📄 ধর্মবিমুখ শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষতি
শিক্ষার্থী যদি দ্বীনি ইলম পরিহার করে শুধু জাগতিক শিক্ষায় মনোনিবেশ করে, তাহলে সেটা তার শিক্ষাজীবনের কোনো এক সময়ে অবশ্যই অনেক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে; যেমনটি ধর্মবিমুখ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কালচারে প্রায় দেখা যায়, যা আমাদের মুসলিম দেশগুলোতে পাশ্চাত্যের অনুকরণে, ইউরোপ-আমেরিকার অনুসরণে অহরহ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। যার ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে সামান্য যে ইলমে নাফে ও আমলে সালিহ থাকে, সেটাও ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কারণ, মানুষ শুধু বাহ্যিকটার দিকেই ছুটে; বিশেষ করে সেটা যদি ‘আজিলা’ ৪৬১ শ্রেণির হয়। আর মানুষ যা দেখতে পায় না (অভ্যন্তরীণ বিষয়), সেটার দিকে ফিরেও তাকায় না। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন-
كَلَّا بَلْ تُحِبُّونَ الْعَاجِلَةَ ٢٠ وَتَذَرُونَ الْآخِرَةَ ٢١ ‘না, প্রকৃতপক্ষে তোমরা ইহজীবনকেই (আজিলা) ভালোবাসো, আর আখিরাতকে উপেক্ষা করো।’ ৪৬২
আবু দাউদ এই আয়াতের তাফসিরে বলেন-'বরং তোমরা হে বনি আদম, যেহেতু তোমাদেরকে ত্বরান্বিত থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, এবং এই ত্বরান্বিতের ওপরই তোমাদের অভ্যস্ত করা হয়েছে; তাই তোমরা সবকিছুতেই তাড়াতাড়ি করতে চাও। আর এজন্যই তোমরা ‘আজিলা’ অর্থাৎ দুনিয়া ভালোবাসে, আর আখিরাত এড়িয়ে যাও।
কেউ কেউ বলেন-এখানে এই ‘না’ সূচক শব্দটি আনা হয়েছে মানুষকে ধিক্কার দেওয়ার জন্য। তখন দুই ক্রিয়ার ক্ষেত্রেই বহুবচন দ্বারা জাতিসত্তা উদ্দেশ্য হবে। ৪৬০
হ্যাঁ, এরকম ধর্মবিমুখ জাগতিক শিক্ষা তাদের কাছেই চাকচিক্য মনে হয়, আখিরাতে যাদের কোনো (সাওয়াবের) অংশ নেই এবং যারা আল্লাহ তাআলার সাক্ষাতের আশা করে না; বরং যারা পার্থিব জীবন নিয়েই তুষ্ট, এতেই আশ্বস্ত।
পক্ষান্তরে, প্রকৃত মুমিন-যে দুনিয়াতেও কল্যাণ চায়, আখিরাতেও কল্যাণ চায়- তার এমন করার কোনোই সুযোগ নেই। কারণ, সে তো (কুরআনে বর্ণিত) ওই সমস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা এমন ব্যবসার আশা করে, যা কখনো মন্দা যায় না। সুতরাং, মুমিনের কর্তব্য হলো-এমনভাবে জাগতিক শিক্ষা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে না পড়া, যা তার দ্বীনি ইলম, সহিহ আকিদা, আমলে সালেহের ক্ষতি করে। কারণ, জাগতিক শিক্ষা শুধু প্রয়োজনের কারণেই বৈধ। অপরদিকে, দ্বীনি ইলম ও আমলে সালেহ এ দুটো পুরোপুরি মুখ্য বিষয়। আর প্রয়োজন ও মুখ্য বিষয় এ দুয়ের মধ্যকার প্রার্থক্য সবার কাছেই দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: জাগতিক শিক্ষার বড়ো একটি ক্ষতি হলো শিক্ষার্থীদের পরিবেশ। কারণ, স্কুল-কলেজই তাদের স্থান। আর জানা বিষয় যে, প্রত্যেক স্থান ও মজলিসের কিছু প্রভাব আছে। স্বাভাবিকভাবেই একজন সহপাঠীর চিন্তা-চেতনা অপরের চিন্তা-চেতনায় প্রভাব ফেলে। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُر أَحَدُكُم مَنْ يُخَالِل
'মানুষকে চেনা যায় তার বন্ধুর আচার-আচরণের মাধ্যমে। সুতরাং, তোমাদের কেউ যখন কাউকে বন্ধু বানাবে, তখন যেন তার চরিত্র দেখে নেয়। ৪৬৪
কবি কতই না সুন্দর করে বলেন—
عن المرء لا تسأل وسل عن قرينه فكل قرين بالمقتدي يقتدي إذا كنت في قوم فصاحب خيارهم ولا تصحب الأردي فتردي مع الردي
'ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না, বরং তার সাথি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো, কারণ প্রত্যেক সাথিই তার বন্ধুকে অনুসরণ করে। যখন তুমি কয়েকজনের মাঝে থাকো, তখন তাদের মধ্যকার উত্তম ব্যক্তিদের সাহচর্য গ্রহণ করো; ভুলেও ইতর শ্রেণির মানুষের সাথে মেলামেশা করো না, তাহলে তুমিও ইতর হয়ে যাবে।'
আবু সায়িদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন—
لا تُصَاحِبْ إِلَّا مُؤْمِنًا، وَلَا يَأْكُلْ طَعَامَكَ إِلَّا تَقِيٌّ
'মুমিন ছাড়া কারও সাহচর্য গ্রহণ করো না। আর মুত্তাকি ছাড়া তোমার খাবার যেন কেউ গ্রহণ না করে।' ১৪৬৫
অভিজ্ঞতাও এই কথা বলে যে, মানুষের স্বভাব আরেক স্বভাব থেকে অনেক কিছু ধারণ করে, অথচ সে টেরও পায় না।
সুতরাং, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজ হতে নিষেধ করে স্কুল-কলেজে অবশ্যই শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সংশোধন করতে হবে। শিক্ষকদের অবশ্যই সহিহ আকিদার অধিকারী হতে হবে, আমলের পাবন্দি করতে হবে। সেই সাথে দ্বীনি ইলমের ক্ষেত্রেও যোগ্য হতে হবে, স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচি গুনাহের উপকরণ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। একইভাবে এ সকল স্কুল-কলেজের তত্ত্বাবধান হতে হবে দক্ষ, যোগ্য এবং অভিজ্ঞ আলিমদের হাতে। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
টিকাঃ
৪৬১ ‘আজিলা’ অর্থ দ্রুত আগমনকারী। উদ্দেশ্য হলো সেটাই মানুষ চায়, যা তাড়াতাড়ি আসে।
*** সূরা কিয়ামত, আয়াত: ২০-২১
*** ইরশাদুল আকলিস সালিম ইলা মাযায়াল কিতাবিল কারিম, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ৬৭
৪৬৪ তিরমিজি, ২৩৭৮
সুনানু আবি দাউদ, ৪৮৩২
📄 নারীশিক্ষা-নীতি এবং নারীশিক্ষার পদ্ধতি
এ বিষয়ে আলোচনা করতে হলে সবার আগে নারীশিক্ষা এবং নারীশিক্ষার পদ্ধতি-এ দুয়ের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে হবে।
প্রথম বিষয়-নারীর শিক্ষার হুকুম : নারী শিক্ষা যে জায়িজ, বৈধ এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই; বরং যে সকল আমল তাদের জন্য করা ওয়াজিব, সেগুলো সম্পর্কে জ্ঞান রাখাও ওয়াজিব। যেগুলো তাদের জন্য করা মুস্তাহাব, সেগুলোর ইলম রাখাও মুস্তাহাব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
طلب العلم فريضة على كل مسلم 'ইলম অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।'
এখানে, মুসলিম দ্বারা নারী-পুরুষ উভয়েই উদ্দেশ্য। যেমন: আরেক হাদিসে আছে-
من سلم المسلمون من لسانه ويده 'সেই প্রকৃত মুসলিম, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্যান্য মুসলিমরা নিরাপদে থাকে।' ৪৬৬ (এখানেও মুসলিম দ্বারা উদ্দেশ্য নারী-পুরুষ সবাই) বলাবাহুল্য যে, নারী শিক্ষা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগেও ছিল। নবীজি তাদের দ্বীনের বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দিতেন। আবু সায়িদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
قالت النِّسَاءُ للنبي صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ: غَلَبَنَا عَلَيْكَ الرِّجَالُ، فَاجْعَلْ لَنَا يَوْمًا مِن نَفْسِكَ، فَوَعَدَهُنَّ يَوْمًا لَقِيَهُنَّ فِيهِ ، فَوَعَظَهُنَّ وَأَمَرَهُنَّ، فَكَانَ فِيمَا قَالَ لهنَّ : مَا مِنْكُنَّ امْرَأَةٌ تُقَدِّمُ ثَلَاثَةً مِن وَلَدِهَا، إِلَّا كَانَ لَهَا حِجَابًا مِنَ النَّارِ فَقالَتِ امْرَأَةٌ: وَاثْنَتَيْنِ ؟ فَقَالَ: وَاثْنَتَيْنِ
'একবার নারীরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলল, পুরুষরা তো আপনার ক্ষেত্রে আমাদের ছাড়িয়ে গেছে। তাই, আপনার থেকে আমাদের একদিন সময় দিন। তখন নবীজি তাদের একদিনের ওয়াদা দিলেন। পরে তিনি তাদের সাথে দেখা করলেন। অতঃপর তাদের নসিহত করলেন এবং (কিছু) আদেশ করলেন। তিনি তাদের যে কথাগুলো বলেছেন, তার মধ্যে এটাও ছিল যে, তোমাদের মধ্য থেকে যে নারীর তিনটি সন্তান আগে মারা যাবে, তার জন্য সেই সন্তানগুলো জাহান্নাম থেকে আড়াল হয়ে থাকবে।'৪৬৭
ইমাম বদরুদ্দিন আইনি রহ. বলেন— 'পুরুষরা আমাদের ছাড়িয়ে গেছে' এর অর্থ হলো—পুরুষরা আপনার সাথে সর্বদা লেগে থাকে, ইলম ও দ্বীনের বিষয়াদি শ্রবণ করে, আর আমরা দুর্বল তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারি না। তাই, আপনি আমাদের জন্য একদিন নির্ধারণ করে দিন, যেদিন আমরা ইলম শ্রবণ করব, দ্বীনের যাবতীয় বিষয় শিখব। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, নারীরা তাদের সম্পর্কিত দ্বীনের যাবতীয় বিষয় জিজ্ঞাসা করতে পারবে। সেক্ষেত্রে পুরুষদের সাথে কথা বলা বৈধ হবে, এবং যে সকল বিষয় তাদের প্রয়োজনীয় সেসব ক্ষেত্রেও কথা বলা যাবে।১৬৮
এছাড়া কেন-ই-বা দ্বীন শেখা ও শেখানো তাদের জন্য বৈধ হবে না; অথচ দ্বীন অনুযায়ী চলতে তাদেরও আদেশ করা হয়েছে? মূলত, এই ইলম জানার মধ্যেই রয়েছে মানুষের সার্থকতা ও সম্মান। আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ 'আপনি বলেন, যারা জ্ঞান রাখে, আর যারা জ্ঞান রাখে না—তারা কি সমান হতে পারে? উপদেশ গ্রহণ করে কেবল বুদ্ধিমানরা!'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمُلْبَكَةِ فَقَالَ ائْتُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاءِ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِينَ 'আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তারপর সেগুলো ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করে বললেন— 'এগুলোর নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।'৪৬৯
এখানে, আল্লাহ তাআলা আদম আ. এর শ্রেষ্ঠত্ব ও খলিফা হওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন শুধু ইলমের মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে তালিমকে (শিক্ষা দেওয়া) ই'লাম ও ইনবা'র (জানানো) ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ, হিসাবে আবু দাউদ বলেন— তালিম (শিক্ষা দেওয়া) এমন একটি কাজ, যা এমনিতেই চলে আসে। এতে কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না। আর এই তালিম (শিক্ষা দেওয়া) শুধু মুআল্লিম বা শিক্ষকের মাধ্যমে সম্ভব নয়। বরং সেজন্য শিক্ষার্থীর ইসতিদাদ ও যোগ্যতা থাকাও আবশ্যক, যাতে সে মুআল্লিমের কাছ থেকে ফয়েজ ও বরকত গ্রহণ করতে পারে। তালিমকে ই'লাম বা ইনবা'র ওপর প্রাধান্য দেওয়ার এটাই হিকমত বা রহস্য। কারণ, ই'লাম বা ইনবা' (জানানো) কোনো কিছু শোনার মাধ্যমেই করা যায়। এক্ষেত্রে মানুষ ও ফেরেশতা সবাই সমান।
সুতরাং, এর মাধ্যমে তেমন কোনো শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় না। পক্ষান্তরে, তালিমের মাধ্যমেই ফেরেশতাদের চেয়ে আদম আ.-এর যোগ্যতা প্রতীয়মান হয়। কারণ, ফেরেশতাদের সৃষ্টিই এমন যে, তারা প্রত্যেকটি জিনিসের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় বিশ্লেষণের সাথে ইলম অর্জন করতে অপ্রস্তুত।
সুতরাং, আদম আ.-কে আল্লাহ তাআলার তালিম দেওয়ার অর্থ হলো—আল্লাহ তাআলা তার ইসতেদাদ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে তার মাঝে সমস্ত বস্তুর নাম, অবস্থা, সেগুলোর প্রত্যেকটির বৈশিষ্ট্য, এসব প্রয়োজনীয় ইলম বিশদভাবে সৃষ্টি করে দিয়েছেন।৪৭০
নারীদের হস্তলিপি শেখা: হস্তলিপি শেখার বিষয়ে অধিকাংশ ফুকাহায়ে কিরামের মত হলো, এটা বৈধ। এখন যদি আয়িশা রা. এর হাদিস এর বিপক্ষে পেশ করা হয়—
لا تنزلوهن الغرف ولا تعلموهن الكتابة وعلموهن المغزلو...
'তোমরা নারীদের বিভিন্ন কামরাতে নামিয়ে এনো না, নারীদের হস্তলিপি শিখিয়ো না। বরং তাদেরকে গীত-গজল শিক্ষা দাও।'৪৭
এ হাদিসের উত্তর হলো, উলামায়ে কিরাম এ হাদিসকে জায়িফ (দুর্বল) বলেছেন। কারণ, তাবারানির সনদে মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহিম নামক একজন রাবি আছে, যে বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করত। আর হাকিমের সনদে আব্দুল ওয়াহহাব ইবনু জাহহাক আছে। ইবনু হাজার রহ. বলেন—আব্দুল ওয়াহহাব ইবনু জাহহাক ইবনি আবান উরজি অর্থাৎ, আবুল হারিস হুমসি—যে সালমিয়া নামক স্থানে এসে বসবাস শুরু করে, সে মাতরুক (তার হাদিস পরিত্যাজ্য)। আবু হাতিম তাকে চরম মিথ্যাবাদী বলেছেন। ৪৭২
আল্লামা ইবনুল জাউজি রহ. মাউজুআত নামক কিতাবে বলেন-'এই হাদিস সহিহ নয়। অথচ আবু আবদুল্লাহ হাকিম নিসাবুরি তার সহিহ নামক কিতাবে এ হাদিস উল্লেখ করেছেন। বড়োই আশ্চর্যকর ব্যাপার যে, কীভাবে তার মত ব্যক্তির সামনে এটা অস্পষ্ট থাকলো?'
আবু হাতিম ইবনু হিব্বান বলেন- 'মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহিম শামি শামবাসীদের উদ্দেশ্যে জাল হাদিস বানাত। তার থেকে কোনো রেওয়ায়তই গ্রহণযোগ্য নয়, যদি না অন্য কোনো বিবেচ্য বিষয় থাকে। (যেমন: তার কোনো হাদিস নির্ভরযোগ্য রাবি থেকে বর্ণিত হয়েছে।) ৪৭৩
আল্লামা ইবনুল কায়সারারি তাজকিরাতুল হুফফাজ কিতাবে বলেন- 'এই হাদিসটি মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহিম শামি বর্ণনা করে শুআইব ইবনু ইসহাক থেকে, তিনি হিশাম থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি আয়িশা রা. থেকে। আর এই মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহিম ইরাকে অবস্থান করত, আর শামবাসীর কাছে জাল হাদিস বর্ণনা করত। ৪৭৪
বিপরীত দিকে, অর্থাৎ আমাদের পক্ষে আবু বকর ইবনু আবু হাসমা থেকে একটি সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে-শিফা নামক এক নারী উমার রা.-এর চাচাতো বোন ছিলেন। তিনি বলেন-আমি হাফসা রা.-এর কাছে ছিলাম, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে প্রবেশ করে বললেন-
ألا تعلمين هذه رقية النملة، كما علمتيها الكتابة
'(হাফসাকে) যেভাবে হস্তলিপি শিখিয়েছ, সেভাবে 'নামলার' ঝাড়ফুঁক কেন শিখিয়ে দাও না?' (নামলার মূল অর্থ পিপীলিকা। উদ্দেশ্য হলো পাঁজরের খুঁজলি।) ৪৭৫
আল্লামা আইনি রহ. বলেন- 'এই হাদিসটি দলিল যে, নারীদের হস্তলিপি শেখা জায়িজ, মাকরুহনয়।' ৪৭৬
টিকাঃ
*** সহিহ বুখারি, ১০১
*** উমদাতুল কারি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৩৪
*সূরা বাক্বারা, আয়াত: ৩১
৪৭০ তাফসিরে আবু সাউদ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৮৪
৪৭১ আল মুজামুল আওসাত, তাবারানি; ৭২৭১ মুজামুর সাগির লিত তাবারানি, ৩৪৯৪
* ৪৭২ তাকরীবুত তাহযীব, ৩৬৮
* ৪৭৩ ইবনুল জাওযি, আল মাওযুআত, ২/২৬৯
* ৪৭৪ তাযকিরাতুল হুফফাজ, ৩৮২
* ৪৭৫ ইমাম তাহাবি, শারহু মাআনিল আসার, ৭১৮২; আবু দাউদ, ৩৮৮৭
* নখাবল আফকার
📄 বাহিরে বের হওয়ার আদব ও শিষ্টাচার
একজন নারী যখন বাহিরে শিক্ষা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বের হবে, তখন তাকে লিবাস ও পরিধানের ক্ষেত্রে শরয়ি আদব রক্ষা করতে হবে। শরয়ি লিবাস কেমন হবে, তার বিশদ বিবরণ ফিকহ ও আদব-আখলাকের বড়ো বড়ো কিতাবে আছে। সুতরাং, সেখানে থেকেই দেখে নেওয়া যেতে পারে। এখানে, আমরা বাহিরে বের হওয়ার সময় একজন নারীর লিবাসের কিছু প্রয়োজনীয় শর্ত-শারায়েত উল্লেখ করব।
একজন নারী যখন ঘর থেকে বের হবে, তখন তাকে পরিধেয় বস্তুর ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত শর্তগুলো রক্ষা করতে হবে।
বি. দ্র. : নিম্নলিখিত সবগুলো শর্তই বাহিরে বের হওয়ার সাথে খাস নয়; বরং কিছু আছে ঘরে-বাইরে উভয় স্থানেই প্রয়োজন। আর কিছু শর্ত তো এমনও আছে, যা পুরুষদের জন্যও আবশ্যক।
প্রথম শর্ত: পুরো শরীর আবৃত করে রাখা, তবে যা বাদ দেওয়া হয়েছে তার কথা ভিন্ন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبَاهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطَّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
'আর মুমিন নারীদের বলেন-তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে থাকে। আর তারা তাদের গলা ও বুক যেন মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীরা, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন-কামনামুক্ত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারও কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে ফিরে আসো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' ৪৯৫
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন- يَاَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِن ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوْرًا رَّحِيمًا
'হে নবী, আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মুমিনদের নারীদের বলেন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে। ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' ৪৯৬
এই আয়াতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, তাদের পুরো সৌন্দর্য ঢেকে রাখতে হবে; তবে যতটুকু বাদ দেওয়া হয়েছে তার কথা ভিন্ন। এখন কতটুকু বাদ দেওয়া হয়েছে—এ নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। 'আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে থাকে' এর ব্যাখ্যায় ইমাম তাবারি রহ. বলেন—সৌন্দর্য দুই প্রকার। এক প্রকার সৌন্দর্য এমন, যা গোপন থাকে। যেমন: পায়ের নূপুর, চুড়ি, কানের দুল, হার। আরেক প্রকার সৌন্দর্য এমন, যা প্রকাশ পেয়েই যায়।
এই প্রকার সৌন্দর্য দ্বারা আয়াতে কী উদ্দেশ্য এ নিয়েও অনেক মত আছে। কেউ কেউ বলেন—বাহ্যিক কাপড়ের সৌন্দর্য। ইবনু মাসউদ রা. থেকে এরূপ বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, সৌন্দর্য দুই প্রকার—প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত। প্রকাশিত দ্বারা উদ্দেশ্য কাপড়।
আর অপ্রকাশিত দ্বারা উদ্দেশ্যে নূপুর, কানের দুল ও বালা। ইবরাহিম ও হাসান বসরি রহ. থেকেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে।
আর অন্যরা বলেন—প্রকাশিত সৌন্দর্য মানে ওই সব সৌন্দর্য যা প্রকাশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সুরমা, আংটি, বালা ও মুখ। ইবনু আব্বাস রা., সাঈদ ইবনু জুবাইর রহ. এবং আতা রহ. থেকেও এমন বর্ণিত হয়েছে।
অন্য আরেক দল বলেন—এটা দ্বারা উদ্দেশ্যে মুখ এবং কাপড়। তবে সবচেয়ে সঠিক মত হচ্ছে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য মুখ ও দুই হাত। এর মাঝে অন্তর্ভুক্ত হবে সুরমা লাগানো, চোখ, আংটি, বালা, খিজাব—এ মতটিই সবচেয়ে সঠিক। কারণ, সবাই এক্ষেত্রে একমত যে, প্রত্যেক মুসলিমকে নামাজে তার সতর ঢেকে রাখতে হবে। শুধু মুখ ও হাত খুলে রাখতে পারবে। সবার মতে, একজন নারীকে এছাড়া সবকিছু ঢেকে রাখতে হবে।
যেহেতু এটা সবার মত, তাহলে এটাও জানা হয়ে গেল যে-একজন নারী ওই অংশও প্রকাশ করতে পারবে, যা তার সতর নয়। যেমন: পুরুষরা করে থাকে। কারণ, যেটা সতর নয়, সেটা প্রকাশ করা হারাম নয়। আর যখন তার জন্য ওই অংশ প্রকাশ করা জায়িজ, তাহলে বোঝা যায়-কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে থাকে'। এর দ্বারা এটাই (অর্থাৎ, যেটা সতর নয়) উদ্দেশ্য। কারণ, এগুলোর প্রত্যেকটিই তো স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়।
ইমাম মাতুরিদি বলেন-এই আয়াত সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, (এটা দ্বারা উদ্দেশ্য) চাদর ও কাপড়।
ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- 'এটা দ্বারা উদ্দেশ্য সুরমা লাগানো, চোখ ও আংটি।'
আরেক বর্ণনায় আছে-'হাত ও মুখ।' আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-'এটা দ্বারা উদ্দেশ্য হৃদয় ও আংটি।'
যদি ইবনু মাসউদ রা.-এর বর্ণনা গ্রহণ করা হয় (চাদর ও কাপড়), তাহলে এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে-বেগানা নারীর মুখের দিকে তাকানো জায়িজ নয়।
আর যদি ইবনু আব্বাস রা.-এর ব্যাখ্যা ধরা হয়, তাহলে প্রমাণিত হয় যে-নারীর চেহারা দেখা জায়িজ, তবে কাম-প্রবৃত্তির দৃষ্টিতে নয়।
আর যদি আয়িশা রা.-এর কথা নেওয়া হয় (হৃদয় ও আংটি), তাহলে এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে-দুই হাত ও দুই পা দেখা যাবে। কারণ, এ দুটো স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশিত হয়ে থাকে। তাছাড়া ওজুর ফরজ হওয়ার ক্ষেত্রেও এ দুটো অঙ্গ জাহিরির অন্তর্ভুক্ত। যদি এমনই হয়, তাহলে এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে-পা প্রকাশ করেও নারীরা নামাজ পড়তে পারবে।৪৯৭
অতএব বোঝা গেল-নারীর মুখ, পা সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়। বেগানা পুরুষ এসব অঙ্গের দিকে তাকাতে পারবে (প্রবৃত্তির সাথে নয়)। আবু বকর জাসসাস রহ. এরূপ মত ব্যক্ত করেছেন।৪৯৮
সুতরাং, পা সতর নয় এটাই সহিহ মত, যেমন হিদায়ায় আছে। হিদায়ার ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইনায়াতে এর কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে-যখন জুতা পরে বা খালি পায়ে হাঁটে, তখন তাকে পা দুটো প্রকাশ করেই রাখতে হয়। কারণ, সবসময় তো আর মোজা পাওয়া যায় না। তাছাড়া পায়ের দিকে তাকালে এতটা কামভাব জাগে না, যতটা জাগে মুখের দিকে তাকালে। এরপরও যখন মুখ সতরের অন্তর্ভুক্ত হলো না প্রবৃত্তি থাকা সত্ত্বেও, তাহলে তো পা আরও আগেই সতরের অন্তর্ভুক্ত হবে না। ৪৯৯ কানযুল উম্মাল এ আছে—একজন স্বাধীন নারী নারীর সতর তার পুরো শরীরই— মুখ, হাত ও পা ছাড়া।
এখন হাতের পৃষ্ঠভাগ সতর কি না, এক্ষেত্রেও বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। মারাকিল ফালাহ কিতাবে আছে-সহিহ মত হচ্ছে, হাতের তালু ও পৃষ্ঠভাগ কোনোটাই সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়। এর কারণ হলো, প্রয়োজনের আধিক্য।১০০
দ্বিতীয় শর্ত: যে পোশাক নিয়ে বের হবে, সেটাতে যেন সৌন্দর্যের চাকচিক্য না থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَهِلِيَّةِ الْأُولَى
‘আর তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো, প্রথম জাহিলিয়াতের যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না।’ ৫০১
অর্থাৎ, তোমরা নিজেদের সৌন্দর্য ও চাকচিক্য পুরুষদের সামনে প্রকাশ করো না। প্রথম জাহিলি যুগে নারীরা যেমন তাদের সৌন্দর্য ও চাকচিক্য পুরুষদের সামনে প্রকাশ করত, তোমরা এমনটা করো না। ফুজালা ইবনু উবাইদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
ثلاثة لا تسأل عنهم: رجل فارق الجماعة، وعصى إمامه، ومات عاصيا وأمة أو عبد أبق فمات، وامرأة غاب عنها زوجها، قد كفاها مؤنة الدنيا فتبرجت بعده، فلا تسأل عنهم
তিন শ্রেণির ব্যক্তি, তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না- ০১. এমন ব্যক্তি, যে (মুসলিমদের) জামাআত থেকে পৃথক হয়, শাসকের অবাধ্যতা করে, অবাধ্য হয়েই মারা যায়। ০২. এমন দাস-দাসী, যে তার মনিব থেকে পালিয়ে (এভাবেই) মারা যায়। ০৩. এমন স্ত্রী যার স্বামী প্রবাসে থাকে, সেই স্ত্রী দূরে অবস্থান করে তার দুনিয়াবি প্রয়োজন পূরণ করে, তারপরও অন্যের সামনে তার সৌন্দর্য প্রকাশ করে বেড়ায়। সুতরাং, তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না।১০২
একজন নারীর পোশাকে যে পরিমাণ সৌন্দর্য ও বিভিন্ন ডিজাইন থাকে, সেই পোশাকে সজ্জিত অবস্থায় যদি কোনো নারী বের হয়, তাহলে অবশ্যই সেটা ফিতনার কারণ হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই, বিশেষ করে এই ফিতনা-ফ্যাসাদের যুগে।
তৃতীয় শর্ত : নারীর পরনের কাপড় ঘন ও পুরু হতে হবে, পাতলা হবে না। কারণ, এছাড়া পুরোপুরি আবৃত করা সম্ভব নয়। তাছাড়া কাপড় পাতলা হলে তো সৌন্দর্য বরং বৃদ্ধি পায়, ফিতনার ভয় বেশি থাকে। এ সম্পর্কেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
سيكون في آخر أمتي رجال يركبون على سروج كأشباه الرجال ينزلون على أبواب المساجد، نساؤهم كاسيات عاريات على رؤوسهن كأسنمة البخت العجاف، العنوهن فإنهن ملعونات.
'আমার উম্মাহর শেষ যুগে কিছু নারীর উদ্ভব ঘটবে, যারা পোশাক পরবে কিন্তু উলঙ্গ থাকবে-এদের মাথার ওপর থাকবে উটের (হেলে পড়া) কুঁজের মতো। এদেরকে তোমরা অভিশাপ দাও, কারণ, এরা অভিশপ্ত। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
قال رسول الله ﷺ : صنفان من أهل النار لم أرهما، قوم معهم سياط كأذناب البقر يضربون بها الناس، ونساء كاسيات عاريات مميلات مائلات رؤوسهن كأسنمة البخت المائلة، لا يدخلن الجنة، ولا يجدن ريحها، وإن ريحها ليوجد من مسيرة كذا وكذا
'দুই শ্রেণির জাহান্নামি আছে, যাদের আমি দেখতে পাই নি। একদলের সাথে গরুর কানের মতো চাবুক থাকবে, যা দিয়ে তারা মানুষকে মারে। আরেক শ্রেণির নারী আছে, যারা পোশাক পরিহিত তবে উলঙ্গ-যারা অন্যদের আকর্ষণ ও আকৃষ্ট করে, তাদের মাথার চুল উটের (হেলে পড়া) কুঁজের মতো। এরা জান্নাতে প্রবশে করবে না, এমনকি এর সুঘ্রাণও পাবে না; অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ তো বহু দূর থেকেও পাওয়া যায়।' ৫০০
টিকাঃ
৪৯২ সূরা নূর, আয়াত: ৩১
৪৯৭ তাফসিরুল মাতুরিদি, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৫-৪৪
৪৯৮ শারহু মখতাসারুত তাহাবি, খণ্ড: ১ পৃষ্ঠা: ৭০০
* আল-ইনায়া শারহুল হিদায়া, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৫৯
* মারাকিল ফালাহ, ৯১
* সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৩
* মুসতাদরাকে হাকিম, ৪১
২০০ মুসলিম, ২১২৮
📄 ‘কাপড় পরিহিত উলঙ্গ’ দ্বারা উদ্দেশ্য কী?
এখানে, অনেকগুলো মত আছে। একটি মত হলো-এরা এমন পাতলা কাপড় পরে, যার ফলে (বাহির থেকে) তাদের শরীর দেখা যায়। যদিও তারা পোশাক পরিহিত, কিন্তু বাস্তবে তারা উলঙ্গ, বিবস্ত্র। মোল্লা আলি কারী রহ. এমনই তার মিরকাতে বলেছেন।
আলকামা ইবনু আবু আলকামা থেকে, তিনি তার মায়ের কাছ থেকে বর্ণনা করেন, তার মা বলেছেন—একবার হাফসা বিনতু আবদির রহমান উম্মুল মুমিনিন আয়িশা রা.-এর কাছে আসেন। হাফসার পরনে ছিল পাতলা ওড়না। তখন আয়িশা রা. ওই পাতলা ওড়না ছিঁড়ে মোটা ওড়না বানিয়ে তাকে পরিয়ে দিলেন।৫০৪
চতুর্থ শর্ত : কাপড় প্রশস্ত ও ঢিলেঢালা হতে হবে, সংকীর্ণ বা আঁটসাঁট (টাইট) হওয়া যাবে না। না হলে শরীরের আকৃতি ফুটে উঠবে। কারণ, কাপড় পড়ার উদ্দেশ্যই ফিতনা উৎপাটন করা। আর এটা ঢিলেঢালা কাপড় ছাড়া সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে কাপড় আঁটসাঁট হলে যদিওবা শরীর ঢেকে যাচ্ছে, কিন্তু শরীরের আকৃতি ফুটে উঠছে। আর এ থেকেই ফিতনা সৃষ্টি হবে, অশ্লীলতার দিকে নিয়ে যাবে। আবু ইয়াজিদ মুযানি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমার রা. নারীদের কিবতি পোশাক পরতে নিষেধ করতেন। তখন তারা আপত্তি করে বলে উঠল, এতে তো শরীর দেখা যায় না? জবাবে তিনি বললেন—শরীর দেখা না গেলেও আকৃতি তো দেখা যায়।৫০৫
পঞ্চম শর্ত : কাপড় উসফুর রং মিশ্রিত হবে না, সুগন্ধিযুক্ত হবে না। কারণ, বহু হাদিসে নারীদের বাহিরে বের হওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। আমি সেগুলো থেকে কয়েকটি হাদিস তুলে ধরছি: (১) আশআরি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
أيما امرأة استعطرت فمرت على قوم ليجدوا ريحها فهي زانية
'যেকোনো নারী সুগন্ধি ব্যবহার করে কারও পাশ দিয়ে যায়, যাতে তারা তার ঘ্রাণ পায়, তাহলে সে নারী জিনাকারী।' ৫০৬
(২) আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা.-এর স্ত্রী জাইনাব সাকিফিয়া থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
إذا خرجت إحداكن إلى العشاء، فلا تمس طيبا
'যখন তোমাদের কোনো নারী রাতে বের হয়, সে যেন সুগন্ধি স্পর্শও না করে।' ৫০৭
(৩) আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, একবার এক নারী তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করল, যার ঘ্রাণ চারপাশে ছড়াচ্ছিল। তখন তিনি ডেকে বললেন—এই অহংকারী দাসী, তুমি কি মসজিদেই যাচ্ছ? সে বলল, হ্যাঁ।
তিনি বললেন—যাও, ফিরে যাও এবং গোসল করো। কারণ, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি—
ما من امرأة تخرج إلى المسجد تعصف ريحها فيقبل الله منها صلاتها حتى ترجع إلى بيتها فتغتسل
যেকোনো নারী মসজিদে গমন করবে, যার ঘ্রাণ চারপাশে ছড়িয়ে যায়; তার বাড়িতে ফিরে গোসল করার আগ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তার নামাজ কবুল করবেন না।১০৮
(৪) আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
لا تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللهُ مَسَاجِدَ الله وليخرجن تفلات
‘তোমরা আল্লাহর বান্দাদের আল্লাহর মসজিদে যেতে বাধা দিয়ো না। আর এরা অবশ্যই দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে বের হবে।’২০৯
(৫) আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
بينما رسول الله صلى الله عليه وسلم جالس في المسجد، إذ دخلت امرأة من مزينة ترفل في زينة لها في المسجد، فقال النبي صلى الله عليه وسلم: «يا أيها الناس انهوا نساءكم عن لبس الزينة، والتبختر في المسجد، فإن بني إسرائيل لم يلعنوا حتى لبس نساؤهم الزينة، وتبخترن في المساجد»
একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাজলিসে বসা ছিলেন। এমন সময় ‘মুজাইনা’ গোত্রের এক নারী মসজিদে সৌন্দর্যকর এক পোশাক পরে অহংকার প্রদর্শন করছিল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
‘হে লোকসকল, তোমাদের নারীদের সাজসজ্জাকর কাপড় পরতে, মসজিদে অহংকার প্রদর্শন করতে নিষেধ করো। কারণ, বনি ইসরাইলকে তখনই লানত ও অভিশাপ দেওয়া হয়েছে, যখন তাদের নারীরা সাজসজ্জাকর কাপড় পরেছে এবং মসজিদে অহংকার প্রদর্শন করতে শুরু করেছে।১১০
সুগন্ধি মেখে বাহিরে বের হওয়ার নিষেধাজ্ঞা সেখানে প্রযোজ্য, যেখানে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কিছু থেকে থাকে। যেমন: চাকচিক্যপূর্ণ পোশাক, বাহির থেকে দেখা যায় এমন অলংকার, চিত্তাকর্ষক সৌন্দর্য, নারী- পুরুষের অবাধ মেলামেশা।২১১
আমি (মুসান্নিফ) বলি-যে নারী নামাজের উদ্দেশ্যে বের হয়, তার জন্যই যদি এটা হারাম হয়, তাহলে ওই নারীর কী হুকুম হবে, যে বাজার-মার্কেট-অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়?
কোনো সন্দেহ নেই, এটা আরও বড়ো গুনাহ। আল্লামা হাইসামি রহ. তো এটাও উল্লেখ করেছেন যে-সুগন্ধি মেখে সাজগোজ করে কোনো নারীর বাহিরে বের হওয়াও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত, যদিওবা স্বামীর অনুমতি থাকে।
ষষ্ঠ শর্ত : নারীদের পোশাক পুরুষদের পোশাকের মতো হবে না। কারণ, বহু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে ওই সমস্ত নারীদের প্রতি লানত ও অভিশাপ দেওয়ার ব্যাপারে, যারা পোশাক ও অন্য কিছুতে পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে। যেমন: (ক) আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
لعن رسول الله ﷺ الرجل يلبس لبسة المرأة والمرأة تلبس لبسة الرجل 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওই পুরুষকে লানত করেছেন যে নারীর মতো পোশাক পরে এবং (লানত করেছেন) ওই নারীকে যে পুরুষের মতো পোষাক পরে।' ৫১২ (খ) ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত-
عن النبي ﷺ أنه لعن المتشبهات من النساء والمتشبهين من الرجال بالنساء তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি নারীদের মধ্য থেকে পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনকারিণীদের লানত করেছেন এবং লানত করেছেন পুরুষদের মধ্য থেকে নারীদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনকারীদের।১১০ (গ) ইবনু আবি মুলাইকা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
لعن رسول الله ﷺ الرجلة من النساء
আয়িশা রা.-কে বলা হলো, এক নারী তো (পুরুষদের) জুতা পরে। তখন তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদের মধ্য হতে পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনকারিণীদের অভিশাপ দিয়েছেন।২১৪
(ঘ) হুজাইল গোত্রের এক লোক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-আমি আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রা.-কে দেখেছি। তার বাড়ি ছিল 'হিল্লে', আর মসজিদ ছিল হারামে। একদিন আমি তার কাছে ছিলাম। হঠাৎ তিনি আবু জাহেলের মেয়ে উম্মে সায়িদকে দেখতে পেলেন। সে গলায় ধনুক ঝুলিয়ে পুরুষের মতো হাঁটছিল! তখন আবদুল্লাহ বললেন, এটা কে? হুজালি বলেন, আমি বললাম-আবু জাহেলের মেয়ে উম্মু সায়িদ। তিনি বললেন-আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি,
ليس منا من تشبه بالرجال من النساء ولا من تشبه بالنساء من الرجال 'যে নারী পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে আমার উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত নয়, একইভাবে যে পুরুষ নারীদের সাথে সাদৃশ্য রাখে (সেও আমার উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত নয়)।' ৫১৫
(ঙ) ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
لَعَنَ النبيُّ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ المُتَرَجِلَاتِ مِنَ النِّسَاءِ، وَ الْمُخَنَّثِينَ مِنَ الرِّجَالِ، وقَالَ: أَخْرِجُوهُمْ مِن بُيُوتِكُمْ قَالَ: فَأَخْرَجَ النبيُّ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ فُلَانًا، وَأَخْرَجَ عُمَرُ فُلَانًا.
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের লানত করেছেন, যারা নারীদের মধ্য হতে পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য রাখে এবং যারা পুরুষদের মধ্য হতে নারীদের সাথে সাদৃশ্য রাখে। আর বলেছেন, ওদেরকে তোমরা নিজেদের ঘর থেকে বের করে দাও। তিনি বলেন-পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অমুককে বের করে দেন, আর উমার রা. অমুককে বের করে দেন।' ৫১৬
ইমাম জাহাবি রহ. তো নারী-পুরুষ একে অপরের সাদৃশ্য অবলম্বন করাকে কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। উপরের কিছু হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন-যদি নারীরা পুরুষদের বেশভূষা; যেমন: চাষাবাদ, পুরুষদের মতো খোলাখুলিভাবে নিজেদের অঙ্গ প্রকাশ করে রাখে, টাইট হাতাযুক্ত কাপড় পরে; তাহলেই সে পরিধানের ক্ষেত্রে পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বন করেছে বলা হবে। একই সাথে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ক্রোধের পাত্র হবে, যদিও তার স্বামী তাকে সাদৃশ্য অবলম্বনের সুযোগ দিয়ে থাকে। অর্থাৎ, সামী তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তাকে নিষেধ না করে। কারণ, সামীকে তো আদেশ করা হয়েছে স্ত্রীকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের ওপর রাখার, অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করার। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَئِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর। যার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে কঠোর, রূঢ় ফেরেশতাগণ-যারা আল্লাহ তাআলা তাদের যা আদেশ করেন, তার আবধ্যতা করে না; বরং তাদের যা আদেশ করা হয়, তারা সেটাই করে।' ৫১৭
অর্থাৎ, তাদেরকে তোমরা আদব ও ইলম শেখাও, আল্লাহর আনুগত্যের আদেশ করো, অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করো। এটা তাদের ওপর যেমন ওয়াজিব, তেমনি তোমাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও ওয়াজিব।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
كلكم راع ومسؤول عن رعيته الرجل راع في أهله ومسؤول عنهم يوم القيامة
'তোমাদের প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্বাধীন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্বামী তার পরিবারের বিষয়ে দায়িত্বশীল এবং তাকে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।'
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
ألا هلكت الرجال حين أطاعت النساء
'শুনে রাখো, পুরুষরা যখন নারীদের আনুগত্য শুরু করবে, তখন তাদের ধ্বংস অপরিহার্য।'
হাসান বসরি রহ. বলেন- 'আল্লাহর কসম! আজ যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নামে উপড়ে ফেলবেন।' ২১৮
একইভাবে ইমাম হাইসামি রহ.-ও একে কবিরা গুনাহ বলে ব্যক্ত করেছেন।২১৯
সপ্তম শর্ত: নারীদের পোশাক কাফিরদের পোশাকের মতো হবে না। কারণ, ইসলামি শরিয়ত বলে, নারী-পুরুষ কারও জন্যই কাফিরদের সাথে সাদৃশ্য রাখা বৈধ নয়-চাই পোশাক-আশাকে বা খাবার-দাবারে অথবা অন্য কিছুতে। এটা ইসলামের বড়ো একটি মূলনীতি, যা পালন করা থেকে আজ মুসলিমরা বিরত থাকছে। এমনকি যারা নিজেদের মুসলিম বলে পরিচয় দেয়, তারাও হয় দ্বীন সম্পর্কে অনভিজ্ঞতার কারণে কিংবা নিজেদের খাহেশাতের অনুসরণ করতে গিয়ে কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার গোলামি করার জন্য (কাফির পোশাক পরিধান করছে)। অথচ এক্ষেত্রে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে-
(ক) ইবনু উমার রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
من تشبه بقوم فهو منهم 'যে কোনো জাতির সাথে সাদৃশ্য রাখে, সে তাদের মধ্য হতে গণ্য।' ৫২০
(খ) আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
جعل رزقي تحت ظل رمحي وجعل الصغار والذلة على من خالف أمري ومن تشبه بقوم فهو منهم 'আমার রিজিক রাখা হয়েছে আমার বর্শার ছায়ায়। আর লানত ও অপদস্থতা রাখা হয়েছে ওই ব্যক্তির ওপর, যে আমার আদেশের বিরোধিতা করে। আর যে কোনো দলের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের মধ্য হতেই গণ্য। '৫২১
অষ্টম শর্ত: কাপড় যেন খ্যাতির কাপড় না হয়। ইবনু উমার রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
من لبس ثوب شهرة ألبسه الله يوم القيامة ثوب مذلة ثم ألهب فيه نارا 'যে খ্যাতির কাপড় পরবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন অপদস্থতার কাপড় পরিয়ে দেবেন। তারপর তাতে আগুন জ্বালিয়ে দেবেন।' ৫২২
আবু জর রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
من لبس ثوب شهرة أعرض الله عنه حي يضعه متى وضعه
'যে খ্যাতির কাপড় পরবে, আল্লাহ তাআলা তাকে এডিয়ে যাবেন যতক্ষণ না তাকে যেখানে রাখার সেখানে রাখবেন। (অর্থাৎ, জাহান্নাম) '৫২৩
একইভাবে, নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে পোশাক-পরিচ্ছদের আদব রক্ষার পাশাপাশি ওই সকল আদবও লক্ষ্য রাখতে হবে, যেগুলো পালন করার জন্য শরিয়ত আদেশ করেছে; যাতে নারীর ইজ্জত-আব্রু, সম্মান-মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষা করা সম্ভব হয়। যেমন: সহশিক্ষা ব্যবস্থা না হওয়া, কোনো পুরুষের সাথে কথা বলার প্রয়োজন হলে নরম স্বরে কথা না বলা।
টিকাঃ
*** বাইহাকি ফিল কুবরা, ৩২৬৫
*** মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা, ২৪৭৯২
*** সুনানুন নাসায়ি, ৫১২৬
*** মুসনাদ আহমাদ, ২৭০৪৭
১০৮ বাইহাকি, ৫৯৭৩
২০১ মুসনাদু আহমাদ, ৯৬৪৫
৫১০ সুনান ইবনি মাজাহ ৪০০১
২১১ ফাতহুল বারি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৪৯
১১২ সুনানু আবি দাউদ, ৪০৯৮
২১০ সুনানু আবি দাউদ, ৪০৯
২১৪ সুনানু আবি দাউদ, ৪০৯৯
৫১৫ মুসনাদু আহমাদ, ৬৮৭৫
৫১৬ মসনাদ আহমাদ ২০০৬
*১* সূরা তাহরিম, আয়াত: ৬
** জাহাবি, আল কাবায়ির, ১৩৪
** আজ-ঝাওয়াজির আন ইকতিয়াফিক সেবামীe Coin), পৃষ্ঠা: ২৫৬
২২০ সুনানু আবি দাউদ, ৪০৩১
২১ মুসনাদুল বাযযার, ৮৬০৬
*** সুনানে ইবনু মাজাহ, ৩৬০৭