📄 শুরার অর্থ
শুরা, মুশাওয়ারা, মাশওয়ারা এবং মিশওয়ার-এগুলো একই ক্রিয়ার ধাতু। ইমাম রাজি রাহিমাহুল্লাহ বলেন-'বলা হয় شاورهم (সে তাদের সাথে পরামর্শ করেছে),' যারা পরামর্শক তাদেরকেও শুরা বলা হয়। যেমন, আয়াতে আছে-
إذ هم نجوى (আর যখন তারা সলাপরামর্শ করে)৪১৬।
কেউ কেউ বলেন-(মুশাওয়ারা) আরবদের কথা-
شرت العسل أشوره থেকে নেওয়া হয়েছে, যখন মধু নিজ স্থান থেকে বের করে।
আবার কেউ বলেন, এটি شرت الدابة شورا إذا عرضتها থেকে এসেছে, যার অর্থ-পেশ করা। আর যে স্থানে পশুকে পেশ করা হয়, সেটাকে مشوار (মিশওয়ার) বলে।
মুশাওয়ারাকে শেষ অর্থে (পেশ করা) মাশওয়ারা (পরামর্শ করা) বলা হয়। কারণ, একটি জিনিস পেশ করার মাধ্যমে যেমন তার ভালো-মন্দ সম্পর্কে জানা যায়, তেমনি পরামর্শ করার মাধ্যমেও কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ জানা যায়। ৪১৭
মুশাওয়ারা অর্থ সবার চিন্তা ও মত একত্র করে বাহ্যিক দৃষ্টিতে সর্বোত্তম পন্থা বের করা। বাস্তবে কোনটা উত্তম সেটা তো আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। ৪১৮
📄 শুরার বৈধতা
একজন শাসকের কর্তব্য হলো, নিছক ধারণার ওপর ভিত্তি করে অস্পষ্ট বিষয়গুলো কখনোই কার্যকর না করা। এছাড়াও বিভিন্ন সিমান্ত প্রকাশ পেয়ে যাবে এবং অন্যের থেকে সাহায্য নিয়ে ছোটো হতে হবে এই ভয়েও শুধু নিজের চিন্তার ওপর নির্ভর করে বড়ো সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। বরং একজন শাসক জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করবে, আমানতদার ও মুত্তাকিদের চিন্তা জানতে চাইবে-যারা বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ, প্রত্যেকটি জিনিসের মূল ও বাস্তবতা জানে।
কারণ, কখনো কখনো একা একা নিজের মত প্রয়োগ করাটা গোপন জিনিস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার চেয়েও ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। সব জিনিসকেই গোপন রহস্য মনে করা সঠিক নয়। আবার, সব রহস্যও হিতাকাঙ্ক্ষীদের সাথে পরামর্শ করার মাধ্যমে ছড়িয়ে যায় না। এজন্যই বলা হয়ে থাকে, ‘পরামর্শ চাওয়াটাই হিদায়াত’। তাছাড়া যে নিজের মত নিয়ে পড়ে থাকে, সে খুব ঝুঁকিতে থাকে।
কোনো কোনো দার্শনিক বলেছেন— ‘জ্ঞানী ব্যক্তির কর্তব্য হলো, নিজের চিন্তার সাথে জ্ঞানীদের চিন্তা সংযোজন করা, নিজের বুদ্ধির সাথে বুদ্ধিমানদের বুদ্ধি মিশ্রণ করা। কারণ, অনেক সময় নিজের একার চিন্তা পদস্খলনের স্বীকার হয়, তদ্রুপ কখনো নিজের বুদ্ধি ভুলের স্বীকার হয়।’ ৪১৯
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার বড়ো একটি মূলনীতি হলো—শুরা বা পরামর্শ করা। এটা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের মাধ্যমে সাব্যস্ত। ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন—‘শুরা ব্যবস্থা শরিয়তের একটি মূলনীতি ও বিধিবিধানের একটি ভিত্তি। এক্ষেত্রে কারও কোনো খিলাফ বা মতবিরোধ নেই।’
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রশংসা করে বলেন— وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ ‘আর তাদের বিষয় পরস্পরের মাঝে পরামর্শপূর্ণ’। ৪২০
এক বেদুইন বলে—আমি কখনোই ঠকি নি, যদি না আমার জাতি ঠকেছে। তাকে বলা হলো, সেটা আবার কীভাবে? তিনি বললেন— আমি তাদের সাথে পরামর্শ ছাড়া কিছুই করি না।
ইবনু খুওয়াইজ মিনদান বলেন— ‘শাসকদের কর্তব্য হলো, দ্বীনের অজানা বা অস্পষ্ট বিষয়ে উলামায়ে কিরামের সাথে পরামর্শ করা, যুদ্ধের বিষয়ে সেনাবাহিনীর সাথে পরামর্শ করা, বিভিন্ন কল্যাণকর বিষয়ে দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করা, দেশের কল্যাণকর ও দেশ বিনির্মাণের বিষয়ে রাজ্যের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিবর্গ, মন্ত্রী ও গভর্নরদের সাথে পরামর্শ করা। মোট কথা, প্রত্যেকের কর্তব্য নিজ নিজ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যক্তির সাথে পরামর্শ করা।’
টিকাঃ
* তাফসিলুন নাজার, ৯৯
📄 শুরা ব্যবস্থার বৈধতার দলিল
কুরআন থেকে: মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ (১৫৯) 'আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণেই আপনি তাদের জন্য কোমল হতে পেরেছেন, আর যদি আপনি কঠিন ও কঠোর হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তাহলে তারা আপনার পাশ থেকে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ত। সুতরাং, আপনি তাদের মাফ করে দেন, তাদের জন্য ইস্তিগফার করেন, তাদের সাথে (প্রয়োজনীয়) বিষয়ে পরামর্শ করেন। আপনি যদি কোনো কিছু প্রতিজ্ঞা করেন, তাহলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করেন। নিঃসন্দেহে, আল্লাহ তাআলা ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।' ৪২২
এই আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনু জারির সালাফে সালিহিনের কিছু আসার উল্লেখ করার পর বলেন— 'এক্ষেত্রে সবচেয়ে সঠিক কথা হলো, আল্লাহ তাআলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহাবায়ে কিরামের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে পরামর্শ করার আদেশ করেছেন। যেমন: শত্রুদের বিষয়ে যুদ্ধের কলাকৌশল সম্পর্কে। (আল্লাহ তাআলার এরূপ আদেশ করার কারণ,) ইসলাম সম্পর্কে যাদের অন্তর্দৃষ্টি নেই তারা যেন এমন অন্তর্দৃষ্টি লাভ করে, যার ফলে শয়তানের ফিতনা থেকে মুক্তি পওয়া যাবে এবং যার মাধ্যমে উম্মাহকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো শেখানো যাবে। তাহলে তারা নবীজির মৃত্যুর পর বিভিন্ন সমস্যার সময় নবীজির পন্থা স্মরণ করে পরস্পরের মাঝে পরামর্শ করবে, যেমন জীবদ্দশায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরামর্শ করতেন।
কিন্তু একট পার্থক্য হবে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরামর্শ করতেন ঠিকই, তবে আল্লাহ তাআলাই তাঁকে ওহি বা ইলহামের মাধ্যমে জানিয়ে দিতেন কোনটা সঠিক, আর কোনটা ভুল। পক্ষান্তরে, উম্মাহ শুধু তাঁর সুন্নাহ হিসাবে পরামর্শ করতে পারে সত্য যাচাই-বাছাই করার জন্য, সঠিক বিষয় জানার উদ্দেশ্যে, যাতে প্রবৃত্তির অনুসরণ না হয়ে যায়, হিদায়াতের পথ থেকে বিচ্যুতি না ঘটে। আল্লাহই তাদের সঠিক পথ দেখাবেন এবং তাউফিক দেবেন। ৪২০
ইমাম বাগাভি রাহিমাহুল্লাহ বলেন—হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তাআলা জানেন যে, নবীজির পরামর্শ করার কোনো প্রয়োজন নেই (তবুও আল্লাহ তাআলা নবীজিকে পরামর্শ করার আদেশ করেছেন)। কারণ আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন, তাঁর পর যারা আসবে তারা যেন এটাকে সুন্নাহ হিসাবে গ্রহণ করে।১২৪
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রশংসা করে বলেন— وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ
'আর যারা তাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দেয় এবং নামাজ কায়েম করে এবং যাদের বিষয়াদি পরামর্শপূর্ণ।' ৪২৫
ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন-'আনসার সাহাবিগণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের পূর্বে যখন কোনো কাজ করতে চাইতেন, তারা পরস্পর পরামর্শ করতেন। তারপর সে অনুযায়ী কাজ করতেন। তাই, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের মাধ্যমে তাদের প্রশংসা করেছেন।' ৪২৬
সুন্নাহ থেকে দলিল: আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— المستشار مؤتمن
'যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়, সে এ বিষয়ে আমানতদার।'২
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন— ما رأيت أحدا أكثر مشورة لأصحابه من رسول الله صلى الله عليه وسلم
'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বেশি আর কাউকে তাঁর সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করতে দেখি নি।' ৪২৮
টিকাঃ
*** তাফসিরে কুরতুবি, খণ্ড:
৪২০ তাফসিরে তাবারি, খণ্ড: ৫৭, পৃষ্ঠা: ৩৪৫
*** তাফসিরে বাগাভি, ১/৫২৬
*২৯ সূরা শুরা, আয়াত: ৩৮
*** তাফসিরে কুরতুবি, খণ্ড: ১৬, পৃষ্ঠা: ৩৬
*** সুনানু আবি দাউদ, ৫১২
*সনানে তিরমিজি
📄 শুরার ক্ষেত্র
শূরা বা পরামর্শ সেখানেই করা হবে, যেখানে কোনো 'নস' (কুরআন বা হাদিস) নেই—যুদ্ধের বিষয়ে হোক বা অন্যান্য বিষয়ে।
আলি ইবনু আবি তালিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম—ইয়া রাসুলাল্লাহ, কখনো কখনো আমাদের সামনে এমন পরিস্থিতি চলে আসে, যে বিষয়ে কুরআনের কোনো আয়াতও বর্ণিত হয় নি, আপনার থেকে কোনো সুন্নাহও গত হয় নি (তখন আমরা কী করব?)। তিনি বললেন—
اجمعوا له العالمين أو قال العابدين من المؤمنين فاجعلوه شورى بينكم ولا تغضب فيه برأي واحد 'তখন তোমরা সেজন্য আলিমদের (কিংবা তিনি বলেছেন) অথবা মুমিনদের মধ্যে যারা আলিম, তাদের একত্র করো। শুধু একজনের রায়ের মাধ্যমেই ফায়সালা করে দিয়ো না।' ৪৩৪
টিকাঃ
৪০৪ জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহি, ৬১১