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য ইসলাম কতটা আন্তরিক, তাও এই বর্ণনা থেকে অনুধাবন করা যায়।”

কোনো অমুসলিমের প্রতি শোক জানাতে হলে অবশ্যই সঠিক বচনে শোক জানাতে হবে। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. কিতাবুল খারাজ-এর শেষাংশে একটি স্মৃতিচারণে বলেন, "আমার শিক্ষক ইমাম আবু হানিফার কাছে জানতে চেয়েছি, 'কোনো পরিচিত ইহুদি ও খ্রিষ্টান যদি আপনজন হারায় বা শোকে মুহ্যমান থাকে, তবে তাদের প্রতি কীভাবে শোক প্রকাশ করা যায়?' উত্তরে তিনি বলেন, 'তুমি বলবে- আল্লাহ সকল সৃষ্টির জন্যই মৃত্যু নির্ধারিত করে রেখেছেন। আমরা শুধু আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারি, যাতে সবার ভাগ্যেই উত্তম মৃত্যু জোটে। আমরা সবাই আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি আবার তাঁর কাছেই ফিরে যাব। তাই ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে শোকাবহ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে হবে'।"

ইমাম আবু ইউসুফ আরও বলেন, হাসান বসরি রহ.-এর কাছে একজন খ্রিষ্টান পড়তে আসত। সেই খ্রিষ্টান ছাত্রের ভাইকেও ইমাম বসরি রহ. সান্ত্বনা দিতে গিয়েছিলেন। কারও মৃত্যুর পর সেই পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে ইমাম বসরি রহ. এভাবে দুআ করতেন, “আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রকৃত অনুসারীদের জন্য যে পুরস্কার নির্ধারণ করে রেখেছেন, তা যেন এই মরহুমকেও দান করেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের মৃত্যুকে নিয়ামতে পূর্ণ করে দেন। আমরা যে পরম সৌভাগ্য কামনা করি, আমাদের জন্য তা নসিব করে দিন। এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য দান করুন।"

মৃত্যু এমন একটি নিয়তি যা আমরা কেউ-ই অস্বীকার করতে পারব না। তাই মৃত মানুষদের জন্য স্বস্তিদায়ক দুআ করা উচিত এবং সব সময় নিজেদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।

ইবনে আবেদিন রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুখতার-এ ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর একটি মন্তব্য উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, "একজন অমুসলিম পরিজনের মৃত্যুতে দেখতে গেলে আপনি সেখানে তার মুসলিম পরিজনদের প্রতি সহানুভূতি জানাতে পারেন। এরকম অবস্থায় আপনি এভাবেও অমুসলিমদের জন্যও দুআ করতে পারেন, 'আল্লাহ তায়ালা আপনাকে উত্তম ধৈর্য দান করুন।' আবার কোনো অমুসলিম ব্যক্তি যখন তার কোনো মুসলিম পরিজনকে হারায়, তখন আপনি এভাবে দুআ করতে পারেন যে, 'আল্লাহ মরহুমের যাবতীয় গুনাহকে মাফ করে দিন এবং তাকে জান্নাত দান করুন'।"

যদি আপনার প্রতিবেশীর মধ্যে কেউ অমুসলিম থাকে, তবে তার সাথে ইসলামি আদবের অনুসরণ করার চেষ্টা করুন। ইসলাম ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।
একজন মুসলিম হিসেবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সামনে ইসলামের মহত্ত্ব ও সৌন্দর্য তুলে ধরা উচিত। প্রত্যেকের সঙ্গে মার্জিত ও সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে। বুখারি ও মুসলিমে খাদিমে রাসূল আনাস রা.-এর উদ্ধৃতিতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সা. বলেছেন, "যে ব্যক্তি নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও যদি একই জিনিস পছন্দ করতে না পারে, তবে সে ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
মুসলিমের অপর বর্ণনায় হাদিসটি এভাবে এসেছে, "নিজের জন্য পছন্দসই কোনো বিষয় বা বস্তুকে একজন মানুষ যদি তার ভাই বা প্রতিবেশীর জন্যও বাছাই করতে না পারে, তবে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
আলিমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে যে 'ভাই' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা সাধারণভাবেই করা হয়েছে। ভাইয়ের এই ধারণার মধ্যে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষই অন্তর্ভুক্ত। একজন মুসলিমকে তার অমুসলিম ভাইয়ের জন্য ঠিক সেই বিষয়টাই পছন্দ করতে হবে, যা সে তার নিজের জন্য করে থাকে। আর মানসিকভাবে ততটা উদার ও বড়ো মনের হতে পারলেই একজন মুসলিম ইসলামের সত্যিকারের সৌন্দর্য ধারণ করতে এবং অমুসলিমদের সামনে ইসলামের সৌন্দর্যকে যথার্থভাবে উপস্থাপন করতে পারবে।
প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব হলো তার অমুসলিম ভাই-বোনদের হিদায়াতপ্রাপ্তির জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করা। একইসঙ্গে, মুসলিম ভাই-বোনদের জন্যও দুআ করা, যেন তারা দ্বীনের পথে অটল থাকতে পারে এবং আন্তরিক ও একনিষ্ঠভাবে ইসলামের অনুশাসনগুলো মেনে চলতে পারেন। কুরআন মাজিদের সূরা মুমতাহিনায় আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেছে এবং বহিষ্কারকার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই জালিম।” সূরা মুমতাহিনা : ৮-৯
তাই অমুসলিম ব্যক্তি যদি আল্লাহর শানে এবং ইসলাম সম্বন্ধে বাজে কথা না বলে, তবে তাদের প্রতি আমাদের অবশ্যই দয়ালু, উদার ও সহনশীল হতে হবে। হয়তো এই সদাচরণের ফলে তারা একসময় ইসলামের প্রতি দরদ অনুভব করবে। হয়তো তারা ইসলাম কবুল করতে অনুপ্রাণিত হবে।
উল্লেখ্য, অমুসলিমদের সাথে ভালো ব্যবহারের অর্থ এমন নয় যে- আমরা তাদের মতো করেই সব কাজ করব অথবা মুসলিম হিসেবে আমাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বিসর্জন দেবো। বরং ভালো ব্যবহারের অর্থ হলো, আমরা তাদের সাথে সব সময় সত্যনিষ্ঠ, সহানুভূতিশীল ও নমনীয় আচরণ করব।
এ প্রসঙ্গে ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, “যারা মুসলিমদের হেয় করেনি বা তাদের ওপর আক্রমণ করেনি, তাদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও সহনশীল আচরণ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা নির্দেশনা দিয়েছেন।”
ইমাম কুরতুবি এক্ষেত্রে উদাহরণ দিতে গিয়ে আবদুর রহমান ইবনে জায়েদ রহ.-এর একটি মন্তব্যকেও সামনে নিয়ে আসেন। ইবনে জায়েদ অভিমত দিয়েছিলেন, “অমুসলিমদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের নীতিগুলো ইসলামের প্রথম যুগে প্রণীত হয়, যখন পর্যন্ত কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফয়সালা আসেনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অনেক যুদ্ধ হলেও অমুসলিমদের সাথে উত্তম ব্যবহারের এই রীতিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।”
এরপর ইমাম কুরতুবি রা. প্রখ্যাত তাবেয়ি কাতাদা রহ.-এর একটি মন্তব্যও তুলে ধরেন। কাতাদা দাবি করেন, কুরআনের উপরোক্ত আয়াতটি আর প্রয়োগযোগ্য থাকবে না। কারণ, পরবর্তী সময়ে সূরা তাওবার নিম্নোক্ত আয়াতটিও আল্লাহ নাজিল করেছেন।
“অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের যেখানে পাও, সেখানেই হত্যা করো। তাদের বন্দি করো এবং অবরোধ করো। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওত পেতে বসে থাকো। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” সূরা তাওবা : ৫
আবদুর রহমান ইবনে জায়েদ এবং কাতাদার দুটি মন্তব্য উপস্থাপন করার পর উপসংহারে ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, অধিকাংশ আলিম ও মুফাসসিরগণ মনে করেন, সূরা তাওবার উক্ত আয়াত নাজিল হওয়ায় অমুসলিমদের সাথে সদ্ব্যবহারের আয়াতটি অকার্যকর হয়ে যায়নি। এক্ষেত্রে বুখারি ও মুসলিম শরিফে আসমা বিনতে আবু বকর রা.-এর একটি ঘটনার কথা জানা যায়।
একবার তিনি নবি সা.-কে প্রশ্ন করলেন, 'আমার বাড়িতে যদি কোনো অমুসলিম নারী বেড়াতে আসে, তবে কি তার সেবা করতে পারব, দরদি আচরণ করতে পারব?' রাসূল সা. জবাব দিয়েছিলেন, 'অবশ্যই পারবে।'
সূরা মুমতাহিনার যে আয়াতে অমসলিমদের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও সহনশীল আচরণ করার কথা বলা হয়েছে, সেই আয়াতটি নাজিল হওয়ার একটি প্রেক্ষাপট আছে। আল মাওয়ার্দি এবং আবু দাউদ উদ্ধৃত করেন, আমর বিন আবদুল্লাহ বিন যুবাইর রহ. বর্ণনা করেন, তাঁর বাবা তাকে বলেছেন, ইসলাম গ্রহণের আগে আবু বকর রা. তাঁর স্ত্রী কুতাইলাকে তালাক দিয়েছিলেন। এই কুতাইলার গর্ভেই আসমা রা.-এর জন্ম হয়। আসমা হিজরত করে বাবা আবু বকরের কাছে মদিনায় চলে যান।
যাহোক, হিজরতের বেশ কয়েক বছর পর, কুরাইশ পৌত্তলিকদের সঙ্গে যখন নবিজির চুক্তি হয়, তখন কুতাইলা মদিনায় তার মেয়েকে দেখতে আসেন। তিনি মেয়ের জন্য কানের দুল এবং আরও উপহারসামগ্রী নিয়ে আসেন। মা অমুসলিম হওয়ায় তার উপহার নেওয়ার ব্যাপারে আসমা বিনতে আবু বকর রা. সংশয়ে ছিলেন। তিনি রাসূল সা.-এর মতামত জানতে চাইলেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তায়ালা উপরোক্ত আয়াতটি নাজিল করেন।
আল্লাহ তায়ালা অমুসলিমদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করার জন্য মুসলিমদের আদেশ করেছেন। 'আর যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি', বলে তাদেরকেই বোঝানো হয়েছে, যারা সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি। বিশেষ করে বনু খোজায়া গোত্র এবং এ জাতীয় অন্যান্য গোত্রগুলো, যারা মুসলিমদের সঙ্গে এই মর্মে মৈত্রী চুক্তি করেছিল, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। সেইসঙ্গে মুসলিমদের প্রতিপক্ষদেরও সহযোগিতা করবে না। আল্লাহ তায়ালা চুক্তিতে আবদ্ধ এই সব গোত্রগুলোর সাথেও সহানুভূতিশীল আচরণ করার জন্য মুসলিমদের নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
অন্যদিকে কাজি আবু বকর আল আরাবি রহ. বলেন, “কুরআনের আয়াতে এখানে যে ইনসাফের কথা বলা হয়েছে, তা ন্যায়বিচার সম্পর্কিত নয়; বরং অংশীদারিত্বের হিসেবে। অর্থাৎ একজন মুসলিম তার অমুসলিম ভাইয়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে তার প্রাপ্য অর্থ তাকে অবশ্যই প্রদান করবে। আর শত্রু বা মিত্র যাই হোক না কেন, ন্যায়বিচার পাওয়া সকলেরই অধিকার।”
ইমাম বুখারি এবং আহমাদ রহ. এ প্রসঙ্গে আনাস বিন মালিক রা.-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। এক ইহুদি কিশোর ছিল, যে নবিজির অজুর পানি, জুতো এগিয়ে দিত। একবার সেই কিশোরটি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। খবর পেয়ে নবিজি সা. তাকে দেখতে গেলেন। তিনি দেখলেন, ছেলেটি একেবারে মুত্যুসজ্জার বিছানায় শুয়ে আছে; তার পিতা শিয়রে বসে আছে।
রাসূল সা. কিশোরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং আহ্বান করলেন, 'বলো, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।' কিশোর ছেলেটি তার পিতার দিকে তাকাল, কিন্তু তার বাবা তখনও নীরব। নবিজি সা. আবারও অনুরোধ করলেন। এবারও ছেলেটি বাবার মুখপানে চেয়ে রইল। অবশেষে বাবা বললেন, 'আবুল কাসেম (নবিজি) যা বলতে বলছেন, বলো।' ছেলেটি ঠিক মৃত্যুর আগ মুহূর্তে বলল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আর আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল।' এটা শোনার পর নবিজি সা. গভীর ভালোবাসার সাথে বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, আমি তাকে বাঁচাতে সক্ষম হলাম।'
ইবনে হাজার রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, “মুসলিমরা অমুসলিমদের কাজে নিয়োগ করতে পারবে, অসুস্থ হলে দেখতে যেতে পারবে। এই হাদিসটি একইসঙ্গে অমুসলিমদের প্রতি আন্তরিক হওয়ার তাগিদ দেয়। তরুণ ও যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য, তাদের ইসলামের পথে নিয়ে আসার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালানোরও নির্দেশনা প্রদান করে।"
অন্যদিকে, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস বদরুদ্দিন আইনি রহ. বলেন, “অমুসলিমদের অসুস্থ অবস্থায় দেখতে যাওয়া এবং অমুসলিম প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হওয়ার জন্য ইসলাম যে তাগিদ দিয়েছে, তার মাধ্যমে ইসলামের সহনশীলতা এবং উদারতাই প্রকাশ পায়। ইসলামের এই ঔদার্যের কারণেই অমুসলিমরা সব সময় ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। তরুণ-যুবাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য ইসলাম কতটা আন্তরিক, তাও এই বর্ণনা থেকে অনুধাবন করা যায়।”
কোনো অমুসলিমের প্রতি শোক জানাতে হলে অবশ্যই সঠিক বচনে শোক জানাতে হবে। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. কিতাবুল খারাজ-এর শেষাংশে একটি স্মৃতিচারণে বলেন, "আমার শিক্ষক ইমাম আবু হানিফার কাছে জানতে চেয়েছি, 'কোনো পরিচিত ইহুদি ও খ্রিষ্টান যদি আপনজন হারায় বা শোকে মুহ্যমান থাকে, তবে তাদের প্রতি কীভাবে শোক প্রকাশ করা যায়?' উত্তরে তিনি বলেন, 'তুমি বলবে- আল্লাহ সকল সৃষ্টির জন্যই মৃত্যু নির্ধারিত করে রেখেছেন। আমরা শুধু আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারি, যাতে সবার ভাগ্যেই উত্তম মৃত্যু জোটে। আমরা সবাই আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি আবার তাঁর কাছেই ফিরে যাব। তাই ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে শোকাবহ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে হবে'।"
ইমাম আবু ইউসুফ আরও বলেন, হাসান বসরি রহ.-এর কাছে একজন খ্রিষ্টান পড়তে আসত। সেই খ্রিষ্টান ছাত্রের ভাইকেও ইমাম বসরি রহ. সান্ত্বনা দিতে গিয়েছিলেন। কারও মৃত্যুর পর সেই পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে ইমাম বসরি রহ. এভাবে দুআ করতেন, “আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রকৃত অনুসারীদের জন্য যে পুরস্কার নির্ধারণ করে রেখেছেন, তা যেন এই মরহুমকেও দান করেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের মৃত্যুকে নিয়ামতে পূর্ণ করে দেন। আমরা যে পরম সৌভাগ্য কামনা করি, আমাদের জন্য তা নসিব করে দিন। এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য দান করুন।"
মৃত্যু এমন একটি নিয়তি যা আমরা কেউ-ই অস্বীকার করতে পারব না। তাই মৃত মানুষদের জন্য স্বস্তিদায়ক দুআ করা উচিত এবং সব সময় নিজেদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
ইবনে আবেদিন রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুখতার-এ ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর একটি মন্তব্য উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, "একজন অমুসলিম পরিজনের মৃত্যুতে দেখতে গেলে আপনি সেখানে তার মুসলিম পরিজনদের প্রতি সহানুভূতি জানাতে পারেন। এরকম অবস্থায় আপনি এভাবেও অমুসলিমদের জন্যও দুআ করতে পারেন, 'আল্লাহ তায়ালা আপনাকে উত্তম ধৈর্য দান করুন।' আবার কোনো অমুসলিম ব্যক্তি যখন তার কোনো মুসলিম পরিজনকে হারায়, তখন আপনি এভাবে দুআ করতে পারেন যে, 'আল্লাহ মরহুমের যাবতীয় গুনাহকে মাফ করে দিন এবং তাকে জান্নাত দান করুন'।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00