📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 শুরার বৈধতা

📄 শুরার বৈধতা


একজন শাসকের কর্তব্য হলো, নিছক ধারণার ওপর ভিত্তি করে অস্পষ্ট বিষয়গুলো কখনোই কার্যকর না করা। এছাড়াও বিভিন্ন সিমান্ত প্রকাশ পেয়ে যাবে এবং অন্যের থেকে সাহায্য নিয়ে ছোটো হতে হবে এই ভয়েও শুধু নিজের চিন্তার ওপর নির্ভর করে বড়ো সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। বরং একজন শাসক জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করবে, আমানতদার ও মুত্তাকিদের চিন্তা জানতে চাইবে-যারা বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ, প্রত্যেকটি জিনিসের মূল ও বাস্তবতা জানে।
কারণ, কখনো কখনো একা একা নিজের মত প্রয়োগ করাটা গোপন জিনিস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার চেয়েও ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। সব জিনিসকেই গোপন রহস্য মনে করা সঠিক নয়। আবার, সব রহস্যও হিতাকাঙ্ক্ষীদের সাথে পরামর্শ করার মাধ্যমে ছড়িয়ে যায় না। এজন্যই বলা হয়ে থাকে, ‘পরামর্শ চাওয়াটাই হিদায়াত’। তাছাড়া যে নিজের মত নিয়ে পড়ে থাকে, সে খুব ঝুঁকিতে থাকে।
কোনো কোনো দার্শনিক বলেছেন— ‘জ্ঞানী ব্যক্তির কর্তব্য হলো, নিজের চিন্তার সাথে জ্ঞানীদের চিন্তা সংযোজন করা, নিজের বুদ্ধির সাথে বুদ্ধিমানদের বুদ্ধি মিশ্রণ করা। কারণ, অনেক সময় নিজের একার চিন্তা পদস্খলনের স্বীকার হয়, তদ্রুপ কখনো নিজের বুদ্ধি ভুলের স্বীকার হয়।’ ৪১৯
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার বড়ো একটি মূলনীতি হলো—শুরা বা পরামর্শ করা। এটা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের মাধ্যমে সাব্যস্ত। ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন—‘শুরা ব্যবস্থা শরিয়তের একটি মূলনীতি ও বিধিবিধানের একটি ভিত্তি। এক্ষেত্রে কারও কোনো খিলাফ বা মতবিরোধ নেই।’
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রশংসা করে বলেন— وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ ‘আর তাদের বিষয় পরস্পরের মাঝে পরামর্শপূর্ণ’। ৪২০
এক বেদুইন বলে—আমি কখনোই ঠকি নি, যদি না আমার জাতি ঠকেছে। তাকে বলা হলো, সেটা আবার কীভাবে? তিনি বললেন— আমি তাদের সাথে পরামর্শ ছাড়া কিছুই করি না।
ইবনু খুওয়াইজ মিনদান বলেন— ‘শাসকদের কর্তব্য হলো, দ্বীনের অজানা বা অস্পষ্ট বিষয়ে উলামায়ে কিরামের সাথে পরামর্শ করা, যুদ্ধের বিষয়ে সেনাবাহিনীর সাথে পরামর্শ করা, বিভিন্ন কল্যাণকর বিষয়ে দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করা, দেশের কল্যাণকর ও দেশ বিনির্মাণের বিষয়ে রাজ্যের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিবর্গ, মন্ত্রী ও গভর্নরদের সাথে পরামর্শ করা। মোট কথা, প্রত্যেকের কর্তব্য নিজ নিজ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যক্তির সাথে পরামর্শ করা।’

টিকাঃ
* তাফসিলুন নাজার, ৯৯

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 শুরা ব্যবস্থার বৈধতার দলিল

📄 শুরা ব্যবস্থার বৈধতার দলিল


কুরআন থেকে: মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ (১৫৯) 'আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণেই আপনি তাদের জন্য কোমল হতে পেরেছেন, আর যদি আপনি কঠিন ও কঠোর হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তাহলে তারা আপনার পাশ থেকে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ত। সুতরাং, আপনি তাদের মাফ করে দেন, তাদের জন্য ইস্তিগফার করেন, তাদের সাথে (প্রয়োজনীয়) বিষয়ে পরামর্শ করেন। আপনি যদি কোনো কিছু প্রতিজ্ঞা করেন, তাহলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করেন। নিঃসন্দেহে, আল্লাহ তাআলা ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।' ৪২২
এই আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনু জারির সালাফে সালিহিনের কিছু আসার উল্লেখ করার পর বলেন— 'এক্ষেত্রে সবচেয়ে সঠিক কথা হলো, আল্লাহ তাআলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহাবায়ে কিরামের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে পরামর্শ করার আদেশ করেছেন। যেমন: শত্রুদের বিষয়ে যুদ্ধের কলাকৌশল সম্পর্কে। (আল্লাহ তাআলার এরূপ আদেশ করার কারণ,) ইসলাম সম্পর্কে যাদের অন্তর্দৃষ্টি নেই তারা যেন এমন অন্তর্দৃষ্টি লাভ করে, যার ফলে শয়তানের ফিতনা থেকে মুক্তি পওয়া যাবে এবং যার মাধ্যমে উম্মাহকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো শেখানো যাবে। তাহলে তারা নবীজির মৃত্যুর পর বিভিন্ন সমস্যার সময় নবীজির পন্থা স্মরণ করে পরস্পরের মাঝে পরামর্শ করবে, যেমন জীবদ্দশায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরামর্শ করতেন।
কিন্তু একট পার্থক্য হবে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরামর্শ করতেন ঠিকই, তবে আল্লাহ তাআলাই তাঁকে ওহি বা ইলহামের মাধ্যমে জানিয়ে দিতেন কোনটা সঠিক, আর কোনটা ভুল। পক্ষান্তরে, উম্মাহ শুধু তাঁর সুন্নাহ হিসাবে পরামর্শ করতে পারে সত্য যাচাই-বাছাই করার জন্য, সঠিক বিষয় জানার উদ্দেশ্যে, যাতে প্রবৃত্তির অনুসরণ না হয়ে যায়, হিদায়াতের পথ থেকে বিচ্যুতি না ঘটে। আল্লাহই তাদের সঠিক পথ দেখাবেন এবং তাউফিক দেবেন। ৪২০
ইমাম বাগাভি রাহিমাহুল্লাহ বলেন—হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তাআলা জানেন যে, নবীজির পরামর্শ করার কোনো প্রয়োজন নেই (তবুও আল্লাহ তাআলা নবীজিকে পরামর্শ করার আদেশ করেছেন)। কারণ আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন, তাঁর পর যারা আসবে তারা যেন এটাকে সুন্নাহ হিসাবে গ্রহণ করে।১২৪
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রশংসা করে বলেন— وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ
'আর যারা তাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দেয় এবং নামাজ কায়েম করে এবং যাদের বিষয়াদি পরামর্শপূর্ণ।' ৪২৫
ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন-'আনসার সাহাবিগণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের পূর্বে যখন কোনো কাজ করতে চাইতেন, তারা পরস্পর পরামর্শ করতেন। তারপর সে অনুযায়ী কাজ করতেন। তাই, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের মাধ্যমে তাদের প্রশংসা করেছেন।' ৪২৬
সুন্নাহ থেকে দলিল: আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— المستشار مؤتمن
'যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়, সে এ বিষয়ে আমানতদার।'২
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন— ما رأيت أحدا أكثر مشورة لأصحابه من رسول الله صلى الله عليه وسلم
'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বেশি আর কাউকে তাঁর সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করতে দেখি নি।' ৪২৮

টিকাঃ
*** তাফসিরে কুরতুবি, খণ্ড:
৪২০ তাফসিরে তাবারি, খণ্ড: ৫৭, পৃষ্ঠা: ৩৪৫
*** তাফসিরে বাগাভি, ১/৫২৬
*২৯ সূরা শুরা, আয়াত: ৩৮
*** তাফসিরে কুরতুবি, খণ্ড: ১৬, পৃষ্ঠা: ৩৬
*** সুনানু আবি দাউদ, ৫১২
*সনানে তিরমিজি

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 শুরার ক্ষেত্র

📄 শুরার ক্ষেত্র


শূরা বা পরামর্শ সেখানেই করা হবে, যেখানে কোনো 'নস' (কুরআন বা হাদিস) নেই—যুদ্ধের বিষয়ে হোক বা অন্যান্য বিষয়ে।
আলি ইবনু আবি তালিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম—ইয়া রাসুলাল্লাহ, কখনো কখনো আমাদের সামনে এমন পরিস্থিতি চলে আসে, যে বিষয়ে কুরআনের কোনো আয়াতও বর্ণিত হয় নি, আপনার থেকে কোনো সুন্নাহও গত হয় নি (তখন আমরা কী করব?)। তিনি বললেন—
اجمعوا له العالمين أو قال العابدين من المؤمنين فاجعلوه شورى بينكم ولا تغضب فيه برأي واحد 'তখন তোমরা সেজন্য আলিমদের (কিংবা তিনি বলেছেন) অথবা মুমিনদের মধ্যে যারা আলিম, তাদের একত্র করো। শুধু একজনের রায়ের মাধ্যমেই ফায়সালা করে দিয়ো না।' ৪৩৪

টিকাঃ
৪০৪ জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহি, ৬১১

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 শুরার হুকুম

📄 শুরার হুকুম


এ বিষয়ে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলমায়ে কিরামের অনেকের মাঝে ইখতিলাফ রয়েছে। যেমন—
(১) কোনো কোনো উলামায়ে কেরাম বলেন— খলিফা, শাসক ও প্রশাসকের জন্য মাশওয়ারা করা ওয়াজিব। এ মত যাদের, তাদের মধ্যে ইবনু খুওয়াইজ মিনদাদ মালিকি রহ. আছেন। ইমাম কুরতুবি রহ. তার মত উল্লেখ করে বলেন— 'ইবনু খুওয়াইজ মিনদাদ বলেন, শাসক-প্রশাসকদের ওপর ওয়াজিব হলো, দ্বীনের যে সকল বিষয়ে তারা জানেন না, বা তাদের কাছে অস্পষ্ট, সে বিষয়ে আলিমদের সাথে পরামর্শ করা। যুদ্ধের বিষয়ে সেনাপ্রধানদের সাথে, জনগণের বিষয়ে তাদের মুখ্য ব্যক্তিদের সাথে, দেশের কল্যাণ ও দেশ বিনির্মাণের উন্নতির বিষয়ে বিজ্ঞ, মন্ত্রী ও গভর্নরদের সাথে পরামর্শ করা ওয়াজিব।'৪৩৫
এই মতে প্রবক্তাদের মধ্যে ইবনু আতিয়্যা মালিকিও আছেন। তার মতও কুরতুবি রহ. উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন— 'ইবনু আতিয়্যা বলেন, শুরা-ব্যবস্থা হলো, শরিয়তের মূলনীতিগুলোর একটি এবং বিধিবিধানের একটি ভিত্তি। যে আহলে ইলমের কাছে পরামর্শ চায় না, তাকে কাজ থেকে বরখাস্ত করা ওয়াজিব। এক্ষেত্রে কোনোই খিলাফ নেই।'৪৩৬
(২) কেউ কেউ বলে মুস্তাহাব। ইবনু কুদামা রহ. বলেন-'এটা (মাশওয়ারা) কতই না উত্তম! যদি শাসকরা সবসময় এটা করত, তাহলে কতই না ভালো হতো! তারা পরামর্শ করবে, অপেক্ষা করবে। তাছাড়া কখনো কখনো এই মাশওয়ারার মাধ্যমেই অনেক কিছু মনে আসে। একইভাবে ভুলে যাওয়া জিনিসগুলোও পরস্পরের আলোচনার মাধ্যমে স্মরণে আসে। '৪৩৭
ইবন হাজার রহ. এই মতকেই মুস্তাহাব অগ্রাধিকার দিয়ে বলেন-ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের ইখতিলাফ আছে।
ইমাম বাইহাকি রহ. মাআরিফাত নামক কিতাবে 'নস' থেকে মুস্তাহাবের কথাই উল্লেখ করেন। এই মত আবু নাসর কুশাইরিও তার তাফসিরে গ্রহণ করেছেন। আর এটাই অগ্রাধিকার যোগ্য ৪৩৮
(৩) আবার কেউ কেউ বলেন—নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষেত্রে ওয়াজিব আর উম্মাহর ক্ষেত্রে মুস্তাহাব।
ইমাম নববি রহ. বলেন- 'আমাদের মাজহাবের উলামায়ে কিরামের মাঝে ইখতিলাফ আছে-এটা কি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামে ক্ষেত্রে ওয়াজিব ছিল, না সুন্নাহ ছিল, যেমন আমাদের ক্ষেত্রে সুন্নাহ? সহিহ মত হলো-তার কাছে এটা ওয়াজিব এবং এটাই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন- وشاورهم في الأمر 'আর আপনি তাদের সাথে পরামর্শ করেন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিতে'-এখানে ওয়াজিবের জন্য আদেশসূচক বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে। এটাই গ্রহণযোগ্য এবং জুমহুর ফুকাহা ও মুহাক্কিক উসুলবিদদের মত।
উক্ত আয়াত থেকে এখানে আরেকটি বিষয় বোঝা যায়, পরামর্শদাতারা সবাই নিজেদের মত পেশ করবে, তারপর পরামর্শকারীর কাছে যেটা ভালো মনে হয়, সেটা গ্রহণ করবে। আল্লাহই ভালো জানেন।
(৪) সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে-নবীজি এবং উম্মাহ) সবার ক্ষেত্রেই পরামর্শ করা মুস্তাহাব। তবে বিষয়টি যদি ঘোলাটে হয়ে যায়, তাহলে মাশওয়ারা করা ওয়াজিব। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন- فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ 'তোমরা যদি না জানো, তাহলে আহলে ইলমকে জিজ্ঞাসা করো।'৪৩৯
মাশওয়ারা করা মুস্তাহাব বলা হয়েছে। কারণ-
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ 'তাদের সাথে যাবতীয় বিষয়ে পরামর্শ করেন'-এখানে আদেশসূচক ক্রিয়াটি 'মুস্তাহাবের' জন্য, ওয়াজিবের জন্য নয়। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাশওয়ারা করার প্রয়োজনই ছিল না। কেননা, আল্লাহ তাআলা তো সঠিক বিষয়ে তাউফিক দেওয়ার মাধ্যমে, ওহির মাধ্যমে তাকে মাশওয়ারা থেকে অমুখাপেক্ষী করেছেন।
এজন্যই বড়ো বড়ো তাবিয়ি থেকে বেশ কিছু বর্ণনা পাওয়া যায় যে, উক্ত আয়াতে আদেশসূচক ক্রিয়ার আসল অর্থ কী? এটা ব্যবহারের হিকমাহ কী? ওই বর্ণনাগুলোর প্রত্যেকটি থেকে এ কথাই বোঝা যায় যে, আদেশসূচক ক্রিয়াটি মুস্তাহাবের জন্য, ওয়াজিবের জন্য নয়। এসব বর্ণনাসমূহ হলো : (ক) কাতাদা রহ. বলেন-
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ (١٥٩) 'আর আপনি তাদের সাথে পরামর্শ করেন যাবতীয় বিষয়ে। অতঃপর যখন আপনি (কোনো বিষয়ে) প্রতিজ্ঞা করেন, তখন আপনি আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করেন। নিঃসন্দেহে, আল্লাহ তাআলা ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।' ৪৪০
আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন বিষয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহাবায়ে কিরামের সাথে মাশওয়ারা করার আদেশ করেছেন। অথচ তার কাছে তো আসমান থেকেই ওহি আসত। কারণ, মাশওয়ারা করলে সবাই আনন্দ পাবে। তাছাড়া যখন কোনো জামাআত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একে অপরের সাথে পরামর্শ করে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সবচেয়ে উত্তম পথটি দেখান।
(খ) হাসান রহ. বলেন- 'আল্লাহ তাআলা জানেন, নবীজির মাশওয়ারা করার কোনোই প্রয়োজন নেই। তবুও (আদেশ করেছেন) যাতে পরবর্তী সময়ে এটা উম্মাহর জন্য অনুসৃত হয়ে যায়।'
(গ) ইমাম রাজি রহ. বলেন- 'ইমাম শাফিয়ি রহ. এই আদেশকে মুস্তাহাব অর্থে ধরেছেন। তিনি বলেন, এটা নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথার মত-
البكر تستأمر في نفسها 'কুমারী নারীর কাছে (বিবাহের বিষয়ে) পরামর্শ চাওয়া হবে।' ৪৪০
এখন যদি বাবা তাকে জোর করে বিয়ে করান, তবুও বিয়ে জায়িজ হবে। তবে উত্তম হচ্ছে, তার মনোতৃপ্তির জন্য তার সাথে পরামর্শ করা। ঠিক এখানেও এমন বলা হয়েছে।
এখন যদি বলা হয়, কোনো কোনো উলামায়ে কেরাম তো বলেছেন-শাসক-প্রশাসকদের ওপর যদি মাশওয়ারা ওয়াজিব না হয়, তাহলে তারা নিজেদের আদেশ-নিষেধ জনগণের ওপর চাপিয়ে জুলুম-অত্যাচার শুরু করে দেবে। তাই, তাদের জন্য পরামর্শ করা ওয়াজিব, যা তাদেরকে জুলুম বা একনায়কতন্ত্র থেকে রক্ষা করবে।
এ কথার উত্তরে আমরা বলব, এটা তাদেরকে জুলুম থেকে বিরত রাখার সঠিক পদ্ধতি নয়। কারণ, (মাশওয়ারা ওয়াজিব হলে) এই জালিম শাসকরা তাদের সাথেই পরামর্শ করবে, যারা তাদের মতাদর্শে আদর্শিত। সুতরাং এতে কোনো ফায়দা নেই, যদি পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।
দুনিয়ার যত রকম অসুস্থতা আছে, যদি বাস্তবেই তার সঠিক চিকিৎসা করতে হয়, তাহলে খিলাফতে ইসলামিয়া কায়েম করার চেষ্টা করা ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা নেই, যা ইসলামকে বাস্তবেই পরিপূর্ণরূপে তুলে ধরতে পারে। কিন্তু যতদিন ইসলাম ও ইসলামের দর্শন কেবল কিতাবের পাতায় থাকবে, ততদিন জুলুম, অত্যাচার, অবিচার, একনায়কতন্ত্র এসব অবশিষ্ট থাকবেই থাকবে; যদিও 'মজলিসে শুরা' করে ভরে ফেলা হয়, যেমনটি অনেক মুসলিম দেশগুলোতে আছে। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।

টিকাঃ
৪৩৫ তাফসিরে কুরতুবি, খণ্ড:
*** আল মুগনি, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ৪৬
*** ফাতহুল বারি, খণ্ড: ১৩, পৃষ্ঠা: ৩৪১
*** সূরা নাহল, আয়াত: ৪৩
৪৪০ সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00