📄 জাহিলি যুগে নারীর অবস্থা
জাহিলি যুগে নারীদেরকে পশু ও পণ্যবস্তুর মতো মনে করা হতো; বরং সমাজে তার অধিকার বলতে কোনো কিছুই ছিল না। স্বামী মারা গেলে তাকে মিরাস হিসাবে বণ্টন করা হতো। মিরাসের ক্ষেত্রে তার কোনো প্রাপ্যই ছিল না। পশু বা অন্যান্য বস্তুর মতো তাকে বেচাকেনা করা হতো। তাকে বিবাহ ও অশ্লীল কাজে বাধ্য করা হতো। তাকে মিরাস বানানো হতো, অথচ সে মিরাস পেত না, তাকে হস্তগত করা হতো, অথচ সে কাউকে হস্তগত করতে পারত না!
যারা তাকে হস্তগত করত, তার মালিক হতো তাদের অধিকাশংই তাকে অনুমতি ছাড়া নিজের জিনিসও ব্যবহার করা নিষেধ করে দিত। তারা মনে করত স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে হস্তক্ষেপ করতে পারবে ঠিক, কিন্তু স্ত্রী পারবে না। কেউ কেউ নারী হত্যার ক্ষেত্রে পুরষের ওপর কিসাস বা দিয়ত আবশ্যক করত না। এমনকি ইতিহাসে তো এমনও পাওয়া যায় যে, কোনো কোনো ইউরোপীয়রা ও অন্যান্য জাতিরা নারীসমাজকে পশু-শ্রেণি বা শয়তান-জাতি মনে করত। তাকে মানবশ্রেণির মধ্যে মনেই করত না! কেউ কেউ অবশ্য সন্দেহ করত।
📄 ইসলামের যুগের নারীর অবস্থা
একসময় ইসলাম এলো, সমাজে নারীর অবস্থান সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরল, তাকে সম্মান ও মর্যাদার আসনে বসালো, তার উপযোগী অধিকারগুলো প্রদান করল। ইসলাম এসে বলল—নারী-পুরুষ সৃষ্টিগতভাবে সমান, তাদের উভয়কেই একজন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন—
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا ... হে লোকসকল, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যিনি তোমাদের একজন থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর তার থেকে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন, আর তাদের উভয় থেকে বহু পুরুষ ও নারী সৃষ্টি করেছেন। আর ভয় করো আল্লাহকে, যার দোহাই দিয়ে তোমরা চাও পরষ্পর পরস্পরের কাছে। চাও আর (ভয় করো) অত্মীয়তা বন্ধনকে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের ওপর নজরদার। ১০১
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
إِنَّمَا النِّسَاءُ شَقَائِقُ الرِّجَالِ নারীরা হলো পুরুষদের সহদোরা।১০২
অর্থাৎ সৃষ্টিগত ও স্বভাবগত ক্ষেত্রে পুরুষদের মতো যেন নারীদের পুরুষদের থেকেই সৃষ্টি করা হয়েছে, তাছাড়া হাওয়া আ.-কে তো আদম আ. থেকেই সৃষ্টি করা হয়েছে, তার অংশবিশেষ থেকে গঠন করা হয়েছে। ইসলাম বলে আমল ও প্রতিদানের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সবাই সমান। আল্লাহ তাআলা কুরআন কারিমে বলেন
مَنۡ عَمِلَ سَيِّئَةً فَلَا يُجْزَىٰٓ إِلَّا مِثْلَهَا ۖ وَمَنْ عَمِلَ صَٰلِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُو۟لَٰٓئِكَ يَدْخُلُونَ ٱلْجَنَّةَ يُرْزَقُونَ فِيهَا بِغَيْرِ حِسَابٍۢ ... যে কোনো মন্দ আমল করবে তাকে শুধু সে মন্দ আমলরই শাস্তি দেওয়া হবে আর যারা-পুরুষ বা নারী হোক- নেক আমল করবে এমন অবস্থায় যে তারা মুমিন, তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে এবং তাদেরকে বেলা হিসাব রিজিক দান করা হবে।১০০
আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন-সাওয়াব ও প্রতিদানের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সবাই সমান, যদি উভয়ে সমানভাবে আনুগত্য করে। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, ধার্মিকতার ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায় আমল ও কর্মের মাধ্যমে, আমলকারী বা কর্মীর বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নয়। কারণ, কারও নারী বা পুরুষ হওয়া, ইতর বংশ বা সম্ভ্রান্ত বংশের হওয়া, ধার্মিকতা ও আমলের ক্ষেত্রে এসবের কোনোই প্রভাব নেই। ইমাম রাজি বলেন-আখিরাতের নিয়ামত যেমন চিরস্থায়ী, তেমনি আখিরাতের আজাবও চিরস্থায়ী। আর সেই চিরস্থায়ী নিয়ামতের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা এবং ওই চিরস্থায়ী আজাব থেকে ভয় প্রদর্শন করা 'তারগিব-তারহিবের' শক্তিশালী একটি পন্থাপন্থা। তারপর আল্লাহ তাআলা বলে দিলেন—আখিরাতের প্রতিদান কেমন হবে, আল্লাহ তাআলা সে বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এদিকেও ইঙ্গিত প্রদান করলেন যে, আখিরাতে শাস্তির চেয়ে তার দয়ার পরিমাণই বেশি হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
مَنْ عَمِلَ سَيِّئَةً فَلَا يُجْزَى إِلَّا مِثْلَهَا
যে কোনো মন্দ আমল করবে তাকে শুধু সে অনুরূপ শাস্তি দেওয়া হবে।
এখানে অনুরূপ দ্বারা উদ্দেশ্য যা তার প্রাপ্য। এখন যদি আপত্তি করা হয় যে, এটা আবার কীভাবে সম্ভব? কারণ, সামান্য সময়ের কুফরিই তো চিরস্থায়ী শাস্তি আবশ্যক করে! আমরা উত্তর বলব-যদি কাফির এই প্রতিজ্ঞা করে যে, সে তার বিশ্বাসের উপরেই অটল থাকবে, তাহলে এটা ঠিক যে-তার শাস্তি চিরস্থায়ী হবে।
পক্ষান্তরে যে ফাসিক, সে কিন্তু বুঝতে পারছে যে-এটা তার খিয়ানত হচ্ছে, অবাধ্যতা হচ্ছে। সুতরাং বলা যায়, তার এই নিয়ত নেই যে, সে এই অবাধ্যতার ওপর অটল থাকবে। তাই, যদি বলা হয়-ফাসিকের শাস্তি ক্ষণস্থায়ী, তাহলে সমস্যা নেই।
আর মুতাজিলা সম্প্রদায় যা বলে, অর্থাৎ তাঁর শাস্তি চিরস্থায়ী, তাদের এই আকিদা বাতিল, প্রত্যাখ্যাত। কারণ, তার অবাধ্যতা তো ছিল ক্ষণস্থায়ী, অবাধ্যতার নিয়তটাও সার্বক্ষণিক ছিল না; বরং ক্ষণস্থায়ী ছিল। এখন যদি তাকে চিরস্থায়ী সাজা দেওয়া হয়, তাহলে সেটা কুরআনের বাণীর বিপরীত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
مَنْ عَمِلَ سَيِّئَةً فَلَا يُجْزَى إِلَّا مِثْلَهَا
যে কোনো মন্দ আমল করবে তাকে শুধু তার অনুরূপ শাস্তি দেওয়া হবে। ১০৪
ইসলাম বলে পুরুষের ওপর নারীদের কিছু অধিকার আছে, যেমন নারীদের ওপর পুরুষের কিছু অধিকার আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
তাদের (নারীদের) জন্য (পুরুষদের ওপর রয়েছে) রয়েছে কিছু হক যেমন নারীদের ওপর রয়েছে (পুরুষদের কিছু হক) আর পুরুষদের জন্য রয়েছে তাদের (নারীদের) ওপর বিশেষ মর্যাদা আর আল্লাহ প্রতাপশালী মহাপ্রজ্ঞাময়।১০৫
অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর অধিকার দুই পক্ষ থেকেই আসবে, স্বামীর জন্য যেমন স্ত্রীর ওপর কিছু হক রয়েছে তদ্রুপ স্ত্রীরও স্বামীর ওপর কিছু হক রয়েছে। তাদের হক ও অধিকার কী কী, সেগুলো সবিস্তারে উলামায়ে কিরাম বর্ণনা করেছেন। এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে উল্লেখ করার সুযোগ নেই। তবে খেয়াল রাখতে হবে—নারী পুরুষের মাঝে এ সাম্য সকল ক্ষেত্রে নয়, যেমনটা বলে গণতন্ত্রে বিশ্বাসীরা। কারণ, আল্লাহ তাআলা একটু পরই বলেন—
وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ
আর পুরুষদের জন্য নারীদের ওপর রয়েছে (বিশেষ) মর্যাদা।
ইমাম রাজি বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীদের চেয়ে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা বেশি যেমন—
* ০১. জ্ঞানবুদ্ধি;
* ০২. দিয়াত;
* ০৩. মিরাস;
* ০৪. খলিফা, কাজি ও সাক্ষী হওয়ার যোগ্যতার ক্ষেত্রে;
* ০৫. একজন স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও পুরুষ অন্যজনকে বিবাহ করতে পারবে, গ্রহণ করতে পারবে, কিন্তু একজন নারী তার স্বামী থাকাবস্থায় সেটা করতে পারে না;
* ০৬. স্ত্রী স্বামী থেকে যে পরিমাণ মিরাস পায়, তার চেয়ে বেশি স্বামী তার থেকে পায়。
* ০৭. স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিতে পারবে, তালাক দেওয়ার পর (ইদ্দত শেষ হওয়া পূর্বে) ফিরিয়ে নিতে পারবে, স্ত্রীর ইচ্ছা হোক বা না হোক। পক্ষান্তরে স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারে না, তালাক দেওয়ার পর স্বামীকে ফিরিয়েও নিতে পারে না। আবার স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাধা দিতে পারে না。
* ০৮. গনিমতে নারীর চেয়ে পুরুষের অংশ বেশি。
তো যেহেতু এ সকল ক্ষেত্রে নারীর ওপর পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পেল, সুতরাং বোঝা গেল—পুরুষের হাতে নারী অনেকটা একজন অক্ষম বন্দিনীর মতো। এজন্যই, তারা যেন অত্যাচারিত না হয়, তাদের ওপর যেন জুলুম না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করতে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
استوصوا بالنساء خيرا فإنهن عندكم عوان
তোমরা নারীদের ব্যাপারে উত্তম হিতাকাংখী হও; কারণ, তারা তো তোমার কাছে বন্দী।
আরেক হাদিসে আছে-
اتقوا الله في الضعيفين اليتيم والمرأة
দুই দুর্বল ও অসহায় এর ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো- ০১. ইয়াতিম, ও ০২. নারী।১০৬
এ জন্যই শরয়ি পদ্ধতিতে স্ত্রীর ওপর স্বামীর জন্য খেদমত ও অনুগত্যের হক ও অধিকার রয়েছে। আম্মাজান আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
যদি আমি কাউকে কারও উদ্দেশ্যে সিজদা দেওয়ার আদেশ করতাম, তাহলে স্ত্রীকে আদেশ করতাম স্বামীকে সিজদা দেওয়ার জন্য। আর যদি কোনো স্বামী স্ত্রীকে লাল পাহাড় থেকে কালো পাহাড়ে, কালো পাহাড় থেকে লাল পাহাড়ে যাওয়ার আদেশ করে, তবুও তার কর্তব্য হবে সে আদেশ পালন করার।১০৭
লাল পাহাড় থেকে কালো পাহাড়ে কালো পাহাড় থেকে লাল পাহাড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদিও তা অসম্ভব। একথা বোঝানোর জন্য যে যত অসম্ভবই হোক না কেন, এবং যত কঠিনই হোক না কেন, স্বামীর আদেশ মানা স্ত্রী কর্তব্য, আর অসম্ভবতা বোঝানোর ক্ষেত্রে লাল পাহাড় এবং কালো পাহাড়ের সাথে সাদৃশ্য দেওয়া হয়েছে। কারণ, লাল পাহাড় এবং কালো পাহাড় সাধারণত একসাথে পাওয়া যায় না; বরং একটা আরেকটা থেকে অনেক দূরে থাকে। তো, এ হাদিস থেকে স্পষ্টতাবে প্রমাণিত হয় যে, স্ত্রীর ওপর স্বামীর অনেক বড়ো হক রয়েছে।
টিকাঃ
*৯৮ সূরা বাকারা, আয়াত: ১১৭৮
*১৯ সরা নাহল, আয়াত ৫৮-৫৯
১০০ আত-তাফসিরুল কাবির, খণ্ড:
*** সূরা নিসা, আয়াত: ১
*** সুনানু আবি দাউদ: ২৩৬, অনুচ্ছেদ, পুরুষ ঘুমের সময় অদ্রতা অনুভব করে。
***সুবা গাফির, আয়াত: ৪০
৬০৪ আত-তাফসিরুল কাবির,
১০৬ আত-তাফসিরুল কাবির, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৪৪১
১০৭ সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৮৫২৮ অক্সীর ৩৪৪।স্ত্রামীর হক。
📄 নারীদের প্রতি ইসলামের ইহসান
ইসলাম নারীদের অধিকারবঞ্চিত করে নি। বরং তাদের অধিকার দিয়েছে। তাদের ওপর নানা রকম ইহসান করেছে। ইসলাম-পূর্ব আরব, বনি ইসরাইল ও অন্যান্য জাতির পুরুষরা যত ইচ্ছা স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত, এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা ছিল না, তাদের মাঝে সমতা রক্ষা করাও শর্ত ছিল না! কিন্তু ইসলাম এসে সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলেছে-চার সংখ্যার বেশি এটা করা যাবে না। শুধু এতটুকুই না, যে নিজের ওপর দুজন স্ত্রীর মাঝে সমতা না রক্ষার আশঙ্কা করে, তার ওপর ওয়াজিব একজনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখা। একের বেশি স্ত্রী-গ্রহণের অনুমতি শুধু তারই জন্য, যার প্রয়োজন আছে, খরচ করতে পারে, তাদের মাঝে সমতা রক্ষা করতে পারে।
এছাড়াও, জাহিলি যুগে বিয়ে করাটা পুরুষদের কাছে নারীর জন্য একপ্রকার দাসত্ব ছিল। ইসলাম এসে বিয়ে-ব্যবস্থাকে একটা দ্বীনি আকদ (চুক্তি) বানিয়ে দিয়েছে। যাতে ফিতরতের তাকাজা (চাহিদা) রক্ষিত হয়, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার মাঝে মানবিক অস্থিরতা থেকে মন শান্ত হয়, যার ফলে দুই প্রেমাষ্পদের মাঝে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি হতে থাকে, দয়া ও ভালোবাসা পূর্ণাঙ্গ হতে থাকে এবং সে দয়া ও ভালোবাসা মা-বাবা থেকে সন্তানদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مُوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
আর তার নিদর্শনের মধ্য রয়েছে—তিনি তোমাদের থেকে তোমাদের জন্য স্ত্রীদের সৃষ্টি করেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করে দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে তাতে রয়েছে কিছু নিদর্শন, এমন সম্প্রদায়ের জন্য—যারা চিন্তা করে।১০৮
তাফসিরুল মানারে আছে—ইউরোপীয় ও অন্যান্য জাতি নারীদেরকে কোনো ধর্মের জন্য যোগ্যই মনে করত না, এমনকি তারা নারীদের জন্য আসমানি কিতাব পাঠ করাকেও হারাম মনে করত; কিন্তু ইসলাম এসে নারী-পুরুষ উভয়কে দ্বীনি বিষয়ে সম্বোধন করে তাদের ‘মুমিন-মুমিনাত, মুসলিম-মুসলিমাত’-এর মহান উপাধি দিয়ে খেতাব ও সম্বোধনের মর্যাদা দান করেছেন। ১০৯
মোটকথা, নারী হক ও অধিকার প্রশ্নে ইসলাম জাহিলি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার মধ্যবর্তী এবং ইসলামই আদর্শ ও ইনসাফের ধর্ম। কেনই বা নয়, অথচ ইসলাম হলো সৃষ্টিকর্তা মহান রবের আইনব্যবস্থা, যিনি রহমান রহিম, নারী-পুরুষ প্রত্যেকের সংশোধন-পদ্ধতি, স্বভাব-প্রকৃতি, ভালো-মন্দ সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞানী, যিনি জানেন কীসে তাদের মুক্তি তাদের চিরচেনা দুশমন থেকে, যার শত্রুতা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি বিশ্বাসী কোনো মুসলিম অস্বীকার করতে পারবে না, এ-জন্যই আল্লাহ তাআলা তাকে শত্রু হিসাবেই নেওয়ার এবং শত্রুতামূলক আচরণ করার আদেশ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا إِنَّمَا يَدْعُو حِزْبَهُ لِيَكُونُوا مِنْ أَصْحَابِ السَّعِيرِ
নিঃসন্দেহে শয়তান তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাকে শত্রু হিসাবেই গ্রহণ করো। সে তো তার দলকে প্ররোচনা দেয় যাতে তারা জাহান্নামের অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।১১০
আল্লাহ তাআলা শয়তানের শত্রুতা এত স্পষ্ট করে প্রকাশ করে দিয়েছেন; কারণ, শয়তান মানুষকে যে দিকে ডাকে, বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখতে মনে হয় মায়া-মমতা ও উপদেশ দিয়ে ভরা যেমন শয়তানের দোসররা করে থাকে; কারণ, সে মানুষকে তাদের প্রবৃত্তি উপভোগ, তাদের কী কী ভালো লাগে, এসবের দিকেই প্ররোচিত করে। কিন্তু আসলে সে যে তাদের ক্ষতি ও ধ্বংস করতে চাচ্ছে—এটা গোপন রাখে। উদাহরণস্বরূপ আদম আ. ও হাওয়া আ.-এর ঘটনা দেখা যেতে পারে। কী সুন্দর করে, শয়তান উপদেশ ও হিতাকাঙ্খা প্রকাশ করেছিল। সে তাদের বলেছিল—
مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَن تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ তোমাদের রব তো তোমাদের এ-গাছে (এর ফল খাওয়া) থেকে নিষেধ করেছেন, যাতে তোমরা ফেরেশতা না হয়ে যাও, অথবা চির অমর না হয়ে যাও...। আর আমি তোমাদের জন্য হিতাকাঙ্খীদের একজন। তার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ..... অতঃপর শয়তান তাদের প্ররাচনা দিল...
হাঁ, এই নিষিদ্ধ গাছেল ফল খাওয়ার ওপর উদ্বুদ্ধ করাই মূল উদ্দেশ্যই ছিল এই প্ররোচনার, তখন থেকেই সে মানুষকে ওই সব কাজের দিকে প্ররোচনা দিয়ে আসছে। যা দেখতে মনে হয় তাদের চাহিদা ও প্রয়োজনই পূরণ করা হচ্ছে বৈ কিছু নয়, কিন্তু আসলে তার একমাত্র টার্গেট আল্লাহ তাআলার আদেশ নিষেধ অমান্য করা, তাদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া। বাহ্যিক দৃষ্টিতে যেটা মনে হয়, সেটা নয়। এজন্যই আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا তোমাদের শত্রু (বন্ধু নয়)। অতএব, তাকে শত্রু হিসাবেই গ্রহণ করো। অর্থাৎ, তার প্ররোচনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকে, যেমন মানুষ তার শত্রুর কৌশলের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকে। অতএব, যে-সকল ধর্ম ও আইন-ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করা হয়েছে মানবজাতিকে ধ্বংস করার ওপর, বুঝতে হবে-সেটাই শয়তাতেন পথ ও পন্থা, যার মাধ্যমে সে তার দলবলকে প্ররোচিত করে, যাতে তারা জাহান্নামের অধিবাসী হতে পারে।
সুতরাং আমরা বলতে পারি-জাহিলিয়াত ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা, দুটোই যেহেতু মানবজাতির ধ্বংসের কারণ, তাই এ দুটো ব্যবস্থাপনাই শয়তানেরই অনেকগুলো পথ-পন্থার দু-একটি। পক্ষান্তরে দ্বীনে ইসলাম ও তার আইন-কানুন, যা এই দুই ব্যবস্থাপনার মধ্যবর্তী; যাতে মানবজাতির মুক্তির সনদ লেখা আছে, এটা আল্লাহ তাআলার পথ, যার দিকে তিনি আপন বান্দাদের আহ্বান করেন, যাতে তারা জান্নাতের অধিবাসী হতে পারে।
তো নারীদের বিষয়ে যা বলা হয়েছে, তার সারকথা হলো- ইসলাম নারীকে পর্দার আদেশ করে, ঘরে অবস্থান করতে বলে, সৌন্দর্য প্রকাশ করে এবং প্রয়োজন ছাড়া বের হতে নিষেধ করে। যেমন কুরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন- وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى আর তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো; প্রথম জাহিলি যুগের মতো সৌন্দর্য প্রকাশ করে বেড়িয়ো না।
উসমা ইবনু জায়িদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ما تركت بعدي فتنة أضر على أمتي من النساء على الرجال আমি আমার পর পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাই নি।১১১
সুতরাং ওই সমস্ত প্রয়োজন ছাড়া নারীদের জন্য সভা-সমাবেশ ও অফিস-আদালতে বের হওয়া জায়িজ নয়, যেগুলো উলামায়ে কিরাম তাদের কিতাবে আলোচনা করেছেন, বিশেষ করে এই ফিতনা ফাসাদের যুগে। এই ফিতনা-ফাসাদের কারণেই উলামায়ে কিরাম ফাতওয়া দিয়েছেন যে- মাসজিদে নারীদের নামাজ পড়া নিষেধ। আম্মাজান আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- لو أدرك رسول الله صلى الله عليه وسلم ما أحدث النساء لمنعهن كما منعت نساء بني إسرائيل (পরবর্তী সময়ে) নারীরা যা কিছু করেছে, এগুলো যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখতে পেতেন তাহলে তিনি তাদের নিষেধ করতেন যেমন বনি ইসরাইলের নারীদের নিষেধ করা হয়েছে। ১১২
অতএব, মুসলিম উম্মাহর সাধারণদের কর্তব্য, নারীদের ক্ষেত্রে তাদের শরয়ি পন্থা অবলম্বন করা, নারীদের তাদের শরয়ি নির্দেশিত পাপ্য প্রদান করা, জাহিলিয়াত ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বর্জন করা; কারণ, এ-দুটোতে সমাজের ধ্বংসও বরবাদি ছাড়া কিছুই নেই।
আর মুসলিম উম্মাহর আলিমদের কর্তব্য, নারী-পুরুষ সবার অধিকার সবিস্তারে বর্ণনা করা, যা মহান সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে ইসলাম তাদের প্রদান করেছে, বহুল দেশে প্রচলিত পাশ্চাত্য অপসংস্কৃতি থেকে তাদেরকে সতর্ক করা, কারণ এই পশ্চাত্য অপসংস্কৃতির কারণেই আজকের নারী সমাজ অহংকার, তথাকথিত স্বাধীনতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রতারণার শিকার; কারণ, মুসলিম উম্মাহর চিরতর দুশমনরা তাদের সামনে ভয়ঙ্কর বিধ্বংসী শিক্ষা-ব্যবস্থা তুলে ধরেছে যার ফলে আজকের নারী-সমাজ সকল ক্ষেত্রেই পুরুষদের সাথে সমান অধিকারের শ্লোগান দিচ্ছে, যেন এগুলো তাদের, তাদেরই বিষয়! আসলে তারা আজকে স্বেচ্ছাচারিতা ও আত্মগরিমার শিকার, ঘরের ভেতর ও বাইরে পুরুষদের শাসিয়ে রাখতে চায়, ইসলামি শরিয়তব্যবস্থার সীমা অতিক্রম করতে চায়, এমনকি যেখানে কুরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট ‘নস’ আছে সেখানেও। বরং তারা নিজেরাই শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে চায়, যেগুলো তাদের বিষয় নয়। পুরুষদেরগুলোও দারা নিজেরা পরিচালনা করতে চায়, আল্লাহ তাঁর রাসুলের আদেশ থেকে বের হয়ে যেতে চায়। তারা তো অস্বীকার করে (আল্লাহ তাআলার বাণী যে) পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তৃত্ববান এবং (অস্বীকার করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী) ওই জাতি কখন সফল হতে পারবে না, যারা নিজেদের যাবতীয় বিষয় একজন নারীর হাতে সোপর্দ করেছে!
হে মুজাহিদ, আপনারা তাদের অনুসরণ করবেন না, যারা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে, যা পাশ্চাত্য ধ্যানধারণা দ্বারা প্রভাবিত। কারণ, ওরা মহান স্রষ্টা ও তাঁর দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ। যদিও তারা নিজেদের জ্ঞানী বলে দাবি করে। অথচ তাদের বোধবুদ্ধি বলতে কিছুই নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَا تُطِيعُوا أَمْرَ الْمُسْرِفِينَ الَّذِينَ يُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ وَلَا يُصْلِحُونَ
আর তোমরা সীমলঙ্ঘন কারীদের আদেশের আনুগত্য করো না যারা যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে, সংশোধন করে না১১০
আল্লাহ তাআলাই সঠিক বিষয়ে অবগত, আল্লাহ তাআলার কাছেই ফরিয়াদ তিনি যেন আমাকে সকল মুসলিম ভাইকে সঠিককে জানার তাউফিক দান করেন। তারপর সে বিষয়ে আমল করার তাউফিক দান করেন, এটাই আমার শেষ ইচ্ছা যা আমি চেয়েছি।
টিকাঃ
* সূরা রুম, আয়াত: ২১
** তাফসিরুল মানার, খণ্ড:
১১০ সূরা ফাতির, আয়াত: ৬
*** মুসনাদু আহমাদ: ২১৭৪৬
*১২ সহিহ বুখারি: ৮৬৯
১১০ সূরা শুআরা: ১৫২-১৫৩