📄 হাদিসে নববির দলিল
উকবা ইবনু আমের জুহানি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إياكم والدخول على النساء فقال رجل من الأنصار يا رسول الله أفرأيت الحمو؟ قال الحمو الموت...
তোমরা নারীদের সামনে যাওয়া থেকে সাবধান হও! তখন একলোক দাঁড়িয়ে বলল-ইয়া রাসুলাল্লাহ, যদি দেবর হয়, তবুও? তখন নবীজি বললেন-আরে! দেবর তো মৃত্যু (র মত ভয়ঙ্কর!)।
১৬ সূত্র: সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম ও অন্যান্য। ইমাম বুখারি রহ. এই হাদিস 'বিয়ে' অধ্যায়ে এনেছেন; যার পরিচ্ছেদের শিরোনাম ছিল 'মাহরাম ছাড়া কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে থাকতে পারবে না'। আর ইমাম মুসলিম রহ. এই হাদিস 'সালাম' অধ্যায়ে এনেছেন, যার পরিচ্ছেদের শিরোনাম: 'কোনো আইরে মাহরাম নারীর সামাদ থাকা ও তার কাছে আসা হারাম'।
হাদিসে حمو দ্বারা উদ্দেশ্য-সামীর নিকটাত্মীয়, যে স্ত্রীর মাহরাম নয় যেমন-দেবর, দেবরের ছেলে, চাচাশ্বশুর এবং এ-রকম আরও যারা আছে তো, হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাহজিরের শব্দ (সতর্ককীরণ বাচক) দ্বারা কথা শুরু করে বলেন-
إياكم والدخول على النساء
এখানে নারীদের সাথে (নির্জনে) মিলিত হওয়া থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব কঠিনভাবে সতর্ক করেছেন। পরে যখন আনসার সাহাবি স্বামীর নিকটাত্মীয় সম্পর্কে প্রশ্ন করল যে-সে ভাবির সামনে যেতে পারবে কি না, তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সামনে যাওয়াকেই 'মৃত্যু' বলে ব্যক্ত করেছেন।
মূলত 'মৃত্যু' হলো দুনিয়াতে মানুষের জীবনে ঘটা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়। সুতরাং স্ত্রীর সামনে স্বামীর নিকটাত্মীয়র প্রবেশ করা সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মন্তব্য-দেবর তো মৃত্যু-নিয়ে আপনারা একটু চিন্তা করে দেখেন, যাতে বুঝতে পারেন যে, গাইরে মাহরাম নারীদের সাথে মেলামেশা করাই 'মৃত্যু' সদৃশ।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটাকে 'মৃত্যু' বলেছেন; কারণ হলো, এই প্রবেশ করাই জিনার দিকে নিয়ে যায়; যা মানুষের সম্মান-মর্যাদা ধূলিস্মাৎ করে দেয়, ধার্মিকতা নিঃশেষ ফেলে। এটা ধার্মিকতা ও আদবের মৃত্যু-যা শরীর থেকে রুহ বের হওয়ার স্বাভাবিক মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর; কারণ, স্বাভাবিক মৃত্যু যদি কোনো নেককার বান্দার হয় তাহলে সে আরও ভালো অবস্থা ও নেয়ামত এর সান্নিধ্যে গমন করে পক্ষান্তরে...।
উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, যারা সহশিক্ষার দিকে আহ্বান করে, তারা মূলত মৃত্যুর দিকেই টেনে নেয়! স্পষ্ট যে এই ক্ষতি ও খতরনাকের দিকে তাকিয়েই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটাকে 'মৃত্যু' বলেছেন!
ইমাম মুসলিম রহ. এই হাদিস লাইস ইবনু সাদের বর্ণনায় উল্লেখ করে বলেন, الحمو মানে দেবর এবং স্বামীর আত্মীয়দের মধ্য তার মতো আরও যারা আছে; যেমন-চাচার ছেলে।
ইমাম নববি রহ. সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থে এই হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, الحمو الموت দ্বারা উদ্দেশ্য হলো-দেবর ও স্বামীর অন্যান্য আত্বীয়দের থেকে যে পরিমাণ গুনাহের আশঙ্কা থাকে, সেটা অন্য কারও থেকে থাকে না। খারাপ যা ঘটতে পারে, তার ওদিক থেকেই ঘটার শঙ্কা বেশি, ফিতনাও সেদিক থেকে বেশি হয়। কারণ, এই ধরনের মানুষগুলো কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই নারীর কাছে সহজে যেতে পারে, মিলিত হতে পারে। পক্ষান্তরে অন্যান্য দূরবর্তী মানুষ যারা, তারা
এই হাদিস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো-যে সুভাবটা দেবর থেকে পাওয়া যায়, ঠিক সেটাই সহপাঠীর মধ্যে পাওয়া যায়। কারণ, সাভাবিকভাবেই সহপাঠীরা সহপাঠিনীদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে। বিভিন্ন কথাবার্তা বলে। আর এভাবে একসময় কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই তার সাথে একান্তে মিলিত হয়ে যায়। এদিকে সবাই ভাবতে থাকে-সে তো তার সহপাঠী, শ্রেণিকক্ষে একসাথে বসবে, এটাই সাভাবিক; অতএব, এই সহপাঠীও ওই দেবর নামক ‘মৃত্যু’র মতোই ভয়ংকর!
ফাতহুল বারিতে এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবন হাজার রহ. বলেন, (إياكم والدخول) দ্বারা সম্বোধিত ব্যক্তিকে সতর্কিত বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা উদ্দেশ্য; যাতে সে বিষয়টা পরিহার করে; যেমন বলা হয় (إياكم والأسد) - সিংহ থেকে সাবধান!)
এখানে (إياكم)-এর আগে একটি ক্রিয়া উহ্য আছে; অর্থাৎ (اتقوا - ভয় করো; সাবধান!) পূর্ণ কথা হলো-
اتقوا أنفسكم أن تدخلوا على النساء والنساء أن يدخلن عليكم তোমরা নারীদের কাছে যাওয়া ও নারীরা তোমাদের কাছে আসা থেকে নিজেদের ভয় করো/সাবধান হয়ে যাও।
ইবনু ওয়াহরের বর্ণনায় আছে-
لا تدخلوا على النساء নারীদের সামনে যেয়ো না।
এই হাদিসে নারীদের সামনে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। যা থেকে একান্তে মিলিত হওয়ার নিষিদ্ধতাকে আরও সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
এছাড়া ইবনু হাজার রহ. (الحمو الموت)-এর অনেকগুলো ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন। একবইভাবে ইমাম নববি রহ.-ও তার ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন। তবে এখানে আমরা যে ব্যাখ্যাটি উল্লেখ করেছি, উদ্দিষ্ট অর্থ হওয়ায় ক্ষেত্রে এটাই বেশি স্পষ্ট। তো, এই সহিহ হাদিস, যা শাইখাইন-ই উল্লেখ করেছেন, তা স্পষ্টভাবে নারীপুরুষের সহ অবস্থানকে কঠিনভাবে নিষেধ করছে। আর যদি সেই সহ-অবস্থানের পদ্ধতিটা অনেক সহজ হয়, যেমন স্বামীর নিকটাত্মীয়দের ক্ষেত্রে, তাহলে তো সেটা মৃত্যুর মতোই ভয়ঙ্কর। সুতরাং, মুসলিম উম্মাহর জন্য শোভনীয় নয় যে, তারা নারী পুরুষ মেলামেশার ব্যাপারে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সতর্ক বাণী এড়িয়ে যাবে, অজ্ঞ সেজে বসে থাকবে।
একথা কারও সামনে অস্পষ্ট নয় যে একই স্থানে নারী পুরুষের একত্র হওয়া, একজন আরেকজনের পাশে থাকার মাধ্যমে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লামের সতর্কীকরণের বিরোধিতা করা হচ্ছে! সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো- শয়তানকে খুশি করার জন্য, ইউরোপীয়দের অন্ধ অনুসরণ করার জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সতর্কবাণী নিয়ে হাসি-তামাশা করা হচ্ছে।
কখনো কখনো সম্মিলিতভাবেও জিনা হয়ে যায়। যদিও তারা শিক্ষকের সামনে মিলিত হয়ে বসে থাকে। তবে এই জিনা মূল জিনার চেয়ে নিম্নস্তরের। ইমাম মুসলিম রহ. আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবু হুরাইরা রা. যা বর্ণনা করেছেন, এর চেয়ে ‘লামামের’ (ছোটো গুনাহ) সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ আর কোনো কিছুই আমি দেখে নি, (তিনি বর্ণনা করেন) যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
ان الله كتب على ابن ادم حظه من الزنا أدرك ذلك على محاله فارسل العينين النظر وزنا اللسان النطق والنفس تتمنى وتشتهي والفرج يصدق ذلك او يكذبه
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা আদম-সন্তানের বিষয়ে জিনার একটা অংশ ফায়সালা করে রেখেছেন; যা সে করবেই, দুই চোখের জিনা (হারামা জিনিস) দেখা, জিহ্বার জিনা (মন্দ) কথা বলা, মানুষের নফস (হারাম জিনিসের) আকাঙ্ক্ষা করে, খুব কামনা করে, তখন লজ্জস্থান সেটাকে বাস্তবে পরিণত করে অথবা অপূর্ণ রেখে দেয়।
আর সহিহ মুসলিমে এই শব্দে এসেছে-
كتب على ابن آدم نصيبه من الزنا مدرك ذلك لا محالة فالعينان زناهما النظر والأذنان زناهما الاستماع واللسان زناه الكلام واليد زناها البطش والرجل زناها الخطا والقلب يهوى ويتمنى ويصدق ذلك الفرج او يكذبه
আদম সন্তানের ভাগ্যে জিনার অংশ লিখে দেওয়া হয়েছে যা সে করবেই, কোনো সন্দেহ নেই। তো চোখের জিনা দৃষ্টি দেওয়া, কানের জিনা শোনা, জিহ্বার জিনা বলা, হাতের জিনা ধরা, পায়ের জিনা হাঁটা, (কখনো কখনো মানুষের) অন্তর (খারাপ কিছুর) বাসনা করে, আকাঙ্ক্ষা করে, তখন সে বাসনা লজ্জাস্থান পূরণ করে অথবা অপূরণ করেই রেখে দেয়। এই হাদিসটি ইমাম বুখারি রহ.-ও উল্লেখ করেছেন। এ হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে-চোখ, কান জিহ্বা হাত-পা সবকিছুরই জিনা রয়েছে।
একথা স্বীকার করতে বাধ্য যে, যখন ছাত্র-ছাত্রীরা একসাথে থাকে, শ্রেণিকক্ষে, দুই ক্লাসের মাঝে বিরতিতে, স্কুলের পার্কে, সুইমিংপুলে পানিতে, ক্লাসের পড়া পরস্পর আলোচনা করার সময়ে তখন তাদের চোখ, জিহ্বা, হাত এ-সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জিনা করতে থাকে, আর সুযোগ পেলে তাদের লজ্জাস্থানও সেগুলো অপূরণ রাখে না; বরং পূরণ করেই ছাড়ে! কারণ, ধর্মীয় দিক থেকে কোনো বাধা তো নেই, সেই সাথে কোনো সামান্য শাস্তির ব্যবস্থাও নেই। সে-সকল ইউরোপীয় নারীদের তারা অনুসরণ করে। জানা কথা—তাদের লজ্জাস্থানও তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেই ছাড়ে, এটা কারও অজানা নয়।
এ-রকম আরও বহু হাদিসই আছে, তবে এই হাদিসগুলোই যথেষ্ট। কারণ, যে সত্য জানতে চায়, সত্যের ওপর আমল করতে চায়, তার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
আফগানিস্তানের মুসলিম অধিবাসীদের উদ্দেশ্যে নিবেদন, আপনারা তো জেনেছেন, নারী-পুরুষের সহ-অবস্থান কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে শরিয়তে হারাম করা হয়েছে। বিশেষ করে এই যুগে, যখন মানুষের অন্তর থেকে আল্লাহর ভয় উঠে গেছে, সকল খারাপ বিষয়কে বৈধ মনে করার মিছিল শুরু হয়ে গেছে, চারিত্রিক অধঃপতন ও মারাত্মত সব অপরাধের ক্ষেত্রে যখন ইউরোপীয়দের অনুসরণ করা হচ্ছে, এমন সময়ে এই সহশিক্ষা ও সহাবস্থান তো অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে। সাথে সাথে যা-কিছু এই সহাবস্থানের জিনার দিকে ধাবিত করে, সে-সব মাধ্যমও বন্ধ করতে হবে। এখন আমাদের জন্য এটা ওয়াজিব। আলিমদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে যার প্রমাণ কুরআন ও সুন্নাহয় স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। কুরআন কারিমে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ كَذَلِكَ زَيَّنَّا لِكُلِّ أُمَّةٍ عَمَلَهُمْ ثُمَّ إِلَى رَبِّهِم مَّرْجِعُهُمْ فَيُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কাউকে ডাকে, তোমরা তাদের গালি দিয়ো না। (তাদের গালি দিলে দেখা যাবে) তাহলে তারাও না-জেনে সীমালঙ্ঘন করে আল্লাহকে গালি দেবে।৩০
তো আল্লাহ তাআলা মূর্তিকে গালি দেওয়া হারাম করেছেন, কারণ, সেটা আল্লাহকে গালি দেওয়ার কারণ ও মাধ্যম। এক সহিহ হাদিসে আছে, যা শাইখাইন বর্ণনা করেছেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
إن من العقوق شتم الرجل والديه قالوا يا رسول الله وهل يشتم الرجل والديه قال نعم يسب أبا الرجل فيسب اباه ويسب امه فيسب امه
পিতাকে পুত্রের গালি দেওয়াও অবাধ্যতা বলে গণ্য হবে। তখন উপস্থিত সাহাবিরা বললেন—কেউ কি তার পিতাকে গালি দেয়?,
নবীজি বললেন— হ্যাঁ, ছেলে অন্য একজনের পিতাকে গালি দেয়, তখন সেও তার পিতাকে গালি দেয়, সন্তান অপরজনের মাকে গালি দেয়, তখন সেও তার মাকে গালি দেয়।
এখানে নবীজি পিতামাতার গালি দেওয়ার মাধ্যমকেই তাদের গালি দেওয়া বলে ব্যক্ত করেছেন। হে আফগানবাসী, কোথায় আপনাদের যুগ যুগ ধরে আসা আফগানি চিন্তা-চেতনা ও আত্মমর্যাদা? কীভাবে আপনারা নিজেদের সন্তানদের বাহিরে বেপর্দা অবস্থায় ভোগ্যপণ্য বানিয়ে ছেড়ে দেন? যাতে যে চায়, তাদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ফ্রি উপভোগ করবে। এটা অবুঝ মেয়ে ও অসহায় বোনদের ওপর জুলুম ও অবিচার, তাদের ইজ্জত-আবরুর ওপর আঘাত। সুতরাং নিজেদের আপন পরিবারের সাথে এই অন্যায় অবিচার করা আপনারা সাবধান হন, তাছাড়া আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকেই তো নিজেদের পরিবারবর্গকে এই জুলুম থেকে রক্ষা করার আদেশ করেছেন আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবারবর্গকে আগুন থেকে রক্ষা করো।
টিকাঃ
৩০ সূরা আনআম, আয়াত: ১০৮
৩১ ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম রহিমাহুমাল্লাহু
📄 সহশিক্ষা হারামের ফতোয়া
বহু উলামায়ে মুতাআখখিরিন সহশিক্ষা হারাম হওয়ার ব্যাপারে ফতোয়া দেন এবং কঠিনভাবে নিষেধ করেন। আমরা প্রশ্ন সহ কিছু ফতোয়া উল্লেখ করব।
ফাতোয়া নম্বর - ০১ : মাওলানা কিফায়াতুল্লাহ এ বিষয়ে ফতোয়া দেন, যখন (জুমাদাল উলা, ১৩৪৩ হিজরি) আফগানিস্তানের শিক্ষামন্ত্রণালয় তার কাছে ফতোয়া জানতে চায়। ফতোয়াটি তলে ধরা হলো—
আজকাল আলোচনার বড়ো একটি কেন্দ্রবিন্দু নারী-শিক্ষা। এখানে দুটো বিষয়—
* ০১. প্রথমত নারীদের শিক্ষা দেওয়া হবে কি না?
* ০২. দ্বিতীয়ত তাদের শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতি কী হবে?
প্রথম বিষয় : নারীদের শিক্ষা দেওয়া হবে কি না?
এই বিষয়ে তো দ্বিমত করার কোনো প্রশ্নই আসে না! কেননা, জ্ঞানার্জন করা ইসলামের ফরজ কাজসমূহের একটি। পবিত্র কুরআন কারিমের যেসব জায়গায় পৃথক ও সমষ্টিগতভাবে চিন্তা-ভাবনার করার নির্দেশ এবং জ্ঞান অর্জনের বাধ্যবাধকতার সম্বোধন করা হয়েছে, তা কিন্তু শুধু পুরুষদের জন্যই নয়; জ্ঞানের আলো অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা কেবল পুরুষ বা কোনো এক শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়! কেননা, জ্ঞান অর্জন করা মানব-জীবনের অন্যতম অপরিহার্য বিষয়। যে কোনো মানুষ, পুরুষ বা নারী, যার জ্ঞান নেই, সে সত্যিকার অর্থেই মানবজীবন থেকে বঞ্চিত। আর এ কারণেই আল্লাহ তাআলা আলিমকে জীবিত এবং অজ্ঞকে মৃত বলে ঘোষণা করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন—
وَمَا يَسْتَوِى الْاَحْيَاءُ وَلَا الْاَمْوَاتُ সমান হতে পারে না জীবিতরা এবং মৃতরা।
সুতরাং যে সকল ইলম অর্জন করা ফরজ কিংবা মুস্তাহাব অথবা মুবাহ সে সকল ইলম নারীদের জন্য অর্জন করা যে বৈধ, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এই ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মাঝে পার্থক্য করার না কোনো সুযোগ আছে আর না কোনো দলিল আছে।
দ্বিতীয় বিষয় : নারীদের শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতি কী হবে?
এ-বিষয়ে আলোচনা করার পূর্বে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর গভীরভাবে চিন্তা-ফিকির করা অতি অবশ্যই জরুরি, তা হলো—আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিভিন্ন প্রয়োজনমুখী করে সৃষ্টি করেছেন; যেমন: খাদ্য, পানীয়, বিবাহ ইত্যাদি মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা। তবে প্রতিটি প্রয়োজন পূরণের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন : কারও জন্য ক্ষুধার্ত অবস্থায় অন্যের সম্পদ বা কোনো হারাম জিনিস খাওয়া, অথবা তৃষ্ণার্ত অবস্থায় অপবিত্র বা হারাম পানীয় পান করা জায়িজ নয়, তদ্রুপ বৈধ নারী ব্যতীত অন্য কোনো নারীর কাছ থেকে তৃপ্তি লাভ করাও তার জন্য জায়িজ নয়। জীবিকা অর্জনের যেমন বৈধ উপায় আছে, তেমনি স্ত্রী পাওয়ারও কিছু বৈধ পদ্ধতি আছে। যেভাবে খাদ্য-দ্রব্য ও পোশাক-আশাকের নির্ধারিত পদ্ধতি লঙ্ঘন করা অপরাধ এবং নিষ্ঠুরতা, আগ্রাসন, দখল, চুরি ও ঘুষের দিকে ধাবিত করে, যা আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কারণ। একইভাবে নারী-পুরুষের সম্পর্কের সীমা না লঙ্ঘন করা অনৈতিকতা, অশ্লীলতা এবং অবৈধ মেলামেশার দিকে ধাবিত করে, যা আল্লাহ তাআলার শাস্তির উপযুক্ত বানিয়ে দেয়।
এই নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার ফিতনা যেহতু বড়ো ফিতনা, এবং এর পরিণতি অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক, তাই ইসলামি শরিয়াহ এই ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি রেখেছেন। নারী-পুরুষকে গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন। আল্লাহ তাআলা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেছেন—
وَقُلْ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ يَغُضُّوْا مِنْ اَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْ
এবং আরও বলেছেন—
وَقُلْ لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ اَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوْجَهُنَّ وَلَا يُبْدِيْنَ زينتهن إلا ما ظهر منها وليضربن بخمرهن على جيوبهن ولا يبدين زينتهن الا لبعولتهن او ابائهن
এবং নবী (ﷺ) নারীদেরকে পুরুষদের মজলিসে অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। এমনকি তিনি এও বলেছেন, নারীদের অন্দর মহলে নামাজ বড়ো ঘরে নামাজ আদায় করার চাইতে উত্তম এবং বড়ো ঘরে নামাজ বাড়ির আঙিনায় নামাজ আদায় করার চাইতে উত্তম এবং বাড়ির আঙিনায় নামাজ মহল্লার মসজিদে নামাজ আদায় করার চাইতে উত্তম এবং মহল্লার মসজিদে নামাজ জুমার মাসজিদে নামাজ আদায় করার চাইতে উত্তম। এবং তিনি নারীদের জানাজার সাথে যেতে নিষেধ করেছিলেন, এমনকি নারীদের জন্য প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়াকে তিনি অপছন্দ করতেন। নবী (ﷺ) বলেন-
المرأة عورة وإنها إذا خرجت استشر فيها الشيطان وانها اقرب ما تكون إلى الله وهي في قعر بيتها رواه الطبراني في الكبير مجمع الزوائد)
এবং আরও বলেন-
ما من امرأة تخرج في شهرة من الطيب فينظر الرجال اليها الا لم تنزل في سخط الله
এই সমস্ত নস থেকে এটা স্পষ্ট যে, ইসলামি শরিয়তে পুরুষদের যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, তা নারীদেরকে দেওয়া হয় নি। এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সীমালঙ্ঘনের উপায়-উপকরণ এবং তার পরিণাম সমূলে উৎপাটন করার জন্য অরিরাম চেষ্টা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা এবং নবীজির (ﷺ)-এর বাণী মেনে চলার বরকতের কারণে বিশ্বের অন্যান্য জাতির তুলনায় মুসলিমদের সমাজ অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা থেকে মুক্ত ও নিরাপদ।
পর্দা, যা মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত তা সেই সভ্যতার ই একটি অংশ বিশেষ। নারী-পুরুষের অবাধ মেলমেশা, যা এশিয়া-ইউরোপ-আফ্রিকা এবং আমরিকাসহ বিভিন্ন অমুসলিম সমাজে দেখা যায়, সভ্য মুসলিমদের মাঝে এর ন্যূনতম প্রভাবও দেখা যায় না। বিশেষভাবে এই ক্ষেত্রে মুসলিমজাতি যদি পৃথিবীর সকল জাতির ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গর্ব করে, তাহলে এটা তাদের ক্ষেত্রে মানায়।
আধুনিক যুগের নারীদের সর্বগ্রাসী মনোভাব ইউরোপের দেশগুলোতে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ সারা বিশ্বে জ্বলজ্বল করছে, এই সময়ে ইসলামের নেতৃবর্গদের দায়িত্ব হলো- মুসলিমদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা এবং তাদের অধঃপতনের অবস্থা থেকে উন্নতির সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। বর্তমান সময়ে যুগের চাহিদা নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের তীব্র প্রয়োজন তৈরি করেছে যে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাগুলো তাদের শিক্ষা-পদ্ধতির মাধ্যমে অর্জিত হতে পারত, তা শুধু তাদের অজ্ঞতার কারণেই হারিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তাআলার সীমাবদ্ধতা রক্ষা করা এবং ইসলামি কৃষ্টিকালচার বজায় রাখা এবং রাসুল (ﷺ)-এর সুন্নাহকে অনুসরণ করা এবং জাতীয় সংস্কৃতি ও সমাজ রক্ষা করা অন্যান্য সকল বিষয়ের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। কেননা, ইসলামের শাসকগণ হলেন আল্লাহ তাআলার (السلطان ظل الله في الأرض) এবং নবীগণের উত্তরসূরি। আর কোনো কিছুর ছায়া সেই জিনিস অনুযায়ী হওয়া উচিত।
এ-সকল বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামের নেতৃবর্গদের ওপর সর্বপ্রথম ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং ইসলামি সভ্যতার পন্থাকে অবলম্বন করা এবং সালাফদের শিষ্টাচার রক্ষা করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। আর নারীদের এতটা স্বাধীনতা দেবেন না যে, তারা ইউরোপীয় নারীদের অসভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইসলামি সমাজ ও সালফদের পথ ও পন্থা পরিহার করে বসে। অন্যথা এই স্বাধীনতার ভয়াবহ পরিণতি তাদের বয়ে বেড়াতে হবে।৫৩২
হজরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. ইজালাতুল খাফা নামক কিতাবে বলেছেন-
খলিফা হওয়ার চতুর্থ পদ্ধতিটা হলো—জবরদখল। যেমন, কোনো খলিফা যদি মারা যায় এবং খলিফা তাকে বাইয়াত ও প্রতিনিধি বানানো ছাড়াই সে খিলাফাতের দায়িত্ব নিয়ে নেয় এবং সবাইকে নিজের বাইআতের ওপর একত্র করে নেয়, তাদের সন্তুষ্টি বা বলপ্রয়োগ অথবা কোনো লড়াইয়ের মাধ্যমে এটা সে করে, তখন সে খলিফা হয়ে যাবে; আর মানুষের ওপর আবশ্যক হয়ে যাবে তার আদর্শ অনুসরণ করা, যদি তার আদেশ শরিয়তের বিধান অনুযায়ী হয়। আর এমন জবর-দখলকারী খলিফা দুই প্রকার—
০১. প্রথম প্রকার হলো: এমন জবর দখলকারী খলিফা, যার মধ্যে খলিফা হওয়ার সকল শর্ত বিদ্যমান এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বদের সাথে কোনো প্রকার হারামে জড়িত হওয়া ছাড়াই কোনো ব্যবস্থাপনা বা সন্ধির মাধ্যমে মিটমাট করে নেয়। আর এ প্রকারটা জায়িজ। ইসলামে এর সুযোগও আছে।
হজরত আলি রা.-এর পর হজরত ইমাম হাসান রা.-এর সাথে হজরত মুআবিয়া রা. সন্ধি স্থাপনের পর মুআবিয়া রা.-এর খিলাফাত সংগঠিত হওয়াটা এই প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল।
০২. আর দ্বিতীয় প্রকার হলো: তার মধ্যে সকল শর্ত বিদ্যমান নেই এবং সে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে যুদ্ধবিগ্রহ ও হারামে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে সমঝোতা করেছে, তাহলে এই প্রকারটা জায়িজ হবে না। সে গুনাগার হবে; কিন্তু তার হুকুম মেনে নেওয়া মানুষের ওপর ওয়াজিব বা আবশ্যক হবে। যদি তার আদেশ- নিষেধ শরিয়ত অনুযায়ী হয়। এবং তার জাকাত উসুলকারীরা যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকদের থেকে জাকাত উসুল করে, তাহলে জাকাত আদায় হয়ে যাবে, তার নিযুক্ত করা কাজী কোনো হুকুম দিলে তার হুকুম কার্যকর হবে। এবং সে (খলিফা) জিহাদের ডাক দিলে তার সঙ্গী হয়ে জিহাদ করা যাবে। আর এই প্রকারের খিলাফাতও সংগঠিত হওয়া প্রয়োজন। এর কারণ হলো, অন্যথা হলে তার অপসারনে সাধারণ মুসলিমদের প্রাণনাশ এবং বিশৃঙ্খলার উদ্ভব ঘটবে। আর যেহেতু এ বিষয়টা নিশ্চিত নয় যে, আদৌ এই বিশৃঙ্খলার কোনো মীমাংসা হবে কি না। হতে পারে— অন্য যাকে উপযুক্ত মনে করা হচ্ছে, সে প্রথমজন থেকে আরও বেশি খারাপ। ফলত যার অন্ধত্ব নিশ্চিত, এমন ফিতনায় জড়িত হওয়া তার জন্য উচিত নয়। খলিফা আব্দুল মালিক ইবনু মারওয়ান এবং বনু আব্বাসের প্রথম দিকের খলিফাদের খিলাফাত সংগঠিত হওয়াটা এই প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ফাতোয়া নম্বর - ০২: আল লাজনাতুদ দাইমা'র ফতোয়াতে আছে, কোনো তরুণীর জন্য সহশিক্ষা-ব্যবস্থা জায়িজ নয়, তদ্রুপ এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পড়া জায়িজ নেই, যার দায়িত্ব পুরুষরা গ্রহণ করে, কারণ, তখন সেটা বড়ো কোনো ফিতনার রূপ নেবে, অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে থাকবে। আল্লাহই তাউফিক দানকারী।৫০০
ফাতোয়া নম্বর - ০৩: শাইখ আল্লামা মুহাম্মাদ আমিন শানকিতিও নারীদের জন্য সহশিক্ষা-ব্যবস্থা হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন।৫৩৪
ফাতোয়া নম্বর - ০৪: আব্দুল্লাহ ইবনু কাউদ, আব্দুল্লাহ ইবনু গাদইয়ান, আব্দুর রাজ্জাক আফিফি ও আব্দুল আজিজ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি বাজ প্রমুখও এই শিক্ষাব্যবস্থা হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। উক্ত ফতোয়াটি তুলে ধরা হলো—
প্রশ্ন: চিকিৎসাশাস্ত্র শেখা ওয়াজিব হোক বা জায়িজ হোক, এর জন্য কি কোনো নারী বাহিরে বের হতে পারবে? অথচ তাকে সে-জন্য সামনের কাজগুলো করতেই হবে, সে যতই চেষ্টা করুক না কেন, তাকে এগুলোর সম্মুখীন হতেই হবে? (সামনের কাজগুলো হলো)—
ক. পুরুষদের সাথে মিশতে হবে। দুই ক্ষেত্রে, যেমন: ০১. অসুস্থ ব্যক্তির সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে, চিকিৎসা-শাস্ত্রের শিক্ষকের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে। ০২. সাধারণ যানবাহনে তাকে আরোহণ করতে হবে।
খ. এক দেশ থেকে অন্য দেশে সফর করতে হবে, যেমন সুদান থেকে মিসরে সফর করতে হবে, যদিও সেই সফর হোক বিমানযোগে, অর্থাৎ সামান্য সময়ের জন্য, তিনদিনের কম সময়ের জন্য।
জবাব: এখানে দুটো বিষয়-
প্রথমত, সে যদি চিকিৎসা-বিজ্ঞান শেখার উদ্দেশ্যে বের হয়, আর সে কারণে শিক্ষা বা যানবাহনের ক্ষেত্রে পুরুষদের সাথে মিশতে হয়, আর এর ফলে ফিতনারও আশঙ্কা থাকে, তাহলে বের হওয়া বৈধ নয়। কারণ, নিজের আবরু হিফাজত করা ফরজে আইন, অন্যদিকে চিকিৎসা-বিজ্ঞান শেখা ফরজে কিফায়া। আর ফরজে আইন ফরজে কিফায়র ওপর প্রাধান্য পায়; কিন্তু যদি শুধু অসুস্থ ব্যক্তি বা শিক্ষকের সাথে কথা বলতে হয়, তাহলে সেটা হারাম নয়, বরং হারাম তখনই হবে, যদি সে খুব নমনীয় হয়ে নরম করে কথা বলে, যার ফলে খারাপ লোকেরা তার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে, এটা হারাম শুধু চিকিৎসা-শাস্ত্রের ক্ষেত্রে নয়, বরং সব ক্ষেত্রেই।
দ্বিতীয়ত, চিকিৎসা-শাস্ত্র শেখা বা শেখানোর উদ্দেশ্যে সফরে বা অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসা করার সময় যদি তার মাহরাম থাকে, তাহলে জায়েজ হবে। আর যদি তার সাথে সফরে স্বামী বা মাহরাম না থাকে, তাহলে হারাম। যদিও বিমান-যোগে সফর হয়। কারণ, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
لا تسافر المرأة إلا مع في محرم (متفق على صحته)
মাহরাম ছাড়া কোনো নারী সফর করতে পারবে না। (মুত্তাফাক আলাইহি)
তাছাড়া এখানে নিজের ইজ্জত-আবরুর হিফাজতকে চিকিৎসা-শাস্ত্র শেখা বা শেখানোর ওপর প্রাধান্য দিতে হবে। আল্লাহই তাউফিকদাতা।
ফতোয়াদাতা: আবদুল্লাহ ইবনু কাউদ, আব্দুল্লাহ ইবনু গাদইয়ান, আব্দুর রাজ্জাক আফিফি, আব্দুল আজিজ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি বাজ।
প্রাপ্তবয়স্কা অর্থাৎ, বালিগা মেয়ের ক্ষেত্রে এটাই বিধান, আর অপ্রাপ্তবয়স্কার ক্ষেত্রে যদি তাকে দেখলে প্রবৃত্ত ও খাহেশাত জাগে তাহলে সে প্রাপ্তবয়স্কার হুকুমে আর যদি তার মাঝে প্রবৃত্তি না জাগে, তাহলে সে গাইরে মাহরাম থেকে ও শিখতে পারে।
হিদায়া কিতাবে আছে-
অপ্রাপ্তবয়স্কা মেয়েকে দেখলে যদি প্রবৃত্তি না জাগে তাহলে তাকে স্পর্শ যাবে, তার দিকে তাকানো যাবে; কারণ, ফিতনার ভয় নেই।
হিদায়ার ব্যাখ্যাগ্রন্থ বিনায়ায় এর কারণ হিসাবে বলা হয়েছে— কারণ, এমন মেয়ের শরীর সতরের হুকুমে আসে না, তাছাড়া খাহেশাত বা প্রবৃত্তির বয়সে উপনীত হওয়া ছাড়া সাধারণত পুরো শরীর ঢাকা হয় না। এমনটা মাবসুত কিতাবেও আছে।২৩৬
আল-বাহরুর রায়িক-এ আছে— কোনো মেয়েকে দেখলে যে প্রবৃত্তি জাগে, এর মানদন্ড কী? এ ব্যাপারে ফুকাহায়ে কিরামের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। ব্যাখ্যাকার ও অন্যান্যরা বলেন—'সহিহ মত হলো, সাত বা নয় বছর, এ সবের কোনো বিবেচনা নেই, বরং মূল বিবেচ্য হলো—সহবাসের উপযোগী হওয়া; অর্থাৎ, পূর্ণাঙ্গ আকৃতির হওয়া, হৃষ্টপুষ্ট হওয়া।' ৫৩৭
এমনটা হিদায়ার ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইনায়াতেও বলা হয়েছে। তাবয়িন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনু ফজল বলেন— নয় বছরের মেয়ে কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই প্রবৃত্তির বয়সে উপনীত, পাঁচ বয়সের মেয়ে কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই প্রবৃত্তির বয়সে উপননীত নয়; আর ছয়, সাত, এবং আট বয়সের মেয়ে যদি হৃষ্টপুষ্ট, পূর্ণ আকৃতির হয়, তাহলে প্রবৃত্তির বয়সে উপনীত, অন্যথায় নয়। ৫৩৮
আল-মুহিতুল বুরহানি কিতাবের মুসান্নিফও বলেন, ফকিহ আবুল লাইস আইমানুল ফতোয়া কিতাবে বলেছেন— মাশাইখে কিরাম সাত ও আট বছরের বয়সের ক্ষেত্রে কিছু বলেন নি; তবে সাধারণত নয় বছরের আগে খাহেশাত বা প্রবৃত্তির বয়সে উপনীত হয় না।
সদরে শহিদ রহ. কিতাবুন নাফাকাতের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন— এর ওপরই ফতোয়া দেওয়া হবে। শাইখ ইমাম আবু বকর জাহিদ রহ. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন—মুফতির জন্য কর্তব্য হচ্ছে, তিনি ফতোয়া দেবেন ৭-৮ বছরের মেয়ে হারাম নয়; তবে যদি ফতোয়া জিজ্ঞাসাকারী বলে, সে খুব হৃষ্টপুষ্ট বা মোটা, তাহলে মুফতি সাহেব হারাম হওয়ার ফতোয়া দেবেন। ৫৩৯
তো ফুকাহায়ে কিরামের কথা থেকে জানা গেল—নয় বছরের মেয়ে হায়েজপ্রাপ্ত, সে প্রাপ্তবয়স্কার হুকুমেই ধর্তব্য। আল্লাহই ভালো জানেন।
টিকাঃ
*** কিফায়াতুল মুফতি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৫২-৫২
৫০০ আল-লাজনাতুদ দাইমা ফতোয়া বিভাগ, ফতোয়া নgg..১০৭S8
504 ফতোয়া নাম্বার ৩৫, ১৩৮৯ হিজরির ২৭এ মহাররম মাস。
*** লাজনাতুত দায়িমা, ফতোয়া নম্বর
২৩৬ বিনায়াহ, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ১৩৪
৫৩৭ আল-বাহরুর রায়িক, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা: ৩৭৬
৫৩৮ তাবয়িনুল হাকায়িক, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১০৭
৫৩৯ আল-মহিতুল বুরহানি খণ্ড ৩ পৃষ্ঠা: ৬৪