📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 শুরার ক্ষেত্র

📄 শুরার ক্ষেত্র


শূরা বা পরামর্শ সেখানেই করা হবে, যেখানে কোনো 'নস' (কুরআন বা হাদিস) নেই—যুদ্ধের বিষয়ে হোক বা অন্যান্য বিষয়ে।
আলি ইবনু আবি তালিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম—ইয়া রাসুলাল্লাহ, কখনো কখনো আমাদের সামনে এমন পরিস্থিতি চলে আসে, যে বিষয়ে কুরআনের কোনো আয়াতও বর্ণিত হয় নি, আপনার থেকে কোনো সুন্নাহও গত হয় নি (তখন আমরা কী করব?)। তিনি বললেন—
اجمعوا له العالمين أو قال العابدين من المؤمنين فاجعلوه شورى بينكم ولا تغضب فيه برأي واحد 'তখন তোমরা সেজন্য আলিমদের (কিংবা তিনি বলেছেন) অথবা মুমিনদের মধ্যে যারা আলিম, তাদের একত্র করো। শুধু একজনের রায়ের মাধ্যমেই ফায়সালা করে দিয়ো না।' ৪৩৪

টিকাঃ
৪০৪ জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহি, ৬১১

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 শুরার হুকুম

📄 শুরার হুকুম


এ বিষয়ে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলমায়ে কিরামের অনেকের মাঝে ইখতিলাফ রয়েছে। যেমন—
(১) কোনো কোনো উলামায়ে কেরাম বলেন— খলিফা, শাসক ও প্রশাসকের জন্য মাশওয়ারা করা ওয়াজিব। এ মত যাদের, তাদের মধ্যে ইবনু খুওয়াইজ মিনদাদ মালিকি রহ. আছেন। ইমাম কুরতুবি রহ. তার মত উল্লেখ করে বলেন— 'ইবনু খুওয়াইজ মিনদাদ বলেন, শাসক-প্রশাসকদের ওপর ওয়াজিব হলো, দ্বীনের যে সকল বিষয়ে তারা জানেন না, বা তাদের কাছে অস্পষ্ট, সে বিষয়ে আলিমদের সাথে পরামর্শ করা। যুদ্ধের বিষয়ে সেনাপ্রধানদের সাথে, জনগণের বিষয়ে তাদের মুখ্য ব্যক্তিদের সাথে, দেশের কল্যাণ ও দেশ বিনির্মাণের উন্নতির বিষয়ে বিজ্ঞ, মন্ত্রী ও গভর্নরদের সাথে পরামর্শ করা ওয়াজিব।'৪৩৫
এই মতে প্রবক্তাদের মধ্যে ইবনু আতিয়্যা মালিকিও আছেন। তার মতও কুরতুবি রহ. উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন— 'ইবনু আতিয়্যা বলেন, শুরা-ব্যবস্থা হলো, শরিয়তের মূলনীতিগুলোর একটি এবং বিধিবিধানের একটি ভিত্তি। যে আহলে ইলমের কাছে পরামর্শ চায় না, তাকে কাজ থেকে বরখাস্ত করা ওয়াজিব। এক্ষেত্রে কোনোই খিলাফ নেই।'৪৩৬
(২) কেউ কেউ বলে মুস্তাহাব। ইবনু কুদামা রহ. বলেন-'এটা (মাশওয়ারা) কতই না উত্তম! যদি শাসকরা সবসময় এটা করত, তাহলে কতই না ভালো হতো! তারা পরামর্শ করবে, অপেক্ষা করবে। তাছাড়া কখনো কখনো এই মাশওয়ারার মাধ্যমেই অনেক কিছু মনে আসে। একইভাবে ভুলে যাওয়া জিনিসগুলোও পরস্পরের আলোচনার মাধ্যমে স্মরণে আসে। '৪৩৭
ইবন হাজার রহ. এই মতকেই মুস্তাহাব অগ্রাধিকার দিয়ে বলেন-ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের ইখতিলাফ আছে।
ইমাম বাইহাকি রহ. মাআরিফাত নামক কিতাবে 'নস' থেকে মুস্তাহাবের কথাই উল্লেখ করেন। এই মত আবু নাসর কুশাইরিও তার তাফসিরে গ্রহণ করেছেন। আর এটাই অগ্রাধিকার যোগ্য ৪৩৮
(৩) আবার কেউ কেউ বলেন—নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষেত্রে ওয়াজিব আর উম্মাহর ক্ষেত্রে মুস্তাহাব।
ইমাম নববি রহ. বলেন- 'আমাদের মাজহাবের উলামায়ে কিরামের মাঝে ইখতিলাফ আছে-এটা কি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামে ক্ষেত্রে ওয়াজিব ছিল, না সুন্নাহ ছিল, যেমন আমাদের ক্ষেত্রে সুন্নাহ? সহিহ মত হলো-তার কাছে এটা ওয়াজিব এবং এটাই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন- وشاورهم في الأمر 'আর আপনি তাদের সাথে পরামর্শ করেন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিতে'-এখানে ওয়াজিবের জন্য আদেশসূচক বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে। এটাই গ্রহণযোগ্য এবং জুমহুর ফুকাহা ও মুহাক্কিক উসুলবিদদের মত।
উক্ত আয়াত থেকে এখানে আরেকটি বিষয় বোঝা যায়, পরামর্শদাতারা সবাই নিজেদের মত পেশ করবে, তারপর পরামর্শকারীর কাছে যেটা ভালো মনে হয়, সেটা গ্রহণ করবে। আল্লাহই ভালো জানেন।
(৪) সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে-নবীজি এবং উম্মাহ) সবার ক্ষেত্রেই পরামর্শ করা মুস্তাহাব। তবে বিষয়টি যদি ঘোলাটে হয়ে যায়, তাহলে মাশওয়ারা করা ওয়াজিব। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন- فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ 'তোমরা যদি না জানো, তাহলে আহলে ইলমকে জিজ্ঞাসা করো।'৪৩৯
মাশওয়ারা করা মুস্তাহাব বলা হয়েছে। কারণ-
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ 'তাদের সাথে যাবতীয় বিষয়ে পরামর্শ করেন'-এখানে আদেশসূচক ক্রিয়াটি 'মুস্তাহাবের' জন্য, ওয়াজিবের জন্য নয়। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাশওয়ারা করার প্রয়োজনই ছিল না। কেননা, আল্লাহ তাআলা তো সঠিক বিষয়ে তাউফিক দেওয়ার মাধ্যমে, ওহির মাধ্যমে তাকে মাশওয়ারা থেকে অমুখাপেক্ষী করেছেন।
এজন্যই বড়ো বড়ো তাবিয়ি থেকে বেশ কিছু বর্ণনা পাওয়া যায় যে, উক্ত আয়াতে আদেশসূচক ক্রিয়ার আসল অর্থ কী? এটা ব্যবহারের হিকমাহ কী? ওই বর্ণনাগুলোর প্রত্যেকটি থেকে এ কথাই বোঝা যায় যে, আদেশসূচক ক্রিয়াটি মুস্তাহাবের জন্য, ওয়াজিবের জন্য নয়। এসব বর্ণনাসমূহ হলো : (ক) কাতাদা রহ. বলেন-
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ (١٥٩) 'আর আপনি তাদের সাথে পরামর্শ করেন যাবতীয় বিষয়ে। অতঃপর যখন আপনি (কোনো বিষয়ে) প্রতিজ্ঞা করেন, তখন আপনি আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করেন। নিঃসন্দেহে, আল্লাহ তাআলা ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।' ৪৪০
আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন বিষয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহাবায়ে কিরামের সাথে মাশওয়ারা করার আদেশ করেছেন। অথচ তার কাছে তো আসমান থেকেই ওহি আসত। কারণ, মাশওয়ারা করলে সবাই আনন্দ পাবে। তাছাড়া যখন কোনো জামাআত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একে অপরের সাথে পরামর্শ করে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সবচেয়ে উত্তম পথটি দেখান।
(খ) হাসান রহ. বলেন- 'আল্লাহ তাআলা জানেন, নবীজির মাশওয়ারা করার কোনোই প্রয়োজন নেই। তবুও (আদেশ করেছেন) যাতে পরবর্তী সময়ে এটা উম্মাহর জন্য অনুসৃত হয়ে যায়।'
(গ) ইমাম রাজি রহ. বলেন- 'ইমাম শাফিয়ি রহ. এই আদেশকে মুস্তাহাব অর্থে ধরেছেন। তিনি বলেন, এটা নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথার মত-
البكر تستأمر في نفسها 'কুমারী নারীর কাছে (বিবাহের বিষয়ে) পরামর্শ চাওয়া হবে।' ৪৪০
এখন যদি বাবা তাকে জোর করে বিয়ে করান, তবুও বিয়ে জায়িজ হবে। তবে উত্তম হচ্ছে, তার মনোতৃপ্তির জন্য তার সাথে পরামর্শ করা। ঠিক এখানেও এমন বলা হয়েছে।
এখন যদি বলা হয়, কোনো কোনো উলামায়ে কেরাম তো বলেছেন-শাসক-প্রশাসকদের ওপর যদি মাশওয়ারা ওয়াজিব না হয়, তাহলে তারা নিজেদের আদেশ-নিষেধ জনগণের ওপর চাপিয়ে জুলুম-অত্যাচার শুরু করে দেবে। তাই, তাদের জন্য পরামর্শ করা ওয়াজিব, যা তাদেরকে জুলুম বা একনায়কতন্ত্র থেকে রক্ষা করবে।
এ কথার উত্তরে আমরা বলব, এটা তাদেরকে জুলুম থেকে বিরত রাখার সঠিক পদ্ধতি নয়। কারণ, (মাশওয়ারা ওয়াজিব হলে) এই জালিম শাসকরা তাদের সাথেই পরামর্শ করবে, যারা তাদের মতাদর্শে আদর্শিত। সুতরাং এতে কোনো ফায়দা নেই, যদি পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।
দুনিয়ার যত রকম অসুস্থতা আছে, যদি বাস্তবেই তার সঠিক চিকিৎসা করতে হয়, তাহলে খিলাফতে ইসলামিয়া কায়েম করার চেষ্টা করা ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা নেই, যা ইসলামকে বাস্তবেই পরিপূর্ণরূপে তুলে ধরতে পারে। কিন্তু যতদিন ইসলাম ও ইসলামের দর্শন কেবল কিতাবের পাতায় থাকবে, ততদিন জুলুম, অত্যাচার, অবিচার, একনায়কতন্ত্র এসব অবশিষ্ট থাকবেই থাকবে; যদিও 'মজলিসে শুরা' করে ভরে ফেলা হয়, যেমনটি অনেক মুসলিম দেশগুলোতে আছে। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।

টিকাঃ
৪৩৫ তাফসিরে কুরতুবি, খণ্ড:
*** আল মুগনি, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ৪৬
*** ফাতহুল বারি, খণ্ড: ১৩, পৃষ্ঠা: ৩৪১
*** সূরা নাহল, আয়াত: ৪৩
৪৪০ সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 শুরা ব্যবস্থা ‘মুলজিম’ না-কি ‘মুলিম’

📄 শুরা ব্যবস্থা ‘মুলজিম’ না-কি ‘মুলিম’


শুরা ব্যবস্থা মুলজিম (আবশ্যককারী) না-কি মুলিম (অবগতকারী) এক্ষেত্রে ইখতিলাফ রয়েছে। কোনো কোনো আলিম এবং সামসময়িক লেখকগণ বলেন-'মাশওয়ারা খলিফার জন্য আবশ্যককারী। তার কর্তব্য হলো, অধিকাংশ লোক যে মতের ওপর আছে, সেটা বাস্তবায়ন করা।'
তাদের দলিল- وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ : إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ (١٥٩) 'আর আপনি তাদের সাথে পরামর্শ করেন যাবতীয় বিষয়ে। অতঃপর যখন আপনি (কোনো বিষয়ে) প্রতিজ্ঞা করেন, তখন আপনি আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করেন। নিঃসন্দেহে, আল্লাহ তাআলা ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।' ৪৪১
এখানে, আজম শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যার অর্থ অধিকাংশ ব্যক্তিদের মত গ্রহণ করা, অথবা আযম শব্দটি অধিকাংশদের মত গ্রহণ করার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। এ দাবির পক্ষে আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর হাদিস আছে। তিনি বলেন 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে عزم )আজম) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন-
مشاورة أهل الرأي ثم اتباعهم '(আযম হলো) 'আহলে রায়' বা সিদ্ধান্ত দেওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করা। এরপর তাদের মত অনুসরণ করা।' ৪৪২
অনুরূপভাবে খালিদ ইবনু মাদানের সূত্রেও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন-
قَالَ : رَجُلٌ : يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا الْحَزْمُ ؟ قَالَ : أَنْ تُشَاوِرَ ذَا رَأْي ثُمَّ تُطِيعُهُ এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল- 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, হাজম কাকে বলে?' তিনি বললেন, 'হাজম হলো সিদ্ধান্ত দেওয়ার যোগ্য ব্যক্তির সাথে পরামর্শ করা। তারপর তাদের আনুগত্য করা।' ৪৪৩
তবে অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম বলেন- খলিফা বা শাসকের জন্য মাশওয়ারা আবশ্যক নয়, বরং শুধু অবগতকারী। এর মাধ্যমে তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। খলিফা যখন আহলে রায়-এর পরামর্শ করবেন, তখন তিনি তাদের মতগুলো দেখবেন। তার কাছে যে মতকে ভালো মনে হয় সেটা গ্রহণ করবেন-চাই সে মত অধিকাংশের হোক, বা কম সংখ্যকের, কিংবা তার নিজের মতও হোক।
তাদের দলিলও উপরোল্লিখিত আয়াত।
আল্লামা তাবারি বলেন-
فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ এই আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো-আপনাকে আমার সমর্থন ও সঠিক মত দেওয়ার মাধ্যমে যখন আপনার প্রতিজ্ঞা সাব্যস্ত হবে, তখন যে বিষয়ে আপনাকে আদেশ করেছি, আপনি সেটা বাস্তবায়ন করেন আমার আদেশ দানের কারণে-চাই আপনার সাথীদের মত বা পরামর্শের অনুকূলে হোক বা বিপরীতে। আর আপনি নির্ভর করেন আল্লাহ তাআলার ওপর। )وتوكل( আপনি আল্লাহ তাআলার ওপর নির্ভর করেন ওই সকল ক্ষেত্রে, যা আপনি করবেন বা বর্জন করবেন, চেষ্টা করবেন বা বিরত থাকবেন। সকল ক্ষেত্রে আপনি তাঁরই ওপর নির্ভর করেন। সব ক্ষেত্রে তাঁর ফায়সালা ও সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকুন। আপনার মাখলুকের সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকার প্রয়োজন নেই।
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
নিঃসন্দেহে, আল্লাহ তাআলা ভরসাকারীদের ভালোবাসেন। আর তারা হলো, যারা আল্লাহ তাআলার ফায়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকে, তাঁর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করে-চাই তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী হোক বা বিপরীতে হোক ৪৪৪
এরকম আরও অনেক মুফাসসিরিনে কিরামই তাফসির করেন। এই তাফসির থেকে বোঝা যায় যে, মাশওয়ারা আবশ্যককারী নয়। তাছাড়া আয়াতে فإذا عزمت একবচনের ক্রিয়া উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে প্রতিজ্ঞা করবে কেবল পরামর্শকারীই। কিন্তু যদি পরামর্শকারীকে আহলে শুরার (পরামর্শদাতা) কথাই মানতে হতো, তাহলে তো আয়াতে বলা হতো- فإذا عزمتم বহুবচনের ক্রিয়া ব্যবহার করে।
আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, জুমহুরিয়‍্যাত বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনোই সঠিকতা বা নির্ভুলতার মানদণ্ড নয়, অকাট্য দলিল তো নয়ই। একই সাথে অগ্রাধিকার যোগ্যও নয়। কেননা, কোনো মত বা চিন্তা সঠিক বা ভুল হওয়ার কারণ ওই চিন্তাশীল ব্যক্তি, কোনো কম বা বেশি সংখ্যক হওয়া এর কারণ নয়। তাই, ইসলাম কখনো সংখ্যাধিক্যকে সত্য- মিথ্যা, হক-বাতিল নির্ণয়ের মাপকাঠি বানায় নি। যেমন দেখা যায় বর্তমান গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ক্ষেত্রে। অতএব, আধিক্যকে মূলনীতি বানানো অইসলামি পন্থা। ৪৪৫
ইমাম জুহাইলি রহ. বলেন- 'শরিয়তের 'মজলিসে শুরা' আর মানবরচিত আইন- কানুন ভিত্তিক দেশগুলোর 'মজলিসে শুরা'র মাঝে বড়ো একটি পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। ইসলামের মজলিসে শূরা মুলজিম তথা আবশ্যককারী নয়; বরং মজলিসে শুরা শুধু আল্লাহ তাআলার হুকুম সম্পর্কে গবেষণা ও অন্বেষণ করে, যার ফলে কম-বেশির কোনো ধর্তব্য নেই, সব সমান! আর মানবরচিত আইন-কানুন ভিত্তিক দেশগুলোর ক্ষেত্রে মজলিসে শুরা আবশ্যককারী। তাই, শাসককে অধিকাংশের মত গ্রহণ করতে হয় ৪৪৬
অনেক ক্ষেত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও অধিকাংশের মত গ্রহণ করেন নি। বরং নিজের মতের ওপর অটল ছিলেন। যেমন: হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়। একইভাবে আবু বকর রা.ও যখন ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে চেয়েছিলেন, তখন এ বিষয়ে সবার সাথে মাশওয়ারা করলে তিনি দেখতে পান যে, অধিকাংশের মত-যাদের মধ্যে স্বয়ং উমার রা. ছিলেন-জিহাদ না করার পক্ষে। তবুও আবু বকর রা. নিজের মতের ওপর অটল ছিলেন যে, নামাজ এবং জাকাত এ দুয়ের মাঝে কখনো পার্থক্য করা যাবে না। তিনি বলেন-
والله لو منعوني عقالا كانوا يؤدونه لرسول الله الحاربتهم عليه ‘আল্লাহর কসম! (জাকাতের পশুর সাথে) যে রশি তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দিত, সেটাও যদি তারা আমাকে দেওয়া থেকে বিরত থাকে, তবুও আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।' ৪৪৭
অনুরূপ উসামা রা.-এর বাহিনী প্রেরণের ক্ষেত্রেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তের ওপর অটল ছিলেন। সুতরাং, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাত ও খুলাফায়ে রাশিদার জীবনী অনুসন্ধান করে বোঝা যায়-খলিফা বা শাসকের জন্য আবশ্যক নয়, মাশওয়ারা অনুযায়ী কাজ করা। শুরার ফায়দা এখানেই যে, সবার মত জানার মাধ্যমে একটি সমস্যার সবদিক স্পষ্ট হয়ে যায়। ফলে পরামর্শকারীর সামনে সবচেয়ে উত্তম পন্থা এবং উপকারী পদ্ধতিটি স্পষ্ট হয়।
শুরা-ব্যবস্থার ফায়দা জানলে সামসময়িক আপত্তিকারীদের আপত্তি এমনিতেই দূর হয়ে যাবে। অনেক সময় শুরার মতমত নেওয়ার পর সেটি গ্রহণ না করলে তারা আপত্তি করে বলে-শুরা ব্যবস্থা যদি আবশ্যককারীই না হয়, তাহলে তো শুরা ব্যবস্থার কোনোই ফায়দা-ই থাকল না। অথচ তারা এটা ভুলে যায় যে-ইসলামি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ এটি! আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।

টিকাঃ
৪৪২ তাফসিরে ইবনু কাসির, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৩১
৪৩৩ সুনানু আবি দাউদ, ৪৮২
*** তাফসিরুত তাবারি, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৩৪৬
*** আল ইমামাতুল উজমা, ৪৬০
*** আল ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু : ২০৫
*** আল ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতিহা : ৬২৩

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 বিশেষ দ্রষ্টব্য

📄 বিশেষ দ্রষ্টব্য


এখানে, শুরা বা মাশওয়ারা দ্বারা উদ্দেশ্য খলিফার মাশওয়ারা। অর্থাৎ, খলিফা থাকাকালীন কোনো বিষয়ে মাশওয়ারা। পক্ষান্তরে, 'আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদ' খলিফা নির্ধারণে তাদের মাশওয়ারাকে 'শুরাল ইনতিখাব' বা 'নির্বাচনের মাশওয়ারা' বলে। আর এই শুরা জনগণের জন্য মুলজিম তথা আবশ্যককারী, যদি আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদ কোনো খলিফাকে নির্বাচন করে তার হাতে বাইআত গ্রহণ করে, যেমনটি পূর্বে আলোচিত হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00