📄 দাওলাতে উসমানিয়ার বিচার-ব্যবস্থা
কাজি নিযুক্তকরণের দায়িত্ব : উসমানি সালতানাতের সূচনাতে সুলতান নিজেই কাজিদের নিয়োগ দিতেন। পরবর্তী সময়ে কাজি নিযুক্ত করাটা শাইখুল ইসলামের ১০২ সাথে খাস হয়ে যায়। তবে নিযুক্তকরণ তখনই চূড়ান্ত হতো, যখন সুলতানের ইচ্ছা মোতাবেক হতো।
৯৫১ হিজরি সনে যখন আবু সায়িদ মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ মুস্তফা ফতোয়া দেওয়ার মর্যাদা লাভ করেন, তখন তিনি সুলতানের সামনে কাজিদের নিযুক্তকরণের নিজের চিন্তা পেশ করেন। তিনি বলেন— 'যেহেতু আমাদের যুগে কাজিদের সবার সমান মর্যাদা হয়ে গেছে, ধার্মিকতাও প্রায় সবার সমান; তাই ইলম, ধার্মিকতা ও আদালতের ক্ষেত্রে যে শ্রেষ্ঠ ও যোগ্যতর তাকে অগ্রগামী করা উচিত।' তার এ কথা থেকে বোঝা যায়— তিনি কাজিদের নির্বাচনের জন্য আলাদা একটি পর্ষদ প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছিলেন ১০৩
পরবর্তী সময়ে কাজি নিযুক্তকরণ কয়েকটি ধাপে কার্যকর হতো। প্রথমত, অন্যান্য কাজিদের আবেদনের মাধ্যমে আরমানিয়া কিংবা আনাতুলে একজন কাজির পদে দাঁড়াত। পরে তার বিষয়টি শাইখুল ইসলামের সামনে পেশ করা হতো। শাইখুল ইসলাম রাজি হলে সুলতানের সামনে পেশ করা হতো। এরপর তার মাধ্যমেই কাজি নিযুক্তকরণ পূর্ণতা লাভ করত। আর কাজির নায়েব নিযুক্ত করার দায়িত্ব ছিল স্বয়ং কাজিরই।
প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্যের কাজিদের নির্ধারণ করা হতো ইস্তাম্বলের বাবে আলি থেকে। পরে যখন আরও উন্নতি হলো, তখন অন্যান্য কাজিদের নির্ধারণের মাধ্যমেই প্রদেশের শাসকরা নির্ধারিত হতো। যেমন: ১২৩২ হিজরিতে সায়িদ পাশা মিসরের শাসক নিযুক্ত হন মিসরের প্রদেশসমূহের কাজিদের নিযুক্তকরণের মাধ্যমে। যদিওবা ইস্তাম্বুলের হুকুমাতের আদেশ ছিল। (কিন্তু সেটা যথেষ্ট ছিল না। বরং অন্যান্য কাজিদের সমর্থন প্রয়োজন হয়েছিল।)
আবার, মিসরের প্রধান কাজি নিযুক্ত হতো সরাসরি ইস্তাম্বুল থেকে। সেজন্য তুর্কি হওয়া শর্ত ছিল। প্রধান কাজি আবার মিসরের বিভিন্ন অঞ্চলের কাজিদের নিযুক্ত করতেন। পরবর্তী সময়ে কাজিদের নির্বাচনের জন্য মিসরে একটি পর্ষদ গঠন করা হয়। যারা কাজিদের নিযুক্ত করত, তাদের আদালতের কার্যবিবরণীতে উল্লিখিত শর্তাবলি রক্ষ করতে হতো। যেমন: ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে আদালতের কার্যবিবরণীতে উল্লিখিত ছিল—শরয়ি কাজিদের নির্ধারণ পরিপূর্ণ হবে ‘খাদইউই’ (মিসরের শাসক) এর আদেশের মাধ্যমে। তবে এর আগে বিচারমন্ত্রী বা তার নায়েবের উপস্থিতিতে, মিসরের প্রধান আদালতের কাজি, জামিয়া আজহারের শাইখ, হানাফি মাজহাবের বিজ্ঞ উলামায়ে কিরামের (সাথে অন্যান্য উলামায়ে কিরামও থাকতে পারেন) নির্বাচন প্রয়োজন ছিল।
১৮৯৭ সালে হাক্কানিয়া (বিচার মন্ত্রণালয়) সংগঠনের কার্যবিবরণীতে উল্লেখ ছিল, কাজির নির্বাচন হবে বিচারমন্ত্রী বা তার নায়েবের উপস্থিতিতে, জামিয়া আযহারের শাইখ, মিসরের বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কিরাম, হাক্কানিয়া সংগঠনের উলামায়ে কিরাম, শরয়ি আদালতগুলোর বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের মধ্য থেকে দুইজন—এদের সবার সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে।
১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী ইস্তাম্বুলে একটি প্রতিষ্ঠান খোলা হয় কাজিদের নির্বাচনের জন্য। তখন থেকে কাজিদের নির্ধারণ করা হয় ওই প্রতিষ্ঠানের সনদপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের থেকে। তারপর ১৯০৯ সালে মিসরে ২৫ ধারায় একটি আইন জারি করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, কীভাবে কাজি, আদালতের কর্মী-সদস্য ও মুফতিদের নির্বাচন করা হবে। (..ধারাবাহিক সংখ্যা নাম্বার ছিল ১০-১৪ পর্যন্ত..) তারপর সে অনুযায়ী কীভাবে কাজ করা হবে।
১৯১৪ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন মিসর তুরস্কের শাসন-ব্যবস্থা থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ফলে সাংবিধানিকভাবে সমস্ত কাজি নিযুক্ত করার দায়িত্ব অর্পিত হয় মিসরের শাসকের হাতে। ১৪১২
উসমানি যুগে কাজির শর্তাবলি: উসমানি খিলাফতকালে কাজি নির্বাচনের জন্য বেশ কয়েকটি শর্ত জারি করা হয়—
০১। কাজির বয়স (অন্তত) ২৫ বছর হতে হবে।
০২। আইনে সাব্যস্ত করা ওজর থেকে মুক্ত থাকতে হবে। অর্থাৎ, বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কোনো আইন যেন বাধার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।
০৩। এমন ব্যক্তি হতে হবে, যাকে অপরাধের কারণে এক সপ্তাহের বেশি কারাদণ্ড গ্রহণ করতে হয় নি।
০৪। বোধশক্তিসম্পন্ন, সরল, বিশ্বস্ত, মর্যাদাবান, ইলম ও আমলে মজবুত হতে হবে।
০৫। 'কাজিয়্যা', 'মুদাল' ও 'মুশকাল'-এগুলোর প্রত্যেকটির মাঝে পুরোপুরি পার্থক্য করার যোগ্যতা থাকতে হবে।
০৬। 'বিচার-ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান' থেকে সনদপ্রাপ্ত হতে হবে, কিংবা ইন্টারভিউ দিতে হবে এবং বিচার-ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানে যে দারসগুলো দেওয়া হয়, সেগুলোতে পুরোপুরি সফল হতে হবে।
০৭। কাজিকে হানাফি মাজহাবের অনুসারী হতে হবে। তবে নায়েবের ক্ষেত্রে এটা শর্ত নয়। অর্থাৎ, কাজিকে হানাফি মাজহাবের হতে হবে। আর এই কাজি চার মাজহাবের চারজনকে নায়েব বানাবেন।
০৮। যেকোনো প্রদেশের প্রধান কাজিকে তুর্কি বংশোদ্ভূত হতে হবে। আর অন্যান্য কাজি বা তাদের নায়েবগণের ক্ষেত্রে এটা শর্ত নয়। তারা মিসরীয় হতে পারেন, আবার অন্যান্য দেশেরও হতে পারেন।১০
টিকাঃ
** শাইখুল ইসলাম তাকে বলা হতো, যিনি দাওলাতে উসমানিয়ার প্রধান মুফতি হতেন। এই পদের সূচনা হয় সুলতান সুলাইমান আল-কানুনির যুগ থেকে-লেখক。
*১ তারিখুল কাজা, ২১২
*১২ তারিখুল কাজা ফিল ইসলাম
* তারিখুল কুজাত, ২১২
📄 বিচারের কয়েকটি স্তর
উসমানি খিলাফতে বিচার-ব্যবস্থায় অনেক কিছু নতুন করে সংযোজিত হয়, অনেক কানুন জারি করা হয়। যার ফলস্বরূপ আরেকটি আইন সংযোজন করা হয়। অর্থাৎ, পূর্বের করা বিচার নতুন করে ফায়সালা করার জন্য কিছু বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়, যাতে বিচারালয় থেকে কোনো বিচার বের হওয়ার পর সে মামলা-মোকদ্দমা নতুন আঙ্গিকে দেখা যায়।
১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে মিসরের একটি কার্যবিবরণীতে বলা হয়, যেকোনো মামলা-মোকদ্দমা তিন মজলিসে (বৈঠকে) তিনবার দেখা হবে। প্রথমে দেখা হবে শরয়ি বিচারালয়ে। কিন্তু বাদী-বিবাদী দুজনই কিংবা একজনও যদি সন্তুষ্ট না হয়, বরং অভিযোগ করে তাহলে সেটা মিসরের প্রধান বিচরালয়ের তত্ত্বাবধানে সাধারণ বিচারালয়ে আবার দেখা হবে।
এরপরও যদি বিচারের ক্ষেত্রে তাদের কোনো অস্পষ্টতা বা সন্দেহ থাকে, তাহলে জামিয়া আযহারের শাইখ এবং হানাফি মাজহাবের উলামায়ে কিরামের তত্ত্বাবধানে আবার দেখা হবে। ৪১৪
টিকাঃ
৪১৪ তারিখুল কাজা ফিল ইসলাম
📄 উসমানি খিলাফতকালে হানাফি মাজহাবে বিচার-ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
উসমানি খলিফারা সবাই ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। তারা শাইখুল ইসলামকে (প্রধান মুফতি) হানাফি আলিমদের থেকেই নির্বাচন করতেন। শাইখুল ইসলামও নিজ মাজহাব অনুযায়ী ফতোয়া দিতেন। পরে যখন সুলতান সুলাইমান সালতানাতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন তিনি একটি ফরমান জারি করেন। সেখানে তিনি ঘোষণা করেন যে, এখন থেকে সকল ক্ষেত্রে হানাফি মাজহাবই দাওলাতে উসমানিয়ার আবশ্যকীয় মাজহাব-বিচার হোক বা ফতোয়া।
তখন থেকে শাইখুল ইসলাম, সমস্ত কাজি ও মুফতি হানাফি মাজহাবের ভিত্তিতেই বিচার করতেন এবং ফতোয়া দিতেন। আলি হায়দার প্রণীত দুরাবুল আহকাম কিতাবে (খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৯১) আছে, 'দাওলাতে উসমানিয়া প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিচারালয়ে থাকার সময় কাজিদের হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ফতোয়া দেওয়ার জন্য আদেশ করা হয়, যদিও তারা অন্য কোনো মাজহাবের মুকাল্লিদ (অনুসারী) হতেন।'
পরবর্তী সময়ে দাওলাতে উসমানিয়ার তত্ত্বাবধানে মুআমালাতের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে হানাফি মাজহাব সংকলন করা হয়, যাতে খিলাফতে উসমানিয়ার আদালতে সেগুলো আবশ্যকীয়ভাবে প্রয়োগ করা যায়। যে সকল হুকুম-আহকামগুলো আদালতে বার বার প্রয়োগ করতে হয়, সেগুলো সংকলনের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি পর্যদ গঠন করা হয়।
১২৮৬ হিজরি সনে এই পর্যদ মুআমালাতের হুকুম-আহকামের একটি সংকলন প্রস্তুত করেন, যেখানে হানাফি মাজহাবের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতটি পেশ করা হয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ প্রয়োজনের কারণে এবং সময়ের দাবি রক্ষা করে, কম গ্রহণযোগ্য মতটিও আনা হয়। এই সংকলনে বিধানগুলো ধারাবাহিক সংখ্যা আকারে বিষয়ভিত্তিক তুলে ধরা হয়েছে, যেমনটি বৈদেশিক আইন-কানুনের ক্ষেত্রে করা হয় যাতে করে প্রয়োজনের সময় সহজেই দেখা সম্ভব হয়। এভাবে ১৮৫১টি সংখ্যা হয়েছে।
এই সংকলনের নামকরণ করা হয় 'মাজাল্লাতুল আহকামিল আদালিয়্যা'। সংকলনটিতে কখনো কখনো বিভিন্ন হুকুমের সাথে উদাহরণও পেশ করা হয়েছে। এছাড়াও আরও দুটো মুকাদ্দিমা ৯৯টি সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়-একটি ফিকহ ও তার প্রকার সম্পর্কে, আরেকটি ফিকহের মূলনীতি সম্পর্কে।
সুলতান আব্দুল আজিজ খান ইবনু সুলতান মাহমুদ সানির পক্ষ থেকে ১২৯৩ হিজরি সনের শাবান মাসে শাহি ফরমান জারি করা হয়, যেন রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি আদালতে এই 'মাজাল্লা' অনুযায়ী আমল করা হয় এবং সকল বিধান প্রয়োগ করা হয়। মোটকথা, হানাফি মাজহাব থেকে সংকলন করা এই মাজাল্লাটি একটি রাষ্ট্রীয় আইন হিসাবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হয়ে যায়।৪১৫
এই হলো ইসলামের বিচার-ব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। বিস্তারিত জানতে চাইলে বান্দার আরেকটি কিতাব দেখা যেতে পারে 'তাতিম্মাতুল নিজাম ফি তারিখিল কাজা ফিল ইসলাম'।