📄 বাহিরে বের হওয়ার আদব ও শিষ্টাচার
একজন নারী যখন বাহিরে শিক্ষা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বের হবে, তখন তাকে লিবাস ও পরিধানের ক্ষেত্রে শরয়ি আদব রক্ষা করতে হবে। শরয়ি লিবাস কেমন হবে, তার বিশদ বিবরণ ফিকহ ও আদব-আখলাকের বড়ো বড়ো কিতাবে আছে। সুতরাং, সেখানে থেকেই দেখে নেওয়া যেতে পারে। এখানে, আমরা বাহিরে বের হওয়ার সময় একজন নারীর লিবাসের কিছু প্রয়োজনীয় শর্ত-শারায়েত উল্লেখ করব।
একজন নারী যখন ঘর থেকে বের হবে, তখন তাকে পরিধেয় বস্তুর ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত শর্তগুলো রক্ষা করতে হবে।
বি. দ্র. : নিম্নলিখিত সবগুলো শর্তই বাহিরে বের হওয়ার সাথে খাস নয়; বরং কিছু আছে ঘরে-বাইরে উভয় স্থানেই প্রয়োজন। আর কিছু শর্ত তো এমনও আছে, যা পুরুষদের জন্যও আবশ্যক।
প্রথম শর্ত: পুরো শরীর আবৃত করে রাখা, তবে যা বাদ দেওয়া হয়েছে তার কথা ভিন্ন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبَاهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطَّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
'আর মুমিন নারীদের বলেন-তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে থাকে। আর তারা তাদের গলা ও বুক যেন মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীরা, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন-কামনামুক্ত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারও কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে ফিরে আসো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' ৪৯৫
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন- يَاَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِن ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوْرًا رَّحِيمًا
'হে নবী, আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মুমিনদের নারীদের বলেন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে। ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' ৪৯৬
এই আয়াতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, তাদের পুরো সৌন্দর্য ঢেকে রাখতে হবে; তবে যতটুকু বাদ দেওয়া হয়েছে তার কথা ভিন্ন। এখন কতটুকু বাদ দেওয়া হয়েছে—এ নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। 'আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে থাকে' এর ব্যাখ্যায় ইমাম তাবারি রহ. বলেন—সৌন্দর্য দুই প্রকার। এক প্রকার সৌন্দর্য এমন, যা গোপন থাকে। যেমন: পায়ের নূপুর, চুড়ি, কানের দুল, হার। আরেক প্রকার সৌন্দর্য এমন, যা প্রকাশ পেয়েই যায়।
এই প্রকার সৌন্দর্য দ্বারা আয়াতে কী উদ্দেশ্য এ নিয়েও অনেক মত আছে। কেউ কেউ বলেন—বাহ্যিক কাপড়ের সৌন্দর্য। ইবনু মাসউদ রা. থেকে এরূপ বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, সৌন্দর্য দুই প্রকার—প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত। প্রকাশিত দ্বারা উদ্দেশ্য কাপড়।
আর অপ্রকাশিত দ্বারা উদ্দেশ্যে নূপুর, কানের দুল ও বালা। ইবরাহিম ও হাসান বসরি রহ. থেকেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে।
আর অন্যরা বলেন—প্রকাশিত সৌন্দর্য মানে ওই সব সৌন্দর্য যা প্রকাশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সুরমা, আংটি, বালা ও মুখ। ইবনু আব্বাস রা., সাঈদ ইবনু জুবাইর রহ. এবং আতা রহ. থেকেও এমন বর্ণিত হয়েছে।
অন্য আরেক দল বলেন—এটা দ্বারা উদ্দেশ্যে মুখ এবং কাপড়। তবে সবচেয়ে সঠিক মত হচ্ছে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য মুখ ও দুই হাত। এর মাঝে অন্তর্ভুক্ত হবে সুরমা লাগানো, চোখ, আংটি, বালা, খিজাব—এ মতটিই সবচেয়ে সঠিক। কারণ, সবাই এক্ষেত্রে একমত যে, প্রত্যেক মুসলিমকে নামাজে তার সতর ঢেকে রাখতে হবে। শুধু মুখ ও হাত খুলে রাখতে পারবে। সবার মতে, একজন নারীকে এছাড়া সবকিছু ঢেকে রাখতে হবে।
যেহেতু এটা সবার মত, তাহলে এটাও জানা হয়ে গেল যে-একজন নারী ওই অংশও প্রকাশ করতে পারবে, যা তার সতর নয়। যেমন: পুরুষরা করে থাকে। কারণ, যেটা সতর নয়, সেটা প্রকাশ করা হারাম নয়। আর যখন তার জন্য ওই অংশ প্রকাশ করা জায়িজ, তাহলে বোঝা যায়-কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে থাকে'। এর দ্বারা এটাই (অর্থাৎ, যেটা সতর নয়) উদ্দেশ্য। কারণ, এগুলোর প্রত্যেকটিই তো স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়।
ইমাম মাতুরিদি বলেন-এই আয়াত সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, (এটা দ্বারা উদ্দেশ্য) চাদর ও কাপড়।
ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- 'এটা দ্বারা উদ্দেশ্য সুরমা লাগানো, চোখ ও আংটি।'
আরেক বর্ণনায় আছে-'হাত ও মুখ।' আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-'এটা দ্বারা উদ্দেশ্য হৃদয় ও আংটি।'
যদি ইবনু মাসউদ রা.-এর বর্ণনা গ্রহণ করা হয় (চাদর ও কাপড়), তাহলে এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে-বেগানা নারীর মুখের দিকে তাকানো জায়িজ নয়।
আর যদি ইবনু আব্বাস রা.-এর ব্যাখ্যা ধরা হয়, তাহলে প্রমাণিত হয় যে-নারীর চেহারা দেখা জায়িজ, তবে কাম-প্রবৃত্তির দৃষ্টিতে নয়।
আর যদি আয়িশা রা.-এর কথা নেওয়া হয় (হৃদয় ও আংটি), তাহলে এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে-দুই হাত ও দুই পা দেখা যাবে। কারণ, এ দুটো স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশিত হয়ে থাকে। তাছাড়া ওজুর ফরজ হওয়ার ক্ষেত্রেও এ দুটো অঙ্গ জাহিরির অন্তর্ভুক্ত। যদি এমনই হয়, তাহলে এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে-পা প্রকাশ করেও নারীরা নামাজ পড়তে পারবে।৪৯৭
অতএব বোঝা গেল-নারীর মুখ, পা সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়। বেগানা পুরুষ এসব অঙ্গের দিকে তাকাতে পারবে (প্রবৃত্তির সাথে নয়)। আবু বকর জাসসাস রহ. এরূপ মত ব্যক্ত করেছেন।৪৯৮
সুতরাং, পা সতর নয় এটাই সহিহ মত, যেমন হিদায়ায় আছে। হিদায়ার ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইনায়াতে এর কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে-যখন জুতা পরে বা খালি পায়ে হাঁটে, তখন তাকে পা দুটো প্রকাশ করেই রাখতে হয়। কারণ, সবসময় তো আর মোজা পাওয়া যায় না। তাছাড়া পায়ের দিকে তাকালে এতটা কামভাব জাগে না, যতটা জাগে মুখের দিকে তাকালে। এরপরও যখন মুখ সতরের অন্তর্ভুক্ত হলো না প্রবৃত্তি থাকা সত্ত্বেও, তাহলে তো পা আরও আগেই সতরের অন্তর্ভুক্ত হবে না। ৪৯৯ কানযুল উম্মাল এ আছে—একজন স্বাধীন নারী নারীর সতর তার পুরো শরীরই— মুখ, হাত ও পা ছাড়া।
এখন হাতের পৃষ্ঠভাগ সতর কি না, এক্ষেত্রেও বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। মারাকিল ফালাহ কিতাবে আছে-সহিহ মত হচ্ছে, হাতের তালু ও পৃষ্ঠভাগ কোনোটাই সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়। এর কারণ হলো, প্রয়োজনের আধিক্য।১০০
দ্বিতীয় শর্ত: যে পোশাক নিয়ে বের হবে, সেটাতে যেন সৌন্দর্যের চাকচিক্য না থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَهِلِيَّةِ الْأُولَى
‘আর তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো, প্রথম জাহিলিয়াতের যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না।’ ৫০১
অর্থাৎ, তোমরা নিজেদের সৌন্দর্য ও চাকচিক্য পুরুষদের সামনে প্রকাশ করো না। প্রথম জাহিলি যুগে নারীরা যেমন তাদের সৌন্দর্য ও চাকচিক্য পুরুষদের সামনে প্রকাশ করত, তোমরা এমনটা করো না। ফুজালা ইবনু উবাইদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
ثلاثة لا تسأل عنهم: رجل فارق الجماعة، وعصى إمامه، ومات عاصيا وأمة أو عبد أبق فمات، وامرأة غاب عنها زوجها، قد كفاها مؤنة الدنيا فتبرجت بعده، فلا تسأل عنهم
তিন শ্রেণির ব্যক্তি, তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না- ০১. এমন ব্যক্তি, যে (মুসলিমদের) জামাআত থেকে পৃথক হয়, শাসকের অবাধ্যতা করে, অবাধ্য হয়েই মারা যায়। ০২. এমন দাস-দাসী, যে তার মনিব থেকে পালিয়ে (এভাবেই) মারা যায়। ০৩. এমন স্ত্রী যার স্বামী প্রবাসে থাকে, সেই স্ত্রী দূরে অবস্থান করে তার দুনিয়াবি প্রয়োজন পূরণ করে, তারপরও অন্যের সামনে তার সৌন্দর্য প্রকাশ করে বেড়ায়। সুতরাং, তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না।১০২
একজন নারীর পোশাকে যে পরিমাণ সৌন্দর্য ও বিভিন্ন ডিজাইন থাকে, সেই পোশাকে সজ্জিত অবস্থায় যদি কোনো নারী বের হয়, তাহলে অবশ্যই সেটা ফিতনার কারণ হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই, বিশেষ করে এই ফিতনা-ফ্যাসাদের যুগে।
তৃতীয় শর্ত : নারীর পরনের কাপড় ঘন ও পুরু হতে হবে, পাতলা হবে না। কারণ, এছাড়া পুরোপুরি আবৃত করা সম্ভব নয়। তাছাড়া কাপড় পাতলা হলে তো সৌন্দর্য বরং বৃদ্ধি পায়, ফিতনার ভয় বেশি থাকে। এ সম্পর্কেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
سيكون في آخر أمتي رجال يركبون على سروج كأشباه الرجال ينزلون على أبواب المساجد، نساؤهم كاسيات عاريات على رؤوسهن كأسنمة البخت العجاف، العنوهن فإنهن ملعونات.
'আমার উম্মাহর শেষ যুগে কিছু নারীর উদ্ভব ঘটবে, যারা পোশাক পরবে কিন্তু উলঙ্গ থাকবে-এদের মাথার ওপর থাকবে উটের (হেলে পড়া) কুঁজের মতো। এদেরকে তোমরা অভিশাপ দাও, কারণ, এরা অভিশপ্ত। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
قال رسول الله ﷺ : صنفان من أهل النار لم أرهما، قوم معهم سياط كأذناب البقر يضربون بها الناس، ونساء كاسيات عاريات مميلات مائلات رؤوسهن كأسنمة البخت المائلة، لا يدخلن الجنة، ولا يجدن ريحها، وإن ريحها ليوجد من مسيرة كذا وكذا
'দুই শ্রেণির জাহান্নামি আছে, যাদের আমি দেখতে পাই নি। একদলের সাথে গরুর কানের মতো চাবুক থাকবে, যা দিয়ে তারা মানুষকে মারে। আরেক শ্রেণির নারী আছে, যারা পোশাক পরিহিত তবে উলঙ্গ-যারা অন্যদের আকর্ষণ ও আকৃষ্ট করে, তাদের মাথার চুল উটের (হেলে পড়া) কুঁজের মতো। এরা জান্নাতে প্রবশে করবে না, এমনকি এর সুঘ্রাণও পাবে না; অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ তো বহু দূর থেকেও পাওয়া যায়।' ৫০০
টিকাঃ
৪৯২ সূরা নূর, আয়াত: ৩১
৪৯৭ তাফসিরুল মাতুরিদি, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৫-৪৪
৪৯৮ শারহু মখতাসারুত তাহাবি, খণ্ড: ১ পৃষ্ঠা: ৭০০
* আল-ইনায়া শারহুল হিদায়া, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৫৯
* মারাকিল ফালাহ, ৯১
* সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৩
* মুসতাদরাকে হাকিম, ৪১
২০০ মুসলিম, ২১২৮
📄 ‘কাপড় পরিহিত উলঙ্গ’ দ্বারা উদ্দেশ্য কী?
এখানে, অনেকগুলো মত আছে। একটি মত হলো-এরা এমন পাতলা কাপড় পরে, যার ফলে (বাহির থেকে) তাদের শরীর দেখা যায়। যদিও তারা পোশাক পরিহিত, কিন্তু বাস্তবে তারা উলঙ্গ, বিবস্ত্র। মোল্লা আলি কারী রহ. এমনই তার মিরকাতে বলেছেন।
আলকামা ইবনু আবু আলকামা থেকে, তিনি তার মায়ের কাছ থেকে বর্ণনা করেন, তার মা বলেছেন—একবার হাফসা বিনতু আবদির রহমান উম্মুল মুমিনিন আয়িশা রা.-এর কাছে আসেন। হাফসার পরনে ছিল পাতলা ওড়না। তখন আয়িশা রা. ওই পাতলা ওড়না ছিঁড়ে মোটা ওড়না বানিয়ে তাকে পরিয়ে দিলেন।৫০৪
চতুর্থ শর্ত : কাপড় প্রশস্ত ও ঢিলেঢালা হতে হবে, সংকীর্ণ বা আঁটসাঁট (টাইট) হওয়া যাবে না। না হলে শরীরের আকৃতি ফুটে উঠবে। কারণ, কাপড় পড়ার উদ্দেশ্যই ফিতনা উৎপাটন করা। আর এটা ঢিলেঢালা কাপড় ছাড়া সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে কাপড় আঁটসাঁট হলে যদিওবা শরীর ঢেকে যাচ্ছে, কিন্তু শরীরের আকৃতি ফুটে উঠছে। আর এ থেকেই ফিতনা সৃষ্টি হবে, অশ্লীলতার দিকে নিয়ে যাবে। আবু ইয়াজিদ মুযানি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমার রা. নারীদের কিবতি পোশাক পরতে নিষেধ করতেন। তখন তারা আপত্তি করে বলে উঠল, এতে তো শরীর দেখা যায় না? জবাবে তিনি বললেন—শরীর দেখা না গেলেও আকৃতি তো দেখা যায়।৫০৫
পঞ্চম শর্ত : কাপড় উসফুর রং মিশ্রিত হবে না, সুগন্ধিযুক্ত হবে না। কারণ, বহু হাদিসে নারীদের বাহিরে বের হওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। আমি সেগুলো থেকে কয়েকটি হাদিস তুলে ধরছি: (১) আশআরি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
أيما امرأة استعطرت فمرت على قوم ليجدوا ريحها فهي زانية
'যেকোনো নারী সুগন্ধি ব্যবহার করে কারও পাশ দিয়ে যায়, যাতে তারা তার ঘ্রাণ পায়, তাহলে সে নারী জিনাকারী।' ৫০৬
(২) আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা.-এর স্ত্রী জাইনাব সাকিফিয়া থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
إذا خرجت إحداكن إلى العشاء، فلا تمس طيبا
'যখন তোমাদের কোনো নারী রাতে বের হয়, সে যেন সুগন্ধি স্পর্শও না করে।' ৫০৭
(৩) আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, একবার এক নারী তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করল, যার ঘ্রাণ চারপাশে ছড়াচ্ছিল। তখন তিনি ডেকে বললেন—এই অহংকারী দাসী, তুমি কি মসজিদেই যাচ্ছ? সে বলল, হ্যাঁ।
তিনি বললেন—যাও, ফিরে যাও এবং গোসল করো। কারণ, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি—
ما من امرأة تخرج إلى المسجد تعصف ريحها فيقبل الله منها صلاتها حتى ترجع إلى بيتها فتغتسل
যেকোনো নারী মসজিদে গমন করবে, যার ঘ্রাণ চারপাশে ছড়িয়ে যায়; তার বাড়িতে ফিরে গোসল করার আগ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তার নামাজ কবুল করবেন না।১০৮
(৪) আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
لا تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللهُ مَسَاجِدَ الله وليخرجن تفلات
‘তোমরা আল্লাহর বান্দাদের আল্লাহর মসজিদে যেতে বাধা দিয়ো না। আর এরা অবশ্যই দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে বের হবে।’২০৯
(৫) আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
بينما رسول الله صلى الله عليه وسلم جالس في المسجد، إذ دخلت امرأة من مزينة ترفل في زينة لها في المسجد، فقال النبي صلى الله عليه وسلم: «يا أيها الناس انهوا نساءكم عن لبس الزينة، والتبختر في المسجد، فإن بني إسرائيل لم يلعنوا حتى لبس نساؤهم الزينة، وتبخترن في المساجد»
একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাজলিসে বসা ছিলেন। এমন সময় ‘মুজাইনা’ গোত্রের এক নারী মসজিদে সৌন্দর্যকর এক পোশাক পরে অহংকার প্রদর্শন করছিল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
‘হে লোকসকল, তোমাদের নারীদের সাজসজ্জাকর কাপড় পরতে, মসজিদে অহংকার প্রদর্শন করতে নিষেধ করো। কারণ, বনি ইসরাইলকে তখনই লানত ও অভিশাপ দেওয়া হয়েছে, যখন তাদের নারীরা সাজসজ্জাকর কাপড় পরেছে এবং মসজিদে অহংকার প্রদর্শন করতে শুরু করেছে।১১০
সুগন্ধি মেখে বাহিরে বের হওয়ার নিষেধাজ্ঞা সেখানে প্রযোজ্য, যেখানে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কিছু থেকে থাকে। যেমন: চাকচিক্যপূর্ণ পোশাক, বাহির থেকে দেখা যায় এমন অলংকার, চিত্তাকর্ষক সৌন্দর্য, নারী- পুরুষের অবাধ মেলামেশা।২১১
আমি (মুসান্নিফ) বলি-যে নারী নামাজের উদ্দেশ্যে বের হয়, তার জন্যই যদি এটা হারাম হয়, তাহলে ওই নারীর কী হুকুম হবে, যে বাজার-মার্কেট-অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়?
কোনো সন্দেহ নেই, এটা আরও বড়ো গুনাহ। আল্লামা হাইসামি রহ. তো এটাও উল্লেখ করেছেন যে-সুগন্ধি মেখে সাজগোজ করে কোনো নারীর বাহিরে বের হওয়াও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত, যদিওবা স্বামীর অনুমতি থাকে।
ষষ্ঠ শর্ত : নারীদের পোশাক পুরুষদের পোশাকের মতো হবে না। কারণ, বহু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে ওই সমস্ত নারীদের প্রতি লানত ও অভিশাপ দেওয়ার ব্যাপারে, যারা পোশাক ও অন্য কিছুতে পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে। যেমন: (ক) আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
لعن رسول الله ﷺ الرجل يلبس لبسة المرأة والمرأة تلبس لبسة الرجل 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওই পুরুষকে লানত করেছেন যে নারীর মতো পোশাক পরে এবং (লানত করেছেন) ওই নারীকে যে পুরুষের মতো পোষাক পরে।' ৫১২ (খ) ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত-
عن النبي ﷺ أنه لعن المتشبهات من النساء والمتشبهين من الرجال بالنساء তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি নারীদের মধ্য থেকে পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনকারিণীদের লানত করেছেন এবং লানত করেছেন পুরুষদের মধ্য থেকে নারীদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনকারীদের।১১০ (গ) ইবনু আবি মুলাইকা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
لعن رسول الله ﷺ الرجلة من النساء
আয়িশা রা.-কে বলা হলো, এক নারী তো (পুরুষদের) জুতা পরে। তখন তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদের মধ্য হতে পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনকারিণীদের অভিশাপ দিয়েছেন।২১৪
(ঘ) হুজাইল গোত্রের এক লোক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-আমি আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রা.-কে দেখেছি। তার বাড়ি ছিল 'হিল্লে', আর মসজিদ ছিল হারামে। একদিন আমি তার কাছে ছিলাম। হঠাৎ তিনি আবু জাহেলের মেয়ে উম্মে সায়িদকে দেখতে পেলেন। সে গলায় ধনুক ঝুলিয়ে পুরুষের মতো হাঁটছিল! তখন আবদুল্লাহ বললেন, এটা কে? হুজালি বলেন, আমি বললাম-আবু জাহেলের মেয়ে উম্মু সায়িদ। তিনি বললেন-আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি,
ليس منا من تشبه بالرجال من النساء ولا من تشبه بالنساء من الرجال 'যে নারী পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে আমার উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত নয়, একইভাবে যে পুরুষ নারীদের সাথে সাদৃশ্য রাখে (সেও আমার উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত নয়)।' ৫১৫
(ঙ) ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
لَعَنَ النبيُّ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ المُتَرَجِلَاتِ مِنَ النِّسَاءِ، وَ الْمُخَنَّثِينَ مِنَ الرِّجَالِ، وقَالَ: أَخْرِجُوهُمْ مِن بُيُوتِكُمْ قَالَ: فَأَخْرَجَ النبيُّ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ فُلَانًا، وَأَخْرَجَ عُمَرُ فُلَانًا.
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের লানত করেছেন, যারা নারীদের মধ্য হতে পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য রাখে এবং যারা পুরুষদের মধ্য হতে নারীদের সাথে সাদৃশ্য রাখে। আর বলেছেন, ওদেরকে তোমরা নিজেদের ঘর থেকে বের করে দাও। তিনি বলেন-পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অমুককে বের করে দেন, আর উমার রা. অমুককে বের করে দেন।' ৫১৬
ইমাম জাহাবি রহ. তো নারী-পুরুষ একে অপরের সাদৃশ্য অবলম্বন করাকে কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। উপরের কিছু হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন-যদি নারীরা পুরুষদের বেশভূষা; যেমন: চাষাবাদ, পুরুষদের মতো খোলাখুলিভাবে নিজেদের অঙ্গ প্রকাশ করে রাখে, টাইট হাতাযুক্ত কাপড় পরে; তাহলেই সে পরিধানের ক্ষেত্রে পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বন করেছে বলা হবে। একই সাথে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ক্রোধের পাত্র হবে, যদিও তার স্বামী তাকে সাদৃশ্য অবলম্বনের সুযোগ দিয়ে থাকে। অর্থাৎ, সামী তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তাকে নিষেধ না করে। কারণ, সামীকে তো আদেশ করা হয়েছে স্ত্রীকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের ওপর রাখার, অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করার। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَئِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর। যার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে কঠোর, রূঢ় ফেরেশতাগণ-যারা আল্লাহ তাআলা তাদের যা আদেশ করেন, তার আবধ্যতা করে না; বরং তাদের যা আদেশ করা হয়, তারা সেটাই করে।' ৫১৭
অর্থাৎ, তাদেরকে তোমরা আদব ও ইলম শেখাও, আল্লাহর আনুগত্যের আদেশ করো, অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করো। এটা তাদের ওপর যেমন ওয়াজিব, তেমনি তোমাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও ওয়াজিব।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
كلكم راع ومسؤول عن رعيته الرجل راع في أهله ومسؤول عنهم يوم القيامة
'তোমাদের প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্বাধীন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্বামী তার পরিবারের বিষয়ে দায়িত্বশীল এবং তাকে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।'
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
ألا هلكت الرجال حين أطاعت النساء
'শুনে রাখো, পুরুষরা যখন নারীদের আনুগত্য শুরু করবে, তখন তাদের ধ্বংস অপরিহার্য।'
হাসান বসরি রহ. বলেন- 'আল্লাহর কসম! আজ যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নামে উপড়ে ফেলবেন।' ২১৮
একইভাবে ইমাম হাইসামি রহ.-ও একে কবিরা গুনাহ বলে ব্যক্ত করেছেন।২১৯
সপ্তম শর্ত: নারীদের পোশাক কাফিরদের পোশাকের মতো হবে না। কারণ, ইসলামি শরিয়ত বলে, নারী-পুরুষ কারও জন্যই কাফিরদের সাথে সাদৃশ্য রাখা বৈধ নয়-চাই পোশাক-আশাকে বা খাবার-দাবারে অথবা অন্য কিছুতে। এটা ইসলামের বড়ো একটি মূলনীতি, যা পালন করা থেকে আজ মুসলিমরা বিরত থাকছে। এমনকি যারা নিজেদের মুসলিম বলে পরিচয় দেয়, তারাও হয় দ্বীন সম্পর্কে অনভিজ্ঞতার কারণে কিংবা নিজেদের খাহেশাতের অনুসরণ করতে গিয়ে কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার গোলামি করার জন্য (কাফির পোশাক পরিধান করছে)। অথচ এক্ষেত্রে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে-
(ক) ইবনু উমার রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
من تشبه بقوم فهو منهم 'যে কোনো জাতির সাথে সাদৃশ্য রাখে, সে তাদের মধ্য হতে গণ্য।' ৫২০
(খ) আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
جعل رزقي تحت ظل رمحي وجعل الصغار والذلة على من خالف أمري ومن تشبه بقوم فهو منهم 'আমার রিজিক রাখা হয়েছে আমার বর্শার ছায়ায়। আর লানত ও অপদস্থতা রাখা হয়েছে ওই ব্যক্তির ওপর, যে আমার আদেশের বিরোধিতা করে। আর যে কোনো দলের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের মধ্য হতেই গণ্য। '৫২১
অষ্টম শর্ত: কাপড় যেন খ্যাতির কাপড় না হয়। ইবনু উমার রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
من لبس ثوب شهرة ألبسه الله يوم القيامة ثوب مذلة ثم ألهب فيه نارا 'যে খ্যাতির কাপড় পরবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন অপদস্থতার কাপড় পরিয়ে দেবেন। তারপর তাতে আগুন জ্বালিয়ে দেবেন।' ৫২২
আবু জর রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
من لبس ثوب شهرة أعرض الله عنه حي يضعه متى وضعه
'যে খ্যাতির কাপড় পরবে, আল্লাহ তাআলা তাকে এডিয়ে যাবেন যতক্ষণ না তাকে যেখানে রাখার সেখানে রাখবেন। (অর্থাৎ, জাহান্নাম) '৫২৩
একইভাবে, নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে পোশাক-পরিচ্ছদের আদব রক্ষার পাশাপাশি ওই সকল আদবও লক্ষ্য রাখতে হবে, যেগুলো পালন করার জন্য শরিয়ত আদেশ করেছে; যাতে নারীর ইজ্জত-আব্রু, সম্মান-মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষা করা সম্ভব হয়। যেমন: সহশিক্ষা ব্যবস্থা না হওয়া, কোনো পুরুষের সাথে কথা বলার প্রয়োজন হলে নরম স্বরে কথা না বলা।
টিকাঃ
*** বাইহাকি ফিল কুবরা, ৩২৬৫
*** মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা, ২৪৭৯২
*** সুনানুন নাসায়ি, ৫১২৬
*** মুসনাদ আহমাদ, ২৭০৪৭
১০৮ বাইহাকি, ৫৯৭৩
২০১ মুসনাদু আহমাদ, ৯৬৪৫
৫১০ সুনান ইবনি মাজাহ ৪০০১
২১১ ফাতহুল বারি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৪৯
১১২ সুনানু আবি দাউদ, ৪০৯৮
২১০ সুনানু আবি দাউদ, ৪০৯
২১৪ সুনানু আবি দাউদ, ৪০৯৯
৫১৫ মুসনাদু আহমাদ, ৬৮৭৫
৫১৬ মসনাদ আহমাদ ২০০৬
*১* সূরা তাহরিম, আয়াত: ৬
** জাহাবি, আল কাবায়ির, ১৩৪
** আজ-ঝাওয়াজির আন ইকতিয়াফিক সেবামীe Coin), পৃষ্ঠা: ২৫৬
২২০ সুনানু আবি দাউদ, ৪০৩১
২১ মুসনাদুল বাযযার, ৮৬০৬
*** সুনানে ইবনু মাজাহ, ৩৬০৭
📄 বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অফিসে নারীদের চাকরি
একজন নারী কোনো মন্ত্রণালয়ে কোনো চাকরি করতে পারবেন কি না, এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমরা কিছু বিষয় স্পষ্ট করে নেব। কারণ, প্রথম এখানে দুটো বিষয় রয়েছে—
* ০১. প্রথমত, মন্ত্রণালয় ও অফিসে দায়িত্ব পালন;
* ০২. দ্বিতীয়ত, সেখানে কাজ করার পদ্ধতি এবং সে-জন্য বাহিরে বের হওয়া;
০১. প্রথম বিষয় : মন্ত্রণালয় ও অফিসে দায়িত্ব পালন। মন্ত্রণালয় দুই প্রকার—
* এক. তাফবিজ (প্রস্তাব করার) মন্ত্রণালয়;
* দুই. তানফিজ করার (কার্যকর করা) মন্ত্রণালয়।
আল্লামা মাওয়ারদি রহ. তাফবিজের মন্ত্রণালয়ের পরিচয় এভাবে পেশ করেছেন— খলিফা এমন কাউকে উজির (মন্ত্রী) বানাবেন, যার কাছে যাবতীয় বিষয় নিজ সিদ্ধান্তে পরিচালনা করার, নিজে চিন্তানুযায়ী বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব সোপর্দ করবেন।
খিলাফাতের দায়িত্বের পর এই মন্ত্রণালয়ই সকল প্রশাসন-ব্যবস্থা ও অন্যান্য দায়িত্বের মূল। তাই কুরাইশ বংশ ছাড়া খলিফা হওয়ার সমস্ত শর্তাবলিই এই মন্ত্রালয়ের জন্য শর্ত। যেমনটা আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাতে আছে। সুতরাং কোনো নারী যেমন খলিফা বা শাসক হতে পারে না, তদ্রুপ এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও গ্রহণ করতে পারবে না।
পক্ষান্তরে তানফিজ করার মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব বা শক্তি তাফবিজ করার মন্ত্রণালয়ের চেয়ে কম, এর শর্তাবলিও অল্প। কারণ, এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব খলিফার সিদ্ধান্ত ও পরিচালনার ওপর নির্ভরশীল। এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শাসকের মাঝে এবং জনগণ ও প্রশাসকদের মাঝে শুধু মাধ্যম মাত্র, খলিফা যা আদেশ করেন, তা পৌঁছে দেন; যা করতে বলেন, সেটা বাস্তবায়ন করেন; যা ফায়সালা করেন, তা কার্যকর করেন; কাকে প্রশাসক নিযুক্ত করা হচ্ছে, কোন বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য পাঠানো হচ্ছে—এসব বিষয়ে মন্ত্রী খলিফাকে জানান। কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু হলে বা নতুন কিছু ঘটলে খলিফার সামনে পেশ করেন, যাতে খলিফা সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারেন, কিছু করণীয় থাকলে বলতে পারেন। মোটকথা, যাবতীয় বিষয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই মন্ত্রী খলিফার সাহায্যকারী, সে বিভিন্ন বিষয়ের ক্ষেত্রে শাসকও নয়, দায়িত্বশীলও নয়।
আল্লামা মাওয়ারদি বলেন—এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও একজন নারী গ্রহণ করতে পারবে না, যদিও এক্ষেত্রে তার কথা গ্রহণযোগ্য; কারণ, তার মধ্যে প্রশাসনের অর্থ ও দায়িত্ব পাওয়া যায়, আর প্রশাসন-ব্যবস্থা থেকে তো নারীদের নিষেধ করা হয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
(لن يفلح قوم ولو أمرهم امرأة)
সে জাতি কিছুতেই সফল হতে পারবে না, যারা নারীর হাতে (নিজেদের) পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়ে দেয়। ২৪১
মুসনাদু আহমাদের বর্ণনায় আছে—
لا يفلح قوم اسندوا أمرهم الى امرأة
সে জাতি সফল হতে পারবে না, যারা নিজেদের যাবতীয় বিষয় একজন নারীর কাছে সোপর্দ করে।
০২. দ্বিতীয় বিষয়: অর্থাৎ কাজ করার পদ্ধতি এবং কাজের জন্য বের হওয়া।
তো, এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় বা অফিসের কোনো দায়িত্ব বাস্তবায়নের জন্য একজন নারী তখনই বের হতে পারবে, যদি তার কোনো শরয়ি প্রয়োজন থাকে; শরয়ি পর্দাবলম্বন অবস্থায় যদি কোনো পুরুষের সাথে আলাদাভাবে বসতে না হয়, মিশতে না হয়। কিন্তু যদি সে শরয়ি পর্দা ছাড়া বা কোনো পুরুষের সাথে আলাদা বসতে হয়, অথবা অন্যান্য পুরুষদের সাথে একসাথে মিলেমিশে কাজ করতে হয়, তাহলে বের হওয়া হারাম। কারণ, পর্দা ছাড়া বের হলে সতর ঢাকা হয় না। আর তা হারাম। আর যদি কারও সাথে আলাদাভাবে বসতে হয়, অথবা পুরুষদের সাথে মিশতে হয়, তাহলেও তা হারাম। কারণ, ইবনু আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন-
(لا يخلون رجل بامرأة ولا تسافرن امرأة إلا ومعها محرم)
কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীকে নিয়ে একা না থাকে, আর কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া সফর না করে।১৪২
উকবা ইব্ন আমির রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
إياكم والدخول على النساء فقال رجل الأنصار يا رسول الله أفرأيت الحمو قال الحمو الموت رواه البخاري باب لا يخلون رجل بامرأة إلا ذو محرم والدخول على المغيبة)
নারীদের সামনে যাওয়া থেকে সাবধান! তখন একলোক আনসার সাহাবি দাঁড়িয়ে বলল-ইয়া রাসুলাল্লাহ, দেবর সম্পর্কে আপনি কী বলেন?
নবীজি বললেন-আরে দেবর তো মৃত্যু (রীতিমতো ভয়ঙ্কর!) !৫৪০
ইবনু উমার রা. বর্ণনা করেন, উমার রা. জাবিয়া নামক স্থানে খুতবা দেন, ... দীর্ঘ একটি হাদিস উল্লেখ করেন, যার একটি অংশ হলো-
ألا لا يخلون رجل بامرأة إلا كان ثالثهما الشيطان
সাবধান! কোনো পুরষ যেন কোনো নারীর সাথে একান্তে মিলিত না হয়, তাহলে সেখানে তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে উপস্থিত হয় শয়তান। ৫৪৪
জাবির রা. বর্ণনা করেন-
نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم أن يدخل على المغيبات
দূরে অবস্থান করা স্বামীর স্ত্রীদের ঘরে প্রবেশ করতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিষেধ করেছেন।২৪৫
এ বিষয়ে আরও অনেক হাদিস আছে, তবে যা বর্ণনা করা হয়েছে, এতুটুকুই যথেষ্ট বলে মনে করছি।
আল্লামা কাসানি রহ. বলেন-ঘরে যদি কোনো গাইরে মাহরাম নারী থাকে, তাহলে কোনো পুরুষ তার সাথে একা থাকতে পারবে না। কারণ, এখানে ফিতনার আশঙ্কা আছে, হারাম কাজে পতিত হওয়ার ভয় আছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন—
لا يخلون رجل بامرأة فإن ثالثهما الشيطان بدائع الصنائع
কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে একা মিলিত না হয়। কারণ, তখন তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে উপস্থিত হয় শয়তান।১৪৬
সহি মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থে ইমাম নববি রহ. বলেন—যদি কোনো পুরুষ গাইরে মাহরাম নারীর সাথে একা থাকে, সেখানে অন্য কেউ না থাকে তাহলে সমস্ত উলামায়ে কিরামের মতে, এটা হারাম। তদ্রুপ যদি তাদের সাথে এমন কেউ থাকে—যার সামনে লজ্জা পায় না, যেমন: দুই তিন বছরের বাচ্চা, তাহলেও হারাম; কারণ, তার থাকা-না-থাকা সমান।'
এই ফিতনা-ফাসাদের যুগে একা থাকার ব্যাপারে আরও বেশি সতর্ক থাকা চাই। সুতরাং মুসলিম নারী-পুরুষ সবার কর্তব্য—খুব ভালো করে ফিতনা থেকে নিজেদের হিফাজত করা, কখনো যেন কোনো নারীর সাথে একা না থাকা হয়। তারা যেন এ সমস্ত লোকদের দিকে ফিরেও না তাকায় যারা বলে—
سواء علينا أوعظت أم لم تكن من الواعظين
আরে তুমি বলো আর না বলো—সবই আমাদের জন্য সমান।
এরাই মূলত শরিয়তের বিধিবিধানের অবাধ্য হয়, মানুষকে খারাপ কাজ করতে বলে, ভালো কাজ থেকে নিষেধ করে। আয় আল্লাহ, ওদের মাঝে আর আমাদের স্ত্রী, কন্যা ও বোনদের মাঝে পূর্ব-পশ্চিমের মতো পরিমাণ দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন।
হে মুসলিম উম্মাহ, আপনারা আল্লাহকে ভয় করেন, আপনাদের মেয়েদের নিজ দায়িত্বে রাখবেন। আল্লাহ তাআলা যে-সব জিনিস করতে তাদের জন্য হারাম করেছেন, যেমন মুখ খোলা রেখে বাহিরে বেপর্দা অবস্থায় বের হওয়া, সৌন্দর্য প্রকাশ করা, আল্লাহ তাআলার দুশমনদের অর্থাৎ ইহুদি-খ্রিস্টানদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করা—এসব থেকে তাদের বাধা দেবেন। মনে রাখবেন—এসব দেখে চুপ থাকলে তাদের সাথে আপনারাও গুনাহর ভাগিদার হবেন, আপনাদেরও আল্লাহর গজব ও অন্যান্য শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এসব অনিষ্ট থেকে যেন পবিত্র রাখেন, আমিন।
এখন সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব হচ্ছে—পুরুষদের সতর্ক করা, যাতে তারা নারীদের সাথে একা না থাকে, তাদের কাছে আসা-যাওয়া না করে, মাহরাম ছাড়া তাদের সাথে সফর না করে; কারণ, এসবই ফিতনা-ফাসাদের মূল মাধ্যম ও কারণ! নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন—
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে ক্ষতিকর ও ভয়ঙ্কর কোনো ফিতনা রেখে যাই নি। ২৪৭
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন—
إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ وَإِنَّ اللهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَنَاظِرٌ كَيْفَ تَعْمَلُونَ فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ فِي النِّسَاءِ رواه مسلم
নিঃসন্দেহে এই দুনিয়া সুমিষ্ট, সবুজ শ্যামল। আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের এখানে স্থলবর্তী করবেন। তারপর দেখবেন, তোমরা কেমন আমল করো। অতএব, তোমরা দুনিয়া থেকে সতর্ক থাকো, নারীদের থেকে সাবধান হও; কারণ, বনি ইসরাইলের প্রথম (বিশেষ করে) ফিতনার সূচনা হয়েছিল নারীদের থেকে। ২৪৮
মুমিন ভাইয়েরা, এ বিষয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কা মেয়ের ক্ষেত্রেও শিখিলতা করা যাবে না। কারণ, শুরুতেই যদি তাদের এভাবে বেড়ে ওঠানো হয়, তাহলে তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে, বড়ো হওয়ার পরও এ-সব স্বাচ্ছন্দ্যে করতে চাইবে। ফলে তাদের মাধ্যমেও ওই সব ভয়ঙ্কর ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টি হবে, যা বড়োদের মাধ্যমে হচ্ছে।
সুতরাং প্রিয় ভাইয়েরা, আল্লাকে ভয় করেন, হারাম থেকে সতর্ক থাকেন, পরস্পর নেককাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন, একে অপরকে হক ও হকের ওপর সবর করতে বলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আপনাদেরকেই এ-সব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন, নিজেদের আমলের প্রতিদান দেবেন। আর মনে রাখবেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সবরকারীদের সাথে রয়েছেন।
নারী-পুরুষ একত্রে এক জায়গায় থাকা হারাম। কারণ, এতে পরস্পরের মাঝে সংযোগ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ, একে অপরের দিকে তাকানো যায়, বা ইশারা করা যায় কিংবা কথা বলা যায়। অথবা একবারে পাশাপাশি বসে কোনো প্রতিবন্ধক বা বাধা ছাড়াই যা উভয়ের মাঝে সৃষ্ট সন্দেহ বা ফিতনা তৈরি করতে পারে। এটাও হারাম। কারণ, এতে অনেক সমাস্যা ও নেতিবাচক প্রভাব আছে। যেমন—
০১। (কুরআন আদেশ করা) দৃষ্টি অবনত রাখতে কষ্ট হয়; খুব সহজেই দৃষ্টির মাধ্যমে চোখের জিনা হয়ে যায়; অথচ আল্লাহ তাআলা মুমিন পুরুষ-নারীদের দৃষ্টি অবনত রাখার আদেশ করেছেন।
০২। এর মাধ্যমে কখনো কখনো নারীর শরীরে স্পর্শ লেগে যায়, যা হারাম। যেমন হাত দিয়ে মুসাফাহা করা যা হারাম, বৈধ নয়। কারণ, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
لأن يطعن في رأس رجل بمخيط من حديد خير له من أن يمس امرأة لا تحل له
কোনো পুরুষ না-জায়িজ নারীকে স্পর্শ করার চেয়ে তার মাথায় লোহার সুই দ্বারা আঘাত করা উত্তম। ২৪৯
০৩। যখন নারী-পুরুষ এক সাথে থাকে, অনেক ধরনের জিনা হতে থাকে। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম বলেছেন- আদম-সন্তানের ভাগ্যে জিনার একটি অংশ লিখে দেওয়া হয়েছে, যা সে করবেই, কোনো সন্দেহ নেই। চোখের জিনা হলো (হারাম জিনিস) দেখা, কানের জিনা হলো (হারাম জিনিস) শোনা, জিহ্বার জিনা হলো (হারাম কিছু) বলা, হাতের জিনা হলো (হারাম জিনিস) ধরা, পায়ের জিনা হলো (হারام জিনিসের দিকে) হাঁটা, (মানুষের অন্তর (কখনো কখনো খারাপ কিছুর) বাসনা করে আকাঙ্ক্ষা করে আর লজ্জাস্থান সে বাসনাকে পূর্ণরূপ দান করে অথবা অপূর্ণই রেখে দেয়।১২৫০
এ হাদিস প্রমাণ করে, নারীদের সাথে অবস্থান করা থেকে সতর্ক থাকতে হবে, তাদের আওয়াজ শোনা থেকে, তাদের দিকে তাকানো থেকে, তাদের স্পর্শ করা থেকে, তাদের উদ্দেশ্যে বের হওয়া থেকে, তাদের মনে মনে কামনা করা থেকে-এ-সবই জিনার অন্তর্ভুক্ত। (আল্লাহ আমাদের রক্ষা করেন।) অতএব, একজন বুদ্ধিমান পুতঃপবিত্র ব্যক্তিকে তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। যারাই নারীদের মেশে, তারা জিনার এ-সকল প্রকারের অন্তত কোনো একটা কিছু থেকে কখনোই মুক্ত থাকতে পারে না।
০৪। একসাথে কাজ করাটা প্রেম-ভালোবাসার কারণ হয়ে দাঁড়ায়; যার ফলে দ্বীন- দুনিয়া উভয়টাই বরবাদ হয়। কারণ, মন তখন মেয়েটির সাথে একাকার হয়ে যায়, অন্য কোনো কিছু মাথায় আসে না, শুধু তার চিন্তায়-ই ঘুর ঘুর করতে থাকে।
কখনো বা উল্টোও হয়। অর্থাৎ, মেয়ের মন ছেলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটা মূলত ওই একসাথে কাজ করার এবং দীর্ঘদিন একসাথে থাকার ফল।
০৫। এর ফলে যে ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়ে, তা হলো-আত্মমর্যাদা বিলীন হয়ে যায়; লজ্জা-শরম শেষ হয়ে যায়, চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। বিশ্বাস না হলে পর্দানশীন মেয়েদের অবস্থা লক্ষ্য করে দেখতে পারেন। সাধারণ মেয়েদের তুলনায় তাদের কী পরিমাণ লজ্জা থাকে, বাজার-ঘাটে তারা পুরুষদের থেকে কী পরিমাণ দূরে থাকে। তাদের চরিত্রের দিকে লক্ষ্য করে দেখেন, তাদের অভিভাবকদের অবস্থা লক্ষ্য করে দেখেন, নিজের মাহরামদের মাঝে এ-সমস্ত গুণ থাকার ফলে তারা কতটা মর্যাদা লাভ করে থাকে। অপরদিকে ওই সমস্ত মেয়েদের অবস্থাও দেখেন, যারা রাস্তাঘাটে সৌন্দর্য প্রকাশ করে বেড়ায়, মুখ খোলা রেখে চলে, পরপুরুষদের সামনে চেহারা প্রকাশ করে রাখে, উল্লিখিত কোনো গুণই তাদের মাঝে নেই, কখনো কখনো এসব পাপাচারী মেয়েকে দেখবেন, কোনো গাইরে মাহরাম পাপাচারি ছেলের সাথে এমনভাবে কথা বলে যে, দেখলে আপনার মনে হবে-তারা দুজন স্বামী-স্ত্রী, বিয়ের শরয়ি আকদ (চুক্তি) তাদের মাঝে হয়ে আছে।
মূলত এই ভয়ঙ্কর অধঃপতনগুলো আমাদের মুসলিম দেশে তখনই এসেছে যখন গণতান্ত্রিক আইন-কানুন মুসলিম দেশগুলোতে চলতে শুরু করেছে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এর ছোবল থেকে রক্ষা করেন।
ব্যস, উপরের আলোচনার আলোকে আমরা বলতে পারি-কর্মক্ষেত্রে গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে কোনো নারী একসাথে কাজ করতে পারবে না, এটা না-জায়িজ। আর এ যুগের জাহিদা ও সভ্যতার দাবি বলে-প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করা তো আরও বড়ো খতরনাক বিষয়। এর ফলে বহু নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিক্ত অভিজ্ঞতা সৃষ্টি হবে। অশুভ পরিণতি আসবে। তাছাড়া এটা শরয়ি বহু 'নসে'র বিপরীত, যেখানে নারীকে আদেশ করা হচ্ছে ঘরে বসে থাকার, বাড়িতে তার উপযোগী বা ঘরের বা অন্য কোনো কাজ করার।
আল্লাহ তাআলা নারীকে ভিন্ন গঠন ও আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন-যা পুরুষদের গঠনের বিপরীত। সে গঠনের মাধ্যমে তাকে ওইসব কাজ করার উপযোগী করে দিয়েছেন, যা ঘরে বসে করা যায়, অথবা যা নারীরা পরস্পরেই করতে পারে। এ কথার অর্থ হলো, নারীদের যদি পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্রে আনা হয়, তাহলে তাদেরকে এর মাধ্যমে তার গঠন ও প্রাকৃতিক অবস্থা থেকে বের করা হলো; যা তার ওপর বিরাট অবিচার, তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ওপর আঘাত, তার ব্যক্তিত্যকে ধ্বংসকরণ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই ধরনের অন্যায়-অবিচার থেকে রক্ষা করেন, আমিন।
টিকাঃ
আল আহকামুস সুলতানিয়্যা:
*** সহিহ বুখারি: ৩০০৬; পরিচ্ছেদ, কেউ যুদ্ধ বাহিনীতে নাম লেখালো, অতঃপর তার স্ত্রী হজ করতে বের হয়ে গেল, অথবা তার অন্য কোনো ওজর থাকে, তাহলে কি তাকে যুদ্ধ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে?
৫৪০ সহিহ বুখারি: ৫২৩২, পরিচ্ছেদের শিরোনাম: কোনো পুরষ কোনো নারীর সাথে মিলিত হতে পারবে না, যদি না মাহরাম হয় এবং প্রবাসীদের স্বামীদের স্ত্রীদের কাছে যাওয়া।
২৪৪ সুনানুত তিরমিজি: ২১৬৬ অনাবশ্যক।
৫৪৫ মুসান্নাফ ইবনি আবি শাইবা: ১৯৬১০।
*** বাদাইয়স সানায়ে, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১২
২৪৭ সূত্র: সহিহ বুখারি।
২৪৮ সূত্র: সহিহ মুসলিম।
*** মাজমাউজ জাওয়ায়িদ: ৭৭:১৮ অনুচ্ছেদ, গাইরে মাহরামের সাথে একান্ত মিলিত হওয়া হারাম, ইমাম হাইসামি বলেন-এই হাদিসের সমস্ত রাবি সহিহ。
*** সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম। তবে এখানের শব্দ সহিহ মুসলিমের।
📄 নারীর সাথে মুসাফাহা বা হ্যান্ডশেক
পুরুষের সাথে নারীর মুসাফাহা বর্তমান যুগে গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথেও নারীদের হ্যান্ডশেক ব্যাপক আকার ধারণ করেছে; যা খ্রিস্টান-ইউপরোপীয়দের থেকে ধার করে নেওয়া। অথচ আমাদেরকে ওদের বিরোধিতা করার আদেশ করা হয়েছে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত উলামায়ে কিরাম এক্ষেত্রে একমত পোষণ করেছেন—গাইরে মাহরাম নারীর শরীরের কোনো অংশই স্পর্শ করা যাবে না! এটা নাফারমানি। তবে প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা। কারণ, নারীর দিকে তাকানোই যায় না, স্পর্শ করা তো আরও দূরে। আল্লামা সারাখসি রহ. বলেন—প্রয়োজন ছাড়া খাহেশাত ও প্রবৃত্তির সাথে তাকানো কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়। প্রয়োজন তখনই হবে যদি কোনো পুরুষকে নারীর বিপক্ষে সাক্ষী হিসাবে ডাকা হয়, অথবা বিচারক যখন তার ওপর বিচার করার জন্য দেখবেন, যদি সে স্বীকারোক্তি দেয় অথবা সাক্ষীরা তাকে চেনার বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়, এ-অবস্থায় তাকানো যাবে; কারণ, এখানে তাকানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই! আর শরিয়তের বড়ো একটি মলনীতি হলো—
الضرورات تبيح المحظورات প্রয়োজনের কারণে নিষিদ্ধ বিষয়ও বৈধ হয়ে যায়।
তবে যখন তার দিকে তাকাবে, তখন নিয়ত থাকতে হবে—সাক্ষ্য দেওয়া বা বিচার করা, খাহেশাত পূরণের উদ্দেশ্যে দেখা যাবে না। কারণ, যদি দেখা পরিহার করে সাক্ষ্য বা বিচার করা সম্ভব হতো, তাহলে সেটাই করা হতো; কিন্তু দেখা পরিহার করা অসম্ভব হলেও নিয়তের মাধ্যমে পরিহার করা সম্ভব। তাই নিয়তের মাধ্যমে পরিহার করবে। যেমন—লড়াইয়ের সময় মুসলিমদের সামনে যদি মুশরিকরা শিশুদের রেখে ঢাল বানায়, তাহলে মুজাহিদদের কর্তব্য হচ্ছে লড়াই বন্ধ না করা; বরং তাদের দিকে অস্ত্র চালিয়ে যাবে, তবে উদ্দেশ্য থাকবে মুশরিকরা।
আর যদি কাউকে নারীর সাক্ষী হওয়ার জন্য ডাকা হয়, অথচ সে মনে করে যে, তার দিকে তাকালে প্রবৃত্তি চলে আসবে, তাহলে এ ক্ষেত্রে একাধিক মত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন—এটা জায়িজ; তবে শর্ত হলো—সাক্ষ্য গ্রহণের নিয়তে তাকাবে, খাহেশাত পূরণের জন্য নয়। যেমন জিনার সাক্ষীর জন্য সাক্ষ্যগ্রহণের উদ্দেশ্যে জিনাকারীর সতরের দিকে তাকানো বৈধ। তবে সহিহ মত হলো—এটা বৈধ নয়। কেননা, এখানে প্রয়োজন নেই। কারণ, সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আরও অনেককে পাওয়া যাবে, যাদের খাহেশাত সৃষ্টি হবে না। পক্ষান্তরে সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে জায়িজ কারণ, সে সাক্ষ্য গ্রহণ করে দায়িত্বটা নিজের ওপর বাধ্য কর ফেলেছে। তাছাড়া সে ছাড়া সাক্ষ্য দেওয়ার আর কেউ নেই।৫১
আল্লাহ তাআলা বলেন— يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَىٰ أَن لَّا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ ..
হে নবী, যখন মুমিন নারীরা আপনার কাছে আসবে এই মর্মে বাইআত করার জন্য, তারা আল্লাহর সাথে কোনো কিছু শরিক করবে না চুরি করবে না, জিনা করবে না, নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না... ৫৫২
এই আয়াতের তাফসিরে আল্লামা ইবনু কাসির রহ. বলেন—ইমাম বুখারি রহ. বর্ণনা করেন উরওয়া থেকে যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী আয়িশা রা. তাকে বলেন, যে সকল নারীরা (মক্কা থেকে) হিজরত করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসত, তিনি তাদের এই আয়াতের মাধ্যমে (يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ) —থেকে (غَفُورٌ رَّحِيمٌ) আয়াতের শেষ পর্যন্ত যাচাই-বাছাই করতেন। উরওয়া বলেন, উম্মুল মুমিনিন আয়িশা সিদ্দিকা রা. বলেছেন—
তো, যে নারী এই শর্তগুলো মেনে নিত, তিনি তাদেরকে বলতেন— قد بایعتک کلاما (কদ বায়াতুকি কালামা) তোমার কথার মাধ্যমে তোমার বাইআত গ্রহণ করিলাম। আল্লাহর কসম! তার হাত কখনোই কোনো নারীর হাত স্পর্শ করে নি; তিনি তাদের বাইআত গ্রহণ করতেন শুধু কথার দ্বারা যে—আমি এ-বিষয়ে তোমার বাইআত কবুল করলাম। ৫৫৩
ইমাম আহমাদ রহ. রাকিকার মেয়ে উমাইমা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন—
আমি কয়েকজন নারীর সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে বাইআতগ্রহণের উদ্দেশ্যে আসি। আমরা বললাম—আল্লাহর রাসুল, আমরা আপনার হাতে বাইআতগ্রহণ করছি এই মর্মে যে, আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করব না, চুরি করব না, জিনা করব না, নিজেদের রচিত অপবাদ রটাবো না, কোনো ভালো কাজে আপনার অবাধ্যতা করব না। নবীজি বললেন—তোমরা যা করতে পারো এবং যা সাধ্যে রাখো সে বিষয়ে।
আমরা বললাম—আমাদের চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই আমাদের প্রতি অধিক দয়াবান, আসেন, আমরা আপনার হাতে বাইআত গ্রহণ করি, হে আল্লাহর রাসুল!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—আমি নারীদের সাথে হাত মেলাই না!
একজন নারীকে আমার এই কথা বলা— 'বাইআত কবুল করলাম' —এটা একশজন নারীকে বলার মতো।২৫৪
ইবনু হাজার রহ. বলেন—এ হাদিসের দ্বারা গাইরে মাহরাম নারীর শরীর স্পর্শ করা হারাম বলা হয়েছে। ২৫৫
আমি বলি—জানা বিষয় যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গুনাহ থেকে মাসুম ছিলেন। তাছাড়া বাইআত গ্রহণের—এক ধরনের চুক্তি ছিল—সময় পুরুষরা তাঁর সাথে হাত মিলাত, তা সত্ত্বেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদের সাথে হাত মেলানো থেকে বিরত থেকেছেন। এমনকি স্পষ্টভাবে বলেও দিয়েছেন যে, নারীদের সাথে পুরুষের হাত মিলানো হারাম যাতে তার পরবর্তী খলিফারা তাকে এ ক্ষেত্রে অনুসরণ না করে। এই মাসআলার ক্ষেত্রে চারও মাজহাবের উলামায়ে কিরাম একমত পোষণ করেছেন যে—হাত মেলানো হারাম। হ্যাঁ, শুধু এ-যুগে একটা কথা পাওয়া যায় যে, গাইরে মাহরাম নারীর সাথে হাতমেলানো বৈধ, সামনে এ বিষয়ে বিশ্লেষণ করা হবে। মুসাফাহার বিষয়ে ফকিহ আলিমদের অভিমত—
০১. হানাফি উলামায়ে কিরামের অভিমত: 'আদদুররুল মুখতারে' আছে (যার দিকে তাকানো বৈধ) পুরুষ হোক বা নারী (তাকে স্পর্শ করাও বৈধ) যদি নিজেরে বিষয়ে খাহেশাতের আশঙ্কা না করে, আর যদি আশঙ্কা করে কিংবা সে বিষয়ে দ্বিধা-দ্বন্দে থাকে তাহলে দেখাও জায়িজ নেই, স্পর্শ কারাও জায়িজ নেই (তবে যদি গাইরে মাহরাম হয়) তাহলে তার চেহারা হাত কিছুই স্পর্শ করা বৈধ নয় যদিও খায়েশাতের ভয় না করে কারণ এটা আরও বেশি খতরনাক। এ'মাসআলা যুবতী নারীর ক্ষেত্রে। আর যদি বৃদ্ধা হয় যাকে দেখলে খায়েশাত সৃষ্টি হয় না তাহলে তার সাথে মুসাফাহা করতে পারবে, তার হাত স্পর্শ করতে পারবে যদি খায়েশাতের আশঙ্কা না করে'... আল্লামা ইবনু আবেদীন বলেন আরেকটা মত আছে (বৃদ্ধার সাথে মুসাফাহা করার ক্ষেত্রে) পুরুষকেও এমন হতে হবে যাকে দেখলে কাম প্রবৃত্তি সৃষ্টি হয় না (আল্লামা কাহাসতানি, কিরমানী রহ. থেকে বর্ণনা করে বলেন) 'যাখীরা' কিতাবে আছে যদি বৃদ্ধা এমন হয় যাকে দেখলে কামপ্রবৃত্তি সৃষ্টি হয় না, তাহলে তার সাথে মুসাফাহা করা যাবে, তার হাত স্পর্শও করা যাবে, আর যদি বৃদ্ধ হয় যে নিজের ব্যাপারে এবং নারীর ব্যাপারে খায়েশাতের আশঙ্কা না করে তাহলে নারীর সাথে মুসাফাহা করা যাবে। আর যদি নিজের ব্যাপারে অথবা নারীর ক্ষেত্রে আশঙ্কা করে তাহলে এটা থেকে বিরত থাকতে হবে।
তো, আল্লামা ইবনু আবিদিন রহ.-এর কথা থেকে জানা যায়-বৃদ্ধা নারী স্পর্শ করার ক্ষেত্রে দুটো মত পাওয়া যায়:
০১. একমত অনুযায়ী মুসাফাহা জায়িজ, যদি তাদের একজন এমন হয়, যাকে দেখলে কামপ্রবৃত্তি সৃষ্টি হয় না।
০২. আরেক মতনুযায়ী প্রত্যেককেই এমন হতে হবে যাকে দেখলে, দুজনের কারওরই কামপ্রবৃত্তি সৃষ্টি হয় না। তবে দ্বিতীয় মতই অগ্রাধিকারযোগ্য। বিশেষ করে এই ফিতনা-ফাসাদের যুগে। কারণ, যে স্পর্শ করবে তার মনে যদিওবা কামপ্রবৃত্তি না থাকে, কিন্তু অপরজনের ক্ষেত্রে তো আশংকা আছে।
ইমাম সারাখসি রহ বলেন-যদি নারীর কামপ্রবৃত্তি সৃষ্টি হওয়ার আশা থাকে, তাহলে তার সাথে মুসাফাহা করা যাবে না। যেমন, যদি নিজের ক্ষেত্রে আশঙ্কা থাকে। ২৬
আল্লামা মারগিনানি রহ. তার প্রখ্যাত কিতাব হিদায়াতে উল্লেখ করেন-পুরুষ গাইরে মাহরাম, নারীর হাত মুখ কিছুই স্পর্শ করতে পারবে না। যদিও খায়েশাতের আশঙ্কা না করে।
আল্লামা সামারকান্দি বলেন-নারী যদি যুবতি হয় তাহলে খায়েশাত থাকুক বা না থাকুক, উভয় অবস্থাতেই স্পর্শ করা হারাম, আর যদি বৃদ্ধা নারী হয় তাহলে খায়েশাতের ভয় না থাকলে তার সাথে মুসাফাহা করা যাবে আর যদি বৃদ্ধা নারীর খায়েশাত থাকে, তাহলে মুসাফাহা করা যাবে না। যদিও পুরুষের খায়েশাত না থাকে।
হাফিজ জাইলায়ি রহ. বলেন-পুরুষ, নারীর হাত স্পর্শ করতে পারবেনা যদিও খাহেশতের ভয় না থাকে কারণ এটা হারাম তদ্রপ, এখানে কোনো প্রয়োজনও নেই, না করাতে অনেক কষ্ট মছিবত চলে আসবে তাও নয়।৫৫৮
০২. মালিকি মাজহাবের উলামায়ে কিরামের অভিমত: আল্লামা বাজি রহ. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
إني لا أصافح النساء আমি নারীদের সাথে মুসাফাহা করি না।
অর্থাৎ, আমার হাতের সাথে তাদের হাত লাগাই না, নবীজি একথার মাধ্যমে-তবে আল্লাহই ভালো জানেন- (স্পর্শ করা থেকে) বিরত থাকতে চাচ্ছেন। মানে, পুরুষদের বাইআতগ্রহণ ছিল হাতে হাত রাখার মাধ্যমে, তো, নবীজি নারীদের বাইআতগ্রহণের ক্ষেত্রে হাতে হাত রাখা থেকে নিষেধ করেছেন। কারণ, তখন তাদের স্পর্শ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে (যা হারাম)।৫৫৯
আসহালুল মাদারিক নামক কিতাবে আছে, কোনো নারীর সাথে পুরুষের মুসাফাহা করা বৈধ নয়, যদিও পরিচিতির জন্য করা হয়। কারণ, শুধু দেখাটাই বৈধ (এর বেশি কিছুতেই নয়)।৫৬০
০৩. শাফিয়ি মাজহাবের উলামায়ে কিরামের অভিমত: ইমাম নববি রহ. বলেন-সুন্দর লাবণ্যময় চেহারার অধিকারী বালকের সাথেও মুসাফাহা করা থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ তার দিকে তাকানোই হারাম। আমাদের (মাজহাবের) উলামায়ে কিরাম বলেন-যার দিকে তাকানো হারাম, তাকে স্পর্শ করাও হারাম; বরং স্পর্শ করা তো আরও বেশি খতরনাক। কারণ, গাইরে মাহরাম নারীর দিকে তাকানো তখনই জায়িজ, যদি তাকে বিয়ে করতে চায় অথবা বেচাকেনা, লেনদেন বা এই জাতীয় কিছু করতে চায়; কিন্তু এ-সবের কোনো অবস্থাতেই স্পর্শ করা জায়িজ নয়।১৬১
হাফিজ ইবনু হাজার রহ.-ও বলেন-হাদিসে বর্ণিত মুসাফাহা করা থেকে (দুজনের সাথে মুসাফাহা) বাদ দেওয়া হবে:
* ০১. গাইরে মাহরাম নারীর সাথে, এবং;
* ০২. সুশ্রী লাবণ্যময় সুন্দর বালকের সাথে মুসাফাহা করা।১৬২
হাফিজ ইরাকি রহ. বলেন—আয়িশা রা.-এর হাদিসে আছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন স্ত্রী ও মালিকানাধীন দাসী ছাড়া কারও হাত স্পর্শ করতেন না, না-বাহাইতগড়ের সময়ে, আর না অন্য সময়ে। তিনি মাসুম ও সন্দেহযুক্ত হওয়ার পরও যদি নারীদের সাথে মুসাফাহা না করেন, তাহলে অন্যানদের কর্তব্য তো আরও বেশি বিরত থাকা। বাহ্যিকভাবে এটাই প্রতীয়মাণ হয় যে, হারাম হওয়ার কারণেই তিনি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতেন।
০৪. হাফলি মাজহারের উলামায়ে কিরামের অভিমত: ‘কাশফুল কিনা’ কিতাবে আছে—গাইরে মাহরাম যুবতী নারীর সাথে মুসাফাহা করা বৈধ নয়। কারণ, এটা তাকওয়ানো চেরেও ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক আর যদি বৃদ্ধ হয় তাহলে মুসাফাহা করাইবেখ।
আল-ইনসাফ ফি মারিফাতির রাজਿਹ মিনাল খিলাফ কিতাবে আছে—ইমাম আহমদ রহ. নারীদের সাথে মুসাফাহা করাকে অপছন্দ করেছেন; বরং এক্ষেত্রে খুব কঠোরতা করে মুহরিম ব্যক্তির জন্যেও মাকরূহ বলেছেন। তবে পিতার জন্য জায়েজ বলেছেন।
আর রাজউন নাদিয়্যি কিতাবে আছে—গাইরে মাহরাম যুবতি নারীর সাথে মুসাফাহা করাইবেন্না।
যারা এই মতের বিরোধিতা করেছেন, তাদের অভিমত : তাকিউদ্দিন নাযাহানি তার কিতাব আন-নিজামুল ইজতিমায়ি ফিল ইসলামিতে বলেন—পুরুষ নারীর সাথে মুসাফাহা করতে পারে, নারী পুরুষের সাথে মুসাফাহা করতে পারে, এ ক্ষেত্রে কোনো বাধা বা প্রতিবন্ধকতা নেই।
তিনি আরও বলেন—বাহাইতগড়ের হাতের মাধ্যমে হতে পারে, লেখার মাধ্যমে হতে পারে, এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই, পুরুষ যেমন খলিফার হাতে বাইআত করতে পারে, নারীরাও হাতে হাত রেখে বাইআতগ্রহণ করতে পারবে।
তার মতের পক্ষে একাধিক দলিল আছে। আমরা সেই দলিলগুলো উল্লেখ করার পাশাপাশি তার খণ্ডনও উল্লেখ করব—
হাতিলীল ০১ : তিনি উম্মু আতিয়্যা রা.-এর হাদিস থেকে যা বুঝতে পেরেছেন, এটাই তার দলিল। উম্মু আতিয়্যা বলেন-
আমরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে বাইআত করি, (أن لا يُشْرِكْنَ بالله شيئا) এই আয়াত তখন নবীজি আমাদের্কে (أن لا يُشْرِكْنَ بالله شيئا) এই আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন। তিনি আমাদের বিলাপ করতে নিষেধ করেন। তখন আমাদের সাথে থাকা এক নারী তার হাত গুটিয়ে বলল- অমুক নারী তো আমাকে একটা কাজে সাহায্য করেছিল, এখন আমি তাকে তার প্রতিদান দিতে চাই।
নবীজি কিছুই বললেন না তাকে। তারপর সে গিয়ে আবার ফিরে এলো। পরবর্তী সময়ে উম্মু সুলাইম, উম্মুল আলা, আবু সুবরার কন্যা-যিনি মুআজ রা.-এর স্ত্রী, অথবা আবু সুবরার কন্যা ও মুআজ রা.-এর স্ত্রী ছাড়া কোনো নারী-(বাইআতকৃত বিষয়গুলো) পূর্ণ করে নি।৫৬৮
তো নাবাহানি বলছেন-এই হাদিস প্রমাণ করে যে, নবীজি নারীদের হাতে হাত রেখে বাইআত গ্রহণ করেছেন। যার প্রমাণ, উম্মু আতিয়্যা রা. এই হাদিসে বলেছেন-'আমাদের এক নারী তার হাত গুটিয়ে ফেলে'। কারণ, এই কথার অর্থ হচ্ছে, সাথে থাকা অন্যান্য নারীরা নিজেদের হাত গুটিয়ে নেন নি। আর এখানেই বোঝা যায় যে-তারা নবীজির হাতে হাত রেখে বাইআত গ্রহণ করেছেন।
একাধিক দিক থেকে এই দাবির উত্তর দেওয়ার সুযোগ আছে। আমরা তিনটি দিক উল্লেখ করে এই দাবির উত্তর দিচ্ছি, ইন শা আল্লাহ-
প্রথম দিক : হাদিসে বর্ণিত, হাত গুটিয়ে নেওয়ার অর্থ, বিলম্ব করে বাইআত কবুল করা। যেমন, হাফিজ বদরুদ্দিন আইনি বলেন-হাত গুটিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য: 'বিলম্ব করে বাইআত কবুল করা।' ৫৬৯ এর উদাহরণ হলো, মুনাফিকদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন- (أيديهم ويقبضون - আর তারা নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখে।) এখানে উদ্দেশ্য: 'আল্লাহর রাস্তায় তাদের দান না করা।' আল্লামা শামসুদ্দিন বারমাবি বলেন-এখান থেকে এটা উদ্দেশ্য নেওয়া যাবে না যে, তারা হাত রেখেই বাইআত করেছিল। কারণ, এটা দ্বারা উদ্দেশ্য তারা বাইআতের সময় হাত দিয়ে ইঙ্গিত করেছে, স্পর্শ করে নি।৫৭০
দ্বিতীয় দিক: আমরা যদি ধরেও নিই যে, হাতে হাত রেখে ওই বাইআত হয়েছিল, তাহলে আমরা উত্তরে বলব-হাতে হাত রাখার মাঝে অন্য কোনো কিছু আড়াল ছিল; যেমনটা হাফিজ আইনি রহ. উমদাতুল কারিতে পরস্পর বিরোধপূর্ণ বর্ণনায় মাঝে সামঞ্জস্য বিধান দিতে গিয়ে বলেছেন।
তৃতীয় দিক: নারীদের বাইআতগ্রহণে যতগুলো সুস্পষ্ট ও সুসাব্যস্ত বর্ণনা পাওয়া যায়, সবগুলো বর্ণনা থেকে এই কথাই জানা যায় যে—নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদের সাথে হাত লাগান নি। যেমন—
এক. আম্মাজান আয়িশা রা.-এর হাদিস গিয়েছে, যেখানে হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি বলেছেন—
لا والله ما مست يد رسول الله يد امرأة قط غير أنه بايعهن بالكلام
আল্লাহর কসম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত কখনো কোনো (গাইরে মাহরাম) নারীর হাত স্পর্শ করে নি; তবে, তিনি শুধু কথার মাধ্যমে তাদের বাইআত করেছেন।
দুই. আব্দুল্লাহ ইবনু আমর থেকে বর্ণিত—রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইআতের ক্ষেত্রে নারীদের সাথে মুসাফাহা করতেন না (হাতে হাত রাখতেন না)। ৫৭১
তিন. উমাইমা বিনতু রাকিকা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন—
আমি কয়েকজন নারীর সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বাইআত গ্রহণ করার জন্য আসি। তখন নবীজি আমাদের বললেন— (তোমরা বাইআত গ্রহণ করো) যে বিষয় তোমরা করতে পার ও সাধ্য রাখ। আমি নারীদের সাথে মুসাফাহা করি না। ৫৭২
তো, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে যা বললেন তা উম্মু আতিয়্যা রা.-এর ব্যাখ্যার (যা নাবাহানি করেছেন) বিপরীত। আর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা ও বাণী সর্বাবস্থায় অন্য যে কারও কথার ওপর অগ্রধিকারপ্রাপ্ত।
এই সমস্ত সহিহ ও সুস্পষ্ট দলিলগুলো প্রমাণ করে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইআতের ক্ষেত্রে কোনো নারীর সাথে মুসাফাহা করেন নি। সুতরাং মুসলিম হলে তার জন্যেও উচিত নয়, এই দলিল ছেড়ে দিয়ে উম্মু আতিয়্যা রা.-এর হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা গ্রহণ করবে। তাছাড়া ওই হাদিসে তো মুসাফাহা বা হাত স্পর্শ করার কথা উল্লেখই নেই।
শাইখ আলবানি রহ. বলেন—মোটকথা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলঅইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনো সহিহ সূত্রে একথা বর্ণিত হয় নি যে, তিনি কখনো কোনো নারীর সাথে মুসাফাহা করেছেন। এমনকি বাইআতের ক্ষেত্রেও না, সাক্ষাৎ গ্রহণের সময় মুসাফাহা করা তো দূরের কথা; কিন্তু নারীর সাথে মুসাফাহা জায়িজ করার জন্য মুসাফাহার দলিল হিসাবে পেশ করা। যে-সকল সহিহ হাদিসে মুসাফাহার উল্লেখ নেই, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া, নিশ্চয়ই এখানে কোনো স্বার্থ আছে, যা কোনো মুমিন মুখলিস বান্দার পক্ষে সম্ভব নয়।১৭৩
দলিল - ০২: নাবাহানি বলেন—নারীর হাত তার সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়, তদুপরি খাহেশাত না থাকলে তাকানো হারাম নয়। সুতরাং তার সাথে মুসাফাহা করাও হারাম নয়।১৭৪
এই দাবির উত্তর : আহলে ইলমের নিকট নারীর হাত সতর না হওয়া এটা প্রমাণ করে না যে, নারীকে স্পর্শ করা, তার সাথে মুসাফাহা করা জায়িজ; বরং এ-ব্যাপারে তো উলামায়ে কিরামের ইজমা আছে যে, প্রয়োজন ছাড়া নারীর, চেহারা, হাত স্পর্শ করা হারাম। যদিও এই দুটো অঙ্গ সতরভুক্ত নয়, যেমনটা ইতিপূর্বে উলামায়ে কিরামের অভিমতে আলোচিত হয়েছে। প্রার্থক্য শুধু এতুটুকু যে প্রয়োজনের কারণে হাত ও চেহারা খুলে রাখা যায়, না-হয় তাদের জন্য কষ্ট হয়ে যাবে; কিন্তু এই প্রয়োজনটা স্পর্শ করার ক্ষেত্রে নেই।
দলিল - ০৩ : ইবনু কাসির রহ. তার তাফসিরে ইবনু আব্বাস রা. থেকে একটা দীর্ঘ হাদিস উল্লেখ করেন। যারা নারীর সাথে মুসাফাহাকে জায়িজ বলেন, তারা এই হাদিস দিয়ে তাদের পক্ষে দলিল হিসেবে পেশ করেন। হাদিসটির কিছু অংশ হলো—
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নারীদের বাইআত গ্রহণ করছিলেন, তখন আবু সুফইয়ানের স্ত্রী হিন্দার মুখ আবৃত ছিল; কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে চিনে ফেলেন। নবীজি তাকে ডাক দিলে হিন্দা নবীজির হাত ধরে ফেলে।
নবীজি তাকে বলেন—তুমি সেই হিন্দা!
তখন হিন্দা বলে—আল্লাহ তো পূর্বের সব গুনাহ মাফ কর দিয়েছেন!
ফলে রাসুলুল্লাহ সাললাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ছেড়ে দেন। তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকেন।১৭৫
এই দাবির খন্ডন: যারা এই হাদিস দিয়ে দলিল পেশ করেছেন, তারা মূলত ইবনু কাসির রহ.-এর মন্তব্য ছাড়াই দলিল পেশ করেছেন—যা আমানতদারিতার পরিপন্থি। আল্লামা ইবনু কাসির রহ. যখন এই হাদিসটি উল্লেখ করেন, তখন হাদিস সম্পর্কে চুপ থাকেন নি, বরং হাদিসের দুর্বলতা ও সাব্যস্তহীনতা স্পষ্ট করে ব্যস্ত করে বলেন—এই হাদিসটি 'গরিব', তাছাড়া এর কিছু অংশ 'মুনকার'! আল্লাহই ভালো জানেন।
কারণ, আবু সুফইয়ান ও তার স্ত্রী যখন ইসলাম গ্রহণ করন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এড়িয়ে যান নি; বরং তাদের প্রতি আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা প্রকাশ করেছেন। এতটুকুই বিষয়ই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে উল্লেখ করার ছিল।
দলিল - ০৪ : তাদের আরেকটা দলিল, আনাস ইবনু মালিক রহ.-এর হাদিস। তিনি বলেন—
إن كانت الأمة من أهل المدينة لتأخذ بيد رسول الله صلى الله عليه وسلم فما ينفع يده من يدها حتى تذهب به حيث شاءت من المدينة في حاجتها رواه ما جاء باب البراءة من الكبر والتواضع
মদিনার লোকেদের দাসীরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত ধরে রাখত। অতঃপর তার হাত ধরে মদিনার যেখানে ইচ্ছা প্রয়োজনে যেত, এর আগ-পর্যন্ত নবীজি তার হাত ছাড়তেন না। ৭৬
এই দাবির উত্তর : এই দাবির উত্তরে আমরা তিনটি বিষয় উপস্থাপন করব—
এক. এই হাদিস 'জয়িফ'। কারণ, এই হাদিসের সনদে আলি ইবনু জায়িদ ইবনি জাদআন আছেন, যিনি দুর্বল রাবি। 'মাজমাউজ জাওয়ায়িদ' কিতাবে আল্লামা হাইসামি রহ. এমনটাই বলেছেন।
দুই. হাত ধরা দ্বারা এর 'আবশ্যকীয়' অর্থ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ অনুগত হওয়া, কোমলতা প্রদর্শন করা (কারণ কেউ যখন কারও হাত ধরে তখন সে তার অনুগত হয়ে যায়, সে যে দিকেই নিয়ে যায়, ওই দিকেই যায়)। ইবনু হাজার রহ. এমনই বলেছেন। ৭৭
তিন. এই হাদিস দ্বারা উদ্দেশ্য কি, সেটা বোঝার জন্য আমরা ইমাম আহমাদ রহ.-এর বর্ণনা দেখতে পারি, তার বর্ণনায় আছে—
إن كانت الوليدة من ولائد أهل المدينة تجي تأخذ بيد رسول الله صلى الله عليه وسلم فما ينفع يده من يدها حتى تذهب به حيث شال ...
মদিনাবাসী মেয়েরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে তাঁর হাত ধরে রাখত। নবীজি তাদের হাত ছাড়তেন না, যতক্ষণ না তারা যেখানে ইচ্ছা সেখানে নবীজিকে নিয়ে যায়।২৭৮
এখানে হাদিসে وليدة শব্দ আছে (পূর্বের হাদিসে أمة শব্দটি ছিল যার অর্থ : দাসী) যার অর্থ ছোটো মেয়ে শিশু ভাষাবিদ ফায়ুমি বলেন, الوليد অর্থ নবজাতক বহুবচন ولدان শব্দটি দাসী অর্থেও ব্যবহৃত হয়, তখন এর বহুবচন হয় أولاءد সুতরাং পূর্বের হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় না, যে গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে নারী মুসাফাহা করতে পারবে।
তাছাড়া মাকাল ইবন ইয়াসার রা.-এর হাদিসে এসছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
لأي يطعن في رأس أحدكم بمخيط من حديد خير له من اي بس امرأة لا تحل له
তোমাদের কারও মাথায় লোহার সুই দিয়ে আঘাত করা উত্তম এমন নারীর স্পর্শ করা থেকে যে তার জন্য হালাল নয়।২৭৯
আল্লাহ তাআলাই সঠিক বিষয়ে অধিক অবগত।
নির্ভরযোগ্য বড়ো বড়ো কিতাবের আলোকে এই ইলমি আলোচনা জানার পর একজন গবেষক যিনি ইনসাফের দৃষ্টিতে দেখেন, নিজের মত ও প্রবৃত্তি থেকে দূরে থাকেন-এই আলোচনায় উল্লিখিত শরয়ি দলিলগুলো মেনে নিতে বাধ্য। এরপর তিনি আর কোনো সন্দেহ বা সংশয়ের মাঝে থাকবেন না যে, গাইরে মাহরাম নারীর সাথে মুসাফাহা করা না-জায়িজ, তাছাড়া সমস্ত উলামায়ে কিরাম এক্ষেত্রে একমতও পোষণ করেছেন। কেউ এ থেকে পিছপা হন নি। এই রকম মেনে নেওয়াই মুমিনদের শান, যারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পূর্ণ অনুসরণ করতে চায়।
টিকাঃ
* সূত্র: আল-মাবসুত, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ১৫৪
** সূরা মুমতাহিনা, আয়াত: ১২
*** সহিহ বুখারি: ২৭১৩
*** মুসনাদু আহমাদ: ২৭০০৮
*** ফাতহুল বারি, খণ্ড: ১২,
***সূত্র: আল-মাবসুত, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ১৫৪
**তুহফাতুল ফুকাহা, খণ্ড: ৩.
*** তাবয়িনুল হাকায়িক, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ১৮
*** আল-মুনতাফাফা, শারহুল মুআত্তা, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৩০৮
**০ আসহালুল মাদারিক, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৩৭০
>> আল-আজকার: ২২৮
*** সত্র; ফাতহুল বাবি, খণ্ড
২৫৫ তারকুত তাসমির, খণ্ড : ৭, পৃষ্ঠা : ৪২-৪২
২৫৬ কাশফুল কিনা, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১৫৪
২৫৭ আল-ইনসাফ ফি মারিফাতির রাজਿਹ মিনাল খিলাফ, খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ৫৯
২৫৮ আর রাজউন নাদিয়্যি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা :
৫৬৮ সহিহ বুখারি: ৭২১৫, অনুচ্ছেদ: নারীদের বাইআত গ্রহণ。
৫৬৯ উমদাতুল কারি, খণ্ড: ১৯, পৃষ্ঠা: ২৩১
৫৭০ আল-লামিউস সহিহ বি-শারহিল জানিয়িত মন্ত্রিরatch পৃষ্ঠা: ১৫৮
৫৭১ মুসনাদু আহমাদ: ৬৯৯৮
৫৭২ সুনান ইবনি মাজাহ: ২৮৭৪, অনুচ্ছেদ: নারীদের বাইআত গ্রহণ。
*১৭৩ সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহা: ২৫৫
*১৭৪ আন-নিজামুল ইজতিমায়ি ফিল ইসলাম: ৩৫
*১৭৫ তাফসিরু ইবনি কাসির, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ১২৬
২৭৯ সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১৭৭, অনুচ্ছেদ: অহংকার ও বিনয় থেকে মুক্ত হওয়া。
** ফাতহুল বারি, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা
* মুসনাদু আহমাদ : ১২৭৮০
** মুজামুত তাবারানি, তার সব রাবি সহিহ, মাজমাউজ জাওয়ায়িদ, আল্লামা হাইসামি, পরিচ্ছেদ • একান্তে মিলিত হওয়ার নিষেধ করা