📘 ইসলামিক ম্যানারস > 📄 বয়স্কদের প্রতি আন্তরিক হোন

📄 বয়স্কদের প্রতি আন্তরিক হোন


বয়স্ক মানুষদের অবস্থানকে স্বীকৃতি দিন এবং তাদের যথাযথ সম্মান করুন। তাদের সাথে হাঁটার সময় একটু পেছনে থাকুন এবং আস্তে আস্তে হাঁটুন। এক্ষেত্রে তাদের ডানে দিকে থেকে হাঁটলেই উত্তম। কোথাও প্রবেশের সময় বয়োজ্যেষ্ঠদের আগে প্রবেশ করতে দিন। বের হওয়ার সময়ও তাদের অগ্রাধিকার দিন।

তাদের সাথে দেখা হলে সুন্দর করে সালাম দিন, অভিবাদন জানান। বয়োবৃদ্ধদের সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে আগে তাদেরকেই বলতে দিন। মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনুন। যদি আলোচনা করতে গিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়, তবে নম্র ও শান্ত থাকুন, অন্তরে শ্রদ্ধাবোধ ধরে রাখুন এবং কণ্ঠস্বর নিচু রাখুন। বয়স্ক মানুষজনের প্রতি কখনোই শ্রদ্ধা হারাবেন না।

এই বিনম্রতা ধরে রাখার ব্যাপারে কিছু হাদিস ও ঘটনা মনে রাখা সহায়ক হবে। বুখারি ও মুসলিমের একটি হাদিস থেকে জানা যায়, একবার আবদুল্লাহ ইবনে সাহল রা. অপর এক সাহাবি মাহিসা বিন মাসউদ রা.-কে নিয়ে খাইবার অঞ্চলে গিয়েছিলেন। ফিরে আসার সময় আবদুল্লাহ রা.-কে শহিদ করা হয়। মাহিসা সেখান থেকে ফিরেই তার বড়ো ভাই হাওয়াইসা এবং শহিদ সাহাবির ভাই আবদুর রহমান ইবনে সাহলকে নিয়ে নবিজির কাছে যান। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মাহিসা আগে কথা বলতে শুরু করেন। কিন্তু রাসূল সা. তাকে থামিয়ে দেন এবং বলেন, আগে বড়োদের কথা বলতে দাও। তারপর হাওয়াইসা আগে কথা বলেন এবং অতঃপর মাহিসা কথা বলার সুযোগ পান।

এক্ষত্রে আরও একটি ঘটনা দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায়। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, “একদিন রাসূল সা. উপস্থিত সাহাবিদেও উদ্দেশে বললেন, 'তোমরা আমাকে এমন একটা বৃক্ষের নাম বলো, যার দৃষ্টান্ত মুমিন বান্দার মতো। তা সর্বদা তার প্রতিপালকের নির্দেশে খাদ্য দান করে, আর এর পাতাও ঝরে না।' তখন আমার মনে হলো যে এটি খেজুর গাছ। কিন্তু যেহেতু সে স্থানে আবু বকর ও উমর রা. উপস্থিত থেকেও কথা বলছিলেন না, তাই আমিও কথা বলা পছন্দ করিনি। তখন নবি সা. নিজেই বললেন, 'এটি খেজুর গাছ।' তারপর আমি যখন আমার আব্বার সাথে বেরিয়ে এলাম, তখন আমি বললাম, 'আব্বা! আমার মনেও খেয়াল এসেছিল যে, এটা নিশ্চয়ই খেজুর গাছ।' তিনি বললেন, 'তোমাকে তা বলতে কীসে বাধা দিয়েছিল? যদি তুমি তা বলতে, তা হলে এ কথা আমার কাছে এত এত ধন-সম্পদ পাওয়ার চেয়েও অধিক প্রিয় হতো, আমার সম্মানও বৃদ্ধি পেত।' আমি বললাম, 'আমাকে শুধু এ বিষয়টিই বাধা দিয়েছিল যে, আমি দেখলাম, আপনি ও আবু বকর রা. কেউ-ই কথা বলছেন না। তাই আমিও কথা বলা পছন্দ করলাম না'।"

ইমাম আহমাদ, হাকিম এবং তাবারানি রহ. উল্লেখ করেছেন, উবাদা ইবনে সামিত রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, “যে বড়োদের শ্রদ্ধা করে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।” এই হাদিসটি আরেকটি বর্ণনায় এভাবে এসেছে, “যে ব্যক্তি বয়স্কদের শ্রদ্ধা করে না এবং ছোটোদের স্নেহ করে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।"

অল্পবয়সি হলেও কাউকে হেয় বা ছোটো করে দেখা ঠিক নয়। বুখারি শরিফে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর বর্ণনা জানা যায়, একবার উমর রা. তাঁর মজলিসে একটি আয়োজনে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবিদের সঙ্গে ইবনে আব্বাসকেও থাকার সুযোগ দেন। তাকে দেখে অনেকেই ইতস্ততবোধ করছিলেন। অনেকে এমনও বলছিলেন, সে তো আমাদের ছেলের বয়সি। আমাদের মাঝখানে তাকে ডাকা হলো কেন? সাইয়িদুনা উমর রা. জবাব দিলেন, সে উত্তম জ্ঞানী। তাই তাকে দাওয়াত করা হয়েছে।

আরেকটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, সাহাবিদের কেউ ছোটো হিসেবে ইবনে আব্বাসের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি তুললে উমর ফারুক রা. উপস্থিত সবাইকে সূরা ফাতিহা ব্যাখ্যা করতে বললেন। সবার মাঝে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. অধিকতর চমৎকারভাবে সূরা ফাতিহা ব্যাখ্যা করেছিলেন। ইবনে আব্বাস রা. পরে বলেন, আমার ধারণা, শুধু আমাদের অন্য সকলের সামনে যৎসামান্য জ্ঞানী হিসেবে প্রমাণ করার জন্যই উমর রা. সেদিন সেই প্রশ্নটি তুলেছিলেন।

বয়স্ক মানুষদের অবস্থানকে স্বীকৃতি দিন এবং তাদের যথাযথ সম্মান করুন। তাদের সাথে হাঁটার সময় একটু পেছনে থাকুন এবং আস্তে আস্তে হাঁটুন। এক্ষেত্রে তাদের ডানে দিকে থেকে হাঁটলেই উত্তম। কোথাও প্রবেশের সময় বয়োজ্যেষ্ঠদের আগে প্রবেশ করতে দিন। বের হওয়ার সময়ও তাদের অগ্রাধিকার দিন।
তাদের সাথে দেখা হলে সুন্দর করে সালাম দিন, অভিবাদন জানান। বয়োবৃদ্ধদের সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে আগে তাদেরকেই বলতে দিন। মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনুন। যদি আলোচনা করতে গিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়, তবে নম্র ও শান্ত থাকুন, অন্তরে শ্রদ্ধাবোধ ধরে রাখুন এবং কণ্ঠস্বর নিচু রাখুন। বয়স্ক মানুষজনের প্রতি কখনোই শ্রদ্ধা হারাবেন না।
এই বিনম্রতা ধরে রাখার ব্যাপারে কিছু হাদিস ও ঘটনা মনে রাখা সহায়ক হবে। বুখারি ও মুসলিমের একটি হাদিস থেকে জানা যায়, একবার আবদুল্লাহ ইবনে সাহল রা. অপর এক সাহাবি মাহিসা বিন মাসউদ রা.-কে নিয়ে খাইবার অঞ্চলে গিয়েছিলেন। ফিরে আসার সময় আবদুল্লাহ রা.-কে শহিদ করা হয়। মাহিসা সেখান থেকে ফিরেই তার বড়ো ভাই হাওয়াইসা এবং শহিদ সাহাবির ভাই আবদুর রহমান ইবনে সাহলকে নিয়ে নবিজির কাছে যান। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মাহিসা আগে কথা বলতে শুরু করেন। কিন্তু রাসূল সা. তাকে থামিয়ে দেন এবং বলেন, আগে বড়োদের কথা বলতে দাও। তারপর হাওয়াইসা আগে কথা বলেন এবং অতঃপর মাহিসা কথা বলার সুযোগ পান।
এক্ষত্রে আরও একটি ঘটনা দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায়। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, “একদিন রাসূল সা. উপস্থিত সাহাবিদেও উদ্দেশে বললেন, 'তোমরা আমাকে এমন একটা বৃক্ষের নাম বলো, যার দৃষ্টান্ত মুমিন বান্দার মতো। তা সর্বদা তার প্রতিপালকের নির্দেশে খাদ্য দান করে, আর এর পাতাও ঝরে না।' তখন আমার মনে হলো যে এটি খেজুর গাছ। কিন্তু যেহেতু সে স্থানে আবু বকর ও উমর রা. উপস্থিত থেকেও কথা বলছিলেন না, তাই আমিও কথা বলা পছন্দ করিনি। তখন নবি সা. নিজেই বললেন, 'এটি খেজুর গাছ।' তারপর আমি যখন আমার আব্বার সাথে বেরিয়ে এলাম, তখন আমি বললাম, 'আব্বা! আমার মনেও খেয়াল এসেছিল যে, এটা নিশ্চয়ই খেজুর গাছ।' তিনি বললেন, 'তোমাকে তা বলতে কীসে বাধা দিয়েছিল? যদি তুমি তা বলতে, তা হলে এ কথা আমার কাছে এত এত ধন-সম্পদ পাওয়ার চেয়েও অধিক প্রিয় হতো, আমার সম্মানও বৃদ্ধি পেত।' আমি বললাম, 'আমাকে শুধু এ বিষয়টিই বাধা দিয়েছিল যে, আমি দেখলাম, আপনি ও আবু বকর রা. কেউ-ই কথা বলছেন না। তাই আমিও কথা বলা পছন্দ করলাম না'।"
ইমাম আহমাদ, হাকিম এবং তাবারানি রহ. উল্লেখ করেছেন, উবাদা ইবনে সামিত রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, “যে বড়োদের শ্রদ্ধা করে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।” এই হাদিসটি আরেকটি বর্ণনায় এভাবে এসেছে, “যে ব্যক্তি বয়স্কদের শ্রদ্ধা করে না এবং ছোটোদের স্নেহ করে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।"
অল্পবয়সি হলেও কাউকে হেয় বা ছোটো করে দেখা ঠিক নয়। বুখারি শরিফে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর বর্ণনা জানা যায়, একবার উমর রা. তাঁর মজলিসে একটি আয়োজনে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবিদের সঙ্গে ইবনে আব্বাসকেও থাকার সুযোগ দেন। তাকে দেখে অনেকেই ইতস্ততবোধ করছিলেন। অনেকে এমনও বলছিলেন, সে তো আমাদের ছেলের বয়সি। আমাদের মাঝখানে তাকে ডাকা হলো কেন? সাইয়িদুনা উমর রা. জবাব দিলেন, সে উত্তম জ্ঞানী। তাই তাকে দাওয়াত করা হয়েছে।
আরেকটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, সাহাবিদের কেউ ছোটো হিসেবে ইবনে আব্বাসের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি তুললে উমর ফারুক রা. উপস্থিত সবাইকে সূরা ফাতিহা ব্যাখ্যা করতে বললেন। সবার মাঝে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. অধিকতর চমৎকারভাবে সূরা ফাতিহা ব্যাখ্যা করেছিলেন। ইবনে আব্বাস রা. পরে বলেন, আমার ধারণা, শুধু আমাদের অন্য সকলের সামনে যৎসামান্য জ্ঞানী হিসেবে প্রমাণ করার জন্যই উমর রা. সেদিন সেই প্রশ্নটি তুলেছিলেন।

📘 ইসলামিক ম্যানারস > 📄 মুশরিকদেরই নামাজের ইমামতি করার সুযোগ দিন

📄 মুশরিকদেরই নামাজের ইমামতি করার সুযোগ দিন


রাসূল সা. তাঁর সুন্নাহ দিয়ে তরুণ ও যুবকদের শিখিয়েছেন, যুবকদের দায়িত্ব হলো বয়স্ক মানুষদের সঙ্গ দেওয়া এবং সকল ক্ষেত্রে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া।

সহিহ বুখারি ও মুসলিমের উদ্ধৃত একটি হাদিসে সাহাবি মালিক বিন হুয়াইরিস রা. বলেন, “একবার আমিসহ কয়েকজন যুবকের একটি দল নবিজি সা.-এর সান্নিধ্যে টানা বিশ রাত অতিবাহিত করার সুযোগ পেয়েছিলাম। রাসূল সা. ছিলেন অতিশয় দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। তিনি অনুভব করতেন, আমরা ঘরের স্বজনদের কথা ভাবছি। তাই তিনি আমাদের প্রশ্ন করতেন, তোমাদের ঘরে কে কে আছে? কাদেরকে রেখে তোমরা এখানে এসেছ? আমরা যখন তাকে জানালাম, আমাদের বাড়িতে কে কে আছে, তখন তিনি বললেন, “তোমরা বাড়ি ফিরে যাও। তাদের সাথে থাকো, তাদের ইসলাম শিক্ষা দাও এবং সৎ কাজের আদেশ দাও। যখন নামাজের সময় হবে, তাদের মধ্য থেকে কাউকে আজানের দায়িত্ব দাও। আর তোমাদের মধ্যে যিনি বয়সে বড়ো, তাকে ইমামতি করার সুযোগ দাও।”

এ ঘটনায় জানা যায়, রাসূল সা. বয়স্ক ও মুরব্বিদের নামাজে ইমামতি করার জন্য বলেছেন। যদি তারা জ্ঞানে ও শিক্ষায় যুবকদের সমানও হয়, তারপরও বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়ার কারণে তাদের এই সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু কোনো মানুষ যদি জ্ঞানে বয়োজেষ্ঠ্যদের চেয়েও বেশি যোগ্য হয়, তবে সেই জ্ঞানী ব্যক্তিকেই নামাজে ইমামতি করার দায়িত্ব দিতে হবে। কারণ, সম্মানের মানদণ্ড হিসেবে বয়সের তুলনায় জ্ঞানের অবস্থান অনেক ওপরে।

যদি কোনো বাড়িতে নামাজ আদায় করা হয়, তবে যিনি বাড়ির মালিক, তারই ইমামতি করার হক। যদি তিনি চান তবে জ্ঞান বা বয়সের দিক থেকে সিনিয়র এমন মেহমানকে নামাজ পড়ানোর জন্য অনুরোধ করতে পারেন। কিন্তু যদি উক্ত মেহমান ইমামতি করতে অনীহা প্রকাশ করেন, তবে আয়োজক ব্যক্তিরই নামাজ পড়ানো উচিত।

ইমাম আহমাদ রহ. তাঁর মুসনাদে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। একবার প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. আরেকজন বিশিষ্ট সাহাবি আবু মুসা আশআরি রা.-এর বাড়িতে বেড়াতে যান। এমন সময় নামাজের ওয়াক্ত হয়। আবু মুসা রা. তখন ইবনে মাসউদকে বলেন, 'আপনি নামাজ পড়ান। কারণ, আপনি আমার চেয়ে বয়সে বড়ো আবার জ্ঞানেও বড়ো।' ইবনে মাসউদ রা. জবাবে বলেন, 'না, আপনি নামাজ পড়ান। কারণ, এটি আপনার বাড়ি।' এরপর আবু মুসা রা. আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নামাজে ইমামতি করেন।

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববি রহ. বলেন, "এই হাদিস থেকে বোঝা যায়- যদি কোনো অনুষ্ঠানে অধিক জ্ঞানী বা ধার্মিক লোকও থাকে, তারপরও ইমামতি করার জন্য উক্ত বাড়ির মালিক বা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বেশি অগ্রাধিকার পাবেন। এই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি নিজে আগ্রহী না হয়ে অন্য কাউকে সামনে এগিয়ে দেয়, কেবল তখনই অন্য ব্যক্তিরা নামাজ পড়াবেন।"

নতুন কোনো স্থানে গেলেও স্থানীয় লোকদের দিয়েই নামাজের ইমামতি করানো বাঞ্ছনীয়। মালিক ইবনুল হুয়াইরিস রা.-কে একবার ইমামতি করতে বলা হলে তিনি বললেন, 'তোমরা নিজেদের মধ্য হতে একজনকে ইমামতি করতে বলো। আমি তোমাদের ইমামতি না করার কারণ সম্পর্কে তোমাদের একটি হাদিস শোনাব। আমি রাসূলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি, “কেউ কোনো কওমের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে সে যেন তাদের ইমামতি না করে; বরং তাদের মধ্য হতেই যেন কেউ ইমামতি করে।” আবু দাউদ: ৫৯৬

রাসূল সা. তাঁর সুন্নাহ দিয়ে তরুণ ও যুবকদের শিখিয়েছেন, যুবকদের দায়িত্ব হলো বয়স্ক মানুষদের সঙ্গ দেওয়া এবং সকল ক্ষেত্রে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া।
সহিহ বুখারি ও মুসলিমের উদ্ধৃত একটি হাদিসে সাহাবি মালিক বিন হুয়াইরিস রা. বলেন, “একবার আমিসহ কয়েকজন যুবকের একটি দল নবিজি সা.-এর সান্নিধ্যে টানা বিশ রাত অতিবাহিত করার সুযোগ পেয়েছিলাম। রাসূল সা. ছিলেন অতিশয় দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। তিনি অনুভব করতেন, আমরা ঘরের স্বজনদের কথা ভাবছি। তাই তিনি আমাদের প্রশ্ন করতেন, তোমাদের ঘরে কে কে আছে? কাদেরকে রেখে তোমরা এখানে এসেছ? আমরা যখন তাকে জানালাম, আমাদের বাড়িতে কে কে আছে, তখন তিনি বললেন, “তোমরা বাড়ি ফিরে যাও। তাদের সাথে থাকো, তাদের ইসলাম শিক্ষা দাও এবং সৎ কাজের আদেশ দাও। যখন নামাজের সময় হবে, তাদের মধ্য থেকে কাউকে আজানের দায়িত্ব দাও। আর তোমাদের মধ্যে যিনি বয়সে বড়ো, তাকে ইমামতি করার সুযোগ দাও।”
এ ঘটনায় জানা যায়, রাসূল সা. বয়স্ক ও মুরব্বিদের নামাজে ইমামতি করার জন্য বলেছেন। যদি তারা জ্ঞানে ও শিক্ষায় যুবকদের সমানও হয়, তারপরও বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়ার কারণে তাদের এই সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু কোনো মানুষ যদি জ্ঞানে বয়োজেষ্ঠ্যদের চেয়েও বেশি যোগ্য হয়, তবে সেই জ্ঞানী ব্যক্তিকেই নামাজে ইমামতি করার দায়িত্ব দিতে হবে। কারণ, সম্মানের মানদণ্ড হিসেবে বয়সের তুলনায় জ্ঞানের অবস্থান অনেক ওপরে।
যদি কোনো বাড়িতে নামাজ আদায় করা হয়, তবে যিনি বাড়ির মালিক, তারই ইমামতি করার হক। যদি তিনি চান তবে জ্ঞান বা বয়সের দিক থেকে সিনিয়র এমন মেহমানকে নামাজ পড়ানোর জন্য অনুরোধ করতে পারেন। কিন্তু যদি উক্ত মেহমান ইমামতি করতে অনীহা প্রকাশ করেন, তবে আয়োজক ব্যক্তিরই নামাজ পড়ানো উচিত।
ইমাম আহমাদ রহ. তাঁর মুসনাদে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। একবার প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. আরেকজন বিশিষ্ট সাহাবি আবু মুসা আশআরি রা.-এর বাড়িতে বেড়াতে যান। এমন সময় নামাজের ওয়াক্ত হয়। আবু মুসা রা. তখন ইবনে মাসউদকে বলেন, 'আপনি নামাজ পড়ান। কারণ, আপনি আমার চেয়ে বয়সে বড়ো আবার জ্ঞানেও বড়ো।' ইবনে মাসউদ রা. জবাবে বলেন, 'না, আপনি নামাজ পড়ান। কারণ, এটি আপনার বাড়ি।' এরপর আবু মুসা রা. আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নামাজে ইমামতি করেন।
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববি রহ. বলেন, "এই হাদিস থেকে বোঝা যায়- যদি কোনো অনুষ্ঠানে অধিক জ্ঞানী বা ধার্মিক লোকও থাকে, তারপরও ইমামতি করার জন্য উক্ত বাড়ির মালিক বা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বেশি অগ্রাধিকার পাবেন। এই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি নিজে আগ্রহী না হয়ে অন্য কাউকে সামনে এগিয়ে দেয়, কেবল তখনই অন্য ব্যক্তিরা নামাজ পড়াবেন।"
নতুন কোনো স্থানে গেলেও স্থানীয় লোকদের দিয়েই নামাজের ইমামতি করানো বাঞ্ছনীয়। মালিক ইবনুল হুয়াইরিস রা.-কে একবার ইমামতি করতে বলা হলে তিনি বললেন, 'তোমরা নিজেদের মধ্য হতে একজনকে ইমামতি করতে বলো। আমি তোমাদের ইমামতি না করার কারণ সম্পর্কে তোমাদের একটি হাদিস শোনাব। আমি রাসূলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি, “কেউ কোনো কওমের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে সে যেন তাদের ইমামতি না করে; বরং তাদের মধ্য হতেই যেন কেউ ইমামতি করে।” আবু দাউদ: ৫৯৬

📘 ইসলামিক ম্যানারস > 📄 বয়স্ক মানুষের সাথে পথচলার আদব

📄 বয়স্ক মানুষের সাথে পথচলার আদব


প্রখ্যাত ফকিহ আলী বিন মুবারাক আল কারখি ছিলেন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর একজন ছাত্র। বয়স্ক মানুষদের সঙ্গে কীভাবে হাঁটা যায় বা চলাচল করা যায়, সেই প্রসঙ্গে আলী বিন মুবারাক আল কারখি রহ.-এর একটি উক্তি এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে। “একদিন আমি বিচারপতি আবু ইয়ালার সঙ্গে হাঁটছিলাম। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, 'যদি তুমি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে গিয়ে কারও সঙ্গে হাঁটো বা হাঁটতে চাও, তবে তুমি কোনদিক দিয়ে হাঁটো?' আমি বললাম, 'জানি না, আমি তো কখনও এটা খেয়ালও করিনি।' তখন তিনি আমাকে বললেন, 'সব সময় মুরব্বি ব্যক্তির ডান পাশ দিয়ে হাঁটবে। তাকে নামাজে ইমামতি করার সুযোগ দেবে। তাঁর বাম পাশ খালি রাখবে, যাতে তিনি প্রয়োজনে থুতু ফেলতে পারেন বা নোংরা-ময়লা বা আবর্জনা এড়িয়ে চলতে পারেন'।"

কয়েকজন মুসলিম শিক্ষাবিদ বন্ধুদের মধ্যে প্রায়ই একটি মজার ঘটনা ঘটত। তাদের মধ্যে ছিলেন বিচারপতি আহমাদ ইবনে উমার বিন সুরিয়াহ, ফকিহ মুহাম্মাদ বিন দাউদ জাহেরি এবং ভাষাবিদ নাফতউইহ। একবার তারা একসাথে হাঁটতে হাঁটতে খুব সরু গলির সামনে চলে এলেন। প্রত্যেকেই আগে যেতে চাইছিলেন। তখন ইবনে উমার সুরিয়াহ বললেন, 'সরু গলি সর্বদা অসৌজন্যমূলক আচরণ উসকে দেয়।' ইবনে দাউদ এই কথার জবাবে বলেন, 'আমাদের অবস্থা দেখেও তা-ই মনে হচ্ছে।' আর সবশেষে নাফতউইহ বলেন, 'যতক্ষণ বন্ধুত্ব টিকে আছে, ততক্ষণ লৌকিক সৌজন্যতার কোনো স্থান নেই'।”

এই গল্প থেকে এটা জানা যায় না যে, উপরোক্ত তিনজনের মধ্যে কে আগে সেই সরু গলি পার হয়েছিলেন; খুব সম্ভবত আহমাদ ইবনে সুরিয়াহ। কারণ, তিনি ছিলেন বিচারপতি, প্রখ্যাত ইমাম এবং অন্য দুই সঙ্গীর তুলনায় তাঁর সামাজিক অবস্থানও ছিল ঊর্ধ্বে। তাঁর উপরোক্ত মন্তব্য তথা 'সরু গলি সব সময় অসৌজন্যমূলক আচরণ উসকে দেয়' প্রমাণ করে, তিনি আগে যাওয়ার জন্য পরোক্ষভাবে ক্ষমাই চাইছিলেন। নিজের বিনম্র মানসিকতার কারণেই তিনি এভাবে ক্ষমা চেয়েছেন। অন্যরা কেউ আগে গেলে তিনি হয়তো এভাবে বলতেন না। আবার ইবনে দাউদ ও নাফতউইহের মন্তব্যে প্রমাণ হয়, তাঁরাও বন্ধুবৎসল হৃদ্যতার সম্পর্কের কারণে আগে যেতে পারেন। তবে যেই যাক না কেন, যেভাবে তারা মন্তব্য করেছেন এবং একে অপরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, তা চমৎকার বন্ধুত্বেও নিদর্শন ও শিক্ষণীয়।

প্রখ্যাত ফকিহ আলী বিন মুবারাক আল কারখি ছিলেন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর একজন ছাত্র। বয়স্ক মানুষদের সঙ্গে কীভাবে হাঁটা যায় বা চলাচল করা যায়, সেই প্রসঙ্গে আলী বিন মুবারাক আল কারখি রহ.-এর একটি উক্তি এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে। “একদিন আমি বিচারপতি আবু ইয়ালার সঙ্গে হাঁটছিলাম। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, 'যদি তুমি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে গিয়ে কারও সঙ্গে হাঁটো বা হাঁটতে চাও, তবে তুমি কোনদিক দিয়ে হাঁটো?' আমি বললাম, 'জানি না, আমি তো কখনও এটা খেয়ালও করিনি।' তখন তিনি আমাকে বললেন, 'সব সময় মুরব্বি ব্যক্তির ডান পাশ দিয়ে হাঁটবে। তাকে নামাজে ইমামতি করার সুযোগ দেবে। তাঁর বাম পাশ খালি রাখবে, যাতে তিনি প্রয়োজনে থুতু ফেলতে পারেন বা নোংরা-ময়লা বা আবর্জনা এড়িয়ে চলতে পারেন'।"
কয়েকজন মুসলিম শিক্ষাবিদ বন্ধুদের মধ্যে প্রায়ই একটি মজার ঘটনা ঘটত। তাদের মধ্যে ছিলেন বিচারপতি আহমাদ ইবনে উমার বিন সুরিয়াহ, ফকিহ মুহাম্মাদ বিন দাউদ জাহেরি এবং ভাষাবিদ নাফতউইহ। একবার তারা একসাথে হাঁটতে হাঁটতে খুব সরু গলির সামনে চলে এলেন। প্রত্যেকেই আগে যেতে চাইছিলেন। তখন ইবনে উমার সুরিয়াহ বললেন, 'সরু গলি সর্বদা অসৌজন্যমূলক আচরণ উসকে দেয়।' ইবনে দাউদ এই কথার জবাবে বলেন, 'আমাদের অবস্থা দেখেও তা-ই মনে হচ্ছে।' আর সবশেষে নাফতউইহ বলেন, 'যতক্ষণ বন্ধুত্ব টিকে আছে, ততক্ষণ লৌকিক সৌজন্যতার কোনো স্থান নেই'।”
এই গল্প থেকে এটা জানা যায় না যে, উপরোক্ত তিনজনের মধ্যে কে আগে সেই সরু গলি পার হয়েছিলেন; খুব সম্ভবত আহমাদ ইবনে সুরিয়াহ। কারণ, তিনি ছিলেন বিচারপতি, প্রখ্যাত ইমাম এবং অন্য দুই সঙ্গীর তুলনায় তাঁর সামাজিক অবস্থানও ছিল ঊর্ধ্বে। তাঁর উপরোক্ত মন্তব্য তথা 'সরু গলি সব সময় অসৌজন্যমূলক আচরণ উসকে দেয়' প্রমাণ করে, তিনি আগে যাওয়ার জন্য পরোক্ষভাবে ক্ষমাই চাইছিলেন। নিজের বিনম্র মানসিকতার কারণেই তিনি এভাবে ক্ষমা চেয়েছেন। অন্যরা কেউ আগে গেলে তিনি হয়তো এভাবে বলতেন না। আবার ইবনে দাউদ ও নাফতউইহের মন্তব্যে প্রমাণ হয়, তাঁরাও বন্ধুবৎসল হৃদ্যতার সম্পর্কের কারণে আগে যেতে পারেন। তবে যেই যাক না কেন, যেভাবে তারা মন্তব্য করেছেন এবং একে অপরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, তা চমৎকার বন্ধুত্বেও নিদর্শন ও শিক্ষণীয়।

📘 ইসলামিক ম্যানারস > 📄 বয়স্ক ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দান

📄 বয়স্ক ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দান


অন্য সবার আগে সবকিছুতে বয়স্ক বা মুরব্বি ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো আয়োজনে খাবার বিতরণ করার সময়ও আগে মুরব্বিদের দিতে হবে। তাদের দেওয়া হয়ে গেলে, তারপর হাতের ডান পাশ থেকে বিতরণ শুরু করতে হবে। রাসূল সা. নিজেও এভাবেই খাবার বিতরণ করতেন। তা ছাড়া ওপরে উল্লেখিত হাদিস থেকেও বয়স্ক ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে শিক্ষা পাওয়া যায়।

ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর সহিহ মুসলিমের আদব ও শিষ্টাচার অধ্যায়ে খাওয়া ও পান করার নিয়ম প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেন, হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. বলেন, “আমরা রাসূল সা.-এর সঙ্গে যখন যেখানেই দাওয়াতে যেতাম, তাঁর আগে কখনোই খাবার স্পর্শ করতাম না।"

এই আদবের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে ইমাম নববি রহ. রিয়াদুস সালিহিন গ্রন্থে বেশকিছু হাদিস উল্লেখ করেছেন। সেইসঙ্গে জ্ঞানী, মুরব্বি এবং শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা করার নিয়ম বিষয়ে গোটা একটি অধ্যায় সন্নিবেশিত করেছেন।

ব্যক্তিগতভাবেও তিনি সব সময় মুরব্বি ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতেন। তাদের বসার জন্য ভালো আসন দিতেন। সর্ববস্থায় তাদের সম্মান ধরে রাখার চেষ্টা করতেন। রিয়াদুস সালিহিন গ্রন্থ থেকে এ সংক্রান্ত কিছু হাদিস নিচে উল্লেখ করছি।

সহিহ মুসলিম-এ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী ও পরিণত, তারা আমার পেছনে দাঁড়াবে। তারপর যারা অপেক্ষাকৃত কম জ্ঞানী তারা, তার থেকেও যারা কম জানেন তারা এর পেছনে। এভাবে ক্রমানুসারে তোমরা কাতারবদ্ধ হবে।”

সুনানে আবু দাউদ-এ আবু মুসা আশআরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “আল্লাহর প্রতি সম্মান দেখানোর একটি উপায় হলো বয়স্ক ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা করা। বিশেষ করে যাদের চুল পেকে সাদা হয়ে গেছে, কিংবা যারা নিয়মিত কুরআন অধ্যয়ন করেন এবং যারা ন্যায়পরায়ণ শাসক, তাদেরকে সব সময় শ্রদ্ধা করা।”

আদাবুল মুফরাদ-এ ইমাম বুখারি উদ্ধৃত করেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “যে ব্যক্তির ছোটোদের প্রতি স্নেহবোধ নেই এবং যে বড়োদের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন নয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।”

বয়স্ক ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই রাসূল সা. আল্লাহকে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একটি উপায় হিসেবে এই আদব উল্লেখ করেছেন। এই আদবকে অবমূলয়ন ও অবহেলা করা অনুচিত। ন্যায়পরায়ণ শাসককে সর্বাগ্রে সম্মান করার বিধান রেখে একজন প্রসিদ্ধ কবি আটটি নিয়ম প্রণয়ন করেছিলেন। তার মতে- যারা এই আটটি অসৌজন্যমূলক আচরণ করবে, তাদের শাস্তি প্রদান করা উচিত। এগুলো হলো:

১. একজন ন্যায়পরায়ণ শাসককে অসম্মান ও অশ্রদ্ধা করা।
২. কারও অনুমতি না নিয়ে তার বাড়িতে প্রবেশ করা।
৩. অন্যের বাড়িতে গিয়ে খবরদারি করা।
৪. বয়োবৃদ্ধরা থাকার পরও কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে সবচেয়ে ভালো আসন দখল করা।
৫. কারও সঙ্গে কোনো বিষয়ে আলোচনা করার সময় একগুঁয়েমি করা।
৬. দুজন ব্যক্তির মাঝখানে হস্তক্ষেপ করা।
৭. অসৎ চরিত্রের কারও কাছ থেকে দান বা সাহায্য প্রত্যাশা করা এবং
৮. শত্রুদের থেকে আনুকূল্য বা সুবিধাদি কামনা করা।

সুনানে আবু দাউদ এবং মুসতাদরাকে হাকিম হাদিস গ্রন্থে মাইমুন ইবনে আবু শাবিব থেকে বর্ণিত। "একবার এক ভিক্ষুক উম্মুল মুমিনিন আয়িশা রা.-এর কাছে কিছু খাবার চাইল। মা আয়িশা রা. তাকে এক টুকরো শুকনো রুটি দিলেন। একটু পর আরেক ব্যক্তি, যিনি একটু মার্জিত; তিনি এসেও খাবার চাইলেন। মা আয়িশা রা. তাকে বসিয়ে খাবার খেতে দেন। যখন তাকে প্রশ্ন করা হলো, আপনি কেন দুই রকম মানুষের সাথে দুই রকম আচরণ করলেন? তিনি উত্তর দিলেন, রাসূল সা. আমাদের বলে গেছেন, প্রত্যেকের সাথে তার মানদণ্ড অনুযায়ী আচরণ করো।” সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৪০

ইমাম নববি রহ. তাঁর এই অধ্যায়টি শেষ করেন বুখারি ও মুসলিম শরিফে উল্লিখিত একটি হাদিস দিয়ে। সামুরা ইবনে জুনদুব রা. বলেন, “রাসূল সা.-এর জীবদ্দশায় যদিও আমি অল্প বয়সি ছিলাম, তারপরও সর্বদা খেয়াল করতাম তিনি কী বলেন। তিনি কিছু বললেই তা মুখস্থ করে নিতাম। সেই জ্ঞানের শক্তিতে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে আমি আমার জানা তথ্যগুলো প্রচার করি না। তবে শুধু সেখানেই নিজেকে সংযত করি, যেখানে নিজের চেয়ে বেশি বয়সি কাউকে পাই।"

রাসূল সা.-এর সুন্নাত হলো, যেকোনো কিছু শুরু করার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ধাপগুলো অবলম্বন করা। প্রথমে বয়স, তারপর জ্ঞান, এরপর সামাজিক মর্যাদা, বংশ মর্যাদা, জিহাদে অংশগ্রহণকারী বীর সেনা, ঔদার্য্য বা এ ধরনের মানবিক গুণাবলি ধারণ করা ইত্যাদি। অন্যদিকে, রাসূল সা.-এর আতিথেয়তার যে সুন্নাত তাতে দেখা যায়, তিনি মেহমানদারি বা আতিথেয়তা করতে গিয়ে সবার আগে সম্মান দিতেন বয়োজ্যেষ্ঠদের, তারপর ডান দিক থেকে একে একে সবাইকে খাবার দিতেন। আবার অনেক সময় সবচেয়ে বেশি মহৎ গুণের অধিকারী যিনি, তাকে দিয়েই খাবার বিতরণ শুরু করা হতো।

অনেক সময় কিছু মানুষ হাদিসের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পারে না এবং দাবি করে, ডানপাশে যে বসবে, তাকে দিয়েই শুরু করাটা সুন্নাত; যে মানের লোকই হোক না কেন। তারা রাসূল সা.-এর ডান দিক থেকে খাবার বিতরণসংক্রান্ত হাদিসের আলোকে এই মতটি ধারণ করেন। কিন্তু এটি তখনই করা দরকার, যখন কোনো একটি গ্রুপে বা দলে সবাই প্রায় কাছাকাছি বা একই মানের চারিত্রিক গুণ সম্পন্ন হয় বা একই মর্যাদা বা বয়সের হয়। কিন্তু সেখানেও যদি এমন কেউ থাকেন যার বয়স বেশি, তবে তাকে দিয়েই মেহমানদারি শুরু করা হবে সুন্নাত।

ইবনে রুশদ রহ. তাঁর গ্রন্থ আল বায়ান ওয়াত তাহসিল-এ বলেন, “যারা উপস্থিত তাদের সকলের মর্যাদা যদি একই হয়, তবে মেহমানদারি ডান দিক থেকে শুরু করা যায়। যদি সেখানে কোনো বয়স্ক লোক বা জ্ঞানী ব্যক্তি থাকে, তবে তাকে দিয়ে আতিথেয়তা শুরু করাই শিষ্টাচারের দাবি। তারপর সেই ব্যক্তির ডান পাশ থেকে চক্রাকারে বাকিদের খাবার পৌঁছে দেওয়া হবে।”

বাম দিক দিয়ে খাবার বিতরণ করা যাবে না। তবে যদি বাম দিকে কোনো উচ্চ মর্যাদার লোক থাকে, আগে তাকে খাবার দিতে হবে। কিন্তু সেখান থেকে বামদিকে আর খাবার বিতরণ করা যাবে না। ডানদিকের লোকেরা যদি আগে বামদিকে বসা মানুষকে খাবার সরবরাহ করতে বলে, তবে সে ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। রাসূল সা. একবার এমন এক মজলিসে বসলেন, যেখানে তার বাম দিকে মুরব্বি ব্যক্তি আর ডানে একজন যুবক বসেছিল। রাসূল সা.-কে পানীয় দেওয়া হলো এবং তিনি তা পান করলেন। এরপর তিনি তার ডানে বসা যুবককে বললেন, 'তুমি যদি অনুমতি দাও, তবে আমি বামে বসা মুরব্বিদের আগে এই পানীয়টুকু দিতে পারি।' যুবক উত্তরে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনোই আপনার হাত থেকে খাবার পাওয়ার সুযোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে পারব না।' তখন রাসূল সা. সন্তুষ্টচিত্তে ডানে বসা ওই যুবককেই অন্য সবার আগে পানীয় পরিবেশন করলেন।" বুখারি: ৫২৬০

আল মিনায়ি রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, "সুন্নাত হলো, সবার আগে বয়োজ্যেষ্ঠ ও সম্মানীয় লোকদের খাবার ও পানীয় সরবরাহ করা। এরপর তার ডান দিকে যারা বসেছে, তাদের মাঝে খাবার পরিবেশন করতে হবে। প্রথম যে মুরব্বি খাবার পাবেন, তার বামে যদি শ্রদ্ধাভাজন লোক থাকে তারপরও আগে ডান দিকেই খাবার সরবরাহ করতে হবে।”

সহিহ মুসলিমের আরেকটি হাদিসে সবার আগে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে খাবার দেওয়া এবং তারপর ডানে বসা ব্যক্তিদের খাবার পরিবেশনের ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়েছে। “একবার রাসূল সা. আমার বাবাকে দেখতে এসেছিলেন। আমরা নবিজিকে খেজুর ও মাখন দিয়ে তৈরি করা খাবার খেতে দিলাম। তারপর তাকে খেজুর খেতে দিলাম। তিনি খেজুর খেয়ে বিচিগুলো আস্তে করে অন্য পাত্রে ফেলছিলেন। খেজুরের বিচি আলাদা করা এবং তা ফেলার জন্য তিনি নিজের মধ্যমা ও তর্জনী আঙুল ব্যবহার করছিলেন। এরপর তাকে আমরা পানি দিলাম। তিনি নিজে পানি পান করলেন এবং তারপর তার ডানে বসা ব্যক্তিকে খেতে দিলেন।"

এই হাদিসটি থেকে বোঝা যায়, রাসূল সা. যেহেতু সবচেয়ে সম্মানিত, তাই সব খাবার প্রথম তাঁকেই সরবরাহ করা হয়। আর রাসূল সা. নিজে খেয়ে তারপর তাঁর ডানে বসা ব্যক্তিদের খাবার সরবরাহ করতেন। এই হাদিসটি থেকে আরও বোঝা যায়, রাসূল সা. নিজে থেকে হয়তো পানীয় বা কিছু খেতে চাননি। কিন্তু মেজবান যখনই যা এনেছেন, সবার আগে তিনি নবিজিকেই তা দিয়েছেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক সময় কিছু মানুষ ঈমানি চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং মানবতাবোধের কারণে মেহমান ও মুসাফিরদের অনেক বেশি আপ্যায়ন করে। পরবর্তী সময়ে যদি জানা যায়, মুসাফির আসলে প্রসিদ্ধ কোনো ব্যক্তি, তবে মেজবান তার যত্ন ও আন্তরিকতার মাত্রা যেন আরও বাড়িয়ে দেয়। নিঃসন্দেহে এটা দোষণীয় নয়। বরং অন্তর্নিহিত সত্যনিষ্ঠ চেতনা এবং ঈমানের কারণেই মানুষের মনে এ ধরনের ইতিবাচক অনুভূতির জন্ম হয়।

অতএব, এক কথায় বলতে গেলে, যদি কোনো আয়োজনে উপস্থিত ব্যক্তিদের সবাই একই মানের হয়, তবে ডান দিক দিয়ে শুরু করাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু যদি সেখানে সম্মানীয় কোনো ব্যক্তি থাকেন, তবে তাকে দিয়েই আতিথেয়তা শুরু করা উচিত।

তাই বলে যদি আমরা গণহারে ডান দিক দিয়েই খাবার বিতরণ শুরু করি, তবে দেখা যাবে- বামপাশে হয়তো কোনো প্রখ্যাত ব্যক্তি, সম্মানিত কোনো আলিম বা জ্ঞানী ব্যক্তি, মুরব্বি, কোনো অভিভাবক, কারও দাদা বা চাচা উপস্থিত আছেন। তিনি হয়তো বামে বসায় খাবার পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাবেন বা অসম্মানিত হবেন। আবার এমনও হতে পারে, মুরব্বি হয়তো ডানপাশেই বসেছেন, কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম বয়সি দশজন ব্যক্তির পর। ওই দশজনকে পর্যায়ক্রমে দিয়ে তারপর তাকে খাবার পরিবেশন করাটাও অসৌজন্যতা।

তবে কেউ যদি আগে পানি খেতে চায় কিংবা কারও যদি কোনো অস্বস্তিবোধ হয় এবং সেই কারণে যদি তিনি একটু পানি খেতে চান, তা হলে অন্য সবার আগে তাকে পানি দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে বয়স বা সামাজিক মান-মর্যাদাকে বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু যদি একজন ব্যক্তি পানি চাইলেন, তাকে পানি দেওয়া হলো। অতঃপর তিনি দেখলেন, তার চেয়ে বয়স্ক কারও পানির আরও বেশি প্রয়োজন। তা হলে সেক্ষেত্রেও তিনি নিজের দাবি ছেড়ে দিয়ে সেই বয়স্ক মানুষটিকে আগে পানি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে পারেন। ইসলামিক শিষ্টাচারের দাবি হলো, যদি সম্ভব হয় তা হলে নিজের হক বা দাবি ছেড়ে দিয়ে বরং অন্যের চাহিদার প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়া। এরকম করতে পারলে বোঝা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিঃস্বার্থ মানসিকতার। আর এরকম পরোপকারী আচরণ করতে পারলে ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়।

বয়স্ক মানুষকে সম্মান করা, আনুগত্য করা এবং অগ্রাধিকার দেওয়া আরবদের পুরোনো সংস্কৃতি। এক্ষেত্রে সাহাবি কায়েস বিন আসেম আত তামিমি রা.-এর একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যায়। নিজের মৃত্যুসজ্জায় কায়েস রা. তাঁর সন্তানদের নসিহত করেন, যাতে তারা ইসলামি আচরণে সমৃদ্ধ প্রবীণ ব্যক্তি ও চরিত্রবান নেতাদের আনুগত্য করে। কারণ, এসব প্রবীণ ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের থেকেই মূল্যবান পরামর্শ এবং জ্ঞাননির্ভর দিক-নির্দেশনা পাওয়া যাবে।

এই মহান সাহাবি কায়েস বিন আসেম আত তামিমি রা. ছিলেন বনু তামিমের প্রসিদ্ধ নেতা। তিনি অনুপম বক্তব্যশৈলীর জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর এই গুণের জন্য রাসূল সা. তাকে 'মরুভূমির বাসিন্দাদের উসতায' উপাধি প্রদান করেছিলেন। কায়েস বিন আসেম রা. ছিলেন খুবই জ্ঞানী ও সদাচারী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। হিজরি ৯ম বর্ষে একবার তিনি বনু তামিমের লোকজন নিয়ে মদিনায় এসেছিলেন। তাকে দেখেই রাসূল সা. বললেন, এই মানুষটি হলো 'মরুভূমির বাসিন্দাদের উসতায'। কায়েস বিন আসেম রা. তাঁর জীবনের শেষ বছরগুলো বসরাতে অতিবাহিত করেন এবং সেখানেই ২০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন।

মানুষ হিসেবে কায়েস বিন আসেম রা. ছিলেন খুবই ধৈর্যশীল। বিখ্যাত আরব সাধক আহনাফ বিন কায়েসকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'আপনি কার থেকে সবরের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন?' তিনি উত্তর দেন, 'কায়েস বিন আসেমের কাছ থেকে। একবার আমি কায়েস রা.-কে তাঁর বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আগত অতিথি ও গোত্রের লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলাম। সেই সময় এক ব্যক্তিকে দড়িতে বেঁধে একটি মৃতদেহসহ তাঁর সামনে নিয়ে আসে। কায়েস রা.-কে বলা হলো, 'এই আটক ব্যক্তিকে দেখুন, আপনার ভাতিজা। আর সে আপনার ছেলেকে হত্যা করেছে।'

নিজের ছেলেকে হত্যা করার কথা শুনেও কায়েস বিন আসেম রা. শান্ত থাকলেন। তিনি মেহমানদের সাথে ধীরে-সুস্থে কথোপকথন শেষ করলেন। তারপর ভ্রাতুষ্পুত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি জঘন্যতম অপরাধ করেছ। তুমি তোমার রবের সাথে অন্যায় করেছ। আপন চাচাতো ভাইকে হত্যা করেছ। প্রকৃতপক্ষে তুমি নিজেকে হত্যা করেছ এবং নিজ গোত্রকে দুর্বল করে দিয়েছ।'

তারপর তিনি তাঁর আরেক পুত্রকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, 'যাও, তোমার চাচাতো ভাইয়ের কাছে। ওর বাঁধন খুলে দাও। আর তোমার সহোদরকে দাফন করো। তারপর তোমার মায়ের কাছে যাও আর তাঁর সন্তানকে হত্যার ক্ষতিপূরণ হিসেবে একশোটি উট দেওয়ার ব্যবস্থা করো।'

ইমাম হাসান বসরি রহ. সরাসরি কায়েস বিন আসেম রা.-এর কাছে দ্বীনি শিক্ষা - গ্রহণ করেছিলেন এবং মৃত্যুসজ্জায় তিনি তাঁর শিয়রে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন, কায়েস বিন আসেম রা. জীবন সায়াহ্নে তাঁর ৩৩ জন সন্তান- সন্ততি ও নাতি-নাতনিকে ডেকে নিম্নোক্ত পরামর্শ দেন-

“হে আমার উত্তরাধিকারীরা! আল্লাহকে ভয় করো। আর আমি যা বলছি তা মনে রেখো। আর কেউ তোমাদের এত আন্তরিকভাবে এই পরামর্শগুলো দেবে না। আমার মৃত্যুর পর তোমাদের মধ্যে যারা বয়স্ক, তাদের মধ্য থেকেই কাউকে তোমরা নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে। যদি তোমরা তোমাদের পিতার স্মৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে চাও, তবে অল্প বয়সি কাউকে নেতা নির্বাচন করো না। যদি তোমরা অপেক্ষাকৃত কমবয়সি কাউকে নেতা বানাও, তবে তোমরা যে কেবল মুরব্বিদেরকেই অপমান করবে তা-ই নয়; বরং অন্যরাও তোমাদের অবমূল্যায়ন করবে। আমার মৃত্যুর পর চিৎকার করে কেঁদো না। আমি শুনেছি, নবিজি সা. এভাবে কান্না করতে নিষেধ করেছেন। অতটুকু পরিমাণ সম্পদের পেছনে ছোটো, যা মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য দরকার হয়। আবার তাই বলে সম্পদের জন্য ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমো না; এটা জঘন্যতম কর্ম। যদি কোনো খারাপ কাজ করতে একবারের জন্যও ভালো লাগে, তারপরও তা আর করো না। কারণ, পরবর্তী সময়ে সেই খারাপ কাজটি তোমার ভেতরে থাকা ভালো অনুভূতিগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেবে।" আদাবুল মুফরাদ: ৩৬২

এরপর কায়েস রা. তাঁর তিরের তুনীটি চাইলেন। তুনী নিয়ে আসার পর তিনি তাঁর বড়ো ছেলে আলীকে একটি তির ভাঙতে বললেন। বড়ো ছেলে তা সহজেই ভেঙে ফেললেন। এরপর তিনি আরও একটি তির ভাঙতে বললেন। এভাবে তাঁর নির্দেশে তুনীরে থাকা ৩০টি তির পর্যায়ক্রমে ভেঙে ফেলা হলো।

এরপর কায়েস রা. ৩০টি তিরকে দড়ি দিয়ে একসাথে বেঁধে ফেলতে বললেন। তা-ই করা হলো। এবার বাঁধনে থাকা তিরগুলোকে ভেঙে ফেলতে বলা হলো। কিন্তু এতগুলো তির একসাথে বাঁধা পড়ায় কেউ-ই আর তা ভাঙতে পারছিল না। তখন কায়েস রা. তাঁর সন্তানদের বললেন, “এই তিরগুলোর মতোই তোমাদের পরিণতি। অর্থাৎ যদি তোমরা একত্রে থাকো তবেই তোমরা শক্তিশালী থাকবে আর বিচ্ছিন্ন হলে দুর্বল হয়ে পড়বে।”

অন্য সবার আগে সবকিছুতে বয়স্ক বা মুরব্বি ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো আয়োজনে খাবার বিতরণ করার সময়ও আগে মুরব্বিদের দিতে হবে। তাদের দেওয়া হয়ে গেলে, তারপর হাতের ডান পাশ থেকে বিতরণ শুরু করতে হবে। রাসূল সা. নিজেও এভাবেই খাবার বিতরণ করতেন। তা ছাড়া ওপরে উল্লেখিত হাদিস থেকেও বয়স্ক ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে শিক্ষা পাওয়া যায়।
ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর সহিহ মুসলিমের আদব ও শিষ্টাচার অধ্যায়ে খাওয়া ও পান করার নিয়ম প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেন, হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. বলেন, “আমরা রাসূল সা.-এর সঙ্গে যখন যেখানেই দাওয়াতে যেতাম, তাঁর আগে কখনোই খাবার স্পর্শ করতাম না।"
এই আদবের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে ইমাম নববি রহ. রিয়াদুস সালিহিন গ্রন্থে বেশকিছু হাদিস উল্লেখ করেছেন। সেইসঙ্গে জ্ঞানী, মুরব্বি এবং শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা করার নিয়ম বিষয়ে গোটা একটি অধ্যায় সন্নিবেশিত করেছেন। ব্যক্তিগতভাবেও তিনি সব সময় মুরব্বি ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতেন। তাদের বসার জন্য ভালো আসন দিতেন। সর্ববস্থায় তাদের সম্মান ধরে রাখার চেষ্টা করতেন। রিয়াদুস সালিহিন গ্রন্থ থেকে এ সংক্রান্ত কিছু হাদিস নিচে উল্লেখ করছি।
সহিহ মুসলিম-এ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী ও পরিণত, তারা আমার পেছনে দাঁড়াবে। তারপর যারা অপেক্ষাকৃত কম জ্ঞানী তারা, তার থেকেও যারা কম জানেন তারা এর পেছনে। এভাবে ক্রমানুসারে তোমরা কাতারবদ্ধ হবে।”
সুনানে আবু দাউদ-এ আবু মুসা আশআরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “আল্লাহর প্রতি সম্মান দেখানোর একটি উপায় হলো বয়স্ক ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা করা। বিশেষ করে যাদের চুল পেকে সাদা হয়ে গেছে, কিংবা যারা নিয়মিত কুরআন অধ্যয়ন করেন এবং যারা ন্যায়পরায়ণ শাসক, তাদেরকে সব সময় শ্রদ্ধা করা।”
আদাবুল মুফরাদ-এ ইমাম বুখারি উদ্ধৃত করেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “যে ব্যক্তির ছোটোদের প্রতি স্নেহবোধ নেই এবং যে বড়োদের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন নয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।”
বয়স্ক ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই রাসূল সা. আল্লাহকে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একটি উপায় হিসেবে এই আদব উল্লেখ করেছেন। এই আদবকে অবমূল্যায়ন ও অবহেলা করা অনুচিত। ন্যায়পরায়ণ শাসককে সর্বাগ্রে সম্মান করার বিধান রেখে একজন প্রসিদ্ধ কবি আটটি নিয়ম প্রণয়ন করেছিলেন। তার মতে- যারা এই আটটি অসৌজন্যমূলক আচরণ করবে, তাদের শাস্তি প্রদান করা উচিত। এগুলো হলো:
১. একজন ন্যায়পরায়ণ শাসককে অসম্মান ও অশ্রদ্ধা করা।
২. কারও অনুমতি না নিয়ে তার বাড়িতে প্রবেশ করা।
৩. অন্যের বাড়িতে গিয়ে খবরদারি করা।
৪. বয়োবৃদ্ধরা থাকার পরও কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে সবচেয়ে ভালো আসন দখল করা।
৫. কারও সঙ্গে কোনো বিষয়ে আলোচনা করার সময় একগুঁয়েমি করা।
৬. দুজন ব্যক্তির মাঝখানে হস্তক্ষেপ করা।
৭. অসৎ চরিত্রের কারও কাছ থেকে দান বা সাহায্য প্রত্যাশা করা এবং
৮. শত্রুদের থেকে আনুকূল্য বা সুবিধাদি কামনা করা।
সুনানে আবু দাউদ এবং মুসতাদরাকে হাকিম হাদিস গ্রন্থে মাইমুন ইবনে আবু শাবিব থেকে বর্ণিত। "একবার এক ভিক্ষুক উম্মুল মুমিনিন আয়িশা রা.-এর কাছে কিছু খাবার চাইল। মা আয়িশা রা. তাকে এক টুকরো শুকনো রুটি দিলেন। একটু পর আরেক ব্যক্তি, যিনি একটু মার্জিত; তিনি এসেও খাবার চাইলেন। মা আয়িশা রা. তাকে বসিয়ে খাবার খেতে দেন। যখন তাকে প্রশ্ন করা হলো, আপনি কেন দুই রকম মানুষের সাথে দুই রকম আচরণ করলেন? তিনি উত্তর দিলেন, রাসূল সা. আমাদের বলে গেছেন, প্রত্যেকের সাথে তার মানদণ্ড অনুযায়ী আচরণ করো।” সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৪০
ইমাম নববি রহ. তাঁর এই অধ্যায়টি শেষ করেন বুখারি ও মুসলিম শরিফে উল্লিখিত একটি হাদিস দিয়ে। সামুরা ইবনে জুনদুব রা. বলেন, “রাসূল সা.-এর জীবদ্দশায় যদিও আমি অল্প বয়সি ছিলাম, তারপরও সর্বদা খেয়াল করতাম তিনি কী বলেন। তিনি কিছু বললেই তা মুখস্থ করে নিতাম। সেই জ্ঞানের শক্তিতে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে আমি আমার জানা তথ্যগুলো প্রচার করি না। তবে শুধু সেখানেই নিজেকে সংযত করি, যেখানে নিজের চেয়ে বেশি বয়সি কাউকে পাই।"
রাসূল সা.-এর সুন্নাত হলো, যেকোনো কিছু শুরু করার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ধাপগুলো অবলম্বন করা। প্রথমে বয়স, তারপর জ্ঞান, এরপর সামাজিক মর্যাদা, বংশ মর্যাদা, জিহাদে অংশগ্রহণকারী বীর সেনা, ঔদার্য্য বা এ ধরনের মানবিক গুণাবলি ধারণ করা ইত্যাদি। অন্যদিকে, রাসূল সা.-এর আতিথেয়তার যে সুন্নাত তাতে দেখা যায়, তিনি মেহমানদারি বা আতিথেয়তা করতে গিয়ে সবার আগে সম্মান দিতেন বয়োজ্যেষ্ঠদের, তারপর ডান দিক থেকে একে একে সবাইকে খাবার দিতেন। আবার অনেক সময় সবচেয়ে বেশি মহৎ গুণের অধিকারী যিনি, তাকে দিয়েই খাবার বিতরণ শুরু করা হতো।
অনেক সময় কিছু মানুষ হাদিসের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পারে না এবং দাবি করে, ডানপাশে যে বসবে, তাকে দিয়েই শুরু করাটা সুন্নাত; যে মানের লোকই হোক না কেন। তারা রাসূল সা.-এর ডান দিক থেকে খাবার বিতরণসংক্রান্ত হাদিসের আলোকে এই মতটি ধারণ করেন। কিন্তু এটি তখনই করা দরকার, যখন কোনো একটি গ্রুপে বা দলে সবাই প্রায় কাছাকাছি বা একই মানের চারিত্রিক গুণ সম্পন্ন হয় বা একই মর্যাদা বা বয়সের হয়। কিন্তু সেখানেও যদি এমন কেউ থাকেন যার বয়স বেশি, তবে তাকে দিয়েই মেহমানদারি শুরু করা হবে সুন্নাত।
ইবনে রুশদ রহ. তাঁর গ্রন্থ আল বায়ান ওয়াত তাহসিল-এ বলেন, “যারা উপস্থিত তাদের সকলের মর্যাদা যদি একই হয়, তবে মেহমানদারি ডান দিক থেকে শুরু করা যায়। যদি সেখানে কোনো বয়স্ক লোক বা জ্ঞানী ব্যক্তি থাকে, তবে তাকে দিয়ে আতিথেয়তা শুরু করাই শিষ্টাচারের দাবি। তারপর সেই ব্যক্তির ডান পাশ থেকে চক্রাকারে বাকিদের খাবার পৌঁছে দেওয়া হবে।”
বাম দিক দিয়ে খাবার বিতরণ করা যাবে না। তবে যদি বাম দিকে কোনো উচ্চ মর্যাদার লোক থাকে, আগে তাকে খাবার দিতে হবে। কিন্তু সেখান থেকে বামদিকে আর খাবার বিতরণ করা যাবে না। ডানদিকের লোকেরা যদি আগে বামদিকে বসা মানুষকে খাবার সরবরাহ করতে বলে, তবে সে ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। রাসূল সা. একবার এমন এক মজলিসে বসলেন, যেখানে তার বাম দিকে মুরব্বি ব্যক্তি আর ডানে একজন যুবক বসেছিল। রাসূল সা.-কে পানীয় দেওয়া হলো এবং তিনি তা পান করলেন। এরপর তিনি তার ডানে বসা যুবককে বললেন, 'তুমি যদি অনুমতি দাও, তবে আমি বামে বসা মুরব্বিদের আগে এই পানীয়টুকু দিতে পারি।' যুবক উত্তরে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনোই আপনার হাত থেকে খাবার পাওয়ার সুযোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে পারব না।' তখন রাসূল সা. সন্তুষ্টচিত্তে ডানে বসা ওই যুবককেই অন্য সবার আগে পানীয় পরিবেশন করলেন।" বুখারি: ৫২৬০
আল মিনায়ি রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, "সুন্নাত হলো, সবার আগে বয়োজ্যেষ্ঠ ও সম্মানীয় লোকদের খাবার ও পানীয় সরবরাহ করা। এরপর তার ডান দিকে যারা বসেছে, তাদের মাঝে খাবার পরিবেশন করতে হবে। প্রথম যে মুরব্বি খাবার পাবেন, তার বামে যদি শ্রদ্ধাভাজন লোক থাকে তারপরও আগে ডান দিকেই খাবার সরবরাহ করতে হবে।”
সহিহ মুসলিমের আরেকটি হাদিসে সবার আগে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে খাবার দেওয়া এবং তারপর ডানে বসা ব্যক্তিদের খাবার পরিবেশনের ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়েছে। “একবার রাসূল সা. আমার বাবাকে দেখতে এসেছিলেন। আমরা নবিজিকে খেজুর ও মাখন দিয়ে তৈরি করা খাবার খেতে দিলাম। তারপর তাকে খেজুর খেতে দিলাম। তিনি খেজুর খেয়ে বিচিগুলো আস্তে করে অন্য পাত্রে ফেলছিলেন। খেজুরের বিচি আলাদা করা এবং তা ফেলার জন্য তিনি নিজের মধ্যমা ও তর্জনী আঙুল ব্যবহার করছিলেন। এরপর তাকে আমরা পানি দিলাম। তিনি নিজে পানি পান করলেন এবং তারপর তার ডানে বসা ব্যক্তিকে খেতে দিলেন।"
এই হাদিসটি থেকে বোঝা যায়, রাসূল সা. যেহেতু সবচেয়ে সম্মানিত, তাই সব খাবার প্রথম তাঁকেই সরবরাহ করা হয়। আর রাসূল সা. নিজে খেয়ে তারপর তাঁর ডানে বসা ব্যক্তিদের খাবার সরবরাহ করতেন। এই হাদিসটি থেকে আরও বোঝা যায়, রাসূল সা. নিজে থেকে হয়তো পানীয় বা কিছু খেতে চাননি। কিন্তু মেজবান যখনই যা এনেছেন, সবার আগে তিনি নবিজিকেই তা দিয়েছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক সময় কিছু মানুষ ঈমানি চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং মানবতাবোধের কারণে মেহমান ও মুসাফিরদের অনেক বেশি আপ্যায়ন করে। পরবর্তী সময়ে যদি জানা যায়, মুসাফির আসলে প্রসিদ্ধ কোনো ব্যক্তি, তবে মেজবান তার যত্ন ও আন্তরিকতার মাত্রা যেন আরও বাড়িয়ে দেয়। নিঃসন্দেহে এটা দোষণীয় নয়। বরং অন্তর্নিহিত সত্যনিষ্ঠ চেতনা এবং ঈমানের কারণেই মানুষের মনে এ ধরনের ইতিবাচক অনুভূতির জন্ম হয়।
অতএব, এক কথায় বলতে গেলে, যদি কোনো আয়োজনে উপস্থিত ব্যক্তিদের সবাই একই মানের হয়, তবে ডান দিক দিয়ে শুরু করাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু যদি সেখানে সম্মানীয় কোনো ব্যক্তি থাকেন, তবে তাকে দিয়েই আতিথেয়তা শুরু করা উচিত।
তাই বলে যদি আমরা গণহারে ডান দিক দিয়েই খাবার বিতরণ শুরু করি, তবে দেখা যাবে- বামপাশে হয়তো কোনো প্রখ্যাত ব্যক্তি, সম্মানিত কোনো আলিম বা জ্ঞানী ব্যক্তি, মুরব্বি, কোনো অভিভাবক, কারও দাদা বা চাচা উপস্থিত আছেন। তিনি হয়তো বামে বসায় খাবার পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাবেন বা অসম্মানিত হবেন। আবার এমনও হতে পারে, মুরব্বি হয়তো ডানপাশেই বসেছেন, কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম বয়সি দশজন ব্যক্তির পর। ওই দশজনকে পর্যায়ক্রমে দিয়ে তারপর তাকে খাবার পরিবেশন করাটাও অসৌজন্যতা।
তবে কেউ যদি আগে পানি খেতে চায় কিংবা কারও যদি কোনো অস্বস্তিবোধ হয় এবং সেই কারণে যদি তিনি একটু পানি খেতে চান, তা হলে অন্য সবার আগে তাকে পানি দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে বয়স বা সামাজিক মান-মর্যাদাকে বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু যদি একজন ব্যক্তি পানি চাইলেন, তাকে পানি দেওয়া হলো। অতঃপর তিনি দেখলেন, তার চেয়ে বয়স্ক কারও পানির আরও বেশি প্রয়োজন। তা হলে সেক্ষেত্রেও তিনি নিজের দাবি ছেড়ে দিয়ে সেই বয়স্ক মানুষটিকে আগে পানি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে পারেন। ইসলামিক শিষ্টাচারের দাবি হলো, যদি সম্ভব হয় তা হলে নিজের হক বা দাবি ছেড়ে দিয়ে বরং অন্যের চাহিদার প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়া। এরকম করতে পারলে বোঝা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিঃস্বার্থ মানসিকতার। আর এরকম পরোপকারী আচরণ করতে পারলে ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়।
বয়স্ক মানুষকে সম্মান করা, আনুগত্য করা এবং অগ্রাধিকার দেওয়া আরবদের পুরোনো সংস্কৃতি। এক্ষেত্রে সাহাবি কায়েস বিন আসেম আত তামিমি রা.-এর একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যায়। নিজের মৃত্যুসজ্জায় কায়েস রা. তাঁর সন্তানদের নসিহত করেন, যাতে তারা ইসলামি আচরণে সমৃদ্ধ প্রবীণ ব্যক্তি ও চরিত্রবান নেতাদের আনুগত্য করে। কারণ, এসব প্রবীণ ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের থেকেই মূল্যবান পরামর্শ এবং জ্ঞাননির্ভর দিক-নির্দেশনা পাওয়া যাবে।
এই মহান সাহাবি কায়েস বিন আসেম আত তামিমি রা. ছিলেন বনু তামিমের প্রসিদ্ধ নেতা। তিনি অনুপম বক্তব্যশৈলীর জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর এই গুণের জন্য রাসূল সা. তাকে 'মরুভূমির বাসিন্দাদের উসতায' উপাধি প্রদান করেছিলেন। কায়েস বিন আসেম রা. ছিলেন খুবই জ্ঞানী ও সদাচারী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। হিজরি ৯ম বর্ষে একবার তিনি বনু তামিমের লোকজন নিয়ে মদিনায় এসেছিলেন। তাকে দেখেই রাসূল সা. বললেন, এই মানুষটি হলো 'মরুভূমির বাসিন্দাদের উসতায'। কায়েস বিন আসেম রা. তাঁর জীবনের শেষ বছরগুলো বসরাতে অতিবাহিত করেন এবং সেখানেই ২০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন।
মানুষ হিসেবে কায়েস বিন আসেম রা. ছিলেন খুবই ধৈর্যশীল। বিখ্যাত আরব সাধক আহনাফ বিন কায়েসকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'আপনি কার থেকে সবরের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন?' তিনি উত্তর দেন, 'কায়েস বিন আসেমের কাছ থেকে। একবার আমি কায়েস রা.-কে তাঁর বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আগত অতিথি ও গোত্রের লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলাম। সেই সময় এক ব্যক্তিকে দড়িতে বেঁধে একটি মৃতদেহসহ তাঁর সামনে নিয়ে আসে। কায়েস রা.-কে বলা হলো, 'এই আটক ব্যক্তিকে দেখুন, আপনার ভাতিজা। আর সে আপনার ছেলেকে হত্যা করেছে।'
নিজের ছেলেকে হত্যা করার কথা শুনেও কায়েস বিন আসেম রা. শান্ত থাকলেন। তিনি মেহমানদের সাথে ধীরে-সুস্থে কথোপকথন শেষ করলেন। তারপর ভ্রাতুষ্পুত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি জঘন্যতম অপরাধ করেছ। তুমি তোমার রবের সাথে অন্যায় করেছ। আপন চাচাতো ভাইকে হত্যা করেছ। প্রকৃতপক্ষে তুমি নিজেকে হত্যা করেছ এবং নিজ গোত্রকে দুর্বল করে দিয়েছ।'
তারপর তিনি তাঁর আরেক পুত্রকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, 'যাও, তোমার চাচাতো ভাইয়ের কাছে। ওর বাঁধন খুলে দাও। আর তোমার সহোদরকে দাফন করো। তারপর তোমার মায়ের কাছে যাও আর তাঁর সন্তানকে হত্যার ক্ষতিপূরণ হিসেবে একশোটি উট দেওয়ার ব্যবস্থা করো।'
ইমাম হাসান বসরি রহ. সরাসরি কায়েস বিন আসেম রা.-এর কাছে দ্বীনি শিক্ষা - গ্রহণ করেছিলেন এবং মৃত্যুসজ্জায় তিনি তাঁর শিয়রে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন, কায়েস বিন আসেম রা. জীবন সায়াহ্নে তাঁর ৩৩ জন সন্তান- সন্ততি ও নাতি-নাতনিকে ডেকে নিম্নোক্ত পরামর্শ দেন-
“হে আমার উত্তরাধিকারীরা! আল্লাহকে ভয় করো। আর আমি যা বলছি তা মনে রেখো। আর কেউ তোমাদের এত আন্তরিকভাবে এই পরামর্শগুলো দেবে না। আমার মৃত্যুর পর তোমাদের মধ্যে যারা বয়স্ক, তাদের মধ্য থেকেই কাউকে তোমরা নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে। যদি তোমরা তোমাদের পিতার স্মৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে চাও, তবে অল্প বয়সি কাউকে নেতা নির্বাচন করো না। যদি তোমরা অপেক্ষাকৃত কমবয়সি কাউকে নেতা বানাও, তবে তোমরা যে কেবল মুরব্বিদেরকেই অপমান করবে তা-ই নয়; বরং অন্যরাও তোমাদের অবমূল্যায়ন করবে। আমার মৃত্যুর পর চিৎকার করে কেঁদো না। আমি শুনেছি, নবিজি সা. এভাবে কান্না করতে নিষেধ করেছেন। অতটুকু পরিমাণ সম্পদের পেছনে ছোটো, যা মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য দরকার হয়। আবার তাই বলে সম্পদের জন্য ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমো না; এটা জঘন্যতম কর্ম। যদি কোনো খারাপ কাজ করতে একবারের জন্যও ভালো লাগে, তারপরও তা আর করো না। কারণ, পরবর্তী সময়ে সেই খারাপ কাজটি তোমার ভেতরে থাকা ভালো অনুভূতিগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেবে।" আদাবুল মুফরাদ: ৩৬২
এরপর কায়েস রা. তাঁর তিরের তুনীটি চাইলেন। তুনী নিয়ে আসার পর তিনি তাঁর বড়ো ছেলে আলীকে একটি তির ভাঙতে বললেন। বড়ো ছেলে তা সহজেই ভেঙে ফেললেন। এরপর তিনি আরও একটি তির ভাঙতে বললেন। এভাবে তাঁর নির্দেশে তুনীরে থাকা ৩০টি তির পর্যায়ক্রমে ভেঙে ফেলা হলো।
এরপর কায়েস রা. ৩০টি তিরকে দড়ি দিয়ে একসাথে বেঁধে ফেলতে বললেন। তা-ই করা হলো। এবার বাঁধনে থাকা তিরগুলোকে ভেঙে ফেলতে বলা হলো। কিন্তু এতগুলো তির একসাথে বাঁধা পড়ায় কেউ-ই আর তা ভাঙতে পারছিল না। তখন কায়েস রা. তাঁর সন্তানদের বললেন, “এই তিরগুলোর মতোই তোমাদের পরিণতি। অর্থাৎ যদি তোমরা একত্রে থাকো তবেই তোমরা শক্তিশালী থাকবে আর বিচ্ছিন্ন হলে দুর্বল হয়ে পড়বে।”

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00