📄 মাহারাম বা স্বামী ছাড়া নারীর সফর করা
বর্তমান যুগের আরেকটা রোগ হলো-এ যুগের নারীরা মাহরাম বা স্বামী ছাড়া সফর করে। অথচ উলামায়ে কিরাম সবাই একমত যে, মাহরাম বা স্বামী ছাড়া নারী সফর করা নাজায়িজ। এর স্বপক্ষে বহু ‘নস’ আছে। কয়েকটি উল্লেখ করা হলো-
এক। আবু সায়িদ খুদরি রা.-এর হাদিস, যিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ১২টি গাজওয়ায় অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে চারটি বাণী শুনেছি, যা আমার খুব মনঃপূত হয়েছে। নবীজি বলেন-
* ০১. কোনো নারী স্বামী বা মাহরাম ছাড়া দুই দিনের দূরত্বে সফর করতে পারবে না।
* ০২. ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এ দুই দিনে রোযা রাখা যাবে না,
* ০৩. সূর্য উদয়ের আগ পর্যন্ত ফজরের নামাযের পর কোনো নামাজ পড়া যাবে না।
* ০৪. আর সূর্যাস্তের সময় মাগরিবের নামাজ পড়া যাবে না। যতক্ষণ না তা ডুবে যায়।২৮০
দুই। ইবনু আব্বাস রা.-এর হাদিস, তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন-
لا يخلون رجل بامرأة ولا تسافرن امرأة إلا ومعها محرم ...
কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে একান্তে মিলিত না হয়। আর কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া সফর না করে।২৮১
তিন। ইবনু উমার রা. বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
لا تسافر المرأة ثلاث أيام إلا مع ذي محرم
কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া তিন দিনের দূরত্বে সফর না করে।২৮২
চার। আবু হুরাইরা রা. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
ما يحل لامرأة تؤمن بالله واليوم الآخر أن تسافر مسيرة يوم وليلة ليس معها حرمة যে নারী আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন মাহরাম ছাড়া একদিন ও একরাতের দূরত্বে সফর না করে।২৮০
পাঁচ। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রা. বর্ণনা করেন-
أن رسول الله صلى الله عليه وسلم استند إلى بيت فوعظ الناس وذكرهم, قال لا يصلي أحد بعد العصر حتى الليل ولا بعد الصبح حتى تطلع الشمس ولا تسافر المرأة إلا مع ذي محرم مسيرة ثلاث.....
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটা ঘরের দিকে হেলান দিয়ে লোকদের উপদেশ দেন; নবীজি বলেন-কেউ যেন আসরের পর রাত নামা পর্যন্ত নামাজ না পড়ে, ফজরের পর সূর্যদয়ের আগ পর্যন্ত (নামাজ না পড়ে) আর কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া তিন (দিনের) দূরত্বে সফর না করে। ১৮৪
ছয়। আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
لا تسافر امرأة بريدا إلا ومعها ذو محرم কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া কয়েক মাইলের দূরত্বে সফর না করে। ১৮৫
সাত। ইবন আব্বাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
لا تسافر المرأة ثلاثة أميال إلا مع زوج أو مع ذي محرم স্বামী বা মাহরাম ছাড়া কোনো নারী যেন তিন মাইলের দূরত্বে সফর না করে।
তখন ইবনু আব্বাস রা.-কে বলা হলো-লোকেরা তো বলে, তিন দিন। তিনি বলেন-এটা নিছক তাদের ধারণাবশত। ১৮৬
ইবনু বাতাল বলেন-দূরত্বের পরিমাণের ক্ষেত্রে হাদিসের বিভিন্নতা অর্থাৎ কোথাও একদিন, একরাত, কোথাও তিন দিন কোথাও বা দুই দিন উল্লেখ আছে। তো এই মতভিন্নতার কারণ হলো- প্রশ্নকারীদের প্রশ্নের ধরন অনুযায়ী নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিয়েছেন; যেমন-একজন প্রশ্নকারী জিজ্ঞাসা করল, মাহরাম ছাড়া কি কোনো নারী এক দিন ও এক রাতের দূরত্বে সফর করতে পারে? তখন নবীজি বললেন-না।
আবার আরেকজন দুই দিনের দূরত্বের সফর নিয়ে জিজ্ঞাসা করল। তখন নবীজি বললেন-না।
আবার আরেকজন তিন দিনের বিষয়ে বিজ্ঞাসা করলেও নবীজি বললেন-না। এভাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রত্যেকে যা শুনেছে তাই বর্ণনা করেছেন। এটা পরস্পর বিরোধপূর্ণ বর্ণনাও নয়, রহিত ও নয়। কারণ, এখানে মূল বিষয়টি হলো, মহরাম ছাড়া নারীর সফর কোনোভাবেই বৈধ নয়, তদ্রুপ মাহরাম ছাড়া অন্য কারও সাথে একান্তে থাকাও বৈধ নয়। কেননা, 'ইল্লত' ও 'কারণের' ক্ষেত্রে এক রাত ও তিন রাত উভয়টাই সমান। ইল্লত বা কারণ হলো, এক রাত ও তিন রাতের ক্ষেত্রেই মহরাম ছাড়া রাতের অন্ধকারে রাত্রিযাপন বা একান্তে মিলিত হওয়া, সফরসঙ্গীদের ঘুমিয়া যাওয়া, পাওয়া যাচ্ছে, যার ফলে তৃতীয় পক্ষ হয়ে শয়তান উপস্থিত হয়। তাই (খারাপ কাজের) মাধ্যম ও উপায় এবং উপকরণটা মজবুত হয়ে গেল। জ্ঞান ও দ্বীনের ক্ষেত্রে অপরিপক নারীদের ব্যাপারে আশঙ্কাও বেড়ে গেল। (তাই তিন দিনের ক্ষেত্রেও জায়িজ নেই, একদিনের ক্ষেত্রেও জায়িজ নেই।) তাছাড়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো বলে দিয়েছেন-
لا يخلون رجل بامرأة ليست بذي محرم منهم ....
মাহরাম ছাড়া কোনো নারীর সাথে যেন কোনো পুরুষ একা না থাকে।৫৮৭
ইমাম নববি মুসলিম শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন-এ সকল হাদিস সহিহ, তবে এ হাদিসগুলোতে সফরের সবচেয়ে কম সময়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় নি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও সবচেয়ে কম সময়ের সফরের পরিমাণের কথা বর্ণিত হয় নি। মোটকথা, সফরের যেটাকেই মানুষ সফর বলে মনে করে, সেটা থেকেই মাহরাম বা স্বামী ছাড়া নারীকে নিষেধ করা হবে। তিনদিন হোক, দুই দিন হোক, একদিন অথবা কয়েক মাইল হোক কিংবা অন্য কোনো সংখ্যা হোক। যার প্রমাণ, পূর্বে বর্ণিত ইবনু আববাস রা.-এর মুতলাক (শর্তহীন) হাদিস; যা সব ধরনের সফরকেই শামিল করে। আল্লাহই ভালো জানেন। ১৮৮
এ সকল হাদিসে সফর দ্বারা আভিধানিক অর্থ উদ্দেশ্য (শরয়ি অর্থ নয়)। অর্থাৎ দূরবর্তী জায়গা অতিক্রম করা। মোল্লা আলি কারি 'মিরকাতে' এমনটাই বলেছেন। তিনি 'দারুল কুফর' ৫৮৯ থেকে মাহরাম ছাড়া নারীর হিজরত করাকে হাদিসে বর্ণিত নিষেধ থেকে বের করেন। অর্থাৎ এটাকে জায়িজ বলেছেন। যার দলিল, আদি ইবনু হাতিম রা.-এর হাদিস, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
يوشك أن تخرج الظعينة من الحيرة تؤم البيت لا جوار معها لا تخاف إلا الله
হিরা এলাকা থেকে উটে আরোহিত নারী কাবার উদ্দেশ্যে বের হবে, তার সাথে কোনো সঙ্গী থাকবে না। (অথচ) সে আল্লাহ ছাড়া কারও ভয় করবে না।২৯০
কাফিরদের হাতে বন্দিনীও মাহরাম ছাড়া পালিয়ে আসতে পারবে। কারণ, যে হিজরত করবে বা যে বন্দিনী পালিয়ে আসবে, তার এই ‘আসা’ সফর নয়; কারণ, তারা কোনো নির্দিষ্ট স্থানের উদ্দেশ্যে বের হয় না; বরং কোনোভাবে জুলুম-নির্যাতনের ভয় থেকে মুক্তি পাওয়াই মূল উদ্দেশ্য থাকে। এজন্যই তারা যদি কোনো নিরাপদ স্থান যেমন মুসলিম সেনাক্যাম্প দেখতে পায়, তাহলে তাদের ওপর ওয়াজিব সেখানে অবস্থান করা, স্বামী বা মাহরাম ছাড়া সেখান থেকে সফর না করা। এখন যদি তারা নির্দিষ্ট কোনো স্থানকে উদ্দেশ্য হিসাবে গ্রহণ করে, তাহলে তাদের এ উদ্দেশ্য গ্রহণ বা নিয়ত ধর্তব্যও হবে না। সফর বলেও বিবেচিত হবে না। কারণ, তাদের এ বাহ্যিক অবস্থা অর্থাৎ মুক্তি পাওয়ার আশা ওই উদ্দেশ্যকে নাকচ করে। (আর মুক্তি পাওয়ার আশা সফরের পরিপন্থী)। আর যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, এটা সফর, তবুও বলতে হবে—এটা মাজবুরির সফর (অর্থাৎ এ সফর জায়িজ)। কারণ, সফর অবস্থায় যে ফিতনার (অশ্লীল কাজে জড়িয়ে পড়া) (মাহরাম ছাড়া) আশঙ্কা আছে সেটা দারুল হারবের ফিতনার (জুলুম-নির্যাতন) চেয়ে অনেক লাঘব, তাই এ সফর জায়িজ বলে বিবেচিত হবে এই মূলনীতির আলোকে—
أخف المفسدتين يجب ارتكابها عند لزوم إحداهما
যখন দুটো ক্ষতিকর বিষয়ের যে কোনো একটা ক্ষতিকর বিষয় আশ্যকীয়, তখন কম ক্ষতিকর বিষয়টা করা ওয়াজিব।
মোটকথা, এখানে সফর জায়িজ হচ্ছে মজবুরি ও উপায়হীনতার কারণে; যাতে এমন ক্ষতি দূর করা সম্ভব হয়, যা মাহরাম ও স্বামী ছাড়া ‘দারুল ইসলামে’ (ইসলামি রাষ্ট্র) সফর করার ক্ষতির চেয়ে বেশি ক্ষতিকর। ‘ফাতহুল কাদির’ ও ‘আল-বাহরুর রায়িকে’ এমনই উল্লেখ করা হয়েছে।১৯১
কতটুকু দূরের সফরে স্বামী বা মাহরাম ছাড়া সফর করা যাবে না—এ-ব্যাপারে উলামায়ে কিরামের বিভিন্ন মত:
এক. ইমাম নাখায়ি, শাবি, তাউস ইবনু কাইসান এবং জাহিরি মাজহাবের মত—নারী নিজে নিজে কোনো সফরই করতে পারবে না, কাছে হোক বা দূর। যদি-না তার সাথে স্বামী বা মাহরাম থাকে।
তাদের দলিল ওই সকল হাদিস, সেগুলো মুতলাক বা শর্তহীনভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন, ইবনু আব্বাস রা.-এর হাদিস।
দুই. আতা, সাঈদ ইবনু কাইসান এবং জাহিরি মাজহাবের কয়েকজনের নিকট—১২ মাইলের কম হলে সফর করা জায়িজ, আর যদি ১২ মাইল বা এর বেশি হয়,
তাহলে মাহরাম বা স্বামী ছাড়া সফর করা জায়িজ নয়। তাদের দলিল সুনানু আবি দাউদে বর্ণিত আবু হুরায়রা রা.-এর হাদিস।
তিন. ইমাম আউজায়ি, লাইস, মালিক এবং শাফিয়ি রহ.-এর মাজহাব-একদিনের কম দূরত্বের হলে সফর করতে পারবে। এর বেশি হলে স্বামী বা মাহরাম ছাড়া সফর করতে পারবে না। তবে ইমাম মালিক ও শাফিয়ি রহ.-এর মাজহাবে ফরজ হজের জন্য স্বামী বা মাহরাম ছাড়াই নারী সফর করতে পারবে। যদিও তার এলাকা ও মক্কার মাঝে সফরের দূরত্বের পরিমাণ থাকে। অর্থাৎ তারা একা একা সফর করার নিষিদ্ধতার কথা শুধু ওই সফরের ক্ষেত্রেই বলেন, যা ওয়াজিব নয়।
তাদের দলিল সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আবু হুরাইরা রা.-এর হাদিস।
চার. ইমাম জুহরি, হাসান আল-বাসরি ও কাতাদা রহ.-এর মত-দুই দিন ও রাতের কম দূরত্বে সফর করতে পারবে। আর যদি দুই দিন দুই রাত হয়, তাহলে মাহরাম বা স্বামী ছাড়া সফর করতে পারবে না।
তাদের দলিল, সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আবু সায়িদ খুদরি রা.-এর হাদিস।
পাঁচ. ইমাম সাউরি, আ'মাশ, আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.-এর মাজহাব-কসরের সফরে অর্থাৎ তিন দিনের দূরত্বে মাহরাম বা স্বামী ছাড়া সফর করতে পারবে না।
তাদের দলিল, সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রা.-এর হাদিস। হানাফি মাজহাবে হজের সফর হোক বা অন্য যে কোনো সফর হোক কোনো পার্থক্য নেই। কোনো অবস্থাতেই মাহরাম বা স্বামী ছাড়া সফর করা জায়িজ নয়। এমনটাই উমদাতুল কারিতে রয়েছে। ১৯২
এ সকল মাজহাব, মত ও দলিল-প্রমাণ বিশ্লেষণের জন্য দেখা যেতে পারে আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি হানাফি রচিত নুখাবুল আফকার ফী শারহি মাআনিল আসার, অধ্যায় : হজ (অনুচ্ছেদ, নারী যদি মাহরাম না পায়, তাহলে কি তার ওপর ফরজ হজ আদায় ওয়াজিব হবে?)।
এই মতই (পঞ্চম মত) হানাফি মাজহাবের নিকট প্রসিদ্ধ। এ-জন্যে হিদায়া গ্রন্থপ্রণেতা হজ অধ্যায়ে বলেন-সফরের নির্দিষ্ট পরিমাণের কম দূরত্বে একজন নারীর জন্য 'মাহরাম ছাড়া' বের হওয়া বৈধ নয়।
কিন্তু আল্লামা ইবনু আবিদিন বলেন-আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ রহ. থেকে বর্ণিত আছে, একদিনের দূরত্বে বের হওয়া মাকরুহ এবং এই ফিতনা ফাসাদের যুগে এই মতের ওপরই ফতোয়া দেওয়া উচিত।১৯০
এমতকে সমর্থন করে সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিস-
لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ عَلَيْهَا وَفِي
যে নারী আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, তার জন্য বৈধ নয়, মাহরাম ছাড়া একদিন ও এক রাতের দূরত্বে সফর করা।
(এটা সহিহ বুখারির শব্দ।) সহিহ মুসলিমে আছে- (مسيرة ليلة) এক রাত্রের দূরত্ব, আরেক বর্ণনায় আছে (يوم) একদিন ২১৪
উপরের আলোচনা থেকে জানা গেল-বর্তমান যুগের ফাতওয়া অনুযায়ী মাহরাম বা স্বামী ছাড়া কোনো নারী একদিনের দূরত্বে সফর করতে পারবে না। আল্লামা ইবনু আবিদিন বলেন-মাহরাম বলা হয় এমন কাউকে, যার সাথে কখনোই বিবাহ করা বৈধ নয়। চাই সেটা আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে হোক বা দুধপানের সূত্রে, কিংবা বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে।
তুহফাতুল ফুকাহাতে এমনই বলা হয়েছে। জহিরিয়্যা নামক কিতাবে উল্লেখ আছে, যার সাথে জিনা করেছে তার মেয়েও জিনাকারীর মাহরাম বলে গণ্য হবে; কিন্তু শারহুল লুবাব গ্রন্থে বলা হয়েছে- হিদায়া গ্রন্থের ব্যাখ্যাকার আল্লামা কাওয়ামুদ্দিন বলেন, জিনার ভিত্তিতে মাহরাম হলেও কয়েকজন উলামায়ে কিরামের নিকট তার সাথে সফর করা যাবে না, এই মত পোষণ করেছেন। ইমাম কুদুরি রহ. এবং এটাই আমাদের মত। আর এর মাধ্যমেই দ্বীনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা যাবে, অপবাদ থেকে দূরে থাকা যাবে।
সাইয়িদ আবু সাউদ নাফাকাতুল বাজ্জাজিয়া গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি পেশ করেন যে, বর্তমান যুগে নারী তার দুধভাইয়ের সাথেও সফর করতে পারবে না। অর্থাৎ ফিতনা ফাসাদের কারণে এটা করবে না। আমি-আল্লামা ইবনু আবিদিন-বলি, এ মত সমর্থন করে আরেকটা মাসআলা অর্থাৎ দুধভাইয়ের জন্য দুধবোনের সাথে একান্তে মিলিত হওয়া মাকরূহ। যেমন-ছেলের যুবতী স্ত্রীর সাথে শ্বশুরের একা থাকা মাকরূহ। অতএব, যুবতী স্ত্রীরও শ্বশুরের সাথে সফরে বের না হওয়ার কারণ, সফরও এক প্রকার 'একা' থাকার মতোই।১১২
মুহরাম হওয়ার জন্য শর্ত হলো-
* ০১. আকেল বা বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া;
* ০২. বালেগ হওয়া;
* ০৩. মাজুসি (অগ্নিপুজারি) না হওয়া;
০৪. ফাসেক না হওয়া;
০৫. স্বামীর ক্ষেত্রেও এ শর্তগুলো পাওয়া যেতে হবে। ১৯৯
আল-মুহিতুল বুরহানি নামক কিতাবে, ইমাম কুদুরি রহ. বলেন—মাহরাম যদি মাজুসি হয়, যে তার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক করাকে বৈধ মনে করে, তাহলে তার সাথে সফর করা যাবে না। কারণ, তার লোলুপ দৃষ্টি নারীর ওপর পড়াটাই স্বাভাবিক। এ-জন্যই নারী তার মাহরাম মাজুসির সাথে একা থাকতে পারে না। সুতরাং সফরও করতে পারবে না। কুদুরি রহ. এটাও বলেন যে—কোনো মুসলিম-মাহরাম-এর ব্যাপারেও যদি খারাপের আশঙ্কা থাকে, তার সাথেও সফর করা যাবে না। কারণ, মাহরাম সঙ্গে থাকার যে উদ্দেশ্য সেটাই তার থেকে পাওয়া যায় না।
অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর থাকা না থাকা সমান। তদ্রুপ মস্তিষ্ক-বিকৃতির অধিকারী মাহরামের থাকাও বিবেচ্য নয়। কারণ, মাহরাম সঙ্গে থাকার উদ্দেশ্য হলো—নিরাপত্তা, যা তাদের দ্বারা পাওয়া যায় না। ১৯৭
এটাই মূলত বিধান যদিও বর্তমান যুগে সবাই এ বিধান পালনে শিথিলতা করে! আফসোসে বিষয় যে, অনেক উলামায়ে কিরামও এ বিষয়ে শিথিলতা করে থাকেন; অথচ তাদেরকেই অন্যদের আদর্শ মনে করা হয়। তাহলে শরিয়তপালনে অন্যদের কী দশা হবে! অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজকে মুসলিম দেশগুলোতে খুব কমই এমন পাওয়া যায়, যারা শরিয়তের আদেশ নিষেধের সামনে অবিচল। তবে আল্লাহ তাআলার অনেক শুকরিয়া যে (হাদিসের ভাষ্যনুযায়ী) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একদল উম্মত সদা সর্বদা আল্লাহ তাআলার আদেশের সামনে অবিচল, যারা তাদের থেকে সরে যায় বা বিরোধিতা করে, তারা ওই দলের কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। একসময় আল্লাহ তাআলার ফায়সালা আসবে, আর তারা সবার ওপর বিজয় লাভ করবে। আল্লাহ তাআলার কাছে ফরিয়াদ—তিনি যেন আমাদেরকেও এই মুবারাক কাফেলায় শামিল করেন। তিনিই ফরিয়াদ পাওয়ার যোগ্য। আল্লাহ তাআলাই সঠিক বিষয়ে অধিক অবগত।
টিকাঃ
২৮০ সহিহ বুখারি: ১৯৯৫
২৮১ সহিহ বুখারি: ৩০০৬
২৮২ সহিহ বুখারি: ১০৮৬
২৮০ সহিহ বুखারি: ১০৮৮ অনুচ্ছেদ: কৃত রাকাত নামাজ কসর করবে।
*** মুসনাদু আহমাদ : ৬৭১২
*** সুনানু আবি দাউদ : ১৭২৫
মুজামুত তাবারানি, কাবির: ১২৬৫২
৫৮৭ শারহুল বুখারি, ইবনু বাতল: ৩
৫৮৮ মুসলিম শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ, ইমাম নববি, অনুচ্ছেদ: মাহরামসহ হজ বা অন্যকোথাও নারীর সফর করা..
৫৮৯ সংক্ষিপ্তভাবে দারুল কুফরের পরিচয় হলো-এমন রাষ্ট্র, যার চারপাশে কোনো মুসলিম দেশ নেই, যেখানে ইসলামের বিধিবিধান অচল, সেটাকেই দারুল কুফর বলে।
২৯০ মিরকাত, মানাসিক অধ্যায়,
*** আল-বাহরুর রায়িক, খণ্ড:
২১২ উমদাতুল কারি, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ১২৬
২১০ সূত্র: শারহুল লুবাব。
*** সূত্র: রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৫৮
* সূত্র: রদ্দুল মুহতার
১৯৯ রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হজ。
১৯৭ আল-মুহিতুল বুরহানি, খণ্ড: