📄 নারীর সাথে মুসাফাহা বা হ্যান্ডশেক
পুরুষের সাথে নারীর মুসাফাহা বর্তমান যুগে গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথেও নারীদের হ্যান্ডশেক ব্যাপক আকার ধারণ করেছে; যা খ্রিস্টান-ইউপরোপীয়দের থেকে ধার করে নেওয়া। অথচ আমাদেরকে ওদের বিরোধিতা করার আদেশ করা হয়েছে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত উলামায়ে কিরাম এক্ষেত্রে একমত পোষণ করেছেন—গাইরে মাহরাম নারীর শরীরের কোনো অংশই স্পর্শ করা যাবে না! এটা নাফারমানি। তবে প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা। কারণ, নারীর দিকে তাকানোই যায় না, স্পর্শ করা তো আরও দূরে। আল্লামা সারাখসি রহ. বলেন—প্রয়োজন ছাড়া খাহেশাত ও প্রবৃত্তির সাথে তাকানো কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়। প্রয়োজন তখনই হবে যদি কোনো পুরুষকে নারীর বিপক্ষে সাক্ষী হিসাবে ডাকা হয়, অথবা বিচারক যখন তার ওপর বিচার করার জন্য দেখবেন, যদি সে স্বীকারোক্তি দেয় অথবা সাক্ষীরা তাকে চেনার বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়, এ-অবস্থায় তাকানো যাবে; কারণ, এখানে তাকানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই! আর শরিয়তের বড়ো একটি মলনীতি হলো—
الضرورات تبيح المحظورات প্রয়োজনের কারণে নিষিদ্ধ বিষয়ও বৈধ হয়ে যায়।
তবে যখন তার দিকে তাকাবে, তখন নিয়ত থাকতে হবে—সাক্ষ্য দেওয়া বা বিচার করা, খাহেশাত পূরণের উদ্দেশ্যে দেখা যাবে না। কারণ, যদি দেখা পরিহার করে সাক্ষ্য বা বিচার করা সম্ভব হতো, তাহলে সেটাই করা হতো; কিন্তু দেখা পরিহার করা অসম্ভব হলেও নিয়তের মাধ্যমে পরিহার করা সম্ভব। তাই নিয়তের মাধ্যমে পরিহার করবে। যেমন—লড়াইয়ের সময় মুসলিমদের সামনে যদি মুশরিকরা শিশুদের রেখে ঢাল বানায়, তাহলে মুজাহিদদের কর্তব্য হচ্ছে লড়াই বন্ধ না করা; বরং তাদের দিকে অস্ত্র চালিয়ে যাবে, তবে উদ্দেশ্য থাকবে মুশরিকরা।
আর যদি কাউকে নারীর সাক্ষী হওয়ার জন্য ডাকা হয়, অথচ সে মনে করে যে, তার দিকে তাকালে প্রবৃত্তি চলে আসবে, তাহলে এ ক্ষেত্রে একাধিক মত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন—এটা জায়িজ; তবে শর্ত হলো—সাক্ষ্য গ্রহণের নিয়তে তাকাবে, খাহেশাত পূরণের জন্য নয়। যেমন জিনার সাক্ষীর জন্য সাক্ষ্যগ্রহণের উদ্দেশ্যে জিনাকারীর সতরের দিকে তাকানো বৈধ। তবে সহিহ মত হলো—এটা বৈধ নয়। কেননা, এখানে প্রয়োজন নেই। কারণ, সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আরও অনেককে পাওয়া যাবে, যাদের খাহেশাত সৃষ্টি হবে না। পক্ষান্তরে সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে জায়িজ কারণ, সে সাক্ষ্য গ্রহণ করে দায়িত্বটা নিজের ওপর বাধ্য কর ফেলেছে। তাছাড়া সে ছাড়া সাক্ষ্য দেওয়ার আর কেউ নেই।৫১
আল্লাহ তাআলা বলেন— يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَىٰ أَن لَّا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ ..
হে নবী, যখন মুমিন নারীরা আপনার কাছে আসবে এই মর্মে বাইআত করার জন্য, তারা আল্লাহর সাথে কোনো কিছু শরিক করবে না চুরি করবে না, জিনা করবে না, নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না... ৫৫২
এই আয়াতের তাফসিরে আল্লামা ইবনু কাসির রহ. বলেন—ইমাম বুখারি রহ. বর্ণনা করেন উরওয়া থেকে যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী আয়িশা রা. তাকে বলেন, যে সকল নারীরা (মক্কা থেকে) হিজরত করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসত, তিনি তাদের এই আয়াতের মাধ্যমে (يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ) —থেকে (غَفُورٌ رَّحِيمٌ) আয়াতের শেষ পর্যন্ত যাচাই-বাছাই করতেন। উরওয়া বলেন, উম্মুল মুমিনিন আয়িশা সিদ্দিকা রা. বলেছেন—
তো, যে নারী এই শর্তগুলো মেনে নিত, তিনি তাদেরকে বলতেন— قد بایعتک کلاما (কদ বায়াতুকি কালামা) তোমার কথার মাধ্যমে তোমার বাইআত গ্রহণ করিলাম। আল্লাহর কসম! তার হাত কখনোই কোনো নারীর হাত স্পর্শ করে নি; তিনি তাদের বাইআত গ্রহণ করতেন শুধু কথার দ্বারা যে—আমি এ-বিষয়ে তোমার বাইআত কবুল করলাম। ৫৫৩
ইমাম আহমাদ রহ. রাকিকার মেয়ে উমাইমা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন—
আমি কয়েকজন নারীর সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে বাইআতগ্রহণের উদ্দেশ্যে আসি। আমরা বললাম—আল্লাহর রাসুল, আমরা আপনার হাতে বাইআতগ্রহণ করছি এই মর্মে যে, আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করব না, চুরি করব না, জিনা করব না, নিজেদের রচিত অপবাদ রটাবো না, কোনো ভালো কাজে আপনার অবাধ্যতা করব না। নবীজি বললেন—তোমরা যা করতে পারো এবং যা সাধ্যে রাখো সে বিষয়ে।
আমরা বললাম—আমাদের চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই আমাদের প্রতি অধিক দয়াবান, আসেন, আমরা আপনার হাতে বাইআত গ্রহণ করি, হে আল্লাহর রাসুল!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—আমি নারীদের সাথে হাত মেলাই না!
একজন নারীকে আমার এই কথা বলা— 'বাইআত কবুল করলাম' —এটা একশজন নারীকে বলার মতো।২৫৪
ইবনু হাজার রহ. বলেন—এ হাদিসের দ্বারা গাইরে মাহরাম নারীর শরীর স্পর্শ করা হারাম বলা হয়েছে। ২৫৫
আমি বলি—জানা বিষয় যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গুনাহ থেকে মাসুম ছিলেন। তাছাড়া বাইআত গ্রহণের—এক ধরনের চুক্তি ছিল—সময় পুরুষরা তাঁর সাথে হাত মিলাত, তা সত্ত্বেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদের সাথে হাত মেলানো থেকে বিরত থেকেছেন। এমনকি স্পষ্টভাবে বলেও দিয়েছেন যে, নারীদের সাথে পুরুষের হাত মিলানো হারাম যাতে তার পরবর্তী খলিফারা তাকে এ ক্ষেত্রে অনুসরণ না করে। এই মাসআলার ক্ষেত্রে চারও মাজহাবের উলামায়ে কিরাম একমত পোষণ করেছেন যে—হাত মেলানো হারাম। হ্যাঁ, শুধু এ-যুগে একটা কথা পাওয়া যায় যে, গাইরে মাহরাম নারীর সাথে হাতমেলানো বৈধ, সামনে এ বিষয়ে বিশ্লেষণ করা হবে। মুসাফাহার বিষয়ে ফকিহ আলিমদের অভিমত—
০১. হানাফি উলামায়ে কিরামের অভিমত: 'আদদুররুল মুখতারে' আছে (যার দিকে তাকানো বৈধ) পুরুষ হোক বা নারী (তাকে স্পর্শ করাও বৈধ) যদি নিজেরে বিষয়ে খাহেশাতের আশঙ্কা না করে, আর যদি আশঙ্কা করে কিংবা সে বিষয়ে দ্বিধা-দ্বন্দে থাকে তাহলে দেখাও জায়িজ নেই, স্পর্শ কারাও জায়িজ নেই (তবে যদি গাইরে মাহরাম হয়) তাহলে তার চেহারা হাত কিছুই স্পর্শ করা বৈধ নয় যদিও খায়েশাতের ভয় না করে কারণ এটা আরও বেশি খতরনাক। এ'মাসআলা যুবতী নারীর ক্ষেত্রে। আর যদি বৃদ্ধা হয় যাকে দেখলে খায়েশাত সৃষ্টি হয় না তাহলে তার সাথে মুসাফাহা করতে পারবে, তার হাত স্পর্শ করতে পারবে যদি খায়েশাতের আশঙ্কা না করে'... আল্লামা ইবনু আবেদীন বলেন আরেকটা মত আছে (বৃদ্ধার সাথে মুসাফাহা করার ক্ষেত্রে) পুরুষকেও এমন হতে হবে যাকে দেখলে কাম প্রবৃত্তি সৃষ্টি হয় না (আল্লামা কাহাসতানি, কিরমানী রহ. থেকে বর্ণনা করে বলেন) 'যাখীরা' কিতাবে আছে যদি বৃদ্ধা এমন হয় যাকে দেখলে কামপ্রবৃত্তি সৃষ্টি হয় না, তাহলে তার সাথে মুসাফাহা করা যাবে, তার হাত স্পর্শও করা যাবে, আর যদি বৃদ্ধ হয় যে নিজের ব্যাপারে এবং নারীর ব্যাপারে খায়েশাতের আশঙ্কা না করে তাহলে নারীর সাথে মুসাফাহা করা যাবে। আর যদি নিজের ব্যাপারে অথবা নারীর ক্ষেত্রে আশঙ্কা করে তাহলে এটা থেকে বিরত থাকতে হবে।
তো, আল্লামা ইবনু আবিদিন রহ.-এর কথা থেকে জানা যায়-বৃদ্ধা নারী স্পর্শ করার ক্ষেত্রে দুটো মত পাওয়া যায়:
০১. একমত অনুযায়ী মুসাফাহা জায়িজ, যদি তাদের একজন এমন হয়, যাকে দেখলে কামপ্রবৃত্তি সৃষ্টি হয় না।
০২. আরেক মতনুযায়ী প্রত্যেককেই এমন হতে হবে যাকে দেখলে, দুজনের কারওরই কামপ্রবৃত্তি সৃষ্টি হয় না। তবে দ্বিতীয় মতই অগ্রাধিকারযোগ্য। বিশেষ করে এই ফিতনা-ফাসাদের যুগে। কারণ, যে স্পর্শ করবে তার মনে যদিওবা কামপ্রবৃত্তি না থাকে, কিন্তু অপরজনের ক্ষেত্রে তো আশংকা আছে।
ইমাম সারাখসি রহ বলেন-যদি নারীর কামপ্রবৃত্তি সৃষ্টি হওয়ার আশা থাকে, তাহলে তার সাথে মুসাফাহা করা যাবে না। যেমন, যদি নিজের ক্ষেত্রে আশঙ্কা থাকে। ২৬
আল্লামা মারগিনানি রহ. তার প্রখ্যাত কিতাব হিদায়াতে উল্লেখ করেন-পুরুষ গাইরে মাহরাম, নারীর হাত মুখ কিছুই স্পর্শ করতে পারবে না। যদিও খায়েশাতের আশঙ্কা না করে।
আল্লামা সামারকান্দি বলেন-নারী যদি যুবতি হয় তাহলে খায়েশাত থাকুক বা না থাকুক, উভয় অবস্থাতেই স্পর্শ করা হারাম, আর যদি বৃদ্ধা নারী হয় তাহলে খায়েশাতের ভয় না থাকলে তার সাথে মুসাফাহা করা যাবে আর যদি বৃদ্ধা নারীর খায়েশাত থাকে, তাহলে মুসাফাহা করা যাবে না। যদিও পুরুষের খায়েশাত না থাকে।
হাফিজ জাইলায়ি রহ. বলেন-পুরুষ, নারীর হাত স্পর্শ করতে পারবেনা যদিও খাহেশতের ভয় না থাকে কারণ এটা হারাম তদ্রপ, এখানে কোনো প্রয়োজনও নেই, না করাতে অনেক কষ্ট মছিবত চলে আসবে তাও নয়।৫৫৮
০২. মালিকি মাজহাবের উলামায়ে কিরামের অভিমত: আল্লামা বাজি রহ. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
إني لا أصافح النساء আমি নারীদের সাথে মুসাফাহা করি না।
অর্থাৎ, আমার হাতের সাথে তাদের হাত লাগাই না, নবীজি একথার মাধ্যমে-তবে আল্লাহই ভালো জানেন- (স্পর্শ করা থেকে) বিরত থাকতে চাচ্ছেন। মানে, পুরুষদের বাইআতগ্রহণ ছিল হাতে হাত রাখার মাধ্যমে, তো, নবীজি নারীদের বাইআতগ্রহণের ক্ষেত্রে হাতে হাত রাখা থেকে নিষেধ করেছেন। কারণ, তখন তাদের স্পর্শ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে (যা হারাম)।৫৫৯
আসহালুল মাদারিক নামক কিতাবে আছে, কোনো নারীর সাথে পুরুষের মুসাফাহা করা বৈধ নয়, যদিও পরিচিতির জন্য করা হয়। কারণ, শুধু দেখাটাই বৈধ (এর বেশি কিছুতেই নয়)।৫৬০
০৩. শাফিয়ি মাজহাবের উলামায়ে কিরামের অভিমত: ইমাম নববি রহ. বলেন-সুন্দর লাবণ্যময় চেহারার অধিকারী বালকের সাথেও মুসাফাহা করা থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ তার দিকে তাকানোই হারাম। আমাদের (মাজহাবের) উলামায়ে কিরাম বলেন-যার দিকে তাকানো হারাম, তাকে স্পর্শ করাও হারাম; বরং স্পর্শ করা তো আরও বেশি খতরনাক। কারণ, গাইরে মাহরাম নারীর দিকে তাকানো তখনই জায়িজ, যদি তাকে বিয়ে করতে চায় অথবা বেচাকেনা, লেনদেন বা এই জাতীয় কিছু করতে চায়; কিন্তু এ-সবের কোনো অবস্থাতেই স্পর্শ করা জায়িজ নয়।১৬১
হাফিজ ইবনু হাজার রহ.-ও বলেন-হাদিসে বর্ণিত মুসাফাহা করা থেকে (দুজনের সাথে মুসাফাহা) বাদ দেওয়া হবে:
* ০১. গাইরে মাহরাম নারীর সাথে, এবং;
* ০২. সুশ্রী লাবণ্যময় সুন্দর বালকের সাথে মুসাফাহা করা।১৬২
হাফিজ ইরাকি রহ. বলেন—আয়িশা রা.-এর হাদিসে আছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন স্ত্রী ও মালিকানাধীন দাসী ছাড়া কারও হাত স্পর্শ করতেন না, না-বাহাইতগড়ের সময়ে, আর না অন্য সময়ে। তিনি মাসুম ও সন্দেহযুক্ত হওয়ার পরও যদি নারীদের সাথে মুসাফাহা না করেন, তাহলে অন্যানদের কর্তব্য তো আরও বেশি বিরত থাকা। বাহ্যিকভাবে এটাই প্রতীয়মাণ হয় যে, হারাম হওয়ার কারণেই তিনি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতেন।
০৪. হাফলি মাজহারের উলামায়ে কিরামের অভিমত: ‘কাশফুল কিনা’ কিতাবে আছে—গাইরে মাহরাম যুবতী নারীর সাথে মুসাফাহা করা বৈধ নয়। কারণ, এটা তাকওয়ানো চেরেও ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক আর যদি বৃদ্ধ হয় তাহলে মুসাফাহা করাইবেখ।
আল-ইনসাফ ফি মারিফাতির রাজਿਹ মিনাল খিলাফ কিতাবে আছে—ইমাম আহমদ রহ. নারীদের সাথে মুসাফাহা করাকে অপছন্দ করেছেন; বরং এক্ষেত্রে খুব কঠোরতা করে মুহরিম ব্যক্তির জন্যেও মাকরূহ বলেছেন। তবে পিতার জন্য জায়েজ বলেছেন।
আর রাজউন নাদিয়্যি কিতাবে আছে—গাইরে মাহরাম যুবতি নারীর সাথে মুসাফাহা করাইবেন্না।
যারা এই মতের বিরোধিতা করেছেন, তাদের অভিমত : তাকিউদ্দিন নাযাহানি তার কিতাব আন-নিজামুল ইজতিমায়ি ফিল ইসলামিতে বলেন—পুরুষ নারীর সাথে মুসাফাহা করতে পারে, নারী পুরুষের সাথে মুসাফাহা করতে পারে, এ ক্ষেত্রে কোনো বাধা বা প্রতিবন্ধকতা নেই।
তিনি আরও বলেন—বাহাইতগড়ের হাতের মাধ্যমে হতে পারে, লেখার মাধ্যমে হতে পারে, এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই, পুরুষ যেমন খলিফার হাতে বাইআত করতে পারে, নারীরাও হাতে হাত রেখে বাইআতগ্রহণ করতে পারবে।
তার মতের পক্ষে একাধিক দলিল আছে। আমরা সেই দলিলগুলো উল্লেখ করার পাশাপাশি তার খণ্ডনও উল্লেখ করব—
হাতিলীল ০১ : তিনি উম্মু আতিয়্যা রা.-এর হাদিস থেকে যা বুঝতে পেরেছেন, এটাই তার দলিল। উম্মু আতিয়্যা বলেন-
আমরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে বাইআত করি, (أن لا يُشْرِكْنَ بالله شيئا) এই আয়াত তখন নবীজি আমাদের্কে (أن لا يُشْرِكْنَ بالله شيئا) এই আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন। তিনি আমাদের বিলাপ করতে নিষেধ করেন। তখন আমাদের সাথে থাকা এক নারী তার হাত গুটিয়ে বলল- অমুক নারী তো আমাকে একটা কাজে সাহায্য করেছিল, এখন আমি তাকে তার প্রতিদান দিতে চাই।
নবীজি কিছুই বললেন না তাকে। তারপর সে গিয়ে আবার ফিরে এলো। পরবর্তী সময়ে উম্মু সুলাইম, উম্মুল আলা, আবু সুবরার কন্যা-যিনি মুআজ রা.-এর স্ত্রী, অথবা আবু সুবরার কন্যা ও মুআজ রা.-এর স্ত্রী ছাড়া কোনো নারী-(বাইআতকৃত বিষয়গুলো) পূর্ণ করে নি।৫৬৮
তো নাবাহানি বলছেন-এই হাদিস প্রমাণ করে যে, নবীজি নারীদের হাতে হাত রেখে বাইআত গ্রহণ করেছেন। যার প্রমাণ, উম্মু আতিয়্যা রা. এই হাদিসে বলেছেন-'আমাদের এক নারী তার হাত গুটিয়ে ফেলে'। কারণ, এই কথার অর্থ হচ্ছে, সাথে থাকা অন্যান্য নারীরা নিজেদের হাত গুটিয়ে নেন নি। আর এখানেই বোঝা যায় যে-তারা নবীজির হাতে হাত রেখে বাইআত গ্রহণ করেছেন।
একাধিক দিক থেকে এই দাবির উত্তর দেওয়ার সুযোগ আছে। আমরা তিনটি দিক উল্লেখ করে এই দাবির উত্তর দিচ্ছি, ইন শা আল্লাহ-
প্রথম দিক : হাদিসে বর্ণিত, হাত গুটিয়ে নেওয়ার অর্থ, বিলম্ব করে বাইআত কবুল করা। যেমন, হাফিজ বদরুদ্দিন আইনি বলেন-হাত গুটিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য: 'বিলম্ব করে বাইআত কবুল করা।' ৫৬৯ এর উদাহরণ হলো, মুনাফিকদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন- (أيديهم ويقبضون - আর তারা নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখে।) এখানে উদ্দেশ্য: 'আল্লাহর রাস্তায় তাদের দান না করা।' আল্লামা শামসুদ্দিন বারমাবি বলেন-এখান থেকে এটা উদ্দেশ্য নেওয়া যাবে না যে, তারা হাত রেখেই বাইআত করেছিল। কারণ, এটা দ্বারা উদ্দেশ্য তারা বাইআতের সময় হাত দিয়ে ইঙ্গিত করেছে, স্পর্শ করে নি।৫৭০
দ্বিতীয় দিক: আমরা যদি ধরেও নিই যে, হাতে হাত রেখে ওই বাইআত হয়েছিল, তাহলে আমরা উত্তরে বলব-হাতে হাত রাখার মাঝে অন্য কোনো কিছু আড়াল ছিল; যেমনটা হাফিজ আইনি রহ. উমদাতুল কারিতে পরস্পর বিরোধপূর্ণ বর্ণনায় মাঝে সামঞ্জস্য বিধান দিতে গিয়ে বলেছেন।
তৃতীয় দিক: নারীদের বাইআতগ্রহণে যতগুলো সুস্পষ্ট ও সুসাব্যস্ত বর্ণনা পাওয়া যায়, সবগুলো বর্ণনা থেকে এই কথাই জানা যায় যে—নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদের সাথে হাত লাগান নি। যেমন—
এক. আম্মাজান আয়িশা রা.-এর হাদিস গিয়েছে, যেখানে হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি বলেছেন—
لا والله ما مست يد رسول الله يد امرأة قط غير أنه بايعهن بالكلام
আল্লাহর কসম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত কখনো কোনো (গাইরে মাহরাম) নারীর হাত স্পর্শ করে নি; তবে, তিনি শুধু কথার মাধ্যমে তাদের বাইআত করেছেন।
দুই. আব্দুল্লাহ ইবনু আমর থেকে বর্ণিত—রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইআতের ক্ষেত্রে নারীদের সাথে মুসাফাহা করতেন না (হাতে হাত রাখতেন না)। ৫৭১
তিন. উমাইমা বিনতু রাকিকা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন—
আমি কয়েকজন নারীর সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বাইআত গ্রহণ করার জন্য আসি। তখন নবীজি আমাদের বললেন— (তোমরা বাইআত গ্রহণ করো) যে বিষয় তোমরা করতে পার ও সাধ্য রাখ। আমি নারীদের সাথে মুসাফাহা করি না। ৫৭২
তো, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে যা বললেন তা উম্মু আতিয়্যা রা.-এর ব্যাখ্যার (যা নাবাহানি করেছেন) বিপরীত। আর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা ও বাণী সর্বাবস্থায় অন্য যে কারও কথার ওপর অগ্রধিকারপ্রাপ্ত।
এই সমস্ত সহিহ ও সুস্পষ্ট দলিলগুলো প্রমাণ করে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইআতের ক্ষেত্রে কোনো নারীর সাথে মুসাফাহা করেন নি। সুতরাং মুসলিম হলে তার জন্যেও উচিত নয়, এই দলিল ছেড়ে দিয়ে উম্মু আতিয়্যা রা.-এর হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা গ্রহণ করবে। তাছাড়া ওই হাদিসে তো মুসাফাহা বা হাত স্পর্শ করার কথা উল্লেখই নেই।
শাইখ আলবানি রহ. বলেন—মোটকথা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলঅইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনো সহিহ সূত্রে একথা বর্ণিত হয় নি যে, তিনি কখনো কোনো নারীর সাথে মুসাফাহা করেছেন। এমনকি বাইআতের ক্ষেত্রেও না, সাক্ষাৎ গ্রহণের সময় মুসাফাহা করা তো দূরের কথা; কিন্তু নারীর সাথে মুসাফাহা জায়িজ করার জন্য মুসাফাহার দলিল হিসাবে পেশ করা। যে-সকল সহিহ হাদিসে মুসাফাহার উল্লেখ নেই, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া, নিশ্চয়ই এখানে কোনো স্বার্থ আছে, যা কোনো মুমিন মুখলিস বান্দার পক্ষে সম্ভব নয়।১৭৩
দলিল - ০২: নাবাহানি বলেন—নারীর হাত তার সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়, তদুপরি খাহেশাত না থাকলে তাকানো হারাম নয়। সুতরাং তার সাথে মুসাফাহা করাও হারাম নয়।১৭৪
এই দাবির উত্তর : আহলে ইলমের নিকট নারীর হাত সতর না হওয়া এটা প্রমাণ করে না যে, নারীকে স্পর্শ করা, তার সাথে মুসাফাহা করা জায়িজ; বরং এ-ব্যাপারে তো উলামায়ে কিরামের ইজমা আছে যে, প্রয়োজন ছাড়া নারীর, চেহারা, হাত স্পর্শ করা হারাম। যদিও এই দুটো অঙ্গ সতরভুক্ত নয়, যেমনটা ইতিপূর্বে উলামায়ে কিরামের অভিমতে আলোচিত হয়েছে। প্রার্থক্য শুধু এতুটুকু যে প্রয়োজনের কারণে হাত ও চেহারা খুলে রাখা যায়, না-হয় তাদের জন্য কষ্ট হয়ে যাবে; কিন্তু এই প্রয়োজনটা স্পর্শ করার ক্ষেত্রে নেই।
দলিল - ০৩ : ইবনু কাসির রহ. তার তাফসিরে ইবনু আব্বাস রা. থেকে একটা দীর্ঘ হাদিস উল্লেখ করেন। যারা নারীর সাথে মুসাফাহাকে জায়িজ বলেন, তারা এই হাদিস দিয়ে তাদের পক্ষে দলিল হিসেবে পেশ করেন। হাদিসটির কিছু অংশ হলো—
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নারীদের বাইআত গ্রহণ করছিলেন, তখন আবু সুফইয়ানের স্ত্রী হিন্দার মুখ আবৃত ছিল; কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে চিনে ফেলেন। নবীজি তাকে ডাক দিলে হিন্দা নবীজির হাত ধরে ফেলে।
নবীজি তাকে বলেন—তুমি সেই হিন্দা!
তখন হিন্দা বলে—আল্লাহ তো পূর্বের সব গুনাহ মাফ কর দিয়েছেন!
ফলে রাসুলুল্লাহ সাললাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ছেড়ে দেন। তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকেন।১৭৫
এই দাবির খন্ডন: যারা এই হাদিস দিয়ে দলিল পেশ করেছেন, তারা মূলত ইবনু কাসির রহ.-এর মন্তব্য ছাড়াই দলিল পেশ করেছেন—যা আমানতদারিতার পরিপন্থি। আল্লামা ইবনু কাসির রহ. যখন এই হাদিসটি উল্লেখ করেন, তখন হাদিস সম্পর্কে চুপ থাকেন নি, বরং হাদিসের দুর্বলতা ও সাব্যস্তহীনতা স্পষ্ট করে ব্যস্ত করে বলেন—এই হাদিসটি 'গরিব', তাছাড়া এর কিছু অংশ 'মুনকার'! আল্লাহই ভালো জানেন।
কারণ, আবু সুফইয়ান ও তার স্ত্রী যখন ইসলাম গ্রহণ করন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এড়িয়ে যান নি; বরং তাদের প্রতি আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা প্রকাশ করেছেন। এতটুকুই বিষয়ই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে উল্লেখ করার ছিল।
দলিল - ০৪ : তাদের আরেকটা দলিল, আনাস ইবনু মালিক রহ.-এর হাদিস। তিনি বলেন—
إن كانت الأمة من أهل المدينة لتأخذ بيد رسول الله صلى الله عليه وسلم فما ينفع يده من يدها حتى تذهب به حيث شاءت من المدينة في حاجتها رواه ما جاء باب البراءة من الكبر والتواضع
মদিনার লোকেদের দাসীরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত ধরে রাখত। অতঃপর তার হাত ধরে মদিনার যেখানে ইচ্ছা প্রয়োজনে যেত, এর আগ-পর্যন্ত নবীজি তার হাত ছাড়তেন না। ৭৬
এই দাবির উত্তর : এই দাবির উত্তরে আমরা তিনটি বিষয় উপস্থাপন করব—
এক. এই হাদিস 'জয়িফ'। কারণ, এই হাদিসের সনদে আলি ইবনু জায়িদ ইবনি জাদআন আছেন, যিনি দুর্বল রাবি। 'মাজমাউজ জাওয়ায়িদ' কিতাবে আল্লামা হাইসামি রহ. এমনটাই বলেছেন।
দুই. হাত ধরা দ্বারা এর 'আবশ্যকীয়' অর্থ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ অনুগত হওয়া, কোমলতা প্রদর্শন করা (কারণ কেউ যখন কারও হাত ধরে তখন সে তার অনুগত হয়ে যায়, সে যে দিকেই নিয়ে যায়, ওই দিকেই যায়)। ইবনু হাজার রহ. এমনই বলেছেন। ৭৭
তিন. এই হাদিস দ্বারা উদ্দেশ্য কি, সেটা বোঝার জন্য আমরা ইমাম আহমাদ রহ.-এর বর্ণনা দেখতে পারি, তার বর্ণনায় আছে—
إن كانت الوليدة من ولائد أهل المدينة تجي تأخذ بيد رسول الله صلى الله عليه وسلم فما ينفع يده من يدها حتى تذهب به حيث شال ...
মদিনাবাসী মেয়েরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে তাঁর হাত ধরে রাখত। নবীজি তাদের হাত ছাড়তেন না, যতক্ষণ না তারা যেখানে ইচ্ছা সেখানে নবীজিকে নিয়ে যায়।২৭৮
এখানে হাদিসে وليدة শব্দ আছে (পূর্বের হাদিসে أمة শব্দটি ছিল যার অর্থ : দাসী) যার অর্থ ছোটো মেয়ে শিশু ভাষাবিদ ফায়ুমি বলেন, الوليد অর্থ নবজাতক বহুবচন ولدان শব্দটি দাসী অর্থেও ব্যবহৃত হয়, তখন এর বহুবচন হয় أولاءد সুতরাং পূর্বের হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় না, যে গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে নারী মুসাফাহা করতে পারবে।
তাছাড়া মাকাল ইবন ইয়াসার রা.-এর হাদিসে এসছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
لأي يطعن في رأس أحدكم بمخيط من حديد خير له من اي بس امرأة لا تحل له
তোমাদের কারও মাথায় লোহার সুই দিয়ে আঘাত করা উত্তম এমন নারীর স্পর্শ করা থেকে যে তার জন্য হালাল নয়।২৭৯
আল্লাহ তাআলাই সঠিক বিষয়ে অধিক অবগত।
নির্ভরযোগ্য বড়ো বড়ো কিতাবের আলোকে এই ইলমি আলোচনা জানার পর একজন গবেষক যিনি ইনসাফের দৃষ্টিতে দেখেন, নিজের মত ও প্রবৃত্তি থেকে দূরে থাকেন-এই আলোচনায় উল্লিখিত শরয়ি দলিলগুলো মেনে নিতে বাধ্য। এরপর তিনি আর কোনো সন্দেহ বা সংশয়ের মাঝে থাকবেন না যে, গাইরে মাহরাম নারীর সাথে মুসাফাহা করা না-জায়িজ, তাছাড়া সমস্ত উলামায়ে কিরাম এক্ষেত্রে একমতও পোষণ করেছেন। কেউ এ থেকে পিছপা হন নি। এই রকম মেনে নেওয়াই মুমিনদের শান, যারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পূর্ণ অনুসরণ করতে চায়।
টিকাঃ
* সূত্র: আল-মাবসুত, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ১৫৪
** সূরা মুমতাহিনা, আয়াত: ১২
*** সহিহ বুখারি: ২৭১৩
*** মুসনাদু আহমাদ: ২৭০০৮
*** ফাতহুল বারি, খণ্ড: ১২,
***সূত্র: আল-মাবসুত, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ১৫৪
**তুহফাতুল ফুকাহা, খণ্ড: ৩.
*** তাবয়িনুল হাকায়িক, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ১৮
*** আল-মুনতাফাফা, শারহুল মুআত্তা, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৩০৮
**০ আসহালুল মাদারিক, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৩৭০
>> আল-আজকার: ২২৮
*** সত্র; ফাতহুল বাবি, খণ্ড
২৫৫ তারকুত তাসমির, খণ্ড : ৭, পৃষ্ঠা : ৪২-৪২
২৫৬ কাশফুল কিনা, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১৫৪
২৫৭ আল-ইনসাফ ফি মারিফাতির রাজਿਹ মিনাল খিলাফ, খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ৫৯
২৫৮ আর রাজউন নাদিয়্যি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা :
৫৬৮ সহিহ বুখারি: ৭২১৫, অনুচ্ছেদ: নারীদের বাইআত গ্রহণ。
৫৬৯ উমদাতুল কারি, খণ্ড: ১৯, পৃষ্ঠা: ২৩১
৫৭০ আল-লামিউস সহিহ বি-শারহিল জানিয়িত মন্ত্রিরatch পৃষ্ঠা: ১৫৮
৫৭১ মুসনাদু আহমাদ: ৬৯৯৮
৫৭২ সুনান ইবনি মাজাহ: ২৮৭৪, অনুচ্ছেদ: নারীদের বাইআত গ্রহণ。
*১৭৩ সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহা: ২৫৫
*১৭৪ আন-নিজামুল ইজতিমায়ি ফিল ইসলাম: ৩৫
*১৭৫ তাফসিরু ইবনি কাসির, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ১২৬
২৭৯ সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১৭৭, অনুচ্ছেদ: অহংকার ও বিনয় থেকে মুক্ত হওয়া。
** ফাতহুল বারি, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা
* মুসনাদু আহমাদ : ১২৭৮০
** মুজামুত তাবারানি, তার সব রাবি সহিহ, মাজমাউজ জাওয়ায়িদ, আল্লামা হাইসামি, পরিচ্ছেদ • একান্তে মিলিত হওয়ার নিষেধ করা
📄 মাহারাম বা স্বামী ছাড়া নারীর সফর করা
বর্তমান যুগের আরেকটা রোগ হলো-এ যুগের নারীরা মাহরাম বা স্বামী ছাড়া সফর করে। অথচ উলামায়ে কিরাম সবাই একমত যে, মাহরাম বা স্বামী ছাড়া নারী সফর করা নাজায়িজ। এর স্বপক্ষে বহু ‘নস’ আছে। কয়েকটি উল্লেখ করা হলো-
এক। আবু সায়িদ খুদরি রা.-এর হাদিস, যিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ১২টি গাজওয়ায় অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে চারটি বাণী শুনেছি, যা আমার খুব মনঃপূত হয়েছে। নবীজি বলেন-
* ০১. কোনো নারী স্বামী বা মাহরাম ছাড়া দুই দিনের দূরত্বে সফর করতে পারবে না।
* ০২. ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এ দুই দিনে রোযা রাখা যাবে না,
* ০৩. সূর্য উদয়ের আগ পর্যন্ত ফজরের নামাযের পর কোনো নামাজ পড়া যাবে না।
* ০৪. আর সূর্যাস্তের সময় মাগরিবের নামাজ পড়া যাবে না। যতক্ষণ না তা ডুবে যায়।২৮০
দুই। ইবনু আব্বাস রা.-এর হাদিস, তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন-
لا يخلون رجل بامرأة ولا تسافرن امرأة إلا ومعها محرم ...
কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে একান্তে মিলিত না হয়। আর কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া সফর না করে।২৮১
তিন। ইবনু উমার রা. বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
لا تسافر المرأة ثلاث أيام إلا مع ذي محرم
কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া তিন দিনের দূরত্বে সফর না করে।২৮২
চার। আবু হুরাইরা রা. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
ما يحل لامرأة تؤمن بالله واليوم الآخر أن تسافر مسيرة يوم وليلة ليس معها حرمة যে নারী আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন মাহরাম ছাড়া একদিন ও একরাতের দূরত্বে সফর না করে।২৮০
পাঁচ। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রা. বর্ণনা করেন-
أن رسول الله صلى الله عليه وسلم استند إلى بيت فوعظ الناس وذكرهم, قال لا يصلي أحد بعد العصر حتى الليل ولا بعد الصبح حتى تطلع الشمس ولا تسافر المرأة إلا مع ذي محرم مسيرة ثلاث.....
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটা ঘরের দিকে হেলান দিয়ে লোকদের উপদেশ দেন; নবীজি বলেন-কেউ যেন আসরের পর রাত নামা পর্যন্ত নামাজ না পড়ে, ফজরের পর সূর্যদয়ের আগ পর্যন্ত (নামাজ না পড়ে) আর কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া তিন (দিনের) দূরত্বে সফর না করে। ১৮৪
ছয়। আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
لا تسافر امرأة بريدا إلا ومعها ذو محرم কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া কয়েক মাইলের দূরত্বে সফর না করে। ১৮৫
সাত। ইবন আব্বাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
لا تسافر المرأة ثلاثة أميال إلا مع زوج أو مع ذي محرم স্বামী বা মাহরাম ছাড়া কোনো নারী যেন তিন মাইলের দূরত্বে সফর না করে।
তখন ইবনু আব্বাস রা.-কে বলা হলো-লোকেরা তো বলে, তিন দিন। তিনি বলেন-এটা নিছক তাদের ধারণাবশত। ১৮৬
ইবনু বাতাল বলেন-দূরত্বের পরিমাণের ক্ষেত্রে হাদিসের বিভিন্নতা অর্থাৎ কোথাও একদিন, একরাত, কোথাও তিন দিন কোথাও বা দুই দিন উল্লেখ আছে। তো এই মতভিন্নতার কারণ হলো- প্রশ্নকারীদের প্রশ্নের ধরন অনুযায়ী নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিয়েছেন; যেমন-একজন প্রশ্নকারী জিজ্ঞাসা করল, মাহরাম ছাড়া কি কোনো নারী এক দিন ও এক রাতের দূরত্বে সফর করতে পারে? তখন নবীজি বললেন-না।
আবার আরেকজন দুই দিনের দূরত্বের সফর নিয়ে জিজ্ঞাসা করল। তখন নবীজি বললেন-না।
আবার আরেকজন তিন দিনের বিষয়ে বিজ্ঞাসা করলেও নবীজি বললেন-না। এভাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রত্যেকে যা শুনেছে তাই বর্ণনা করেছেন। এটা পরস্পর বিরোধপূর্ণ বর্ণনাও নয়, রহিত ও নয়। কারণ, এখানে মূল বিষয়টি হলো, মহরাম ছাড়া নারীর সফর কোনোভাবেই বৈধ নয়, তদ্রুপ মাহরাম ছাড়া অন্য কারও সাথে একান্তে থাকাও বৈধ নয়। কেননা, 'ইল্লত' ও 'কারণের' ক্ষেত্রে এক রাত ও তিন রাত উভয়টাই সমান। ইল্লত বা কারণ হলো, এক রাত ও তিন রাতের ক্ষেত্রেই মহরাম ছাড়া রাতের অন্ধকারে রাত্রিযাপন বা একান্তে মিলিত হওয়া, সফরসঙ্গীদের ঘুমিয়া যাওয়া, পাওয়া যাচ্ছে, যার ফলে তৃতীয় পক্ষ হয়ে শয়তান উপস্থিত হয়। তাই (খারাপ কাজের) মাধ্যম ও উপায় এবং উপকরণটা মজবুত হয়ে গেল। জ্ঞান ও দ্বীনের ক্ষেত্রে অপরিপক নারীদের ব্যাপারে আশঙ্কাও বেড়ে গেল। (তাই তিন দিনের ক্ষেত্রেও জায়িজ নেই, একদিনের ক্ষেত্রেও জায়িজ নেই।) তাছাড়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো বলে দিয়েছেন-
لا يخلون رجل بامرأة ليست بذي محرم منهم ....
মাহরাম ছাড়া কোনো নারীর সাথে যেন কোনো পুরুষ একা না থাকে।৫৮৭
ইমাম নববি মুসলিম শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন-এ সকল হাদিস সহিহ, তবে এ হাদিসগুলোতে সফরের সবচেয়ে কম সময়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় নি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও সবচেয়ে কম সময়ের সফরের পরিমাণের কথা বর্ণিত হয় নি। মোটকথা, সফরের যেটাকেই মানুষ সফর বলে মনে করে, সেটা থেকেই মাহরাম বা স্বামী ছাড়া নারীকে নিষেধ করা হবে। তিনদিন হোক, দুই দিন হোক, একদিন অথবা কয়েক মাইল হোক কিংবা অন্য কোনো সংখ্যা হোক। যার প্রমাণ, পূর্বে বর্ণিত ইবনু আববাস রা.-এর মুতলাক (শর্তহীন) হাদিস; যা সব ধরনের সফরকেই শামিল করে। আল্লাহই ভালো জানেন। ১৮৮
এ সকল হাদিসে সফর দ্বারা আভিধানিক অর্থ উদ্দেশ্য (শরয়ি অর্থ নয়)। অর্থাৎ দূরবর্তী জায়গা অতিক্রম করা। মোল্লা আলি কারি 'মিরকাতে' এমনটাই বলেছেন। তিনি 'দারুল কুফর' ৫৮৯ থেকে মাহরাম ছাড়া নারীর হিজরত করাকে হাদিসে বর্ণিত নিষেধ থেকে বের করেন। অর্থাৎ এটাকে জায়িজ বলেছেন। যার দলিল, আদি ইবনু হাতিম রা.-এর হাদিস, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
يوشك أن تخرج الظعينة من الحيرة تؤم البيت لا جوار معها لا تخاف إلا الله
হিরা এলাকা থেকে উটে আরোহিত নারী কাবার উদ্দেশ্যে বের হবে, তার সাথে কোনো সঙ্গী থাকবে না। (অথচ) সে আল্লাহ ছাড়া কারও ভয় করবে না।২৯০
কাফিরদের হাতে বন্দিনীও মাহরাম ছাড়া পালিয়ে আসতে পারবে। কারণ, যে হিজরত করবে বা যে বন্দিনী পালিয়ে আসবে, তার এই ‘আসা’ সফর নয়; কারণ, তারা কোনো নির্দিষ্ট স্থানের উদ্দেশ্যে বের হয় না; বরং কোনোভাবে জুলুম-নির্যাতনের ভয় থেকে মুক্তি পাওয়াই মূল উদ্দেশ্য থাকে। এজন্যই তারা যদি কোনো নিরাপদ স্থান যেমন মুসলিম সেনাক্যাম্প দেখতে পায়, তাহলে তাদের ওপর ওয়াজিব সেখানে অবস্থান করা, স্বামী বা মাহরাম ছাড়া সেখান থেকে সফর না করা। এখন যদি তারা নির্দিষ্ট কোনো স্থানকে উদ্দেশ্য হিসাবে গ্রহণ করে, তাহলে তাদের এ উদ্দেশ্য গ্রহণ বা নিয়ত ধর্তব্যও হবে না। সফর বলেও বিবেচিত হবে না। কারণ, তাদের এ বাহ্যিক অবস্থা অর্থাৎ মুক্তি পাওয়ার আশা ওই উদ্দেশ্যকে নাকচ করে। (আর মুক্তি পাওয়ার আশা সফরের পরিপন্থী)। আর যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, এটা সফর, তবুও বলতে হবে—এটা মাজবুরির সফর (অর্থাৎ এ সফর জায়িজ)। কারণ, সফর অবস্থায় যে ফিতনার (অশ্লীল কাজে জড়িয়ে পড়া) (মাহরাম ছাড়া) আশঙ্কা আছে সেটা দারুল হারবের ফিতনার (জুলুম-নির্যাতন) চেয়ে অনেক লাঘব, তাই এ সফর জায়িজ বলে বিবেচিত হবে এই মূলনীতির আলোকে—
أخف المفسدتين يجب ارتكابها عند لزوم إحداهما
যখন দুটো ক্ষতিকর বিষয়ের যে কোনো একটা ক্ষতিকর বিষয় আশ্যকীয়, তখন কম ক্ষতিকর বিষয়টা করা ওয়াজিব।
মোটকথা, এখানে সফর জায়িজ হচ্ছে মজবুরি ও উপায়হীনতার কারণে; যাতে এমন ক্ষতি দূর করা সম্ভব হয়, যা মাহরাম ও স্বামী ছাড়া ‘দারুল ইসলামে’ (ইসলামি রাষ্ট্র) সফর করার ক্ষতির চেয়ে বেশি ক্ষতিকর। ‘ফাতহুল কাদির’ ও ‘আল-বাহরুর রায়িকে’ এমনই উল্লেখ করা হয়েছে।১৯১
কতটুকু দূরের সফরে স্বামী বা মাহরাম ছাড়া সফর করা যাবে না—এ-ব্যাপারে উলামায়ে কিরামের বিভিন্ন মত:
এক. ইমাম নাখায়ি, শাবি, তাউস ইবনু কাইসান এবং জাহিরি মাজহাবের মত—নারী নিজে নিজে কোনো সফরই করতে পারবে না, কাছে হোক বা দূর। যদি-না তার সাথে স্বামী বা মাহরাম থাকে।
তাদের দলিল ওই সকল হাদিস, সেগুলো মুতলাক বা শর্তহীনভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন, ইবনু আব্বাস রা.-এর হাদিস।
দুই. আতা, সাঈদ ইবনু কাইসান এবং জাহিরি মাজহাবের কয়েকজনের নিকট—১২ মাইলের কম হলে সফর করা জায়িজ, আর যদি ১২ মাইল বা এর বেশি হয়,
তাহলে মাহরাম বা স্বামী ছাড়া সফর করা জায়িজ নয়। তাদের দলিল সুনানু আবি দাউদে বর্ণিত আবু হুরায়রা রা.-এর হাদিস।
তিন. ইমাম আউজায়ি, লাইস, মালিক এবং শাফিয়ি রহ.-এর মাজহাব-একদিনের কম দূরত্বের হলে সফর করতে পারবে। এর বেশি হলে স্বামী বা মাহরাম ছাড়া সফর করতে পারবে না। তবে ইমাম মালিক ও শাফিয়ি রহ.-এর মাজহাবে ফরজ হজের জন্য স্বামী বা মাহরাম ছাড়াই নারী সফর করতে পারবে। যদিও তার এলাকা ও মক্কার মাঝে সফরের দূরত্বের পরিমাণ থাকে। অর্থাৎ তারা একা একা সফর করার নিষিদ্ধতার কথা শুধু ওই সফরের ক্ষেত্রেই বলেন, যা ওয়াজিব নয়।
তাদের দলিল সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আবু হুরাইরা রা.-এর হাদিস।
চার. ইমাম জুহরি, হাসান আল-বাসরি ও কাতাদা রহ.-এর মত-দুই দিন ও রাতের কম দূরত্বে সফর করতে পারবে। আর যদি দুই দিন দুই রাত হয়, তাহলে মাহরাম বা স্বামী ছাড়া সফর করতে পারবে না।
তাদের দলিল, সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আবু সায়িদ খুদরি রা.-এর হাদিস।
পাঁচ. ইমাম সাউরি, আ'মাশ, আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.-এর মাজহাব-কসরের সফরে অর্থাৎ তিন দিনের দূরত্বে মাহরাম বা স্বামী ছাড়া সফর করতে পারবে না।
তাদের দলিল, সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রা.-এর হাদিস। হানাফি মাজহাবে হজের সফর হোক বা অন্য যে কোনো সফর হোক কোনো পার্থক্য নেই। কোনো অবস্থাতেই মাহরাম বা স্বামী ছাড়া সফর করা জায়িজ নয়। এমনটাই উমদাতুল কারিতে রয়েছে। ১৯২
এ সকল মাজহাব, মত ও দলিল-প্রমাণ বিশ্লেষণের জন্য দেখা যেতে পারে আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি হানাফি রচিত নুখাবুল আফকার ফী শারহি মাআনিল আসার, অধ্যায় : হজ (অনুচ্ছেদ, নারী যদি মাহরাম না পায়, তাহলে কি তার ওপর ফরজ হজ আদায় ওয়াজিব হবে?)।
এই মতই (পঞ্চম মত) হানাফি মাজহাবের নিকট প্রসিদ্ধ। এ-জন্যে হিদায়া গ্রন্থপ্রণেতা হজ অধ্যায়ে বলেন-সফরের নির্দিষ্ট পরিমাণের কম দূরত্বে একজন নারীর জন্য 'মাহরাম ছাড়া' বের হওয়া বৈধ নয়।
কিন্তু আল্লামা ইবনু আবিদিন বলেন-আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ রহ. থেকে বর্ণিত আছে, একদিনের দূরত্বে বের হওয়া মাকরুহ এবং এই ফিতনা ফাসাদের যুগে এই মতের ওপরই ফতোয়া দেওয়া উচিত।১৯০
এমতকে সমর্থন করে সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিস-
لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ عَلَيْهَا وَفِي
যে নারী আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, তার জন্য বৈধ নয়, মাহরাম ছাড়া একদিন ও এক রাতের দূরত্বে সফর করা।
(এটা সহিহ বুখারির শব্দ।) সহিহ মুসলিমে আছে- (مسيرة ليلة) এক রাত্রের দূরত্ব, আরেক বর্ণনায় আছে (يوم) একদিন ২১৪
উপরের আলোচনা থেকে জানা গেল-বর্তমান যুগের ফাতওয়া অনুযায়ী মাহরাম বা স্বামী ছাড়া কোনো নারী একদিনের দূরত্বে সফর করতে পারবে না। আল্লামা ইবনু আবিদিন বলেন-মাহরাম বলা হয় এমন কাউকে, যার সাথে কখনোই বিবাহ করা বৈধ নয়। চাই সেটা আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে হোক বা দুধপানের সূত্রে, কিংবা বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে।
তুহফাতুল ফুকাহাতে এমনই বলা হয়েছে। জহিরিয়্যা নামক কিতাবে উল্লেখ আছে, যার সাথে জিনা করেছে তার মেয়েও জিনাকারীর মাহরাম বলে গণ্য হবে; কিন্তু শারহুল লুবাব গ্রন্থে বলা হয়েছে- হিদায়া গ্রন্থের ব্যাখ্যাকার আল্লামা কাওয়ামুদ্দিন বলেন, জিনার ভিত্তিতে মাহরাম হলেও কয়েকজন উলামায়ে কিরামের নিকট তার সাথে সফর করা যাবে না, এই মত পোষণ করেছেন। ইমাম কুদুরি রহ. এবং এটাই আমাদের মত। আর এর মাধ্যমেই দ্বীনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা যাবে, অপবাদ থেকে দূরে থাকা যাবে।
সাইয়িদ আবু সাউদ নাফাকাতুল বাজ্জাজিয়া গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি পেশ করেন যে, বর্তমান যুগে নারী তার দুধভাইয়ের সাথেও সফর করতে পারবে না। অর্থাৎ ফিতনা ফাসাদের কারণে এটা করবে না। আমি-আল্লামা ইবনু আবিদিন-বলি, এ মত সমর্থন করে আরেকটা মাসআলা অর্থাৎ দুধভাইয়ের জন্য দুধবোনের সাথে একান্তে মিলিত হওয়া মাকরূহ। যেমন-ছেলের যুবতী স্ত্রীর সাথে শ্বশুরের একা থাকা মাকরূহ। অতএব, যুবতী স্ত্রীরও শ্বশুরের সাথে সফরে বের না হওয়ার কারণ, সফরও এক প্রকার 'একা' থাকার মতোই।১১২
মুহরাম হওয়ার জন্য শর্ত হলো-
* ০১. আকেল বা বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া;
* ০২. বালেগ হওয়া;
* ০৩. মাজুসি (অগ্নিপুজারি) না হওয়া;
০৪. ফাসেক না হওয়া;
০৫. স্বামীর ক্ষেত্রেও এ শর্তগুলো পাওয়া যেতে হবে। ১৯৯
আল-মুহিতুল বুরহানি নামক কিতাবে, ইমাম কুদুরি রহ. বলেন—মাহরাম যদি মাজুসি হয়, যে তার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক করাকে বৈধ মনে করে, তাহলে তার সাথে সফর করা যাবে না। কারণ, তার লোলুপ দৃষ্টি নারীর ওপর পড়াটাই স্বাভাবিক। এ-জন্যই নারী তার মাহরাম মাজুসির সাথে একা থাকতে পারে না। সুতরাং সফরও করতে পারবে না। কুদুরি রহ. এটাও বলেন যে—কোনো মুসলিম-মাহরাম-এর ব্যাপারেও যদি খারাপের আশঙ্কা থাকে, তার সাথেও সফর করা যাবে না। কারণ, মাহরাম সঙ্গে থাকার যে উদ্দেশ্য সেটাই তার থেকে পাওয়া যায় না।
অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর থাকা না থাকা সমান। তদ্রুপ মস্তিষ্ক-বিকৃতির অধিকারী মাহরামের থাকাও বিবেচ্য নয়। কারণ, মাহরাম সঙ্গে থাকার উদ্দেশ্য হলো—নিরাপত্তা, যা তাদের দ্বারা পাওয়া যায় না। ১৯৭
এটাই মূলত বিধান যদিও বর্তমান যুগে সবাই এ বিধান পালনে শিথিলতা করে! আফসোসে বিষয় যে, অনেক উলামায়ে কিরামও এ বিষয়ে শিথিলতা করে থাকেন; অথচ তাদেরকেই অন্যদের আদর্শ মনে করা হয়। তাহলে শরিয়তপালনে অন্যদের কী দশা হবে! অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজকে মুসলিম দেশগুলোতে খুব কমই এমন পাওয়া যায়, যারা শরিয়তের আদেশ নিষেধের সামনে অবিচল। তবে আল্লাহ তাআলার অনেক শুকরিয়া যে (হাদিসের ভাষ্যনুযায়ী) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একদল উম্মত সদা সর্বদা আল্লাহ তাআলার আদেশের সামনে অবিচল, যারা তাদের থেকে সরে যায় বা বিরোধিতা করে, তারা ওই দলের কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। একসময় আল্লাহ তাআলার ফায়সালা আসবে, আর তারা সবার ওপর বিজয় লাভ করবে। আল্লাহ তাআলার কাছে ফরিয়াদ—তিনি যেন আমাদেরকেও এই মুবারাক কাফেলায় শামিল করেন। তিনিই ফরিয়াদ পাওয়ার যোগ্য। আল্লাহ তাআলাই সঠিক বিষয়ে অধিক অবগত।
টিকাঃ
২৮০ সহিহ বুখারি: ১৯৯৫
২৮১ সহিহ বুখারি: ৩০০৬
২৮২ সহিহ বুখারি: ১০৮৬
২৮০ সহিহ বুखারি: ১০৮৮ অনুচ্ছেদ: কৃত রাকাত নামাজ কসর করবে।
*** মুসনাদু আহমাদ : ৬৭১২
*** সুনানু আবি দাউদ : ১৭২৫
মুজামুত তাবারানি, কাবির: ১২৬৫২
৫৮৭ শারহুল বুখারি, ইবনু বাতল: ৩
৫৮৮ মুসলিম শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ, ইমাম নববি, অনুচ্ছেদ: মাহরামসহ হজ বা অন্যকোথাও নারীর সফর করা..
৫৮৯ সংক্ষিপ্তভাবে দারুল কুফরের পরিচয় হলো-এমন রাষ্ট্র, যার চারপাশে কোনো মুসলিম দেশ নেই, যেখানে ইসলামের বিধিবিধান অচল, সেটাকেই দারুল কুফর বলে।
২৯০ মিরকাত, মানাসিক অধ্যায়,
*** আল-বাহরুর রায়িক, খণ্ড:
২১২ উমদাতুল কারি, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ১২৬
২১০ সূত্র: শারহুল লুবাব。
*** সূত্র: রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৫৮
* সূত্র: রদ্দুল মুহতার
১৯৯ রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হজ。
১৯৭ আল-মুহিতুল বুরহানি, খণ্ড: