📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 আবু বকর রা.-এর যুগে বিচার-ব্যবস্থা

📄 আবু বকর রা.-এর যুগে বিচার-ব্যবস্থা


আবু বকর রা.-এর যুগ ছিল খিলাফতে রাশিদার প্রথম যুগ। তাই, নবীযুগের সাথে তার সম্পর্ক ও নৈকট্য অত্যন্ত নিবিড় ছিল। তাঁর যুগে বিচার-ব্যবস্থা হুবহু ওই রকম ছিল, ঠিক যেমন ছিল নবীযুগে। যখন কোনো বিচারের প্রয়োজন হতো, তখন তিনি নিজেই বিচার করতেন। তিনি বিচার-ব্যবস্থাকে রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে পৃথক করেন নি। সে সময় বিচার-ব্যবস্থার আলাদা কোনো পদও ছিল না। বরং তা রাষ্ট্র পরিচালনারই একটি অংশ ছিল, ঠিক যেমন ছিল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে। তবে তিনি মাঝে মাঝে বিশেষ কোনো বিচারে অন্যের সাহায্য গ্রহণ করতেন। যেমন: মদিনা মুনাওয়ারাতে বিচারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন উমার রা.-কে, তবে সেই বিচার-ব্যবস্থার আলাদা কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
আবু বকর রা. অধিকাংশ প্রশাসক ও কাজিকে আপন পদেই বহাল রেখেছেন, যাদেরকে স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিযুক্ত করেছেন।
আবু বকর রা.-এর যুগে বিচার-ব্যবস্থার উৎস-
০১. কুরআনে কারিম;
০২. সুন্নাতে নববি, যার মাঝে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিচার-ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত;
০৩. ইজমা;
০৪. ইজতিহাদ ও রায়।
তবে এই চতুর্থ প্রকার তখনই, যখন কোনো বিষয় কিতাবুল্লাহ বা সুন্নাতে রাসুল অথবা ইজমায়ে উম্মাহর মাঝে না পাওয়া যায়।

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 উমার রা.-এর যুগে বিচার-ব্যবস্থা

📄 উমার রা.-এর যুগে বিচার-ব্যবস্থা


উমার রা.-এর যুগে ইসলাম যখন ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে, রাষ্ট্রের পরিধি বিস্তৃত হয়, খলিফার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও বৃদ্ধি পায়, বিভিন্ন এলাকার প্রশাসকদের কাজ বেড়ে যায়, পরস্পরের মাঝে ঝগড়া-বিবাদ বেশি দেখা দেয়। তখন উমার রা. বিচার-ব্যবস্থাকে আলাদা ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করার চিন্তা করেন, যাতে প্রশাসক প্রশাসনের দায়িত্ব ভালোভাবে আঞ্জাম দিতে পারেন। তাই, উমার রা. বিভিন্ন শহরে কাজিদের নিয়োগ দেন। যেমন: কুফা, বসরা, শাম, মিসর। তিনি শুরাইহ রা.-কে কুফায়, উবাদা ইবনু সামিত রা.-কে শামে কাজি হিসাবে নিযুক্ত করেন (যিনি বাইআতে আকাবায়ে নির্ধারিত ১২ জন নকিবের একজন ছিলেন)।
উমার রা. একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাব ইবনু সুরকে বসরার শাসক হিসাবে প্রেরণ করেন। ঘটনাটি হলো—একবার কাব রা. উমার রা.-এর কাছে বসা ছিলেন। তখন এক নারী এসে বলল, 'আমি আমার সামীর চাইতে শ্রেষ্ঠ আর কোনো পুরুষকে দেখি নি। তিনি রাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েন, দিনে রোজা রাখেন।'
তখন উমার রা. তার জন্য ইস্তিগফার করে বললেন- 'তোমার মতো নারী ভালোই। তুমি নিজের সামীর প্রশংসা করেছ।'
এই নারী তখন লজ্জা পেয়ে চলে যেতে লাগল। এটা দেখে কাব রা. বলে উঠলেন- 'আমিরুল মুমিনিন, যদি তাকে তার স্বামীকে নিয়ে আসতে বলতেন!'
উমার রা. বললেন-'কেন সেটাই কি তার ইচ্ছা ছিল?'
কাব বললেন- 'হ্যাঁ।'
তিনি বললেন-'নারীটিকে ফিরিয়ে আনো।'
তাকে ফিরিয়ে আনা হলে উমার রা. বললেন- 'তুমি যা বলতে চাচ্ছিলে তা সত্য সত্য বলো, কোনো অসুবিধা নেই। সে (কাব) বলছে যে, তুমি অভিযোগ করতে এসেছ।'
তখন ওই নারী বলল-'হ্যাঁ, আমি একজন যুবতী নারী। অন্যান্য নারীদের মতো আমারো কিছু কামনা থাকা স্বাভাবিক।'
(এ কথা শুনে) উমার রা. তার স্বামীকে আসতে বললেন, আর কাবকে বললেন- 'তুমিই তাদের মাঝে ফায়সালা করো'।
তিনি বললেন- 'আমার মতে, নারীকে প্রত্যেক চারদিনে একদিন সুযোগ দেওয়া হবে। অর্থাৎ, ধরা হবে তার চারজন স্ত্রী আছে। কিন্তু যেহেতু এই নারী ছাড়া তার আর কোনো স্ত্রী নেই, তাই বাকি তিনদিন তার জন্য। সে এই তিনদিন ইবাদাত-বন্দেগি করবে, আর নারীর জন্য একদিন থাকবে। তখন উমার রা. বলে উঠলেন-
والله ما رأيك الأول بأعجب الي من الآخر اذهب فأنت غاضب على البصرة...
'আল্লাহর কসম! (বুঝতে পারছি না) তোমার কোন মতটা বেশি মুগ্ধকর! যাও, (এখন থেকে) তুমি বসরার কাজি।' ৩৮৯
উমার রা.-ই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বিচার-ব্যবস্থাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থার রূপ দান করেছেন, যা রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে আলাদা। একইভাবে তিনিই সর্বপ্রথম কাজিদেরকে বাইতুল মাল থেকে ভাতা দেওয়ার প্রথা চালু করেন।

টিকাঃ
*** তারিখু কুজাতিল আন্দালুস,

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 উসমান রা.-এর যুগে বিচার-ব্যবস্থা

📄 উসমান রা.-এর যুগে বিচার-ব্যবস্থা


উমার রা.-এর যুগে বিচার-ব্যবস্থা যেমন ছিল, উসমান রা.-এর যুগেও তাই ছিল। উমার রা. আল্লাহ তাআলার তাউফিকে, নিজের মেধা ও প্রতিভা কাজে লাগিয়ে বিচার-ব্যবস্থাকে আরও এগিয়ে নিয়েছেন। ফলে তার কিছু মূলনীতি ও নীতিমালা উসমান রা.-এর আগেই তৈরি হয়েছিল, যা থেকে উসমান রা. কাজি নিয়োগ করা, তাদের ভাতা দেওয়া, তাদের শুধু বিচারের দায়িত্ব প্রদান করা, কাজির গুণাবলি ও করণীয়, কাজা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিধানের উৎস এবং ওই সমস্ত দলিল-প্রমাণাদি যার ওপর কাজার ভিত্তি ছিল—এ সকল বিষয়ে উমার রা.-এর বিচার-ব্যবস্থার মূলনীতি থেকে উসমান রা. বেশ উপকৃত হয়েছেন।৩৯০
নববি যুগ এবং আবু বকর ও উমার রা.-এর যুগে কাজিদের আলাদা কোনো বসার স্থান ছিল না। কাজি সাহেব মামলা-মোকদ্দমা দেখতেন। এরপর প্রায় সময় মসজিদে কিংবা নিজের ঘরে অথবা সাধারণ কোনো জায়গায় বিচারের ফায়সালা করতেন। কারণ, তখন এত বেশি মামলা-মোকদ্দমা ছিল না। কিন্তু উসমান রা.-এর যুগে তিনি কাজির জন্য আলাদা একটি ঘর তৈরি করলেন, যা কাজার জন্য নির্দিষ্ট ছিল; যাতে মসজিদ শোরগোল থেকে দূরে থাকে, বেহুদা কাজ ও কথা থেকে মসজিদকে পবিত্র রাখা সম্ভব হয়।
অতএব, উসমান রা.-ই প্রথম ব্যক্তি, যিনি মদিনায় কাজার জন্য আলাদা একটি ঘর নির্মাণ করেন। এরপর বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এটা দ্বারা এরূপ বোঝায় না যে, সাধারণ মামলা-মোকদ্দমার নিষ্পত্তি মসজিদে বা নিজের ঘরে করা নিষেধ। এটা শুধু একটি নিয়ম হয়ে গিয়েছে যে, বিচার-ব্যবস্থা হবে তার নির্দিষ্ট স্থানে বা আদালতে।৩৯১

টিকাঃ
৩৯০ মাওসুআতুস সিয়ার, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ১৩৩
৩৯১ তারিখুল কুজাতি ফিল ইসলাম

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 আলি রা.-এর যুগে বিচার-ব্যবস্থা

📄 আলি রা.-এর যুগে বিচার-ব্যবস্থা


আলি রা.-এর যুগে বিচার-ব্যবস্থা পূর্ববর্তী খলিফাদের পদ্ধতিতেই ছিল। তবে আলি রা. বিচারালয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলাদা কিছু সময় ব্যয় করতেন; যদিও তখন মুসলিমদের ঐক্যে ফাটল ধরে। তার আলাদা সময় দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায় তার একটি পত্র থেকে, যা তিনি মিসরের প্রশাসক আশতার ইবনু নাখায়ির কাছে পাঠিয়েছেন, সেখানে তিনি বলেছেন—
'অতঃপর তুমি তোমার জনগণের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তিকে বিচারের জন্য নির্বাচন করো। এমন ব্যক্তি—
০১. যাকে মামলা-মোকদ্দমা কাবু করতে পারবে না。
০২. যার সাথে বাদী-বিবাদীরা কথা কাটাকাটি করার সাহস পাবে না。
০৩. যে বারবার ভুল করে বসে না。
০৪. যে ভুল ফায়সালা করার পর সত্য জানলে সেটা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করে না。
০৫. যে কোনো প্রলোভনের আশা করে না。
০৬. যে সামান্য কথা শুনেই বিচার শুরু করে দেয় না, বরং শেষ পর্যন্ত সবকিছু শোনে。
০৭. অস্পষ্ট বিষয়গুলো সম্পর্কে যার জ্ঞান বেশি。
০৮. যে সব ক্ষেত্রে দলিল-প্রমাণাদি জানতে ইচ্ছুক。
০৯. যে দ্বিতীয়বার বিচার-নিরীক্ষণ করতে বিতৃষ্ণা হয় না。
১০. যে ঘটনার খুঁটিনাটি বের করার বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করতে পারে。
১১. যে বিচার করার সময় কঠোর থাকে, তবে অহংকারের সাথে নয়。
১২. যাকে কোনো প্ররোচনা টলাতে পারে না。
এরকম মানুষ অবশ্য খুবই কম। তারপরও তুমি তার বিচারকার্য বেশি বেশি পর্যবেক্ষণ করো। আর তাকে এ পরিমাণ ভাতা দাও, যাতে তার প্রয়োজন পূরণ হয়ে যায়, একই সাথে মানুষের কাছে যাওয়ার প্রয়োজনও কমে যায়। আর তাকে এমন মর্যাদা দাও, যা তোমার বিশিষ্টজনেরাও আশা করে না, যাতে সে এ বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারে যে, তোমার কাছ থেকে তার এই পদ কেউ কেড়ে নেবে না।'৩৯২
এই পত্র থেকে বোঝা যায়—একজন কাজির কী কী গুণ থাকবে, তার ওপর কী কী অপরিহার্য, বিচারের সময় তাকে কীভাবে কথা বলতে হবে (সংক্ষিপ্ত কথা তবে বিরক্তিকর নয়)। চিঠিটি মূলত বিচার-ব্যবস্থার বিষয়ে আলি রা.-এর সর্বোচ্চ গুরুত্ব তুলে ধরে এবং তার সুচিন্তা ও জ্ঞানের পূর্ণতা প্রমাণিত করে, বিশেষ করে বিচার-ব্যবস্থার বিষয়ে। এজন্যই আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত আছে— كنا نتحدث أن أقوى أهل المدينة علي بن أبي طالب رضي الله عنه رواه الحاكم في المستدرك
'আমরা আলোচনা করতাম যে, আলি রা. মদিনাবাসীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কাজি।'৩৯৩
আলি রা.-ই সর্বপ্রথম সাক্ষীদের আলাদা করেন। অর্থাৎ, সাক্ষীদের থেকে আলাদা আলাদা সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবাতে আছে— 'আলি রা.-ই সর্বপ্রথম সাক্ষীদের আলাদা করেন।'
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন—'আমি আলি রা.-এর বিচার অধ্যায়ে সনদ ছাড়া একটি ঘটনা পড়েছি। ঘটনাটি হলো—একবার এক নারীকে আলি রা.- এর সামনে পেশ করা হলো, যার বিরুদ্ধে জিনার অভিযোগ করা হয়েছে। সেই নারী ছিল ইয়াতিম, তাই সে এক লোকের কাছে থাকত। ইয়াতিম মেয়েটি যুবতী হয়ে গেল। লোকটির স্ত্রী ভয় পেয়ে গেল, না-জানি তার স্বামী আবার ওই যুবতীকে বিয়ে করে ফেলে। তাই, সে কয়েকজন নারীকে নিয়ে ওই ইয়াতিম যুবতীকে এক জায়গায় আটকে রাখল। আর সেই স্ত্রী নিজের আঙুল দিয়ে ওই যুবতীর কুমারিত নষ্ট করে ফেলল। পরে যখন তার স্বামী আসে, তখন সেই স্ত্রী ওই যুবতীর বিরুদ্ধে জিনার অপবাদ দেয়। প্রমাণ হিসাবে ওই সব নারীকে উপস্থিত করে, যারা তাকে এই কাজে সাহায্য করেছিল।
সব শুনে আলি রা. স্ত্রী লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার কি কোনো সাক্ষী আছে?' স্ত্রী লোকটি বলল, 'হ্যাঁ, এই নারীরাই আমার দাবির সাক্ষী।' তখন আলি রা. তাদের উপস্থিত করলেন, সাথে তরবারিও সামনে এনে রাখলেন। তাদের আলাদা করলেন। এরপর প্রত্যেককে আলাদা আলাদা ঘরে রাখলেন। তারপর লোকটির স্ত্রীকে ডেকে সব ধরনের চেষ্টা করলেন, কিন্তু স্ত্রী তার কথার ওপর অবিচল। তখন তাকে তার ঘরে ফিরিয়ে দিলেন, যেখানে তাকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল।
এবার একজন সাক্ষীকে ডাকলেন। আলি রা. হাঁটু গেড়ে বসে তাকে বললেন, 'দেখো, ওই নারী (স্ত্রী) যা বলার বলেছে, শেষে সত্য স্বীকার করেছে। আর তাকে আমি নিরাপত্তাও দিয়েছি। এখন তুমি সত্য কথা বলে ফেলো, না-হয় আমি কিছু একটা ব্যবস্থা নেবই নেব।' তখন নারীটি ভয়ে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমার কোনো দোষ নেই। ওই স্ত্রী লোকটি ইয়াতিম যুবতীর রূপ-সৌন্দর্য দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল, না-জানি তার স্বামী অন্যায়ে লিপ্ত হয়ে যায়। তাই, সে আমাদের ডেকে আনে। আমরা ওই যুবতীকে আটকে রাখি। তখন ওই স্ত্রী লোকটি যুবতীর কুমারিত্ব নিজের হাতে নষ্ট করে ফেলে।'
তখন আলি রা. বলে ওঠেন, 'আল্লাহু আকবার। আমিই প্রথম, যে সাক্ষীদের আলাদা আলাদা করে সাক্ষ্য গ্রহণ করেছে।' পরে তিনি ওই নারীকে হুদ্দূল কাজফ (অপবাদ দেওয়ার হদ) লাগালেন। আর অন্যান্য নারীদের ওপর জরিমানা আরোপ করলেন। এরপর স্ত্রী লোকটির স্বামীকে তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার আদেশ করলেন। আর তার সাথে ওই যুবতীর বিবাহ দিলেন। তার মোহরও তিনি নিজ থেকে আদায় করলেন।' ৩৯৪
যদি কোনো অপবাদ বা মিথ্যার আশঙ্কা থাকত, আলি রা. (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু) বিবাদীদেরও আলাদা আলাদা করে তাদের কথা শুনতেন। আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'একবার এক যুবক আলি রা.-এর কাছে কয়েকজনের ব্যাপারে অভিযোগ নিয়ে এলো যে, এরা সফরে আমার আব্বার সাথে বের হয়েছিল। কিন্তু তারা ফিরে এলেও আমার আব্বা আর ফিরেননি। তখন তিনি তাদেরকে তার আব্বা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে, তিনি না-কি মারা গেছেন। এবার আমি তাদেরকে আব্বার সাথে থাকা সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তারা বলে, তিনি না-কি কিছুই রেখে যাননি। অথচ তার সাথে অঢেল সম্পদ ছিল। পরে আমরা কাজি শুরাইহকে বললে তিনি তাদের থেকে কসম নেন। (তারা কসম খেলে) তিনি তাদেরকে ছেড়ে দেন। তখন আলি রা. তার নিরাপত্তা বাহিনীকে ডেকে বিবাদীদের প্রত্যেকের সাথে দুজন করে নিরাপত্তাকর্মীকে দায়িত্ব দেন। আর তাদেরকে কড়াভাবে বলেন, এদের কেউ যেন আরেকজনের কাছে যেতেও না পারে, কোনোভাবে কথা বলতেও না পারে। আলি রা. একজন কাতিবকে (লেখক) ডেকে বিবাদীদের একজনকে ডাকলেন। তারপর বললেন, তুমি আমাকে এই ছেলের বাবার সম্পর্কে যা জানো বলো। কোন দিন তিনি তোমাদের সাথে বের হয়েছিলেন? কোন কোন মানজিলে তোমরা সফরের বিরতি ঘোষণা করেছ? তোমাদের যাত্রা কেমন ছিল? কোন কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন? তার সম্পদ কীভাবেই বা নষ্ট হলো?
তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, কে তাকে গোসল দিয়েছে? দাফন করেছে? কে তার জানাজার নামাজ পড়িয়েছে? কোথায় তাকে দাফন করা হয়েছে? ইত্যাদি ইত্যাদি। কাতিব লিখছিল। আলি (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু) তাকবির বলে উঠলে উপস্থিত লোকেরাও তার সাথে তাকবির দিয়ে ওঠে। আর বাকি যারা বিবাদী ছিল, তাদের কারোই এ সম্পর্কে কিছুই জানা নেই। তারা শুধু মনে করেছে, তাদের এ সাথি সবকিছু স্বীকার করে ফেলেছে। তারপর এই বিবাদীকে মজলিস থেকে বের করে আরেকজনকে নিয়ে আসা হয়। তাকেও এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয়। তারপর আলি রা. আরেকজনকেও অনুরূপ জিজ্ঞাসা করেন। এভাবে তিনি সবার কথাই শুনলেন। কিন্তু প্রত্যেকের কথা ছিল অপরজনের কথার বিপরীত। তখন তিনি প্রথমজনকে আবার ডেকে এনে বললেন, আল্লাহর দুশমন! এখন তো আমি তোমার সাথিদের কথা শুনে তোমার বিশ্বাসঘাতকতা ও মিথ্যাবাদিতা ধরে ফেলেছি। এখন শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় সত্য কথা। তারপর তিনি তাকে জেলখানায় নিয়ে যান। আলি রা. আল্লাহ আকবার বলে উঠলে উপস্থিত সকলেও তাকবির বলে ওঠে।
বিবাদীরা যখন এ অবস্থা দেখল, তখন তারা নিশ্চিত হয়ে গেল যে, তাদের (প্রথম) সাথি এবার সব সত্যিই সত্যিই বলে দিয়েছে। তখন তিনি আরেকজনকে ডাকলেন, তাকেও ধমক দিলেন। তখন সে বলল, আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি (আগে থেকেই) তাদেরকে অসমর্থন করেছি। তারপর তিনি সবাইকে ডাকলেন। সবাই পুরো ঘটনা খুলে বলল। যে কারাগারে ছিল, তিনি তাকে ডেকে বলেন, দেখো, তোমার সাথীরা সবাই নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে। এখন তুমি মুক্তি চাইলে তোমাকেও সত্য কথা বলতে হবে। তখন সেও সবার মতো স্বীকার করল। আলি রা. তাদের ওপর সম্পদের জরিমানা আরোপ করলেন, একই সাথে তার বাবাকে হত্যার কিসাসও আবশ্যক করলেন।১৯৮

টিকাঃ
৩৯২ শারহুন নাহজিল বালাগা, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১০৩
৩৯৩ মুসতাদরাকে হাকিম
৩৯৪ আত তুরুকুল হিকমিয়্যা ফিলাসিয়াসতিমাশরাহcono

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00