📘 ইসলামী শরীয়াতে দাড়ির পদমর্যাদা > 📄 অমুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে দাড়ি রাখার প্রচলন

📄 অমুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে দাড়ি রাখার প্রচলন


ওহী নাযিলের পূর্বে কিংবা পরেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়কার আরব মুশরিকদের লম্বা দাড়ি ছিল (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৮০০-আরবী) কারণ আরবরা তাদের সৌন্দর্য শ্মশ্রুমণ্ডিত চেহারার কোন বিকৃতি সাধন করেনি। বস্তুত, ইসলামে মুশরিকদের এই সৌন্দর্যকে স্বীকার করেছে। আরব মুশরিকরা ছিল প্রকৃতপক্ষে ইবরাহীম আলাইহি সালামের সুন্নাহ থেকে পথভ্রষ্ট হয়ে যাওয়া একটি জাতি, কিন্তু তখনও তাদের মাঝে এই সুন্নাহটি চালু ছিল। সময়ের সাথে সাথে ইসলামের অন্যান্য মূল বিষয় থেকে সরে আসলেও এক লক্ষ চব্বিশ হাজার মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার নবীর সুন্নাহ থেকে আরব মুশরিকরা পর্যন্ত সরে আসেনি।

পশ্চিমারাও তাদের দাড়ি লম্বা করত যতক্ষণ না সপ্তদশ শতকে রাশিয়ার শাসক পিটার, দাড়ি কামানোর চল ইউরোপে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই সময়কার কিংবা তার পূর্বেকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, বিজ্ঞানী, গবেষক, সভাসদ ও অন্যান্যদের আঁকা ছবি, ভাস্কর্য কিংবা প্রতিকৃতিতে আজও তার প্রমাণ মেলে। অধিকাংশই শ্মশ্রুমণ্ডিত ছিলেন।

পরবর্তীতে, মুসলিমদের মাঝেও পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণের কারণে দাড়ি কামানোর এই কু-রীতিটির ব্যাপক প্রসার লাভ করে।

রাসুলুল্লাহর সময়কার মুশরিকদেরও দাড়ি ছিল, কিন্তু তাঁরা গোঁফ কামাতো না। মুসলিমরা তাদের থেকে আলাদা হলেন, মুসলিমরা ঠোটের উপরের গোঁফ ছাঁটতেন এবং দাড়ি ছেড়ে দিলেন, যেখানে মুশরিকরা তাদের দাড়ি ছোট করে রাখত সেখানে মুসলিমরা তাদের দাড়ি ছেড়ে দিলেন। এভাবেই সত্যানুসারীরা তাদের থেকে আলাদা হলেন যারা শিরকে লিপ্ত এবং পথভ্রষ্ট।

আবু শামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "কিছু লোক দাড়ি কামানো করল, এবং এটা তো মেজিয়ানদের (একটি মুশরিক সম্প্রদায়) থেকেও নিকৃষ্ট কারণ তারা তো কেবল দাড়ি ছোট করা করেছিল! "

টীকাঃ এখানে জেনে রাখা প্রয়োজন, কিছু মুশরিকেরা দাড়ি রাখছে একারণে আমাদের মুসলিমদের দাড়ি কামিয়ে ফেলার মাধ্যমে তাদের থেকে আলাদা হওয়ার কোন সুযোগ নেই। কারণ;

* প্রথমত, তাদের স্বাভাবিক এবং অধিকাংশের অবস্থা হল, তারা দাড়ি কামিয়ে ফেলে এবং দাড়ি কামানোর বিষয়টি তাদের থেকেই উদ্ভাবিত একটি বিষয়।
* দ্বিতীয়ত, যে মুশরিকরা একারণে দাড়ি রাখছে যে এটা হচ্ছে পৌরুষ, অথবা তারা নবীদের অনুসরণের কারণে এটা করছে; তাহলে বুঝতে হবে তাদের এই ফিতরাগত ব্যাপারটি সুস্থ-স্বাভাবিক রয়েছে কারণ এই ব্যাপারে আমাদের শরীয়ার সাথে তাদের শরীয়া একমত হয়েছে। কিন্তু এরপরেও তাদের থেকে আমাদের আলাদা বৈশিষ্ট প্রকাশিত হয়েছে ঠোটের উপরের গোঁফ ছেটে ফেলার মাধ্যমে। হযরত যায়েদ বিন আকরাম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, "যে ব্যক্তি স্বীয় গোঁফ ছাটবে না সে আমাদের দলভুক্ত নহে।" (তিরমিযি,সহীহ) [৯]

📘 ইসলামী শরীয়াতে দাড়ির পদমর্যাদা > 📄 নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ করা

📄 নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ করা


বুখারী, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে মাজায় হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালার ভর্ৎসনা ঐ সব পুরুষদের উপর যারা মহিলাদের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করে এবং ঐ সব মহিলাদের উপর যারা পুরুষদের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করে।" (বুখারী: ২/৮৭৪)

হযরত নাফে' রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, একদিন হযরত ইবনে উমার ও আবদুল্লাহ ইবনে আমর হযরত যুবাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এর কাছে ছিলেন। এমতাবস্থায় এক মহিলা ঘাড়ে ধনুক বহন করে মেষ পাল তাড়াতে তাড়াতে এগিয়ে এল। আবদুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা তাকে জিজ্ঞেস করলেন; “তুমি পুরুষ না মহিলা? সে বলল; “মহিলা”। তখন তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে আমরের দিকে তাকালে তিনি বললেন; আল্লাহ তায়ালা স্বীয় নবীর পবিত্র মুখ দিয়ে পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনকারী মহিলাদেরকে এবং মহিলাদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনকারী পুরুষদেরকে অভিসম্পাত করেছেন।

কোন সন্দেহ নেই, একজন নারীর ধনুক বহনের ফলে যদি পুরুষের অনুকরণ করা হয়ে থাকে তবে একজন পুরুষের পক্ষে দাড়ি কামিয়ে ফেলাটা আরো অধিক পরিমাণে নারীদের সাথে সাদৃশ্য বহন করে। একজন নারী যদি নকল দাড়ি লাগায় তাহলে যেমন তাকে পুরুষ বলে মনে হত তেমনি একজন পুরুষ যদি স্বীয় সৌন্দর্য ও দাড়ি কামিয়ে ফেলে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তবে তাকে তার বাহ্যিক চেহারার কথা বাদ দিলেও তার মানসিকতার কারণেই তাকে মেয়ে বলে অনেকেরই ভুল হতে পারে।

আরো উল্লেখ্য, পুরুষ কর্তৃক নারীর এবং নারী কর্তৃক পুরুষের কন্ঠস্বর অনুকরণও এর আওতাভুক্ত। নারী যখন পুরুষের মত আঁটসাঁট, পাতলা ও শরীরের আবরণযোগ্য অংশ অনাবৃত থাকে এমন পোশাক পরিধান করে, তখন সে পুরুষের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করে এবং অভিসম্পাতের যোগ্য হয়।

আপনি যদি একজন সাধারণ আহলে সুন্নাহ'র অনুসারী মুসলিমকে জিজ্ঞেস করেন, "দাড়িবিহীন চেহারার পুরুষের সাথে কাদের মিল বেশি?" সে উত্তর করবে, "মহিলা, নাবালক অথবা ইহুদী, খৃষ্টান"। আলেমগণ এই মিলকে বলেছেন 'আত-তাখানুথ' (effeminateness)। বিখ্যাত আলেম ইবন আবদুল বার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "দাড়ি কামানো হারাম, শুধুমাত্র মেয়েলি স্বভাবজাত পুরুষেরাই তা করতে পারে।"

বর্তমান কুফফারদেরও অনেকে দাড়ি রাখে (যেমন ইহুদী, শিখ) যখন অন্যরা তা কামিয়ে ফেলে। যেটাই হোক, আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে যারা দাড়ি কামিয়ে ফেলে তাদের বিপরীত করতে যারা দাড়ি বড় করে তাদের বিপরীত করতে নয়। যদি অন্ধভাবে কুফফারদের বিপরীত আচরণ করার কথা বোঝানো হত তাহলে 'খাতনা' করাও রহিত হয়ে যেত কেননা ইহুদীরাও 'খাতনা' করে।

তৃতীয়ত, বর্তমান যুগে অধিকাংশ মুসলিম যারা দাড়ি কামিয়ে ফেলছে তারা এটা একারণে করছে না যে তারা মুশরিকদের বিপরীত করছে যদিও মুশরিকদের রীতি এবং নারী-পুরুষের পারস্পরিক সাদৃশ্য গ্রহণের বিপরীতে কুর'আন ও সুন্নাহর শক্ত অবস্থান রয়েছে। উপরন্তু, সুন্নাহ ফিতরাহর উপর প্রতিষ্ঠিত যা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনশীল নয়। এটা এর উপরেও নির্ভরশীল নয় যে, কিছু মানুষ এর থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়বে। কাজেই, এটা ঠিক নয় যে আমরা অবিশ্বাসীদের সাথে বৈসাদৃশ্য গ্রহণের নাম করে আল্লাহর আইনের বিপরীতে করব।

📘 ইসলামী শরীয়াতে দাড়ির পদমর্যাদা > 📄 অঙ্গহানির অপরাধ (act of mutilation)

📄 অঙ্গহানির অপরাধ (act of mutilation)


ইমাম আহমাদ, আস-সাওরি এবং আবু হানিফা একমত পোষণ করে বলেন যে, যদি কারো দাড়ি মুণ্ডন করে দেয়া হয় হয় তবে এটি একটি অঙ্গহানির অপরাধ এবং সে ব্যক্তিকে পূর্ণ 'দিয়াহ' অথবা 'রক্ত মূল্য' পরিশোধ করতে হবে যেমনিভাবে বাদীকে তার চোখ কিংবা হাত হারানোর জন্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে 'রক্ত মূল্য' দেয়া হয়।

ইমাম বুখারী হতে বর্ণিত, "নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডাকাতি এবং জোর জবরদস্তি করে অন্যের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া এবং অঙ্গহানিকে নিষেধ করেছেন"

ইবন হাজম বলেন, "তারা (মুসলিম আলেমগণ) একমত যে, দাড়ি কামানো একটি অঙ্গহানি, যা হারাম।" উপরন্তু, দাড়ি কামানো হচ্ছে আল্লাহর রাসূলের অবাধ্যতা এবং তা আল্লাহ তায়ালার অবাধ্যতা, কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "যে আমাকে মান্য করল সে আল্লাহকে মান্য করল, আর যে আমাকে অমান্য করল সে আল্লাহকে অমান্য করেছে।" (বুখারী)

ইবনে তাইমিয়া, একজন বিখ্যাত মুজাদ্দিদ (পুণর্জাগরণকারী), আলেম এবং মুজাহিদ, তিনি বলেন, "দাড়ি কামানো হারাম- কোনো আলেম দাড়ি কামানোর অনুমোদন করেনি।"

এ সম্পর্কে আমাদের এই আয়াতটি স্মরণ করা উচিত যেখানে আল্লাহ, মহাপবিত্র ও মহামহিম বলেন, "আমি যখনই কোন রাসূল পাঠিয়েছি তাকে এজন্যেই পাঠিয়েছি যে, আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তার শর্তহীন আনুগত্য করা হবে।" (নিসা ৬৪)

[১০] দাড়ি লম্বা করার এই আদেশটির মর্যাদা এতটাই ছিল যে, দীন ইসলামের সবচেয়ে বড় আলেমগণ ইমাম আবু হানিফা, আহমাদ, আস-সাওরি বলেছেন, "যদি কারো দাড়ি 'আক্রান্ত' হয় পুরোপুরি মুণ্ডন করার দ্বারা, এবং তা আর বেড়ে না উঠে, তাহলে দুষ্কৃতকারীকে এর পূর্ণ মূল্য (দিয়াহ) দিতে হবে, যেন সে দাড়িওয়ালা ব্যক্তিকে হত্যা করেছে।" ইবন আল মুফলিহ (রাহিমাহুল্লাহ) ব্যাখা করে বলেন যে, "এটা এ কারণে যে, দুষ্কৃতকারী দাড়ি বেড়ে উঠার সমস্ত কার্যক্রমকে ব্যাহত করেছে। এটা সেই অপরাধের সমান যা আমরা কারো দৃষ্টি ছিনিয়ে নিলে বিবেচনা করি।"

📘 ইসলামী শরীয়াতে দাড়ির পদমর্যাদা > 📄 স্বাভাবিক অবস্থার বিকৃতি ঘটানো

📄 স্বাভাবিক অবস্থার বিকৃতি ঘটানো


আব্দুল্লাহ বিন ইয়াজিদ আল আনসারী বর্ণিত, " নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আন-নুহবা এবং আল-মুথলা নিষেধ করেছেন।" [১১]

সুমরাহ এবং ওমরান বিন হুসেইন রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত, "প্রত্যেক খুতবায় নবীজী আমাদেরকে দান করতে ও আল-মুথলা(আকার বিকৃতি) থেকে বেঁচে থাকার কথা না বলে শেষ করতেন না।" [১২]

ইবন আস শাকির হতে বর্ণিত, ওমর বিন আব্দুল আযিয (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "দাড়ি কামানো হল মুথলা এবং নবীর নিষেধ করা কাজের একটি হল মুথলা"।

ইমাম ইবন হাজম রাহিমাহুল্লাহ, তাঁর বই 'মারাতিব আল-ইজমা' (ঐক্যমতের স্তর) এ উল্লেখ করেন," তাঁরা (আলেমগণ) একমত হয়েছেন যে, দাড়ি কামানো হল মুথলা এবং এটা অননুমোদিত।"

আলেমগণের কেউ কেউ দাড়ির ছেটে ছোট করাকে মুথলা বলেছেন, অনেকে গোঁফ কামিয়ে ফেলাকে মুথলা বলেছেন। একবার ভেবে দেখুন, সম্পূর্ণ দাড়ি কামিয়ে ফেলার মত অবস্থা সৃষ্টি হলে আলেমগণের বক্তব্য কি হতো? চেহারা হল মানুষের শরীরের সবচেয়ে সুন্দরতম অংশ এবং সৌন্দর্যের কেন্দ্র। চেহারা একটি সম্মানিত অংশ, একারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুয়া আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "যখন তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয় সে যেন চেহারাকে এড়িয়ে চলে" আরেকটি বর্ণনায়, "সে মুখে আঘাত করবে না"। [১৩]

সুয়ায়েদ বিন মিকরিন একজন লোককে দেখলেন যে তার ছেলেকে মুখে আঘাত করছে (চড় মারছে), তিনি বলেন, "তুমি কি জানোনা যে সুরাহ (চেহারা) সম্মানিত?" (মুসলিম)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00